ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসেছি তোর মনেরই দেশে

পর্ব 1

লেখক: alifa madbar

এসেছি তোর মনেরই দেশে
Writer –Alifa madbar

পর্ব 1 / সূচনা

ঢাকার আকাশে তখন বিকেলের নরম রোদ। ব্যস্ত রাস্তার দুপাশে মানুষের ছুটে চলা, যানবাহনের শব্দ আর পথের ধারের ছোট ছোট দোকানগুলোর কোলাহলে চারপাশ মুখরিত। এত মানুষের ভিড়েও প্রত্যেকের জীবন আলাদা, প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কারও জীবনে আনন্দের অভাব নেই, আবার কেউ হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে রাখে একরাশ কষ্ট।

রুবায়েত নূর সিকদারও তেমনই একজন।

সতেরো বছরের মেয়েটার মুখে একধরনের শান্ত কোমলতা। বড় বড় কালো চোখ দুটোতে মায়া আছে, আছে এমন কিছু না-বলা কথা, যেগুলো সে কখনো কাউকে বুঝতে দেয় না। লম্বা কালো চুলগুলো পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। সাধারণ পোশাক, কাঁধে একটা পুরোনো ব্যাগ আর নিজের কাজ নিজে করে নেওয়ার অভ্যাস—এই নিয়েই তার ছোট্ট পৃথিবী।

নূর খুব বেশি কথা বলে না। কেউ ভালোভাবে কথা বললে সে হাসিমুখে উত্তর দেয়, কেউ কষ্ট দিলেও বেশির ভাগ সময় চুপ করে থাকে। তবে তার এই নীরবতাকে দুর্বলতা ভাবার সুযোগ নেই। জীবন তাকে অল্প বয়সেই শিখিয়ে দিয়েছে, সব কষ্টের প্রতিবাদ মুখে করতে হয় না; কখনো কখনো নিজের অবস্থান ধরে রাখাটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ।

অথচ একসময় নূর এমন ছিল না।

তারও একটা ছোট্ট পৃথিবী ছিল, যেখানে সন্ধ্যা নামলে মায়ের ডাক শোনা যেত, বাবা বাড়ি ফিরলে সে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরত। সেখানে অভাবের চেয়ে ভালোবাসা বেশি ছিল, আর নিরাপত্তা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। নূর জানত, পৃথিবীর সবাই তাকে ভালো না বাসলেও তার বাবা-মা সব সময় তাকে আগলে রাখবেন।

সে জানত না, মানুষের জীবন থেকে সবচেয়ে আপন মানুষগুলো কখনো কখনো এত দ্রুত হারিয়ে যায় যে বিদায় জানানোর সময়টুকুও পাওয়া যায় না।

নূরের বয়স তখন মাত্র দশ বছর।

ছুটির দিন ছিল। ছোট্ট নূর বসার ঘরের মেঝেতে বসে রঙিন পেনসিল দিয়ে ছবি আঁকছিল। ছবিতে একটা ছোট্ট বাড়ি, বাড়ির সামনে তিনজন মানুষ আর তাদের মাথার ওপর বিশাল একটা হলুদ সূর্য। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দুই পাশে দুজন মানুষ হাত ধরে আছে।

রান্নাঘর থেকে মেয়ের কাণ্ডকারখানা দেখতে দেখতে হাসলেন রাহেমা সিকদার।

রাহেমা সিকদার: নূর মা, কী আঁকছিস এত মন দিয়ে?

নূর: আমাদের পরিবার আঁকছি, আম্মু। এটা তুমি, এটা আব্বু আর মাঝখানে আমি। দেখো, আমরা তিনজন কত সুন্দর!

রাহেমা সিকদার: বাহ! আমার মেয়েটা তো বেশ ভালো ছবি আঁকতে শিখেছে। কিন্তু তোর আব্বুর চুল এত কালো কেন? তাঁর তো দু-একটা চুল পেকে গেছে।

নূর: আব্বুর চুল সাদা করলে ভালো লাগবে না। তাই কালো করে দিয়েছি!

রাহেমা সিকদার: তাই বুঝি? তাহলে তোর আব্বুকে তো দেখছি তোর ছবিতে চিরদিন যুবক হয়েই থাকতে হবে!

নূর হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে ঘরটা যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

ঠিক তখনই দরজার বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। নূর পেনসিল ফেলে উঠে দাঁড়াল। গাড়ির শব্দটা তার চেনা। বাবা বাড়ি ফিরেছেন!

দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন রাহিদ সিকদার। তাঁকে দেখেই নূর ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল।

নূর: আব্বু! এত দেরি করলে কেন? আমি কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি!

রাহিদ সিকদার: ওহ্, আমার মেয়েটা বুঝি আমাকে ছাড়া একদম থাকতে পারে না?

নূর: পারি তো! কিন্তু থাকতে ইচ্ছে করে না।

রাহিদ সিকদার: আচ্ছা, আমার মায়ের কথায় তো দেখি অনেক যুক্তি আছে!

তিনি হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর হাতে থাকা ব্যাগটা এগিয়ে দিলেন।

রাহিদ সিকদার: দেখ তো, তোর জন্য কী এনেছি।

নূর আগ্রহ নিয়ে ব্যাগের ভেতর তাকাল। সেখানে রঙিন প্রচ্ছদের কয়েকটি গল্পের বই। বইগুলো দেখে তার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।

নূর: আব্বু! এতগুলো বই! সবগুলো আমার?

রাহিদ সিকদার: না, পাশের বাড়ির বিড়ালের জন্য এনেছি!

নূর: আব্বু!

রাহিদ সিকদার: আচ্ছা, আচ্ছা! সব তোর। তবে একটা শর্ত আছে।

নূর: কী শর্ত?

রাহিদ সিকদার: শুধু গল্প পড়লেই হবে না। পড়াশোনাও মন দিয়ে করতে হবে। বড় হয়ে ভালো মানুষ হবি, নিজের একটা পরিচয় তৈরি করবি।

নূর: আমি অনেক পড়াশোনা করব। তারপর বড় হয়ে অনেক বড় কিছু হব। তখন তোমাকে আর আম্মুকে অনেক ভালো রাখব।

রাহিদ সিকদার: আমাদের ভালো রাখার দায়িত্ব এখনই তোকে নিতে হবে না, মা। তুই শুধু ভালো মানুষ হবি। তোর মুখের হাসিটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সুখ।

কথাটা শুনে নূর বাবাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

সন্ধ্যায় তিনজন একসঙ্গে খেতে বসেছিল। নূর একবার গল্পের বইয়ের কথা বলছিল, আরেকবার নিজের স্কুলের কথা। সে বড় হয়ে কী হবে, কোথায় যাবে, কত বই পড়বে—এসব নিয়ে তার কত পরিকল্পনা!

রাতের খাবার শেষে রাহেমা সিকদার মেয়েকে ঘুম পাড়াতে নিয়ে গেলেন। নূর মায়ের পাশে শুয়ে তাঁর হাত ধরে রইল।

নূর: আম্মু?

রাহেমা সিকদার: কী হয়েছে, মা?

নূর: তুমি আর আব্বু আমাকে কখনো একা রেখে যাবে না তো?

রাহেমা সিকদার মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। এত ছোট একটা মেয়ের মনে এমন প্রশ্ন এল কেন, বুঝতে পারলেন না।

রাহেমা সিকদার: এমন কথা বলছিস কেন? আমরা তো তোর কাছেই আছি।

নূর: জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি তোমরা আমার কাছে না থাকো, তাহলে আমি কী করব?

রাহেমা সিকদার: পাগলি মেয়ে! তুই আমাদের একমাত্র মেয়ে। তোকে ছেড়ে কোথাও যেতে আমাদের মন চাইবে নাকি?

নূর: সত্যি বলছ, আম্মু?

রাহেমা সিকদার: একদম সত্যি। এবার চোখ বন্ধ কর। কাল সকালে তোর আব্বু তোকে নিয়ে বাইরে যাবে।

নূর: কোথায়?

রাহেমা সিকদার: সেটা কাল তোর আব্বুর কাছ থেকে শুনিস।

নূর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল। মায়ের বুকের উষ্ণতায় চোখ বন্ধ হয়ে এল তার। রাহেমা সিকদার মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

সেই রাতে নূর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল। তার ছোট্ট পৃথিবীতে তখনো কোনো ভাঙন ধরেনি।

পরদিন সকালে রাহিদ সিকদার ও রাহেমা সিকদার একটি জরুরি কাজে বাড়ি থেকে বের হলেন। যাওয়ার আগে মেয়েকে কথা দিয়ে গেলেন, ফিরে এসে তাকে নিয়ে বইয়ের দোকানে যাবেন।

নূর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিল।

নূর: তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, আব্বু! আম্মু! আমি কিন্তু অপেক্ষা করব!

রাহিদ সিকদার: ঠিক আছে, মা। ফিরে এসেই তোকে নিয়ে যাব।

রাহেমা সিকদার: আর দুষ্টুমি করবি না। ভালো মেয়ের মতো থাকবি।

নূর: আমি একদম দুষ্টুমি করব না!

গাড়িটা চোখের আড়াল হওয়া পর্যন্ত নূর দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘরে ফিরে নতুন গল্পের বইগুলো নিয়ে বসে পড়ল। সে ঠিক করে রেখেছিল, বাবা ফিরলে বইয়ের একটা গল্প তাঁকে পড়ে শোনাবে।

কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামল। বাবা-মা তখনো ফিরলেন না।

প্রথমে নূর ভাবল, হয়তো কাজে দেরি হচ্ছে। সে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। একবার চাচার বাড়িতে ফোন করার কথা মনে হলো, কিন্তু তখনো সে জানত না, কীভাবে এত বড় একটা দুশ্চিন্তা সামলাতে হয়।

রাতের দিকে বাড়িতে কয়েকজন আত্মীয় এলেন। তাঁদের মুখ গম্ভীর, চোখ ভেজা। বড়দের চাপা কথাবার্তা আর কান্নার শব্দে নূরের বুকের ভেতর অজানা ভয় জমতে লাগল।

সে একজনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

নূর: চাচা, সবাই কাঁদছে কেন? আমার আব্বু-আম্মু কোথায়?

কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।

নূর: বলো না! ওরা এখনো ফিরে আসেনি কেন?

একজন আত্মীয় তাকে কাছে টেনে নিলেন। কিন্তু তাঁর চোখের জল দেখে নূরের ভয় আরও বেড়ে গেল।

শেষ পর্যন্ত সে জানতে পারল, একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন।

কথাটা শুনে নূর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, সে ঠিকমতো শুনতে পায়নি। কথাগুলো যেন তার কানের কাছে এসেও অর্থহীন হয়ে গেল।

নূর: না। আমার আব্বু-আম্মু আসবে। ওরা আমাকে কথা দিয়েছে।

কেউ কিছু বলল না।

নূর: আমার আব্বু বলেছে, আমাকে বইয়ের দোকানে নিয়ে যাবে। আম্মুও বলেছে। ওরা মিথ্যা বলবে না!

তার কণ্ঠ ভেঙে এল। সে দরজার দিকে ছুটে গেল, যেন বাবা-মা এই বুঝি ফিরে এসে তাকে ডাকবেন।

নূর: আব্বু! আম্মু! তোমরা কোথায়? আমি অপেক্ষা করছি!

সেদিন রাতে নূর অনেকক্ষণ দরজার সামনে বসে ছিল। তার পাশে পড়ে ছিল বাবার কিনে দেওয়া গল্পের বইগুলো। সে একটা বই বুকে চেপে ধরে বসেছিল, কিন্তু চোখের সামনে লেখা অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিল।

কিছুক্ষণ পর তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল না, কেন তার সঙ্গে এমন হলো। সে তো কোনো ভুল করেনি। সে তো শুধু তার বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিল।

মাত্র দশ বছর বয়সে নূর বুঝে গেল, পৃথিবীতে এমন কিছু হারিয়ে যাওয়া আছে, যা কোনো কান্না দিয়েই ফিরিয়ে আনা যায় না।

বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর নূরের দায়িত্ব নিলেন তার আপন চাচা আরিফুল সিকদার। তিনি ছিলেন রাহিদ সিকদারের ছোট ভাই। বড় ভাইয়ের একমাত্র মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে তাঁর এক মুহূর্তও দ্বিধা হয়নি।

নূর যখন চাচার বাড়িতে পৌঁছাল, তখন তার হাতে ছিল ছোট্ট একটা ব্যাগ। ব্যাগের ভেতরে কয়েক জোড়া কাপড়, কয়েকটা খাতা আর বাবার কিনে দেওয়া গল্পের বইগুলো।

নতুন বাড়িতে ঢুকে নূর চারপাশে তাকাল। সবকিছুই অচেনা। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে।

আরিফুল সিকদার: ভয় পাস না, মা। এটা তোরও বাড়ি। তুই এখানে থাকবি, পড়াশোনা করবি। তোর যা দরকার হবে, আমাকে বলবি।

নূর: চাচা, আমি এখানে থাকলে তোমাদের অসুবিধা হবে না তো?

আরিফুল সিকদার কিছুক্ষণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এত ছোট একটা মেয়ে নিজের আশ্রয় নিয়েই দুশ্চিন্তা করছে—এটা ভাবতেই তাঁর বুকটা ভারী হয়ে এল।

আরিফুল সিকদার: এ কেমন কথা বলছিস, মা? তুই আমার ভাইয়ের মেয়ে। তুই আমার নিজের মেয়ের মতো। তোর জন্য এই বাড়ির দরজা সব সময় খোলা থাকবে।

নূর চাচার হাত ধরে মাথা নাড়ল। তার খুব ইচ্ছে করছিল, কেউ তাকে একবার বুকে টেনে নিয়ে বলুক যে সে আর একা নয়।

চাচা তাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শায়লা সিকদারকে দেখে নূর থেমে গেল।

শায়লা সিকদার: এখন থেকে এই বাড়ির খরচ আরও বাড়বে। নিজের সংসার সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়, তার ওপর আরেকজনের দায়িত্ব!

আরিফুল সিকদার: শায়লা, মেয়েটা এতিম হয়েছে। ওর মা-বাবা কেউ নেই। এই অবস্থায় ওকে আমরা কোথায় পাঠাব?

শায়লা সিকদার: আমি কি বলেছি, ওকে রাস্তায় ফেলে দিতে? কিন্তু তাই বলে ওকে নিয়ে এত আবেগ দেখানোরও দরকার নেই। সংসার চালাতে আবেগ লাগে না, টাকা লাগে।

আরিফুল সিকদার: ওর সামনে এসব কথা বলো না। ও অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে এসেছে।

শায়লা সিকদার: আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন এসব কথা থাক।

শায়লা চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর কথাগুলো নূরের কানে রয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, চাচার ভালোবাসা পেলেও এই বাড়িতে সবাই তাকে আপন করে নেবে না।

সেই রাতে বিছানায় শুয়ে নূর বালিশের নিচে বাবার দেওয়া গল্পের বইটা রেখে দিল। তার মনে পড়ছিল, বাবা বলেছিলেন সে বড় হয়ে ভালো মানুষ হবে। মা বলেছিলেন, তাকে কখনো একা থাকতে হবে না।

কিন্তু আজ দুজনের কেউই তার পাশে নেই।

নূর বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদল। কান্নার শব্দ যেন কেউ শুনতে না পায়, তাই সে ঠোঁট চেপে ধরেছিল। সেই বয়সেই সে শিখে গেল, নিজের কান্না নিজেকেই লুকিয়ে রাখতে হয়।

পরদিন সকাল থেকে নূরের জীবনের নতুন নিয়ম শুরু হলো।

চাচা তাকে ভালোবাসতেন। স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করতেন, পড়াশোনার খোঁজ নিতেন, মাঝেমধ্যে তার জন্য খাবার বা বই নিয়ে আসতেন। কিন্তু সংসারের অন্য সবকিছু শায়লা সিকদার নিয়ন্ত্রণ করতেন। নূরের ছোট ছোট ভুলও তাঁর চোখ এড়াত না।

শায়লা সিকদার: নূর, ঘুম থেকে উঠেছিস? রান্নাঘরে এসে একটু সাহায্য কর।

নূর: জি, চাচি। আসছি।

শায়লা সিকদার: শুধু আসছি বললে হবে না। কাজও শিখতে হবে। এই বাড়িতে বসে বসে খেলে চলবে না।

নূর চুপচাপ রান্নাঘরে গিয়ে কাজ শুরু করল। সে জানত, প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই নিজের কাজ শেষ করে পড়তে বসত।

স্কুল থেকে ফিরে কখনো তাকে ঘর গোছাতে হতো, কখনো বাসন পরিষ্কার করতে হতো, কখনো রান্নার প্রস্তুতিতে সাহায্য করতে হতো। সবকিছু শেষ করে পড়াশোনার জন্য সময় বের করতে করতে রাত হয়ে যেত।

তবুও নূর পড়া ছাড়েনি।

একদিন রাতে আরিফুল সিকদার দেখলেন, নূর রান্নাঘরের কাজ শেষ করে টেবিলে বসে পড়ছে। চোখে ক্লান্তি, তবুও বইয়ের ওপর মনোযোগ রাখার চেষ্টা করছে।

আরিফুল সিকদার: মা, এত রাতে পড়ছিস কেন? সকালেও তো পড়তে পারিস।

নূর: সকালে কাজ থাকে, চাচা। আর স্কুল থেকে ফিরে কাজ শেষ করতে করতে রাত হয়ে যায়।

আরিফুল সিকদার: তোর পড়াশোনায় যেন কোনো সমস্যা না হয়। কিছু দরকার হলে আমাকে বলবি।

নূর: আমার কিছু দরকার নেই, চাচা। তুমি শুধু আমার জন্য দোয়া করো।

আরিফুল সিকদার মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি জানতেন, নূর অনেক কিছুই বলতে পারে না। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন না, তাঁর নীরবতার আড়ালে মেয়েটা প্রতিদিন কতটা কষ্ট জমিয়ে রাখছে।

বছর পেরিয়ে গেল। নূর ধীরে ধীরে বড় হলো। তার চেহারায় কোমলতা রয়ে গেলেও চোখে জমল এক ধরনের স্থিরতা। অন্যরা যখন ছোটখাটো দুঃখে ভেঙে পড়ত, নূর তখন নিজের মনকে বুঝিয়ে আবার কাজে ফিরে যেত।

তার কাছে পড়াশোনা শুধু ভালো ফল করার উপায় ছিল না; পড়াশোনা ছিল নিজের জীবন বদলে দেওয়ার একটা পথ।

রাতে নিজের খাতার শেষ পাতায় সে লিখত—

“আমি একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াব। এমন একটা জীবন তৈরি করব, যেখানে কারও কাছে বোঝা হয়ে থাকতে হবে না। আমি নিজের কষ্ট নিজেই সামলাব, কিন্তু কখনো নিজের আত্মসম্মান হারাব না।”

লেখাটা শেষ করে নূর খাতা বন্ধ করত। তারপর পরদিনের পড়াগুলো গুছিয়ে রাখত।

স্কুলের শেষ পরীক্ষাগুলো শেষ হওয়ার পর নূর কলেজে ভর্তি হলো। ভর্তি হওয়ার দিন তার মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল। একদিকে নতুন জায়গায় পড়ার আনন্দ, অন্যদিকে অজানা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চিন্তা।

সকালে সে সাধারণ একটা পোশাক পরে প্রস্তুত হলো। লম্বা কালো চুলগুলো আঁচড়ে গুছিয়ে নিল, ব্যাগে বইখাতা রাখল। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।

মেয়েটা আর আগের সেই দশ বছরের শিশু নেই। জীবনের অনেক কঠিন কথা সে বুঝে গেছে, অনেক কষ্টের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। তবুও তার ভেতরে কোথাও একটা ছোট্ট মেয়ে রয়ে গেছে, যে এখনো বিশ্বাস করতে চায়—একদিন তার জীবনেও ভালো সময় আসবে।

নূর: নতুন একটা শুরু। এবার মন দিয়ে পড়ব। নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করব।

নিজের কথায় নিজেই হালকা হাসল সে। তারপর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কলেজের উদ্দেশে বেরিয়ে গেল।

কলেজের পরিবেশ তার ভালো লাগল। চারপাশে নতুন মুখ, করিডোরে শিক্ষার্থীদের কথাবার্তা, কেউ ক্লাসরুম খুঁজছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে। নূর একটু দূরে দাঁড়িয়ে নোটিশ বোর্ডে নিজের ক্লাসের রুম নম্বর খুঁজছিল।

ঠিক তখনই পাশে একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল।

মেয়েটি: তুমি কি নতুন ভর্তি হয়েছ?

নূর: হ্যাঁ। তুমি?

মেয়েটি: আমিও নতুন। ক্লাসরুমটা খুঁজে পাচ্ছি না। নোটিশ বোর্ডের লেখা দেখে মনে হচ্ছে আরও দুইবার পড়লেও বুঝব না!

নূরের ঠোঁটে ছোট্ট হাসি ফুটল।

নূর: রুম নম্বরটা এখানে লেখা আছে। চলো, একসঙ্গে খুঁজে দেখি।

মেয়েটি: ভালোই হলো! অন্তত প্রথম দিন একা একা ঘুরতে হবে না।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। পথে মেয়েটি নিজের নাম বলল, নূরও তার সঙ্গে পরিচিত হলো। কথাবার্তা খুব বেশি না হলেও নূরের অস্বস্তিটা একটু কমে গেল।

ক্লাসরুমে পৌঁছে তারা পাশাপাশি বসার জায়গা পেল। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে মেয়েটি আবার কথা বলল।

মেয়েটি: তোমার বাসা কি এখান থেকে অনেক দূরে?

নূর: খুব বেশি দূরে না। তবে আসতে একটু সময় লাগে।

মেয়েটি: আমারও তাই। কলেজ শেষ হলে একসঙ্গে বের হতে পারি, যদি তোমার আপত্তি না থাকে।

নূর: আপত্তি থাকবে কেন? অবশ্যই পারি।

কথাটা বলতে গিয়ে নূরের মনে হলো, অনেক দিন পর কেউ তার সঙ্গে এমন স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে। তাকে নিয়ে কারও বিরক্তি নেই, তাকে নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। এই ছোট্ট পরিচয়টুকুও তার কাছে ভালো লাগল।

ক্লাসে শিক্ষক পড়াতে শুরু করলেন। নূর মনোযোগ দিয়ে নোট নিতে লাগল। নতুন বই, নতুন ক্লাস, নতুন পরিবেশ—সবকিছুতেই নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল সে।

ক্লাস শেষে ব্যাগ গুছিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে নূর আকাশের দিকে তাকাল। দিনের আলো তখনো উজ্জ্বল। কলেজের গেটের বাইরে মানুষের ভিড়, রাস্তার পাশে খাবারের দোকান, আর শিক্ষার্থীদের হাসি-আড্ডা।

তার মনে হলো, জীবনের সবকিছু হয়তো এখনো খারাপ হয়ে যায়নি। এত কষ্টের পরও সে পড়াশোনা করতে পারছে, নিজের স্বপ্ন ধরে রাখতে পারছে। ছোট্ট একটা বন্ধুত্বও হয়তো তার দিনগুলোকে একটু সহজ করে তুলবে।

বাড়িতে ফিরে নূর নিজের ব্যাগ গুছিয়ে পড়ার টেবিলে বসল। নতুন খাতার প্রথম পাতায় সুন্দর করে নিজের নাম লিখল—রুবায়েত নূর সিকদার।

তারপর খাতার নিচে ছোট করে লিখল—

“নিজের স্বপ্নের কাছে কখনো হার মানা যাবে না।”

কলমটা বন্ধ করে নূর খাতার ওপর হাত রাখল। জানালার বাইরে সন্ধ্যা নামছিল। রান্নাঘর থেকে শায়লা সিকদারের ডাক ভেসে এল।

শায়লা সিকদার: নূর! পড়া পরে করিস। আগে রান্নাঘরে এসে হাত লাগা!

নূর: জি, চাচি। আসছি।

খাতাটা বন্ধ করে সে উঠে দাঁড়াল। নিজের বইগুলো যত্ন করে টেবিলের এক পাশে রেখে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

তারপরও মনের ভেতর নতুন কলেজের প্রথম দিনের স্মৃতিটুকু রয়ে গেল—অপরিচিত একটা মুখের সঙ্গে পরিচয়, পাশাপাশি বসে ক্লাস করা, আর বহু দিন পর নিজের অজান্তে একটু হাসতে পারা।

নূর জানত, তার সামনে এখনো অনেক দায়িত্ব আছে। কিন্তু সেদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে অনেক দিন পর নিজের আগামী দিনগুলো নিয়ে একটু আশাবাদী বোধ করল।

চলবে...

🚫⚠️ সতর্কবার্তা ও লেখিকার অনুরোধ ⚠️❌

এই উপন্যাসটি সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব মৌলিক লেখা। লেখিকার অনুমতি ছাড়া কোনো অংশ কপি, নকল বা অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। অন্যের লেখা নিজের নামে প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন।

লেখার মধ্যে অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং গঠনমূলক পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকবেন। 🙂
✍️ writer – Alifa madbar
🎵 TikTok ID: @alifa.madbar

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন