গোলমেলে গুষ্টি
লেখিকা: জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ১: দাদুর বিয়ের ঘোষণা😂🥴
____
সকাল সাতটা।
চৌধুরী বাড়িতে তখন ভয়াবহ অবস্থা।
রান্নাঘর থেকে চিৎকার ভেসে আসছে—
—এই বাড়িতে কি কেউ মানুষ আছিস? নাকি সবাইকে পাগল বানিয়ে তারপর জন্ম দিয়েছি?
চিৎকারটা করেছেন বাড়ির গৃহকর্ত্রী রওশন আরা বেগম। হাতে খুন্তি, মাথায় ওড়না আর মুখে এমন রাগ, যেন এইমাত্র তিনি জানতে পেরেছেন তাঁর বাড়ির সবাই মিলে গোপনে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
কিন্তু তাঁর চিৎকারে কারও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
কারণ এই বাড়ির মানুষজন চিৎকার শুনতে শুনতে এমন অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, ভূমিকম্প হলেও হয়তো আগে জিজ্ঞেস করবে, ‘নাশতা খেয়েছ?’
বাড়ির বড় ছেলে কামাল চৌধুরী খবরের কাগজ পড়ছিলেন। মায়ের চিৎকার শুনে কাগজ নামিয়ে বললেন,
—আম্মা, সকাল সকাল এত চেঁচাচ্ছ কেন? প্রতিবেশীরা ভাববে আমরা তোমাকে ঠিকমতো খেতে দিই না!
রওশন আরা খুন্তি উঁচিয়ে বললেন,
—তোরে আজ খুন্তি দিয়ে খাওয়ালে বুঝবি আমি তোদের কত ভালো রাখি!
কামাল সাহেব সঙ্গে সঙ্গে খবরের কাগজের আড়ালে মুখ লুকালেন।
—আব্বা, আপনার স্ত্রী আমাকে মারতে চাচ্ছে!
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে চা খেতে খেতে বাড়ির কর্তা আবদুল করিম চৌধুরী বললেন,
—মারুক। আমার বউয়ের হাতে মার খেলে শরীর ভালো থাকে।
কামাল সাহেব অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালেন।
—আপনি আমার বাবা তো?
—সন্দেহ আছে?
—আছে। যথেষ্ট আছে!
এদিকে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল আদনান চৌধুরী। পরনে কালো টি-শার্ট, এলোমেলো চুল আর মুখে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ হাসি।
অবশ্য এই হাসির আড়ালে কত বড় শয়তান লুকিয়ে আছে, সেটা বাড়ির প্রতিটি মানুষ জানে।
আদনান নিচে নেমেই বলল,
—কী হয়েছে? সকাল সকাল পারিবারিক কুস্তি শুরু?
তার ছোট ভাই রাফি পেছন থেকে বলল,
—ভাইয়া, তুমি চুপ থাকো। তোমার জন্যই তো কাল রাতে আম্মু আমার ফোন নিয়ে গেছে!
আদনান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—আমি আবার কী করলাম?
—আমার ফোন দিয়ে আম্মুকে মেসেজ পাঠিয়েছ, ‘আম্মু, আমি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছি।’
আদনান হেসে ফেলল।
—আরে, তোর ফোনে চার্জ ছিল না। আমি শুধু আম্মুর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছি।
রাফি দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
—তারপর আম্মু আমার ঘরে এসে আমাকে বালিশসহ ধরে নিয়ে গেছে!
আদনান কাঁধ ঝাঁকাল।
—পারিবারিক ভালোবাসা বুঝিস না।
ঠিক তখনই বাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য তিশা দৌড়ে এসে চিৎকার করল,
—বাঁচাও! বাঁচাও! বড় বিপদ!
সবাই থেমে গেল।
দাদি খুন্তি হাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
—কী হয়েছে? কে মরেছে?
তিশা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—কেউ মরেনি! দাদু নাকি আবার বিয়ে করবেন!
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
তিন সেকেন্ড।
তারপর পুরো বাড়িতে নীরবতা নেমে এল।
কামাল সাহেবের হাত থেকে খবরের কাগজ পড়ে গেল।
রাফির মুখের বিস্কুট গলায় আটকে যাওয়ার অবস্থা।
আদনান ধীরে ধীরে দাদুর দিকে তাকাল।
—দাদু, আপনি কি চা না খেয়ে ভুল করে অন্য কিছু খেয়ে ফেলেছেন?
দাদু গম্ভীর মুখে চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন,
—কথা সাবধানে বলবি। আমি এখনো যথেষ্ট সুস্থ-সবল!
দাদি চোখ বড় বড় করে বললেন,
—কী বললে? আবার বিয়ে করবে?
দাদু গলা পরিষ্কার করে বললেন,
—হ্যাঁ। মানুষ একবার বিয়ে করলেই কি জীবন শেষ?
আমারও তো কিছু শখ-আহ্লাদ আছে!
দাদি হাতে থাকা খুন্তিটা শক্ত করে ধরলেন।
—তোমার শখ আমি আজই পূরণ করছি!
দাদু সোফা থেকে লাফ দিয়ে উঠে বললেন,
—এই যে! আলোচনা হচ্ছে, যুদ্ধ না!
—তোমার আলোচনা আমি খুন্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেব!
দাদু দৌড় দিলেন।
দাদি পেছনে।
দাদি দৌড়াতে দৌড়াতে বলছেন,
—আজ তোর বিয়ের শখ চিরদিনের জন্য মিটিয়ে দেব!
দাদু সিঁড়ির কাছে গিয়ে চিৎকার করলেন,
—আদনান! তোর দাদিকে বোঝা! বউকে বোঝানো নাতির দায়িত্ব!
আদনান সোফায় বসে চিপসের প্যাকেট খুলতে খুলতে বলল,
—দাদু, নিজের বউ নিজে সামলান। আমি এখনো বিয়ে করিনি!
দাদু থমকে গেলেন।
—কী বললি? তুই বিয়ে করিসনি বলেই তো আমার বিয়ে করার অধিকার নেই?
আদনান মাথা নাড়ল।
—যুক্তিটা বুঝলাম না, কিন্তু ঝামেলাটা বুঝেছি।
ঠিক তখন মেহের আফরোজ বাড়িতে ঢুকল। হাতে একটা ব্যাগ, মুখে বিরক্তি।
সে ঢুকেই দেখল, দাদু সোফার পেছনে লুকিয়ে আছেন আর দাদি খুন্তি হাতে তাঁকে খুঁজছেন।
মেহের অবাক হয়ে আদনানকে জিজ্ঞেস করল,
—তোমাদের বাড়িতে আবার কী হয়েছে?
আদনান চিপস মুখে দিয়ে বলল,
—দাদুর দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হয়েছে।
—মানে?
—দাদু আবার বিয়ে করবেন!
মেহের প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর এমন জোরে হেসে উঠল যে তার হাতের ব্যাগ মেঝেতে পড়ে গেল।
—সত্যি? দাদু, পাত্রী কোথায়? আমিই খুঁজে দিই?
দাদি এবার মেহেরের দিকে তাকালেন।
—তুই আবার ওকে উৎসাহ দিচ্ছিস কেন?
মেহের হাসতে হাসতে বলল,
—দাদি, দাদুরও তো সুখে থাকার অধিকার আছে!
দাদি খুন্তি তুলে বললেন,
—তুই চুপ কর! তোর বিয়ের ব্যবস্থা আগে করি!
মেহেরের হাসি মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেল।
আদনান পাশ থেকে মুচকি হেসে বলল,
—এই তো! বোমা ঘুরে নিজের কাছে ফিরে এসেছে!
মেহের চোখ পাকিয়ে বলল,
—তোমার বিয়ে হলে আমি বরপক্ষকে বলব, এই ছেলে ছোটবেলায় পুতুল চুরি করত!
আদনান বুক ফুলিয়ে বলল,
—আমি কখনো পুতুল চুরি করিনি!
মেহের শান্তভাবে বলল,
—তাহলে তোমার ছোটবেলার ছবি দেখাব?
আদনান থমকে গেল।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করল,
—আমার কাছে আছে! ভাইয়া গোলাপি ফ্রক পরে পুতুল নিয়ে বসে ছিল!
পুরো বাড়ি হেসে উঠল।
আদনান রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোর ফোনটা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা আমি এখনই করছি!
রাফি দৌড়!
মেহের আবার হাসতে শুরু করল।
আর দাদু?
তিনি তখনো সোফার পেছনে লুকিয়ে থেকে ঘোষণা দিলেন,
—সবাই শুনে রাখো! আগামী শুক্রবার আমার পাত্রী দেখার অনুষ্ঠান!
দাদি খুন্তি হাতে তাঁর দিকে ঘুরে তাকালেন।
—আগামী শুক্রবারের আগেই তোমাকে আমি এমন শিক্ষা দেব, তুমি বিয়ের নাম শুনলে কবিতা আবৃত্তি করবে!
দাদু অসহায় মুখে আদনানের দিকে তাকালেন।
আদনান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল,
—প্রিয় দর্শকবৃন্দ, চৌধুরী পরিবারের আজকের পর্ব এখানেই শেষ। আগামী পর্বে দেখা হবে—যদি আমরা কেউ বেঁচে থাকি!
চলবে...
পাঠকদের জন্য: দাদুর বিয়ের খবর শুনে আপনাদের কী মনে হচ্ছে? দাদু কি সত্যিই বিয়ে করবেন, নাকি দাদির খুন্তির কাছে হার মানবেন? কমেন্টে জানাবেন! 🤣