👻 বন্ধ দরজার ওপাশে কে?
✍️ লেখিকা: রহস্যকন্যা
পাঠ ১ — মৃত মেয়েটির ফোন!
রাত তখন ঠিক বারোটা। আকাশে চাঁদ নেই, চারদিকে ঘন কুয়াশা। বাতাসের ঝাপটায় পুরোনো গাছের ডালপালা দুলছে, যেন অন্ধকারের ভেতর কেউ হাত বাড়িয়ে ডাকছে। গ্রামের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বহু বছরের পুরোনো এক জমিদারবাড়ি। ভাঙা দেয়াল, শ্যাওলা ধরা সিঁড়ি আর বন্ধ জানালাগুলো দেখে মনে হয়, বাড়িটিতে বহুদিন কেউ বাস করে না। অথচ গ্রামের মানুষ জানে, প্রতি অমাবস্যার রাতে দোতলার একটি বন্ধ ঘর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসে।
শহর থেকে ছুটি কাটাতে গ্রামে এসেছে সতেরো বছরের মেঘলা। সে সাহসী, কৌতূহলী এবং ভূতের গল্প একেবারেই বিশ্বাস করে না। তার খালাতো বোন রিমি আবার অন্ধকার দেখলেই ভয় পায়। সেদিন রাতে দুজন পাশের বাড়ি থেকে নিজেদের বাড়িতে ফিরছিল। জমিদারবাড়ির সামনে আসতেই রিমি মেঘলার হাত চেপে ধরল।
“আপু, এই রাস্তা দিয়ে যেও না। সবাই বলে, ওই বাড়িতে নীলাঞ্জনা নামের এক মেয়ের আত্মা ঘুরে বেড়ায়।”
মেঘলা হেসে বলল, “এসব বানানো গল্প। ভূত বলে কিছু নেই। মানুষই মানুষকে ভয় দেখায়।”
ঠিক তখনই মেঘলার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে অচেনা একটি নম্বর। সে কল ধরতেই ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল।
“মেঘলা... তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ?”
মেঘলা অবাক হয়ে বলল, “আপনি কে? আমার নাম জানলেন কীভাবে?”
“আমি নীলাঞ্জনা। আমাকে বাঁচাও। আমি এই বাড়ির বন্ধ ঘরে আটকে আছি।”
মেঘলা বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি কোথায় আছেন? মজা করবেন না।”
ওপাশে হঠাৎ দরজা বন্ধ হওয়ার মতো বিকট শব্দ হলো। তারপর মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, “তোমার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। খবরদার, পেছনে তাকিয়ো না!”
কল কেটে গেল।
মেঘলা হাসতে চাইল, কিন্তু তার হাসি গলায় আটকে গেল। রিমির মুখ ফ্যাকাশে। সে কাঁপা গলায় বলল, “আপু, আমার মনে হচ্ছে আমাদের পেছনে সত্যিই কেউ আছে।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল একটি ডাক।
“মেঘলা... একবার আমার দিকে তাকাও।”
রিমি চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু মেঘলা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। রাস্তার ওপাশে সাদা পোশাক পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার লম্বা কালো চুল মুখ ঢেকে রেখেছে, আর পায়ের নিচে কুয়াশা ঘুরছে। মেয়েটি যেন মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই, অন্ধকারের মধ্যে ভেসে আছে।
মেঘলা পিছিয়ে গিয়ে বলল, “আপনি কে?”
মেয়েটি উত্তর দিল না। শুধু হাত তুলে জমিদারবাড়ির দোতলার জানালার দিকে ইশারা করল। তারপর মুখের চুল সরিয়ে দিল।
মেঘলার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। মেয়েটির মুখ অবিকল তার নিজের মুখের মতো! একই চোখ, একই নাক, এমনকি বাঁ গালের ছোট তিলটিও একই জায়গায়।
“এটা কীভাবে সম্ভব?” মেঘলা কাঁপা গলায় বলল। “আপনি আমার মতো দেখতে কেন?”
সাদা পোশাকের মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, “ওই বন্ধ ঘরে যাও। তোমার জন্মের সত্যি সেখানে লুকিয়ে আছে।”
তারপর সে মিলিয়ে গেল। একই মুহূর্তে জমিদারবাড়ির দোতলার জানালাটি নিজে থেকেই খুলে গেল। জানালার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট মেয়ে। সে কাচে হাত রেখে চিৎকার করল, “আপু, আমাকে নিয়ে যাও! ওরা আমাকে আটকে রেখেছে!”
মেঘলা জানালার দিকে ছুটতে গেল, কিন্তু রিমি তার পথ আটকে দিল।
“আপু, থামো! জানালায় তো কেউ নেই। তুমি একা একা কার সঙ্গে কথা বলছ?”
মেঘলা আবার তাকাল। জানালাটি বন্ধ। ভেতরে অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই।
তার ফোনে হঠাৎ একটি বার্তা এল। সঙ্গে একটি ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, জমিদারবাড়ির সেই বন্ধ ঘর, মাঝখানে ধুলো জমা বিশাল একটি আয়না, আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলার মতো দেখতে একটি মেয়ে। ছবির নিচে লেখা, “আজ রাত বারোটার আগে ঘরে এসো। নইলে তোমার মাকেও হারাবে।”
মেঘলা ছবিটি বড় করে দেখল। আয়নার পেছনের দেয়ালে লেখা তারিখটি তার নিজের জন্মদিন। তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। কেন তার জন্মদিন ওই পরিত্যক্ত ঘরের দেয়ালে লেখা থাকবে?
ঠিক তখনই আবার ফোন বেজে উঠল। এবার স্ক্রিনে দেখা গেল মেঘলার নিজের নম্বর। সে কাঁপতে কাঁপতে কল ধরল। ওপাশে তার নিজের কণ্ঠ শোনা গেল, কিন্তু কণ্ঠটি যেন অনেক দূর থেকে আসছে।
“মেঘলা, মন দিয়ে শোনো। আমি ভবিষ্যতের তুমি। কোনোভাবেই ওই ঘরের দরজা খুলবে না। আমি যদি সেখান থেকে বেরিয়ে আসি, তুমি আর কখনো বাড়ি ফিরতে পারবে না।”
মেঘলা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কল কেটে গেল।
জমিদারবাড়ির ভেতর থেকে ধীরে ধীরে দরজা খোলার শব্দ এল।
ক্যাঁচচচ...
অন্ধকার ঘরের ভেতর কেউ একজন মৃদু স্বরে বলল, “অবশেষে তুমি ফিরে এলে, আমার মেয়ে...”
মেঘলা জমে গেল। সে কখনো এই বাড়িতে আসেনি, তবু কণ্ঠটি তাকে চেনে কেন? রিমি তার হাত ধরে টানতে লাগল, কিন্তু মেঘলার চোখ আটকে রইল দরজার অন্ধকার ফাঁকে।
সেখান থেকে একটি ছোট্ট হাত বেরিয়ে এল। হাতের কবজিতে বাঁধা লাল সুতোটি ঠিক মেঘলার নিজের হাতের সুতোর মতো। ভেতর থেকে আবার ফিসফিসানি ভেসে এল।
“দরজা পেরিয়ে এসো, মেঘলা। তোমার আসল পরিবার তোমার অপেক্ষায় আছে।”
মেঘলা এক পা এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই রিমির ফোনে মেঘলার মায়ের কল এল। ওপাশ থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠ বলল, “রিমি, মেঘলাকে নিয়ে এখনই বাড়ি চলে আয়! ওর ঘরে যে ছবিটা পেয়েছি, সেটা দেখে বুঝেছি—ওই বাড়িতে যাওয়া মানেই সর্বনাশ!”
কিন্তু ততক্ষণে মেঘলা দরজার সামনে পৌঁছে গেছে। অন্ধকারের ভেতর থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকল। দরজাটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
রিমি দরজায় ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করল, “মেঘলা, আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?” ভেতর থেকে তিনবার টোকা এল। তারপর সব চুপ। জানালায় একটি ছায়া দেখা দিল, আর কাঁচের ওপর আঙুল দিয়ে লেখা ফুটে উঠল—“প্রথম দরজা খুলেছে, এবার দ্বিতীয় দরজা খুঁজে বের করো।” রিমি পেছনে তাকাতেই দেখল।
আর দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল মেঘলারই কণ্ঠ, “রিমি, পালিয়ে যা... ওটা আমি নই!”
চলবে...