ঘরে ঢুকেই মিলন গায়ের শার্ট খুলে গামছা আর লুঙ্গি হাতে নিয়ে বেরোতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই রেবেকা ঘরে ঢুকে মিলনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। হঠাৎ এমন ধাক্কায় মিলন খানিকটা পিছিয়ে গেল। আর রেবেকা তার বুক ভাসিয়ে কেঁদে চলল।
রেবেকা: আন্নে! অন্নের রাইতে কুনো আছিলাইন? আমি কতো খুঁজছি! আন্নে আমার লগে গুস্সা (রাগ) করছুইন? আমি কিতা করবাম? আব্বা-আম্মা যাইতাছিল গা, আমার বহুত পেড পুড়তাছিল তহন।
মিলন রেবেকাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিল।
মিলন: পেড পোড়ান লাগতো না, যাওগা তোমার মা-দাদির লগে।
রেবেকা দুহাতে চোখ মুছে বলল-
রেবেকা: সত্যিই?
মিলন দাঁত কিড়মিড় করে রেবেকার দিকে তাকিয়ে রইল। স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে রেবেকা আবারও জিজ্ঞেস করল-
রেবেকা: কতা কইন না কেন? আমি কি সত্যিই যাইতাম গা?
মিলন: মিছামিছি থাহার চাইতে, সত্যি সত্যি যাওগা। আর এহন আমার সামনের থেইকা সরো, তোমার ঢং সহ্য হইতাছে না আমার।
রেবেকা মিলনের কথা শুনেও সামনে থেকে সরল না। বরং আবারও তার কাছে ঘেঁষতে চাইলে মিলন রেবেকার হাত শক্ত করে চেপে ধরে জোর খাটিয়ে তাকে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে দিল। তারপর বাইরে যেতে যেতে বলে উঠল-
মিলন: আর একবার এরুম ঢং করলে আমার হাতের থাপ্পড় খাইবা, মনে রাইখো!
এবার সত্যিই অনেক খেপেছে মিলন। তার রাগের পেছনে কারণও আছে। কথা ছিল, আসমানীর বিয়ে উপলক্ষে রেবেকা বেনারসি পরে বউ সেজে সম্পূর্ণভাবে তার হবে। কিন্তু সেই সব কথা ভুলে গিয়ে বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে রেবেকা যেন তার সমস্ত পরিকল্পনাই মাটি করে দিয়েছে। বিষয়টা মিলন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তাকে দেওয়া কথা রেবেকা কীভাবে ভুলে যেতে পারে? তার মানে কি মিলনের আপন হয়ে ওঠার প্রতি রেবেকার মন থেকেই আগ্রহ ছিল না? এই অভিমানটাই মিলনের রাগের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু মিলনের রাগী কথাগুলো রেবেকার হজম হলো না।
চৌদ্দ বছর চার মাস বয়সী রেবেকার এখনো বয়ঃসন্ধিকাল চলছে। এ বয়সে ছেলে-মেয়ে উভয়েরই মন-মানসিকতায় দ্রুত পরিবর্তন আসে। আবেগের বশে কখনো তারা এমন কিছু করে বসে, যার সঙ্গে তাদের পরক্ষণকার চিন্তাভাবনার কোনো মিল থাকে না। কখনো তাদের আচরণে মনে হয় বেয়াদবি করছে, কখনো মনে হয় সবটাই বুঝি নাটক কিংবা ঢং। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই তারা নিজেরাই বুঝে উঠতে পারে না, কেন এমন আচরণ করছে।
______
সেই সময়কার গ্রামীণ সমাজে চৌদ্দ বছর পেরোনো মেয়েদের প্রাপ্তবয়স্ক নারী হিসেবে গণ্য করা হতো। এই বয়সেই অনেক মেয়ে সংসার সামলাত, এমনকি মা-ও হয়ে যেত। কিন্তু রেবেকা বাপের বাড়ি ও স্বামীর বাড়ি-উভয় জায়গাতেই অতিরিক্ত আদর-যত্নে বড় হয়েছে। ফলে সেই সময়ের সমাজে তার বয়সী অনেক মেয়েকে যে জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হতো, রেবেকা এখনো তার অনেক কিছু থেকেই দূরে। যুগ, কাল, স্থান ও পরিবেশের সবকিছুকে ছাপিয়ে তার ওপর বয়ঃসন্ধির প্রভাব তখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান।
তাই মিলনের এমন হঠাৎ রেগে যাওয়াটা রেবেকা কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। সেও আগে-পিছে কিছু না ভেবেই বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য কাপড় গুছিয়ে নিতে শুরু করল।
বাড়ির আঙিনায় তখন ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। রেবেকার দাদি-মা সবাই যাওয়ার জন্য তৈরি। বেয়াইনের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতাও চলছে। মিলন গোসল সেরে তাদের বাজার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসবে। ইতিমধ্যে কলি রুহুলের সঙ্গে চলে গেছে। আর হাসমত সওদাগর আসমানীদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাতাসা-জিলাপি কিনতে বাজারে গেছেন। সেখান থেকে ফিরেই, উনিও চলে যাবে খবিরুন নেসাকে নিয়ে।
মিলন গোসল সেরে ঘরে ঢুকতেই দেখল, রেবেকা তার কাপড়চোপড় গুছিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। মুহূর্তেই তার ভেতরে জমে থাকা রাগটা যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি সবকিছু ভুলে গেল সে। রেবেকার হাত শক্ত করে চেপে ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর রাগের মাথায় সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল রেবেকার গালে।
রেবেকা ছিটকে বিছানায় পড়ে গেল।
মিলন রাগী গলায় বলে উঠল-
মিলন: এক পাও ঘরের দুয়ারের বাইরে রাইখা দেখ খালি! পাও ভাইঙ্গা বিছনাত বহাই রাহুম!
এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়েনি রেবেকা। মিলনকে এতটা রাগী রূপে সে কখনো দেখেনি। ভীষণ ভয় পেল সে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে তার চোখে জল এল না। বিছানার যে জায়গাটায় আছড়ে পড়েছিল, সেখানেই মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল।
মিলন আর তার দিকে তাকাল না। গায়ে শার্ট জড়াতে জড়াতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বিদায়ের সময় মুক্তি বেগম ও রাবেয়া বেগম রেবেকার কাছে এলেন। এবার আর রেবেকা কাঁদল না। ঘরে বসেই মা-দাদিকে বিদায় দিল। ঘর থেকে বাইরে পর্যন্ত বেরিয়ে এল না সে। সবাই ভাবল, হয়তো মা-দাদি চলে যাচ্ছেন বলে তার মন খারাপ হয়েছে, তাই ঘর থেকে বেরোতে চাইছে না। কেউ আর তাকে জোরাজুরি করল না।
মিলন তাদের নিয়ে বীরপুর বাজারের উদ্দেশে রওনা হলো।
______________________
রেবেকার গোটা দিনটা ঘরের ভেতরেই কেটে গেল। সত্যি সত্যিই সে আর ঘর থেকে বের হয়নি। সকালে মা-দাদির সঙ্গে বসে খেয়েছিল, তারপর আর কিছুই খায়নি। মূলত তার খিদেই লাগেনি। দুপুরবেলা খালেদা খাতুন তাকে খেতে ডেকেছিলেন, কিন্তু রেবেকা খাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। খালেদা খাতুন ভেবে নিয়েছেন, নিজের বাড়ির লোকজন চলে গেছে বলে মেয়েটার মন খারাপ। তাঁর নিজেরও তো ভীষণ মন খারাপ! মা-বাবা-দাদি চলে যাওয়ায় বুকের ভেতরটা তাঁরও কেমন খালি খালি লাগছে। তাই রেবেকার কষ্টটা তিনি অনুভব করতে পারলেন। মেয়েটার মন খারাপ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক!
অন্যদিকে, মিলন কিছুতেই বাড়ি ফেরার সাহস পাচ্ছে না। বারবার নিজের ডান হাতের দিকে তাকাচ্ছে। হাতের তালুর দিকে চোখ পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলছে হাতটা। কখনো আবার উরুর কাছে লুঙ্গির ওপর হাতের তালু ঘষছে।
বউদের নাকি মাঝেমধ্যে শাসনে রাখা উচিত! সেই বিষয় শুনে-দেখেই তো বড় হয়েছে মিলন। তাই সেও ধৈর্য হারিয়ে শাসন করেছে। কতভাবে বুঝিয়েছে, কত কথা বলেছে! শেষ পর্যন্ত মুখে বুঝিয়ে কাজ না হওয়ায় হাত তুলেছে। এতে কি সে পাপ করেছে?
নাদান স্ত্রীকে বোঝাতে, তাকে শাসনে রাখতে স্বামী নাকি সব রকম পন্থাই অবলম্বন করতে পারে! এমনটাই তো যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। বড়দের মুখে শুনে শুনে, চারপাশে দেখে দেখেই তো এই বিশ্বাস নিয়ে বড় হয়েছে সে। তাহলে আজ কেন নিজের স্ত্রীর সামনে দাঁড়াতেই তার এত সংকোচ হচ্ছে? কেন বারবার নিজের হাতের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে? কেন অনুশোচনায় পুড়ে যাচ্ছে তার অন্তর?
যে কাজটাকে এতক্ষণ নিজের অধিকার বলে মনে হচ্ছিল, এখন সেই কাজের ফলাফলের মুখোমুখি হতেই কেন এত ভয় লাগছে তার?
_____________________
এশার আজানের পর মিলন দোকান বন্ধ করল। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ পড়লেও আজ এশার নামাজের জন্য সে হাঁটতে হাঁটতে মসজিদে গিয়ে উঠল। মুসল্লিদের সঙ্গে এশার নামাজ আদায় করে মোনাজাতে দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর কাছে নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইল। নিজের বিবাহিত জীবনের জন্য দোয়া করল, দোয়া করল তার বিবি ও পরিবারের সবার জন্য। জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে যেন ধৈর্য ধারণ করতে পারে, আল্লাহ যেন তাকে সেই তৌফিক দান করেন-মোনাজাতে বারবার এই প্রার্থনাই করল সে।
মসজিদে বসে বেশ কিছুক্ষণ ইবাদত-বন্দেগি করার পর মিলনের মনটা কিছুটা শান্ত হলো। তারপর ধীর পায়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল। অথচ অন্যদিন বাড়ি ফেরার সময় তার পা দুটো অস্থির হয়ে থাকত, কখন বাড়িতে পৌঁছাবে, কখন নিজের বিবির মুখখানা দেখবে! আর আজ যেন পা দুটো চলতেই চাইছে না। প্রতিটি পদক্ষেপে বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠছে।
দীর্ঘ সময় হেঁটে অবশেষে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল মিলন।
খালেদা খাতুন হয়তো তখনই নামাজ পড়ে উঠেছেন। রাতের খাবার পরিবেশনের জন্য রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। উঠোনে মিলনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললো-
খালেদা: আইয়া পরছো আব্বা? যাও তয় হাত-মুখ ধুইয়া আইয়ো জলদি। আমি ভাত বাড়তাছি। বৌয়েও তো কিছু খায় নাই। মা-দাদি গেছে গা, মনে হয় পেড পুড়তাছে। তারেও লইয়া আইয়ো।
মিলন শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল-
মিলন: দুফুরে ভাত খায় নাই?
খালেদা: না! খাইব কী? সহালতে তো ঘর থাইকাই বাইর হয় নাই একবারের লাইগাও।
কথাটা বলতে বলতেই খালেদা খাতুন নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। রান্নাঘর থেকে ধোয়া প্লেট-বাটি নিয়ে খাবার ঘরের দিকে চলে গেলেন।
মিলন বুঝে নিল, যা বোঝার। কয়েক মিনিট নীরবে উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর নিজেকে শক্ত করে বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে পা বাড়াল নিজের ঘরের দিকে।
দরজাটা ভেজানো ছিল। দুয়ারে হাত রাখতেই খুলে গেল।
হারিকেনের আলো কমানো। আবছা সেই আলোয় মিলন দেখল, রেবেকা খোলা জানালার ধারে বিছানার এক কোণে বসে আছে। তার চোখ দুটো জানালার ওপাশে পুকুরের পানির দিকে স্থির হয়ে আছে। মিলন দুয়ারে দাঁড়িয়েই লক্ষ করল, সকালবেলার শাড়িটাই এখনো গায়ে। চুলগুলো এলোমেলোভাবে পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। বাঁ পা বিছানার ওপর তোলা, আর ডান পা ঝুলছে চৌকির নিচের দিকে।
রেবেকাকে এমন এলোমেলো রূপে আজই প্রথম দেখছে মিলন। দৃশ্যটা তার চোখে মনোমুগ্ধকর লাগল ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতরটা একই সঙ্গে অসহ্য যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল।
দৃষ্টি সরিয়ে আবারও নিজের ডান হাতের তালুর দিকে তাকাল সে। চোখ দুটো জ্বালা করে উঠল। মুহূর্তেই হাতটা শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল মিলন। এমনভাবে হাত চেপে ধরল, যেন নিজের হাতের তালুতেই নিজে আঙ্গুলের নখের চাপে আঘাত করে বসবে।
চোখ বন্ধ করে জ্বালা কমানোর চেষ্টা করল সে। তারপর বাঁ হাত দিয়ে দরজাটা আলতো করে চাপিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিদিনের মতো গায়ের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে নরম কণ্ঠে রেবেকাকে বলল-
মিলন: আন্ধাইর রাইতে জানলার ধারে বইয়া কী দেহ, বিবি?
মিলনের কথা শুনে দ্রুত পেছন ফিরে তাকাল রেবেকা। মিলন তখন শার্টের বোতামের দিকেই তাকিয়ে আছে। খুব মনোযোগ দিয়ে একের পর এক বোতাম খুলছে সে।
রেবেকা ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। এলোমেলো শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে স্বাভাবিক গলায় বলল-
রেবেকা: পাগারের (পুকুরের) উপরে আইজ মেলা জোনাহি পুক আইছে, তাই দেখতাছিলাম।
কথাটা বলেই রেবেকা আবার জানালার বাইরে পুকুরের দিকে তাকালো জোনাকি পোকা দেখতে।
মিলন ঘাড় ঘুরিয়ে আড়চোখে দেখল, জোনাকি পোকা দেখতে রেবেকার কত মনোযোগ! শার্ট খুলে ঢেক্সুর ওপর রেখে গলায় গামছা ঝুলিয়ে লুঙ্গি খুঁজতে খুঁজতে তাকে জিজ্ঞেস করল-
মিলন: আমার তবন (লুঙ্গি)কুনো, বিবি? বাইরের আড়ের থাইকা হুগনা কাপড় আনো নাই ঘরে?
রেবেকা তাকাল মিলনের দিকে। কিন্তু মিলন তার দিকে তাকাচ্ছে না। ঢেক্সুর কাছে দাঁড়িয়ে লুঙ্গি খুঁজছে , আর সেই ফাঁকে বিড়ির প্যাকেটটা রেখে দিচ্ছে ঢেক্সুর ওপর।
রেবেকা সবসময়ের মত সহজভাবেই কথা বলছে-
রেবেকা: আমার মনে আছিল না।
মিলন: ঘরের থাইকা বাইরেও যাও নাই পুরা দিন?
রেবেকা: না।
মিলন: কাপড় তো সহালেরডা এহনো গায়ে। দুপুরে নাও নাই?
রেবেকা: না।
মিলন নিজেকে অন্য কাজে ব্যস্ত রেখেই একের পর এক প্রশ্ন করে চলল। রেবেকাও প্রতিটি প্রশ্নের সহজ-সরল উত্তর দিয়ে যাচ্ছে।
মিলন: কেন নাও নাই? এই গরমে!
রেবেকা: আমার ইচ্ছা হয় নাই।
মিলন:খাওন খাও নাই কেন?
রেবেকা: খিদা ধরে নাই।
মিলন:নাওন না দিলে খিদা ধরব কেমনে? নাও নাই, তাই শইলে খাওনও খুঁজে নাই।
রেবেকা: হ, তাও হইবার পারে। দাদারে দেখতাম, গাও-গতর ধোয়ার পর খাওনের লাইগা চিল্লাইতো।
রেবেকা কথাগুলো একেবারেই সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলছে। অথচ তার এই সহজ কথাগুলোই মিলনের ভেতরের যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঘরের পরিবেশটা এমন, যেন সকালবেলা তাদের মধ্যে কিছুই ঘটেনি। যেন প্রতিদিনের মতোই সবকিছু চলছে।
রেবেকা এতটা শান্ত থাকবে, তা মিলন কল্পনাও করেনি। তার কথার উত্তর দিচ্ছে, তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে, অথচ কোথাও কোনো অভিমান প্রকাশ করছে না। এই অস্বাভাবিক স্বাভাবিকতাই যেন মিলনকে আরও অস্থির করে তুলছে।
তবু সেই পরিবেশটা ধরে রাখার চেষ্টা করল সে। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে একটা বিড়ি ধরিয়ে ঠোঁটে চেপে বলল-
মিলন: বাইরের বারান্দার আড় থেইকা আমার তবনডা লও, লগে তোমার কাপড়ও। গাও-গতর না ধুইলে খিদা লাগব না, লগে চোহেও ঘুম ধরব না। আইয়ো, আমার লগে পাগারে একখানা ডুব দিয়া আইবা।
রেবেকা মাথা দুলিয়ে বলল-
রেবেকা: আইচ্ছা।
মিলন বিড়িতে টান দিতে দিতে ধীর পায়ে পুকুরঘাটের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। রেবেকাও তার পেছন পেছন এগিয়ে গেল।
ব্যাটারিচালিত ছোট্ট টর্চলাইট জ্বালিয়ে মিলন প্রথমে পুকুরঘাটে নামল। টর্চটা পাশের কলাগাছের সঙ্গে এমনভাবে আটকে রাখল, যাতে সরাসরি ঘাটের ওপর আলো না পড়ে। তারপর রেবেকার দিকে তাকিয়ে বলল-
মিলন: বেশিক্ষণ ভিজুন যাইতো না। রাইত বহুত হইছে এহন। ঝটপট তিনহান ডুব দিয়া উডো।
রেবেকা মাথা ঝাঁকিয়ে ঘাটে নামল।
পুকুরঘাটে ধাপে ধাপে তালগাছের কাঠ দিয়ে বানানো সিঁড়ি। পাশে হাত ধরে নামার জন্য বাঁশ পুঁতে রাখা হয়েছে। সেই বাঁশ ধরে ধরে রেবেকা পানিতে নামতে লাগল। কোমরসমান পানিতে নেমে হঠাৎ থেমে গেল সে।
মিলন ততক্ষণে ঘাটে বসেছে হাঁটু পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে রেখে। রেবেকাকে থেমে যেতে দেখে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করল। পুকুরের মাঝখানে বেশ কয়েকটা জোনাকি পোকা দল বেঁধে উড়ছে। রেবেকা সেদিকেই স্থির চোখে তাকিয়ে আছে।
গ্রামের মেয়ে সে। জোনাকি পোকা তো গ্রামে কম নেই। অথচ এর আগে কখনো রেবেকাকে এত আগ্রহ নিয়ে জোনাকি দেখতে দেখেনি মিলন।
তাই কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল-
মিলন: হঠাৎ কইরা জোনাহি পুক এতো ভালা লাগার কারণ কী, বিবি?
রেবেকা: জানি না! তয় আইজ কেন যে এরুম ভালা লাগতাছে এই পুকগুলাইন!
মিলন: আইচ্ছা, যাও এলা তাড়াতাড়ি ডুব দিয়া উডো।
রেবেকা তার কথা শুনে আরও একটু নেমে গলা পর্যন্ত পানিতে ডুব দিলো। মিলন তখন ঘাটে বসে শরীরে সাবান মাখছে, আর চোখ রেখে দিয়েছে রেবেকার দিকে।
কেমন শান্ত হয়ে আছে তার বিবি! তার কথা শুনছে, কথার উত্তরে জবাব দিচ্ছে। অথচ মিলনের মনটা ছটফট করছে। এতটা শান্ত রেবেকাকে দেখে তার ভেতরের অস্থিরতা যেন আরও বেড়ে যাচ্ছে।
রেবেকা শরীরে সাবান মেখে ডুব দিয়ে উঠে পড়ল। তারপর পলিথিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা আড়ালের ভেতর ঢুকে কাপড় বদলাতে লাগল। মিলনও ঘাটে দাঁড়িয়ে নিজের লুঙ্গি বদলে নিল।
রেবেকা আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতেই অন্য দিনের মতো তার ভেজা শাড়িটা ধুয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল মিলন। প্রতিদিনের অভ্যাস অনুযায়ী নিজের লুঙ্গির সঙ্গে রেবেকার শাড়িটাও ধুয়ে দেয় সে।
কিন্তু আজ হাত বাড়িয়েও ভেতরে ভেতরে সংকোচ বোধ করছিল মিলন। একপর্যায়ে তার মনে হলো, রেবেকা হয়তো অভিমান করে কাপড়টা দেবেই না।
অথচ রেবেকার মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখা গেল না। মিলন হাত বাড়াতেই সে নিঃশব্দে ভেজা শাড়িটা তার হাতে তুলে দিল।
গোসল শেষে দুজন বাড়িতে ফিরে এল।
রেবেকা বারান্দার খুঁটির সঙ্গে বাঁধা কাপড় শুকানোর বাঁশে ভেজা কাপড়গুলো মেলে দিয়ে ঘরে ঢুকল। তারপর গামছা দিয়ে মাথার চুল মুছতে শুরু করল। লম্বা ঘন চুলগুলো কোমরেরও নিচ পর্যন্ত নেমে এসেছে। নিজের চিকন, কোমল হাতে যেভাবে পারছে, সেভাবেই চুল মুছছে সে।
অন্যদিন ভেজা চুল মুছতে মিলনের সাহায্যের অপেক্ষা করে রেবেকা। কখনো নিজেই বলে, চুলগুলো একটু মুছে দিতে। কিন্তু আজ আর সেসবের কিছুই করল না। নিজে থেকেই যতটা পারল, চুল মুছে নিল।
মিলনও এগিয়ে গিয়ে গামছাটা ধরল না। শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
এরই মধ্যে খালেদা খাতুন খাবার বেড়ে তাদের ডাকতে লাগলেন।
মিলন: লও, আম্মায় বইয়া আছে। ভাত খাইবা।
রেবেকা তার কথা শুনে মাথায় ঘোমটা টেনে নিল। তারপর স্বামীর পেছন পেছন হেঁটে খাবার ঘরে উপস্থিত হলো।
সারাটা দিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে মাসুদও একটু আগে ঘুম থেকে উঠেছে। খালেদা খাতুনের জোরাজুরিতে গোসল সেরে ভাত খেতে এসেছে সে। বড় ভাই আর ভাবিকে খাবার ঘরে ঢুকতে দেখে আর দাঁড়াল না। ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল আবার।
বাদল মাস্টারের বাড়িতে আজ হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ। গতকাল যে বাড়ি অতিথিতে গমগম করছিল, আজ সেখানে বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। কলিও নেই। আমেনা বেগম খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়ে পড়েছেন। বাদল মাস্টারও মায়ের সঙ্গে খেয়েছেন। খালেদা খাতুন মাসুদের সঙ্গে বসেই খেয়ে নিয়েছেন।
মিলন আর রেবেকা খাবার ঘরে ঢুকতেই খালেদা খাতুন তাদের একা রেখে নিজের ঘরে চলে গেলেন। রেবেকা মিলনকে ভালো করে বেড়ে খাওয়াতে পারে। এটা তো নতুন কিছু নয়। তাই তিনি ভেবেছেন, এখানে বসে থেকে তাঁর আর কাজ নেই।
রেবেকা শান্ত হাতে মিলনের পাতে ভাত বেড়ে দিল। অভ্যাসমতো নিজের জন্যও আলাদা থালা বাড়ল।
সারাদিন মিলনের খিদে অনুভব হয়নি। কিন্তু এখন যেন পেটের ভেতরটা খিদেয় মোচড় দিয়ে উঠছে। সে তৃপ্তি করে ভাত খেতে লাগল। রেবেকাও প্রতিদিনের মতোই খাচ্ছে।
দুজনের আচরণে কোথাও কোনো পরিবর্তন নেই। রেবেকা নিজের খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে এটা-সেটা তুলে দিচ্ছে স্বামীর পাতে। মিলনও স্বভাবমতো নিজের পাতে থাকা এক টুকরো গরুর গোশত তুলে দিল রেবেকার পাতে।
অন্যদিন হলে রেবেকা কিছু বলত না। মিলনের তুলে দেওয়া খাবারটা নিঃশব্দে খেয়ে নিল।
সবকিছুই চলছে অন্যান্য দিনের মতো। রেবেকা শান্তভাবে খাচ্ছে, স্বামীর পাতে খাবার তুলে দিচ্ছে। তার আচরণে যেন সকালবেলার ঘটনার কোনো ছাপই নেই।
অথচ এই স্বাভাবিকতার মাঝেই মিলনের ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠছে। যে মেয়েটা প্রতিদিন তার সঙ্গে কত কথা বলে, ছোটখাটো বিষয় নিয়েও কত আবদার করে, আজ সে এত চুপচাপ কেন? কেন তার মুখে কোনো অভিযোগ নেই? কেন সে একবারও সকালবেলার ঘটনাটা নিয়ে কিছু বলছে না?
মিলন বুঝতে পারছে না, রেবেকা সত্যিই সব ভুলে গেছে, নাকি তার এই নীরবতার আড়ালে জমে আছে এমন কোনো অভিমান? যার মুখোমুখি হওয়ার সাহস এখনো তার হয়ে ওঠেনি।
_______________________
প্রতিদিনের মতো রেবেকা বিছানা ঝাড়তে শুরু করল। আর মিলন দুয়ারে দাঁড়িয়ে ঘুমানোর আগে রাতের শেষ বিড়িটা টানছে। বিছানা গুছিয়ে রেবেকা নিজের নির্দিষ্ট জায়গায়, বিছানার বাঁ পাশে বালিশ টেনে শুয়ে পড়ল। মিলন বিড়ির শেষ অংশটুকু ফেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করল। তারপর হারিকেনের আলো একেবারে কমিয়ে রেবেকার পাশে শুয়ে পড়ল।
রেবেকা বাঁ পাশে ফিরে শুয়ে আছে, আর মিলন চিৎ হয়ে ঘরের ছাউনির বাঁশের দিকে তাকিয়ে রইল।
এভাবে বেশ অনেকটা সময় নীরবতায় কেটে গেল। একসময় মিলন অনুভব করল, রেবেকা গভীর তন্দ্রায় ডুবে ছোট ছোট শ্বাস ফেলছে। কেন জানি না, তার বিবির এমন নির্বিকারভাবে ঘুমিয়ে পড়াটা কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না মিলনের।
কীভাবে সহ্য করবে? তার বুকে গা এলিয়ে না দিলে তো রেবেকা ঘুমাতেই পারে না! কত দিন ধরে এই অভ্যাস। তার বুকে মাথা না রাখলে নাকি রেবেকার চোখে ঘুম আসে না। প্রতি রাতে মিলনের বুকে নাক চেপে ধরে বিড়ির গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকা তার শরীরের পরিচিত গন্ধটা ঘন ঘন শ্বাসের সঙ্গে টেনে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে রেবেকা। আর ঘুমানোর আগে প্রায়ই বলে-‘আন্নের গায়ের এই সুবাস মনে হয় আমার ঘুমের ওষুধ!’
তাহলে আজ কেন? কীভাবে সেসব ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়ল তার বিবি?
এই এত এত প্রশ্নের উত্তর এখন কোথায় পাবে মিলন?
বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল তার। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে রেবেকার বাহুতে হাত রাখল। তারপর শান্ত স্বরে ডাকল-
মিলন: বিবি... ও বিবি... রে রেবেকা, হুনো! চোখ মেলো দেহি। ঐ বিবি, আরে হুনো না একটু!
সারাদিন না খেয়ে থাকা রেবেকার পেটে গরম ভাত পড়তেই শরীরের ক্লান্তি যেন আরও বেড়ে গেছে। চোখে নেমে এসেছে গভীর ঘুম। তা ছাড়া রেবেকা একবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলে তাকে শোয়া থেকে তুলে বসিয়ে রাখলেও সহজে ঘুম ভাঙে না। মিলন তো তার এই গভীর ঘুমের অভ্যাস ভালো করেই জানে।
তবু সে আরও কয়েকবার ডাকল। কিন্তু রেবেকার ঘুম ভাঙল না।
শেষ পর্যন্ত আর পেরে উঠল না মিলন। বিছানা ছেড়ে উঠে একটা বিড়ি ধরাল। এই সামান্য বিষয়টুকুও আজ তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
মূলত রেবেকাকে থাপ্পড় মারার পর থেকেই নিজের ধৈর্য আর মানসিক স্থিরতা যেন কিছুটা হারিয়ে ফেলেছে সে। অপরাধবোধে ভুগতে থাকা মিলন এখন রেবেকার প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তার সঙ্গে কথা বলার ধরন, মিলনের কথার উত্তরে তার প্রতিক্রিয়া, এমনকি ছোটখাটো আচরণও নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করছে মনে মনে।
স্ত্রীকে আঘাত করে যে অপরাধ করেছে, তার জন্য নিজেকে শাস্তি দেওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না মিলন। অথচ নিজের অপরাধের মুখোমুখি হওয়ার বদলে সে ছোট ছোট বিষয় নিয়েও দুশ্চিন্তা করে চলেছে। রেবেকার প্রতিটি স্বাভাবিক আচরণের ভেতরেও খুঁজে বেড়াচ্ছে কোনো অস্বাভাবিকতার চিহ্ন।
***************************
সকালে ঘুম ভাঙার পর মিলন দেখল, রেবেকা ঘরে নেই।
গত রাতে শেষ রাত পর্যন্ত জেগে ছিল সে। স্পষ্ট মনে আছে, ফজরের প্রথম আজানও শুনেছিল। তারপর কখন ক্লান্তিতে চোখ বুজে এসেছে, তা আর খেয়াল করতে পারেনি।
মিলন বিছানা থেকে নেমে কাঁধে গামছা নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। তার চোখ দুটো প্রথমেই খুঁজতে লাগল রেবেকাকে। বেশিক্ষণ খুঁজতে হলো না। রান্নাঘরে তার আম্মা খালেদা খাতুনের সঙ্গে কোনো একটা কাজে ব্যস্ত রেবেকা।
দৃশ্যটা দেখে মিলনের হঠাৎ বিয়ের প্রথম দিকের কথা মনে পড়ে গেল। তখনো প্রায় প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রেবেকাকে এভাবেই তার আম্মার সঙ্গে রান্নাঘরে কাজ করতে দেখত সে। সেই চেনা দৃশ্য, পরিচিত পরিবেশ-সবকিছু যেন আগের মতোই আছে।কিন্তু তাদের দুজনের মাঝখানে কী যেন বদলে গেছে!
মিলন যখন এসব ভাবনায় ডুবে ছিল, ঠিক তখনই মাসুদের ডাকে তার ধ্যান ভাঙল।
মাসুদ: ভাইজান!
মিলন: হুম।
মাসুদ: আমার কিছু টেহা দরহার।
মিলন বাড়ির বাইরে পুকুরপাড়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল-
মিলন: ছুডি শেষ কবে? ফিরবি কবে বরিশাল?
মাসুদ বড় ভাইয়ের পেছনে মাথা নিচু করে হাঁটছিল। খুব নম্র স্বরে উত্তর দিল-
মাসুদ: এইতো সাতদিনের ছুডি আছে। চাইর দিন বাদে আমি এইনতে রওনা হইবাম। হেইনু যাইতে দুই দিন তো লাগে, যানুইননি?
মিলন: আইচ্ছা। যাওনের আগেই মাদ্রাসার খরচ পাইবি। আর এর পরের বার মাওলানা হইয়া মাথাত পাগড়ি দিয়াই বাড়িত আইস।
মাসুদ: ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ভাইজান, আমার মাদ্রাসার খরচের বাইরেও টেহা লাগতো।
মিলন ততক্ষণে পুকুরঘাটে নেমে পড়েছে। মাসুদের কথা কানে এলেও উত্তর দেওয়ার আগে ভালোভাবে হাত-পা ধুয়ে নিল। তারপর গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ঘাট থেকে উঠে ভাইয়ের সামনে দাঁড়াল।
মিলন: কয় টেহা লাগতো? কিতা করবি?
মাসুদ: আন্নেতো যানুইন, আঠারো বছরের বড় ছাত্রগোর মাদ্রাসার ভিতরে রাহে না। আমি অন্য ছাত্রগোর লগে মাদ্রাসা থেইকা দূরে থাহি। তাই আমার একখান সাইকেল লাগতো।
মিলন শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের কথা শুনল।
একটা সাইকেল কিনতে কমপক্ষে তিনশো টাকা লাগবে। তার ওপর মাসুদের এক বছরের মাদ্রাসার পড়াশোনা ও খাওয়ার খরচ তিনশো টাকা, আর হাতখরচ ও যাতায়াতের ভাড়া মিলিয়ে আরও পঞ্চাশ টাকা। সব মিলিয়ে ছয়শো পঞ্চাশ টাকা দিতে হবে তাকে।
ছয়শো পঞ্চাশ টাকা কম কথা নয়! এই টাকায় তো তাদের অঞ্চলে আট শতাংশ জমিও কেনা সম্ভব। হিসাবটা মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকল মিলনের। চিন্তিত মুখে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে বলল-
মিলন: তা কিনতে তো মেলা টেহা লাগবো! এতডি টেহা তরে আমি আব্বার অনুমতি না পাইলে কিবা দেই? তুই আব্বার লগে গিয়া ক।
মাসুদ জানত, বড় ভাইয়ের কাছ থেকে এমন উত্তরই পাবে। তাই মাথা দুলিয়ে শুধু বলল-
মাসুদ: আইচ্ছা।
_______________________
সকালে খাবার খেতে বসে মিলন রেবেকাকে জিজ্ঞেস করল-
মিলন: বাজার থেইকা ফিরার সময় কিছু আনুন লাগবো তোমার লাইগা, বিবি?
খালেদা খাতুন বারান্দা ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যেতেই মিলন রেবেকাকে একা পেয়ে কথাটা বলেছিল।মিলনের কথা শুনে রেবেকা ভাবতে লাগল, তার আসলে কিছু লাগবে কি না। একটু ভেবে মনে পড়ল, তার মাথায় দেওয়ার নারকেল তেল শেষ হয়ে গেছে। অসুস্থ আসমানীর মাথায় তেল দিতে দিতেই কৌটাটা খালি হয়ে গেছে।
রেবেকা:হ লাগবো তো, আমার মাতাত দেওয়ার তেল শেষ। নারিকেল তেল লাগবো।
মিলন: হুদা তেলই? আর কিছু না?
রেবেকা: আর কিছু তো মনে পড়তাছে না।
মিলন: আইচ্ছা।
বাজারে যাওয়ার আগে মিলনের খুব ইচ্ছা করছিল, অন্য দিনগুলোর মতো রেবেকাকে ডেকে এনে আদরে ভরিয়ে দিয়ে যেতে। অথচ কেন জানি না, আজ আর তাকে ঘরে ডেকে আনতে পারল না।
ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেল, তার বিবি পুকুরঘাটে বসে একগাদা কাপড় ধুচ্ছে। এইটুকুন শরীর নিয়ে এত কাপড় ধোয়া-পাল্লার কাজ করতে রেবেকার যে কষ্ট হচ্ছে, তা বুঝতে মিলনের অসুবিধা হলো না।
আর দাঁড়িয়ে থাকল না সে। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বাজারের উদ্দেশে রওনা দিল। তবে পথে রোজিনাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বলে গেল, যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের বাড়িতে গিয়ে রেবেকার ভেজা কাপড়গুলো কেচে দেয়। তার বিবির এখনো এত ভারী কাজ করার বয়স হয়নি।
_______________________
বৃহস্পতিবার বীরপুরের হাটের দিন। সকাল থেকেই বাজারে মানুষের ঢল নেমেছে। হাটের দিন এলেই আশপাশের গ্রামগুলো থেকে দলে দলে লোকজন ছুটে আসে বাজারে। রাস্তার দুপাশে মানুষের ভিড়, ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক আর দরদামে সরগরম হয়ে ওঠে গোটা বাজার।
পশুর হাটে গরু-ছাগলের পাশাপাশি হাঁস, মুরগি ও কবুতরের বেচাকেনা চলছে। মাছের বাজারে তাজা মাছের পসরা, সবজির বাজারেও ক্রেতাদের ভিড়। সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবারের হাট যেন আশপাশের গ্রামের মানুষের মিলনমেলা।
মিলনের কাপড়, লুঙ্গি আর গামছার দোকানেও সকাল থেকে ক্রেতাদের ভিড় লেগে আছে। কেউ লুঙ্গি কিনছে, কেউ গামছা, আবার কেউ দরদাম করে পছন্দের কাপড়খানা বেছে নিচ্ছে। ক্রেতাদের সামলাতে আর বেচাকেনার হিসাব রাখতে রাখতে দম ফেলার ফুরসত পেল না মিলন। দেখতে দেখতে সারাটা দিন ব্যস্ততায় কেটে গেল।
মাগরিবের নামাজের পর হাটের ভিড় একটু একটু করে কমতে শুরু করলে দোকান গুটিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিল সে। তবে বাড়ি ফেরার আগে হাট থেকে কিনে নিল দুটো রাজহাঁস। রেবেকার হাঁস খুব পছন্দ। তাই সারাদিনের ক্লান্তি সত্ত্বেও হাঁস দুটো সঙ্গে নিয়ে রাতের আঁধারে মেঠোপথ ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল মিলন।
এক হাতে দুটো রাজহাঁস, অন্য হাতে সদাইয়ের ব্যাগ। ব্যাগে রেবেকার জন্য কেনা নারকেল তেলের টিনের কৌটা, বিস্কুট, চানাচুর, নিমকি আর কলা।
বাড়ির বেশ খানিকটা কাছে আসতেই রাস্তার পাশের মাঠে বাঁশঝাড়টার দিকে হঠাৎ চোখ পড়ল তার। অন্ধকারের বুক চিরে বাঁশঝাড়ের নিচে জোনাকি পোকাগুলো জ্বলছে আর নিভছে। মনে হচ্ছে, মাটির বুকে ছড়িয়ে আছে একমুঠো ছোট ছোট তারা।
দৃশ্যটা দেখেই গত রাতের কথা মনে পড়ল মিলনের। পুকুরের মাঝখানে জোনাকি দেখে তার বিবি কী আগ্রহ নিয়েই না তাকিয়ে ছিল! অথচ তখন রাতের অন্ধকারে নানা দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকায় রেবেকার জন্য জোনাকি ধরে দেওয়ার কথা মনেই আসেনি তার।
আজ আর সেই ভুল করতে চাইল না মিলন।
রাজহাঁস দুটোর পা একসঙ্গে বাঁধা ছিল। তাই রাস্তার কিনারে সেগুলো আর সদাইয়ের ব্যাগটা রেখে নেমে পড়ল বাঁশঝাড়ের নিচে। অনেক যত্ন করে ধরে ফেলল আট-নয়টা জোনাকি। তারপর লুঙ্গির কাছা থেকে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া একটা বিড়ির প্যাকেট বের করে, তার ভেতরে থাকা দুটো বিড়ি অন্য একটা নতুন প্যাকেটে সরিয়ে রাখল। খালি প্যাকেটটায় সাবধানে জোনাকিগুলো ঢুকিয়ে নিল।
এবার তার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। বাড়ি ফিরে নিজের বিবির হাতে তুলে দেবে রাতের আকাশের একটুকরো আলো-মুঠোভরা জোনাকি! সেগুলো দেখে তার বিবি যে ভীষণ খুশি হবে, এ নিয়ে মিলনের মনে কোনো সন্দেহ নেই।
খুশি মনে দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল সে। সারাদিনের ক্লান্তি যেন নিমেষেই উধাও হয়ে গেছে। বিবির জন্য কত কিছুই না এনেছে! তার ওপর আছে এক প্যাকেট জোনাকি। বাড়ি ফিরে রেবেকার মুখটা দেখবে, তার খুশিতে ঝলমল করা চোখ দুটো দেখবে-ভাবতেই মনটা আনন্দে ভরে উঠছিল মিলনের।
কিন্তু ঘরে ঢুকেই সেই আনন্দে খানিকটা ভাটা পড়ল মিলনের।
কই, তার বিবি কই? ঘরে তো রেবেকা নেই!
অন্য দিন এই সময়টায় সে অধীর আগ্রহে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকে। মিলন বাড়ি ফিরলেই আদুরে সুরে কত প্রশ্ন, কত যত্নের আয়োজন! :-‘বাজারের দিনডা কিরুম কাটল? খিদা ধরছে কি না? নাওন দিবাই, নাহি হাত-মুখ ধুইবাইন? আচ্ছা, আমি ভাত দিতাছি, চালাইয়া আইয়ুন।’
এমন কত কথা যে বলে রেবেকা! অথচ আজ ঘরটা একেবারে নিঝুম। কোথাও তার বিবির সাড়াশব্দ নেই।
মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল মিলনের। তবু মুখে কিছু প্রকাশ করল না। রাজহাঁস দুটো বারান্দায় রেখে সদাইয়ের ব্যাগ ঘরের নির্দিষ্ট জায়গায় তুলে রাখল। তারপর গামছা হাতে গোসল করতে বেরিয়ে পড়ল।
পুকুরঘাটে যাওয়ার আগে দাদির ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল, তার মা খালেদা খাতুন, দাদি আমেনা বেগম আর রেবেকা মিলে কলির অনাগত সন্তানের জন্য ছোট ছোট কাঁথা সেলাই করছে।
রেবেকা সেখানে এত মনোযোগ দিয়ে বসে আছে যে স্বামী বাড়ি ফিরেছে, সেই খবরটুকুও তার জানা নেই।
মিলন আর ডাকল না। নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে এসে একাই গোসল সেরে ঘরে ফিরল।
ঘরে এসে চুলে নারকেল তেল মেখে চিরুনি চালাচ্ছিল সে। ঠিক তখনই হুট করে ঘরে ঢুকল রেবেকা।
এবার মিলন মুখ তুলে তার দিকে তাকাল, তবে কিছু বলল না। এতক্ষণ ধরে যে মানুষটার জন্য তার মনটা আনচান করছিল, সে যে অবশেষে সামনে এসেছে!
রেবেকা: আয় হায়, আন্নে কহন বারিত আইছুইন? আমি তো টেরই পাই নাই!
মিলন: তুমি জানো না, বিবি, আমি কহন বাড়িত আই? কী করতাছিলা হেইনো?
রেবেকা: কলি আফার গেন্দার (বাচ্চার) লাইগা আম্মা আর বুবু,,, ছুডু ছুডু সুন্দর কেথা বুনতাছে, তাই দেখতাছিলাম।
মিলন:তা ঘরে ঢুহার সময় কিছু চোহে পড়ে নাই?
রেবেকা: হ, পড়ল তো-রাজহাঁস।
মিলন: তে কিছু জিগাইলানা যে এহনো?
রেবেকা: আইজ বিষুদবার, (বৃহস্পতিবার)বাজারে হাট বইছে। হাঁস কিনা আনছুইন খাইবার লাইগা, তা তো বুঝাই যাইতাছে। এইনো জিগানের কী আছে?
মিলন অবাক হয়ে রেবেকার কথা শুনল।
এর আগে যতবারই বাজার থেকে হাঁস কিনে এনেছে সে, প্রতিবারই রেবেকা নানা প্রশ্নে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। হাঁসের দাম কত, হাঁসা নাকি হাঁসি, হাঁসি হলে ডিম পাড়ে কি না, হাঁসগুলো ডিম দেওয়ার জন্য রেখে দেবে নাকি জ বা ই করে খাবে-এসব নিয়ে হাসতে হাসতে কত কথাই না জিজ্ঞেস করত সে!
অথচ আজ কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো বাড়তি আগ্রহ নেই। রাজহাঁস দুটো দেখে সামান্য প্রতিক্রিয়া দেখালো না, সামান্য দুই লাইন কথায় বিষয়টা শেষ করে দিল রেবেকা।
রেবেকার এই পরিবর্তনে মিলন একেবারেই ভুলে গেল বিড়ির প্যাকেটে রাখা জোনাকিগুলোর কথা। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে মনে মনে ভাবতে লাগল, কী হচ্ছে তার জীবনে? কেন তার বিবির প্রতিটি আচরণ আজ তার কাছে এত অচেনা লাগছে?
ঠিক তখনই খালেদা খাতুন রাতের খাবার খেতে ডাকলো। রেবেকা মিলনকে খেতে আসুন বলে ,আগেই ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
কিন্তু মিলনের মনের অস্থিরতা যেন কিছুতেই কমল না।
___________________________
খাওয়া শেষ করে সবকিছু গুছিয়ে রেখে রেবেকা ঘরে এল। প্রতিদিনের মতো ব্যস্ত হাতে বিছানা ঝেড়ে গুছিয়ে নিয়ে আগের রাতের মতোই নিজের নির্ধারিত জায়গায় বালিশ টেনে শুয়ে পড়ল। তারপর চোখ বন্ধ করে নিল।
মিলন তখনো ঘরে ফেরেনি। রাতের শেষ বিড়িটা টানতে টানতে সুপারি বাগানের অন্ধকারে গিয়ে বসেছে শরীর হালকা (প্রসাব) করতে। সেখানে যাওয়ার আগে দেখে এসেছে, রেবেকা খাবার ঘরের প্লেট-বাটিগুলো গুছিয়ে রাখছে।
তাই মিলন ধীরে ধীরে বিড়ি টানল। প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘরে ফিরে দেখল, রেবেকা বিছানায় শুয়ে পড়েছে।
মিলনের মনে হলো, সে বুঝি এবার সত্যিই পাগল হয়ে যাবে! দ্রুত হাতে দরজা বন্ধ করে রেবেকার কাছে এগিয়ে গেল। চোখ বন্ধ, ছোট ছোট শ্বাস পড়ছে। ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি?
রেবেকার এমন নিশ্চিন্ত ঘুম কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না তার। অস্থিরতা যেন ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে রেবেকার কাঁধে আলতো ধাক্কা দিয়ে গম্ভীর গলায় ডাকতে শুরু করল-
মিলন:এই, এই বিবি! হুনতাছো? এই রেবেকা, ঘুমাইয়া গেছো কিবা? তোমার না আমার বুহে ছাড়া ঘুম ধরে না? এই, হুনতাছো তুমি? উডো, এইদিক ঘুরো দেহি। আমার বুহে আইয়ো, বুহে আইয়া ঘুমাও।
ধাক্কাধাক্কিতে রেবেকা একটু নড়েচড়ে উঠল, কিন্তু ঘুম ভাঙল না।তবে তখনো গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়নি সে। আধোঘুমের মধ্যে চোখ বন্ধ রেখেই বিরক্ত স্বরে বলল-
রেবেকা: ইস্! এইবা ঢেলতাছুইন কেন? বিছানা থেইকা পড়রা যাইবাম তো!
মিলন: তাইলে তুমি হেইবা হুতছো কেন? আমার বুহে আইয়া হুতো।
ঘুমের মধ্যে রেবেকা আরও বিরক্ত হয়ে বলল-
রেবেকা: কুনো বুক, কুনো? আমি তো কিছু দেখতাছি না! বুক কুনো?
মিলন রেবেকার বাহু ধরে নিজের দিকে টানতে টানতে বলল-
মিলন: চোখ বন্ধ কইরা দেখবা কিবা? আমার বুক খুঁজছো তুমি, যে পাইবা? কাইল রাইতেও তো খোঁজো নাই! এক চর খাইয়া আমার বুহে ঘুমানের অভ্যাস ছুইডা গেল তোমার, বিবি। এইডা কী বড় সর্বনাশ কইরা দিলাম নিজের হাতে!
কথাটা বলতে বলতেই মিলন "বিসমিল্লাহ" বলে রেবেকাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। দীর্ঘ সময় পর পরিচিত আশ্রয়টুকু ফিরে পেয়ে ঘুমের ঘোরেই রেবেকা নাক-মুখ ঘষে মিলনের বুকে মুখ লুকাল।
তারপর অস্ফুট স্বরে বলে উঠল-
রেবেকা: আন্নের বুকে থেইকা আমারে ধাক্কা দিয়া সরাইছুইন কাইল, ভুইল্লা গেছুইন? আমি আর যাইতাম না আন্নের বুহে।
কথাটা শুনে মিলন আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল। রেবেকার মাথাটা নিজের বুকের কাছে রেখে আকুল স্বরে বলল-
মিলন: হায় হায়, বিবি! এইতা সবনাইশা কথা কইয়ো না সোনা। তুমি আমার বুহে না আইলে, আমি বুহের বেদনায় মরমু তো!
রেবেকা: আন্নে আমার গালে চড় দিছুইন। আমার গালে আর জীবনে চুমা খাইবার দিতাম না আন্নেরে!
কথাটা শুনেই মিলন তার গালে চুমু খেয়ে ফেলল।
মিলন: উম্মাহ, উম্মাহ, উম্মাহ! বিবি, আমার সোনা বিবি! এইতা কিতা কতা কও তুমি সোনা? এরুম কতা আর কইয়ো না, বিবি।
রেবেকা বিরক্ত হয়ে তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। মিলন বুঝতে পারল, তার বিবির মন থেকে সকালের ঘটনাটা মুছে যায়নি। বরং সেই আঘাতের রেশ এখনো রয়ে গেছে।
রেবেকা: উফ্, ছাড়ুন দেহি! আন্নে কইছুইন, আমি আন্নের লগে ঢং করি! আমার এইডা ঢং সহ্য হয় না আন্নের। আমি আর কিছু করতাম না আন্নের লগে। জামাই-বউয়ের ভিতরের হেইডাও করতাম না কুনো দিন!
মিলন এবার থেমে গেল। হারিকেনের মিটমিটে আলোয় রেবেকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। অন্ধকারে চোখ সয়ে এলে যেমন অস্পষ্ট জিনিসগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেমনি তার মনেও একের পর এক উপলব্ধি পরিষ্কার হয়ে উঠছিল।
রেবেকার অভিমানকে সে এতক্ষণ ছোট করে দেখেছে। ভেবেছে, একটু আদর করলেই সব আগের মতো হয়ে যাবে। অথচ রেবেকার কথায় স্পষ্ট, তার মনের কষ্ট এখনো কাটেনি।
মিলন: জামাই-বিবির হেইতা কী, বিবি? কী করতানা কুনো দিন?
রেবেকা ছোট ছোট শ্বাস নিতে লাগল। কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।
মিলন আবার ডাকল-
মিলন: এই বিবি, হুনো দেহি। কী করতানা আমার লগে, খুইলা কও?
রেবেকা কপাল কুঁচকে বিরক্ত মুখে বলল-
রেবেকা:: করতাম না হেইতা,হেইতা স হ বা স
না কি? যেইতা আন্নে করবার চাইন,হেইতা ঢং করতাম না কুনো দিন আন্নের লগে।
মিলন শান্ত হয়ে শুনলো, গম্ভীর মুখে বলল-
মিলন:: তুমি না করার কেডা?আর তাছাড়া তুমি করবাইবা কি,যা করার তো আমিই করবাম।
রেবেকা:: আমি কিছু করবাম দিতাম না।
মিলন:: দিয়া না?
রেবেকা:: না
মিলন:: আবার কও
রেবেকা: দিতাম না,,,,,,, আহ্ দুক্কু লাগে।
মিলন:: আইজ তো দুক্কু দিবামই, অনেক দুক্কু সব সহ্য করবা তুমি।
ব্লাউজের বোতাম খুলতে খুলতে কথাটা বলল মিলন। হঠাৎ বক্ষভাঁজের কাছে অপ্রত্যাশিত স্পর্শে রেবেকার আধোঘুম ছুটে গেল। অন্ধকারে কিছু দেখতে না পেলেও নাক আর থুতনিতে স্বামীর চুলের স্পর্শ পেতেই জোরে হাঁচি দিল সে। তাতে দুজন আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ায় রেবেকা চমকে উঠল। ভয়ে দ্রুত হাত বাড়িয়ে অপ্রত্যাশিত স্পর্শটা ছুঁয়ে দেখতে চাইল কী আছে সেখানে, কিন্তু হাত পড়ল মিলনের মাথাভর্তি চুলে। চুলের মুঠি ধরে অবুঝ রেবেকা সরল স্বরে প্রশ্ন করল-
রেবেকা:: আন্নে! আন্নে আমার এইনো কি করুইন?আমারে উদাম করবাইন না,খালি খালি লাগে ,শীত করে।
মিলন মাথা তুলে বললো-
মিলন:: স হ বা স করবাম বিবি। শীত করতো না,একটু পরে শইল ঘামবো।
রেবেকা:: কি? আমি কিছু করতাম না।
মিলন:: হুম; তুমার কিছু করার নাই, তুমি হুইতা থাহ,যা যা করার আমিই করুম।
বলতে বলতে রেবেকার অধর আঁকড়ে ধরে নিজের অধর দ্বারা। রেবেকা ছটফট করে উঠলো মিলন চেপে ধরলো বিছানায় তার দু বাহু।
রেবেকা:: আহ্ আহ্ ছাড়ুইন আমারে আমি কাইন্দা দিয়াম কিন্তু
মিলন:: এমনিতেই শেষে থুক্কু পাইয়া কান্দন লাগবো, তাই ভালা হইবো তুমি শুরুর তেই কান্দন ধরো।
কথাটা বলেই মিলন রেবেকা কে কাদানোর কাজে লেগে গেলো, আজ আর কোন প্রকার বাধা মানলো না মিলন, এক চড় খেয়ে বিবির ভেতর যা পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তা সহ্য হচ্ছে না কিছুতেই মিলনের এখন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কটা গভীর না করতে পারলে ,তার হৃদয়ের এই অসহ্য যন্ত্রণা কমবে না।
রাত তখন গভীর। চারপাশের গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে, দূরের ঝোপঝাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক সেই নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলেছে। বাঁশঝাড়ের ফাঁক গলে আসা বাতাসে বাঁশের পাতাগুলো মৃদু শব্দে দুলছে। জানালার বাইরে ধানখেতের ওপর চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে রুপালি চাঁদের মতো। মাঝেমধ্যে পুকুরের পানিতে মাছের ঝুপ করে ওঠার শব্দ শোনা যাচ্ছে, আবার সবকিছু ডুবে যাচ্ছে রাতের নীরবতায়।
সেই নিঝুম রাতের আড়ালে ছোট্ট ঘরটিতে দুজন মানুষ একে অপরের অনেক কাছাকাছি, একে অপরকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে। এত দিনের চেনা সম্পর্ক, হাসি-ঠাট্টা, অভিমান আর ভালোবাসার মধ্যে আজ যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। রেবেকার কাছে মুহূর্তগুলো সম্পূর্ণ নতুন, অচেনা। মনের ভেতর লজ্জা, সংকোচ আর অজানা আশঙ্কা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। গলা কাঁটা মুরগির মত ছটফট করতে করতে রেবেকা,কখনো স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে কান্না করছে,কখনো অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যাচ্ছে। প্রথম অভিজ্ঞতার শারীরিক অস্বস্তি আর মনের দ্বিধা তাকে নীরব করে দিয়েছে।
মিলনেরও এ এক নতুন অনুভূতির রাত। তবে ভালোবাসার এই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে রেবেকার সংকোচ আর অস্বস্তি বুঝে নেওয়াটাই তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
সবকিছু শেষে রেবেকা মিলনের বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে অন্ধকারের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। নতুন অভিজ্ঞতার অস্বস্তি, শরীরের ব্যথা আর মনের অজানা ভারে ছোট্ট মেয়েটার কান্না যেন কিছুতেই থামতে চাইছে না। রেবেকার কান্না শুনে মিলনের বুকের ভেতরটাও কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। কী করে তার বিবির কান্না থামাবে, এত রাতে কী দিয়ে মন ভোলাবে, কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছে না সে।
হঠাৎই মনে পড়ল, রেবেকার জন্যই তো যত্ন করে ধরে এনেছে এক প্যাকেট জোনাকি!
মনে পড়তেই দ্রুত হাত বাড়িয়ে বালিশের পাশ থেকে প্যাকেটটা তুলে নিল মিলন। দীর্ঘ সময় প্যাকেটে বন্দি থাকার কারণে জোনাকিগুলো অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। তবু অন্ধকারে দু-একটার ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠছে।
মিলন সাবধানে প্যাকেট খুলে কয়েকটা জোনাকি বের করল। তারপর রেবেকার অগোচরে তার এলোমেলো চুলের ভাঁজে আর হাতের বাহুর কাছে পোকাগুলো বসিয়ে দিল। সবশেষে মৃদু অথচ দৃঢ় কণ্ঠে ডাকলো-
মিলন:: বিবি চোখ মেলো, দেহ তোমার চুলে আর শইলে কি।
রেবেকা তাকানোর আগেই হাতের বাহুতে কিছু একটা নড়াচড়া অনুভব করল। ক্ষীণ সুরসুরিতে তার কান্না থেমে গেল। ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকাতেই মিলন ইশারা করে তাকে জোনাকিগুলো দেখাল।
রেবেকা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। তার এলোমেলো লম্বা চুলের ভাঁজে কয়েকটা জোনাকি আলো জ্বালাচ্ছে। হাতের বাহুর ওপরও একটা পোকা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে।
এতগুলো জোনাকি এখানে এল কীভাবে? এত রাতে ঘরের ভেতরেই বা কী করে এল তারা? বিস্ময়ে রেবেকার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। শরীরের অস্বস্তি আর মনের কষ্টের মাঝেও সে কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না।
নাক টেনে কান্নাভেজা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-
রেবেকা:: এ এ এতোডি জোনাহি পুক,কিবা আইলো ঘরে।
মিলন তার প্রশ্নের উত্তরে মিষ্টি করে হাসে, হাত বাড়িয়ে তার গলার নিচে নেমে যাওয়া জোনাকি পোকাট দুই আঙ্গুলের মাধ্যমে চেপে ধরে তার গালের উপর বসিয়ে দিয়ে আবেগি ভরাট গলায় বলে-
মিলন:: আমার বিবি আমার লাইগা আইজ শারীরিক দিক দিয়া পরিপক্ক হইছোযে, তাই জোনাহি পুক খুশি হইয়া, আমার বিবিরে ধন্যবাদ যানাইবা আইছে।বুঝছো সোনা বিবি।
মিলনের কথা শুনে রেবেকা আবারো ঠোঁট উল্টে কাঁদে, মিলন রেবেকার ঠোঁটে চুমু খেয়ে জড়িয়ে ধরে। রেবেকা নাক টেনে বললো-
রেবেকা:: দুক্কু লাগতাছে খুব
মিলন:: ঠিক হইয়া যাইবো সোনা।
কথাটা বলেই সে চুপ হয়ে গেল।জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো মেঝেতে এসে পড়েছে। ঘরের ভেতর জোনাকিগুলোর ক্ষীণ আলো মিটমিট করছে। রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে পাশাপাশি শুয়ে আছে মিলন আর রেবেকা। একজনের চোখে অনুশোচনা, অন্যজনের চোখে জমে থাকা কষ্ট।
রাতের নীরবতা সবকিছুর সাক্ষী হয়ে রইল-কিছু না-বলা কথা, কিছু অভিমান, আর সম্পর্কের ভেতর জমে থাকা দূরত্ব কমিয়ে আনার এক অসমাপ্ত চেষ্টা।