#শুকনো_পাতার_নূপুর_পায়ে
#আয়েশা_রিন
#পর্ব৪১
[কপি ও রিপোস্ট করা থেকে বিরত থাকবেন]
[ Warning বারিশ চরিত্রটি টক্সিক ও রেড ফ্ল্যাগ। তার এই উগ্র আচরণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। নিজ দায়িত্বে পড়ুন!]
বারিশের হাত ধীরে ধীরে নেমে এলো ঝিলমিলের উদরে। কালো কুচকুচে চোখ দুটিতে কোনো অনুভূতি নেই। একদম শান্ত, অথচ ভীষণ হিমশীতল। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! বারিশ মেয়েটার ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকাল। তাহলে এই জন্যই চেহারার এই ম্লান রূপ? এতদিনের অহেতুক অসুস্থতার আসল কারণ এটাই? ঝিলমিলের এই অবস্থা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই বারিশের মগজে এক বি”ষাক্ত চিন্তা চাড়া দিয়ে উঠল। পেটে তার র”ক্ত বয়ে নিয়েও মেয়েটা এত সহজে তাকে ভুলে অন্য ছেলেদের সাথে হাসাহাসি করে ঘুরেছে? পার্ক, নাইটক্লাব! এমনকি ফাহিমের হাত ধরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে! বুক ফুলিয়ে বলেছে সে নাকি বারিশকে ঘৃণা করে! কেন… কেন ঘৃণা করবে? বারিশ কি তাকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসেনি?
উঠে দাঁড়াল বারিশ। ঝিলমিলের দিকে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে নিঃশব্দে রুম থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার আগে বাইরে থেকে বেশ ভালোভাবে রুমের দরজা লক করার শব্দ পাওয়া গেল।ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে আবারও নিজের তলপেটে স্পর্শ করতেই তার চোখ ফেটে জল নেমে এলো। অঝোরে কেঁদে উঠল সে। এখানে... ঠিক এই জায়গাটায় তার নিজের সন্তান বেড়ে উঠছে! অথচ এতদিন ধরে তার বাবা তাকে কত বড় মিথ্যে আর ছলনার মাঝে ডুবিয়ে রেখেছিল! নিষ্পাপ প্রাণটাকে পেটে নিয়েই সে না জেনে নি’’ষিদ্ধ কত কী খেয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে! এই কারণেই ফাহিমকে ভুলিয়ে বাংলাদেশে চলে যেতে চেয়েছিল সে। সেখানে অন্তত দাদীমা তাকে সেফ রাখত। তবে তো চলতি সপ্তাহেই সাধারণ এক অপারেশনের অজুহাতে আলতাফ সাহেব তার কলিজার টুকরোটাকে চিরতরে শেষ করে দিত!
বেডের এককোণে বসে কত কী ভাবছে ঝিলমিল! তবে কোনো কিছুর হিসাব মেলাতে পারছে না। দরজার লক খোলার শব্দে চমকে উঠে সে। তাকিয়ে দেখল বারিশের হাতে খাবারের ব্যাগ। নিশ্চয়ই বাহির থেকে এনেছে। সেগুলো ঝিলমিলের সামনে এনে রাখতে রাখতে বলল,
“এগুলো খেয়ে নে।”
ঝিলমিল তড়িঘড়ি করে চোখের জল মুছে নিল। চোখের কোণ দুটো তার তখনও লাল। লোকটার দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল,
“এভাবে কেন কথা বলছেন আমার সাথে?”
থমথম করা চোখে তাকাল বারিশ,
“কীভাবে কথা বলব তোর সাথে?”
ঝিলমিল তাকিয়ে রইল। বারিশের মুখে ফুটে থাকা কা”টা দাগগুলোর দিকে হাত বাড়িয়ে আলতো করে স্পর্শ করতে চাইল সে,
“এগুলো... এগুলো কীভাবে হলো আপনার মুখে?”
বারিশ এক ঝটকায় তার হাতটা ধরে ফেলে।
“জানার আগ্রহ থাকলে, আমাকে দেখা মাত্রই জেনে নিতে চাইতে। এতক্ষণ পর এই ঢং সাজে না।”
আজব! জানতে চাওয়ার সুযোগ দিয়েছে একবারও? ঝিলমিল আর কিছু বলল না। খাবারগুলো একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজের ব্যাগ থেকে সেই চিঠিটা বের করল। বারিশের হাতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমি না হয় আপনাকে ভুলে গিয়েছিলাম... এটা কী ছিল তবে?”
বারিশ কপাল কুঁচকে চিঠির ভাঁজ খুলল। দু-তিন লাইন চোখ বুলাতেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল বাঁকা হাসি।
“কে দিল এটা তোকে? ওই আলতাফ?”
ঝিলমিল এবার একদম চুপ করে রইল। বারিশ চিঠিটা হাতের মুঠোয় পিষে দলা পাকিয়ে এক পাশে ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর ঝিলমিলের একদম কাছে এসে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন সুরে বলতে লাগল,
“কাউকে ভালোবাসলে অন্ধের মতো বিশ্বাস রাখতে হয়। যার ওপর বিশ্বাসই নেই, তাকে ভালোবাসবে কি করে? থার্ড ক্লাস একটা লোক আমার নাম ভাঙিয়ে একটা কাগজ হাতে ধরিয়ে দিল, আর তুমি অমনি বিশ্বাস করে নিলে? আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি কি এতটাই সস্তা?
“তাহলে আপনি এতদিন কেন আসেননি? আমি কত অপেক্ষা…”
“শাট আপ! আর একটা শব্দও না! চুপচাপ এগুলো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বি। এক্ষুনি!”
বারিশের ধমকে আঁতকে উঠল মেয়েটা। আর একটা কথাও না বাড়িয়ে বাধ্য মেয়ের মতো খাবারটুকু খেয়ে একপাশে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। শরীরের দুর্বলতায় চোখ বুজতেই গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল সে। এতদিন যে অনিশ্চয়তায় চোখ থেকে ঘুম উবে গিয়েছিল, আজ সেই মানুষটা পাশে আছে বলেই হয়তো অজানা স্বস্তিতে ঘুমটা এত দ্রুত নেমে এলো।
বারিশ বসে রইল। সোফায় বসে থমথমে মুখে তাকিয়ে রইল ঝিলমিলের দিকে। ঘরের আলোটা ঘুমন্ত মেয়েটার মুখে গিয়ে পড়ছে দেখে উঠে গিয়ে লাইটটা নিভিয়ে দিল। তারপর এসে আবার একই জায়গায় মূর্তির মতো নিঃশব্দে বসে রইল সে। কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর। মন জুড়ে চেপে বসেছে হাজারটা চিন্তা।
তার তুলনায় মেয়েটা ভীষণ ছোট। এই রোগা, নরম শরীরে এত বড় শারীরিক ধকল সামলাবে কীভাবে সে? যদি কিছু হয়ে যায়! ভাবতে ভাবতেই উঠে দাঁড়িয়ে বিছানার কাছে গেল বারিশ। মেয়েটার পাশে বসে গায়ের চাদরটা সরাল। পড়নের কাপড় সামান্য তুলে নিজের বরফশীতল হাতটা রাখল উন্মুক্ত তলপেটে, যেখানে তার অস্তিত্বের নতুন স্পন্দন লুকিয়ে আছে। স্পর্শের সাথে সাথেই বারিশের শক্তপোক্ত শরীরটা কেমন যেন কাঁটা দিয়ে উঠল!
জায়গাটায় এখন তার নিজের রক্ত বেড়ে উঠছে! যে মেয়েটার কথা একসময় সে কল্পনাতেও আনেনি, যাকে স্রেফ নিজের প্রয়োজনে আর জেদের বশে বিয়ে করেছিল---আজ সেই মেয়েটার পেটে তার সন্তান! কিন্তু… না!
এখনও কারও আসার সময় হয়নি। একদমই না! বারিশ তাদের দুজনের একক পৃথিবীর মাঝখানে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারবে না। নিজের ওপর ঝিলমিলের যে দখলদারি, সেখানে কোনো তৃতীয় সত্তার ভাগ বসানো সম্ভব না। অন্তত এই মুহূর্তে তো কোনোভাবেই না! ধীরে ধীরে ঝিলমিলের ফ্যাকাশে মুখের কাছে ঝুঁকলো বারিশ।
আবছা আলোয় স্পষ্ট চোখে পড়ল তার হাতের আ’’ঘতে মেয়েটার দুটো গালই লাল হয়ে আছে, নিচের ঠোঁটে জমাট বেঁধে আছে রক্তের দাগ। এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতর মায়া উঁকি দিতে গিয়েও উবে গেল। মায়া কেন হতে যাবে? যে অপরাধ এই মেয়েটা করেছে, তার জন্য শাস্তি তো আরও চরম আর ভয়ংকর বাকি ছিল... যদি না আজ মাঝপথে এই বাচ্চার খবরটা চলে আসত!
বিছানা ছেড়ে কয়েক পা পিছিয়ে এসে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনের আলোয় মুহূর্তের জন্য উদ্ভাসিত হলো তার নিরেট, কঠিন চোখ জোড়া। গুগল ড্রাইভে গিয়ে বেশ কিছু পুরোনো ফোল্ডারের ভেতর ঢুকলো সে। অনেক আগের কিছু ফাইল আর ছবি স্ক্রল করে দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা জায়গায় এসে থমকে গেল তার আঙুল। গাড় অন্ধকার ঘরে ফোনের সেই নীলচে আলোয় ছবিগুলোর দিকে তাকাতেই বারিশের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল শয়তানি হাসি।
———লেখিকার পেইজ নেম Ayesha Rin—রিন
লন্ডনের এক অপূর্ব, শান্ত সকাল আজ। এমন এক স্নিগ্ধ সকালে নাজমা বেগম বেশ হালকা মনেই নাশতা তৈরি করছিলেন। এতদিন পর তার মনের ওপর চেপে থাকা ভারী পাথরটা যেন নেমে গেছে। মেয়েকে নিয়ে যে আতঙ্ক আর চিন্তায় প্রতিটা মুহূর্ত কাটছিল, তার অবসান ঘটেছে। ঝিলমিল শেষপর্যন্ত নিজের স্বামীর কাছেই ফিরে আছে। স্বামী হাজার রাগ-অনুরাগ করলেও দিনশেষে স্বামীর বুকই মেয়ের আসল ঠিকানা; এমনটাই মনে করেন তিনি। তাই মেয়ে এখন যেখানে আছে, নিরাপদেই আছে ধরে নিয়ে তিনি একদম নিশ্চিন্ত।
কিন্তু এর ঠিক বিপরীত অবস্থা আলতাফ চৌধুরীর। ফাহিম গত রাতে এসে যখন সমস্ত ঘটনা বলার পর থেকেই আলতাফ সাহেবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। বারিশের হাত থেকে ঝিলমিলকে কীভাবে উদ্ধার করা যায়, সেই চিন্তায় সারারাত এক ফোঁটা ঘুমাতে পারেননি। পায়চারি করতে করতে ভোররাতের দিকে ক্লান্ত হয়ে একটু চোখ বুজেছিলেন মাত্র। তিনি ভালো করেই জানেন, বারিশ ঝিলমিলকে নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারে। তাই এয়ারপোর্টে লোক ভারা করে বসিয়ে রেখেছেন তিনি। বারিশ বা ঝিলমিলকে দেখা মাত্রই যেন কোনো মতে আটকে রাখা হয়।
টুংটাং শব্দে হঠাৎ নাজমা বেগমের ফোনের মেসেঞ্জারটা বেজে উঠল। ফোনটা হাতে নিলেন তিনি। লন্ডনে আসার পর আলতাফ সাহেবের জন্য পরিচিত প্রায় সকল আত্মীয়-স্বজনকে ব্লক করে রাখতে হয়েছিল তাকে। শুধু একজন বান্ধবীর সাথেই তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল সেই বান্ধবীর পাঠানোই একটি মেসেজ। উৎসাহ নিয়ে ইনবক্সটা খুলতেই কিন্তু নাজমা বেগমের মুখের থমথমে ভাব উবে গিয়ে বিস্ময় আর ধাক্কা স্থান নিল। চোখের সামনে যা দেখছেন, তা বিশ্বাস করতে খটকা লাগছে তার।
একটি পুরনো ছবি। হোটের রুমের এককোণ থেকে তোলা। ছবির লোকটা আর কেউ নয়, তার নিজের স্বামী, আলতাফ চৌধুরী। তার স্বামী আলতাফ চৌধুরী এক অপরিচিত নারীর গালে কামাতুর ভঙ্গিতে চুমু খাচ্ছেন! ছবিটা দেখলে যেকোনো সুস্থ মানুষের গা ঘিনঘিন করে উঠবে। নিজের এত বছরের আদর্শবাদী স্বামীর এমন কুরুচিকর আর নোংরা রূপ দেখা মাত্রই নাজমা বেগমের মাথার ভেতরটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল।
হাতের রান্না করা খাবারগুলো এক ঝটকায় ফ্লোরে ছুড়ে মারলেন নাজমা বেগম। ক্ষোভে অন্ধ হয়ে তিনি একছুটে ঢুকলেন নিজেদের কক্ষে। বিছানায় তাদের ছোট ছেলে জিহান নিশ্চিন্তে বাবার গায়ে হাত-পা তুলে দিয়ে ঘুমাচ্ছে। নাজমা বেগম জিহানকে একপাশে সরিয়ে আলতাফ সাহেবের মাথার চুল দু-হাতে শক্ত মুঠোয় চেপে ধরলেন। হেঁচকা টান মেরে চেঁচিয়ে উঠলেন,
“এই উঠ! উঠ বলছি!”
শরীরে কয়েকটা ঝাঁকুনি আর চুলে টান পড়তেই আলতাফ সাহেব আঁ*তকে উঠে চোখ মেললেন। ঘুম জড়ানো, বিস্ময় ভরা চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আধো গলায় শুধালেন,
“কী সমস্যা নাজমা? এত সকালে এমন করছ কেন?”
নাজমা বেগম চুল ছাড়লেন না, বরং আরও জোরে টান মেরে তাকে বিছানায় বসিয়ে দিলেন। ফোনটা বের করে আলতাফ সাহেবের মুখের একদম সামনে ধরে রুক্ষ গলায় বললেন,
“বিয়ের আগে তো বলেছিলি আমিই তোর প্রথম ভালোবাসা! বুকে হাত দিয়ে বড় বড় নীতিকথা শোনানো হয়েছিল না? তাহলে এসব কী? কী এটা? নোংরা, কুরুচিকর লোক কোথাকার!”
ছবিটা চোখের সামনে ফুটে উঠতেই হিম হয়ে গেল আলতাফ সাহেবের বুকের ভেতরটা ! মনে হলো সে পৃথিবীতেই নেই। সেকেন্ডের ভেডরেই তার ধূর্ত মস্তিষ্ক বুঝে ফেলল, এ কাজ কার!
বারিশ! এই একটা মাত্র ছেলেই এর অতীতে কতবার এই পুরোনো ছবিটা দিয়ে তাকে ব্লাকমেইল করেছে, শাসিয়েছে। আজও তবে সেই অঘটনটা ঘটাল শ”য়তানটা! আলতাফ সাহেবের মাথা কাজ করছিল না, তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি এই পুরোনো হোটেল রুমের স্ক্যান্ডালটা এখনো বারিশ নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দিয়েছে! লজ্জা চেপে আলতাফ সাহেব কোনোমতে তোতলাতে তোতলাতে সামাল দিতে চাইলেন,
“আরে... নাজমা! শোনো আমার কথা, এটা আমি না! যে করেছে নিশ্চিত এআই দিয়ে ফেক তৈরি করেছে... বিশ্বাস করো আমাকে!”
“চুপ কর! মুখ সামলে কথা বলবি! তোর সঙ্গে আমি আর এক মুহূর্তও থাকব না!”
কথাটা শেষ করেই বিছানা থেকে ঘুমন্ত জিহানকে পাঁজা কোলে তুলে নিলেন নাজমা বেগম। সোজা দরজার দিকে পা বাড়ালেন। আলতাফ সাহেব বিছানা থেকে হুড়মুড় করে নেমে পেছনে ধাওয়া করলেন,
“নাজমা, শোনো আমার কথা! আল্লাহ সাক্ষী, এটা আমি নই! এটা নিশ্চয়ই ওই বারিশের কাজ! ও আমাদের সংসার ভাঙতে চায়!”
নাজমা বেগম থমকে দাঁড়ালেন। পেছনের দিকে ঘুরে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে চেঁচিতে উঠলেন,
“এজন্যই ছেলেটাকে মেয়ের জামাই হিসেবে মেনে নিতে এত চুলকানি ছিল আপনার, তাই না? ভেবেছিলেন নিজের এসব কুকীর্তি ঢাকা পড়ে যাবে? সব কুকীর্তি তো ওই ছেলের জানা!”
আলতাফ সাহেবের জবাব দেওয়ার আগেই নাজমা বেগম লিফটে ঢুকে পা ফেলে নিচে নেমে গেলেন। বাইরে গিয়ে ড্রাইভারকে ডেকে দ্রুত গাড়ি বের করতে বললেন। আপাতত লন্ডনের কোনো এক হোটেলে উঠবেন, আর সেখান থেকেই ছোট ছেলেকে নিয়ে সোজা বাংলাদেশে ফিরে যাবেন—এই ভণ্ড লোকটার সঙ্গে আর এক ছাদের নিচে থাকবে না। কী জঘন্য ছবি! ছিঃ!
———
সকাল সকাল ঝিলমিলকে হসপিটালে নিয়ে এসেছে বারিশ। গতকাল রাতেই অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছিল সে। বাইরে এখনো রোদের মুখ দেখা যায়নি, কুয়াশা আর ঠাণ্ডা বাতাসে চারপাশ কেমন নিস্তব্ধ। কেবিনের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে দুজন। কেন তাকে এত সকালে এখানে নিয়ে আসা হলো, ভেবে কূল পাচ্ছিল না ঝিলমিল। পাশে বসা লোকটাকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে, কোনো উত্তর দেয়নি। বরফের মতো ঠাণ্ডা মুখ করে ফোনে দৃষ্টি স্থির রেখে একেবারে চুপ করে আছে। খানিক বাদে চেম্বারের দরজা খুলে লেডি ডক্টর ভেতরে প্রবেশ করতেই নড়েচড়ে বসল ঝিলমিল। আজকের প্রথম রোগী বোধহয় তারাই। ডক্টর চেয়ারে বসে ফাইলটা হাতে নিয়ে হাসিমুখে কিছু একটা বলতে যাবেন, তার আগেই বারিশ ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে একদম নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
"আমার ওয়াইফের অ্যাবরশন করাতে এসেছি। আমি চাচ্ছি না এখন কোনো বাচ্চা আসুক।"
ডক্টরের দিকে নির্বিকার স্বরে বলা বারিশের কথাগুলো শুনতেই যেন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল ঝিলমিলের। এজন্যই? ঠিক এজন্যই লোকটা এভাবে তাকে হসপিটালে নিয়ে এসেছে? যেখানে সে ভেবেছিল হয়তো বাচ্চার খবর শুনে লোকটার ভেতর ন্যুনতম কোনো মানবিকতা জাগবে, সেখানে সে এত সহজে, এত ঠান্ডা মাথায় সব শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে এসেছে!
মাঝবয়সি ডক্টরের মুখটাও কেমন গম্ভীর হয়ে উঠল।
“দেখুন মিস্টার, প্রেগন্যান্সি অ্যা”বরশন কোনো ছোটখাটো বিষয় না যে আপনি হুট করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবেন। পেশেন্ট অর্থাৎ আপনার স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা আগে চেক করতে হবে, মেডিকেল পারমিশন লাগবে। আর সবকিছুর আগে... ওনার নিজের সম্মতিটা সবচেয়ে বড় ব্যাপার।”
“আমার ওয়াইফের সম্মতি আছে এতে। ও নিজেও এত অল্প বয়সে কোনো ঝুটঝামেলা বা বাচ্চার দায়িত্ব নিতে চায় না।”
মুখের ওপর কীভাবে মিথ্যা বলছে লোকটা! চিৎকার দিয়ে ডক্টরকে আসল সত্যটা বলতে চাইল সে। কিন্তু মুখ খোলার আগেই টেবিলের নিচ দিয়ে তার ডান হাতের কব্জিটা শিকলের মতো আঁকড়ে ধরল বারিশ। ঝিলমিল যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলেও, বাইরে থেকে বারিশের ফ্যাকাশে শীতল মুখে ফুটে রইল স্বাভাবিকতার অভিনয়। ডক্টর চশমার ওপর দিয়ে দু'জনের এই অস্বাভাবিক নীরবতা সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর ঝিলমিলের চুপসে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে শুধালেন,
“আপনার স্ত্রীর কি নিজের মুখে কিছু বলার আছে? প্রথম প্রেগন্যান্সিতে হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কোনো বিশেষ কারণ? ফ্যামিলি প্রেসার, নাকি অন্য কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যা?”
ঝিলমিল ডক্টরের চোখে চোখ রেখে আকুল দৃষ্টিতে সাহায্যের আবেদন জানাতে চাইল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই তাকে থামিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ডক্টরের দিকে তাকাল বারিশ। ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম হাসির আভা ফুটিয়ে, ধারালো কণ্ঠে বলল,
“নিশ্চয়ই আমাদের বেডরুমের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো আপনাকে এসে বিস্তারিত ভেঙে বলতে হবে না? উই রেসপেক্ট ইউর কন্সার্ন, ডক্টর। কিন্তু কোনো সমস্যা আছে কি নেই, সেটা সম্পূর্ণ আমাদের পার্সোনাল ম্যাটার। আমরা মেডিকেল প্রসিডিউরের নিয়ম জানতে এসেছি, পারিবারিক কাউন্সিলিং নিতে আসিনি। আপনি জাস্ট বলুন কাজটা আজকেই শুরু করা সম্ভব কি না।”
ডক্টরের ভ্রু আরও জোড়া কুঁচকে গেল। পছন্দ হলো না এই লোকটার কথা।
“না! আমি... আমি আরও ভেবে দেখতে চাই! আজ না ডক্টর, প্লিজ!”
কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে বলেই ফেলল ঝিলমিল। বারিশ ঝিলমিলের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে অগ্নিনজর নিক্ষেপ করল, যেন সেই চাহনি দিয়েই মেয়েটাকে জীবন্ত জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে। হাতের বাঁধনটা আরও শক্ত হলো। ডক্টরের চোখে চোখ রেখে হুকুমের সুরে বলল,
“আজই অ্যাবরশন করাতে চাই। আপনি প্রসিডিউরের ব্যবস্থা করুন।”
ডক্টর কিছু বলার আগেই ফোনটা বেজে উঠল তার। মোবাইলটা হাতে নিয়ে বললেন,
“এক্সকিউজ মি, আমার একটা জরুরি কল এসেছে। আপনারা বসুন, আমি দু' মিনিটে আসছি।”
ডক্টর চেম্বার থেকে বের হয়ে দরজাটা হালকা ভেজিয়ে দেওয়া মাত্রই বারিশের চোখে চোখ রেখে ফুঁপিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল ঝিলমিল,
“কেন এমন করছেন? একটা ছোট্ট নিষ্পাপ প্রাণটার সাথে আপনার কিসের এত শত্রুতা? ও তো আপনারই রক্ত, আপনারই সন্তান! বাচ্চা নিয়ে এত সমস্যা কিসের আপনার?”
ঝিলমিলের দিকে না তাকিয়েই বারিশ থমথমে কিন্তু বরফের মতো শীতল গলায় বারিশ বলল,
“তুমি এখনও আমাকেই মন থেকে ভালোবাসতে পারোনি। এখনও তোমার পুরো পৃথিবী জুড়ে আমি হতে পারিনি। আর এর মধ্যে যদি ওই বাচ্চাটা আসে, তখন তোমার সমস্ত ভালোবাসা, সব খেয়াল তো চলে যাবে ওর কাছে! সব ধ্যান-জ্ঞান ওকে ঘিরে হয়ে যাবে! আমাকে তখন পাত্তাই দেবে না, একদম ছুড়ে ফেলে দেবে। আমার অস্তিত্বকে ডিঙ্গিয়ে অন্য কেউ তোমার হৃদয়ে রাজত্ব করবে---এটা তো আমি জীবন্ত থাকতে হতে দেব না! এমনকি নিজের রক্তকেও না!"
ঝিলমিল স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন মুখের সব ভাষা হারিয়ে ফেলেছে সে। অবিশ্বাস্য চোখে লোকটার কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কোনোমতে বলল,
“শুধুমাত্র আমি আমাদের বাচ্চাকে ভালোবেসে ফেলব বলে আপনি তাকে পৃথিবীতে আসার আগেই মে”রে ফেলবেন? আজ হোক বা কাল, সন্তান তো একদিন আমাদের জীবনে আসবেই! তাহলে এখন কেন নিজেরই অনাগত সন্তানকে এভাবে খু”ন করতে চাইছেন?”
ঝিলমিলের প্রশ্নে এবার ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল বারিশ। তার চাহনিতে কোনো দ্বিধা নেই।
“বাচ্চা অবশ্যই আসবে... তবে এখন না। যেদিন বুঝব তোমার শরীর আর মন কেবল আমার নেশায় বুঁদ হয়ে আছে, সেদিন আমি নিজে তোমার গর্ভে আমার সন্তান দেব। তার আগে না…”
ঝিলমিলের চোখ বেয়ে পানি ঝরে পড়ল। ভাঙা গলায় বলল,
“ও আপনার র*ক্ত! কীভাবে বলছেন এগুলো?”
বারিশের চেহারায় কোনো পরিবর্তন হলো না। ঝিলমিলের চোখের পানির দিকে এক নজর তাকিয়ে বিদ্রুপের সুরে বলল,
“যে আসেইনি তার জন্য এখনই চোখের জল ফেলছ? তাহলে দেখো, আমার ধারণাই সঠিক। যাকে তুমি এখনও চোখেই দেখোনি, তার জন্য আমার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছ? এই পিছুটানটাকেই আমি শেষ করতে চাইছি।”
“আপনি একটা পি*শাচ! অন্ধ হয়ে গেছেন আপনি! কিন্তু আমি আমার শরীরের একটা অংশকে এভাবে আপনার এই নোংরা মানসিকতার বলি হতে দেব না! আপনি মা*রতে চাইলে আমাকে মে*রে ফেলুন, কিন্তু আমি এই নিষ্পাপ প্রাণটাকে কিছুতেই শেষ করতে দেব না!”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল বারিশ।
“হতাম না এত নিষ্ঠুর, যদি না তুমি আমায় ভালোবাসতে! কিন্তু তুমি তো আমার সঙ্গে ছলনা করেছ! কথা ক্লিয়ার---আগে আমায় ভালোবাসবে, তারপর সন্তান আসবে।”
ঝিলমিলের মগজ যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। এ কেমন অস্বাভাবিক জেদ! একজন মানুষ কীভাবে নিজের রক্তের বিরুদ্ধে এতটা অন্ধ, এতটা হিং”স্র যুক্তি দাঁড় করাতে পারে? কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলতে চাইল ঝিলমিল,
“আমি... আমি আপনাকে ভালোবাসি…”
“এই শব্দটা অন্তত তোমার মুখে মানায় না!"
ঝিলমিল মুহূর্তেই বুঝে গেল এই পিশাচের সামনে যুক্তি, আকুতি দেখিয়ে লাভ নেই। তার মাতৃত্ব, তার অনাগত সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য তাকে এখন ঠাণ্ডা মাথায় চাল চালতে হবে। নিজেকে কোনোমতে ধাতস্থ করল সে। চোখের পানি মুছে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নরম, শান্ত গলায় বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আপনার কথাই শুনব। আপনি যা চান তাই হবে... তবে এখানে না। আমাকে বাংলাদেশে নিয়ে চলুন। এই পরিবেশে, এভাবে থাকলে এই বাচ্চাটার সাথে সাথে আমিও ম*রে যাব।”
বারিশ নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল,
“আমরা এখান থেকে কানাডায় যাচ্ছি।”
ঝিলমিল চমকে উঠে শুধাল,
“কানাডা? কেন?”
“ওখানেই থাকব।”
ঝিলমিলের বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল।
“আমার একটা কথা অন্তত রাখুন! প্লিজ, আমাকে বাংলাদেশে নিয়ে চলুন... একবার বাংলাদেশে চলুন, প্লিজ!”
বারিশ মেয়েটার মুখপানে তাকিয়ে আরেকবার দীর্ঘশ্বাস টানল।
———
আলো মুছে গিয়ে বাংলাদেশের কুয়াশাচ্ছন্ন সাঁঝের আঁধার নামছিল শেহরিয়ার ভিলায়। ড্রয়িংরুমে গরম নাশতার ধোঁয়া। সন্ধ্যাটা স্নিগ্ধ হলেও ঘরের ভেতরের পরিবেশ বিষণ্ণ। চা-নাশতার টেবিলে বসে আছেন চঞ্চল সাহেব। পাশে বসে নিঃশব্দে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে মেহরাজ। কিন্তু কারো মুখেই কোনো চঞ্চলতা নেই। চঞ্চল সাহেবের কপালে জমে থাকা দুশ্চিন্তার ভাঁজগুলো কুয়াশার মতোই বেশ গাঢ়। বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধতার পর কাপটা নামিয়ে রেখে মেহরাজের দিকে তাকিয়ে চঞ্চল সাহেব বললেন,
“আমার মনে হয় বারিশকে বিদেশের কোনো হসপিটালে নিয়ে যাওয়া উচিত। আর কতদিন ওকে এভাবে ফেলে রাখব?”
মেহরাজ চায়ের কাপে আঙুল বোলাতে বোলাতে বেশ স্বস্তির সুরেই বলল,
“না না, তার কোনো দরকার নেই। এখন দেশেই তো ভালো চিকিৎসা হচ্ছে। দেখা যাক না আর কয়েকটা দিন, কী হয়।”
“নাহ মেহরাজ! এসব বলে বলেই তো এতদিন ধরে ওকে এখানে রেখে দিয়েছি।” চঞ্চল সাহেবের গলায় উদ্বেগ উপচে পড়ল,
“ও আমার ছোট ছেলে! ওর যদি কিছু হয়ে যায়, আমি কোনো ভাবেই মানতে পারব না! আমি কাল সকালেই বড় ডক্টরের সাথে কথা বলব।”
মেহরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গলার স্বরটা একদম ভারাক্রান্ত করে আনল,
“ডক্টরের সাথে কথা যা বলার, আমিই বলে নেব। আসলে ওর জন্য আমিও বড্ড চিন্তায় আছি। আমার একমাত্র ছোটবেলার বন্ধু! ওর কিছু হলে আপনার মতো আমিও কি সইতে পারব? আমিও তো মনেপ্রাণে চাই ও দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুক…রাতে ওর চিন্তায় আমার ঘুম হয় না। কবে ঠিক হবে, দুজন মিলে আড্ডা দেব, ঘুরতে বের হব…ঠিক মতো খেতে পর্যন্ত পারি না…ওর পছন্দের খাবার গুলো দেখলেই আমার চোখে পানি চলে আসে।”
“ আমার জানা মতে এমন কোনো খাবারই নেই, যেটা ওর পছন্দ।”
মেহরাজ কেশে উঠল। একটু বেশিই বলে ফেলেছে। সে কথা ঘুরিয়ে কিছু বলতে চাই তবে তার আগেই, সদর দরজার কাছে এক পরিচিত তরুণীর করুণ আকুতি ভেসে এল,
“বাবা…”
মুহূর্তের মধ্যে চঞ্চল সাহেব, মেহরাজ, শিউলি বেগম আর ঝর্ণা সকলেই একসাথে দরজার দিকে তাকালেন। কিন্তু দরজায় যা দেখলেন, তা দেখে উপস্থিত সবার শরীর দিয়ে যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল! সকলেরই চোখ কপালে উঠে গেল। আর মেহরাজ পুরো সাত আসমান থেকে টকপে পড়ল। দরজায় দাঁড়িয়ে একেবারে সুস্থ-সবল, জ্যান্ত বারিশ! কিন্তু বারিশ তো দীর্ঘদিন ধরে হসপিটালে আইসিইউতে কোয়ায়! চঞ্চল সাহেব সহ সকলে বাকরুদ্ধ, স্তব্ধ! মেহরাজের চোখের মনি গোল গোল হয়ে যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম! মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের সমস্ত রক্ত চুষে নিল কেউ, মুখমণ্ডল লাল-চে হয়ে আতঙ্কে জমে গেল। হাঁপাতে হাঁপাতে তোতলাতে লাগল সে,
“ব-ব-ব-ব... বারিশশশ?!”
পুরো ড্রয়িংরুমের জুড়ে নিথর নীরবতা। সবাই যেন পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ঝিলমিল একছুটে ঘরের ভেতর ঢুকে চঞ্চল সাহেবের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। কান্নারত গলায় বলল,
“বাবা... বাঁচান! আপনার ছেলে আমার অনাগত সন্তানকে মেরে ফেলতে চাইছে! ও এখনও দুনিয়াতেই আসেনি, আর ও তাকে সরিয়ে দিতে চাইছে! পাগল হয়ে গেছে আপনার ছেলে! দয়া করে ওকে থামান বাবা, প্লিজ!”
ঝিলমিলের এই অদ্ভুত কথায় ঘরের সবার মাথার ওপর দিয়ে যেন কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেল! চঞ্চল সাহেব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একনজর কান্নারত ঝিলমিলকে দেখে, তারপর শক্ত নজরে মেহরাজের দিকে তাকালেন। থমথমে গলায় প্রশ্ন করলেন,
“মেহরাজ! তুমি না কিছুক্ষণ আগেই বললে হসপিটালে বারিশকে দেখে এসেছ?”
মেহরাজের বুক তখন দড়াম দড়াম করে পিটছে। কপালে ঘাম জমে উঠেছে। সে চোখ-মুখ খিঁচে দ্রুত ওপর-নিচ মাথা নেড়ে উল্টোপাল্টা বকে উঠল,
“হ্যাঁ! অবশ্যই! আমি নিজ চোখে দেখে এসেছি! এটা নিশ্চিত কোনো ভূত! প্রে*তাত্মা ছাড়া আর কিছুই না!”
দরজা থেকে ধীর পায়ে ভেতরে আসতে আসতে বারিশের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল উপহাসের হাসি।
“নাটকটা বন্ধ কর... আর এতদিন ধরে এই চমৎকার নাটক চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমি তোর কাছে টানা তিনদিন কৃতজ্ঞ থাকব। সারাজীবন থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
মাথার রগ লাফাতে লাগল মেহরাজের। অপমানে ইচ্ছে করছিল এখনই গু’কি বারিশের মাথাটা উড়িয়ে দিতে! একটু আগেও সে সবাইকে কত সুকৌশলে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলছিল, আর এখন এক সেকেন্ডে সবার সামনে সে উন্মোচিত হয়ে গেল! অপমানের চোটে মেহরাজ ঘর থেকে সটান বেরিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু চঞ্চল সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠ বজ্রের মতো গর্জে উঠল,
“কেউ কোথাও যাবে না! মেহরাজ, দাঁড়াও ওখানে!”
মেহরাজ পায়ের গতি থামিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঝিলমিল চঞ্চল সাহেবের জামা আঁকড়ে ধরে আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,
“বাবা, প্লিজ আপনি কিছু করুন! আপনার ছেলেকে একটু বুঝিয়ে বলুন... উনি যা করতে চাইছে সেটা পাপ! অনাগত প্রাণকে এভাবে মেরে ফেলা অপরাধ!”
কথাটা শেষ হতে না হতেই বারিশ এক পা এগিয়ে এসে ঝিলমিলের এক হাত শক্ত মুঠোয় ধরে নিজের দিকে এক হেঁচকা টান মারল। তার নিরেট বরফশীতল গলায় শোনালো,
“এসব দুর্বল ভাবনা নিয়ে যদি বাংলাদেশে এসে থাকো, তবে ভুল করছ। আমি আমার সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও সরব না।”
পরিস্থিতির ভয়াবহতা না বুঝতে পেরে চঞ্চল সাহেব কড়া চোখে ছেলের দিকে তাকালেন,
“কীসের সিদ্ধান্ত? কীসের কথা বলছে ঝিলমিল?”
ঝিলমিল চোখের পানি মুছে কাঁপতে থাকা আঙুলে বারিশকে দেখিয়ে বলল,
“উনি আমাদের নিজের সন্তানকে মেরে ফেলতে চাইছেন বাবা! অ্যা"বরশন করাতে চাইছেন!”
চঞ্চল সাহেব স্তম্ভিত হয়ে বারিশের দিকে তাকালেন। বারিশ কেমন করে যেন নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
"আমি আমার মায়ের মতো মানুষকে খুব ভয় পাই, বাবা! আমি কোনোদিনই চাইনা আমার স্ত্রী, তোমার স্ত্রীর মতো হোক। কোমায় থাকার নাটক করে আমি এতদিন ওর আশেপাশেই ছিলাম; শুধু এটা দেখার জন্য যে, ও-ও আমার মায়ের মতো নিকৃষ্ট কি না! কিন্তু আমি যা ভেবেছিলাম তাই হলো... আমি ওর ভেতরে ঠিক সেই তার আচরণগুলোই দেখতে পেয়েছি, যাকে আমি জীবনের সবথেকে বেশি ঘৃণা করি। তাই যতদিন না ও আমাকে মন থেকে ভালোবাসবে, ততদিন আমাদের দুজনের মাঝে অন্য কেউ আসবে না। আমাদের কোনো সন্তানও না!"
সকলে রেসপন্স করিয়েন। আগামী পর্বে দীঘি তাহসিনও থাকবে। বাংলাদেশে তো চলে এলাম। লন্ডনে কে কেমন ছবি তুললেন, কমেন্টে দিয়ে যাবেননন।
চলবে…