👽 এলিয়েন গার্লফ্রেন্ড
পর্ব ১
সিরাজগঞ্জ শহরের রাতগুলো সাধারণত খুব বেশি রহস্যময় হয় না। রাত বাড়লে রাস্তার ভিড় কমে আসে, দোকানপাট বন্ধ হতে থাকে, দূরের কোনো চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসে মানুষের কথাবার্তা, আর মাঝেমধ্যে রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে চলে যায় দু-একটি মোটরসাইকেল। কিন্তু সেদিনের রাতটা অন্য রকম ছিল। আকাশে চাঁদ ছিল না, অথচ চারপাশ অন্ধকারও ছিল না। মেঘের আড়াল থেকে নীলচে আলো ছড়িয়ে পড়ছিল শহরের ওপর। বাতাসে একটা অদ্ভুত শীতলতা ছিল, যেন কোথাও কোনো অজানা শক্তি জেগে উঠেছে। রাত তখন ১১টা ৪৭ মিনিট। আরিয়ান নিজের ঘরে বসে মোবাইলে ভিডিও দেখছিল। ছেলেটা খুব সাধারণ। কলেজে পড়ে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়, মাঝেমধ্যে গল্পের বই পড়ে, আর অবসর সময়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে। তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল—প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে সে কয়েক মিনিট আকাশের তারা দেখত। তার বিশ্বাস ছিল, এই বিশাল মহাবিশ্বে পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ নয় যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে। তবে এই বিশ্বাস নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বললে তারা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। “তুই একদিন না একদিন এলিয়েনের প্রেমে পড়বি!” তার বন্ধু রাফি একদিন মজা করে বলেছিল। আরিয়ান হেসে উত্তর দিয়েছিল, “এলিয়েন যদি সত্যিই থাকে, তাহলে তার সঙ্গে একবার দেখা করতে আপত্তি কী?” সেদিন রাফি এত জোরে হেসেছিল যে পাশের টেবিলে বসা বন্ধুরাও তাদের দিকে তাকিয়েছিল। আরিয়ানও হেসেছিল। কিন্তু সে জানত না, তার বলা কথাটাই কয়েক দিনের মধ্যে তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত সত্য হয়ে উঠবে। মোবাইলের স্ক্রিনে তখন একটা মহাকাশবিষয়ক ভিডিও চলছিল। ভিডিওতে দেখানো হচ্ছিল, পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা কতটা। আরিয়ান মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। ঠিক তখনই তার ঘরের আলো একবার জ্বলে উঠল, তারপর নিভে গেল। সে মোবাইল থেকে চোখ তুলে তাকাল। “আবার বিদ্যুতের সমস্যা!” সে কথাটা বলে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাতে গেল। কিন্তু তার আগেই জানালার বাইরে আকাশ থেকে একটা তীব্র নীল আলো এসে ঘরের দেয়ালে পড়ল। আলোটা এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে আরিয়ান চোখ ঢেকে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড পর আলোটা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে তাকাল। আকাশের মাঝখানে একটা অদ্ভুত বস্তু স্থির হয়ে আছে। প্রথমে আরিয়ান ভেবেছিল, হয়তো কোনো বিমান। কিন্তু বস্তুটা দেখতে বিমানের মতো ছিল না। সেটা ছিল গোলাকার, তার চারপাশে নীল আলোর কয়েকটি বৃত্ত ঘুরছিল। কোনো শব্দ ছাড়াই বস্তুটা আকাশে ভেসে ছিল। আরিয়ান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। “এটা কী?” সে মোবাইল তুলে ভিডিও করতে গেল। কিন্তু ক্যামেরা চালু করতেই স্ক্রিনে অদ্ভুত কিছু চিহ্ন ফুটে উঠল। মোবাইলের পর্দা কয়েকবার কেঁপে উঠল, তারপর সম্পূর্ণ কালো হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশের বস্তুটি দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করল। আরিয়ানের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে ভেবেছিল, বস্তুটা হয়তো কোনো ভবনে আছড়ে পড়বে। কিন্তু সেটি শহরের বাইরে নদীর কাছাকাছি একটা নির্জন মাঠের দিকে এগিয়ে গেল। মাটিতে পৌঁছানোর আগেই বস্তুটি থেমে গেল, তারপর চারপাশে নীল আলোর একটা বিশাল বলয় ছড়িয়ে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। সবকিছু আবার স্বাভাবিক। বিদ্যুৎ ফিরে এল। ঘরের বাতি জ্বলে উঠল। দূরে কুকুরের ডাক শোনা গেল। রাস্তায় একটা মোটরসাইকেল চলে গেল আগের মতোই। অথচ আরিয়ান জানত, সে যা দেখেছে, সেটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। সে দ্রুত একটা কালো জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে মোবাইলটা হাতে নিল। মোবাইল চালু করার চেষ্টা করল, কিন্তু সেটি কাজ করল না। তবুও সে থামল না। তার মনে হচ্ছিল, ওই বস্তুটার সঙ্গে এমন কিছু ঘটেছে, যা তাকে নিজের চোখে দেখা দরকার। কয়েক মিনিটের মধ্যে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। রাতের বাতাস তার মুখে এসে লাগছিল। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। দূরের বাতিগুলো কেমন যেন নীলচে দেখাচ্ছিল। সে দ্রুত হাঁটছিল, কিন্তু তার মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরছিল—আকাশে সে যা দেখেছে, সেটা কি সত্যিই কোনো মহাকাশযান? মাঠের কাছে পৌঁছাতেই সে থেমে গেল। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ নেই, কুকুরের ডাক নেই, বাতাসে গাছের পাতাও নড়ছে না। যেন পুরো জায়গাটার ওপর কোনো অদৃশ্য আবরণ পড়েছে। মাঠের মাঝখানে একটা বৃত্তাকার অংশ নীল আলোয় জ্বলছিল। ঘাসের ডগাগুলোতে ছোট ছোট আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছিল। আরিয়ান সাবধানে সামনে এগোল। “কেউ আছেন?” তার নিজের কণ্ঠস্বর শুনে সে নিজেই চমকে উঠল। শব্দটা যেন অনেক দূর থেকে ফিরে এল। হঠাৎ নীল আলোর বৃত্তের মাঝখানে একটা ছায়া দেখা গেল। ছায়াটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল। একজন মেয়ে। মেয়েটি দাঁড়িয়ে ছিল মাঠের মাঝখানে। তার পরনে ছিল কালো ও রুপালি রঙের অদ্ভুত পোশাক, যেন কোনো ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানুষের তৈরি পোশাক। তার লম্বা কালো চুল বাতাস ছাড়াই সামান্য ভেসে ছিল। চোখ দুটো সাধারণ মানুষের মতো হলেও তার মণির চারপাশে নীল আলো জ্বলছিল। কপালের এক পাশে ছোট্ট একটা উজ্জ্বল চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। আরিয়ান কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারল না। মেয়েটি তার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে বাংলায় বলল, “তুমি এখানে কেন এসেছ?” আরিয়ান বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। “তুমি... বাংলা বলতে পারো?” মেয়েটি কয়েক সেকেন্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। “তোমার ভাষা বুঝতে আমার সমস্যা হচ্ছে না। তোমার মস্তিষ্ক থেকে ভাষার সংকেত বিশ্লেষণ করছি।” আরিয়ান এবার এক পা পিছিয়ে গেল। “মানে?” “মানে, তোমরা যে ভাষায় কথা বলো, সেটা বুঝতে আমার আলাদা করে শেখার প্রয়োজন নেই।” আরিয়ান নিজের হাতের তালুতে নখ বসিয়ে দেখল। সে স্বপ্ন দেখছে কি না, বুঝতে চাইছিল। কিন্তু ব্যথাটা একেবারে বাস্তব। “তুমি কি... এলিয়েন?” মেয়েটি মাথা সামান্য কাত করল। “তোমাদের পৃথিবীর ভাষায় আমাকে সেই নামেই ডাকা হয়।” আরিয়ানের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। এত দিন ধরে সে মহাকাশের প্রাণী নিয়ে পড়েছে, ভিডিও দেখেছে, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করেছে। কিন্তু কখনো ভাবেনি, একদিন সত্যিই কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর সামনে দাঁড়াবে। তার ওপর সেই প্রাণীটি একজন মেয়ে! মেয়েটি চারপাশে তাকিয়ে অস্থির কণ্ঠে বলল, “আমাকে সাহায্য করতে পারবে?” আরিয়ান অবাক হয়ে বলল, “তোমার কী হয়েছে?” “আমার যানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শক্তির উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। এই গ্রহের বায়ুমণ্ডল আমার জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। আমাকে দ্রুত এমন একটা জায়গায় যেতে হবে, যেখানে আমি শক্তি পুনরুদ্ধার করতে পারব।” আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে দেখল, মেয়েটির ডান হাত কাঁপছে। হাতের ওপর নীল আলোর মতো কিছু একটা ছড়িয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ড পর মেয়েটি হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। “এই! তুমি ঠিক আছ?” আরিয়ান দ্রুত এগিয়ে গেল। মেয়েটিকে ধরে ফেলতেই তার শরীর থেকে অদ্ভুত ঠান্ডা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। যেন শীতের রাতে বরফ ছুঁয়ে আছে সে। কিন্তু মেয়েটির মুখে কোনো যন্ত্রণার প্রকাশ ছিল না। সে শুধু চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছিল। “আমার শক্তি কমে যাচ্ছে,” মেয়েটি বলল। “তুমি যদি আমাকে এখানে ফেলে যাও, তাহলে আমি এই গ্রহে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারব না।” আরিয়ান এক মুহূর্তও দেরি করল না। “চলো। আগে তোমাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাই।” মেয়েটি তার দিকে তাকাল। চোখের নীল আলোটা যেন সামান্য উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছ না?” আরিয়ান একটু হাসল। “ভয় তো পাচ্ছি। কিন্তু তোমাকে এখানে ফেলে যেতে পারব না।” মেয়েটি কিছু বলল না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন পৃথিবীর মানুষের এমন আচরণ তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন। আরিয়ান তাকে নিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু একটা সমস্যা ছিল। শহরের রাস্তা দিয়ে একজন অচেনা মেয়েকে নিয়ে গেলে লোকজন প্রশ্ন করবে। তার পোশাক, চোখের আলো, শরীরের অস্বাভাবিক ঠান্ডা—কোনোটাই মানুষের চোখ এড়াবে না। “তোমার নাম কী?” হাঁটতে হাঁটতে আরিয়ান জিজ্ঞেস করল। “জারা।” “শুধু জারা?” “আমাদের গ্রহে নামের সঙ্গে পরিবারের পরিচয় যোগ করা হয় না। আমার পরিচয়সংকেত ZR-17। তবে তুমি আমাকে জারা বলতে পারো।” আরিয়ান মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে, জারা। আমি আরিয়ান।” জারা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, “আরিয়ান, তোমাদের পৃথিবীতে বন্ধুত্বের জন্য কি কোনো বিশেষ সংকেত আছে?” প্রশ্নটা শুনে আরিয়ান হেসে ফেলল। “না, তেমন কিছু নেই। মানুষ কথা বলে, একে অন্যকে বিশ্বাস করে, তারপর বন্ধু হয়।” “বিশ্বাস কীভাবে পরিমাপ করো?” আরিয়ান এবার একটু থেমে গেল। এমন প্রশ্ন সে আগে কখনো শোনেনি। “সবকিছু পরিমাপ করা যায় না। কিছু জিনিস অনুভব করতে হয়।” জারা তার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, কথাটা সে নিজের মনে কোথাও লিখে রাখল। আরিয়ান তাকে শহরের ভিড় এড়িয়ে নিজের পরিচিত একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে পুরোনো গাছের ছায়া আর চারপাশের উঁচু দেয়ালের কারণে বাইরে থেকে সহজে কাউকে দেখা যায় না। সেখানে পৌঁছে সে জারাকে বসতে বলল। “তোমার কি পানি লাগবে?” জারা মাথা নাড়ল। “পানি আমার শরীরের শক্তি ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তবে এই গ্রহের কিছু খনিজ পদার্থ আমার কাজে লাগতে পারে।” “তাহলে তোমার কী লাগবে?” “একটি স্থিতিশীল শক্তিক্ষেত্র। আমার যানটির শক্তি পুনরুদ্ধার করতে হবে।” “তোমার মহাকাশযান কোথায়?” জারা আকাশের দিকে তাকাল। “এখন দৃশ্যমান নয়। আমি এটিকে আংশিক অদৃশ্য অবস্থায় রেখেছি। কিন্তু মূল শক্তিকেন্দ্র নষ্ট হওয়ায় বেশিক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না।” আরিয়ান গভীর শ্বাস নিল। সে জানত না কীভাবে একজন এলিয়েনকে সাহায্য করতে হয়। ইন্টারনেটে খোঁজার সুযোগও নেই, কারণ তার মোবাইল তখনো বন্ধ। আর জারাকে নিয়ে কোনো বিজ্ঞানীর কাছে যাওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে। “তোমার কি পৃথিবীতে কেউ আছে?” সে জিজ্ঞেস করল। “না।” “মানে, তুমি একা?” জারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “আমি একা নই। আমার জাতির কোটি কোটি সদস্য আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের কেউ আমার কাছে নেই।” উত্তরটা শুনে আরিয়ানের মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। মহাবিশ্বের দূরবর্তী কোনো গ্রহ থেকে আসা এই মেয়েটির হয়তো নিজের জগৎ আছে, পরিবার আছে, পরিচিত মানুষ আছে। অথচ এই মুহূর্তে সে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি গ্রহে অসহায় অবস্থায় বসে আছে। আরিয়ান নিজের জ্যাকেটটা খুলে জারার কাঁধে রাখল। জারা অবাক হয়ে তাকাল। “এটা কেন দিলে?” “তোমাকে ঠান্ডা লাগছে মনে হচ্ছে।” “আমার শরীরের তাপমাত্রা তোমাদের মানুষের তুলনায় কম। এই পোশাক আমার তাপমাত্রা পরিবর্তন করবে না।” “তবু রাখো। আমার কাছে অতিরিক্ত পোশাক আছে।” জারা জ্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব সাবধানে সেটি নিজের কাঁধে ঠিক করে নিল। “তোমাদের পৃথিবীতে মানুষ অন্যের জন্য এমন করে কেন?” আরিয়ান একটু হাসল। “কারণ সবাই শুধু নিজের কথা ভাবলে পৃথিবীটা খুব খারাপ জায়গা হয়ে যেত।” জারা উত্তর দিল না। তার চোখের নীল আলো ধীরে ধীরে স্থির হয়ে এল। ঠিক তখনই দূরে একটা তীব্র শব্দ হলো। দুজনেই চমকে উঠল। আকাশের দিকে তাকিয়ে আরিয়ান দেখল, নীল আলোর একটা রেখা দ্রুত ছুটে যাচ্ছে। সেটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে গেল। জারা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। “না! এটা সম্ভব নয়!” “কী হয়েছে?” “আমার যানটির সংকেত কেউ শনাক্ত করেছে।” “কে?” জারা তার দিকে তাকাল। এবার তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। “আমার গ্রহের কেউ নয়।” আরিয়ানের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। “তাহলে?” জারা নিচু স্বরে বলল, “এই মহাবিশ্বে এমন কিছু সত্তা আছে, যারা অন্য গ্রহের প্রযুক্তি দখল করার জন্য যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে পারে। তারা যদি আমার অবস্থান জানতে পারে, তাহলে শুধু আমি নয়, তোমাদের পৃথিবীও বিপদে পড়তে পারে।” আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তুমি কি বলতে চাইছ, কেউ তোমাকে অনুসরণ করছে?” “হ্যাঁ।” “তোমার শত্রু?” জারা মাথা নাড়ল। “তারা আমার শত্রু নয়। তারা আমার জাতিরও শত্রু। তাদের কাছে কোনো গ্রহের প্রাণের মূল্য নেই। তারা শুধু শক্তি আর প্রযুক্তি চায়।” আরিয়ান আকাশের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ আগেও তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার মধ্যে আছে। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছিল, বিষয়টা শুধু একজন এলিয়েনের সঙ্গে দেখা হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অজানা কোনো বিপদ পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসছে। “তুমি পুলিশের কাছে যাবে?” সে প্রশ্ন করল। জারা এমনভাবে তার দিকে তাকাল, যেন সে খুব অদ্ভুত কোনো কথা বলেছে। “পুলিশ কী?” আরিয়ান নিজের কপালে হাত দিল। “তোমাদের গ্রহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা নেই?” “আছে। কিন্তু তোমাদের পৃথিবীর মতো নয়।” “আচ্ছা, সেটা পরে বুঝব। এখন আমাদের কী করতে হবে?” জারা চোখ বন্ধ করল। তার কপালের চিহ্নটি হালকা নীল আলো ছড়াতে শুরু করল। কয়েক সেকেন্ড পর সে চোখ খুলে বলল, “আমার একটি যোগাযোগযন্ত্র দরকার।” “কী ধরনের?” “যে কোনো যন্ত্র, যেটি দিয়ে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানো যায়।” আরিয়ান নিজের মোবাইলের কথা মনে করল। “আমার ফোনটা বন্ধ হয়ে গেছে।” “দাও।” সে মোবাইলটা জারার হাতে দিল। জারা ফোনটির পেছনে আঙুল রাখতেই নীল আলোর সূক্ষ্ম রেখা তার আঙুল থেকে মোবাইলের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত পর ফোনটি নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল। আরিয়ান হতবাক। “তুমি এটা কীভাবে করলে?” “তোমাদের যন্ত্রে শক্তি সরবরাহের পদ্ধতি খুব সাধারণ। আমি সাময়িকভাবে এর শক্তিকোষ সক্রিয় করেছি।” মোবাইলের স্ক্রিনে এবার অদ্ভুত চিহ্ন দেখা গেল। জারা দ্রুত কিছু নির্দেশ দিল। তারপর স্ক্রিনে একটা মানচিত্রের মতো ছবি ফুটে উঠল। মানচিত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের ওপর ছোট ছোট আলোর বিন্দু জ্বলছিল। “এগুলো কী?” আরিয়ান জিজ্ঞেস করল। “মহাকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে আসা অজানা সংকেতের অবস্থান।” “কিন্তু পৃথিবীতে তো কোটি কোটি যন্ত্র আছে।” “এগুলো সাধারণ সংকেত নয়। এগুলোর শক্তির ধরন আমার যানটির সংকেতের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।” আরিয়ান স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে তাকাল। বাংলাদেশের ওপর একটি ক্ষুদ্র লাল বিন্দু জ্বলছিল। তার পাশে আরও তিনটি বিন্দু ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসছিল। “ওগুলো কি তোমাকে খুঁজছে?” “সম্ভবত।” “তাহলে তোমাকে লুকিয়ে থাকতে হবে।” জারা মাথা নাড়ল। “লুকিয়ে থাকা যথেষ্ট নয়। আমাকে আমার যানটি পুনরায় সক্রিয় করতে হবে। নইলে তারা আমাকে সহজেই শনাক্ত করবে।” আরিয়ান ভাবতে লাগল। শহরের বাইরে যে মাঠে সে জারাকে পেয়েছে, সেখানে হয়তো যানটির কোনো অংশ রয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে আবার যাওয়া নিরাপদ কি না, সে জানে না। “তোমার যানটির কোনো অংশ কি আলাদা হয়ে পড়ে থাকতে পারে?” জারা একটু চিন্তা করে বলল, “হ্যাঁ। মূল শক্তিকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সময় একটি শক্তি-সংযোগকোষ আলাদা হয়ে গিয়েছিল। সেটি ছাড়া আমি যানটি চালু করতে পারব না।” “তাহলে সেটা খুঁজে বের করতে হবে।” “এখনই?” “হ্যাঁ। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে কেউ ওই জায়গায় চলে যেতে পারে।” জারা তার দিকে তাকিয়ে রইল। “তুমি কি বুঝতে পারছ, এই কাজে তোমার বিপদ হতে পারে?” আরিয়ান হালকা হাসল। “আমি তোকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছি, এখন মাঝপথে চলে যাব?” জারা সঙ্গে সঙ্গে তার কথার অর্থ বুঝতে পারেনি। কিছুক্ষণ পর বলল, “তুমি আমাকে ‘তুই’ বলছ কেন?” আরিয়ান একটু লজ্জা পেল। “আমাদের ভাষায় এটা অনেক সময় আপনজনের সঙ্গে কথা বলার ধরন।” “আপনজন?” “যাকে নিজের কাছের মানুষ মনে হয়।” জারা শব্দটা ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল, “আপনজন।” তারপর সে বলল, “আমি এই শব্দটির অর্থ মনে রাখব।” দুজন আবার মাঠের দিকে রওনা হলো। এবার আরিয়ান জানত, সে শুধু একটা অদ্ভুত ঘটনা দেখতে যাচ্ছে না। সে এমন একটা অভিযানে যাচ্ছে, যার শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না। মাঠের কাছে পৌঁছানোর আগেই তারা অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পেল। রাস্তার ওপর একটা ছোট পাখি স্থির হয়ে বসে আছে। তাদের কাছে আসতে দেখেও সেটি উড়ে গেল না। আরিয়ান আরও কাছে গিয়ে দেখল, পাখিটির চারপাশে বাতাস যেন কাঁচের মতো কাঁপছে। জারা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে টেনে সরিয়ে নিল। “ওটার কাছে যেও না!” “কেন?” “এটা স্বাভাবিক পাখি নয়।” পাখিটি ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাদের দিকে তাকাল। তার চোখে ক্ষুদ্র লাল আলো জ্বলে উঠল। তারপর তার শরীরের ওপরের পালকগুলো মিলিয়ে গিয়ে ধাতব আবরণ দেখা দিল। আরিয়ান হতবাক হয়ে গেল। “এটা একটা রোবট?” “হ্যাঁ। কিন্তু আমার তৈরি নয়।” পাখির মতো যন্ত্রটি তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার বুকের মাঝখান থেকে একটা সরু লাল রশ্মি বেরিয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ল। জারা সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে নীল আলোর একটি আবরণ তৈরি করল। লাল রশ্মিটি সেই আবরণে আঘাত করে চারদিকে ছিটকে গেল। “দৌড়াও!” জারা চিৎকার করল। আরিয়ান আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে দ্রুত মাঠের দিকে ছুটল। পেছনে যন্ত্রটির তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা যাচ্ছিল। জারা তার পাশে দৌড়াচ্ছিল, কিন্তু তার গতি মানুষের মতো ছিল না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সে আরিয়ানকে পেছনে ফেলে সামনে চলে গেল। মাঠে পৌঁছে জারা মাটির ওপর হাত রাখল। ঘাসের নিচে নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল। তারপর মাটির একটি অংশ স্বচ্ছ হয়ে উঠল। তার নিচে ধাতব একটি ছোট বস্তু দেখা গেল। “ওটাই!” জারা বলল। আরিয়ান হাঁটু গেড়ে বসে বস্তুটি তুলতে গেল। কিন্তু তার আঙুল স্পর্শ করার আগেই বস্তুটি হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার শরীরের ভেতর দিয়ে যেন ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল। সে হাত সরিয়ে নিল। “এটা আমাকে শক দিল!” জারা দ্রুত তার হাত পরীক্ষা করল। “তুমি ঠিক আছ?” “হ্যাঁ, কিন্তু এটা কীভাবে তুলব?” “এটি তোমার শরীরের বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করছে।” “তাহলে তুমি তুলতে পারবে না?” “পারব। কিন্তু এটি যদি আমার সংকেত শনাক্ত করে, তাহলে শত্রুরাও আমাদের অবস্থান জানতে পারবে।” আরিয়ান কিছুক্ষণ বস্তুটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের জ্যাকেটের ভেতর থেকে একটা কাপড় বের করে সেটি দিয়ে বস্তুটিকে সাবধানে জড়িয়ে তুলল। জারা অবাক হয়ে বলল, “তুমি এটা কীভাবে বুঝলে?” “আমি শুধু সরাসরি হাতে ধরিনি।” জারা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, “তোমাদের পৃথিবীর মানুষ অনেক সময় খুব সাধারণ পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান করে।” আরিয়ান হেসে বলল, “আমাদের সবকিছুই যে জটিল হবে, এমন তো নয়।” তারা শক্তি-সংযোগকোষটি নিয়ে মাঠের অন্য প্রান্তে এগিয়ে গেল। সেখানে পৌঁছাতেই আকাশে আবার নীল আলো দেখা গেল। এবার আলোটা অনেক বড়। মেঘের আড়াল থেকে একটা অদ্ভুত ছায়া বেরিয়ে এল। সেটি জারার মহাকাশযানের মতো গোলাকার ছিল না। বরং লম্বাটে, কালো এবং চারপাশে লাল আলোর রেখা দিয়ে ঘেরা। জারা থেমে গেল। “তারা এসে গেছে।” আরিয়ান আকাশের দিকে তাকাল। “এখন কী হবে?” “আমাকে শক্তি-সংযোগকোষটি আমার যানটির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কিন্তু তার আগে আমাদের এমন একটি জায়গায় যেতে হবে, যেখানে তাদের সংকেত পৌঁছাতে পারবে না।” “এমন জায়গা কোথায়?” জারা উত্তর দেওয়ার আগেই আকাশের কালো বস্তুটি থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল। কণ্ঠটি বাংলায় নয়, কিন্তু আরিয়ানের মোবাইল নিজে থেকেই সেটিকে বাংলায় রূপান্তর করতে শুরু করল। “ZR-17, তোমার অবস্থান আমরা শনাক্ত করেছি। প্রতিরোধের চেষ্টা কোরো না। তোমার প্রযুক্তি আমাদের কাছে হস্তান্তর করো।” জারার মুখ কঠিন হয়ে গেল। “আমি তোমাদের হাতে কিছুই তুলে দেব না।” আকাশের বস্তুটি থেকে আবার কণ্ঠ এল, “তুমি একা। তোমার সাহায্য করার মতো কেউ নেই।” জারা আরিয়ানের দিকে একবার তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “আমি একা নই।” কথাটা শুনে আরিয়ানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। সে জানত না, এই মুহূর্তে সে কতটা কাজে আসতে পারবে। তার কাছে কোনো অস্ত্র নেই, কোনো বিশেষ ক্ষমতা নেই। সে শুধু একজন সাধারণ কলেজপড়ুয়া ছেলে। তবুও জারা তাকে একা মনে করছে না। হঠাৎ আকাশ থেকে লাল আলোর একটি রেখা নেমে এল। মাটিতে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের ঘাস পুড়ে কালো হয়ে গেল। আরিয়ান জারার হাত ধরে পাশের দিকে সরে গেল। “আমরা এখানে থাকলে বাঁচব না!” জারা মাথা নাড়ল। তার কপালের চিহ্নটি এবার আগের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল। সে আরিয়ানের হাত শক্ত করে ধরে বলল, “আমার কথা মন দিয়ে শোনো। কয়েক সেকেন্ড পর আমি একটি শক্তিক্ষেত্র তৈরি করব। তখন তুমি চোখ বন্ধ করবে। যা-ই শুনতে পাও, চোখ খুলবে না।” “কিন্তু—” “আমাকে বিশ্বাস করো।” আরিয়ান তার চোখের দিকে তাকাল। নীল আলোর মধ্যে সে কোনো মিথ্যা দেখতে পেল না। সে মাথা নাড়ল। পরের মুহূর্তেই চারপাশে প্রচণ্ড আলো ছড়িয়ে পড়ল। বাতাস কেঁপে উঠল। মাটির নিচ থেকে যেন কোনো বিশাল শক্তি জেগে উঠল। আরিয়ান চোখ বন্ধ করল। সে অনুভব করল, তার পা মাটি থেকে উঠে যাচ্ছে। শরীরের চারপাশে শীতল বাতাস ঘুরছে। দূরে অসংখ্য কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কোনো কথাই পরিষ্কার নয়। কয়েক সেকেন্ড পর সবকিছু শান্ত হয়ে গেল। “এবার চোখ খোলো,” জারা বলল। আরিয়ান চোখ খুলে দেখল, তারা আর মাঠে নেই। তারা দাঁড়িয়ে আছে একটি অদ্ভুত স্থানের মধ্যে। চারপাশে নীল স্বচ্ছ দেয়াল, মেঝেতে আলোর রেখা, আর মাথার ওপরে ঘূর্ণায়মান কিছু ধাতব বস্তু। দূরে একটি বড় গোলাকার যন্ত্র স্থির হয়ে আছে। তার গায়ে অসংখ্য আলোর বিন্দু জ্বলছে। “আমরা কোথায়?” “আমার মহাকাশযানের ভেতরে,” জারা বলল। আরিয়ান চারপাশে তাকিয়ে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেল। “কিন্তু আমরা তো বাইরে ছিলাম!” “আমি যানটির অস্থায়ী অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছি। এই মুহূর্তে এটি পৃথিবীর স্বাভাবিক স্থানাঙ্কের বাইরে একটি আড়াল করা অবস্থায় আছে।” “মানে, আমরা কি পৃথিবীতে নেই?” “আমরা পৃথিবীর সঙ্গেই আছি, কিন্তু তোমাদের সাধারণ যন্ত্র দিয়ে এই স্থানটিকে শনাক্ত করা কঠিন হবে।” আরিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমি মনে হয় জীবনে যত কল্পবিজ্ঞান পড়েছি, আজ সব একসঙ্গে সত্যি হতে দেখছি।” জারা তার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসল। “তোমাদের গল্পগুলোতে কি আমার মতো প্রাণীদের দেখানো হয়?” “হ্যাঁ। তবে বেশির ভাগ গল্পে এলিয়েনরা পৃথিবী দখল করতে আসে।” “আমি পৃথিবী দখল করতে আসিনি।” “সেটা বুঝতে পারছি।” জারা শক্তি-সংযোগকোষটি নিল। মহাকাশযানের কেন্দ্রে থাকা একটি গোলাকার অংশের সঙ্গে সেটি যুক্ত করতেই চারপাশের আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মেঝের ওপর নীল রেখাগুলো একের পর এক জ্বলে উঠতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই যানের ভেতরে একটি মৃদু গুঞ্জন শুরু হলো। “শক্তি পুনরুদ্ধার হচ্ছে,” জারা বলল। আরিয়ান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মহাকাশযানের দেয়ালে হঠাৎ একটি লাল চিহ্ন ফুটে উঠল। তারপর আরেকটি। তারপর আরও অনেকগুলো। জারা দ্রুত সামনে এগিয়ে গেল। “না, এটা কীভাবে সম্ভব?” “আবার কী হয়েছে?” “ওরা আমার অবস্থান শনাক্ত করেছে।” “কিন্তু তুমি তো বলেছিলে, এখানে কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না!” “আমি ভেবেছিলাম, এই অবস্থান তাদের সংকেত থেকে আড়াল করা যাবে। কিন্তু তারা আমার যানটির শক্তি-সংযোগকোষের সংকেত অনুসরণ করছে।” আরিয়ান বুঝতে পারল, বিপদ এখনো শেষ হয়নি। জারা একটি স্বচ্ছ পর্দার সামনে দাঁড়াল। সেখানে পৃথিবীর ছবি ফুটে উঠল। বাংলাদেশের ওপর লাল বিন্দুটি এখন আর একা নয়। তার পাশে আরও কয়েকটি বিন্দু দেখা যাচ্ছে। সেগুলো দ্রুত একত্র হচ্ছে। “ওরা কি পৃথিবীতে নামবে?” আরিয়ান জিজ্ঞেস করল। “যদি তারা আমার প্রযুক্তি পেতে চায়, তাহলে নামতে পারে। আর যদি তারা মনে করে, পৃথিবীর মানুষ আমার সহযোগী, তাহলে তোমাদেরও বিপদের মধ্যে ফেলতে পা.রে।” আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তাহলে তুমি চলে যাও। তোমার যান ঠিক হয়ে গেছে। তুমি তোমার গ্রহে ফিরে যাও।” জারা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। “তুমি আমাকে চলে যেতে বলছ?” “আমি চাই না, তোমার জন্য পৃথিবীর মানুষের ক্ষতি হোক।” “কিন্তু তুমি কি জানো, আমি কোথায় যাব?” “তোমার গ্রহে।” “আমার গ্রহে পৌঁছাতে আমাকে একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। এই যানটি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। আর যদি আমি তোমাকে এখানে রেখে যাই, তাহলে তারা তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তুমি যা দেখেছ, তা গোপন রাখতে পারবে না।” আরিয়ান একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “আমি কাউকে কিছু বলব না।” “আমি জানি। কিন্তু বিষয়টা শুধু তোমার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে না।” জারা কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলল, “তুমি চাইলে আমাকে সাহায্য না-ও করতে পারতে। তবু তুমি আমার পাশে দাঁড়িয়েছ। আমি এই আচরণ ভুলব না।” আরিয়ান হেসে বলল, “তাহলে এখন আমাদের কী করতে হবে?” জারা একটি ছোট নীল যন্ত্র তার হাতে দিল। “এটি তোমার শরীরের চারপাশে সাময়িক সুরক্ষাবলয় তৈরি করবে। বিপদের সময় এটি সক্রিয় হবে।
চলবে....