ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে

৪৬তম পর্ব

লেখক: আয়েশা শেখ
#শুকনো_পাতার_নূপুর_পায়ে 
#আয়েশা_রিন 
#পর্ব৪৬

[কপি ও রিপোস্ট করা থেকে বিরত থাকবেন]

“তাহলে আমার কাছে ওকে কেন ফেলে রেখেছ? আমি ওর কোনো দায়িত্ব নিতে পারব না, আমি ওকে পালতে পারব না!”

“ ইরান! নিজের লিমিটের মধ্যে থাকবি!”

“ পারব না! আমি ওকে পালতে পারব না! ও একটা…” নিজে থেকেই থেমে গেল ইরান।

তাহসিনও কোনো জবাব দিল না। ক্ষোভ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল শুধু। দুজনের চিৎকারে অবুঝ দিগন্ত থরথর কেঁপে উঠছে বারংবার। ভয়ে সে আরও শক্ত করে চেপে ধরল বাবার গলা। ইরান সব সময় এমন করে, সুযোগ পেলেই বাচ্চার ওপর নিজের সব ক্ষোভ উগরে দেয়। তা তাহসিনও খুব ভালো করেই জানে।

তাহসিন ছেলেকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে ঝাপটে ধরে তার গাল, কপাল আর মাথায় এক নিঃশ্বাসে পর পর কয়েকটা চুমু খেল। তারপর বিছানায় দাঁড় করিয়ে পকেট থেকে কয়েকটা চকলেট বের করে বাচ্চার ছোট্ট হাতের তালুতে দিয়ে হেসে বলল,
“আমার সোনা বাবাটা অনেক স্ট্রং, তাই না? ইউ আর মাই প্রাউড, মাই লিটল বয়!”

দিগন্ত কান্নাভেজা গলায় বলে উঠল,
“বাবা যাবে না... বাবা আর যাবে না!”

​তাহসিন বুকের ভেতর আটকে থাকা ভারি বাতাসটা চেপে রেখে হাসার চেষ্টা করল। আলতো করে ছেলের ভেজা গাল দুটো মুছে দিয়ে কন্ঠ শান্ত রেখে বলল,
“আমি কোথাও যাইনি তো সোনা…তোমার বাবা সব সময় তোমার পাশেই আছে। সব সময় থাকবে।”

​চকলেটের কথা নিমেষেই ভুলে গেল বাচ্চাটা। হাতের মুঠো থেকে চকলেটগুলো বিছানায় ফেলে দিয়ে আবার ঝাপটে এসে উঠে পড়ল তাহসিনের কোলজুড়ে। কচি মাথাটা বাবার কাঁধে গুঁজে দিয়ে আধভাঙা ভাষায় হাজারটা কথা বলে যেতে লাগল। তাহসিনও খুব মন দিয়ে ছেলের প্রতিটা আধো কথার জবাব দিচ্ছে, তাল মিলিয়ে মাথা নাড়াচ্ছে। যেন বাবা আর তার আড়াই বছরের ছেলে পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি কোনো আলাপ নিয়ে মগ্ন হয়ে আছে।

​ইরান তখনও ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে। চোখে তার জমানো জল ছলছল করছে, অথচ মুখে একগুঁয়ে জেদ। আচমকা অতীতে তলিয়ে গেল সে। স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল তাদের সেই সংক্ষিপ্ত সুখী পরিবারের ভাঙনের দিনগুলো… যা ঝড়ের বেগে ধূলিসাৎ হয়ে হারিয়েও গেছে।

------------

সেদিন তুরান উঠানে ঝাঁড় দিচ্ছিল। উঠানের একপায়ে ঝরে পড়া শুকনো পাতাগুলো জড়ো করতেই, হঠাৎ বাড়ির প্রধান দরজা দিয়ে অচেনা দুজন মহিলা আর একজন পুরুষ ভেতরে ঢুকলেন। তাঁদের পরনের দামি পোশাক আর পরিপাটি চালচলন দেখেই বোঝা গিয়েছিল শহর থেকে এসেছেন। ​সামনে এসে প্রথম মহিলাটি বেশ কৌতুহল নিয়ে বললেন,
“তুমি বুঝি এ বাড়ির মেয়ে?”

