ফন্ট সাইজ:
থিম:
আয়াশের রোদপাখি

পর্ব 1

লেখক: আয়ুষী মনি

উপন্যাস: আয়াশের রোদপাখি
লেখিকা: আয়ুষী মনি
পর্ব: ১
[প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত। কপি করা নিষিদ্ধ।] 🚫

শহরের নামী কলেজের সুবিশাল মিলনায়তনজুড়ে তখন কান পাতাই দায়। চারদিকে নবীনবরণের তুমুল ব্যস্ততা, রঙের খেলা আর উৎসবের আমেজ। শব্দব্যবস্থায় মৃদু স্বরে বাজছে রবীন্দ্রসংগীত, তবে তরুণ-তরুণীদের তুমুল আড্ডা আর হাসাহাসির শব্দে সেই সুর ঢাকা পড়েছে। চারপাশের রঙিন আলো, তাজা ফুলের সুবাস আর থরে থরে সাজানো বেলুন—সবকিছু মিলে এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই হাজারো মানুষের কোলাহল আর জমকালো আয়োজনের মাঝেও যার ওপর চোখ পড়লে আর ফেরানো যাচ্ছিল না, সে হলো মৌনিতা আফরিন রোদ।
রোদকে দূর থেকে দেখলেই যেন চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তার গায়ের রংটা ঠিক যেন দুধে-আলতা ফর্সা, যাতে মিলনায়তনের ওপরের নিয়ন আলো পড়লে এক অদ্ভুত জাদুকরী স্নিগ্ধ আভা ছড়ায়। সেই রূপের বিপরীতে পিঠ বেয়ে নেমে গেছে এক ঢাল ঘন কালো রেশমি চুল। চুলগুলো এত লম্বা, রেশমি আর মেঘের মতো কালো যে, তা তার কোমর ছাড়িয়ে নিচে নেমে গেছে। আজ কলেজের প্রথম দিনে সে সেজেছেও বেশ যত্ন করে। পরনে তার একটা গাঢ় লাল পাড়ের বাসন্তী রঙের সুতি শাড়ি। কুঁচিগুলো নিখুঁতভাবে গোঁজা হলেও তার চঞ্চলতার কারণে আঁচলটা বারবার কাঁধ থেকে খসে পড়তে চাইছে। দুধে-আলতা ফর্সা হাত দুটো ভর্তি করে পরেছে রিনিঝিনি শব্দ করা এক ডজন লাল কাঁচের চুড়ি, আর কপালে ছোট্ট একটা সিঁদুরে টিপ। তার ডাগর ডাগর চঞ্চল চোখে সবসময় একটা তীব্র দুষ্টুমির ছায়া খেলা করে। রোদ এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়ানোর মেয়েই নয়। প্রজাপতির মতো চপল পায়ে সে এদিক-ওদিক ঘুরছে, নতুন বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে আর তার সেই অনিন্দ্যসুন্দর খিলখিল হাসিতে পুরো মিলনায়তন মাতিয়ে রাখছে।
তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে অনবরত কপালে হাত দিয়ে বকবক করে যাচ্ছিল তার ছোটবেলার প্রিয় বান্ধবী অনন্যা। অনন্যা মেয়েটা যেমন শান্ত আর মিষ্টি, তেমনই রোদের সব দুষ্টুমির একমাত্র সাথি এবং ঢাল।
অনন্যা রোদের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে টেনে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, "এই রোদ! একটু শান্ত হবি? কলেজের প্রথম দিনেই অধ্যক্ষ স্যার আর জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের নজরে পড়ার ইচ্ছা আছে নাকি তোর? একটু ভদ্র সেজে এক জায়গায় বস তো! আর তোর এই মেঘের মতো লম্বা চুলগুলো একটু ঠিক কর, বাতাসে উড়ে বারবার আমার চোখেই ঢুকছে!"
রোদ এক গাল হেসে অনন্যার নাকটা হালকা করে টেনে দিল। তারপর চোখের ইশারায় বলল, "আরে ধুর অনু! জীবনের এই একটা দিনই তো কলেজের প্রথম দিন। আজকের দিনেও যদি একটু আনন্দ না করি, সারাক্ষণ যন্ত্রমানবের মতো বসে থাকি, তাহলে বাঁচব কবে বল তো? আর আমার চুল তো আমার ইচ্ছেমতোই উড়বে! তুই এত চিন্তা করিস না তো।"
অনন্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "তোর এই চপলতা কোনোদিন কমবে না। সৃষ্টিকর্তা তোকে এত সুন্দর একটা চেহারা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে একটুও গাম্ভীর্য দেননি!" রোদ অনন্যাকে জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসতে লাগল।
ঠিক তখনই মিলনায়তনের মূল ফটকের সামনে একটা রাজকীয় কুচকুচে কালো মার্সিডিজ এসে থামল। গাড়িটির চকচকে গড়ন আর রাজকীয় ভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে ভেতরে বিশেষ কেউ আছেন। গাড়ির দরজা খুলে যিনি নামলেন, তাঁকে দেখা মাত্রই পুরো হলের করিডোরে থাকা ছাত্রছাত্রীদের গুঞ্জন আর শোরগোল যেন এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই যেন এক অজানা সম্মোহনে চুপ হয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমে যিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে হলের দিকে এগিয়ে এলেন, তিনি আর কেউ নন, এই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি—তরুণ বিজ্ঞানী এবং দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক ইশতিয়াক খান আয়াশ।
আয়াশের গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, ঠিক যেন কোনো গ্রিক দেবতার মতো নিখুঁত, উজ্জ্বল আর দীপ্তিময়। তবে সেই ফর্সা রূপের ওপর ছড়িয়ে আছে এক তীব্র, কঠিন পুরুষালি গাম্ভীর্য। চওড়া কাঁধ, সুঠাম দীর্ঘ শরীর আর ধারালো চোয়াল—সব মিলিয়ে আয়াশকে দেখলেই মনের ভেতর এক ধরনের সমীহ আর ভয় জাগে। পরনে তার গাঢ় নীল রঙের একটা উন্নতমানের আনুষ্ঠানিক শার্ট, যার হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গুটিয়ে রাখা। চোখে তার কোনো সাধারণ চশমা নেই, বরং তার ধবধবে ফর্সা মুখে রাজকীয় আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছে একটি ম্যাট কালো রে-ব্যান ওয়েফেয়ার চশমা। এই দামি ব্র্যান্ডের চশমাটির সূক্ষ্ম গাঢ় রঙের কাচের আড়ালে তার তীক্ষ্ণ চোখের চাউনি আরও বেশি রহস্যময় আর মারাত্মক রকমের আকর্ষণীয় লাগছিল। সে তার চশমার আড়াল থেকে চারপাশটা এক পলক দেখল, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো কৌতূহল বা উত্তেজনা ছিল না। বিজ্ঞান, গবেষণাগার আর জটিল সব গবেষণার জগতে ডুবে থাকা এই মানুষটির ধবধবে ফর্সা চেহারার সেই গম্ভীর রূপটাই তাকে যেন আরও বেশি অধরা করে তুলেছে।
আয়াশ যখন গম্ভীর পায়ে, চারপাশের কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছিল, হলের প্রতিটি মেয়ের চোখ যেন তার ওপর আটকে গেল। জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ সব মেয়েরা ফিসফিস করে তার রূপ আর ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করতে লাগল। কিন্তু আয়াশ যেন এক জীবন্ত কৃষ্ণগহ্বর, যা চারপাশের সবাইকে নিজের দিকে টেনে নেয়, কিন্তু নিজে থাকে সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে কাউকেই পাত্তা দেয় না, নিজের গাম্ভীর্যের এক অদৃশ্য চাদরে নিজেকে মুড়ে রাখতে ভালোবাসে। কলেজের অধ্যক্ষ এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক তাকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানিয়ে মঞ্চের দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। আয়াশ কেবল ভদ্রতাসূচক একটা মাথা নাড়ল, মুখে কোনো বাড়তি আবেগের প্রকাশ ঘটল না।
মঞ্চের দিকে যাওয়ার সময় করিডোরজুড়ে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। আয়াশ তার স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে সোজা বিশেষ অতিথিদের জন্য নির্ধারিত সারির দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে সে যখন মিলনায়তনের মাঝখানের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা চঞ্চল রোদ তখন সম্পূর্ণ নিজের জগতেই মগ্ন। সে তখন অনন্যার কানের কাছে মুখ নিয়ে নতুন এক জ্যেষ্ঠ আপুর শাড়ির কুঁচি নিয়ে হাসাহাসি করছিল।
আয়াশের তীক্ষ্ণ এবং ভাবলেশহীন দৃষ্টি সোজা সামনের দিকে নিবদ্ধ ছিল, চশমার আড়াল থেকে তার নজর পেছনের সারির বা চারপাশের কোনো চঞ্চল মেয়ের দিকে পড়ার প্রশ্নই ওঠে না। সে নিজের কাজে এবং চিন্তায় এতটাই মগ্ন থাকে যে, বাইরের দুনিয়ার এই চপলতা তাকে স্পর্শও করে না। অন্যদিকে রোদও তখন অনন্যার হাত ধরে আইসক্রিম খাওয়ার বায়না ধরছিল, প্রধান অতিথি কে এলেন বা কে গেলেন—তা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না।
দুজন একই হলের ভেতর, মাত্র কয়েক গজ দূরত্বের ব্যবধানে অবস্থান করলেও তারা রইল সম্পূর্ণ দুই মেরুর মতো আলাদা। একজন গবেষণাগারের কঠিন সমীকরণে বন্দি থাকা গম্ভীর কৃষ্ণগহ্বর, আর অন্যজন নিজের ছন্দে ডানা মেলে ওড়া এক চিলতে চঞ্চল রোদ। প্রথম দেখাতেই তাদের মাঝে কোনো নাটকীয় ধাক্কাধাক্কি হলো না, কোনো রোমান্টিক চোখের ইশারা হলো না, এমনকি আয়াশ জানলও না যে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়টি এই হলেরই এক কোণে দাঁড়িয়ে হাসছে। অধ্যক্ষ স্যার শব্দবর্ধক যন্ত্রে অনুষ্ঠান শুরুর ঘোষণা দিলেন, আর আয়াশ গম্ভীর মুখে মঞ্চের প্রধান আসনে গিয়ে বসল।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন