সারারাতের ঝড়-বৃষ্টির পর সকালটা যেন প্রকৃতির নতুন করে সেজে ওঠা। রাতের ভারী বৃষ্টিতে পুকুরের জল টলমল করছে, পাড়ের ঘাসে জমে আছে অসংখ্য শিশির আর বৃষ্টির ফোঁটা। দূরের ধানের জমিগুলো ধুয়ে-মুছে আরও সবুজ হয়ে উঠেছে; বাতাসে দুলছে ধানের শীষ, আর জমে থাকা পানিতে আকাশের মেঘের ছায়া পড়ে তৈরি হয়েছে অপূর্ব এক দৃশ্য।
পাশের বাঁশঝাড়ে বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া বাঁশপাতাগুলো হাওয়ায় মৃদু শব্দ তুলছে। সুপারি বাগানের সরু গাছগুলো ভেজা শরীরে দাঁড়িয়ে আছে নীরবে, পাতার ডগা থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে জমে থাকা জল। কাদামাটির মেঠোপথ, ভেজা ঘাস, পুকুরপাড় আর চারপাশের সবুজ মিলিয়ে মনে হয়-সারারাতের ঝড় যেন প্রকৃতিকে কষ্ট দিয়ে নয়, বরং আরও সুন্দর করে দিয়ে গেছে।
সাথে দিয়েছে উঠোনজুড়ে কাদা আর পানি। কলি ঘর থেকে বেরিয়ে খুব সাবধানে টিপে টিপে পা ফেলতে লাগল। এক পা, তারপর আরেক পা-কোথায় কাদা বেশি, কোথায় পা দেবে, সেই হিসাব করেই এগোতে হচ্ছে। কাদামাটি পাড়িয়ে বাড়ির উঠোন পার হওয়াই তার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠল।
ইদানিং তার পেটের মধ্যে প্রচুর ব্যথা অনুভব করে থেমে থেমে, কলি গর্ভবতী তবে হিসাব জানা নেই কত সপ্তাহ হয়েছে।
বাড়ির পশ্চিম দিকে বাঁশঝাড়ের নিচে পায়খানাটা। ঘর থেকে বেশ খানিকটা দূর। ভেজা কাদা মাড়িয়ে সেখানে যেতে যেতে কলির পা ভার হয়ে আসছিল। কাপড়চোপড় যেন কাদায় না লাগে, পা যেন পিছলে না যায়-এই ভয়ে প্রতিটি পা ফেলছিল অত্যন্ত সাবধানে।তখনি পেছন থেকে খবিরুন নেসা হায় হায় করে উঠলো,
খবিরুন: ও মায়া মায়া গো মায়া, কি সর্বনাশ, কি সর্বনাশ !
কলি চমকে উঠে তাকায় তার নানির দিকে,খবিরুন নেসা ফজরের নামাজ পড়ার জন্য সবে মাত্র পুকুরের ঘাট থেকে ওযু করে বাড়ির উঠানে উঠেছে।
কলি: কি হইলো নানি এইবা চিক্কার পারো কে ?
খবিরুন: এই ভরা শইলে, তুই ছেড়ি উদাম মাতা লইয়া এইনো আইছোস কেন ?
কলি: আমার মুতে ধরছে।
খবিরুন: এহনো আন্দার কাডে নাই ! লগে রসুন-কয়লা কিছু আছে?
কলি: না তো নানি !
খবিরুন: ও মায়া মায়া গো মায়া, ঐ খালেদা কই তুই এই ছেডি কি কয় এডি! ভয়া শইলে একলাই এই বেইন্নাকালে তর ঝি (মেয়ে) বাইরে যায় তাও মাতা উদাম,কইলজায় ডর ভয় কিছু নাই ?
খালেদা মায়ের গলা শুনেই রান্না ঘর ছেড়ে ,ছুটে আসে , ফজরের নামাজ আদায় করে মাত্রই ভাত টা বসিয়েছিল চুলায় সে, বাড়িতে আজকে অনেক মানুষ তাই রান্নাবান্নাও সকাল-সকালই শুরু করে দিয়েছে তিনি। তবে এখন রান্না ঘরের পেছনে আম গাছে নিচে এসে মা আর মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকলে দেখে বুঝে গেল কি হয়েছে।
খালেদা: হায় আল্লাহ কলি তরে কতো কইতাম এমন ঠ্যাং ঠ্যাং কইরা সময়কাল না বুইঝা এইনো হেইনো যাইবি না।
কলি: আম্মা আমি কুনোহানেই যাই নাই, আমার মুতে ধরছে ,মুততে যাই।
খালেদা: এইবা মাতা খুলা রাইক্কা
কথাটি বলতে বলতেই খালেদা খাতুন কলির মাথায় ঘোমটা টেনে দিল বড় করে। খবিরুন নেসা কণ্ঠস্ব নিচু করে বললো,
খবিরুল: পোয়াতি মাইয়াগোর সাবধানে থাহুন লাগে, যতবার পায়খানায় যাইবি মাথায় ভালা কইরা কাপড় দিয়া লইবি,আর বাইরের খাড়াইয়া (আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম, বিসমিল্লাহীর রাহমানির রাহীম) পইড়া ঢুকবি। আর যহন বাহরের তনে ঘরে যাইবি,তহন ঢুকবার সময় লম্বা সালাম দিয়া ভিতরে ঢুকবি।
কলি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল;
কলি: কেলা এইনো সালাম দিতাম কেলা (কেনো)
খবিরুন নেসা ফিসফিস করে বললো;
খবিরুন: এইতা যাগায় ওনাগোর আনিগুনি থাহে।
_____________
মিলনের অভ্যাস, ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে জানালা খুলে বসা। তারপর বাসি মুখে বিড়ি ধরানো। যদিও তা তার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তবুও এমনটা না করলে তার মস্তিষ্ক ভালোভাবে সজাগ হয় না_এটাই তার ধারণা।
বিড়ি টানার ফাঁকে ফাঁকে মিলন রেবেকার দিকে তাকায়। রেবেকা নড়াচড়া করছে। ঘুম ভাঙার আগে সে এমনটাই করে। তবে শাড়ির বেহাল অবস্থা-আঁচল পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মিলন এসব দেখে অভ্যস্ত।
তবে আজ তার পুরুষালি সত্তা একটি বিষয় লক্ষ্য করল। রেবেকার গায়ের ব্লাউজ আঁটসাঁট হয়ে আছে , ব্লাউজ মাপ গায়ে ছোট হয়ে গেছে।যার অর্থ কি দাঁড়ায় তা বুঝতে পেরেই মিলনের টানটান অবস্থা হয়ে এলো,লুঙ্গি ঠিক করে নড়েচড়ে বসল সে। শুকনো গলায় ঢোক গিলে গলা ভেজানোর চেষ্টা করল। তাতেই বিড়ির ধোঁয়া গলায় আটকে কাশি উঠে গেল।
রেবেকা হঠাৎ কানের কাছে জোরে কাশির শব্দ শুনে ধরফড়িয়ে উঠল। কাশির কারণে মিলনের নিঃশ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। রেবেকা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। বিষয়টা বুঝতে পেরে এগিয়ে গিয়ে মিলনের পিঠে হাত বুলিয়ে বলতে লাগল-
রেবেকা : আল্লাহ কিতা হইছে আন্নের সহাল সহাল।
কিন্তু মিলন কিছু বলতে পারল না। স্বাভাবিক হতে তার একটু সময় লাগবে। রেবেকা তার হাতে জ্বলতে থাকা বিড়িটার দিকে তাকিয়ে বুঝে নিল কী হয়েছে। এমনটা আজ প্রথম নয়, লোকটার প্রায়ই সকালবেলা এমনটা হয়। তবে আজ রেবেকার হঠাৎ ভীষণ রাগ উঠে গেল। যা কখনো করেনি, আজ সেটাই করে বসল।
মিলনের পেছনে দাঁড়িয়ে সে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। ওভাবেই হঠাৎ পেছন থেকে ঝুঁকে এল মিলনের বাঁ পাশের দিকে। মিলন কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবাক হয়ে গেল , রেবেকা ততক্ষণে তার হাত থেকে বিড়িটা কেড়ে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলেছে।
তাতেও থেমে থাকল না রেবেকা। কড়া গলায় বলে উঠল-
রেবেকা: আন্নে সহাল সহাল খালি পেটে বিড়ি টানা ছাড়বাইন ?
মিলন অবাকের পর অবাক হয়ে যাচ্ছে যেন। রেবেকা এই প্রথম এমন অধিকার নিয়ে নিজের থেকে কিছু করল। মিলন অনুভব করল, তার কাশি বন্ধ হয়ে গেছে। রেবেকা শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বিছানা ছেড়ে-
রেবেকা: চুপ আছুইন যে, কতা কন না কে ?
রেবেকা মিলনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মিলন রেবেকার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে দেখল। একটু আগেই যে সাহস দেখিয়ে বিড়িটা ফেলে দিয়েছিল, তাতে তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই, ভয়ও নেই। বরং এখনো তার সামনে দাঁড়িয়ে ঝেড়ে কথা বলছে, প্রশ্ন করছে। আবার উত্তরের আশায় কপাল কুঁচকে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মিলন: কি কইতাম ?
রেবেকা: সহালে খালি পেটে বিড়ি খাওয়া ছাড়তাইন না?
মিলন: বিড়ির কি দোষ? কি করলো ?
রেবেকা চোখ বড়বড় করে তাকালো, মিলনের কথা শুনে সে অবাক হল বলল;
রেবেকা: কিছু করে নাই? সহালে বিড়ি টাইনা যে মইধে মইধে বুইড়া বেডাইনগোর লাহান কাঁশতে কাঁশতে দম বন্ধ হয়।
এবার বিষম খেল মিলন। রেবেকা তাকে বুড়ো লোকের সঙ্গে তুলনা করেছে-বিষয়টা মোটেও ভালো লাগল না তার। সে কোন দিক দিয়ে বুড়ো? কথাটা ভাবতেই মিলনের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর সে গম্ভীর মুখে বলল-
মিলন: বিড়ি লাইগা কাশি উডেনাই বিবি
রেবেকা: তো কিয়ের লাইগা উডে?
মিলন: তোমার লাইগা
রেবেকা: আমার লাইগা ! আমি কিতা করলাম?
মিলন: বহুত কিছু করছো, করতাছো।
রেবেকা: কি ? কি সব মিছা কতা কওয়া ধরছেন?
মিলন: মিছা কতা কইতাম কে, এই মিলন কুনোদিন মিছা কয়না।
রেবেকা: মিছা কইয়াও কয় মিছাকতা কয় না,কাইজ্জাখুইড়া বিড়িখুইড়া বেডা।
মিলন: তুমিও কাইজ্জাখুইড়া বেডি।
রেবেকা: আমি কাইজ্জা পারিনা।
মিলন: তাইলে আমি কি হাওয়ার লগে কাইজ্জা করতাছি ?
এবার রেবেকা চুপ হয়ে ভাবতে লাগল-সেও তো মিলনের কথার উত্তর দিচ্ছে, তাহলে সেও কি ঝগড়া করছে?
মিলন রেবেকার হাত শক্ত করে ধরে বলল-
রেবেকা: সাহস তো বালাই বাড়ছে বিবি,তয় আমি কিন্তু সত্য বিড়ির লাইগা কাশি না।
রেবেকা: তাইলে?
মিলন নির্লজ্জের মত রেবেকার শাড়ির আঁচল জায়গা থেকে নিচে টেনে নামিয়ে দিলো, চোখের ইশারায় দুষ্টুমি ঢেলে দিয়ে বলল-
মিলন: সহাল সহাল তোমার এই রূপে আমার অবস্থা বেহাল কইরা দেয় বিবি , ইচ্ছা করে,,,,
মিলন আর মুখে কথাটা বলল না, কী বোঝাতে চাইছে-ইশারাতেই তা বুঝিয়ে দিল। রেবেকা ততক্ষণে লজ্জায় লাল-নীল-হলুদ রঙে নিজেকে যেন বদলে ফেলতে লাগল। তাকে দেখতে মিলনের কাছে বেশ আকর্ষণীয় লাগছিল। মিলন বেহায়ার মতো আবারও রেবেকার শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে দিয়ে তাকে মনের মনে মনে "বিসমিল্লাহ" বলেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেবেকার ঘাড়ে আলতো করে দাঁত বসাল।
শক্ত করে ধরে রাখায় রেবেকার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। দাঁত বসাতেই সে মৃদু আওয়াজ করে বলল-
রেবেকা: উম্ উম্ উম্
মিলন: একটু এইবা থাহ সোনা
রেবেকা: উম্ এতো শক্তে ধরছুইন কে , দুক্কু লাগে তো।
মিলন: দুক্কু দিবার মতো কিছুই করি নাই এহনে বিবি, তয় জলদি করুন লাগবো।
রেবেকা: কি ?
মিলন: হ , দিতানা ?
রেবেকা লজ্জায় আর কোনো কথাই বলতে পারল না। তাকে চুপ থাকতে দেখে মিলন ইচ্ছা করে আবারও একটা কামড় বসায়। কিন্তু এবার রেবেকা নড়েও না, কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখায় না। মিলন রেবেকার ঘাড়ে কামড় দেওয়া স্থানে অধর ঘষে মুচকি হাসে।
___________________
সকালের নাস্তায় খালেদা খাতুন বেশ আয়োজন করেছেন, বাবার পছন্দের খাবার রান্না করেছে। গরম ভাত, দেশি মোরগের গোশত ছোট আলু দিয়ে ঝোল, পেঁপে ভাজি, কচুর বড়া, সঙ্গে নোনা ইলিশের ডিম ভাজা। সবই হাসমত সওদাগরের খুব পছন্দের খাবার। বাবার পছন্দের খাবারগুলো রান্না করতে পেরে খালেদা খাতুনের মনটাও আজ বেশ ভালো। এমন খুশি হতে কয়টা নারী পারে? বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে নিজের বাবার পছন্দের খাবার রান্না করার মত সৌভাগ্য সবার হয় না।
বারান্দার শীতলপাটিতে পাশাপাশি বসে খেতে শুরু করেছে হাসমত সওদাগর, বাদল মাস্টার আর মিলন।হাসমত সওদাগর খাওয়ার এক ফাঁকে এদিক-ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল-
হাসমত: মাসুদ কি বাইত আইয়ে না?
মিলন: ওয় দাদির লগে মুক্তাগাছায় গেছে।
কথার ফাঁকে খালেদা খাতুন মূল প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেল। শুধু মাসুদ কবে গেছে এবং আমিনা বেগম আরও কয়েক দিন সেখানে থাকবেন-সেই কথাটুকুই বলল। রেবেকার সঙ্গে তার শাশুড়ি কী করেছে, সে কথা এই মুহূর্তে আর তুলল না। পাশে স্বামী বসে আছে, তাই কথাটা প্রকাশ করতেও সাহস হলো না।
সব শুনেও হাসমত সওদাগর স্বাভাবিকভাবেই খেতে খেতে বলল-
হাসমত: তা দাদিরে দিবার গিয়া হেইনো থাহুন লাগে ক্যান? পোলাপান মানুষ, মাইয়া-ঘটিত কোনো ঘটনা ঘইটা গেলে পরে কিরুম হইবো?
বাবার কথা শুনে খালেদা খাতুন চমকে উঠল। তবে বাদল মাস্টার সঙ্গে সঙ্গে কথাটা কেটে দিয়ে বলল-
বাদল: আমার মাসুদ মাদ্রাসার ছাত্র। শান্ত, ভদ্র। কয়দিন পর হাফেজ হইবো, ভবিষ্যতে বড় মাওলানা। হের অরুম সভাব নাই, আব্বা। তারে লইয়া আমার বহুত স্বপ্ন।
মিলনের খাওয়ার গতি ধীরে ধীরে কমে গেল।
বাবার মুখে স্বপ্নের কথা শুনে তার নিজের কথাও মনে পড়ে গেল। একসময় তাকেও নিয়ে বাদল মাস্টারের কত স্বপ্ন ছিল-ছেলেকে বড় শিক্ষক বানাবেন। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি মিলন। দ্বিতীয়বার সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি। তাই এখন তার একটাই চাওয়া-মাসুদ যেন বাবার সেই অপূর্ণ ইচ্ছেটা পূরণ করে।
সে কারণেই তো ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ সময়মতো পাঠিয়ে দেয় সবসময়। তবে কুড়ি বছর বয়স চলমান মাসুদ এখনো হাফেজির পাগড়ি পায়নি। বছর দুয়েক আগে এ নিয়ে মিলন তার বাবাকে দু-একটা প্রশ্ন করেছিল। বাদল মাস্টার তখন কড়া গলায় বলেছিল-“হাফেজি লাইনে পড়া বাংলা পড়ার মতো এত সহজ না। সময় লাগবে।”
তারপর থেকে মিলন আর কোনো দিন ভাইয়ের পড়াশোনা নিয়ে বাবাকে কিছু বলেনি। তবে সময় মত মাসুদের পড়াশোনার টাকা বরিশালের মাদ্রাসার ঠিকানায় পাঠাতে থাকে, কিন্তু ভাইয়ের ব্যাপারে সে বাবাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করে না ,তার বাবা একজন শিক্ষক সে যা বুঝবে, যা করবে ভালোই করবে এই আত্মবিশ্বাসে।
হাসমত সওদাগর এবার জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল-
হাসমত: তুমি এতো ভরসা দিয়া কেমনে কইবার পারো, জামাই? মুন্সি-হুজুরগো লগে শয়তানও থাকে। তারা মাথা নষ্ট কইরা দেয়, জানো না? পুতের খবর রাইখো।
কথাটা বলে হাসমত সওদাগর খাওয়া শেষ করল। হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়িয়ে যেতে যেতে মিলনের দিকে তাকিয়ে বলল-
হাসমত: আমি কদমতলায় গেলাম। হেই জিনিস লইয়া তাত্তারি আইয়ো। দরহারি কতা আছে।
মিলন মাথা ঝাঁকাল। ‘হেই জিনিস’ বলতে নানা যে বিড়ির কথাই বলেছে, তা বুঝতে তার বাকি রইল না।
মিলন তার অর্ধেক খাওয়া থালাটা পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকা রেবেকার দিকে সরিয়ে দিল। ইশারায় এই থালাতেই খেতে বলে সে উঠে গেল।
এতক্ষণ খালেদা খাতুন ছেলের প্লেটে মোরগের গোশতের ভালো ভালো টুকরো তুলে দিচ্ছিল। মিলন একবারও মাকে নিষেধ করেনি। কারণ, মনে মনে সে আগেই ঠিক করে রেখেছিল-সবটুকু তার বিবিকে খাওয়াবে। সবার সামনে বসে রেবেকা কী খায়, সেটা তো সে ভালো করে দেখতে পারে না। তাই এই ছিল তার ছোট্ট চালাকি।
খালেদা খাতুন মুখে কিছু বলল না, কিন্তু ছেলের এমন কাণ্ডে ভেতরে ভেতরে বেশ বিরক্ত হলো। তবে দাদির কাছ থেকে পাওয়া সেই পুরোনো ধৈর্য আর সংসার সামলে চলার অভ্যাস আঁকড়ে ধরে নিজের ভেতরের অস্বস্তিটাকে চেপে রাখল।
অন্যদিকে, শ্বশুরের কথায় বাদল মাস্টার বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। তার শ্বশুর মানুষটা কম বোঝেন না। না বুঝে, না শুনে তিনি হুটহাট কোনো কথা বলবেন-এমন মানুষও নন।
খাবার খেতে খেতেই বাদল মাস্টার মনে মনে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
___________
বেশ খানিকটা সময় ধরে কদমগাছের নিচে বসে বিড়ি টানছে হাসমত সওদাগর আর মিলন। সওদাগর আসমানীকে নিয়ে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা খুলে বলল মিলনের কাছে।
সবকিছু শুনে মিলন কিছুক্ষণ তব্দা খেয়ে বসে রইল। তারপর চিন্তিত মুখে বলল-
মিলন: হেয় এইনো আইবার চাইছিল কে? আর আইলোই যহন, তাইলে বাইত না আইয়া কই গেলো নানা?
হাসমত: আমিও ঐডাই ভাবতাছি রাইতের তনে। কই গেছে মাইয়াডা!
মিলন: আন্নে রাইতে কন নাই ক্যান আমারে? এত বড় একটা রাইতে একলা একটা মাইয়া কই গেছে, কেমন আছে-খারাপ কিছু হইছে কিনা, কে জানে!
হাসমত: কইতাম, যদি ঝড়-তুফান না থাকতো। হের উপর তার জর আছিল। ঝড়ের রাইতে কি কোনো দিন যাইবার পাইতাম?
মিলন এবার নানা চিন্তাভাবনার ভিড়ে কিছুটা বিরক্ত হয়ে উঠল। যত সমস্যাই থাকুক, একটা মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে-কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, খারাপ কিছু হলো কি না, কে জানে! নিজের মেয়ে হলে কি ঝড় বৃষ্টি মানতো?হাসমত সওদাগর মুরব্বি মানুষ, তাই তাকে আর কিছু বলল না মিলন। তবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এখনই আসমানীকে খুঁজতে বের হবে।
মিলন: নানা, আমি দুহানে যাইতাছি। দুহান থেইকা দুইডা ছেড়া লইয়া নদীর দিকে খুঁজবার যামু। হাজার হক, আসমানী আন্নেগো লগে থাকতো। এমনে তো হের বাড়ির লোকজন হেরে ভালা পায় না। তয় এহন কিছু হইলে আন্নের লগে কাইজ্জা বান্ধাইবো। বড়মা-নানি, হেগোরে কিছু কওন লাগবো না। আগে দেহি কী হয়।
কথাটা বলেই মিলন হাঁটা ধরল বাড়ির দিকে। তৈরি হয়ে সে বের হবে। হাসমত সওদাগরও নাতির সঙ্গে যাওয়ার কথা ভাবল। তাই সেও মিলনের পিছু নিল।কিন্তু বাড়ির উঠানে পা রাখতেই দুজনেই থমকে দাঁড়াল।অবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল তারা।
আসমানী!
আসমানী তাদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক ছেলে।
হাসমত সওদাগরকে দেখামাত্র আসমানী ছুটে গিয়ে তার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। নিজের কৃতকর্মের জন্য বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল। তার ভুল হয়ে গেছে। এমন ভুল জীবনে আর কোনো দিন করবে না। এই ঘটনাই তাকে চরম শিক্ষা দিয়ে দিয়েছে। অতিরিক্ত লোভে তার মাথাটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অন্যের সংসারে হাত দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনকেই বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল সে।
হাসমত সওদাগর পাষাণ মানুষ নন, তবে তিনি প্রচণ্ড বিরক্ত। আসমানীর কান্নার শব্দে বাড়ির সবাই একে একে উঠানে জড়ো হয়ে গেল।
ঘষেটি বেগম আর খালেদা খাতুন তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল। খবিরুন নেসা ছুটে গিয়ে আসমানীকে ধরে ফেলল। তারপর অস্থির হয়ে চাপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-
খবিরুন: কই আছিলি তুই?
আসমানী এবার হাসমত সওদাগরের পা ছেড়ে খবিরুন নেসাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। কান্নার জন্য কোনো কথাই বলতে পারছে না। খবিরুন নেসা অনুভব করল, আসমানীর গোটা শরীর থরথর করে কাঁপছে। ,জ্বরে যে গা পুড়ে যাচ্ছে। তবে নিজের কাছের মানুষগুলোকে দেখে অতিরিক্ত আবেগে অসুস্থ শরীরেও নিজেকে সামলাতে পারল না আসমানী। চিৎকার করছে, বিলাপ করছে, ক্ষমা চাইছে-কিন্তু তার একটি কথাও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
গায়ের সাদা শাড়িটা কাদায় মাখামাখি। আহত শরীরে জমাট বাঁধা রক্তের চিহ্ন রয়েছে, যা স্পষ্টতই অশুভ কোনো ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ঘষেটি বেগমের নাতনির এমন অবস্থা দেখে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। আসমানী হাসমত সওদাগরের ভাইয়ের মেয়ে হতে পারে, তবে ঘষেটি বেগমের কাছে সে নিজের নাতনি,যেমনটা খালেদা খাতুন।
আসমানীর কোনো খারাপ কিছু হয়ে থাকলে, সে কীভাবে তা সহ্য করবে?
রেবেকা কী বুঝল, কে জানে! আসমানীর কান্না দেখে সেও কাঁদতে শুরু করল। আহ্লাদী বউয়ের মতো মিলনের গায়ের শার্ট খামচে ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কাঁদছে।
মিলনের আবার তার বিবির কান্না একদম সহ্য হয় না। দুনিয়াদারি সব ভুলে রেবেকার চোখের পানি মুছতে ব্যস্ত হয়ে গেল সে। চাপা কণ্ঠে বারবার বলে চলল-
মিলন: উফ্, বিবি, কান্দনা সোনা। কিছু হই নাই তো।
বাড়ির প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে গুলনাহার আগুনঝরা চোখে মিলন আর রেবেকার দিকে তাকিয়ে আছে। আসমানীর চিৎকার শুনেই কী হয়েছে তা দেখার জন্য ছুটে এসেছিল সে। কিন্তু কী দেখতে এসে কী দেখে ফেলছে-তা যেন তার মাথার ভেতর তোলপাড় করে দিচ্ছে।
চোখের সামনে দৃশ্যটা দেখে গুলনাহারের বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠল।
-------
হঠাৎ করেই আসমানী জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। মুহূর্তেই হাসমত সওদাগর নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। বাড়ির মহিলারা হায় হায় করতে করতে দ্রুত আসমানীকে ধরে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন।
এদিকে হাসমত সওদাগর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আসমানীর সঙ্গে আসা লোকটির হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখেমুখে তখন ভয়ংকর রাগ।
হাসমত সওদাগর গর্জে উঠলেন-
হাসমত : কী করছোস তুই, হারামজাদা-বান্দির পুত? কী করছোস আমার ভাছতির লগে?
নানা শ্বশুরের এমন রূপ দেখে রেবেকা ভয়ে কেঁপে উঠল। পরিস্থিতি সামাল দিতে মিলন দ্রুত নানাকে ইশারা করে থামতে বলল। তারপর রেবেকার দিকে তাকিয়ে বলল_
মিলন: বিবি, অচেনা পুরুষের সামনে এইবা খাড়াই আছো ক্যান? ঘরে যাও। আমি আইতাছি।
রেবেকা মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাল। তারপর দ্রুত ঘরের দিকে ছুটে গেল। তবে নিজের ঘরে নয়-সে চলে গেল আসমানীকে যে ঘরে নেওয়া হয়েছে, সেদিকেই।
রেবেকা চোখের আড়াল হতেই মিলন ধীরে ধীরে লুঙ্গির কাছাটা দুই হাতে উঁচু করে দু-পায়ের ফাঁক দিয়ে পেছনের কোমরে গুঁজে নিল। তারপর লুঙ্গির কাছা থেকে একটা বিড়ি বের করে দুই ঠোঁটের মাঝখানে রাখল। আগুন ধরিয়ে কয়েক টান দিতেই বিড়ির ধোঁয়া চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
বারান্দার একপাশ থেকে মোটা মান্দার গাছের একটা লাঠি তুলে নিল মিলন। তারপর ধীর পায়ে লোকটির কাছে গিয়ে কোনো কথা না বলে সোজা তার পায়ে একটা আঘাত করল।
:----- আআআআ!
লোকটির মুখ থেকে তীব্র চিৎকার বেরিয়ে এল।
মিলন সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে তার মুখ চেপে ধরল। তারপর তাকে টেনে বাড়ির পেছনের (গোয়ালি ঘরে)গরুর ঘরের ভেতর নিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসমত সওদাগর ও মিলন দুজনে মিলে লোকটির দুই হাত পেছনদিকে নিয়ে গরু বাঁধার মোটা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলল।
গোয়ালি ঘরের আবছা অন্ধকারে তখন শুধু লোকটির ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।
মিলন গরুর জন্য ঘাস কাটার চিকন, লম্বা দাটার দিকে হাত বাড়াল। দাটা হাতে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে এপাশ-ওপাশ করে দেখতে লাগল সে।
ততক্ষণে তার ঠোঁটে থাকা বিড়িটা অর্ধেকেরও বেশি জ্বলে গেছে। মিলন বিড়িটা দুই আঙুলের ডগায় নিয়ে জোরে জোরে কয়েকটা টান দিল। তারপর সেটাকে দূরে ছুড়ে ফেলল।
বিড়ির শেষ আগুনটা মাটিতে পড়ে নিভে গেল।
মিলনের নাক-মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা কালো ধোঁয়া মুহূর্তের জন্য গোয়ালি ঘরের বাতাসটাকেও ভারী করে তুলল। সে দাটার ধারালো ফলার দিকে একবার তাকাল, তারপর লোকটির দিকে চোখ তুলে দাঁত কটমট করে রাগী কণ্ঠে বলল-
মিলন: দেখ ইজ্জত ছাড়া আমি কুনো কিছুই ডরাই না এই দুনিয়াত--- তরে কুপাইয়া এই গোয়ালির মাডিত(মাটিতে) পুইতা (মাটি চাপা) রাখলেও কেউ টের পাইতো না।তাই একবার জিগাইয়াম (জিগ্গেস করমু) সত্য কইবি,কি করছোস ছেড়িডার লগে?