ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোর নামের লেখা আমারই হৃদয়

পর্ব 1

লেখক: এলিনা ইসলাম নূর

তোর নামে লেখা আমার হৃদয়

একটি রহস্য, ক্ষমতা, ভালোবাসা ও বিশ্বাসঘাতকতার উপন্যাস

লেখিকা: এলিনা ইসলাম নুর

---

পর্ব ১

ক্ষমতার মুকুট

রাত বারোটা এক মিনিট।

নওরোজ প্রজাতন্ত্রের রাজধানী নূরাবাদ।

শহরের আকাশে তখন ঘন কালো মেঘ। চারপাশের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে এলেও শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত বিশাল কালো প্রাসাদটিতে তখনও আলো জ্বলছে।

প্রাসাদটির নাম—মির্জা ম্যানশন।

কালো রঙের বিশাল দুইতলা বাড়ি। বাড়িটির বাইরের প্রতিটি দেয়াল কালো পাথরের নকশায় তৈরি। বিশাল কাচের জানালা, আধুনিক স্থাপত্য, প্রশস্ত সিঁড়ি আর চারপাশে সাজানো বাগান বাড়িটিকে অন্যরকম রাজকীয় রূপ দিয়েছে।

বাড়ির সামনে কালো পাথরের প্রশস্ত উঠান। এক পাশে বিলাসবহুল গাড়ির সারি, অন্য পাশে সুন্দরভাবে সাজানো বসার জায়গা। বাড়ির প্রতিটি কোণে নিরাপত্তারক্ষীদের সতর্ক উপস্থিতি।

এই বাড়িতে প্রবেশ করার আগে মানুষ দুবার ভাবে।

কারণ এটি শুধু একটি বাড়ি নয়।

এটি মির্জা পরিবারের ক্ষমতা ও ঐতিহ্যের প্রতীক।

আর এই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে আলোচিত উত্তরাধিকারী—

রাইয়ান মির্জা।

বয়স আটাশ।

নওরোজ প্রজাতন্ত্রের একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য। দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মির্জা গ্রুপের পরিচালক। রাজনীতি ও ব্যবসা—দুই জগতেই তার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী।

কিন্তু এসব পরিচয়ের বাইরেও তার আরেকটি রহস্যময় জগৎ রয়েছে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানে।

রাইয়ান মির্জা এমন একজন মানুষ, যার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকে নিজের কথাও গুছিয়ে বলতে পারে না।

ঘন কালো চুল, গম্ভীর কালো চোখ, ধারালো মুখাবয়ব এবং ব্যক্তিত্বে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। বেশিরভাগ সময় কালো পোশাকেই দেখা যায় তাকে। তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষটির নীরবতার আড়ালেও অসংখ্য প্রশ্ন লুকিয়ে আছে।

তার রাগ যেমন ভয়ংকর, তেমনি তার সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত।

কেউ তার বিশ্বাস অর্জন করতে পারলে সে তাকে সহজে ছেড়ে যায় না। আবার কেউ বিশ্বাস ভাঙলে তাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেওয়ার মানুষও সে নয়।

---

মির্জা ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার বিশাল অফিসকক্ষ।

কালো চামড়ার চেয়ারে বসে একটি ফাইল দেখছিল রাইয়ান। টেবিলের ওপর সাজানো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। পাশে রাখা ফোনটি বারবার আলো জ্বালাচ্ছিল।

দরজায় তিনবার শব্দ হলো।

— ভেতরে আসো।

দরজা খুলে প্রবেশ করল সামির।

সামির রাইয়ানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী। রাইয়ানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সে সামলায়। তবে তাদের সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি রয়েছে পেশাগত বিশ্বাস ও আনুগত্য।

সামির টেবিলের ওপর একটি ফাইল রাখল।

— স্যার, মেহেদী রহমানের কোম্পানির কিছু হিসাব নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

রাইয়ান ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল,

— কী ধরনের সমস্যা?

— গত তিন মাসের কয়েকটি আর্থিক লেনদেনের হিসাব মিলছে না। অথচ এই বিষয়গুলো জাফিল স্যারকে জানানো হয়নি।

রাইয়ান এবার ধীরে ধীরে চোখ তুলল।

— আব্বু জানেন?

— না, স্যার।

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।

রাইয়ান ফাইলটি হাতে নিয়ে প্রতিটি কাগজ মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল।

মেহেদী রহমান।

একসময় তার বাবা জাফিল মির্জার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও দুজনের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মেহেদীর কিছু আচরণ রাইয়ানের মনে সন্দেহ তৈরি করেছে।

— সব কাগজের কপি তৈরি করো। আর কোম্পানির প্রতিটি লেনদেন যাচাই করো।

— জি, স্যার।

— আব্বুকে এখনই কিছু বলবে না। আগে আমি নিশ্চিত হতে চাই।

সামির মাথা নাড়ল।

ঠিক তখনই রাইয়ানের ফোন বেজে উঠল।

পর্দায় ভেসে উঠল একটি পরিচিত নাম।

আব্বু।

ফোনটি হাতে নিয়ে রাইয়ানের গম্ভীর মুখে সামান্য কোমলতা দেখা দিল।

— জি, আব্বু।

ওপাশ থেকে জাফিল মির্জার কণ্ঠ শোনা গেল।

— এত রাত পর্যন্ত অফিসে বসে আছিস কেন?

— কিছু কাজ বাকি আছে।

— কাজ কি কখনো শেষ হবে? নিচে আয়। তোর মা অপেক্ষা করছে। আর আরিশ তোকে ছাড়া খেতে বসবে না।

রাইয়ান হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— আসছি, আব্বু।

ফোন রেখে সামিরের দিকে তাকাল।

— ফাইলগুলো এখানে রেখে যাও।

— জি, স্যার।

সামির চলে গেলে রাইয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

পৃথিবীর কাছে সে যতই কঠোর হোক, নিজের পরিবারের কাছে সে সম্পূর্ণ আলাদা একজন মানুষ।

বিশেষ করে তার বাবা জাফিল মির্জার প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল সীমাহীন।

---

মির্জা ম্যানশনের ডাইনিং রুম।

বিশাল ডাইনিং টেবিলের এক পাশে বসে আছেন জাফিল মির্জা। নওরোজ প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী এবং মির্জা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা।

রাজনীতিতে তার প্রভাব যেমন বিস্তৃত, ব্যবসায়িক জগতেও তার অবস্থান তেমনি শক্তিশালী। দেশের বহু বড় প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত।

তার পাশে বসে আছেন স্ত্রী আফিন বেগম।

আরিশ মির্জা খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে বসে আছে।

রাইয়ানকে দেখেই আরিশ বলে উঠল,

— ভাইয়া, তোমার জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে?

রাইয়ান চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,

— তোর এত কথা বলার সময় আছে, খাবার খাওয়ার সময় নেই?

আরিশ মুখ বাঁকাল।

আফিন বেগম হেসে বললেন,

— তোরা দুজন কি কখনো শান্তিতে থাকতে পারিস না?

জাফিল মির্জা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

— কাল সকালে আমার সঙ্গে মেহেদীর একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। তুইও থাকবি।

রাইয়ান খাবারের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,

— ঠিক আছে, আব্বু।

জাফিল আবার বললেন,

— মির্জা গ্রুপের নতুন প্রকল্পটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। মেহেদীও কিছু প্রস্তাব দিয়েছে।

রাইয়ান আর কোনো কথা বলল না।

তার মাথায় তখন শুধু একটাই নাম ঘুরছিল।

মেহেদী রহমান।

---

অন্যদিকে নূরাবাদের আরেকটি প্রান্তে অবস্থিত সিদ্দিকী বাড়ি।

বাড়িটি মির্জা ম্যানশনের মতো বিশাল না হলেও ছিল সুন্দর ও অভিজাত। একসময় এই বাড়ির মালিক ছিলেন ইমতিয়াজ নূর সিদ্দিকী।

নিজের পরিশ্রমে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সিদ্দিকী গ্রুপ নামের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়িক জগতে তাঁর সম্মান ও পরিচিতি ছিল যথেষ্ট।

তবে মির্জা পরিবারের বিশাল সাম্রাজ্যের তুলনায় সিদ্দিকী গ্রুপ অনেক ছোট।

ইমতিয়াজ নূর সিদ্দিকীর একমাত্র মেয়ে—

ইনায়া নূর সিদ্দিকী।

লম্বা সোনালি-বাদামি চুলগুলো পিঠ বেয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে। চুলে হালকা ঢেউ, এক পাশে ছোট্ট সাদা ফুলের ক্লিপ। মুখে কোমলতা, আর চোখে এক অদ্ভুত মায়া।

কিন্তু সেই চোখের গভীরে লুকিয়ে আছে একরাশ অভিমান।

ইনায়া এখন তার নানির বাড়িতে থাকে। মা-বাবার মৃত্যুর পর থেকে মামা কামরুল হাসান তাকে নিজের পরিবারের একজন হিসেবেই আগলে রেখেছেন।

কিন্তু মামি শায়লা বেগমের মনোভাব বরাবরই আলাদা।

শায়লা বেগমের ছেলে আদনান হাসান, যার বয়স একুশ। আর পরিবারের আরেক সদস্য নাওমিন।

ইনায়া সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেও শায়লা বেগমের কাছ থেকে কখনো মায়ের মতো স্নেহ পায়নি।

আজও নিজের ঘরে বসে পুরোনো একটি ছবি দেখছিল ইনায়া।

ছবিতে তার বাবা-মা দুজনেই হাসছেন।

ইনায়া ছবিটির ওপর হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

— আব্বু, আম্মু... তোমরা কি সত্যিই একটা দুর্ঘটনায় আমাকে একা করে চলে গিয়েছিলে?

তার চোখের কোণে জমে উঠল পানি।

বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাবা-মায়ের মৃত্যুর সেই ঘটনা আজও তার কাছে পরিষ্কার নয়।

কিছু প্রশ্নের উত্তর সে পায়নি।

কিছু স্মৃতি তার কাছ থেকে ইচ্ছা করেই আড়াল করা হয়েছে।

আর কিছু মানুষ আছে, যারা চায় না ইনায়া কখনো সত্যিটা জানুক।

সে জানে না, তার বাবা-মায়ের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক রহস্য, যা একদিন তার জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে।

---

রাত আরও গভীর হলো।

মির্জা ম্যানশনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকিয়ে আছে রাইয়ান।

তার হাতে একটি ফোন।

ফোনের ওপাশ থেকে সামিরের কণ্ঠ ভেসে এল।

— স্যার, একটা নতুন তথ্য পেয়েছি।

— বলো।

— মেহেদী রহমানের সাম্প্রতিক কয়েকটি লেনদেন এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, যেটির নাম আগে কখনো আমাদের সামনে আসেনি।

রাইয়ানের চোখ সরু হয়ে এল।

— প্রতিষ্ঠানের মালিক কে?

সামির কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

— এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, স্যার। তবে মনে হচ্ছে বিষয়টা শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

রাইয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,

— তাহলে খুঁজে বের করো। আমি সত্যিটা জানতে চাই।

ফোন কেটে দিল সে।

ঠিক সেই মুহূর্তে তার টেবিলের ওপর থাকা একটি পুরোনো খাম চোখে পড়ল।

খামের গায়ে লেখা একটি নাম—

ইমতিয়াজ নূর সিদ্দিকী।

রাইয়ান কিছুক্ষণ নামটির দিকে তাকিয়ে রইল।

সিদ্দিকী পরিবারের সঙ্গে মির্জা পরিবারের পুরোনো কোনো সম্পর্ক ছিল কি?

নাকি এই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো রহস্য?

সে তখনো জানত না, একদিন এই নামের সঙ্গেই জড়িয়ে যাবে তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায়।

আর সেই অধ্যায়ের কেন্দ্রে থাকবে একজন মেয়ে।

ইনায়া নূর সিদ্দিকী।

যে মেয়েটির আগমন একদিন রাইয়ান মির্জার সাজানো পৃথিবীতে এমন এক ঝড় তুলবে, যার শেষ কোথায়—তা কেউ জানে না।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন