ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুকনো পাতার নূপুর পায়ে

৫০তম পর্ব

লেখক: আয়েশা শেখ
#শুকনো_পাতার_নূপুর_পায়ে 
#আয়েশা_রিন 
#পর্ব৫০

[কপি ও রিপোস্ট করা থেকে বিরত থাকবেন।]

সকালে চৌধুরী ভিলা অনেকটাই ফাঁকা। বাড়ির সবাই অফিসে চলে গেছে; কেবল নাজমা বেগম, জিহান, ইরান আর ঝিলমিল ছাড়া এই মুহূর্তে কেউ নেই বাড়িতে। দীঘি সাধারণত অনিয়মিত হলেও, আজ সেও অফিসে গেছে। বসার ঘরে বসে নাজমা বেগম মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। একটু আগেই ঝিলমিলও কথা বলেছিল তার নানুর সঙ্গে। দীর্ঘ আলাপের পর সে ইরানের রুমে গেছে।

সকালবেলা নূরজাহান চৌধুরী নির্দেশ দিয়ে গেছেন ইরান যেন ভুলেও বাড়ি থেকে বের না হয়। মেহরাজের আকস্মিক বিয়ের কথা এখনই প্রতিবেশীদের বা আশেপাশের কারও কানে যাওয়া চলবে না। এদিকে মেহরাজও ইরান ঘুম থেকে ওঠার আগেই বাসা ছেড়ে চলে গেছেন, ফলে এই নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলারও কোনো সুযোগ মেলেনি।

“ঝিলমিল, দেখ... বিয়েটা তো কোনো রকমে হয়ে গেছে, কিন্তু এভাবে তো জীবন চলতে পারে না! এতে আমার অনেক সমস্যা হয়ে যাবে। এখন তো বাসায় কেউ নেই, দয়া করে আমাকে চলে যেতে দে প্লিজ!” 

ইরানের উদ্বেগে অস্থির হয়ে বলা কথা শুনে ঝিলমিল বলল,
“তোর আবার কী এমন সমস্যা হবে? আমার চাচ্চু কি কোনো খারাপ মানুষ? কেন তুই এমন করছিস বল তো? একটু ধৈর্য ধর না, দেখিস দাদীমাও আস্তে আস্তে সব মেনে নেবেন।”

“তুই বুঝতে পারছিস না, ঝিল!” অসহায় গলায় বলল ইরান।

চোখ টিপে ঝিলমিল একটু হেসে বলল,
“তুই তো এমনিতেও আমার চাচ্চুকে মনে মনে পছন্দ করতি! আমি কিচ্ছু বুঝি না নাকি?”

ইরান বিব্রত হলো, “কারও প্রতি ভালো লাগা থাকা আর এভাবে হুট করে বিয়ে হয়ে যাওয়া দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়!”

বিরক্ত হয়ে ঝিলমিল হাত উল্টে বলল,
“উফ! আমি আর তোর এসব কথা শুনতে চাই না। তুই যদি এখন এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাস, দাদীমা আরও রেগে যাবেন। পাশাপাশি চাচ্চুও ছাড়বেন না। পরিবারে নতুন করে অশান্তি শুরু হবে। দয়া করে মাথা থেকে এসব পাগলামি বুদ্ধি ঝেড়ে ফেল তো, ইরান!”

ইরানের কপালে চিন্তার গভীর রেখা। সে ভালো করেই জানে, ঝিলমিলকে বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই; এই মেয়ে তার কোনো কথাই কান দিয়ে শুনবে না। বান্ধবীকে একটু শান্ত করতে ঝিলমিল নরম হাতে তার হাতটা ধরে বলল,
“চল, নিচে চল। কিছু মুখে দিবি।”

ইরান ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা দুপাশে নেড়ে দিল। শুকনো গলায় বলল,
“আমার খিদে নেই।”

“মিথ্যে কথা বলবি না তো! কাল রাতেও কিছু খাসনি। চল আমার সাথে…”

“বারিশ স্যার এসেছেন, জানিস?” প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইল ইরান।

বাক্যটা শোনার সাথে সাথেই ঝিলমিলের বুকটা ধক করে কেঁপে উঠল। ফর্সা মুখটা তার কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে গেল মুহূর্তে। মানুষটা এসেছে অথচ সে জানবে না? থমথমে গলায় সে জিজ্ঞেস করল,
“কে বলল তোকে এ কথা?”

“তোর চাচ্চু বলেছে।”

মুখটা আরও চুপসে গেল ঝিলমিলের। লোকটা এসেও একবারের জন্যেও তার খোঁজ নিতে এল না তার! মনে মনে সে যতই অভিমান জমিয়ে রাখুক, অবুঝ মনটা তো ঠিকই লোকটার আসার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে ছিল। অথচ তার একটুও মনে হলো না মেয়েটা কেমন আছে, তার ভেতরে থাকা ছোট্ট প্রাণগুলো ভালো আছে কি না!

বিষাদময় শ্বাস ফেলল ঝিলমিল। ভারী পায়ে রুম থেকে বের হতে হতে ম্লান গলায় বলল,
“শরীর বড় বেশি ক্লান্ত লাগছে, পরে আসছি।”

ঝিলমিল বের হতেই ইরানের মনে হলো, কথাটা বলে সে বুঝি মস্ত বড় ভুল করে ফেলল! কিন্তু এই নামটা না টানলে হয়তো ঝিলমিলের মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে পারত না। এই সুযোগেই সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে সে। দ্রুত পায়ে সে দরজার অব্দি যেতেই আচমকা ঝোড়ো হাওয়ার বেগে রুমে ঢুকে পড়ল তাহসিন। বিন্দুমাত্র সময় না দিয়ে ইরানের গলা চেপে ধরে ফুঁসে উঠল সে,

“আমার ওপর জেদ করে এই জঘন্য কাজ করেছিস, তাই না? বল!
তোর এত বড় সাহস হয় কী করে আমার সাথে এই খেলা খেলার?”

গলার কাছে চেপে বসা শক্ত আঙুলগুলোর মাঝ থেকেই কোনোমতে দম আটকে হাপাতে হাপাতে কথা বলার চেষ্টা করল ইরান। বহু কষ্টে গলা দিয়ে অস্পষ্ট আওয়াজ বের করে সে বলে উঠল,
“আমি... আমি ইচ্ছে করে করিনি! বিশ্বাস করো!”

কিন্তু কে শোনে কার কথা! ইরানের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই তাহসিন নিজের হাতের তালুটা কষিয়ে বসিয়ে দেয় মেয়েটার গালে।  রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠল তাহসিন,
“ইচ্ছে করেই করেছিস তুই! কীসের এত ক্ষোভ তোর আমার সাথে? বল!”

ইরানের ঠোঁটের কোণ কেটে র/ক্ত গড়িয়ে পড়ল থুতনিতে। ধীরে ধীরে সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাটা ঠোঁটটা একটু জিব দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে তাকাল তাহসিনের দিকে। গলার স্বর নামিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় সে বলল,
“কীসের ক্ষোভ, তুমি জানো না? নাকি জেনেও সব জেনেশুনে অবুঝের মতো করছ?”

তাহসিন যেন আরও বেশি জ্বলে উঠল,
“আমি কিচ্ছু জানতে চাই না! তোর জন্য এখন এলোমেলো হয়ে যাবে সব!”

ভয়ডরহীন গলায় ইরান এবার অদ্ভুত ভাবে হাসল, 
“কী এমন হবে? তোমার বাচ্চার দেখাশোনা করতে পারব না, তাই তো? না পারলে নাই! আগেই তো বললাম, আমি ইচ্ছে করে করিনি। আর যদি জেনেশুনেই করে থাকি---তাতেও ভালোই করেছি!”

কথার শেষ রেশটুকু ফুরোবার আগেই তাহসিনের হাতটা আবার শূন্যে ভেসে উঠল। কিন্তু তার ঠিক আগমুহূর্তেই পাশের রুমটা থেকে হঠাৎ একটা চাপা আর্তনাদ আর গোঙানির শব্দ ভেসে এল।
ঝিলমিলের রুম থেকে আসা সেই যন্ত্রণাময় শব্দটা বাতাসে ভেসে আসতেই দুজনেই থমকে গেল। ইরানকে ছেড়ে ঝিলমিলের রুমে যেতেই দেখল যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে মেয়েটা। 

“ কী হয়েছে?” তাহসিনের প্রশ্নে নাজমা বেগম বললেন, “লেবার পেইন শুরু হয়ে গেছে বোধহয়! সময় তো এখনো পুরোপুরি হয়নি, ব্যথা তো ওঠার কথা না! জলদি হসপিটালের নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করো তাহসিন!”

ঝিলমিলের মুখ দিয়ে ব্যথায় যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ বেরিয়ে আসছে, বিছানার চাদর খামচে ধরে সে কুঁকড়ে যাচ্ছে, “আহ মা... সহ্য করতে পারছি না... পেটটা... মনে হচ্ছে ছিঁড়ে যাচ্ছে!” 

নাজমা বেগম মেয়েকে ঝাপটে ধরলেন। তাহসিন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দুহাতে সাবধানে ধরে তুলল ঝিলমিলকে। যতদ্রুত সম্ভব সে মেয়েটাকে গাড়িট পেছন সিটে নিয়ে বসিয়ে দিল। নাজমা বেগম আর ইরান ঝিলমিলের দুপাশে বসল। তাহসিন ড্রাইভিং সিটে বসে 
বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলল হসপিটালের উদ্দেশ্যে। 

————লেখিকার পেইজ নেইম- Ayesha Rin—রিন 

চোখের পাতা ঝট করে মেলে দিল বারিশ। অদ্ভুত এক স্বপ্ন তার এতক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখা ঘুমটা এক নিমেষে ভেঙে দিয়েছে। বুকটা কেমন যেন চিনচিন করছে। বরাবরই নিজের দেখা ভালো কিংবা মন্দ কোনো স্বপ্ন নিয়েই তার কোনো কালেই মাথাব্যথা থাকে না, অতীতেও কখনো পাত্তা দেয়নি। কিন্তু আজকের অনুভূতি একদমই আলাদা, অন্যরকম এক অস্বস্তিতে মনটা ভারী হয়ে আছে। স্বপ্নটা ঝিলমিলকে নিয়েই ছিল।

নিজের বিশাল ট্রিপ্লেক্স বাড়িটার বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে। যেখানে এর আগে কয়েকদিন সে ঝিলমিলকে নিজের বন্দিদশায় রেখেছিল। গতকাল গভীর রাতে ঝিলমিলের কাছ থেকে শেহরিয়ার ভিলায় না গিয়ে সরাসরি এই বাড়িতে এসে উঠেছে সে। দীর্ঘ জার্নির ধকলে শরীরটা এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে আজ ঘড়ির কাঁটায় বেলা বারোটা বেজে গেলেও ঘুম ভাঙেনি।

চোখ কচলাতে কচলাতে আলস্য ভেঙে সে ওয়াশরুমে ঢুকে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিল। কিন্তু ভেতরটা কেমন যেন ছটফট করছে, একটা অজানা আশঙ্কায় মনটা টিকটিক করছে। বারবার কেবল ঝিলমিলের সেই মলিন মুখটাই চোখের সামনে ভেসে উঠছে পুরুষটির। ভেজা মুখটা টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে ফোনটা হাতে নিতেই মেরুদণ্ড দিয়ে বরফশীতল স্রোত বয়ে গেল।

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে দেখল ভরপুর নোটিফিকেশন। স্ক্রিনজুড়ে মিসড কলের লম্বা লাইন। মেহরাজ, তাহসিন, চঞ্চল সাহেব এবং ফরহাদ সাহেব সবার নাম্বার থেকে একাধিক কল এসেছে। নিচে মেহরাজের পাঠানো একটা সংক্ষিপ্ত টেক্সট মেসেজ জ্বলজ্বল করছে:
> ঝিলমিলকে বনানীর ইউনিভার্সাল হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে। ফাস্ট আয়।

বিছানায় ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চোখের পলকে পোশাক বদলে নিল সে। বিছানা থেকে চাবি আর ফোনটা পকেটে পুরে লম্বা পা ফেলে পোর্চে এসে দাঁড়াল। বাইকের নিয়ে সোজা বেরিয়ে পড়ল রাস্তা পানে। শহরের কোলাহল এড়াতে ইচ্ছে করেই সে তার এই বাড়িটা একটু নির্জন ও শহরের বাইরের দিকে নিয়েছিল। আর আজ সেই দূরত্বটাই যেন বারিশের গায়ের র/ক্ত গরম করে দিচ্ছে। ফাঁকা পিচঢালা পথ ধরে বাইকের থ্রটল ফুল স্পিডে চ্যারে দিয়ে সে ছুটছে ঝড়ের বেগে।

হাসপাতালের ওয়েটিং এরিয়াতে সবাই এমনভাবে বসে আছে, যেন একেকটা মূর্তির মতো। কারোর মুখে কোনো কথা নেই, কেবল চেহারায় অজানা আতঙ্ক। ডাক্তার জানিয়েছে নরমাল ডেলিভারিতেই চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু এত দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও ভেতরের লেবার ওয়ার্ড থেকে কোনো ধরনের আপডেট আসছে না। অস্থির পায়ে এদিক-সেদিক কয়েকবার হেঁটে হুট করে নূরজাহান চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন নাজমা বেগম। ভয়ে তার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, চোখের কোণে জমে থাকা জল আর আটকে রাখা যাচ্ছে না। তার এইটুকুনি মেয়েটার না জানি কত কষ্ট হচ্ছে! নূরজাহান চৌধুরীর দুই হাত নিজের কাঁপা হাতে খামচে ধরে তিনি প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন,
“আম্মা, আমার খুব ভয় করছে! এত কেন সময় লাগছে? আমার না কেমন সব শূন্য শূন্য ঠেকছে... আমি কী ভেতরে যাব?”

নূরজাহান চৌধুরী নিজেও চিন্তিত। ঝিলমিল তো ভয়ে ভেতরেই যেতে চাইছিল না। তার হাত চেপে ধরে চি/ৎকার করে কাঁদছিল। এখন কেমন করছে কে জানে! তিনি শক্তিসঞ্চয় করে নাজমা বেগমকে কাছে টেনে শক্ত গলায় বললেন,
“আল্লাহকে ডাকো, নাজমা। এভাবে ভেঙে পড়ো না। ও আমার জাহান, কিছু হবে না ওর। ডাক্তাররা আছে ভেতরে, একটু ভরসা রাখো।”

নাজমা বেগমের এমন কান্নাকাটি দেখে দীঘিও সান্ত্বনা দিয়ে এটা ওটা বললেন। আলতাফ সাহেব মেয়ের জন্য হসপিটালের সাথে থাকা মসজিদে নফল নামাজ পড়ছেন। তিনি মেয়ের কান্নাকাটি কোনো ভাবেই সহ্য করতে পারছিলেন না। তাহসিন, ইরান, মেহরাজ চঞ্চল সাহেব, শিউলি বেগম, ফরহাদ সাহেব সকলের মুখেই দুশ্চিন্তা এবং বিরক্তির ছাপ। কারণ বারিশের এখনো কোনো হদিস নেই। চিন্তিত নয় শুধু ঝর্ণা বেগম। এমনকি নাজমা বেগমকে দুটো কথা বলে সান্ত্বনাও দিচ্ছে না।

এর মাঝেই ইমার্জেন্সি ওটি রুমের দরজাটা একটু ফাঁক হলো। ভেতরে কর্মরত ডাক্তার নাজিয়া ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে এলেন করিডোরে। তার কপালে ঘামের ফোঁটা, মুখের অভিব্যক্তি চরম উদ্বেগের। করিডোরের অপেক্ষমাণ ভিড়ের মধ্যে সরাসরি চঞ্চল সাহেবের দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি।

নিচু এবং ভারাক্রান্ত গলায় ডক্টর নাজিয়া বললেন,
“ওর অবস্থা তো ভালো লাগছে না চাচা। নরমাল ডেলিভারিতে নেওয়াটা বোধহয় ঠিক হয়নি, কিন্তু এখন আমরা একদম প্রসবের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এই মুহূর্তে চাইলেও ব্যাক করার উপায় নেই। ঝিলমিলের হেলথ কন্ডিশন খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে... আমার ধারণাই ছিল না যে শেষ মুহূর্তে এমন জটিলতা তৈরি হতে পারে! তাই কোনো টেস্ট না করিয়েই নরমাল ডেলিভারিতে নিয়েছিলাম।”

পায়ের তল থেকে মাটি সরে গেল চঞ্চল সাহেবের। তবু তিনি কাউকে বুঝতে না দিয়ে স্বাভাবিক রইলেন। কারণ সকলের দৃষ্টি এখন তাদের দিকে। তিনি নাজিয়াকে নিয়ে একটু সাইডে গেলেন। বললেন,
“ সব দোষ আমার ছেলের। মেয়েটাকে এই অবস্থায়ও অশান্তিতে রেখেছে। তুমি যেভাবে হোক কিছু একটা করো মা!”

নাজিয়াকে সব সত্যিটা খুলে বললেন--- বারিশ যে এতদিন ঝিলমিলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। অন্য কোনো ডক্টর হলে হয়তো বলত না, তবে নাজিয়া যেহেতু তাদেরই আত্মীয়, তাই কোনো রাখঢাক না রেখে বলে ফেলল। 

তবে ডক্টর নাজিয়ার এসব জানতও না আর ধারণাও ছিল না। তাই হেলথ কন্ডিশন চেক না করেই নরমাল ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

“কী বলল নাজিয়া? ভেতরের কী খবর?”

নাজিয়া চলে যেতেই ঝর্ণা বেগম এসে শুধালেন। জবাবে চঞ্চল সাহেব বললেন, “ভালো না! আল্লাহ জানে কী হবে।”

ঝর্ণা বেগম তাতে খুব একটা বিচলিত হলেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বাচ্চাগুলোর যেন কিছু না হয়!”

ঝর্ণা বেগমের মুখে ঝিলমিলকে নিয়ে এমন উদাসীন কথা শুনে চঞ্চল সাহেবের বুকটা আরও এক দফা তেতো হয়ে উঠল। 
 “হ্যাঁ, আমি ডাক্তারকে বলে দিয়েছি তিনজনই যেন সুস্থ থাকে।”

“ সামান্য বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে এত কাণ্ড! শুরু থেকেই ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই করছে না এই মেয়ে।” মুখটা শক্ত করে বলে উঠল ঝর্ণা বেগম। তার কথায় বিরক্ত হয়ে সরে গেল চঞ্চল সাহেব। এই মুহূর্তে তার তর্ক করার ধৈর্য নাই।

বেশ কিছুক্ষণ পরই অপারেশন থিয়েটারের দরজা ঠেলে দ্রুত পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন আরেকজন নারী চিকিৎসক। তার পরনে ওটি ড্রেস। এবার সকলকে শুনিয়েই বলল,

 “আমাদের হাতে আর সময় খুব কম, রোগীর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। আমাদের চিকিৎসাও এখন প্রায় শেষের পথে।”

ডক্টরের কথা শেষ হওয়ামাত্রই বুকফাটা আর্তনাদে ভেঙে পড়লেন নাজমা বেগম। তিনি পাগলের মতো এগিয়ে গিয়ে ডাক্তারের হাত খামচে ধরে চি/ৎকার করে উঠলেন,
“আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন? আমার মেয়ের কী হয়েছে?”

নাজমা বেগমের কাণ্ড দেখে ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরও কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করালেন সবাইকে। বললেন,
 “মা ও শিশুর মধ্যে দুজনকে একসঙ্গে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব! আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করছি, কিন্তু রোগীর শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে আমাদের হাতে অপশন একটাই—মা কিংবা শিশু।”

ডক্টরের এই কথা শোনার পর মাটিতে বসে পড়ার উপক্রম হলো নাজমা বেগমের। 

“যেভাবেই হোক আমার মেয়েকে সুস্থ করে দিন ডক্টর! আমার একটাই মেয়ে... একটাই কলিজার টুকরো মেয়ে আমার! ওর কিচ্ছু হতে দেবেন না।”

নূরজাহান বেগমও দৃঢ় গলায় বললেন, “আগে আমাদের মেয়েকে সুস্থ রাখুন ডক্টর, মায়ের জীবন বাঁচান! বাকিটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম।”

উপস্থিত সবাই যেখানে ঝিলমিলকে বাঁচানোর জন্য আকুল আর্তনাদ করছে, সেখানে উল্টো সুর ধরলেন ঝর্ণা বেগম। 
“একজনের জন্য কী এখন আমরা দুটো তাজা প্রাণ হারাতে দেবো? ওরা শেহরিয়ার বংশের র/ক্ত! আমার ছেলের র/ক্ত! বাচ্চাদের বাঁচান ডক্টর! ওরা আমার বংশের প্রদীপ, ওদের কিছু হলে আমি কাউকে ছাড়ব না!”

পরিবারের এমন দ্বিমুখী কান্নাকাটি, চিৎকার আর মতবিরোধ দেখে ডাক্তার বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলেন। কার কথা রাখবেন আর কাকে সান্ত্বনা দেবেন বুঝে উঠতে না পেরে তিনি বিরক্ত ও কঠোর গলায় বলে উঠলেন,
“দেখুন আপনারা সবাই শান্ত হোন! আমরা চেষ্টা করব সবাইকে বাঁচানোর, কিন্তু আমাদের কাছে সবার আগে রোগী। মায়ের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে আমরা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারব না।”

ডক্টরের মুখে এমন কথা শুনে ঝর্ণা বেগম আরও বেশি তেতে উঠলেন। রাগে চোখ দুটো তার ঠিকরে বের হয়ে আসার উপক্রম। চেঁচিয়ে উঠলেন,
 “চুপ করুন আপনি! কিসের রোগী, কিসের মা? বংশের আলো যদি না বাঁচে, এই মেয়ের বেঁচে থেকে কী হবে? বাচ্চা দুটোকে আমার চাই-ই চাই! ওদের কিছু হলে এই হাসপাতাল মাথায় তুলে ফেলব আমি!”

বারিশ দাড়িয়ে পেছনেই। জ্যান্ত মূর্তি হয়ে দাড়িয়ে আছে কেমন। একটু আগেই সে বাইক ছুটিয়ে হসপিটালে এসে পৌঁছেছে। দম ফেলার ফুরসত না পেয়ে সোজা ওটি গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। ডক্টরের আর নিজ মায়ের মুখ থেকে বলা বাক্যগুলো তার কানে গিয়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তার হাত-পা অবশ হয়ে আসে। 

নিজের মায়ের মুখ থেকে ঝিলমিলের জীবনের চেয়ে বংশের উত্তরাধিকারের এমন নির্লজ্জ দাবি শোনার পর বারিশের পায়ের রক্ত মাথা দিয়ে চড়ে বসল। চোখের পলকে তার সমস্ত রাগ গিয়ে জমা হলো দুচোখে। হাসপাতালের করিডোর কাঁপিয়ে সে দানবীয় চি/ৎকারে গর্জে উঠল,
 “ধ্বংস হোক আমার বংশ! লাগবে না আমার কোনো সন্তান!”

চিৎকার করতে করতে সে ঝড়ের বেগে ভিড় ঠেলে একদম সামনে এগিয়ে এসে সোজা নিজের মায়ের মুখোমুখি দাঁড়াল। মায়ের দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে আবার ফুসে উঠল,
“সন্তানহীন আজীবন বাঁচব আমি, কিন্তু ওকে ছাড়া এক মুহূর্তও না। না মানে না! জাস্ট সেভ মাই ওয়াইফ! সেভ হার অ্যাট এনি কস্ট!”

বারিশের গলার স্বরের তীব্রতা আর চোখের চাউনি এতই হিংস্র  যে,  ঝর্ণা বেগম চুপসে গেলেন, তার গলা দিয়ে আর একটা শব্দও বের হলো না।

যুবকের অটল সিদ্ধান্ত শোনার পর ডাক্তার এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন ইনিই রোগীর স্বামী এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার একমাত্র তারই রয়েছে। স্বামীর এমন অদম্য সম্মতি পেয়ে তিনি বললেন,
“ ঠিক আছে আমরা চেষ্টা করব…”

“ডোন্ট ফা/কিং টেল মি দ্যাট! আমার স্ত্রীকে চাই আমার! জীবিত! সুস্থ! আমার সামনে! আমার ওয়াইফের কিছু হলে, এই হাসপাতালের বাকি রোগীদেরও গ/লা চেপে মে/রে ফেলব আমি! ডিড ইউ হিয়ার মি? আই ওয়ান্ট মাই ওয়াইফ ব্যাক!” বলতে বলতে ক্ষ্যাপাটে পাগলার মতো ধেঁয়ে যাচ্ছিল ডক্টরের দিকে বারিশ। মেহরাজ এসে ঝাপটে ধরে তাকে,
 “এই হিরোগিরি দেখাবি না জা/নোয়ার! কোথায় লুকিয়ে ছিলি এতক্ষণ? মেয়েটা ম/রে গেলে আসতি?” বারিশ মেহরাজের শার্টের কলারটা এক টানে শক্ত করে খামচে ধরে  তার জ্বলজ্বলে লাল চোখে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলে উঠল,
 “ফা/ক অফ! ওই শব্দ মুখেও আনবি না রাজ! কিচ্ছু হবে না ওর, কিচ্ছু না! আমি ভেতরে যাব…”

মেহরাজ বলল,
“ ঝিলমিল তোকে সামনে যেতে নিষেধ করেছে। বলেছে আর তোর মুখ দেখবে না।”

বারিশের চোখের দৃষ্টি আরও হিংস্র হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় মেহরাজকে সরিয়ে দিয়ে খ্যান্তহীন গলায় বলে উঠল,
“ছাড় আমাকে!”

“ডক্টর এলাও করবে না। ওর অবস্থা এমনিতেই খারাপ!”

কিছুই কানে তুলল না পুরুষটি। তোলার মানুষও না সে। নিয়ম ভেঙে ওটি রুমের দরজা সজোরে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল বারিশ। ভেতরে পা রাখতেই দেখল হ্যালোজেন লাইটের নিচে লেবার টেবিলে শুয়ে আছে ঝিলমিল। ফর্সা মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে, কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘামগুলো চুলে লেপ্টে আছে। নিশ্বাসের সঙ্গে তার বুকটা অদ্ভুত এক যন্ত্রণায় ওঠানামা করছে। নার্স আর ডাক্তাররা তখন র/ক্তমাখা হাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ঝিলমিলের এমন নিস্তেজ অবস্থা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই বারিশের সমস্ত উন্মাদনা, রাগ আর চি/ৎকার যেন এক মুহূর্তে থমকে বরফ হয়ে গেল। বুকের ভেতরটায় হুট করেই কে যেন আস্ত একটা পাথর বসিয়ে দিল বারিশের। পায়ের নিচে থিতিয়ে থাকা মাটিটুকু পর্যন্ত দুলে উঠল তার! গলার ভেতর জমে থাকা সমস্ত চিৎকার, সমস্ত আস্ফালন এক পলকে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। এগোতেই পারছে না সামনে, পা দুটো যেন মাটির সঙ্গে সেঁটে আছে। স্তব্ধ, মৃ/তপ্রায় চোখের দৃষ্টি নিয়ে সে কেবল অপলক তাকিয়ে রইল টেবিলটার দিকে, যেখানে তার পৃথিবীটা ফুরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ওদিকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ঝিলমিলের চোখও একসময় গিয়ে পড়ল দরজার কাছে। দেখল, ওই দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষটা। লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটোতে আতঙ্ক আর অনুশোচনা নিয়ে সে পাথর হয়ে তাকিয়ে আছে। ছয়টি দীর্ঘ মাস কেটে গেছে এই মানুষটাকে সে চোখের দেখা দেখেনি, তার স্পর্শ পায়নি। অথচ আজ জীবনের সবচেয়ে নরকীয় এই মুহূর্তে ঠিক তাকেই সামনে এসে দাঁড়াতে হলো।

হাড়ের ভেতর থেকে বয়ে যাওয়া ব্যথার তীব্রতা ছাপিয়ে ঝিলমিলের বুকটা খামচে উঠল একরাশ অভিমানে। ঘন ঘন শ্বাস টেনে ডক্টরদের উদ্দেশ্যে করে বলল,
“ডক্টর! লোকটাকে বের হতে বলুন! সে যেন আমার কাছে না আসে ডক্টর... তাকে বের করে দিন!”

কান্নাকাটি আওয়াজে বারিশের স্থবিরতা ভেঙে গেল। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে রইল না, পাথরের মতো শক্ত পায়ে এগিয়ে গেল কয়েক পা। ডক্টর নাজিয়া বারিশের কাণ্ড শুনে এমনিতেই তার ওপর রেগে আছে। এখন তাকে এখানে দেখে বাধা দিয়ে কঠোর গলায় বলল,
 “ও চাচ্ছে না তুমি এখানে থাকো। ওর কন্ডিশন অলরেডি ক্রিটিক্যাল, এই মুহূর্তে তাকে কোনোভাবেই উত্তেজিত করা ঠিক হবে না। তুমি বাইরে যাও।”

ডক্টরের কথায় কান দেওয়ার পাত্র বারিশ নয়। ঝিলমিলের ওই আর্তনাদ তার বুকের ভেতরটা চির ধরে ভেঙে দিচ্ছিল। ঝিলমিল তখন আরও দুর্বল কণ্ঠে ডক্টরের হাত খামচে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল,
 “চলে যেতে বলুন ডক্টর... ওকে বলুন এখান থেকে চলে যেতে... আমি দেখতে চাই না ওকে!”

ঝিলমিলের মুখ থেকে প্রত্যাখ্যান তুচ্ছ করে বারিশ সোজা গিয়ে হাজির হলো লেবার টেবিলের একদম মাথা বরাবর। চারপাশের ডাক্তার-নার্সদের ভ্রূকুটি গায়েই মাখল না। ঝিলমিলের দুই পাশে দুই হাত রেখে সে নিজের মুখটা একদম ঝিলমিলের মুখের ওপর ঝুঁকিয়ে আনল। গলার ভেতর থেকে ঠিকরে বের হওয়া রূঢ়, খসখসে বাক্য,
 “আমি নিষেধ করেছিলাম না? নিষেধ করেছিলাম! বলেছিলাম আমার এসব চাই না, কোনো সন্তান চাই না! এখন দেখ, হা/রামির বাচ্চা! কী অবস্থা করেছিস তুই নিজের!”

বারিশের এই খামখেয়ালিতে ঝিলমিলের গলাটা আরও বেশি বুজে এল। চোখের কোন গড়িয়ে নামা নোনতা জল ঘামে ভেজা চুলে মিশে একাকার হয়ে গেল। সে ভাঙা গলায় ফিসফিস করল,
 “চলে যান আপনি... যেখানে ছিলেন, সেখানেই ফিরে যান। লাগবে না আর আপনাকে... দরকার নেই আমার আপনার!”

ঘুসি মারল পাশে বারিশ। গর্জে উঠল,
 “চুপ! একদম চুপ!”

ঝিলমিলের শীতল ডান হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় খপ করে চেপে ধরল। হাতের তালু দিয়ে তার আঙুলগুলো এমনভাবে আঁকড়ে ধরল, যেন এই স্পর্শ দিয়ে সে ওটির সমস্ত মৃ/ত্যুভয় ছিনিয়ে নেবে। ঝিলমিলের চোখের দিকে তাকিয়ে সে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল,
 “আমাকে বাদ দিয়ে কোথাও যাওয়ার অধিকার নেই তোর! সহ্য কর... প্লিজ একটু সহ্য কর তুই! কিচ্ছু হবে না…”

ডক্টরের টিম আবার ঝিলমিলের চারপাশে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তেই বারিশের হাতের মুঠোয় হাত বন্দি রেখেই ঝিলমিল ব্যথায় কুঁকড়ে একটা দীর্ঘ আর্তনাদ করে উঠল। 

চিকিৎসক রক্তমাখা হাত দিয়েই আবার ঝিলমিলের পেটের ওপর নির্দিষ্ট পয়েন্টে চাপ দিয়ে লেবার প্রসেসটা রি-স্টার্ট করার জন্য জোর নির্দেশ দিলেন,
 “পুশ করো ঝিলমিল! জাস্ট শেষবার জোরে প্রেসার দাও! পুশ হার্ড!”

ঝিলমিলের গলা চিরে বেরিয়ে এল এক অবর্ণনীয় কান্নার আওয়াজ। পেটের ভেতর থেকে ছিঁড়ে বের হয়ে আসার মতো সেই অসহ্য যন্ত্রণায় সে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে বারিশের হাতের কব্জিতে দাঁত বসিয়ে শক্ত করে কা/মড়ে ধরে বসল! মাংস ভেদ করে ব্য/থা হাড় পর্যন্ত পৌঁছে গেলেও বারিশ টু শব্দটিও করল না। চোখ বন্ধ করে সব সহ্য করে রইল।

ভেসে এলো ঝিলমিলের ফোঁপানো,
“আর পারছি না বারিশ... ম/রে যাচ্ছি আমি...সহ্য করতে পারছি না আর!”

“কিচ্ছু হবে না জান! ম/রবি না তুই... ম/রতে দেবো না! বেঁচে যাবে তুমি! পুশ করো জাস্ট। আমি আছি না? কিচ্ছু হতে দেবো না তোমায়!” বলতে বলতে ঝিলমিলের কপালে কপাল ঠেকাল বারিশ। ঝিলমিলের গালে হাত রেখে কেমন ভেজা গলায় ফের বলল,
“ লুক অ্যাট মি! ইউ আর আ স্ট্রং গার্ল! জান প্লিজ... আরেকটু... জাস্ট আর একটু! আমি আছি তো… পুশ কর জান!”  বলতে বলতে টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল সেই রুক্ষ, একগুঁয়ে, উগ্র পুরুষটির চোখ হতে।

ঠিক সেই মুহূর্তে চিকিৎসকদের চূড়ান্ত নির্দেশ আর শেষ সর্বাত্মক পুশ পড়তেই ওটি রুমের থমথমে বাতাস চিরে বেজে উঠল এক সদ্যজাত শিশুর প্রথম কান্নার তীক্ষ্ণ আওয়াজ। তার পরপরই কেঁদে উঠল দ্বিতীয় শিশুটিও। দুটো নতুন প্রাণের যৌথ কান্না পুরো লেবার রুমকে কাঁপিয়ে দিল।

ক্লান্ত, নিস্তেজ চোখে ঝিলমিল কোনমতে মাথাটা একটু ঘুরিয়ে নার্সদের কোলে থাকা সেই ছোট্ট দুটি সন্তানকে এক পলক দেখতে পেল। তার মলিন ফ্যাকাশে ঠোঁটে ফুটে উঠল প্রশান্তির হালকা হাসি। ডক্টর নাজিয়া র/ক্তমাখা গ্লাভস পরা হাতে বাচ্চা দুটোকে সামলে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বারিশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
“আলহামদুলিল্লাহ! একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হয়েছে, বারিশ!”

কিন্তু ডক্টরের সেই খুশির খবর বারিশের কানের ভেতর দিয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছালই না। সে নিজের সন্তানদের দিকে ফিরেও তাকাল না; তার সমস্ত দুনিয়া, তার সমস্ত দৃষ্টি তখন কেবল আটকে আছে লেবার টেবিলে শুয়ে থাকা ঝিলমিলের ফ্যাকাশে মুখের ওপর। সে দেখল, ঝিলমিলের চোখের পাতা দুটো ধীরে ধীরে এলিয়ে আসছে। নিঃশ্বাসগুলো ক্রমশ হালকা ও ক্ষীণ হয়ে আসছে। জীবনের শেষ শক্তিটুকু কুঁড়ে এনে সে তার ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হাতটা বাড়িয়ে দিল স্বামীর গালে। বারিশের গালে নিজের হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে ঝিলমিল একদম ফিসফিস করে, ভাঙা গলায় টেনে টেনে বলে উঠল,
“কনগ্রাচুলেশনস! আমি... আমি আপনাকে বাবা বানাতে পেরেছি...আমি জিতে গিয়েছি পাগলু…”

​কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঝিলমিলের চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল। হাতটা খসে পড়ল বারিশের গাল থেকে। ​ক্লান্তি ও দূর্বলতায় পুরোপুরি জ্ঞান হারিয়ে ফেলল মেয়েটা। চোখের পলকে মাথা ঘুরে গেল বারিশের। চারপাশটা অন্ধকার লাগল। ঝিলমিলের নিথর দেহটার ওপর ঝুঁকে পড়ে দুই হাত দিয়ে তার ফ্যাকাশে গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। পাগলের মতো ঝাঁকুনি দিতে দিতে সে গলা ফাটিয়ে চি/ৎকার করে উঠল,
 “এই! এইইই হা/রামির বাচ্চা! এমন করছিস কেন? কী হয়েছে? সিয়েনাহ! তাকা... চোখ খোল বলছি! চোখ খুলবি না হলে কিন্তু সব ভেঙে চুরমার করে দেবো! আমার দিকে তাকা বলছি... এই জাহান! এই নাটক করবি না আমার সাথে। চোখ খোলো জান! আর কষ্ট দেব না তোমায়…”


চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন