এসেছি তোর মনেরই দেশে
Kabita Rahman
(কপি করা নিষিদ্ধ) 🚫🚫🚫
সূচনা পর্ব
গ্রামের নাম শিমুলতলী। সবুজে ঘেরা ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের একপাশ দিয়ে বয়ে গেছে সরু নদী, অন্যপাশে বিস্তীর্ণ ধানখেত। গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটলে দুপাশে চোখে পড়বে সারি সারি গাছপালা, ছোট ছোট মাটির বাড়ি আর পুকুরপাড়ে বসে থাকা গ্রামবাংলার সহজ-সরল মানুষগুলো। শহরের কোলাহল থেকে বহুদূরে এই গ্রামটি যেন প্রকৃতির নিজস্ব হাতে সাজানো এক টুকরো শান্তির ঠিকানা।
গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক পুরোনো বাড়ি। বাড়িটির নাম খান বাড়ি। বিশাল লোহার গেট, উঁচু সীমানাপ্রাচীর, সামনে ফুলের বাগান আর বাড়ির পেছনে বিশাল পুকুর। বাড়িটির মালিক মেহের খান। গ্রামের সবাই তাঁকে খান সাহেব নামে চেনে। একসময় এই গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন তিনি। বর্তমানে বয়সের ভারে আগের মতো চলাফেরা করতে না পারলেও ব্যক্তিত্বের কোনো কমতি নেই।
খান সাহেবের বড় ছেলে মাশরুর খান। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। তাঁর একমাত্র ছেলে মেহরাজ খান অর্ক। বয়স ছাব্বিশ বছর। ঢাকার একটি স্বনামধন্য ভার্সিটির লেকচারার।
অর্কের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার প্রচণ্ড বদমেজাজ। সামান্য ভুলও তার সহ্য হয় না। কথাবার্তায় যথেষ্ট কঠোর। অপ্রয়োজনীয় কথা বলা কিংবা কারও সঙ্গে মিশে চলা কোনোটাই তার পছন্দ নয়। সুদর্শন চেহারা, ঘন কালো চুল, তীক্ষ্ণ চোখ আর গম্ভীর ব্যক্তিত্বের কারণে তাকে প্রথম দেখাতেই আলাদা করে চেনা যায়। তবে তার রাগের কারণে পরিচিতজনদের অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলে।
আজ সেই অর্কই দীর্ঘদিন পর গ্রামের বাড়িতে আসছে।
সকাল থেকেই খান বাড়িতে উৎসবের আমেজ। দাদুর নাতি আসবে বলে বাড়ির প্রতিটি মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
খান বাড়ি, সকাল ১০টা।
রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে সবজিগুলো কাটছে। পরনে সাধারণ একটি নীল রঙের সালোয়ার-কামিজ। লম্বা কালো চুলগুলো বেণি করে পিঠের ওপর ফেলে রেখেছে। মুখে কোনো প্রসাধন নেই। গায়ের রং শ্যামলা, চোখ দুটো বড় বড়। চেহারায় অদ্ভুত এক সরলতা।
মেয়েটির নাম নাকিবা রহমান সিমিন। বয়স ষোলো বছর।
ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়েছে সে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর চাচার বাড়িতে আশ্রয় হয়েছিল তার। কিন্তু সেখানে আদর-যত্নের চেয়ে অবহেলাই বেশি পেয়েছে। সংসারের অভাবের অজুহাতে চাচা তাকে খান বাড়িতে কাজে দিয়ে দিয়েছেন। সেই থেকে এই বাড়িতেই থাকে সিমিন।
বাড়ির ছোট-বড় সবার কাজই তাকে করতে হয়। কখনো রান্নাঘর, কখনো ঘর পরিষ্কার, কখনো বাগানে পানি দেওয়া। তবুও মেয়েটি খুব একটা অভিযোগ করে না। কারণ এই বাড়িতে অন্তত দুবেলা খাবার আর মাথার ওপর একটি ছাদ আছে।
রান্নাঘর থেকে রহিমা খালা ডাকলেন,
‘ সিমিন, ও সিমিন! কী করিস এতক্ষণ?’
সিমিন তাড়াতাড়ি উত্তর দিল,
এই তো খালা, সবজি কাটছি।
সবজি রেখে আগে সামনের ঘরটা পরিষ্কার কর। ছোট সাহেব আসবেন আজ। তাঁর ঘরে যেন কোনো ধুলাবালি না থাকে।
সিমিন অবাক হয়ে বলল,
ছোট সাহেব আসব?
— হ্যাঁ রে। আমাগো অর্ক বাবাজান আসব। ঢাকা থাইকা আইবেন । তুই তো তাঁরে কখনো দেখিসনি। খুব রাগী মানুষ, বুঝলি? কোনো ভুল করবি না।
সিমিন মাথা নেড়ে বলল,
— আচ্ছা খালা। আমি সাবধানে কাজ করমু নে।
কথা শেষ করে আবার নিজের কাজে মন দিল সে।
অন্যদিকে খান বাড়ির বসার ঘরে মেহের খান চশমাটা ঠিক করতে করতে ঘড়ির দিকে তাকালেন।
মাশরুর, অর্কের সঙ্গে কথা হয়েছে? কখন পৌঁছাবে?
মাশরুর খান হেসে বললেন,
বাবা, একটু আগেই ফোন করেছিল। বলেছে আর আধা ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবে।
ছেলেটা এতদিন পর বাড়ি আসছে। এবার কিছুদিন যেন থাকে। সবসময় কাজ আর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে পড়ে থাকে।
পাশে বসে থাকা মাশরুরের স্ত্রী নওশীন বেগম বললেন,
আপনার নাতিকে তো আপনি চেনেন। একবার কাজে বসলে আর কোনো দিকে খেয়াল থাকে না।
মেহের খান মৃদু হেসে বললেন,
ওর রাগটাই শুধু একটু কমানো দরকার।
অন্যদিকে, গ্রামের প্রবেশপথ।
কালো রঙের একটি গাড়ি গ্রামের মেঠোপথ ধরে এগিয়ে চলেছে। গাড়ির ভেতরে বসে আছে মেহরাজ খান অর্ক। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। এক হাতে গাড়ির জানালার পাশে ভর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে সে।
ড্রাইভারের ফোন বেজে উঠতেই অর্ক বিরক্ত হয়ে বলল,
গাড়ি চালানোর সময় ফোন ধরার কী দরকার?
ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দিল।
অর্ক আবার জানালার বাইরে তাকাল। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি, পরিচিত রাস্তা, পুরোনো গাছগুলো দেখে তার মনে শৈশবের কিছু স্মৃতি ভেসে উঠল। ছোটবেলায় এই গ্রামেই কতটা সময় কাটিয়েছে সে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা, পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা—সব মিলিয়ে গ্রামে আসা হয়ে ওঠেনি।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটি খান বাড়ির বিশাল গেটের সামনে এসে থামল।
গাড়ির হর্ন শুনে বাড়ির সবাই বাইরে চলে এলেন।
গাড়ির দরজা খুলে নামল অর্ক।
মাশরুর খান এগিয়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
কেমন আছিস, বাবা?
অর্ক গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?
আলহামদুলিল্লাহ। আয়, ভেতরে আয়।
মেহের খান বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। নাতিকে দেখেই তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
এই যে আমার দাদুভাই! অবশেষে সময় হলো গ্রামের বাড়িতে আসার?
অর্ক এগিয়ে গিয়ে দাদুর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।
কেমন আছেন, দাদু?
ভালো আছি, তবে এখন তোকে দেখে আরও ভালো হয়ে গেলাম।
অর্ক মৃদু হাসল।
দাদুর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে সে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
খান বাড়ির দোতলা।
সিমিন তখন একটি ঘরের জানালার পর্দা ঠিক করছিল। ঘরটি বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর ঘরগুলোর একটি। বড় বিছানা, পাশে বইয়ের তাক, দেয়ালে কয়েকটি ছবি। এই ঘরেই থাকবেন ছোট সাহেব।
কাজ করতে করতে হঠাৎ তার হাত থেকে একটি ফুলদানি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। দ্রুত সামলে নিল সে।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
সিমিন ঘুরে তাকাতেই দেখল, দরজার সামনে একজন লম্বা যুবক দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে কালো শার্ট ও কালো প্যান্ট। এক হাতে ঘড়ি, অন্য হাতে মোবাইল। মুখে বিরক্তির ছাপ।
অর্ক ঘরের ভেতরে ঢুকে অপরিচিত মেয়েটিকে দেখে ভ্রু কুঁচকাল।
কে তুমি?
সিমিন একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
জে... আমি সিমিন।
এখানে কী করছ?
ঘর পরিষ্কার করতাছিলাম।
অর্ক ঘরের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
তোমাকে কে আমার ঘরে ঢুকতে বলেছে?
সিমিন মাথা নিচু করে বলল,
রহিমা খালা কইছেন, ছোট সাহেবের ঘরটা পরিষ্কার করতে।
তাহলে কাজ শেষ করে বেরিয়ে যাও। আমার ঘরে অযথা কোনো জিনিসপত্রে হাত দেবে না।
জি।
অর্ক আর কোনো কথা না বলে বিছানার ওপর নিজের ব্যাগটি রেখে দিল।
সিমিন দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু দরজার কাছে যেতেই অর্ক আবার বলল,
এই মেয়ে!
সিমিন থেমে পেছনে তাকাল।
জি?
আমার ঘরে বইয়ের তাকটা কোথায়?
ওই যে জানালার পাশে।
অর্ক তাকিয়ে দেখল। তারপর সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
যাও।
সিমিন আর দাঁড়াল না। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অর্ক কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের ঘড়িটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল।
দুপুর ১২টা।
রান্নাঘরে তখন দুপুরের খাবারের আয়োজন চলছে। সিমিন প্লেটে খাবার সাজিয়ে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে যাচ্ছে। মেহের খান, মাশরুর খান, নওশীন বেগম এবং অর্ক সবাই সেখানে উপস্থিত।
অর্ক চুপচাপ বসে মোবাইল দেখছিল।
মেহের খান বললেন,
অর্ক, এতদিন পর বাড়িতে এলি। এবার কয়েকটা দিন নিজের মতো করে কাটাবি। সারাক্ষণ ফোন আর কাজ নিয়ে বসে থাকবি না।
অর্ক মোবাইলটা টেবিলে রেখে বলল,
চেষ্টা করব, দাদু।
নওশীন বেগম হেসে বললেন,
আগে খাওয়া শুরু করো। সকাল থেকে নিশ্চয়ই কিছু খাওয়া হয়নি।
সিমিন খাবার পরিবেশন করতে এগিয়ে গেল। সবার প্লেটে খাবার দেওয়ার পর অর্কের সামনে খাবারের বাটি রাখতে গিয়ে সামান্য শব্দ হলো।
অর্ক সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে তাকাল।
সাবধানে কাজ করতে পারো না?
সিমিন থমকে গেল।
দুঃখিত, ছোট সাহেব।
কাজ করার সময় মনোযোগ কোথায় থাকে তোমার?
মেহের খান এবার নাতির দিকে তাকালেন।তারপর বললেন,
আরে, সামান্য শব্দ হয়েছে। মেয়েটাকে এত কথা শোনানোর কী আছে?
অর্ক আর কিছু বলল না। আবার নিজের খাবারের দিকে মনোযোগ দিল।
সিমিন নীরবে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
মেহের খান কিছুক্ষণ পর বললেন,
মেয়েটার নাম সিমিন। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে। ওর চাচা আমাদের বাড়িতে কাজে দিয়েছিলেন। সেই থেকে এখানেই আছে।
অর্ক স্বাভাবিক গলায় বলল,
ও।
মেয়েটা কিন্তু খুব শান্ত। নিজের মতো কাজ করে। খুব মিশুক একটা মেয়ে।
অর্ক কোনো মন্তব্য করল না।
খাওয়া শেষ করে সে নিজের ঘরে চলে গেল।
বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে বসে আছে সিমিন। তার হাতে একটি পুরোনো বই। কাজের ফাঁকে একটু সময় পেলেই বই পড়তে ভালোবাসে সে। ছোটবেলায় পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সেই ইচ্ছেটা আর পূরণ হয়নি।
পুকুরের পানিতে বিকেলের রোদ পড়ে চিকচিক করছে। দূরে কয়েকটি সাদা বক উড়ে যাচ্ছে। সিমিন বইয়ের পাতায় চোখ রেখে পড়ছিল।
হঠাৎ রহিমা খালার ডাক শোনা গেল।
সিমিন! ও সিমিন! কোথায় গেলি?
সিমিন তাড়াতাড়ি বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল।
আসছি খালা!
বইটি বুকের কাছে ধরে সে বাড়ির দিকে ছুটল।
কিন্তু সে জানত না, এই বাড়িতে নতুন একজন মানুষ আসার পর তার প্রতিদিনের জীবনটা আরও কঠিন হতে চলেছে।
অন্যদিকে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অর্ক গ্রামের চারপাশ দেখছিল। দূরের পুকুরপাড়ে মেয়েটিকে বই হাতে বসে থাকতে দেখেছিল সে। মেয়েটি কে, তা বুঝতে তার অসুবিধা হয়নি।
কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে সে নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল।
তারপর নিচু স্বরে বলল,
এই বাড়ির সবাই এত অগোছালো কেন!
গ্রামের আকাশে তখন সন্ধ্যার লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছে। খান বাড়ির পুরোনো দেয়ালগুলো নতুন দিনের সাক্ষী হতে প্রস্তুত হচ্ছে।
চলবে...