ফন্ট সাইজ:
থিম:
অপরিপক্ক

অপরিপক্ক পর্ব ৩৮

লেখক: যাজিবা জাবিন

ফজরের আজান দিতেই ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে গ্রামের মানুষের। রাতের অন্ধকার তখনো পুরোপুরি কাটেনি। চারদিকে শিশিরভেজা স্নিগ্ধ পরিবেশ, মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের সুমধুর ধ্বনি। কেউ অজু করতে পুকুরঘাটে ছুটছে, কেউবা ঘুমজড়ানো চোখে উঠোনে নেমে গরু-ছাগলের দেখাশোনা শুরু করেছে। মোরগের ডাক আর পাখির কিচিরমিচিরে ভোরের নিস্তব্ধতা ধীরে ধীরে মুখর হয়ে উঠছে।

তবে বাদল মাস্টারের বাড়িতে আজ অন্য দিনের মতো ধীরেসুস্থে সকাল শুরু করার অবকাশ নেই। আজ আসমানীর বিয়ে!

ফজরের আজান কানে আসতেই বাড়ির সবাই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে। নামাজ শেষ করে খালেদা খাতুন ব্যস্ত হাতে প্রথমেই সবার জন্য চানাচুর দিয়ে মুড়ি মেখে দিলেন। সঙ্গে ছিল সেনপুর থেকে রেবেকার মায়ের বানিয়ে আনা পিঠা। হাসমত সওদাগর, বাদল মাস্টার আর রুহুল তিনজন বারান্দায় পাটি পেতে বসে তাড়াতাড়ি নাশতা সেরে নিলেন। তারপরই ছুটলেন বিয়ের রান্নার কাজে।

বাড়ির পূর্ব দিকের আমগাছের নিচে বড় বড় পাতিলে রান্না বসানোর ব্যবস্থা হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিয়ের রান্না পুরুষেরাই সামলাবে। হাসমত সওদাগর সাদা লুঙ্গির ওপর গামছা বেঁধে ইতিমধ্যে বাবুর্চির ভূমিকায় নেমে পড়েছেন। তাঁর সঙ্গে বাদল মাস্টার আর রুহুলও কোমর বেঁধে লেগে গেছেন কাজে।

এদিকে কাটাকুটি আর বাছাবাছির কাজে সাহায্য করার জন্য রোজিনার সঙ্গে আরও দুজন মহিলা এসে হাজির হয়েছে। খালেদা খাতুন গতকালই রোজিনাকে বলে রেখেছিলেন, সকালে যেন দুজনকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে।

রোজিনা রান্নাঘরে চুলা জ্বালিয়ে গরম পানি বসিয়েছে। একজন চাল-ডাল ধুতে ব্যস্ত, আরেকজন তরকারি কাটছে। উঠোনজুড়ে শুরু হয়ে গেছে লোকজনের ছোটাছুটি, হাঁকডাক আর কাজের ব্যস্ততা। ভোরের স্নিগ্ধ নীরবতা ভেঙে বাদল মাস্টারের বাড়িতে বেজে উঠেছে বিয়ের দিনের কর্মব্যস্ত সুর।

অথচ এত কাণ্ডকারখানার মধ্যেও রেবেকার ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণ নেই!

মুক্তি বেগমের রাগে তখন গা জ্বলে যাচ্ছে। বাড়িতে বিয়ে, অথচ বাড়ির বউ এখনো মরার মতো বিছানায় পড়ে ঘুমাচ্ছে! ইস্, রেবেকার ভাগ্য ভালো যে এটা শ্বশুরবাড়ি, সেনপুর নয়। সেনপুর হলে মুক্তি বেগম এতক্ষণে তার চুলের মুঠি ধরে টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে দিতেন!

রাগে খচখচ করছে মুক্তি বেগম, এ কেমন মেয়ে? দায়িত্ব-কর্তব্য বলতে কিছুই নেই? শাশুড়ি একা হাতে রান্নাঘরের কাজ সামলাচ্ছেন, সবাইকে নাশতা বানিয়ে খাওয়াচ্ছেন, আর বাড়ির বউ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে!

শেষ পর্যন্ত আর সহ্য করতে না পেরে মুক্তি বেগম দাঁত কিড়মিড় করে পুত্রবধূ রাবেয়া বেগমকে বললেন-

মুক্তি:: “কি মাইয়া জন্ম দিলা তুমি? এইডা কুনো কতা? কত্থান্নি বেইল অইছে, এহনো তুমার ঝি হুতনতে উঠতাছে না! এইডা কি ওর বাপের বাড়ি পাইছে? উডাও, জলদি উডাও!”

শাশুড়ির কথায় রাবেয়া বেগম জবুথবু হয়ে বসে রইলেন। তিনি নিজেও রেবেকাকে কয়েকবার ওঠানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু মেয়েটার ঘুম যেন কিছুতেই ভাঙতে চাইছে না। এমনভাবে বিছানায় পড়ে আছে, দুনিয়ার কোনো হুঁশই নেই তার বেহুশ সে।

কথায় আছে, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। মুক্তি বেগমের কপালেও ঠিক তা-ই ঘটলো।

নাশতা খেতে ডাকতে, ঠিক তখনি মিলনের ঘরে এসে হাজির হলো আমেনা বেগম। ঘরে ঢুকেই রেবেকার ঘুমন্ত চেহারাটা দেখে নিলেন একবার। তারপর মুক্তি বেগমের দিকে তাকিয়ে মুখের ভাব এমন করলেন, যেন এতক্ষণে তাঁর হাতে বহু প্রতীক্ষিত একটা বিষয় এসে ধরা দিয়েছে।

মুক্তি বেগম মনে মনে বললেন; এবার একেবারে ষোলো কলা পূর্ণ হইল! নে মুক্তি, প্রস্তুত হ! বুড়ির চুকা চোপার কতা হুনবার লাইগা,নে কোমর বাঁধ !

আমেনা বেগম রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন-

আমেনা: “মায়া, আন্নের বিয়াইন আন্নেরে খুঁজতাছে। যাইতাইন, হেইনো হের কাছে।”

রাবেয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

রাবেয়া: “যাইতাছি, মাওই।”

রাবেয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আমেনা বেগম চোখ-মুখ কুঁচকে মুক্তি বেগমকে বললেন-

আমেনা: “আন্নের নাতনির ফুডানি দেখছুইন, বিয়াইন? বাড়িডা ভরা অতো মানুষ! কহন ফজর অইছে, এহনো কতো নিশ্চিন্তে হুইতা আছে! না আছে কোনো কামকাজের নাম, না আছে কোনো জিম্মাদারি!(দায়িত্ব-কর্তব্য) এরুম বাড়ির বউ আন্নে বাইত থাহলে কিতা করতাইন?

মুক্তি বেগম মনে মনে যে ভয়টা পাচ্ছিলেন, ঠিক সেই ভয়টাই সত্যি হলো। গতকাল থেকে আমেনা বেগম অতিথি হিসেবে তাঁর সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেছেন। আদর-আপ্যায়নেও কোনো কমতি রাখেননি। মুক্তি বেগম সবদিক বিবেচনা করে দেখলো, আমেনা বেগম তার জায়গায় ঠিক আছে,এখন তাঁর মুখের ওপর কথা বলার উপায় নেই। আমেনা বেগমের জায়গায় তিনি নিজে থাকলেও হয়তো একই কথা বলতেন।

কাজেই মুক্তি বেগমের মুখে কোনো উত্তর জুটল না। তিনি চুপচাপ বসে রইলেন। তবে রাগটা গিয়ে পড়ল বিছানায় শুয়ে থাকা রেবেকার ওপর। নাতনির পায়ে চিমটি কেটে কেটে ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করতে লাগলেন।

কিন্তু আমেনা বেগমের মন তখন অন্যদিকে।

তিনি হেঁটে গিয়ে মিলনের ঘরের জানালার ধারে দাঁড়ালেন। জানালাটা খোলা। ওপারে পুকুর, আর পুকুরের অন্য পাশের ঘাটের ওপর দেখা যাচ্ছে গুলনাহারকে। সে চুপচাপ বসে আছে, দৃষ্টি এদিকেই।

গুলনাহারকে এভাবে বসে থাকতে দেখে আমেনা বেগমের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। আফসোস যেন কিছুতেই পিছু ছাড়তে চায় না বৃদ্ধার। মনে মনে ভাবলেন - ::ইস্ ! হেই সময় যদি জোর কইরা মিলনের লগে গুলনাহারের বিয়াডা দিয়া দিতাম, তাইলে আজ নাতির ঘরে পুতি দেখনের স্বপ্নডাও পূরণ হইয়া যাইত!

মনের মধ্যে কত কথা যে জমে আছে আমেনা বেগমের! ইচ্ছা করছিল, মুক্তি বেগমকে রেবেকাকে নিয়ে দু-চার কথা শুনিয়ে দেন। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় দোকানে মিলন স্পষ্ট নিষেধ করে দিয়েছে, তার বিবির ব্যাপারে যেন কেউ কোনো কথা না বলে। তাই সরাসরি কিছু বললেন না। তবে আকারে-ইঙ্গিতে হাসিমুখে গুলনাহারের প্রসঙ্গটা মুক্তি বেগমের কানে তুলে দিলেন।

ব্যস! তাতেই কাজ হয়ে গেল।

আমেনা বেগম মুখে সরাসরি কিছু না বললেও, আকারে-ইঙ্গিতে মুক্তি বেগমের কানে নাতনির সংসার নিয়ে নানা নালিশ ঠিকই তুলে দিলেন। রেবেকা সংসারের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে না, স্বামীর প্রতি যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি পরিপক্কভাবে সংসারটাও আগলে রাখতে শিখছে না-এমন কথাই বুঝিয়ে দিলেন তিনি। সেই সঙ্গে এটাও ইঙ্গিত করে দিলেন, রেবেকা যদি এভাবে উদাসীন হয়ে সংসার করে, তাহলে সেই সংসার বেশিদিন টিকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অবশ্য তাঁর নাতির তাতে কোনো সমস্যা নেই! বিকল্পের অভাবও তো নেই। পুকুরপাড়ে বসে থাকা গুলনাহারকে দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, মিলন একবার বললেই সে সতীন হয়েও এ সংসারে আসতে রাজি। অতএব, নাতনি-নাতজামাইকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সংসারটা আগলে রাখার ব্যবস্থা যেন মুক্তি বেগমই করেন। নইলে ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তার দায় কিন্তু কেউ নিতে পারবে না!

কথাগুলো শুনে নাতনির সংসার নিয়ে দুশ্চিন্তায় মুক্তি বেগমের রেবেকার প্রতি রাগ আরও বেড়ে গেল। আমেনা বেগমও মনে মনে খুশি। নিজে কিছু বলে নাতির কাছে খারাপ হওয়ার কী দরকার? রেবেকার দাদিকেই বরং নাতনির পেছনে লাগিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি আড়ালে থেকে তামাশা দেখবেন, আর মনে মনে বলবেন ::দেহি এইবার নাতিনের ঘর বাচাইয়ে বিয়াইন কতখানি কী করবার পায়।

এদিকে মুক্তি বেগম আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। রেবেকার দুই হাত ধরে টানতে টানতে তাকে বিছানায় বসিয়ে দিলেন।

রেবেকা বসেছে ঠিকই, কিন্তু ঘুমে তার মাথা দুলছে। চোখ খুলে রাখার সাধ্যটুকুও যেন নেই।

মুক্তি: “এই, এই ছিনাল! উড, উড কইতাছি! মাগি, লাঙ্গের ভাত মারবার লাগছস! এরুম লাঙ্গ পাইবি নি দুনিয়ার?”

ঠিক সেই সময়েই ঘরে ঢুকল মিলন।

সারা রাত তার ঘুম হয়নি। গত রাতে রেবেকাকে নিয়ে শাপলা বিলে গিয়েছিল মিলন। জোছনামাখা রাতে নৌকায় দুজনে একসঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছে। কিন্তু নৌকায় বসে থাকতে থাকতেই হঠাৎ রেবেকা অকারণে হাসতে শুরু করে। তার সেই হাসির কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি মিলন। প্রথমে অবাক হলেও ধীরে ধীরে মনের ভেতর অজানা এক ভয় চেপে বসে তার। শাপলা বিলের নির্জন পরিবেশে বিবির এমন অকারণ হাসি দেখে নানা দুশ্চিন্তা মাথায় ভিড় করে। শেষমেশ আর দেরি না করে রেবেকাকে নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসে সে। ততক্ষণে রাতও অনেক গভীর হয়ে গেছে।

রেবেকাকে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার পর থেকেই মিলনের মন অস্থিরতা ডুবে থাকে, সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি সে। বারবার শাপলা বিলের সেই ঘটনা মনে পড়েছে, বুকের ভেতর খচখচ করেছে অজানা আশঙ্কা। তার বিবির কী হয়েছিল? কেনই-বা এমন অকারণে হাসছিল? কোনো অশরীরীর প্রভাব পড়েনি তো তার ওপর? এমন হাজারো চিন্তায় রাত কেটেছে মিলনের। সকাল হওয়ার অপেক্ষায় ছিল সে, কখন একবার নিজের চোখে বিবিকে দেখে মনটা শান্ত করবে!

অথচ সকাল হওয়ার পর থেকেই নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য ছটফট করলেও উপায় হচ্ছিল না। ঘরে শাশুড়ি আর দাদি-শাশুড়ি উপস্থিত থাকায় এতক্ষণ ঢুকতে পারেনি। দূর থেকে রান্নাঘরে মায়ের সঙ্গে শাশুড়িকে ব্যস্ত থাকতে দেখে অবশেষে একটু স্বস্তি পেল মিলন। এই তো সুযোগ! আর দেরি না করে নিজের বিবিকে একবার দেখার জন্য দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল সে।

কিন্তু ঘরে পা রেখেই যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তাতে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।

বিছানার পাশে দুই জংলি বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে, আর মাঝখানে তার বিবি ঘুমের ঘোরে ঢুলছে!

