মাহফুজ মীর এর বাঁধন খুলল সময় নিয়ে।কাবির যাকে বাঁধে সে-ই বাঁধন সে ব্যতীত অন্য কেউ খুলতে পারে না।তবু বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে খুলতে সক্ষম হয়েছে মাহফুজ।মীর অনেক দিন পর দু হাত স্বচোক্ষে দেখছে। দড়ির দাগ পড়ে গেছে।আহত হাতটি। রক্তের ঝোপ ঝোপ দাগ।মীর হাত দুটো দেখে। মাহফুজ বলল ‘অহন খাবার খান।আর কন আপনার প্রেম কাহিনী।’
একটা বেঞ্চ।বেঞ্চ এর একপ্রান্তে মীর দু পা ফাঁক বসে। অপরপ্রান্তে মাহফুজ একি রকম ভাবে বসে। মাঝখানে খাবারের থালা।মীর জল দিয়ে হাতটা ধুয়ে রুটি তুলে মুখে দেয়। ইশারায় মাহফুজ কেও খেতে বলে। মাহফুজও খেতে শুরু করে।মীর বলল “আমি ভাবিনি আমার জীবনে কখনো প্রেম ভালোবাসা আসবে।যখন বড় হলাম জানলাম মা নেই।মা ব্যতীত বেঁচে থাকাটা কতটা যে কষ্টের তা নিশ্চয়ই জানিস। ধীরে ধীরে যখন বড় হতে শুরু করলাম, তখন ভাবলাম আগামী যে ক’টা দিন বেঁচে থাকব মায়ের স্মৃতি নিয়েও থাকব। এবং বাবাকে ঘিরে। কিন্তু সে-ই অনূভুতি আর স্থায়ী হল না বেশিদিন। একদিন আমার বাবা আমার খালতো বোন এর বর্ণনা দিলেন আমার কাছে।
ওঁর নাম ছিল মায়া। সেদিন বর্ণণা শুনেই ওর প্রেমে পড়ে যাই। মায়াকে দেখার জন্য মন ছটফট করতে শুরু করে।এক পর্যায়ে আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম,মায়ার কি বিয়ে হয়ে গেছে! বাবা সেদিন জবাবে হাসেন।বলেন সে-ই মায়ার সাথেই ছোট বেলা থেকেই আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।শুনে সেদিন আরো ছটফট করি, উদ্ভ্রান্ত হই।কখন বিদেশের মাটি থেকে দেশে ফিরব! ভাবতে ভাবতে সময় বের করে চলে আসি দেশে।আর সেদিন দেশে ফিরেই আমি উত্তর এর জঙ্গলে যাই শিকার করতে। শিকার করতে বরাবরই ভালো লাগত আমার। সে-ই ধোয়াময় জঙ্গলেই মায়ার আগমন ঘটে।পরীর মত কারো অবয়ব দেখলাম। সামনে এগিয়ে দেখি পরী নয়, মানুষ।মেয়ে একজন।আর সেই মায়া,বাবার বর্ণণার সাথে মিলিয়ে পেলাম। সেদিন ওকে দেখেই ভালোবেসে ফেলি।”
মাহফুজ হেঁসে বলল “প্রথমবার বর্ণণা শুইনা ভালো লাগল। দ্বিতীয়বার ভালোই ভেসে ফেললেন।”
“হুঁ। এভাবে দিন চলছিল।মায়ার সাথে আমার বিয়ে হবে এটা মায়া বিয়ের দিন জেনেছিল। তাঁর আগে ভেবেছে অন্যকারো সাথে ওর বিয়ে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বিয়ে হল আমার সাথে। বিয়ের দিন আমাকে বর সেজে দেখে ও ভীষণ খুশি হয়। কিন্তু বাসর ঘরে আর আমি যেতে পারিনি। সেখানে শয়তান গুলো আমার জমজ ভাইকে পাঠিয়েছে।আর ও বি’ষ খেয়ে মরে যায়। ওঁরা পরিকল্পনা করে মেরেছে।আর আমাকে বন্দি করেছে।আজ কতদিন পর নিজের হাত দিয়ে খাবার খাচ্ছি।সবটা তোর জন্য।তুই ও আমার ভাইয়ের মতন।”
“আপনার লইগা দুঃখ লাগতেছে।এখন আপনার বউ কুমমে?
“আছে হয়ত বাড়িতেই। কেঁদে কেঁদে ম’রছে।”
“না স্যার।মাইয়া মানুষ মরা জামাইয়ের লইগা বেশিদিন কান্দে না।খুবজোর তিনদিন। তারপর সব আবেগ শেষ। নতুন কাউরে পাইলে তাঁর গলায় ঝুইলা পড়ে।”
মাহফুজ এর মুখে কথাটি শুনে মীর এর হাতটি থেমে গেল। আবেগের স্থান টা ক্ষণিকের জন্য যেন কেঁপে উঠল। দৃষ্টি থালাতে ছিল। সেখান থেকে তুলে ধীরে ধীরে মাহফুজ কে দেখে।বলল “কি বলছিস এসব?
“হুঁ স্যার।ঠিকই বলতেছি।মাইয়া মানুষ এমনি। আমার পাশের গ্রামে।দুইভাই ছিল।বড় ভাই বিয়ে করে বিদেশে চলে গেছে। অমনি বউ ছোট ভাইয়ের হাত ধইরা পালাইছে।আর আপনি তো তাগো কাছে মৃত।”
মীর এর চোখে জলের দেখা মিলল।বুকটা ভার হয়ে গেল।নীরব নিথর হয়ে সোজা হয়ে বসে।ভাবে মায়াও কি তাঁকে ভুলে যাচ্ছে!শেহজাদার সাথে তাঁর দেখা হয়েছে,শেহজাদা নিশ্চয়ই মধুর মধুর কথা বলে গলানোর চেষ্টা করছে।মায়া কি এখন সত্যিই তাঁকে ভুলে শেহজাদার জন্য ভাবছে!
এতটুকু ভেবে আবার ভাবে, না! মায়াবতীর ভালোবাসার এতটা সস্তা হতেই পারে না।এতটা হালকা হতে পারে না। যেখানে অল্প বাতাস পেলেই উড়ে যাবে।মীর মনে প্রাণে বিশ্বাস করে মায়া তাঁকেই ভালোবাসে।শেহজাদা যতই চাক, মায়াকে কথার জালে ফাঁসানোর চেষ্টা করুক,সে ফাসবে না।এতটা সহজ নয়।মীর বড় করে শ্বাস টেনে নীরবে ছাড়ল।
মাহফুজ বলল “খাননা ক্যান! শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করতে হলে বাঁচতে হইবো তো।”
মীর মাহফুজ এর কথা কানে নিল। ঠিকই বলেছে ও শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়তে হলে আগে বেঁচে থাকতে হবে। শক্তি দরকার।মীর বাদবাকি খাবারটুকু খেয়ে শেষ করল। মাহফুজ মীর এর পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখল।বলল “আপনি অনেক সুন্দর পুরুষ। আপনার মতই আমগো শেহজাদা ওস্তাদ। কিন্তু আপনার মতন এত ফর্সা না।হইলেও সুন্দর দেখায়।”
মীর বিড়বিড় করে বলল “শালা তো আমারি বংশের,এক তো হবেই।”
থেমে বসা ছেড়ে উঠল। বন্দিশালার উপরের দিকে এক কোণে ক্ষুদ্র একটি জানালা। নিশ্চয়ই অক্সিজেন সরবরাহ এর জন্য।বাকি জায়গা গভীর অন্ধকার। অনেক দিন পর উঠে একটু হাঁটার চেষ্টা করছে। ঘাড়ে আঘাত পেয়েছে।পায়ের একটা আঙ্গুল ব্যথা। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল কালো প্যান্ট পরনে। বিয়ের রাতে সে শেরওয়ানি পরনে ছিল। মাহফুজ কে বলল “মফিজ আমার পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি প্যান্ট কিভাবে আসলো? শেরওয়ানি কোথায়?
“মাহফুজ!বড় স্যার আপনার পোশাক বদলে এসব পরাইছে। নিশ্চয়ই তাঁর হিংসা হইছিলো।হেয় আপনার বউরে ভালোবাসে।তাই!”
“শালা হিংসুটে।তার উপর আমায় অনেক মেরেছে।”
“বড় ভাইয়ের একটু মাইর খাইলে কিছু হয় না।” বলে মাহফুজ থালা হাতে নিল।মীর ভ্রু কুঁচকে তাকায় ওঁর দিকে।ওকে রেখে ফের তাকাল বন্দিশালার দরজাটার দিকে।এটাই সুযোগ এখান থেকে বের হওয়ার। নিশ্চয়ই বাইরে অ’স্ত্র হাতে কেউ আছে।থাকুক।জীবনের ঝুঁকি যে এখন নিতেই হবে তাঁর। মাহফুজ কে আঘাত করতে চাইল না মীর। ওঁর সাহায্যে বাইরে বের হবে। ভেবে মীর ওকে বলল “মাহফুজ, তোদের আস্তানাটা ঘুরিয়ে দেখাবি!”
“আপনে যদি পালাই যান, তবে আমারে মাইরালাইবো।”
“এই তোকে ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি পালাব না।পালালেও তোকে নিয়ে।”
“সত্যি পালাবেন না?
“না।”
“কিন্তু বাইরে তো আরো অনুচর।আর ওস্তাদ যদি চইলা আসে!
“আসবে না। আগেই খারাপটা ভাবছিস কেন!”
“ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আগে খারাপটাই ভাবতে হয়।”
“তোর কথাবার্তা যুক্তিযুক্ত।তারপরেও এদের সাথে কাজ করছিস কেন, নিজের যুক্তিযুক্ত গুলো ভালো কাজে লাগালে হালাল কিছু পেতিস। শান্তি পেতিস।”
মাহফুজ দৃঢ় চোখে তাকাল মীর এর দিকে।মীর ভুল কিছু বলেনি। অভাবের সময় কাজ না পেয়ে আজ পাপের সাথে যুক্ত হয়েছে। মাহফুজ বলল “আপনে পালাবেন?
মাহফুজ এর কণ্ঠ নির্বাক।মীর আশ্চর্য হয়ে বলল ‘মানে?
“পালাতে চাননা! নিজের বউ, পরিবারের কাছে যাইবেন না ?”
মীর অদ্ভুত অনূভুতি সৃষ্টি করে বলল “হুঁ কিন্তু তুই আমাকে সাহায্য…! মীর বাকিটুকু গিলে ফেলল।
“হুঁ।পাপ তো অনেক করছি।আইজ আপনারে মুক্ত কইরা যদি একটু পূণ্য কামাইতে পারি।”
“সরাসরি তুই মুক্ত করলে তোর সমস্যা হবে। ওঁরা তোকে মেরে ফেলবে।”
“ফেলুক। ওঁদের ভয়ে আর ক’দিন বাঁচুম। আসুন আমার সাথে। ওস্তাদ কহন আহে জানি না।সময় নষ্ট করবেন না।আপনে শুধু দুই মিনিট দাঁড়ান।একটা শার্ট লইয়া আইতেছি।” বলে মাহফুজ বন্দিশালা থেকে বের হয়ে যায়।মীর হতভম্ব হল মাহফুজ এর কথায়। খারাপের মাঝেও যে ভালো মানুষ থাকে তা যেন মাহফুজ কে না দেখলে বোঝা যেত না।
মীর বন্দিশালার মধ্যে পায়চারি শুরু করে। মিনিট দুয়েক পার হয়ে গেছে। মাহফুজ আসছে না। কতদিন হয়ে গেছে মায়াকে দেখে না।সে কেমন আছে,কি করছে,মীর কে সত্যিই ভুলে যায়নি তো!শেহজাদা ঠিক তাঁর সাথে কি করছে, সেসব ভেবেই তাঁর মাথাটা ভার হয়ে যায়।
একজোড়া পায়ের আওয়াজ আসে।মীর পথে তাকাল। মাহফুজ নাকি কাবির ভাবছে! অপেক্ষা করছে কে বন্দিশালায় ঠুকে। তাৎক্ষণিক মাহফুজ প্রবেশ করল।মীর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।বলল “ভেবেছি আর তুই আসবি না”
“উদ্দেশ্য নিচি আপনারে বাঁচানোর, অবশ্যই বাঁচামু। শার্ট টা হাতে রাখেন। আপাতত পইরেন না। বাইরে বাইর হওয়ার পর পইরেন।” মীর সম্মতি জানায়। বন্দিশালা থেকে বের হয়। সামনে মাহফুজ। পেছনে মীর।সরু একটা গলির মত। দুই ধারে মশাল জ্বলছে।দূরে একজন অনুচর দেখা যায়। এক ধ্যানে যন্ত্রের মানুষের মতন দাঁড়িয়ে আছে। ওঁর পাশে আর একটা দরজা।
মীর ও মাহফুজ দু পা এগোতেই অপর দরজার ওপাশ থেকে একাধিক পায়ের আওয়াজ আসে। মাহফুজ ও মীর এর কানে সে-ই শব্দ পৌঁছায়। মীর বলল “ওঁরা আসছে।”
মাহফুজ ওঁর কোমরের ভাঁজ থেকে একটা ছু’রি বের করে মীর এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল “ওঁরা যারাই হউক,আপনে পারবেন ওঁদের লগে লড়ে যাইতে।আমি আগে যাই, আপনি পেছনে থাকুন।” বলে মাহফুজ আগে আগে হাঁটতেই দ্বিতীয় দরজা খুলে ক’জন অনুচর আর কাবির প্রবেশ করলেন। মাহফুজ ক্রুব্ধ মনে পথ রোধ করে দাঁড়াল কাবির এর।কাবির সিগার ফুকছেন গালের একপাশে নিয়ে।দু আঙ্গুলের সাহায্য সিগারটা বের করে বলেন “কিরে,পথ আটকে দাঁড়ালি কেন?
মাহফুজ রাগি রাগি শব্দে প্রকম্পিত গলায় বলল “আমাকে যা খুশি বলুন, উনাকে কিছু বলবেন না।”
কাবির অবাক হয়ে বললেন “কাকে কি বলব না?
“উনারে?
কাবির মাহফুজ এর পেছনে তাকিয়ে বললেন “কাকে?
মাহফুজ এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল “আমার পেছনে যিনি আছেন।”
কাবির ধাপ করে উঠে মাহফুজ কে একটা থাপ্পর দিয়ে বললেন “হারামজাদা তোর পেছনে তো কেউই নেই।” মাহফুজ গাল ধরে পেছনে তাকিয়ে দেখল মীর নেই। কোথায় যাবে সে! বাইরে বের হওয়ার পথ এদিকে! তবে সে কোথায়! কাবির আর ওঁদের নিয়ে পারছেনা অভিব্যক্তির হাঁফ ছেড়ে বন্দিশালার ভেতরে আসল। মাহফুজ ও আসে।মীর চেয়ারে পূর্বের মতই বাঁধা। কাবির আসেন।বসেন মীর এর সামনে। হাবভাব এমন যেন বিশ্ব জয় করে এসেছে।মীর কিছু বলল না। কাবির বললেন “আগামীকাল শেহজাদা যাবে তোদের বাড়িতে।মায়ার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।মেয়েটাও শেহজাদাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে হয়ত।করারই কথা। আমি ওকে বলেছি কি,তোর আসল পরিচয় আমজাদ চৌধুরী কে দিয়ে দিস। কতদিন একা একা থাকবি। উনারা র’ক্তের কেউ না হলেও আত্মীয় তো।আপন-এর মতই। পরিচয় পেয়ে নিশ্চয়ই আমজাদ চৌধুরী খুশি হবেন।রেখেও দিবেন তাঁর কাছে।মেয়েও বিয়ে দিবেন।”
মীর রুষ্ট করে তাকায় কাবির এর দিকে।তবু চুপচাপ। কিছু বলছে না।বলার মত শব্দ উচ্চারণ করতে পারছে না।
কাবির আবার বললেন “তোর বউ আরেক জনের বউ হবে। ভাবলে কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়ই। হওয়ার কথাই।”
“মায়া কেমন আছে!” মীর এর কণ্ঠটা ভেজা।
কাবির হেসে বললেন “আছে ভালোই।শুনেছি কথা বলতে পারে না। নতুন পুরুষের আগমন যেহেতু ঘটেছে এখন কথা ফুটবে।”
“অন্যকেউ কোনদিন ওর মুখে কথা ফোটাতে পারবে না।আমিই পারব। আমাকে যেদিন দেখবে সেদিন ঠিকই কথা বলবে।”
“তোর খুব আত্মবিশ্বাস।এমনটা হলেই ভালো। আমি দেখব কে জিতে,আর কে হারে।তাঁর থেকেও বড় কথা এখানে থেকে বের হতে পারবি না।”
“শেহজাদা কোথাও!
“ও আলিমনগর।”
“আমরা কোথায় আছি? মীর কিছুটা বিচলিত হলো।
কাবির শ্বাস টেনে বললেন “শ্যামপুরে।আলিমনগর থেকে অনেক টা দূরে।তাই শেহজাদা এখানে এখন আসে না। ওঁর লক্ষ্য এখন মায়া।তাই ওখানে আছে।এক বন্ধুর বাড়িতে।”
মীর দম ছাড়ল।সে আলিমনগর থেকে অনেক দূরে আছে।যেতে হলেও অনেক সময় লাগবে।তবু যে যেতেই হবে।আজ রাতে বের হতে পারলে আজই চলে যাবে। আগামীকাল শেহজাদা ওঁর সত্য পরিচয় দিলে ওর ও বাড়িতে ওঠা নিশ্চিত। তাঁর আগে ওর আসল রুপ খোলসা করতে চায় মীর।
মীর কে কিছু ভাবতে দেখে কাবির বললেন “কি ভাবিস?
“কিছু না।”
“তুই ভাবতে থাক। আমি আসছি।” বলে কাবির চলে যায়।সাথে অনুচরগন। মাহফুজ উনাদের যাওয়ার পানে দেখে। কাবির দ্বিতীয় দরজা অতিক্রম করার পর মাহফুজ মীর এর সামনে এসে বলল “আপনে তখন গেলেন না ক্যান!
মীর ঘাড়টা হালকা কাত করে বলল “তোর জন্য।”
“আমার লইগা মানে?
“একাধিক পায়ের আওয়াজ পাচ্ছিলাম আমি। ওঁদের সাথে ঠিকই পেরে উঠতাম আমি। কিন্তু আমাকে মুক্ত করার জন্য তোকে শেষ করে দিতে দু সেকেন্ড ভাবত না ওরা। আমি যদি তোকে কোনভাবে বাঁচাতে ব্যর্থ হই সে-ই ভেবে এখানে এসে বসে পড়ি।”
মাহফুজ ঠোঁট দুটো হা হয়ে তাকিয়ে রইল অবাকের দৃষ্টিতে।সে ভুল নয় বরং সঠিক এবং সৎ একজনকে বাঁচানোর জন্য মনস্থির করেছে ভেবে গর্ব হচ্ছে।বলল “কিন্তু আপনে বাঁধলেন কেমনে হাত,আর ছুরি কই?
মীর হাত দুটো সামনে আনল।ছু’রিটি হাতেই।বলল “হাত দুটো পেছনে ছিল আর ছু’রিও। কাবির কে বোকা বানালাম।”
মাহফুজ মৃদু হাসে।মীরও একি সাথে চোখে চোখ রেখে ওর সাথে হাসল।বলল “আজ রাতে আমি এখান থেকে বের হলে কখন পৌঁছাতে পারব বলতে পারিস?
“আগামীকাল রাইতে আলিমনগর পৌঁছাইতে পারবেন।”
“তুই ও আমার সাথে পালাবি।তুই তোর স্থানে চলে যাবি।”
“না স্যার। আমি একটা মিথ্যা বইলা তাঁদের মানাই নিমু।নয় আমার বউ বাচ্চা খাইবো কি!”
মীর তাঁর হাতের ছু্রি রেখে দেয়।বা হাতে থাকা ব্রেসলেট টা খুলে মাহফুজ এর দিকে এগিয়ে বলল “এটা রেখে দে।বেশ দামি।এটা বিক্রি করে তোর অনেক দিন কেটে যাবে। তারপরও দরকার পড়লে জমিদার বাড়িতে চলে আসবি।তবু হারাম কাজে থাকিস না।” থেমে আবার বলল “আচ্ছা আমি সে-ই কখন থেকে হারাম কাজ বলে যাচ্ছি, কাবির হোসেন আসলে কি কাজ করে!”
“অবৈধ ব্যবসা করে। স্বর্ণের।”
“সুযোগ করে উনাকেও বলব এসব ছেড়ে দিতে।”
“শুনত না।”
সময় গড়াচ্ছে।মীর অপেক্ষা করছে কখন বের হবে। ঘড়ির কাঁটা এখন ঠিক রাত একটা।এমন সময় কাবির একবার এসে মীর কে দেখে যান।আজ এখনো আসেনি। মাহফুজ বলেছে,উনি রাতে আসার পর আপনি বেরিয়ে যাবেন।মীর অপেক্ষা করছে। মিনিট দশেক পায়চারি করার পর কাবির এর দেখা মিলে।মীর হয়রানির মত বসে পড়ে চেয়ারে।কাবির এসে বললেন “দেখতে এলাম কি করছিস!তোর ভাইয়ের সাথে মায়ার বিয়েটা হওয়া পর্যন্ত তোকে একটু পাহারা তো দিতেই হবে।”
মীর মায়ার প্রসঙ্গের কথা শুনতে পারছে না। যতবার কাবির এই শব্দ উচ্চারণ করছে ততবার মেজাজ বিগড়ে যায়।সে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল “শেহজাদা তো চোর।চোরের আবার প্রেম!কোন এক চুন্নির সাথে ওঁর বিয়ে হওয়া দরকার।”
“ওকে চোর কেন বললি?
“কারণ ও আমাদের পিতৃপুরুষ -সুফিয়ান হায়দার এর বাঁশি চুরি করেছে।হয়ত ওঁর অধিকার ছিল ওটা ছুঁয়ে দেখার। নিয়ে আসার।তাই বলে লুকিয়ে আনবে!”
কাবির চোখ দুটো ছোট করে বললেন “তোর কোথাও ভুল হচ্ছে,শেহজাদা সুফিয়ান হায়দার এর বাঁশি চুরি করেনি। আমিও এটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু যখন ওকে জিজ্ঞাসা করি ,ও বলে, যাকে ঘৃণা করি তাঁর কিছু ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে আমার নেই।”
মীর বিস্মিত হল। আশ্চর্যে হতবিহ্বল কণ্ঠে বলল “মানে!!”
“হুঁ।শেহজাদা ঐ বাঁশি নেয়নি। সুফিয়ান এর সোনার বাঁশির খোঁজ আজও কেউ পায়নি।যার কাছে আছে সে-ই বাঁশি নিশ্চয়ই সে গভীর জলের মাছ।ধরা মুশকিল।