নিষিদ্ধ সাম্রাজ্য
লেখিকা: তাসফিয়া হোসাইন
পর্ব – ০১
একটি অচেনা সকাল
চট্টগ্রাম শহর।
সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতর প্রবেশ করছে। বিছানার ওপর এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে একটি মেয়ে। হঠাৎ ফোনের শব্দে তার ঘুম ভাঙল।
— এই অ্যাভেলিন! আর কত ঘুমাবি? কলেজে যাবি না?
ফোনের ওপাশ থেকে অনিকার চিৎকার।
অ্যাভেলিন চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
— আর পাঁচ মিনিট ঘুমাতে দে না!
— তোর পাঁচ মিনিট মানে এক ঘণ্টা। তাড়াতাড়ি আয়!
— আচ্ছা বাবা, আসছি!
ফোন রেখে মেয়েটি উঠে বসল। আয়নার সামনে গিয়ে নিজের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে লাগল। তারপর তৈরি হয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
সরকারি সিটি কলেজ, চট্টগ্রাম।
কলেজের গেট দিয়ে ঢুকতেই মায়া পেছন থেকে ডাকল,
— এই যে আমাদের রাজকন্যা!
অ্যাভেলিন ঘুরে বলল,
— রাজকন্যা হলে অন্তত একটা রাজপ্রাসাদ পেতাম। তোরা শুধু বিরক্ত করিস!
রুদো হেসে বলল,
— প্রাসাদ লাগবে? আমার বাড়ি নিয়ে যা।
— আগে নিজের বাড়ির ছাদটা ঠিক কর, তারপর আমাকে প্রাসাদ দিস!
সবাই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।
— সকাল সকাল এত চিৎকার কিসের?
অ্যাভেলিন ঘুরে তাকাল।
আদ্রিয়ান!
কালো শার্ট, এলোমেলো চুল আর মুখে সেই চিরচেনা হাসি।
আদ্রিয়ান কাছে এসে বলল,
— তোমাদের আড্ডা শেষ হলে একটু ক্লাসেও যাবে?
অ্যাভেলিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
— তুমি কি কলেজের শিক্ষক নাকি?
— না, তবে তোমাদের মতো অলস শিক্ষার্থীদের দেখে দায়িত্ব নিতে ইচ্ছে করে।
— নিজের দায়িত্ব আগে সামলাও, অন্যের চিন্তা পরে করো।
মায়া হেসে বলল,
— তোরা দুজন শুরু করেছিস আবার!
আদ্রিয়ান কিছু না বলে হাসল। তারপর সবাই একসঙ্গে ক্লাসের দিকে চলে গেল।
দুপুরে সবাই ক্যান্টিনে বসে গল্প করছিল।
অনিকা হঠাৎ বলল,
— আচ্ছা, আমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি পাগল?
রুদো সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— অ্যাভেলিন!
অ্যাভেলিন চায়ের কাপ নামিয়ে বলল,
— নিজের নামটা বলতে এত লজ্জা কিসের? সরাসরি বললেই পারতি!
সবাই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর কথার বিষয় বদলে গেল। কেউ পরীক্ষার চিন্তা করছে, কেউ ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
বিকেলে কলেজ ছুটি হলো। সবাই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় নিচ্ছিল।
আদ্রিয়ান অ্যাভেলিনকে বলল,
— কাল কিন্তু অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে আসবে। স্যার আজ তোমার নামও বলেছেন।
— আমার নাম বলার মতো আর কেউ ছিল না?
— তোমার মতো শিক্ষার্থী তো আর দুটো নেই!
— ধন্যবাদ। এবার রাস্তা ছাড়ো।
আদ্রিয়ান হেসে সরে দাঁড়াল।
সন্ধ্যায় নিজের ছোট্ট ঘরে ফিরে অ্যাভেলিন জানালার পাশে বসল। বাইরে আকাশে পাখিরা আপন ঠিকানায় ফিরছে।
ফোনে ইরাবতীর মেসেজ এল।
Iraboti: কী করছিস?
Avelin: কিছু না। তুই?
Iraboti: তোকে খুব মনে পড়ছে।
মেয়েটি মেসেজটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
Avelin: আমারও।
তারপর ফোনটা পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
জীবনটা দেখতে যতটা সহজ, সবসময় ততটা সহজ হয় না। কিছু গল্পের শুরুতে হাসি থাকে, বন্ধুত্ব থাকে, ছোট ছোট আনন্দ থাকে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গল্পের পাতায় কী লেখা হবে, তা কেউ জানে না।
রাত বাড়তে লাগল। অ্যাভেলিন রাতের খাবার তৈরি করতে রান্নাঘরে গেল। একা থাকতে থাকতে নিজের সব কাজ নিজেকেই করতে শিখে গেছে সে। রান্না শেষ করে খাবার টেবিলে বসতেই ইরাবতীর ফোন এল।
— হ্যালো আপু, খেয়েছিস?
— এখন খাব। তুই খেয়েছিস?
— হ্যাঁ। আচ্ছা, তুই আমাদের কাছে কবে আসবি?
অ্যাভেলিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— সময় হলে যাব রে।
— তুই সবসময় এমন করিস কেন? আমাদের থেকে এত দূরে থাকিস কেন?
— সব প্রশ্নের উত্তর কি দেওয়া যায়, ইরাবতী?
ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
— ঠিক আছে। নিজের খেয়াল রাখিস।
— তুইও রাখিস। আল্লাহ হাফেজ।
ফোন রেখে অ্যাভেলিন খাবার শেষ করল।
অন্যদিকে আদ্রিয়ান নিজের ঘরে বসে অ্যাসাইনমেন্ট লিখছিল। হঠাৎ রুদোর ফোন এল।
— কিরে, কাল ঘুরতে যাবি?
— কোথায়?
— পতেঙ্গা। সবাই যাব।
— ঠিক আছে, বাকিদের জানিয়ে দিস।
ফোন রেখে সে আবার লেখায় মন দিল।
পরদিন সকালটা অন্য দিনের তুলনায় একটু ব্যস্ত ছিল। কলেজে পৌঁছে অ্যাভেলিন দেখল অনিকা আর মায়া আগে থেকেই অপেক্ষা করছে।
অনিকা বলল,
— আজ কিন্তু ক্লাস শেষে কোথাও যাবি না। আমাদের সঙ্গে ঘুরতে যাবি।
অ্যাভেলিন হেসে বলল,
— তোদের হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই দেখছি!
মায়া তার হাত ধরে বলল,
— বন্ধুত্ব করেছিস, এখন আর মুক্তি নেই!
তিনজনের হাসিতে কলেজের সকালটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
কেউ জানত না, এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো একদিন কতটা মূল্যবান হয়ে উঠবে।
কিছু স্মৃতি তৈরি হওয়ার সময় মানুষ বুঝতে পারে না, একদিন সেই স্মৃতিগুলোই তার চোখের জল হয়ে ফিরে আসবে।
কলেজের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আদ্রিয়ানের সঙ্গে দেখা হলো।
— কী ব্যাপার, আজ এত খুশি কেন?
অ্যাভেলিন বলল,
— তোমাকে দেখার পর থেকেই মন খারাপ!
আদ্রিয়ান হেসে বলল,
— বাহ! আমাকে দেখেই এত প্রভাব?
— হ্যাঁ, তোমাকে এড়িয়ে চলার চিন্তা করছি।
পাশ থেকে রুদো হেসে উঠল। সবাই মিলে ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেল।
ক্লাস শেষে অ্যাভেলিন আকাশের দিকে তাকাল। মেঘের ফাঁকে রোদ উঁকি দিচ্ছিল। সে মৃদু হেসে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।
দিনটা সাধারণই ছিল, অথচ এই সাধারণ দিনের ভেতরেই জমা হচ্ছিল অজস্র স্মৃতি।
কেউ জানত না, সময় একদিন এই মানুষগুলোর জীবনকে কতটা বদলে দেবে।
কলেজের ব্যস্ততার মাঝেও বন্ধুত্বের এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তাদের দিনকে আনন্দে ভরিয়ে রাখত। হাসি, খুনসুটি আর দুষ্টুমিতে সময় কেটে যেত। আগামী দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে, তা কেউ ভাবেনি। আপাতত সবার কাছে জীবনটা ছিল সুন্দর।
হাসতে হাসতেই অ্যাভেলিন ব্যাগ নিয়ে দরজার বাইরে পা বাড়াল।
অবশেষে
চলবে..