​মহিলার কথায় তুরান সোজা হয়ে দাঁড়াল। চট করে মাথার খসে পড়া ওড়নাটা টেনে মাথায় তুলে দিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“জ্বী!”

​মহিলাটি আরেকটু এগিয়ে এলেন তুরানের দিকে। পেছনের অন্য দুজনও ধীরপায়ে কাছে এসে দাঁড়ালেন। মহিলাটি বেশ মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
“নাম কী তোমার?”

​উত্তরে তুরান বলে,
“তাসনিম সুনাইরা তুরান।”

​অচেনা অতিথিরা থমকে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ তুরানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁদের চোখে এক অদ্ভুত জহুরির দৃষ্টি। তুরান একটু ইতস্তত করে কৌতুহলী গলায় শুধায়
“আপনারা কারা? মানে... আমাদের কোনো আত্মীয় লাগেন?”

​তারা সে কথার উত্তর এড়িয়ে উল্টো জিজ্ঞেস করলেন,
“কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?”

“কলেজের প্রথম বর্ষ।”

​ঠিক তখনই ঘর থেকে বের হতে হতে ইরান বলে উঠল,
“আপা, কার সাথে কথা বলছিস? কে এসেছে রে?”

​ইরানও চিনতে পারল না অচেনা অতিথিদের। বাড়ির বড়রা তখন কেউই ঘরে ছিল না। রান্নাবান্না শেষ করে সবাই খামারের দিকে গেছেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ইরান আর দেরি করল না, দ্রুত খামারের দিকে দৌড়ে গিয়ে তাদের ডেকে নিয়ে আসে। অতিথিদের বসার ঘরে বসিয়ে নাস্তা-পানির ব্যবস্থা করা হয়।

​প্রথম দিকে তুরান ব্যাপারটাকে একদম সাধারণ ভেবে স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু বসার ঘরে দীর্ঘ আলোচনার পর যখন আসল সত্যিটা জানতে পারে, তখন তুরানের মাথার ওপর যেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশ ভেঙে পড়ল!

​লোকগুলো এসেছে তুরানকে তাদের বাড়ির বউ করে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিতে। পাত্র শহরের নামজাদা বংশের, লাখো গুণী ছেলে। কিন্তু তুরানের কাছে এই প্রস্তাব মেনে নেওয়া মানে জীবন্ত সাগরে ডুবে ম/রা! সে তো একটু বুজ হওয়ার পর থেকেই নিজের এক অঘোষিত গোপনে জড়িয়ে আছে। নিজের অজান্তেই কখন যে বুকের ভেতর বড় হতে থাকা ভালোবাসাটা সে তার চাচাতো ভাইয়ের পায়ে সমর্পণ করে দিয়েছে, তা সে নিজেও জানে না। কবে থেকে যে প্রতিটা ওয়াক্তের নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে অঝোর ধারায় কেঁদে সে কেবল ওই একটা মানুষকে খোদার কাছে চেয়েছে... তার কোনো হিসাব নেই। এত প্রেম, এত ব্যাকুলতার পর অন্য কোনো অচেনা পুরুষের সাথে একটা পুরো জীবন কাটাবে কী করে সে? ​ভাবতেই তুরানের দম আটকে আসে। মেয়েটা এমনিতেই বড্ড কাঁচা স্বভাবের, অল্পতেই দিশেহারা হয়ে পড়ে। আজও তাই হলো। আগুপিছু না ভেবেই, বসার ঘরে মেহমানদের রেখে সে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে ধুপ করে দরজা আটকে দেয়। অজু করে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়াল দু-রাকাত নফল নামাজে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ আর বাঁধন থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলে অঝোরে কাঁদতে লাগল।

​কিছুক্ষণ পর ইরান ঘরে ঢুকে বোনের এই করুণ অবস্থা দেখে চমকে উঠে বলে,
“তুই এভাবে কাঁদছিস কেন আপা? কী হয়েছে তোর?”

​তুরান চোখ-মুখ লাল। কান্নার তোড়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“তুই... তুই তো সব জানিস…”

​ইরান বোনের কাঁধে হাত রেখে বোঝানোর চেষ্টা করল,
“আরে ধুর! মেহমানরা দেখতে এসেছে বলেই কি বিয়ে হয়ে যাচ্ছে?”

“বাবা রাজি হয়ে যাবে ইরান!” তুরান চোখের জল মুছতে মুছতে ভেজা গলায় বলল। ​তুরানের বিশ্বাস ভুল নয়। কিছুক্ষণ বসার ঘরে আড়ি পেতে সুলতান সাহেবের চোখের চকচকে ভাব আর মেহমানদের খাতিরদারি দেখেই সে বুঝে গেছে---তার বাবা এক পায়ে রাজি।
.
.

তুরানের মা প্রস্তাবে রাজী না, অথচ তুরানের বাবা সুলতান সাহেব আর তাঁর বড় ভাই-ভাবী সবাই একপায়ে খাঁড়া। তুরানের মা চান তাঁর মেয়েটা অন্তত পড়াশোনাটা শেষ করুক। ​রাতে খাবার টেবিলে এগুলো নিয়ে কথা হচ্ছিল,
“বয়সটাই বা কত মেয়েটার? এই তো সেদিন আঠারোতে পা দিল! পড়াশোনা করুক না আরও! এই যুগে এত অল্প পড়াশোনার দাম আছে?”

​স্ত্রীর কথা শুনে সুলতান সাহেব বোঝানোর চেষ্টা করলেন,
“আহা, তারা তো শহরের বেশ নামীদামী মানুষ। তুরানকে কি তারা পড়ালেখা করাতে মানা করবে? নিশ্চয়ই করাবে। আর তা ছাড়া গ্রামে আমরা এখন যে ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি... কাল কী হয় কেউ জানে না। শ/ত্রুর দল এসে কখন বাড়িঘরে আ/গুন ধরিয়ে দেয় তার ঠিক আছে? তখন মেয়েকে বিয়ে দেব কীভাবে? হতেও তো পারে শহরে আত্মীয় হলে তারা আমাদের এই ঝামেলা থেকে মুক্তও করতে পারবে।”

“তাই বলে এইটুকু বয়সে মেয়েটাকে পরের বাড়ি ঠেলে দেব? আর তুরানও তো রাজী না। সকাল থেকে না খেয়ে ঘরে একা একা কেঁদে ভাসাচ্ছে!”

​সুলতান সাহেব স্ত্রীকে খুব ভালোবাসেন, তাঁর মুখের ওপর কড়া কথা বলতে পারেন না। ঝগড়া বাড়াতে চান না বলে তিনি চুপ হয়ে গেলেন। কিন্তু থামলেন না সুলেমান সাহেব। তুরানের বড় চাচা। গ্রাম্য মাতব্বর গোছের মানুষ তিনি, এমন রাজকীয় ঘর থেকে সম্বন্ধ এসেছে শুনে তাঁর মুখে যেন হাসির ফোয়ারা ফুটছে। কে না চায় নিজের বাড়ির মেয়ে এত বড় ঘরে গিয়ে রানী হয়ে থাকুক! তার মুখের ওপর তুরানের মা কোনো কথা বলতে পারল না।

​সবাই যার যার ঘরে চলে যাওয়ার পর তুরানের মা ফোন লাগালেন সীমান্তকে। তুরান আর ইরানের চাচাতো ভাই, যে এখন শহরে পড়াশোনা করছে।
“সীমান্ত! তুই কিছু একটা কর বাবা! তোদের এই সংসার সামলাতে গিয়ে আমার নিজের পড়ালেখা শেষ হয়েছে। আমি আমার মেয়েটার সাথে এই অন্যায় হতে দেব না। একবার সংসারে আটকে গেলে কোনো মেয়ের আর পড়াশোনা হয় না রে, সব হারিয়ে যায়!” 

মাত্র এসএসসির গণ্ডি পার হতেই বাপের কথায় বিয়েতে বসতে হয়েছিল তাঁকে। তারপর থেকে সংসারের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে কেটে যায় তার পুরো জীবন। বইয়ের পাতাগুলো ছোঁয়ার ইচ্ছা সেদিনই ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। তিনি নিজের সাথে হওয়া এই অন্যায় নিজের পেটের দুই মেয়ের সাথে কিছুতেই হতে দেবেন না! দরকার হলে সারা দুনিয়ার সাথে লড়বেন, তবু তুরানের ভবিষ্যৎ এভাবে অন্ধকারে তলিয়ে যেতে দেবেন না। কারণ নিজের সাথে এমন হয়েছে মানে তার মেয়েদের সাথেও হবে। এমনটাই ভাবেন তিনি। 

​সীমান্তের কণ্ঠ মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠল। রাগে চ্যাঁচামেচি করে বলল,
“কারা কোত্থেকে উড়ো খবর নিয়ে এসে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে, আর তাতেই সবাই এমন পা/গল হয়ে গেল কেন? মাথা খারাপ হয়ে গেছে সবার?”

“সেটা তুই এসে তোর বাবা-চাচাকে বোঝা সীমান্ত! তুই ছাড়া এই বাড়িতে ওদের থামানোর সাধ্য কারও নেই। আমার মেয়েরা যত দূর ইচ্ছে পড়বে, ওদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াবে। তারপর ওদের ইচ্ছা হলে বিয়ে করবে, না হলে নাই!”

​সীমান্ত আশ্বাস দিল তাকে,
“ঠিক আছে চাচী, তুমি শান্ত হও। আমি কাল ভোরের ট্রেনেই বাড়ি আসছি। দেখি কে তুরানের বিয়ে দেয়!”

----------

“আমি ওকে রেখে যাচ্ছি। ফারদার ওর গায়ে হাত দিলে খোদার কসম, তোর হাত আমি কব্জি থেকে কে//টে দেব!”

তাহসিনের গম্ভীর কণ্ঠের ধাক্কায় ইরান স্মৃতি থেকে আচমকা বাস্তবে ফিরে এল। সে চমকাল, তবে তাহসিনের হু/মকিতে নয়। চমকাল সে নিজের ভাবনাগুলো এভাবে হঠাৎ থমকে যাওয়ায়। তাহসিন কোল থেকে ঘুমন্ত দিগন্তকে বিছানায় আস্তে করে শুইয়ে দিতে দিতে কথাগুলো চাপা স্বরে বলল।

ইরান আবারও জেদি গলায় বলল,
“তোমার র//ক্ত কি ও একাই? আর কেউ ছিল না? ও একাই তোমার আপন?”

“তোকে কেউ আ/ঘাত করলে যেমন আমি তার হাত কে//টে ফেলব, তেমনি ওর গায়ে হাত তুললেও আমি তোর হাত কে//টে নেব। বুঝতে পেরেছিস?” দিগন্তর কপালে শেষবারের মতো চুমু খেল তাহসিন। তারপর নেমে এসে ইরানের খুব কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল।
“আমি তোকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছি ইরান... ও আমার সন্তান!”

“অবৈধ…” সত্যটা যেন মুখে ছুঁড়ে মারল ইরান।

যুবকের নীলাভ চোখের মণিতে আগুন জ্ব//লে উঠল। এক ঝটকায় সে ইরানের চোয়াল চেপে ধরল আঙুলের কঠিন বাঁধনে। চেহারাটা কাছে এনে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ডোন্ট ইউ ড্যার রিপিট দিস এগেইন, ইরান! নেভার! আরেকবার এই নোংরা শব্দ আমার সামনে উচ্চারণ করলে তোর জি/ব টেনে ছিঁ//ড়ে ফেলব!” বলেই দীর্ঘ পদক্ষেপে চলে গেল তাহসিন।

-------------- লেখিলার পেইজ নেইম Ayesha Rin—রিন 

বারিশ চিরকুটগুলো একে একে গুনে একপাশে রাখল। একশোরও বেশি হবে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক থমথমে, অদ্ভুত হাসি। হঠাৎই ​প্রথম চিরকুটটা তুলে নিয়ে ঝিলমিলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ভারি গলায় বলল,
“পড়ে শোনাও।”

​তরুণী থমকে গিয়ে হাতের চিরকুটটার দিকে তাকায়। বুকটা ধক করে উঠে তার। অস্বস্তি চেপে বলল,
“কেন?”

​বারিশ কথা না বাড়িয়ে ঝিলমিলকে এক টানে ঘুরিয়ে নিজের দিকে টেনে নিল। ঝিলমিলের পিঠটা ঠেকল যুবকের বুকের সাথে। মেয়েটার ঘাড়ে বারিশ নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল,
“শুনব।”

আতঙ্কে দুলতে লাগল ​মেয়েটার বুক। এই থমথমে মানুষটার গতিবিধি একেবারেই বোঝার বাইরে। কাঁধের ওপর লোকটার থুতনির স্পর্শে গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল তার। 
“মানে! এসব লেখা শুনে আপনি এখন কী করবেন?”

​বারিশের মুখের ভঙ্গিতে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ঘটল না। যেন খুব স্বাভাবিক একটা আবদার করেছে সে। অতীব শান্ত গলায় ঝিলমিলের কানে কানে বলল,
“কী এমন লেখা আছে যা আমি শুনতে পারব না?”

​ঝিলমিল ব্যাকুল কণ্ঠে নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে,
“দেখুন... এসব তো আমি অনেক আগে এমনি এমনি লিখেছিলাম। তখন আমি অত কিছু বুঝতাম না, তখন আমি…”

​কথা শেষ করতে দিল না বারিশ। একহাতে ঝিলমিলের কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে, তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। নিজের নাকটা  ছুঁইয়ে দিল ঝিলমিলের নাকে। একদম কাছাকাছি, শ্বাসের সাথে শ্বাস মিশিয়ে ধীর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“পড়ে শোনাতে বলেছি।”

শান্ত স্বরে বললেও পুরুষটির কন্ঠে উপচে পড়ছে হু/মকি! ​ঝিলমিলের গলা শুকিয়ে কাঠ। আকুতি ঝরে পড়ল কণ্ঠে,
“প্লিজ...!”

​মুহূর্তের মধ্যে বারিশের আঙুলের প্রচণ্ড চাপ অনুভব হলো ঝিলমিল নিজের বাহুতে। চাপটা যত বাড়ছিল, বারিশের চেহারার শান্ত ভাবটা ততটাই ভীতিপ্রদ লাগছিল। ঝিলমিল যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে দ্রুত বলল,
“শোনাচ্ছি! আমি পড়ে শোনাচ্ছি!”

​বলেই বারিশের এমন দমবন্ধ করা বন্দিদশা থেকে খানিকটা সরে আসতে চাইল তরুণী। কিন্তু বারিশ ইঞ্চিপরিমাণও সরতে দিল না। কোনো বাড়াবাড়ি করল না, টু শব্দটিও করল না। শুধুমাত্র হাতের বাঁধন আর বরফশীতল চাহনি দিয়েই বুঝিয়ে দিল, ওকে এভাবেই, এত কাছাকাছি থেকেই প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করতে হবে। ​ঝিলমিল কাঁপাকাঁপা হাতে চিরকুটটার দিকে তাকাল। আড়চোখে একবার চিরকুটের হরফগুলোতে চোখ বুলিয়ে ভয়ে ভয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
— জারিফ আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা... আমার সমস্ত প্রার্থনা, সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে শুধু সে-ই আছে…

​প্রতিটা বাক্য উচ্চারণের সাথে সাথে ঝিলমিলের মনে হচ্ছিল বি/ষপান করছে সে, দম আটকে আসছে তার। যেন এখনই পায়ের নিচের মেঝেটা দু-ফাঁক হয়ে যাক আর সে মাটির নিচে তলিয়ে যাক! এত বি/ষাক্ত আর জ/ঘন্য অতীতে মুখ গুঁজে বেঁ/চে থাকার দরকার নেই।

​বারিশ চোখ বন্ধ করল। নাকের সাথে নাক ঠেকানো অবস্থাতেই ওর ঠোঁটের কোণে কেমন একটা বিকৃত হাসি খেলে গেল। অতিমাত্রিক এই নীরব ব্যাকুলতা যেন সে উপভোগ করছে।
“তারপর? পরেরটা পড়ো…” পুরুষটির শান্ত নির্দেশ ভেসে এল।

​একে একে একশোরও বেশি চিরকুট শেষ করতে হলো ঝিলমিলকে। প্রতিটা পাতা, প্রতিটা বাক্য মুখে আনা আর জারিফের নাম ধরে বিষোদগার করে যাওয়া, ঝিলমিলের কাছে মনে হচ্ছিল সে নিজের হাতে নিজের কলিজা ছিঁড়ে নিজেই গিলছে। আর বারিশ চোখ বন্ধ করে পরম শান্তিতে সেই কলিজার স্বাদ উপভোগ করছে।

শেষ চিরকুটটা পড়া শেষ হতেই বারিশ আলতো করে মেয়েটার কপালে গভীর একটা চুমু খায়। কোনো ভালোবাসার উত্তাপ নেই চুমুতে, আছে কেবল বিজয়ের শীতল ছোঁয়া। তারপর ধীরে ঝিলমিলকে টেনে নিয়ে বসিয়ে দিল পড়ার টেবিলের চেয়ারটায়। টেবিলের ড্রয়ার খুলে কিছু নতুন রঙিন কাগজ আর একটা কলম ঝিলমিলের কাঁপা কাঁপা হাতের মুঠোয় ধরে দিয়ে বলল,
“এবার আমার জন্যেও কিছু লেখো।”

হতবাক হয়ে গেল ঝিলমিল। লোকটার চেহারার নিশ্চুপ কাঠিন্য দেখে অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,
“কী বলছেন এসব? কী লিখব আমি?”

“যা মাথায় আসে।” বলতে বলতে পাশে থাকা অন্য চেয়ারটা টেনে বারিশ নিজেও খুব শান্ত ভঙ্গিতে বসে পড়ল। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে বাধ্য হয়ে বলল ঝিলমিল,
“আচ্ছা... লিখছি।”

“এক হাজারটা…”

ঝিলমিলের যেন পুরো শরীরে দশ হাজার ভোল্টের কারেন্ট খেলে গেল! বিস্ময়ে চোখজোড়া ছানাবড়া তার। 
“এক হাজারটা! কী এক হাজারটা?”

“চিরকুট!”

বারিশ অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঝিলমিলের মুখের ওপর নেমে আসা উস্কোখুস্কো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিতে দিতে শব্দটি উচ্চারণ করল। নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না মেয়েটা। এক ঝটকায় মাথা সরিয়ে নিয়ে বলল,
“আপনি আসলেই একটা সা/ইকো! রাত বারোটার বেশি বেজে গেছে, আমার অসহ্য লাগছে, আমি এখন ঘুমাব! প্লিজ এসব ফালতু জিনিস বন্ধ করুন! আমারই ভুল হয়েছে পুরনো আবর্জনাগুলো এতদিন রেখে দিয়ে, অনেক আগেই এগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া উচিত ছিল!”

বারিশের চেহারায় ঝিলমিলের এইসব ক্ষোভের একটু প্রতিক্রিয়াও ফুটে উঠল না। সে যেন অন্য জগতে বাস করছে। খুব নিচু অথচ আদেশসূচক গলায় ফের বলল,
“রাইট।”

“লিখব না আমি! আপনার মতো আমার মাথা খারাপ হয়নি! কী হয় মাঝে মাঝে আপনার, বলবেন? আমার না হয় ভুল হয়েছে এসব ফেলে না দিয়ে, তাই বলে তার শাস্তি এক হাজারটা চিরকুট লিখতে হবে? এটাও কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব? আমি কিন্তু সবাইকে সব বলে দেব!”

বারিশ এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে ঝিলমিলের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে নিজে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। টান মেরে ঝিলমিলকেও দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল,
“চলো।”

ঝিলমিল থমকে গিয়ে তোতলাল,
“ক—কোথায় যাব?”

“সবাইকে বলবে না? চলো, এখনই চলো।”

হিম হয়ে গেল ঝিলমিলের বুকের ভেতর। তড়িঘড়ি করে বারিশের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। কাঁপা হাতে বারিশের গালে হাত রেখে ব্যাকুল চোখে বলল,
“না না! প্লিজ এমন করবেন না! এগুলো বাড়ির সবাই দেখলে কী ভাববে আমার সম্পর্কে? প্লিজ ছেড়ে দিন আমাকে! আমি সত্যি বলছি, আপনাকে ছাড়া আমি আমার জীবনে আর কাউকে ভালোবাসি না, বাসবও না!”

“তাহলে কলমটা চালাও।” বারিশ আবার সেই একই জায়গায় ফিরে এল। ঝিলমিলকে আবার খুব শান্তভাবে চেয়ারের ওপর বসিয়ে দিল। বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল ঝিলমিল। ঠিক কী বলে লোকটাকে শান্ত করা যায় ভেবে পাচ্ছে না সে। কাজ করা বন্ধ করে দিল বুঝি। বারিশ এবার ঝিলমিলের চোখের একদম গভীরে তাকিয়ে কলমটা তার হাতে গুঁজে দিয়ে আবার নির্দেশ দেয়,
“স্টার্ট রাইটিং।”

ঝিলমিলের আঙুলগুলো বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। ডান হাতটা থরথর করে কাঁপছে, তবুও সে বারিশের চোখের সেই স্থির, বরফশীতল চাহনি এড়িয়ে কলমটা শক্ত করে চেপে ধরল। পাতলা রঙিন কাগজের ওপর পড়তে শুরু করল কালির আঁচড়।
——— ভালোবাসি আমি আপনাকে বারিশ… আমার এই পুরো জীবনে যদি কোনো একটা সত্যি থেকে থাকে, তবে সেটা আপনি। আমার সমস্ত আবেগ, অনুভূতির একমাত্র মালিক কেবল আপনি। আপনার এই খামখেয়ালি আর একগুঁয়েমি ভালোবাসাই এখন আমার সবচেয়ে প্রিয় অভ্যাস। শান্ত কোনো নদী নন আপনি, এক অতল অন্ধকার সমুদ্র। যার তীরে দাঁড়িয়ে আমি যেমন ভয়ে জমে যাই, তেমনি থমকে যাই হারিয়ে যাওয়ার নেশায়। আপনি এমন এক আগ্নেয়গিরি যার তাপে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নিশ্চিত জেনেও পেছনে ফেরা যায় না। কারণ ওই যে ভালোবাসি! পৃথিবীর সমস্ত কিছুর বিনিময়েও যদি কাউকে বেছে নিতে বলা হয়, আমি কোনো দ্বিধা ছাড়া আপনাকেই বেছে নেব। আপনাকে ছাড়া অন্য কারো উপস্থিতি আমি আমার স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি না। আপনাকে ছাড়া আমার এই অস্তিত্বের আর কোনো অর্থ হয় না। আপনি যেভাবে হোক, যেমন ভাবেই হোক আমার পাশে থাকুন। শুধু চাই আপনি আমার পাশে থাকুন।

এমন করে করেই একটানা চিরকুট লিখে গেল ঝিলমিল। রাত গভীর থেকে গভীরতর হলো, শীত বাড়ল। কিন্তু বারিশের সেই বরফশীতল জেদের কোনো শিথিলতা এল না। ক্লান্তিতে বারবার ঝিলমিলের চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল, ঘুমে টলে টলে পড়ছিল সে। আর প্রতিবারই আচমকা তন্দ্রা ভেঙে জেগে উঠে সে দেখেছে পাশে বসে থাকা বারিশ একদৃষ্টে, চোখের পলক না ফেলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই চাহনিতে ছিল কেবল নিজের হুকুম তামিল করানোর এক নির্দয় একগুঁয়েমি। বারিশ তাকে থামতে দেয়নি, লিখিয়েই ছাড়ল।

​পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ চরম ক্লান্তি আর যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে শেষ চিরকুটটায় হাত থামায় ঝিলমিল। সারা রাত জেগে, নিজের আঙুল অবশ করে বারিশকে নিয়ে এক হাজারেরও বেশি ভালোবাসার বাক্য লিখে শেষ করে সে।
------------------------------
“ভালোবাসি আমি আপনাকে বারিশ… আমার এই পুরো জীবনে যদি কোনো একটা সত্যি থেকে থাকে, তবে সেটা আপনি। আমার সমস্ত আবেগ, অনুভূতির একমাত্র মালিক কেবল আপনি। আপনার এই খামখেয়ালি আর একগুঁয়েমি ভালোবাসাই এখন আমার সবচেয়ে প্রিয় অভ্যাস।শান্ত কোনো নদী নন আপনি, এক অতল অন্ধকার সমুদ্র। যার তীরে দাঁড়িয়ে আমি যেমন ভয়ে জমে যাই, তেমনি থমকে যাই হারিয়ে যাওয়ার নেশায়। আপনি এমন এক আগ্নেয়গিরি যার তাপে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নিশ্চিত জেনেও পেছনে ফেরা যায় না। কারণ ওই যে ভালোবাসি! পৃথিবীর সমস্ত কিছুর বিনিময়েও যদি কাউকে বেছে নিতে বলা হয়, আমি কোনো দ্বিধা ছাড়া আপনাকেই বেছে নেব। আপনাকে ছাড়া অন্য কারো উপস্থিতি আমি আমার স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি না। আপনাকে ছাড়া আমার এই অস্তিত্বের আর কোনো অর্থ হয় না। আপনি যেভাবে হোক, যেমন ভাবেই হোক আমার পাশে থাকুন। শুধু চাই আপনি আমার পাশে থাকুন।”

​কানাডার নিজের আলিশান অফিস রুম বারিশের। কাঁচের বড় জানালার ওপারে বরফে ঢাকা শহর। সেই এক হাজারটা চিরকুট টেবিলের ওপর গুছিয়ে সামনে রেখেই বারিশ এখন চুপচাপ বসে আছে। ​এই দীর্ঘ ছয় মাসে বারিশ এই এক হাজারটা চিরকুট অন্তত লক্ষবার পড়েছে! প্রতিটা অক্ষর, প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা দাড়ি-কমায় যেন সে ঝিলমিলকে খুঁজতে চেয়েছিল। হ্যাঁ, আজ টানা ছয়টা মাস ধরে বারিশ আর ঝিলমিল সম্পূর্ণ আলাদা। ঝিলমিলের জীবন থেকে বারিশ নিজে থেকেই একেবারে সরে এসেছে। ​কারণ, যে মেয়েটা সেদিন চিরকুটে বারিশকে ভালোবেসে এত এত বাক্য লিখেছিল, তার লেখা প্রতিটি শব্দ বারিশের কাছে মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে! এমনকি ঝিলমিল যে তাদের মধ্যে সন্তানদের বাচিয়ে রাখতে এত লড়াই করেছিল, বারিশের বাচ্চার মা হতে চেয়েছিল সেটার পেছনেও লুকিয়ে ছিল তার কুৎসিত উদ্দেশ্য।

তবুও প্রথম চিরকুটটার একদম শেষ লাইন দুটো বারিশকে খুব ভাবায়। প্রতিবার পড়ার সময় ওর বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম মুচড় দেয়---মেয়েটা কি সত্যিই তাকে পাশে চায়? এখনও কি ঝিলমিল মনে মনে কামনা করে বারিশ ওর পাশে থাকুক? চিরকুটের শুরুর কথাগুলো তো সবই মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তার ভালোবাসার মিথ্যে নাটক, তার পেছনের সমস্ত ছলনা বারিশ নিজের চোখে দেখে এসেছে। কিন্তু এই শেষ বাক্যটাও কি মিথ্যে ছিল? 

এই একটাই প্রশ্নের উত্তর বারিশের জানা চাই। আর তার জবাব পেতে হলে তাকে আবারও বাংলাদেশে ফিরতে হবে। এমনিতেও বারিশ ঝিলমিলকে একেবারে ফেলে দিয়ে আসেনি। কানাডায় বসেও প্রতি মুহূর্তে অদৃশ্য জালে আটকে রেখেছে মেয়েটাকে, নজর রাখছে তার প্রতিটা নিঃশ্বাসে। তবে বারিশ তাকে এভাবে অন্ধ ছলাকলায় পেতে চায় না। সে চায় ঝিলমিল যাকে নিজের স্বার্থে 'ভালোবাসা' বলে মিথ্যা নাটক করেছিল, সেই অনুভূতির আসল রূপ তার ভেতরে জাগুক। ঝিলমিল বুঝুক সত্যিকারের ভালোবাসা ঠিক কতটা তীব্র, কতটা বাধ্য আর কতটা নির্মম হতে পারে!

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন