🌙 রাতের আকাশের চাঁদ তুমি
লেখিকা: লামইয়া আক্তার
রাত ১২টা।
চৌধুরী ম্যানশনের বিশাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রেজুয়ান চৌধুরী। হাতে এক কাপ ব্ল্যাক কফি। পরনে কালো শার্ট, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। বাংলাদেশের অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী সে। শহরের সবচেয়ে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি তার পরিবারের। কোটি কোটি টাকার সম্পদ, বিলাসবহুল গাড়ি আর বিশাল রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি—কোনো কিছুরই অভাব নেই তার।
কিন্তু মানুষটার স্বভাব ভীষণ কঠিন। রাগী, অহংকারী এবং প্রচণ্ড বদমেজাজি। নিজের সিদ্ধান্তের বাইরে অন্য কারও কথা শুনতে সে পছন্দ করে না।
হঠাৎ তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
"যাকে তুমি অতীত ভেবে ভুলে গেছ, সে-ই একদিন তোমার বর্তমান হয়ে ফিরে আসবে। সাবধান, রেজুয়ান!"
মেসেজটি পড়ে রেজুয়ানের কপাল কুঁচকে গেল।
— Who the hell is this?
সে নম্বরটিতে কল করল। কিন্তু নম্বরটি বন্ধ।
রেজুয়ান জানত না, এই একটি মেসেজ তার জীবনের সব হিসাব পাল্টে দিতে চলেছে।
অন্যদিকে, শহরের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছোট্ট ঘরে জানালার পাশে বসে আছে জারা সুলতানা। মেয়েটির উচ্চতা একটু কম, চোখ দুটো মায়াবী। স্বভাবে ভীষণ চঞ্চল, তবে অভিমানীও বটে।
তার জীবনে খুব বেশি চাওয়া-পাওয়া নেই। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো থাকাই তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
তবে তার মনের এক গোপন জায়গায় বাস করে একজন মানুষ। সেই মানুষটির নাম রেজুয়ান চৌধুরী।
ছোটবেলা থেকেই জারা তাকে ভালোবাসে। রেজুয়ানের একটি ছবি তার ডায়েরির ভাঁজে যত্ন করে রাখা। অথচ রেজুয়ান জানেও না, পৃথিবীর এক কোণে কেউ একজন তাকে এতটা ভালোবাসে।
পরদিন সকাল।
জারা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছিল। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল সে।
ঠিক তখনই একটি কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি এসে তার সামনে থামল।
জারা বিরক্ত হয়ে বলল,
— চোখে দেখতে পান না? মানুষের সামনে এভাবে গাড়ি থামান কেন?
গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল লম্বা, সুদর্শন এক যুবক।
কালো শার্ট, দামি ঘড়ি আর চোখে বিরক্তির ছাপ।
রেজুয়ান!
সে জারার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
— রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকলে এমনই হবে, মিস।
জারা কোমরে হাত দিয়ে বলল,
— রাস্তা কি আপনার বাবার কেনা? ইচ্ছেমতো গাড়ি চালাবেন?
রেজুয়ান অবাক হয়ে তাকাল।
— Excuse me! Do you know who I am?
জারা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— জানার এত শখ নেই। আর আপনার মতো অহংকারী মানুষকে চিনতেও চাই না।
কথাটা বলে জারা চলে গেল।
রেজুয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখল।
নিজের জীবনে এমন বেয়াদব মেয়ে সে আগে দেখেনি।
মনে মনে বলল,
— অসভ্য একটা মেয়ে!
কিন্তু ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা! এই মেয়েটিই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে।
বিকেল ৪টা।
চৌধুরী ম্যানশনের ড্রয়িংরুমে বসে আছে আরিশা রহমান। ছোটবেলা থেকেই সে রেজুয়ানকে ভালোবাসে। তার বিশ্বাস, একদিন রেজুয়ান শুধু তারই হবে।
রেজুয়ান ঘরে ঢুকতেই আরিশা হাসিমুখে এগিয়ে এল।
— রেজুয়ান! এতক্ষণ কোথায় ছিলে?
— অফিসে। কেন?
— তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।
— বলো।
আরিশা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
— আমি তোমাকে ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসি, রেজুয়ান। তুমি জানো সেটা।
রেজুয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
— আরিশা, এসব নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না।
— কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে কল্পনাও করতে পারি না।
— সেটা তোমার সমস্যা। আমার নয়।
আরিশার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, রেজুয়ানকে সে কখনো অন্য কারও হতে দেবে না।
এরপর কয়েক দিন কেটে গেল।
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে আবার দেখা হলো জারা ও রেজুয়ানের।
জারা বান্ধবীদের সঙ্গে হাসাহাসি করছিল। হঠাৎ রেজুয়ান তার সামনে এসে দাঁড়াল।
— এই যে খাটো মেয়ে!
জারা ঘুরে তাকাল।
— আমাকে বলছেন?
— এখানে আর কোনো খাটো মেয়ে দেখছি না।
— আপনার সমস্যা কী?
— সমস্যা হলো, তোমার মতো মেয়েদের আমি একদম সহ্য করতে পারি না।
জারা মুচকি হেসে বলল,
— তাহলে চোখ বন্ধ করে রাখবেন। আমাকে দেখতে হবে না।
রেজুয়ান রাগে দাঁত চেপে বলল,
— তোমার অনেক সাহস!
— ধন্যবাদ। সাহসটা নিজের কাছেই রাখুন।
জারা চলে গেল।
রেজুয়ান এবার সত্যিই রেগে গেল।
কিন্তু সে বুঝতে পারল না, মেয়েটির সঙ্গে ঝগড়া করেও কেন বারবার তার কথাই মনে পড়ছে।
রাত ১১টা ৩০ মিনিট।
জারা নিজের ডায়েরি খুলে লিখল—
"প্রিয় রেজুয়ান,
আপনি হয়তো জানেনও না, কেউ একজন আপনাকে কতটা ভালোবাসে। আপনার রাগ, আপনার অহংকার, আপনার সবকিছুই আমার চেনা। জানি, আপনাকে কখনো নিজের করে পাব না। তবুও আপনাকে ভালোবাসতে আমার ভালো লাগে।"
ডায়েরিটি বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকাল জারা।
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ।
অন্যদিকে রেজুয়ানের ফোনে আবার একটি মেসেজ এল।
"তুমি যাকে ঘৃণা করছ, একদিন তাকেই খুঁজবে। আর যাকে ভালোবাসার দাবি করছ, সে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।"
রেজুয়ান এবার আর চুপ থাকতে পারল না।
সে নিজের সহকারীকে ফোন করে বলল,
— আগামীকাল সকালেই ওই নম্বরের মালিককে খুঁজে বের করো। আমি জানতে চাই, আমার অতীত নিয়ে খেলার সাহস কার হয়েছে!
কিন্তু তার অজান্তেই আরিশা নিজের ঘরে বসে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছিল।
তার ফোনে একটি মেসেজ ভেসে উঠল—
"জারা মেয়েটিকে নজরে রেখো। ওর কাছে এমন কিছু আছে, যা আমাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।"
আরিশার হাসি মিলিয়ে গেল।
সে ফিসফিস করে বলল,
— জারা সুলতানা, তুমি জানো না তুমি কার জীবনে পা দিয়েছ!
সেদিন রাতেই জারার বাড়ির দরজার সামনে একটি কালো খাম পাওয়া গেল।
খামের ভেতরে ছিল একটি পুরোনো ছবি।
ছবিতে ছোট্ট জারা এবং ছোট্ট রেজুয়ান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
ছবির পেছনে লেখা—
"তোমাদের গল্প আজকের নয়, জারা। তোমার জন্মের আগেই এই গল্পের প্রথম অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে।"
জারা ছবিটি হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর হঠাৎ পেছন থেকে একটি অচেনা কণ্ঠ ভেসে এল—
— সত্যিটা জানতে চাও, জারা?
জারা ভয়ে পেছনে ফিরে তাকাল।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি সাদা কাগজ।
তাতে লেখা—
"রেজুয়ান চৌধুরীকে বিশ্বাস কোরো না"