ফন্ট সাইজ:
থিম:
অপরিপক্ক

অপরিপক্ক পর্ব ৩৪

লেখক: যাজিবা জাবিন

আশ্বিনের শেষরাত। ফজরের আজান এখনো ভেসে আসেনি। গ্রামটা ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে। দূরে দু-একটি মাটির ঘরের জানালা দিয়ে কুপির মিটমিটে আলো দেখা যায়, আর সেই ক্ষীণ আলোও যেন অন্ধকারের কাছে বারবার হার মেনে যায়। বিলের কালো জলে চাঁদের আবছা আলো কেঁপে কেঁপে পড়েছে। জলের বুকজুড়ে ফুটে থাকা শাপলাগুলোকে দূর থেকে মনে হচ্ছে অন্ধকারের মধ্যে ভেসে থাকা সাদা সাদা মুখ।

ধানক্ষেতের ওপর শিশির আর পাতলা কুয়াশা জমেছে। বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে পাতার সোঁ সোঁ শব্দ ওঠে, আবার মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক, কোথাও রাতজাগা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ, আর হঠাৎ দূরের কোনো কুকুরের অকারণ ঘেউ ঘেউ-নিস্তব্ধ রাতটাকে আরও অচেনা করে তোলে।

গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা বিশ্বাস করে, রাতের এই শেষ প্রহরটা অন্য সময়ের মতো নয়। এই সময় নাকি জিন-পরির আনাগোনা বাড়ে। নির্জন বিলের পাড়ে, পুরোনো বটগাছে, বাঁশঝাড়ে কিংবা জনমানবহীন কাঁচা পথ-এসব জায়গা রাতে এড়িয়ে চলাই ভালো। কেউ কেউ বলত, গভীর রাতে সাদা পোশাকের কোনো ছায়া বিলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়; কেউ তাকে পরি বলত, কেউ আবার ভয়ে পেত্নী বলে মনে করে।

আবার কখনো দূরের বিলের ওপর অচেনা কোনো আলো জ্বলে উঠলে গ্রামের মানুষ তাকে বলে-"আলেয়া"। এই আলো নাকি পথিককে ভুলিয়ে নিয়ে গেছে বহুবার অন্ধকারের অনেক গভীরে। সত্যি কী? মানুষের ভয় ও কল্পনার সৃষ্টি কী-তা কেউ জানত না। কিন্তু রাতের নিস্তব্ধতা যখন চারদিক গ্রাস করে রাখে, তখন সামান্য একটা শব্দও অজানা কিছুর উপস্থিতি বলে মনে হয়।

তাই ফজরের আজানের আগের সেই সময়টুকুতে গ্রামের মানুষ দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরের ভেতরেই থাকে। বাইরে কেবল কুয়াশায় ঢাকা বিল, শাপলার নিঃশব্দ সৌন্দর্য আর অন্ধকারের বুক চিরে ভেসে আসা অচেনা কিছু শব্দ। সবাই তখন অপেক্ষা করে সেই প্রথম আজানের জন্য-যে আজানের ধ্বনি উঠলেই মনে হয়, রাতের সমস্ত অশরীরী ভয়, রহস্য আর অন্ধকার ধীরে ধীরে ভোরের আলোয় মিলিয়ে যাচ্ছে।

_________

মিলন ও তার নানা হাসমত সওদাগরের রাতের ঘুমের জায়গা হয়েছে মাটির ঘরের খোলা বারান্দায়। বাড়ি ফিরতে তাদের বেশ রাত হয়ে গেছে। পুকুরঘাটে গিয়ে দুজনেই হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে। তারপর বাড়ির ভেতরে ঢুকে যে যার ঘরের দিকে পা বাড়াতেই, মিলনের ঘরের ভেতর থেকে ভেসে এলো ঘষেটি বেগমের কড়া গলা-

ঘষেটি:: খবরদার দরজাত টুহা দেইছ না ক‌ইলাম , এই রাইতে কেউ ঘরে ঢুকবার পাইতে না। ক‌ইলজাডা কতথান্নি বড় (কলিজাটা কতো বড়) বান্দির পুতাইন, বাইত কত্তডি বেইডাইন (বাড়িতে কতো গুলো মহিলা) এলহা রাইহা শেষ রাইত তরি (একা রেখে শেষ রাত পর্যন্ত )বাইরে থাহা! এ ঘরে ঢুকবার দিতাম না, ফজরের আজান পরলে ওযু কইরা নাহন (গোসল) দিয়া মসজিদতনে নামাজ প‌ইড়া পরে ঘরে ঢুকবি খরাফের বিছুইন (খারাপের জাত)।

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ঘষেটি বেগম কথাগুলো চিবিয়ে চিবিয়ে বলছিল। বৃদ্ধার গলায় রাগের সঙ্গে মিশে ছিল একধরনের চাপা শঙ্কা। যেন এত রাত অবধি বাইরে থাকার জন্য শুধু বকাঝকা নয়, অদৃশ্য কোনো বিপদ থেকেও তাদের সাবধান করে দিচ্ছিলেন তিনি।

মিলন কিংবা হাসমত সওদাগর-কেউই তার কথার বিপরীতে একটি শব্দও বলল না। একজনের মা, অন্যজনের বড়মা; তার কথা অমান্য করার সাধ্য কিংবা ইচ্ছা কোনোটাই তাদের ছিল না।

তবু মিলনের মনটা পড়ে রইল নিজের ঘরের দিকে।

রেবেকা কি খুব ভয় পেয়েছে? এত রাত হয়ে যাওয়ায় কি বড়মাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে আশ্রয় নিয়েছে? ভয় পাওয়ারই কথা। চারদিক তখন গভীর রাতে ডুবে আছে। গ্রামের নির্জন পরিবেশে, বাঁশঝাড়ের সোঁ সোঁ শব্দ, ঘরের পেছনের পুকুরের পানির শব্দ-সব মিলিয়ে এমন রাতে একা ঘরে থাকাটাও সহজ কথা নয়।

কিন্তু ঘরে ঢোকার উপায় নেই।

অগত্যা মিলন আর হাসমত সওদাগর বারান্দায়ই শোয়ার আয়োজন করল। মাটির মেঝেতে শীতলপাটি বিছিয়ে দুজন পাশাপাশি শুয়ে পড়ল। বালিশেরও ব্যবস্থা নেই; তাই নিজেদের হাত টাকেই বালিশ বানিয়ে নিল।

কিছুক্ষণ পর চারপাশের নীরবতার ভেতর হঠাৎ মিলনের কানে ভেসে এলো হাসমত সওদাগরের নাক ডাকার শব্দ। শব্দটা শুনে মিলনের ঠোঁটের কোণে শান্ত একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। বালিশ ছাড়া শুয়েছে বলেই বোধহয় বৃদ্ধের এমন জোরে নাক ডাকা-ভাবতে ভাবতে মিলন নিঃশব্দে উঠে বসল।

বারান্দার বাঁশে মেলে রাখা তার আম্মা খালেদার একটি কাপড় হাতে নিয়ে সেটি পেঁচিয়ে নানার মাথার নিচে বালিশের মতো করে দিল। তারপর আবার নিজের জায়গায় আগের মতোই শুয়ে পড়ল। মুখে রাখা বিড়িটায় জোরে টান দিল সে। ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ছেড়ে দিয়ে আবার কান পেতে রইল নিজের ঘরের দিকে।

ওপাশে ঘষেটি বেগম তখনো ধীর গলায় বকেই চলেছেন। মাঝে মাঝে তার কথার ফাঁকে আরেকটি নারীকণ্ঠও ভেসে আসছে। রেবেকা কি কথা বলছে? নাকি বড়মার বকুনিতে চুপচাপ শুনে পড়েছে?

মিলন ঠিক বুঝতে পারল না।

তার বুকের ভেতর শুধু একটাই কৌতূহল ঘুরপাক খেতে লাগল-তার বিবি কি এখনো জেগে আছে, নাকি ঘুমিয়ে পড়েছে?

তবে ঘষেটি বেগমের কথার একেবারে অযৌক্তিকতাও নেই। এত রাতে তারা কত পথ হেঁটে, কত নির্জন জায়গা পেরিয়ে বাড়ি ফিরেছে। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস-রাতের শেষ প্রহরে নির্জন পথঘাট, বিলের পাড় কিংবা বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে ফিরলে অশুভ কিছুর ছায়া মানুষের সঙ্গে ঘরে ঢুকে পড়তে পারে। সে বিশ্বাস সত্য হোক কিংবা কেবল বহুদিনের লোকমুখে চলে আসা ভয়-ঘষেটি বেগমের কাছে তার গুরুত্ব কম নয়।

তার ঘরে রয়েছে সুন্দরী এক কুমারী বউ, যার সঙ্গে এখনো স্বামী-স্ত্রীর সংসার পূর্ণতা পায়নি। রয়েছে গর্ভবতী ছোট বোনও। সামান্য অসাবধানতায় যদি কোনো খারাপ কিছুর বাতাস তাদের গায়ে লাগে-এই আশঙ্কাটুকুও মিলন উড়িয়ে দিতে পারে না।

রেবেকাকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি সে নিতে চায় না।আর বোন কে নিয়ে তো অসম্ভব প্রশ্নই আসেনা।

তাই বড়মার নির্দেশ মেনে শেষ পর্যন্ত বারান্দাতেই শুয়ে রইল মিলন।

___________________

ঘষেটি বেগমের কথা মতোই ফজরের আজান হতেই মিলন ও হাসমত সওদাগর গোসল করে মসজিদে নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরল। ফজরের আজান দিতেই ঘষেটি বেগম দরজা খুলে মিলনের হাতে টুপি-পাঞ্জাবি ধরিয়ে দিয়েছিলেন, তবে ঘরে ঢুকতে দেননি। খবিরুন নেসাও শাশুড়িকে অনুসরণ করে একই নিয়ম মেনে চলেছেন, নিজের স্বামীর ক্ষেত্রেও।

নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে মিলন লক্ষ্য করল, বাড়ির প্রত্যেকেই জেগে উঠেছে-শুধু রেবেকা ছাড়া।

মিলন দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এবার কোনো বাধা নেই। দরজার কাছে এসে নিচু স্বরে “বিসমিল্লাহ” পড়ে ঘরে ঢুকল সে। বিছানার দিকে তাকাতেই দেখল, রেবেকা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

মিলন শান্ত চোখে আগাগোড়া একবার দেখে নিল বিবিকে। ঘুমন্ত মুখখানি দেখেই যেন তার বুকের ভেতরের অস্থিরতাটা কিছুটা কমে গেল। মাথা থেকে টুপি খুলে ঢেক্সুর ওপর রেখে বিছানায় উঠতে উঠতে জোরে জোরে পড়ল-

[আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।]

তারপর আর দেরি করল না। দুই হাত বাড়িয়ে রেবেকাকে কাছে টেনে নিল। নিজের শক্ত বাহুর নিরাপদ আশ্রয়ে তাকে আগলে রেখে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল মিলন।

তবে ঘুমানোর মতো সময় তার হাতে নেই। আজ তাকে বাজারে যেতে হবে, দোকান খুলতে হবে। তাছাড়া গতকালই তার আব্বা বাদল মাস্টার, আসমানীর বিয়ে উপলক্ষে অনেক কেনাকাটার দায়িত্ব দিয়েছেন। সব মিলিয়ে আজকের দিনটা ভীষণ ব্যস্ত যাবে। তাই কাজে বের হওয়ার আগে নিজের বিবিটাকে একটু দেখে নেওয়ার লোভটা সামলাতে পারেনি সে।

রেবেকার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় আদরে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিল মিলন। ঘুমটা পাতলা হওয়ায় খুব বেশিক্ষণ লাগল না রেবেকার জেগে উঠতে। চোখ মেলেই রেবেকা স্বামীকে কাছে পেয়ে নিজের কোমল দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল তার গলা। তারপর কান্নাজড়িত গলায় নাক টেনে অভিযোগ করল-

রেবেকা: আন্নে বহুত খারাপ আছুইন, আমি বহুত ডরাইছি রাইতে।

রেবেকার ফোলা চোখ-মুখ দেখেই মিলন বুঝে গেল, রাতের ভয়ে তার বিবি কেঁদেছে। রেবেকা ভয় পেয়েছে-এটা ভেবে তার খারাপ লাগল। কিন্তু তার জন্য রেবেকা কেঁদেছে, এই অনুভূতিটুকু অদ্ভুত এক মায়ায় তার বুক ভরিয়ে দিল।

শেষরাতে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে শুনেছিল, ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না কেন-এই প্রশ্ন করে ঘষেটি বেগমের কাছে কাঁদছিল রেবেকা।

মিলন: আমার ভুল হইছে সোনা, আর কুনো দিন কুনো হানেই যাইতাম না রাইতে তুমারে এলহা রাইখা।

রেবেকা: মেলাখন যহন আন্নে ফিরতাছিলাই না, আমি বহুত ডরাইছি। পুশকুনিত পানি কিরুম যেন আওয়াজ করতাছিল।

মিলন আগেও পুকুরের সেই শব্দ শুনেছে। মূলত পুকুরের মাছ বড় হয়ে গেলে রাতের বেলা পানিতে বেশ শব্দ হয়। পাঁচ-সাত বছর পরপর তাদের পুকুরে বড় জাল ফেলে বারো-চৌদ্দ কেজি ওজনের রুই-কাতলা মাছ ধরা হয়। বড় মাছ তোলার সময় আলাদাভাবে পেশাদার মাছ ধরার লোকজনকেও খবর দিতে হয়।

মিলন: পুশকুনিত পানিত শব্দ করে বড় বড় মাছের, বিবি। অন্য কিছু না। তয় ভালা করছো বড়মারে ডাইকা আইনা। যাওনের কালে আমি বুঝি নাই এতো রাইত হইবো ফিরতে।

কথাটা বলেই মিলন স্নেহভরে রেবেকার গালে নাক ঘষে দিল।

রেবেকা: আমি হেরে ডাহি নাই। আমি তো আন্নের কতা মতো দুয়ার দিয়া ঘুমাইয়া গেছিলাম। যহন আক্তা মাইরা ( হঠাৎ করে) পুশকুনির পানি জুরে আওয়াজ করলো, তা কানে আইতেই আমার ঘুম ছুঁড়ে। চোখ মেইলা দেহি, হারিকেনের নিভা গেছে। তহন ভয়ে আমি কান্তাছিলাম। তহন বড়মা আমার কান্দা হুইনা আইছে,হেয় তো মুতার লাইগা বা‌ইর হ‌ইছিলো তহন,যদি হেয় না বাইর হ‌ইতো আমি কিতা করতাম?

কথাটা বলেই রেবেকা পুনরায় কান্না করে

মিলন পুনরায় রেবেকাকে বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার স্বরে বলল-

মিলন: এরুম আর করতাম না বিবি, আর কুনো দিন করতাম না। এহন হুনো, কাইল যে আসমানীর বিয়া। আমি তো দুহানে যাইবাম। অনেক বাজার করুন লাগবো। তোমার লাইগা কি কি আনবাম সোনা? নতুন কাপড়, না সাজন-পাতি-কি লাগবো?

কথাগুলো শুনেই রেবেকা কান্না ভুলে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসল। কাল বিয়ে, আজ মেহেদি বাটতে হবে, হলুদ বাটতে হবে-আরও কত কাজ! তার চেয়েও বড় কথা, আজ তার বাবার বাড়ি থেকেও মানুষ আসবে বিয়ে উপলক্ষে। বাদল মাস্টার গতকাল রোজিনার স্বামীকে সেনপুর তাদের বাড়িতে পাঠিয়েছেন বিয়ের দাওয়াত দিয়ে।

মুহূর্তের মধ্যেই রেবেকার মন আনন্দে ভরে উঠল। আহ্লাদি সুরে মিলনের কাছে আবদার করল-

রেবেকা: হুনুইন না, আমারও বিয়ার লাল কাপড় লাগবো।

মিলন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল-

মিলন: লাল বেনারসি? কেন, বউ সাজবার সখ হইছে বিবি?

রেবেকা: হ। আমার বিয়ার কালে আমি অনেক ছুডু আছিলাম তো। নিজে সাজবার পারতাম না, আর সাজন-পাতিও চিনতাম না। তয় এহন চিনি। আন্নে আইনা দেন, এহন আমারও লালা বেনারসি চাই।

মিলন: আচ্ছা, নিয়া আইবাম। আমার বিবি চাইছে, আনুন তো লাগবই।

কথাটি বলেই মিলন একটু থামল। রেবেকার চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মৃদু হাসল। বিবির লাজুক মুখ দেখতে তার বেশ লাগে, মিলন নিজের ভেতরের কথা দমিয়ে না রেখে সরাসরি বলল-

মিলন:: পুরাত বিবিরে নতুন বেনারসিতে নতুন ব‌উ সাজাইয়া, আমার এতো কালের না হ‌ওয়া বাসরের স্বাদ নিবাম পুরোপুরি। তোমার আপত্তি নাই তো বিবি?

কানে যেন কেউ গরম পানি ঢেলে দিল রেবেকার, লজ্জায় সে চোখ তুলে আর তাকাতে পারল না সামনের দিকে, বলতে পারল না কোন কথা।

মাথা নিচু করে এক হাত দিয়ে অন্য হাত ঘষতে লাগল। তার লজ্জা দেখে মিলনের মুখে আবারও হাসি ফুটে উঠল।

মিলন: কতা কও না কেন? আমার বুকের লগে মিইশা আছো, কেমনে দেখছো বিবি! প্রতিরাইতে এরচেও ভয়ংকর রূপে তোমারে আমি দেহি, তয় নিজেরে সামলাইয়া রাহি প্রতিবার। গভীরভাবে তোমারে নিজের দিকে টানি না, ভয় পাইছো একবার তাই। আগে তো বুঝতা না, এখন তো ভাবদেইহা বুঝা যায়, জামাই-বিবি পুতুল খেলা ভালা বুঝো তুমি। তাই আইজ তোমার মুখে কও দেহি, দিতানা আমি যা চাই? না ডরাইয়া দূরেই থাকবা?

রেবেকা ছটফট করে উত্তর দিল-

রেবেকা: না; দূরে থাকতাম না।

মিলন হেসে ফেলল। আর লজ্জায় ফেলতে চাইল না বিবিকে, কারণ এখন তার কাছে সময় নাই তাকে যেতে হবে বাহিরে। রেবেকার অধরে শক্ত চুম্বন খেয়ে বলল-

মিলন: হাডে যায়ুন লাগবো, দুহানেও যাইবাম,জলদি জলদি আমার লাইগা খাউনের কিছু আনো দেহি।

রেবেকা বিছানা থেকে নেমে বাইরে ছুটে গেল। মিলন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস এর গতি খুব দ্রুত চলছে। বিবির সাথে তার দাম্পত্য শুরু হবে এবার, বিবির সরাসরি আগ্রহ আছে ওসবে। এটা যথেষ্ট কারণ তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ করার জন্য, অতিরিক্ত উত্তেজনায়। মিলন টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিল।

এতদিন পর আবার দোকানে যেতে হবে-ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য শূন্য লাগল।

দীর্ঘদিন রেবেকাকে কাছে পেয়েছে সে। সারাদিন চোখের সামনে দেখেছে, ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তার চলাফেরা দেখেছে। অথচ আজ আবার দিনের বড় একটা সময় তাকে ছাড়া কাটাতে হবে। কাজের তাড়া আছে, সংসারের দায়িত্ব আছে-তবু মনটা বারবার ঘরের দিকেই টানছে।

এই কয়দিনে রেবেকার সঙ্গে তার যে গভীর মায়ার বন্ধন তৈরি হয়েছে, তাকে চোখের আড়াল করতে গেলেই মিলনের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা জেগে ওঠে। সারাদিন কাজের ভিড়েও হয়তো বারবার মনে পড়বে এই ঘুমভাঙা মুখটা, এই মায়াভরা চোখ দুটো।যেতে ইচ্ছে করছে না।

মিলন দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল-আজকের দিনটা বুঝি অন্য সব দিনের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘ হতে চলেছে।

*******************

"মুক্তাগাছা"

চাঁদনীর গতো রাতে জ্বর আসেনি আর,রূপমতী তার কাছেই ছিল রাতে। চাঁদনী ল‌‍ক্ষ করছে রূপমতী তাকে একা রেখে কোথাও যাচ্ছেনা কাল জলসার পর থেকে, সকালে তো চলে যাওয়ার ক‌থা, নিজের কুঠুরিতে তাও যাচ্ছে না। কাল মাসুদ তাকে বলে গেছে সকালে একবার আসবে কিন্তু রূপমতী থাকলে কিভাবে আসবে? অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে লাগলো চাঁদনী। রূপমতী তখন গতরাতের বেঁচে যাওয়া ভাত পানি দিয়ে ধুয়ে, খাওয়ার জন্য পেঁয়াজ আর কপি জ্বালিয়ে চারটা শুকনো মরিচ পুড়ে নিচ্ছিল। তবে আরে তাকিয়ে চাঁদনীকে লক্ষ্য করছে গোপনে।

রূপমতী পানি ভাত, পোড়া মরিচ , কাঁচা পেঁয়াজ মাটির সানকিতে নিজের জন্য এবং চাঁদনীর জন্য নিয়ে গিয়ে বসে তার সামনে বলে-

রূপমতী:: খাইয়া লো জলদি।

চাঁদনী কথা বলে না চুপ করেই পান্তা ভাত খেয়ে নিল। রূপমতীর খাওয়া শেষ সে উঠে সানকি দুটো মটকায় জমানো পানিতে ধুয়ে নেয়। তারপর স্পষ্ট ভাষায় চাঁদনীকে বলে।

রূপমতী:: কাপড় যা আছে গুছাইয়া নে,আর পাইলা-বাসন আমি গুছাইতাছি।

চাঁদনী চমকায় খুব রূপমতীর কথায়

চাঁদনী:: কেন? হগল জিনিস গুছাই কুনো যাইবাম।

রূপমতী:: এহন থাইকা রাজবাড়ীর ভিরতে আমার লগেই থাহন লাগবো তর।

চাঁদনীর হাত পা কাঁপতে লাগলো,সে কিছু একটা আন্দাজ করতে পারছিল, কোন গভীর ঘটনা ঘটিয়েছে সে তা না হলে রূপমতী সকাল হওয়ার পরেই চলে যেত। তবে ভাবতে পারেনি তার সবকিছু গুছিয়ে তাকে রাজবাড়িতে নেওয়ার জন্যই রয়ে গেছে। চাঁদনীকে এক জায়গাতেই বসে থাকতে দেখে রূপমতী বলে-

রূপমতী:: হুন ছেড়ি যা আকাম করবার করছোস,এহন এর থাইকাও কুন বড় দুর্ঘটনা ঘটবার আগেই গা বাচাইয়া স‌ইরা যাওন ভালা।

চাঁদনীর চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ছে, মাসুদের সাথে তার সম্পর্ক কি এখানেই শেষ তবে। রূপবতী তাকে কাঁদতে দেখে, জিনিসপত্র গোছানো বাদ দিয়ে তার পাশে গিয়ে বসে দুহাত ধরে বলে-

রূপমতী:: তর ভালার লাইগা ক‌ইতাছি চাঁদনী,কাইল হাইঞ্জাকালে (সন্ধ্যায়) তর লাইগা ভাত ল‌ইয়া আ‌ইছিলাম আমি। ঐ শালিনি মা গি ডা আমার লগে জোড়া ধ‌ইরা আইলো, আমি তারে আনি নাই,হেয় নাহি তরে দেখবার আইবো। জুর ক‌ইরাই আইলো লগে, আর দুয়ারে খাড়াইয়া ঐ ছেড়ারে তর লগে দেইখা গেছে, বুঝবার পারলি কি বিপদ আইতাছে সামনে।

চাঁদনীর মাথায় বাজ পড়লো যেন কথাটা শুনে, শালিনি তাকে দেখেছে ঐ অবস্থায়! ঐ মেয়ের সাথে তার সাপ-বেজির সম্পর্ক সে দেখেছে মাসুদ কে!? এতক্ষণে সবকিছু মিলিয়ে যতটা না আশ্চর্য হয়েছিল, তার থেকে অধিক বেশি চিন্তায় পড়ে গেল এখন চাঁদনী।

জ্বরের ঘোরে মাসুদের কথা বলে দিয়েছিল সে রূপমতীকে,তবে কতটুকু পরিমাণে বলেছে তা তার মনে নাই। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে যা সর্বনাশ করার সে নিজেই করেছে। চাঁদনী এবার শব্দ করে

কান্না করলো রূপমতীর হাত আঁকড়ে ধরে, এসব কিছু থেকে বের হ‌ওয়ার পথ খুঁজতে লাগলো, আকুতির সুরে বলল-

চাঁদনী:: বুজান; বুজানগো আমি কি করবাম গো বুজান, আমি হের লগে আমার পেশাগত ভাবেই জড়াইছিলাম তয় এহন আমি তারে চাই হেয়ো আমারে বহুত চায়, বুজান কুনো উপায় কি নাই আমার এইন তে বাইরহ‌ইবার।

রূপমতী জানে, কোনো উপায় নেই। তাই তো সে চাঁদনীকে বাঁচাতে, এখনই তাকে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর আগে যারা পালিয়েছে, তাদের কী হয়েছে, সেটা কেউ জানে না। জানবেই বা কী করে?

রাজবাড়ীর দক্ষিণের শেষ মাথায় জল্লাদদের বাসস্থান। যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাদের সেখানে পাঠানো হয়। তারপর সেখানে কী হয়, বাইরের কেউ জানে না। এটাই বহু যুগ ধরে চলে আসছে।

পুরুষ হোক কিংবা মহিলা-একবার রাজবাড়ীর সঙ্গে জড়িত হয়ে গেলে, রাজবাড়ীর অনুমতি ছাড়া তারা আর কোথাও যেতে পারে না। সেখানে চাঁদনী তো বাইরের একজন মানুষকে রাজবাড়ীর সীমানার ভেতরে ঢুকিয়ে এতদিন ধরে লীলা-খেলা করেছে।

যদিও রাজবাড়ীর শাসকেরা অঞ্চলের মানুষের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি ভালো রাখার জন্য গ্রামবাসীদের জলসা দেখার অনুমতি দিয়েছে, তবে এটুকুর বাইরে আর কোনো কিছুর অনুমতি নেই। গ্রামের মানুষও রাজবাড়ীর লোকজনকে ভালো করেই চেনে। তাই তারা কেউ এই জলসায় আসে না।

জলসা দেখতে যারা আসে, তারা মূলত অন্য গ্রাম কিংবা দূর-দূরান্তের মানুষ। মাসুদও তাদেরই কাতারে পড়ে।

রূপমতীর কাছে চাঁদনীকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোন ভাষা নেই, চাঁদনীর মনের কষ্ট অনুভব করারও কোন অনুভূতি নেই, কারন সে কখনোই কোন পুরুষকে নিজের মনে জায়গা দেয়নি। তবে তার একটা ছোট্ট বোন ছিল, সে মারা গেছে বহু বছর আগে, চাঁদনীকে দেখে তার বোনের কথা মনে পড়ে , তাই সেই অনুভূতি থেকেই এইটুকু সাহায্য সে চাঁদনীকে করতে চাইছে।

রূপমতী:: এই ছেড়ি কান্দিছ না ক‌ইলাম, দুই রাইত কাম ছাড়া আছিলি,আইজ কাম আছে তর, কাইন্দা চেহারা নষ্ট করলে জলসায় কুন সুরতে (চেহারা)যাইবি, হুইন্না রাখ তুই যা চাইতাছস তা হ‌ইবো না কুনো কালেই,মাথার ম‌ইধে যে শয়তানি

ডুকছে তা এই ঘরে রাইখা যাবি, পিছে চাওয়া যাইতো না আর। নাইলে নিজেতো মরবি লগে মা-ভাই ল‌ইয়া মারবি।হেই ছেমড়ার কিছু হ‌ইবো না,হেয় কিন্তু ঠিক‌ই জিন্দা ঘুরবো।

সেইসব শুনে চাঁদনী আর কথা বাড়ালো না, কান্নাও করলো না, নিজের সবকিছু গুছিয়ে মাটির কুঠুরি এভাবে খালি রেখে রাজবাড়ীর পথে হাঁটা ধরে, চোখ দুটো দিয়ে নিরবে অশ্রু গড়ায় তার, বারবার পেছনে তাকিয়ে মাটির ঘরটা দেখে, এই ঘরে রয়েছে তার আর মাসুদের একসাথে থাকার সকল স্মৃতি।যা আজ থেকে হয়তো চিরকালের জন্য স্মৃতি হয়ে যেতে পারে।

একটা সময় ছিল চাঁদনী প্রথম যখন রাজবাড়ীতে আসে তখন সে রাজবাড়ীর ভেতরে থাকতে চেয়েছিল, তবে তাকে থাকতে দেওয়া হয় এই মাটির ঘরে । সেসব নিয়ে কতটা মন খারাপ করেছিল চাঁদনী। তবে আজ রাজবাড়ীর ভেতরে থাকার জায়গা পেয়েও তার মনে খুশি নেই। আছে শুধু প্রিয় মানুষকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়ার কষ্ট। ছোটবেলা থেকে হারিয়েই তো বেঁচে আছে সে। প্রথমে বাপ ,তারপর স্বামী-সংসার। আর এখন পুনরায় তার ভাঙ্গা মনে নতুন করে জন্ম নেওয়া আবেগ মাসুদকে।

তবে সে আর একটু দেরি করলে হয়তো শেষবারের মতো মাসুদের সাথে তার দেখা হতো, চাঁদনী কুঠুরি ছাড়ার কিছু সময়ের মাথায় মাসুদ সেখানে উপস্থিত হয়। বাপ-দাদিকে ফাঁকি দিয়ে সে এসেছে চাঁদনীর কাছে।

বাদল মাস্টারকে বলেছে পাশের এক মসজিদে হুজুরের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, ট্রেন আসার আগেই চলে আসব। তবে বাপকে মিথ্যা কথা বলে কোনো লাভ হলোনা।

চাঁদনীর ঘরের দুয়ার দড়ি দিয়ে বাঁধা, মাসুদ প্রথমে ভাবলো পুকুরে গেছে হয়তো,সে কিছু সময় অপেক্ষা করে যখন দেখলো চাঁদনী ফিরছে না তখন সাবধানে পুকুর ঘাটের কাছে যায়,তবে যদি সঙ্গে কেউ থাকে চাঁদনীর, তাই নিজেকে আড়ালে রেখে যথেষ্ট সে, তবে পুকুরঘাট খালি ।

ওদিকে ট্রেনের সময়ও হয়ে এসেছে। বাদল মাস্টার কে রুষ্ট করতে চাইছেনা মাসুদ, বাপের কাছে সে খুব আদুরে তাই সে আর অপেক্ষা করে না। চলে যায় সেখান থেকে আর মনে মনে ভাবে; চাঁদনী হয়তো রূপমতীর সাথে কোন কাজে রাজবাড়িতে গিয়েছে। তার এখন যেতে হবে বাবা ভাইয়ের কাছ থেকে পয়সা নিয়ে চার দিন পরে আসবে সে, তখন চাঁদনী কে নিয়ে পালাবে এই অঞ্চল ছেড়ে।

********************

বিয়ের আগের দিন হলেও জসিমদের বাড়িতে বিয়ের কোনো আনন্দের ছোঁয়া নেই। নদীর পাড় ঘেঁষে ছোট্ট মাটির ঘরটাকে সকাল থেকেই লেপেপুঁছে পরিষ্কার করছেন জসিমের আম্মা চম্পা বানু। উঠোনের এক পাশ থেকে গোবর-মাটি মেখে, নারিকেল পাতার শলার ঝাড়ুতে গোবর-পানি মাখিয়ে উঠান ঝাড়ু দেওয়া হচ্ছে।

অন্য পাশে বিয়ের জন্য সামান্য কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা। অথচ ঘরের বাতাসে উৎসবের বদলে কেমন একটা চাপা শোক লেগে আছে। কাল মাত্র সাত দিন হবে এই বাড়ির বউ মারা গেছে।

ঘরের ভেতর দেড় মাসের শিশুটি বিছানায় শুয়ে একটানা কেঁদেই চলেছে। মায়ের গন্ধ না পেয়ে কান্নায় তার ছোট্ট বুকটা বারবার কেঁপে উঠছে। জসিমের মা কাজের ফাঁকে ছুটে গিয়ে কখনো তাকে কোলে তুলে নিচ্ছেন, আবার মাটির দেওয়ালে হাত বুলিয়ে ঘর লেপার কাজে ফিরে আসছেন।

এমন সময় পাড়ার দু-একজন মহিলা এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে মুখ টিপে টিপে কথা বলতে শুরু করল।

:: সাত দিনও তো হইবার পায়নাই বউডা মরছে, এর মইধ্যেই জসিমের আবার বিয়ার লাইগা মাইয়া পায়া হালছুইন!

আরেকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

:: হায় হায় আল্লাহ, কী দিনকাল পড়ল রে! মাইনষেরা একচল্লিশ দিনও সবুর ধরবার চায় না এখন। বউ মরছে, আর ঘর শুকাইতে না শুকাইতেই নতুন বউ আনতাছে! ছিঃ ছিঃ।

চম্পা বানু নীরবেই শুনে গেল মহিলাদের সব কথা। কাউকে কিছু বলার মতো ভাষা নেই তার কাছে। কেউ জানে না, এই বিয়ে আনন্দের নয়। কেউ জানে না, জসিম নিজেও এই বিয়েতে রাজি হয়ে উঠেনি। গ্রামের চেয়ারম্যান, মেম্বার আর মাতব্বরদের শালিসের সিদ্ধান্তে, একরকম বাধ্য হয়েই তাকে আবার সংসার পাততে হচ্ছে। সে কথা কাউকে জানানো হয়নি; তাই মানুষের চোখে এ শুধু মৃত বউয়ের সাত দিনের মাথায় হওয়া দ্বিতীয় বিয়ে।

নদীর পাড়ের নির্জন আঙিনায় বসে জসিম দূরের পানির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। নদীর স্রোত আপন মনে বয়ে যায়, অথচ তার জীবন যেন কোথাও আটকে গেছে। কয়েক দিন আগেও যে ঘরে তার বউ ছিল, আজ সেই ঘরেই অন্য এক মেয়েকে নিয়ে আসার প্রস্তুতি চলছে। নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠে।

পেছন থেকে আবার শিশুটার কান্না ভেসে আসে। জসিম চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকে। এই ছোট্ট ছেলেটার মায়ের জায়গা তো আর কেউ নিতে পারবে না। তবু কাল এই বাড়িতে একজন নতুন নারী আসবে-কীভাবে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করবে, কীভাবে এই শিশুটার সামনে তাকে দাঁড় করাবে, কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারে না জসিম।

নদীর ওপার থেকে দুপুরের তীব্র রোদ পানির ওপর ঝিলমিল করে পড়ছে। বাতাসে নদীর সোঁদা গন্ধ, চারপাশে নিস্তব্ধ দুপুরের ভারী আবহ। অথচ সেই রোদেলা দুপুরেও জসিমদের ছোট্ট মাটির ঘরটায় বিয়ের কোনো উচ্ছ্বাস নেই; চারদিকে শুধু শোক, অনিশ্চয়তা আর আসন্ন এক নতুন জীবনের অস্বস্তিকর ছায়া।

_______________

আসমানী জড়সড় হয়ে চৌকির এক কোণে, জানালা ঘেঁষে বসে আছে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে পুকুরের কালো পানির দিকে। অন্তরে যেন আঁধার নামিয়ে স্মৃতির পাতায় উঁকি দিচ্ছে তার প্রথম স্বামীর মুখ।

অথচ আশ্চর্যের বিষয়, সে তো ভুলেই গিয়েছিল সেই লোকটির চেহারা! তবে আজ হঠাৎ করে কেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই হাসিমুখ?

আসমানীর চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ে। সেই বৃষ্টিভেজা রাতের পর থেকেই মৃত স্বামীর মুখটা যেন আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার চোখে। যখন সেই খারাপ লোকটা তার সঙ্গে জোরাজুরি করছিল, তখনই অদ্ভুতভাবে তার মনে পড়েছিল মৃত স্বামীর কথা। নইলে এতদিনে তো সে স্বামীর চেহারাটাও প্রায় ভুলেই বসেছিল।

কাল আবার নতুন করে কোনো এক লোকের বউ হবে সে। নতুন একটি সংসারে পা রাখবে, নতুন একজন পুরুষের সঙ্গে জীবন কাটানোর কথা উঠবে। অথচ সেই লোকটিরও যে তার মতোই পোড়া কপাল-কী ভাগ্য নিয়ে যে তাদের এই সম্পর্কের শুরু হতে যাচ্ছে, তা কে জানে!

জানালার ওপারে পুকুরের কালো পানির দিকে তাকিয়ে আসমানী নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে। মনে হয়, তার জীবনে কিছুই যেন নিজের ইচ্ছায় ঘটেনি-শুধু একের পর এক ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিতে হয়েছে।

ঠিক তখনই বাইরে থেকে ঘষেটি বেগমের ডাক ভেসে এলো।

কাল বিয়ে তাই সকাল থেকেই উঠানে আশপাশের বাড়ির মহিলারা জড়ো হতে শুরু করেছে। সবাই মিলে বিয়ের গীত গাওয়া শুরু করেছে। আজ গোটা দিন থেমে থেমে চলবে তাদের এই গীতের আসর।

ঘষেটি বেগমও আসমানীকে ডাকলেন। কিন্তু আসমানীর বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না। মনটা যেন কোনোভাবেই সায় দিচ্ছে না। ঘষেটি বেগম নাতনির মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন। তাই আর জোর করলেন না। উঠানে ফিরে গিয়ে মহিলাদের সঙ্গে বসে তিনিও গীতের আসরে যোগ দিলেন।

কিছুক্ষণ পর উঠানজুড়ে যেন গানের ঝড় উঠল। একদল গাইছে, আরেকদল সুর মিলিয়ে উঠছে। হাসি-ঠাট্টার ফাঁকে ফাঁকে উঠছে উলুধ্বনি। অথচ সেই আনন্দের সুরও আসমানীর কাছে কেমন যেন বিষণ্ন ঠেকছে। এইসব গীত গাওয়া হলুদ-গোসল তার সঙ্গে এখন মানাচ্ছে না।এসব হয়েছিল তার প্রথম বিয়েতে, এখন এইসব‌ই তার কাছে লজ্জার।

জানালার পাশে বসে থাকা আসমানীর কানে ভেসে আসছে সেই চেনা সুর-

হলুদের জ্বালা জ্বলে রে সই,

সাজাইতে সাজাইতে,

মায়ের মাইয়া বউ হইব রে,

কাঁদাইতে কাঁদাইতে।

ও মাইয়া রে, হলুদ মাখে,

গায়ে লাগে সোনার রং,

কালকে মাইয়া পরের ঘরে,

আজকে গীতের ঢং।

আয় সই, আয় কাছে আয়,

হলুদ দে মাইয়ার গায়,

মায়ের ঘরের আদরের মাইয়া

কালকে পরের ঘর যায়।

মাইয়ার মাথায় ফুল দে সই,

হাতে দে রাঙা চুড়ি,

আজকে সে যে মায়ের মাইয়া,

কালকে হইব বউটি।

ও সই গো, গীত গাইও,

মনের কথা কইও না,

বউ হইয়া পরের ঘরে

মায়ের কথা ভুইল না।

মায়ের ঘরের উঠানখানি

থাকব মনে ভরা,

এই উঠানেই হাসত মাইয়া,

কালকে যাবে পরের ঘরা।

হলুদ মাখা মাইয়ার মুখে

কেমন মায়ার ছায়া,

হাসতে গিয়ে চোখের কোণে

জমে কেন মায়া?

ও মাইয়া রে, সুখে থাকিস,

সুখে কাটুক কাল,

মায়ের দোয়া মাথায় নিয়া

পার হইস সংসারজাল।

গীতের সুরে চৌকির ওপর জানালার পাশে বসে থাকা আসমানীর বুকটা কেঁপে উঠল। পুকুরের কালো পানির দিকে তাকিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলতে লাগল সে। মায়ের ঘর ছেড়ে পরের ঘরে যাওয়ার কথা এই গীতের সুরে যতটা সহজ, তার জীবনে ততটা সহজ ছিল না। বিধবা হওয়ার পর থেকেই মায়ের ঘরের দরজা তার জন্য বন্ধ। দাদির ঘরেই এতদিন আশ্রয় নিয়েছে সে। তাই এই বিয়ের গীত যেন তার পোড়া কপালের সঙ্গে কিছুতেই মানায় না।

আর উঠোনে গীত গাওয়া মহিলাদের কাছেই, বারান্দার কিনারায় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে রেবেকা। গানের প্রতিটি কথা যেন তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে নিজের বিয়ের দিনের স্মৃতিতে। সেদিন ছোট ছিল, বুঝতে পারেনি মায়ের ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্টটা কত গভীর। আজ সেই কথাগুলোই যেন বুকের ভেতর নতুন করে বাজছে। মনে পড়ছে নিজের আম্মার মুখ, বাবার কথা, ফেলে আসা সেই চেনা বাড়ির উঠান।

গানের সুরের আড়ালে দুজনের চোখেই ঝরছে জল-একজন কাঁদছে যে মায়ের ঘর তাকে আর কোনোদিন আপন করে নেয়নি, আর অন্যজন কাঁদছে সেই মায়ের ঘর ছেড়ে আসার পুরোনো ব্যথায়।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে অপরিপক্ক পর্ব ৩৪ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন