নিভৃত যতনে
লেখিকা: স্নিগ্ধা মনি
পর্ব: ১
[প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত। কপি করা নিষিদ্ধ] 🚫
রাত ২টা ১৩ মিনিট।
উত্তরার একটি শান্ত বাড়ির ছাদ। চারপাশে রাতের নিস্তব্ধতা, মাঝে মাঝে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ। নিচে পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে। শুধু দূরে কোথাও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা যাচ্ছে।
ছাদের এক কোণে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে ডা. আরিয়ান মির্জা। পরনে সাদা অ্যাপ্রোন, গলায় স্টেথোস্কোপ। হাসপাতালের ডিউটি শেষ করে ফিরেছে সে। টানা ১২ ঘণ্টার ইমার্জেন্সি ডিউটি করে শরীরটা বেশ ক্লান্ত, অথচ চোখে একটুও ঘুম নেই। হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি।
এই ছাদটাই আরিয়ানের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। যেখানে দাঁড়ালে নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো যায়, যেখানে কেউ তাকে বিরক্ত করে না।
হঠাৎ নিচ থেকে মিষ্টি একটা ডাক ভেসে এলো।
"ভাইয়া! আবার ছাদে? ঠান্ডা লাগবে তো। নিচে আসো।"
আরিয়ান হালকা হাসল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল,
"আসছি আরোহী। দুই মিনিট।"
আরোহী আর কিছু না বলে নিচে চলে গেল। আরিয়ান শেষবারের মতো রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কফির কাপে চুমুক দিল।
আরিয়ান মির্জা। বয়স ২৮ বছর। পেশায় একজন ডাক্তার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে কর্মরত। স্বভাবে শান্ত, গম্ভীর ও দায়িত্ববান। খুব একটা বেশি কথা বলে না।
আরিয়ানের বাবা শফিকুল মির্জা। বয়স ৫৮ বছর। দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। গার্মেন্টস ও রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা রয়েছে তাঁর।
মা রেহানা বেগম। বয়স ৫০ বছর। একজন গৃহিণী। নরম মনের মানুষ।
ছোট বোন আরোহী মির্জা। বয়স ২২ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছে। আরিয়ানের ভীষণ আদরের ছোট বোন। চঞ্চল আর মিশুক স্বভাবের মেয়ে।
চাচা কামাল মির্জা। বয়স ৫২ বছর। শফিকুল মির্জার ব্যবসায়িক পার্টনার।
চাচি নাজমা বেগম। বয়স ৪৮ বছর।
চাচাতো ভাই রিয়াদ মির্জা। বয়স ২৬ বছর। বিবিএ শেষ করে বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করে। আরিয়ানকে ভীষণ ভালোবাসে।
চাচাতো বোন নিশাত মির্জা। বয়স ২১ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ে। আরিয়ান ভাইয়াকে খুব পছন্দ করে।
ছোটবেলা থেকেই আরিয়ানের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। বাবা বড় ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও ছেলের ইচ্ছাকে কখনো বাধা দেননি। বরং ছেলের স্বপ্ন পূরণে সবসময় পাশে থেকেছেন। তাই আজ আরিয়ান নিজের স্বপ্ন পূরণ করে একজন ডাক্তার।
কফির কাপ শেষ করে আরিয়ান ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের এক ছোট্ট বাড়িতে তখন আরেকটি মেয়ে নিজের জীবনসংগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত।
তিতলি আহমেদ। বয়স ২০ বছর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তিন বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মাকে হারিয়েছে সে। বর্তমানে খালার বাসায় থাকে। সঙ্গে তার ছোট বোন তিন্নি, বয়স ১৫ বছর।
বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকেই ছোট বোনকে আগলে রেখেছে তিতলি। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি দুটি টিউশনি করায়। মেয়েটি খুব মিশুক ও সাহসী, তবে ভেতরে ভীষণ নরম মনের। হাসলে গালে টোল পড়ে।
রাত ৮টা ৩০ মিনিট। চট্টগ্রামের চকবাজার।
টিউশনি পড়িয়ে বাড়ি ফিরছে তিতলি। আজ স্টুডেন্টের পরীক্ষা ছিল বলে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। হাতে বই-খাতার ব্যাগ।
গলির মোড়ে আসতেই তিনটি ছেলে তার পথ আটকে দাঁড়াল।
একটি ছেলে হাত বাড়িয়ে বলল,
"এই সুন্দরী, একা একা কই যাও?"
তিতলি কিছুটা পিছিয়ে গেল। কাঁপা গলায় বলল,
"কি করছেন? হাত ছাড়ুন।"
ছেলেটি আরও কাছে এগিয়ে এলো।
তিতলি ভয় পেয়ে জোরে চিৎকার করে উঠল,
"হেল্প! কেউ আছেন? হেল্প!"
ঠিক তখনই একটি কালো গাড়ি এসে ব্রেক কষল।
গাড়ি থেকে নেমে এলো ডা. আরিয়ান মির্জা। চোখেমুখে স্পষ্ট রাগ। সরকারি হাসপাতাল থেকে ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরছিল সে। কিন্তু মেয়েটির চিৎকার শুনে গাড়ি থামাতে বাধ্য হলো।
আরিয়ান সামনে এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
"কি হচ্ছেটা কি এখানে?"
ছেলেগুলো আরিয়ানকে দেখে হাসতে লাগল। তাদের মধ্যে একজন বলল,
"এই হিরো, তুই কেরে? তোর এখানে কোনো কাজ নেই। তুই এখান থেকে যা।"
আরিয়ান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
"আমি কে, সেটা শুনে তোদের কোনো লাভ নেই।"
কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরিয়ান একটি ছেলেকে ঘুষি মারল। ছেলেটি মাটিতে পড়ে গেল। বাকি দুজন তেড়ে এলে আরিয়ান লাথি আর ঘুষি দিয়ে তাদেরও কাবু করে ফেলল। এক মিনিটের মধ্যেই তিনজনের অবস্থা খারাপ।
ছেলেগুলো ভয়ে বলল,
"ভাই, মাফ করে দেন। আর কখনো এমন করব না।"
এই বলে তারা দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে গেল।
আরিয়ান এবার তিতলির দিকে ঘুরে তাকাল। মেয়েটি তখনো ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।
আরিয়ান গলার স্বর নরম করে জিজ্ঞেস করল,
"তুমি ঠিক আছো তো?"
তিতলি মাথা নিচু করে বলল,
"জি... আমি ঠিক আছি।"
আরিয়ান আবার জিজ্ঞেস করল,
"এত রাতে একা? বাসা কোথায়?"
তিতলি আস্তে করে উত্তর দিল,
"এই তো, এখান থেকে প্রায় এক ঘণ্টার পথ।"
আরিয়ান গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলল,
"উঠো। আমি দিয়ে আসছি।"
তিতলি কিছুটা দ্বিধা করলেও শেষ পর্যন্ত গাড়িতে উঠে বসল।
রাস্তায় যেতে যেতে আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
"নাম কী তোমার?"
"তিতলি।"
"আর কে কে আছে তোমার বাসায়?"
তিতলি বলল,
"জি, আমি আর আমার ছোট বোন তিন্নি। আমরা খালার বাসায় থাকি। আমাদের মা-বাবা তিন বছর আগে গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা গেছে।"
কথাগুলো বলতে গিয়ে তিতলির কণ্ঠটা কিছুটা ভারী হয়ে এলো।
আরিয়ানের শুনে একটু খারাপই লাগল। সে আর কোনো প্রশ্ন করল না।
কিছুক্ষণ পর খালার বাসার সামনে গাড়ি থামল।
তিতলি গাড়ি থেকে নেমে বলল,
"ধন্যবাদ।"
আরিয়ান মাথা নেড়ে বলল,
"সাবধানে থেকো।"
তিতলি মাথা নেড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। আরিয়ানও গাড়ি নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
কয়েক দিন পর...
বিকেল ৪টা। চট্টগ্রাম পাবলিক লাইব্রেরি।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। লাইব্রেরির ভেতরে বেশ শান্ত পরিবেশ। টিউশনির ফাঁকে কিছু বই খুঁজতে এসেছে তিতলি।
উঁচু তাক থেকে বই নিতে গিয়ে অসাবধানতাবশত কয়েকটা বই নিচে পড়ে গেল।
তিতলি বইগুলো তুলতে নিচু হতে যাবে, ঠিক তখনই পাশ থেকে একটা হাত এগিয়ে এলো। লোকটি বইগুলো তুলে দিল।
তিতলি মাথা তুলে তাকাতেই ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল।
আরিয়ান!
মনে মনে ভাবল, এই লোকটা! সেদিন রাতে এই লোকটাই তো আমাকে বাঁচিয়েছিল। সেদিন যদি এই লোকটা আমাকে না বাঁচাত, তাহলে আমার কী সর্বনাশ হয়ে যেত, তা তো আল্লাহই জানেন।
তিতলি আস্তে করে বলল,
"ধন্যবাদ।"
আরিয়ান নিজের হাতে থাকা ছাতাটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
"বৃষ্টি হচ্ছে। ছাতাটা নিয়ে যাও।"
তিতলি বলল,
"না, ধন্যবাদ। লাগবে না। আমার ছাতা আছে।"
আরিয়ান আর কিছু বলল না। শুধু একবার তাকিয়ে নিজের বই নিয়ে চলে গেল।
তিতলি নিজের ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে মেলে ধরল। অথচ বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করছিল। কেন এমন হচ্ছে, নিজেও বুঝতে পারল না।
বিকেল ৫টা। জিইসি মোড়ের Brew & Bean কফিশপ।
রিয়াদ ক্লায়েন্টের সঙ্গে মিটিং শেষ করে কফি খেতে এসেছে। এক কাপ কফি নিয়ে বসেছিল সে।
ঠিক তখনই হাসতে হাসতে কফিশপে ঢুকল আরোহী। সঙ্গে তার তিনজন বান্ধবী।
আরোহী রিয়াদকে দেখে থেমে গেল।
রিয়াদ অবাক হয়ে বলল,
"তুই এইখানে কি করিস?"
আরোহী হাসল।
"এই তো, বান্ধবীদের সাথে একটু কফি খেতে।"
রিয়াদ মাথা নাড়ল। আর কিছু বলল না।
আরোহী বান্ধবীদের নিয়ে পাশের টেবিলে বসে পড়ল।
কফিশপের বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। ভেতরে দুই টেবিলে বসে আছে দুজন। মাঝে মাঝে চোখাচোখি হচ্ছে, তারপর আবার দুজনেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছে।
কেউ কারও সঙ্গে খুব বেশি কথা বলছে না। অথচ এই ছোট্ট দেখা হওয়াটুকুই হয়তো পরবর্তীতে নতুন কোনো গল্পের সূচনা হয়ে থাকবে।
চলবে...