মিলন প্রথমে আমেনা বেগমকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিল। অথচ নাতিকে দেখামাত্রই আমেনা বেগমের চেহারায় কী আশ্চর্য পরিবর্তন! এইমাত্র যিনি রেবেকার নামে অভিযোগের ঝুড়ি খুলে বসেছিলেন, তিনিই এখন একেবারে ভদ্র, সভ্য, শান্ত আর নিষ্পাপ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

মিলনকে দেখেই মুক্তি বেগম রেবেকার হাত ছেড়ে দিয়ে, বিছানা থেকে লাফিয়ে নামার চেষ্টা করল।কিন্তু রেবেকা ঘুমে টাল সামলাতে না পেরে বা পাশ হয়ে বিছানা থেকে ঢলে পড়তে যাচ্ছিল। কিন্তু

মিলন দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে দুহাতে আগলে ধরল।

স্বামীর বুকের সঙ্গে থুতনি ঠেকিয়ে রেবেকা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল। যেন এতক্ষণে বহু আকাঙ্ক্ষিত আশ্রয়টা খুঁজে পেয়েছে। তারপর স্বামীর বুকের ভাঁজে নাক-ঠোঁট ঘষে আবারও ঘুমিয়ে পড়ালো শান্তিতে।

মিলনও তাকে আরো শক্ত করে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। তারপর কিছুটা রাগী দৃষ্টিতে দুই বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-

মিলন: “কিতা সমস্যা? কিতা হইছে? আমার বিবিরে কি করছুইন আন্নেরা?”

নাতজামাইয়ের এমন ভরাট কণ্ঠস্বর শুনে মুক্তি বেগম কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। কিন্তু আমেনা বেগমের কোনো হেলদোল নেই। তিনি বরং মুখ বাঁকিয়ে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছেন মিলনের বুকের সাথে লেপ্টে থাকা রেবেকার দিকে।

মুক্তি বেগমের দিকে তাকিয়ে মিলন কিছু বুঝতে না পারলেও নিজের গুণধর দাদির মুখের দিকে তাকিয়েই যা বোঝার বুঝে নিল। তবে আজ এই নির্লজ্জ বুড়িকে একটা শিক্ষা সে দেবেই চিন্তা করে নিলো এক মূহুর্তে, তবে দুষ্ট-মিষ্টি শিক্ষা। মিলনের চিন্তার মধ্যেই মুক্তি বেগম কিছুটা জড়তা নিয়ে বলল-

মুক্তি:: “কিতা! কিছু হয় নাই কা, জামাই? ওয় হুতুনতে উঠতাছে না, তাই উডাইবার চাইছিলাম।”

মিলন: “এতো সহালে আমার বিবির ঘুম ভাঙে না, বুবু। আর এতো বেইন্না বেলা উইডা কিতা করব, হুনি?”

মিলনের কথাটা আমেনা বেগমের একেবারেই সহ্য হলো না। তিনি আর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না, চুপ করে সব দেখাটা তো তার স্বভাবের বাহিরে, তাই ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলেন-

আমেনা: “আহা হা হা! ঢং কতো! সহালে উডবার পায় না, নাটক! বেইন্না বেলা উইডা কি করবো জানে না! বেইন্না বেলা হগলেরে নাচ দেহাইবো তোর মাগি!”

এতক্ষণে মিলনের মুখে হাসি ফুটল। এই তো, বেরিয়ে এসেছে তার দাদির আসল রূপ!

দাদিকে আর দাদি-শাশুড়িকে একসঙ্গে জব্দ করার এমন সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়?

মিলন ইচ্ছা করেই বিছানা থেকে টেনে উঠিয়ে রেবেকাকে কোলে তুলে নিল। ঘুমে আচ্ছন্ন রেবেকা বুঝলো না কিছুই স্বামীর কোলে বসে, স্বভাবগত ভঙ্গিতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরেই, মিলনের গলার ভাজে মুখ গুঁজে দিল।

দৃশ্যটা দেখে দুই বৃদ্ধা যেন পাথর হয়ে গেলেন।

মুক্তি বেগম লজ্জায় আঁচল দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেললেন। জীবনে এমন দৃশ্য চোখের সামনে দেখবেন, তা স্বপ্নেও ভাবেননি!

কিন্তু আমেনা বেগমের অবস্থা আরও করুণ। তিনি মুখ বিকৃত করে চিৎকার করে উঠলেন-

আমেনা: “ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ! আমার পুতের ঘরে এমন ইবলিশ কেমনে পয়দা হইলো? এই, এই! তোর শরম নাই? নামা, নামা ওরে!”

মিলন নির্বিকার।

মিলন: “না, নাই! শরম নাই। আমার বিবি আমার যেইনো মন চায়, হেইনো রাহুম। তাতে কার বাপের কিতা?”

আমেনা:“ইবলিশের ঘরের ইবলিশ! এরুম ভাব মারাস যেন দুনিয়াত তুই এলহাই একখান মাগিউলা বেডা! আঙ্গর সোয়ামিরা কি বউ ছাড়া আছিল?”

দাদির কথার জবাব দেওয়ার জন্য মিলন মুখে আর কিছু বলল না। তার বদলে দুই বৃদ্ধাকে দেখিয়ে-শুনিয়ে জোরে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" বলেই ঘুমন্ত রেবেকার আধখোলা ঠোঁটে শব্দ করে একটা চুমু খেয়ে বসল-

মিলন: “উম্মাহ!” আল্লাহ তুমি ভূত-পেত, জিন-পেতাত্মা ,অশরীরী সকল কিছু আর জংলি বুড়িগোর খপ্পর থাইকা আমার নিষ্পাপ বিবিরে রক্ষা করো।

ঘটনাটা কী হলো, কীভাবে হলো, সত্যিই চোখের সামনে ঘটল কি না-তা বুঝতে দুই বৃদ্ধার প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড সময় লেগে গেল।

যখন বুঝতে পারলেন, ততক্ষণে মুক্তি বেগমের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “মায়া গো! মায়া গো!” বলে দুই কানে হাত দিয়ে ধপাস করে মাটিতে বসে পড়লেন তিনি।

আর আমেনা বেগম? লজ্জায়-রাগে তাঁর হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাওয়ার জোগাড়। হাতের কাছে ঢেক্সুর উপর তালপাতার পাখাটা পেয়েই সেটা তুলে সজোরে ছুড়ে মারলেন মিলনের দিকে।

মিলন দ্রুত একটু ঘুরে বসতেই পাখাটা তার পিঠে এসে পড়ল।

আমেনা:: “হারামজাদা! বেলজ্জা! বেশরম! আমার পুতের ঘরে এমন খবিশ জন্মাইলো!”

মিলনও কম যায় না।

মিলন: “খবরদার, খবিশের দাদি! খবিশের বিবি দুক্কু পাইলে ঘাড় ডা মটকাইয়া লায়াম!” (ভেঙে ফেলবো)

কথাটা বলেই সে রেবেকার ঘুমন্ত মুখমণ্ডলে একের পর এক চুমু আঁকতে লাগল।

আজ দুই বুড়িকে একসঙ্গে জব্দ করার সুযোগ পেয়েছে সে। এমন সুযোগ কি আর বারবার আসে? তাই ইচ্ছা করেই তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে আদুরে গলায় বলতে লাগল-

মিলন:: “উম্মাহ, আমার সোনা বিবি! উম্মাহ, আমার লক্ষ্মী বিবি! উম্মাহ, আন্ধাইর রাইয়ের চান্দের টুকরা বিবি! উম্মাহ, ঘুমাও সোনা, যতো মন চায় ঘুমাও!”

আমেনা বেগমের সহ্যের সীমা এবার একেবারে ছাড়িয়ে গেল। তিনি ছুটে এসে মিলনের পিঠে ধুমধাম করে কিল বসাতে লাগলেন।

আমেনা: “হারামজাদা! পুংডার ঘরের পুংডা! বেলজ্জা-বেশরম! ছাড় ওরে, ছাড়! শরম নাই তর? খবিশের নাতি! তুই তো ঐ গুলনাহারের চেয়েও বেশি শরম ছাড়া!”ছাড় ওরে

কিন্তু মিলন কিছুতেই রেবেকাকে ছাড়ল না। বরং আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাদিকে শুনিয়ে বলল-

মিলন: “আহা! চুমু খাওয়া দেইখাই এরুম চেতলা! এহনো তো বহুত কিছু করার বাকি! খাড়াও, দেহাই!”

কথাটা বলেই সে রেবেকার কাঁধের ওপর থেকে শাড়ির আঁচলটা নামিয়ে দিল, তারপর আবারও আদুরে ভঙ্গিতে তাকে বুকে টেনে নিল।

তা দেখেই আমেনা বেগমের চিৎকারে যেন ঘরের চাল উড়ে যাওয়ার জোগাড় হলো।

আমেনা::“ও মায়া গো! মায়া! ও আল্লাহ গো আল্লাহ! এই কি খবিশ জন্ম দিলো আমার পুতে ব‌উয়ে গো !”

এ পর্যায়ে মুক্তি বেগম আর স্থির থাকতে পারলেন না। কোনোমতে উঠে এসে আমেনা বেগমের হাত ধরে টানতে টানতে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যেতে লাগলেন। নাতজামাইয়ের ওপর আর ভরসা পাচ্ছেন না তিনি। কে জানে, এই বুড়িদের সামনে থাকতে থাকতে কখন আবার কী কাণ্ড করে বসে!

মুক্তি:: “বিয়াইন, আইয়ুন! এইনতে যাইগা। নাতজামাইয়ের মাতা গেছে!”

আমেনা:: “না, বিয়াইন! ছাড়ুইন আমারে! ঐ হারামজাদারে পিডে আরো কয়ডা দিয়া আই।খবিশের বাচ্চা কামডা করলো কি!

দুই বুড়ির টানাটানির কাণ্ড দেখে মিলন গা দুলিয়ে হাসতে লাগল। আমেনা বেগমকে দেখিয়ে দেখিয়ে রেবেকার কপালে মুখমণ্ডল জুড়ে চুমু বসাতে বসাতে বলল-

মিলন:: “জংলি বিবিরা, দুয়ারডা লাগাইয়া যাও! আমি আমার সোনা বিবিডারে একটু সোয়াগ করি।

কথাটি বলেই পেছনে তাকিয়ে, দুই বৃদ্ধার হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও হেসে উঠল মিলন।

মিলন:: হা হা হা

আমেনা বেগম বা পায়ের স্যান্ডেল ততক্ষণে খুলে হাতে নিয়েছে, মুক্তা বেগম তখনো তাকে ধরে টানছিল, সেই টানাটানি আটকাতে পারল না আমেনা বেগমকে, বৃদ্ধা ক্ষিপ্ত হয়ে নাতির দিকে ছুড়ে মারল স্যান্ডেল চেচিয়ে বলল-

আমেনা:: বিবি মারাছ হারামজাদা,তর আর তর বিবির গাঢ়িডা ফাঁডাইয়া লাইয়াম এক্কারে!

মুক্তি বেগম দ্রুত আমেনা বেগমকে নিয়ে বের হয়ে, দরজাটি বাহির দিক দিয়ে আটকে দিল, ভেতর থেকে তখন মিলনের হাসি শব্দ শোনা যাচ্ছে। এদিকে রেবেকা তখনো স্বামীর বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ঘরের বাইরে দুই বুড়ির তুমুল হইচই, উঠোনজুড়ে বিয়ের ব্যস্ততা-কোনো কিছুই যেন তার ঘুমের রাজ্যে পৌঁছাতে পারছে না।

আর মিলন? বিয়ের বাড়ির সকালবেলায় নিজের বিবিকে আগলে ধরে দুই বুড়িকে একসঙ্গে জব্দ করার আনন্দে তার মুখের হাসি আর কিছুতেই থামছে না!

_______________________

যোহরের আজান পড়তেই মুসল্লিরা নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদের দিকে ছুটলেন। চেয়ারম্যান শরাফত আলী, মেম্বার সাহেবসহ গ্রামের কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হলেন। তাঁদের হাতে ছিল এক পাল্লা বাতাসা।

সেখানে উপস্থিত হলো জসিমও। পরনে তার সাদা পাঞ্জাবি সাদা লুঙ্গি। গত সন্ধ্যায় হাসমত সওদাগর মিলনের দোকানের এক কর্মচারী ছেলের হাত দিয়ে জসিমের বাড়িতে পাঞ্জাবিটা পাঠিয়েছিলেন, সঙ্গে আরও নানান জিনিসপত্র।

সালিশের রায় অনুযায়ী, যোহরের নামাজ আদায়ের পর জসিমের মৃত স্ত্রীর রুহের মাগফিরাত কামনা করে মিলাদের দোয়া পড়ানো হলো। সবশেষে মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লি ও বাচ্চাদের মধ্যে বাতাসা বিতরণ করা হলো। মিলাদের কাজ সম্পূর্ণ হতেই চেয়ারম্যান, মেম্বার, মসজিদের ইমাম এবং এলাকার কয়েকজন লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে জসিম বরযাত্রী হিসেবে রওনা হলো বাদল মাস্টারের বাড়ির উদ্দেশে।

এদিকে, বাদল মাস্টারের বাড়িতে ততক্ষণে বিয়ের আমেজ জমজমাট। আসমানীকে লাল বেনারসি পরিয়ে বধূ সাজানো হয়েছে। সেজেছে কলি, সঙ্গে রেবেকাও। তিনজনকে একসঙ্গে দেখে মহিলারা অবাক হয়ে যাচ্ছেন। কানাকানি করে একে অন্যকে জিজ্ঞেস করছেন:: তিন-তিনডা বউ কুনহানতে আইলো? বিয়ার আসল কন্যাডা কেডা?

শেষমেশ তাঁরা যেন বুঝতেই পারছেন না, কার বিয়ে হচ্ছে!

এদিকে, সকালের সেই ঘটনার পর থেকে আমেনা বেগম নিজের কক্ষ ছেড়ে একচুলও নড়ছেন না। বাদল মাস্টার মায়ের সঙ্গে এ নিয়ে গোপনে কয়েক দফা বৈঠকও বসিয়েছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। মাস্টার কয়েকবার মিলনের দিকে রাগী চোখে তাকিয়েছেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, এসবের পেছনে ছেলের হাত আছে, তবে কী করেছে, তা তিনি জানেন না।

কিন্তু মিলনের তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে নিজের মতো সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা লুঙ্গি পরে নতুন জামাই সেজে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর একটু সুযোগ পেলেই বেনারসিতে মোড়ানো তার চান্দের টুকরা বিবিটাকে গোপনে ডেকে নিয়ে গিয়ে রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছে, সঙ্গে চলছে টুকটাক আদর-সোহাগও।

আজ মিলনের মনটা ভীষণ ফুরফুরে। বিয়েটা ঠিকঠাক মিটমাট হয়ে গেলে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই জিনিসটা যে সে পেতে চলেছে, এই ভাবনাটুকুই তার শরীরের শিরা-উপশিরায় অদ্ভুত এক শিহরণ জাগিয়ে তুলছে। মনে মনে সে যেন আর তর সইতে পারছে না!

তবে এত আনন্দের মধ্যেও দায়িত্ব পালনে কোনো হেরফের করছে না মিলন। বরযাত্রীদের বসার ব্যবস্থা ঠিকঠাক হয়েছে কি না, খাওয়াদাওয়ার আয়োজন যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেসবও ঘুরে ঘুরে তদারকি করছে। বিয়েবাড়ির সবকিছু ঠিকঠাক রাখার দায়িত্বটাও যে তার কম নয়!

এরই মধ্যে বাদল মাস্টার মাসুদ কে পাঠালো,দাদিকে ঘর থেকে বাইরে আনার দায়িত্ব দিয়ে। বাবার কথা শুনে মাসুদ বেশ আহ্লাদ করে দাদির কাছে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ, আমেনা বেগম তার দিকে স্যান্ডেল ছুড়ে মারলেন তাও আবার বারান্দা ভর্তি মহিলাদের সামনে।

বেচারা মাসুদ জানেই না, তার ওপর দাদির রাগের মাত্রা মিলনের চেয়েও কয়েক হাজার গুণ বেশি। এককথায়, বর্তমানে মাসুদকে তিনি চোখের সামনে সহ্যই করতে পারেন না।

তবে কেউ বুঝতে পারছে না, বিয়েবাড়িতে হঠাৎ এমন কী ঘটল যে আমেনা বেগমের এই অবস্থা? কিছুক্ষণ পরেই তো বরযাত্রীরা চলে আসবে! এদিকে বাড়ির সবাই একে একে তাঁকে ডাকছে, নতুন জামাইকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হতে বলছে। এ বাড়ির বিয়েতে বরণের কাজ সবার আগে আমেনা বেগমের হাত দিয়েই শুরু হয়। মিলনদের ব্যাপারী গোষ্ঠীর সবচেয়ে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ বৃদ্ধা তিনি। বয়সে বড় বলে পরিবারের সবাই তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করে।

এক এক করে কলি, রুহুল, রাবেয়া বেগম, খালেদা খাতুন, খবিরুন নেসা, এমনকি ঘষেটি বেগমও তাঁকে ডাকলেন। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। শেষমেশ মুক্তি বেগম গেলেন আমেনা বেগমের কাছে।

মূলত মুক্তি বেগমের সামনে যেতেই আমেনা বেগমের লজ্জা পাচ্ছিল। মুক্তি বেগমও কম লজ্জা পাচ্ছেন না, তবে আমেনা বেগমের লজ্জার মাত্রাটা যেন একটু বেশিই!

অবশেষে, যার সামনে যেতে এত লজ্জা, সেই মুক্তি বেগমই যখন কাছে এসে ঘর থেকে বাইরে আসার জন্য অনুরোধ করলেন, তখন আর ঘরে বসে থাকতে পারলেন না আমেনা বেগম। বেরিয়ে এলেন ঠিকই, তবে মাথায় এক হাত পরিমাণ ঘোমটা টেনে! ঘোমটা একেবারে বুক ছুঁইছুঁই।

দাদি-শাশুড়িকে এমন পর্দাশীল অবস্থায় দেখে,নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রেবেকা হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠলো।

মিলন তখন রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে খালেদা খাতুনের সঙ্গে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন নিয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ রেবেকার হাসি শুনে পেছনে ঘুরে তাকাল। আমেনা বেগমের এমন ঘোমটায় ঢাকা অবস্থা দেখে সেও আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। শব্দ করে হেসে উঠল মিলনও।

খালেদা খাতুন ঘটনাটা দেখে একেবারে আহাম্মক বনে গেলেন। ঘষেটি বেগম কিছু না বুঝেই দফায় দফায় হাসতে লাগলেন। কলি তো কিছুই বুঝতে পারল না। সে ব্যস্ত হাতে কয়েকবার চেষ্টা করল দাদির ঘোমটা খুলে দেওয়ার।

মাসুদও হাসল। তবে আগেরবার সবার সামনে দাদির ছোড়া জুতার অভিজ্ঞতা হওয়ায় মুখে কিছু বলল না।

কিন্তু মিলন তো আর সুযোগ ছাড়ার পাত্র নয়! সে রসিকতা করে বলে উঠল-

মিলন:: বুঝবার পাইতাছি না, বাইত বিয়া কার? আসমানীর, না আমেনা বেগমের?

আমেনা বেগম ঘোমটার আড়াল থেকে দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,

আমেনা:: বিয়া তার মাগির! নষ্ট হারামজাদা!

কথাটা শুনে আরেক দফা হাসির রোল উঠল বাড়িতে। মিলনও হাসল, তবে ‘নষ্ট হারামজাদা’ কথাটার মানে কী, তা আর কেউ বুঝে উঠতে পারল না।

____________________

সময় কারও জন্যই থেমে থাকে না। নিয়ম মেনে ধাপে ধাপে পার হয়ে গেল আসমানীর বিয়ের দিনটাও।

শুরুটা হয়েছিল আমেনা বেগমের হাতে জসিমকে বরণের মধ্য দিয়ে। যদিও ঘষেটি বেগমের সঙ্গে সম্পর্কে আমেনা বেগমের বয়সের ব্যবধান থাকলেও এই বাড়ির সবার মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়ায় নতুন জামাইকে বরণ করার দায়িত্বটা বরাবরের মতো এবারও আমেনা বেগমের হাতেই ছিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ঘষেটি বেগমও।

এরপর হাসমত সওদাগরের তৈরি বাঁশ আর খড়ের ছাউনির নিচে বরযাত্রীদের বসিয়ে ধাপে ধাপে আপ্যায়ন করা হলো। খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেল।

ইমাম সাহেবের কথা মত, কবুল বলার সময় হঠাৎ করেই চিৎকার করে কেঁদে উঠল আসমানী। তার কান্নার শব্দে এতক্ষণ হাসি-আনন্দে মুখরিত বিয়েবাড়ির পরিবেশ মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল। সেই কান্নার শব্দ গিয়ে পৌঁছাল জসিমের কানেও। বুকের ভেতরটা তারও হাহাকার করে উঠল। কিন্তু এই মুহূর্তে কারও কিছু করার নেই। নিয়তির কাছে যে দুজনকেই হার মানতে হয়েছে!

হাসমত সওদাগর অনেক বুঝিয়ে আসমানীকে শান্ত করলেন। অবশেষে ভাঙা গলায়, বুকভরা কষ্ট নিয়ে কবুল বলল আসমানী। আর সবার অনুমতি ও উপস্থিতিতে জসিমও কবুল বলে আসমানীকে চিরদিনের জন্য নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করল। চারপাশের মানুষজনের কাছে এ ছিল বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, অথচ আসমানী আর জসিমের কাছে মুহূর্তটা ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা অসংখ্য কষ্টের সঙ্গে আপস করে নেওয়ার মতো।

সবশেষে এল বিদায়ের পালা।

বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসতেই আসমানী আবারও চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কান্নার একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল সে। বাধ্য হয়ে জ্ঞানহীন আসমানীকেই পালকিতে তুলে দিলেন হাসমত সওদাগর। নিয়ম অনুযায়ী, আসমানীর সঙ্গে তার শ্বশুরবাড়ি গেলেন দাদি ঘষেটি বেগমও।

একদিকে আসমানীর বিদায়, অন্যদিকে রেবেকার বাপের বাড়ির লোকজনেরও বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল।

এই তো দুপুরবেলা জালাল মিয়া আর মুমিন মিয়া এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। আসরের আজানের পর আসমানীকে বিদায় দিয়ে এবার তাঁরাও নিজেদের বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর তা দেখেই রেবেকার মুখ ভার হয়ে উঠল। একসময় শুরু করে দিল কান্নাকাটি।

বউয়ের কান্না দেখে মিলনের হাত-পা ঘেমে উঠল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মনে মনে ভাবতে লাগল, সর্বনাশ! আজ আবার কী হতে চলেছে? রেবেকা কি এবার বাপ-দাদার সঙ্গে নিজের বাড়ি যাওয়ার বায়না ধরে বসবে নাকি?

ভাবনাটা মাথায় আসতেই মিলনের মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। এতক্ষণ যে মানুষটা বিয়েবাড়ির সব দায়িত্ব হাসিমুখে সামলেছে, সেই মানুষটাই এখন নিজের বউয়ের কান্না দেখে দিশেহারা হওয়ার জোগাড়!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে অপরিপক্ক পর্ব ৩৮ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন