*পর্ব - ১: ফেরা*
রায়হান দশ বছর পর দেশে ফিরেছে। লন্ডনের হিথ্রো থেকে সিলেট ওসমানী, তারপর সেখান থেকে সিএনজি করে তাজপুর। দশ বছরে অনেক কিছু বদলেছে। গ্রামের কাঁচা রাস্তা এখন পাকা, পুকুরের পাশে যে চায়ের দোকানটা ছিল সেটা এখন বড় মার্কেট। কিন্তু বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই তার মনে হলো, কিছুই বদলায়নি। সেই আম গাছটা, সেই তুলসী মঞ্চ, আর বারান্দায় মায়ের সেই অপেক্ষা।
ঘরে ঢুকে ব্যাগটা রাখল সে। মা ভাত বসিয়েছেন। বাবা নামাজে গেছেন। রায়হানের ঘরটা যেমন রেখে গিয়েছিল, তেমনই আছে। দেয়ালে তার ছোটবেলার একটা পোস্টার, একটা ভাঙা ব্যাডমিন্টন র্যাকেট।
আলমারি খুলে একটা পুরনো পাঞ্জাবি খুঁজতে গিয়ে নিচে একটা অ্যালবাম পেল। মোটা, লাল মলাটের অ্যালবাম। ধুলো জমে কালো হয়ে গেছে। সে ফুঁ দিয়ে ধুলো সরাল।
প্রথম পাতাটা খুলতেই তার হাত থেমে গেল।
একটা ছবি। একটু ঝাপসা হয়ে গেছে। একজন লোক কালো ব্লেজার পরে চেয়ারে বসে আছে। চোখে মোটা সাদা ফ্রেমের চশমা। মুখে হালকা হাসি। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ-ছয় বছরের একটা বাচ্চা, চোখে বড় কালো সানগ্লাস, যেটা তার মুখের চেয়ে বড়। বাচ্চাটা সে নিজে, রায়হান।
লোকটা তার চাচা, কাশেম চাচা।
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কাশেম চাচা ছিলেন তার বাবার ছোট ভাই। বিয়ে করেননি। সারাজীবন এই বাড়িতেই ছিলেন। চাকরি করতেন সিলেট শহরে, একটা কলেজে কেরানি। কিন্তু রায়হানের কাছে তিনি ছিলেন সুপারহিরো।
ছোটবেলায় প্রতিদিন বিকেলে চাচা অফিস থেকে ফিরতেন। ব্যাগ থেকে একটা সাদা চশমা বের করে রায়হানকে পরিয়ে দিতেন। আর নিজের কালো চশমাটা পরতেন। তারপর দুজন মিলে গলির মাথা পর্যন্ত হাঁটতে যেতেন। চাচা বলতেন, "দেখ, আমরা দুজন গোয়েন্দা। সাদা চশমা মানে ভালো মানুষ, কালো চশমা মানে খারাপ মানুষ ধরার ডিউটি।"
রায়হান বিশ্বাস করত। সে ভাবত সত্যিই সে সুপারম্যান।
একবার চাচা তাকে বলেছিলেন, "একদিন তুইও আমার মতো সাদা চশমা পরবি। অনেক বড়লোক হবি, অনেক বড় মানুষ হবি। তখন আমাকে ভুলে যাবি না তো?"
রায়হান তখন বলেছিল, "কখনো না।"
কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল। লন্ডনে যাওয়ার পর প্রথম দুই বছর ফোন করত, তারপর ব্যস্ততা, তারপর অজুহাত। চাচা যখন মারা গেলেন আট বছর আগে, তখন তার সেমিস্টার ফাইনাল ছিল। আসতে পারেনি। শুধু ফোনে শুনেছিল, মানুষটা স্ট্রোক করে চলে গেছে।
পেছন থেকে মা এসে দাঁড়ালেন। বললেন, "ওই ছবিটা এখনো আছে? তোর চাচা মরার আগে পর্যন্ত রোজ ওই ছবিটার কথা বলত। বলত, আমার রায়হান একদিন সাদা চশমা পরে প্লেন থেকে নামবে।"
রায়হানের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। সে তো সত্যিই সাদা চশমা পরে প্লেন থেকে নেমেছে, কিন্তু যে মানুষটা দেখতে চেয়েছিল, সে নেই।
সে অ্যালবামটা বন্ধ করল না। বুকে জড়িয়ে ধরল। বাইরে আজান হচ্ছে। তার মনে হলো, জীবনে সে অনেক ডিগ্রি, অনেক টাকা, অনেক সার্টিফিকেট পেয়েছে, কিন্তু যে জিনিসটা সবচেয়ে দামি ছিল, সেই সাদা চশমার ভেতরের মায়াটা সে হারিয়ে ফেলেছে।
সে ঠিক করল, কাল সকালে ফজরের পর সে চাচার কবরের কাছে যাবে। খালি হাতে না। বাজার থেকে ঠিক ওইরকম একটা মোটা সাদা ফ্রেমের চশমা কিনে নিয়ে যাবে। কবরের পাশে রেখে বলবে, "চাচা, দেখো, আমি পরেছি। আমি বড় মানুষ হয়েছি। কিন্তু তোমাকে ভুলিনি।"
কারণ জীবনে কিছু ঋণ আছে, যা টাকা দিয়ে শোধ হয় না। সাদা চশমা দিয়ে শোধ করতে হয়।
সকালে রায়হান ঘুম থেকে উঠল ফজরের আজানের আগেই। অ্যালবামটা বালিশের পাশেই ছিল। সে পাঞ্জাবি পরে বাজারের দিকে হাঁটল।
তাজপুর বাজারে এখন অনেক চশমার দোকান। সে তিনটা দোকান ঘুরল। কোথাও সেই মোটা সাদা ফ্রেমটা নেই। সবাই এখন সরু কালো ফ্রেম বিক্রি করে। শেষে পুরনো এক দোকানদার বলল, "এই মডেল কেউ পরে না এখন। গোডাউনে একটা পড়ে আছে, দেখি।"
দোকানদার ধুলো ঝেড়ে একটা চশমা বের করে দিল। একদম হুবহু চাচার মতো, মোটা সাদা ফ্রেম। রায়হান হাতে নিয়ে কেঁপে উঠল।
চশমাটা পরে সে কবরস্থানের দিকে গেল। সকালের কুয়াশা। কবরস্থানটা নীরব। চাচার কবরটা একটু ভেতরে, একটা আম গাছের নিচে।
রায়হান কবরের পাশে বসল। চশমাটা খুলে কবরের মাটির উপর রাখল। বলল, "চাচা, দেখো, আমি পরেছি। তুমি বলেছিলে আমি একদিন বড় মানুষ হবো। হয়েছি। কিন্তু তোমার মতো ভালো মানুষ হতে পারিনি।"
তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। সে বলল, "আমাকে মাফ করে দিও, আমি আসতে পারিনি।"
হঠাৎ পেছন থেকে একটা বাচ্চার আওয়াজ, "আরে, এটা কার চশমা?"
রায়হান তাকিয়ে দেখল, একটা সাত বছরের বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। পাশের বাড়ির রিফাত। রায়হান হেসে চশমাটা তুলে বাচ্চাটার চোখে পরিয়ে দিল। বাচ্চাটা হেসে উঠল।
রায়হান বুঝল, গল্পটা শেষ হয়নি। সাদা চশমাটা এখন রিফাতের চোখে। ঋণটা এভাবেই চলতে থাকে, এক চশমা থেকে আরেক চশমায়।ঠিক আছে, তৃতীয় পাঠ ২৩৮ শব্দে বানিয়ে দিলাম — এটা কপি করে নাও:
রিফাত চশমা পরে লাফাচ্ছে। বলল, "ভাইয়া, আমাকে সুপারম্যান লাগছে?"
রায়হান হাসল। এই হাসিটা অনেক বছর পর তার মুখে এলো। বলল, "হ্যাঁ, একদম। আজ থেকে তুই গোয়েন্দা।"
রিফাতকে নিয়ে সে বাড়ি ফিরল। মা দেখে অবাক, "আরে, এই চশমা কোথায় পেলি?"
রায়হান বলল, "চাচারটা। এখন রিফাতের।"
দুপুরে রায়হান ঠিক করল, সে আর লন্ডনে ফিরবে না এত তাড়াতাড়ি। গ্রামের স্কুলটা অনেকদিন বন্ধ। চাচা যে কলেজে কেরানি ছিলেন, সেখানকার এক স্যারকে ফোন করল।
পরের দিন সকালে সে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে সাদা চশমা, পাশে দশটা বাচ্চা, সবার চোখে কাগজের সাদা চশমা। রায়হান পড়াচ্ছে, "বলো, সাদা চশমা মানে কী? ভালো মানুষ।"
রিফাত চিৎকার করে বলল, "আমরা সবাই ভালো মানুষ!"
রায়হান আকাশের দিকে তাকাল। মনে হলো, চাচা ওপর থেকে দেখছেন। আর হাসছেন। সাদা ফ্রেমের ভেতর থেকে।
------- ---- -- ----- ----