ফন্ট সাইজ:
থিম:
জান্নাতের ফুল

পর্ব 1 জান্নাতের ফুল

লেখক: ছামি চিশতি

---
*ইসলামিক উপন্যাস: জান্নাতের ফুল*

*পর্ব ১: রহিমের সংসার*

তাজপুর গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় একটা টিনের ঘর। ঘরটা ছোট, কিন্তু সেই ঘর থেকে পাঁচ ওয়াক্ত আজানের আগে আলো জ্বলে। সেটা রহিম সাহেবের ঘর।

রহিম সাহেব পেশায় কাঠমিস্ত্রি। দিন আনে দিন খায়। কিন্তু তার ঘরে যে শান্তি আছে, তা গ্রামের চেয়ারম্যানের পাকা বাড়িতেও নেই। কারণ তার স্ত্রী ফাতেমা। ফাতেমা বেগম ছিলেন গ্রামের মাদ্রাসার এক হুজুরের মেয়ে। পর্দাশীল, দ্বীনদার, আর অসম্ভব সবর ওয়ালা মহিলা।

তাদের চার সন্তান। বড় মেয়ে সালমা, বয়স ১৬, হাফেজা হতে চলেছে, ২০ পারা মুখস্থ করেছে। মেজো মেয়ে আসমা, ১৪ বছর, খুব বুদ্ধিমতী, মায়ের মতো সংসার সামলায়। ছোট মেয়ে ফাতেহা, ৭ বছর, সবার আদরের, সারাদিন টুপি মাথায় দিয়ে ঘুরে। আর একমাত্র ছেলে করিম, ১২ বছর, বাবার মতো সহজ সরল।

তাদের অভাব ছিল, কিন্তু অভিযোগ ছিল না। ফজরের পর পুরো পরিবার একসাথে কোরআন পড়ত। ফাতেমা বলতেন, "যে ঘরে কোরআন পড়া হয়, সেই ঘরে ফেরেশতা আসে।"

একদিন আসরের পর করিম মন খারাপ করে বসে আছে। তার বন্ধু শহীদ নতুন সাইকেল পেয়েছে। করিমের একটা পুরনো সাইকেলও নেই।

সে মাকে এসে বলল, "মা, আল্লাহ কি আমাদের ভালোবাসে না? আমাদের কেন কিছু নেই? শহীদের বাবা তো নামাজও পড়ে না, তবুও তাদের কত কিছু আছে।"

ফাতেমা ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন। বললেন, "বাবা করিম, আল্লাহ যাকে বেশি ভালোবাসেন, তাকে বেশি পরীক্ষা করেন। শোনো, রাসুল (সা.) বলেছেন, দুনিয়া হলো মুমিনের জন্য জেলখানা আর কাফেরের জন্য জান্নাত। আমাদের এই কষ্টটা হলো জেলখানার কষ্ট। আসল সুখ তো জান্নাতে।"

পাশে বসে থাকা বড় মেয়ে সালমা বলল, "ভাইয়া, তুমি কি জানো, জান্নাতে তোমার জন্য কী আছে? তুমি যদি সবর করো, আল্লাহ তোমাকে এমন সাইকেল দেবেন, যা মাটিতে না, হাওয়ায় চলবে।"

করিম হেসে ফেলল। তার মন ভালো হয়ে গেল।

রমজানের ঠিক দশ দিন আগে। সালমার হঠাৎ খুব জ্বর এলো। ১০৩ ডিগ্রি জ্বর। কিছুতেই কমে না। রহিম সাহেব গ্রামের ডাক্তারকে দেখালেন। ডাক্তার বলল, ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে, সিলেট শহরে নিতে হবে, অনেক টাকা লাগবে।

রহিম সাহেবের কাছে তখন মাত্র ৮০০ টাকা। একটা চেয়ার বানানোর টাকা। কী করবেন?

ফাতেমা কোনো অভিযোগ করলেন না। তিনি ওযু করে জায়নামাজে বসে গেলেন। আসমা বোনের মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে আর কাঁদছে। ছোট ফাতেহা তার ছোট ছোট হাত দিয়ে বোনের পা টিপে দিচ্ছে। আর করিম, সে মসজিদে গিয়ে মাগরিবের পর কাঁদতে কাঁদতে দোয়া করছে।

ফাতেমা সারারাত তাহাজ্জুদ পড়লেন। তিনি আল্লাহকে বললেন, "হে আল্লাহ, আমার মেয়ে তোমার কোরআনের হাফেজা। তুমি তাকে সুস্থ করে দাও। আমি তোমার কাছে আর কিছু চাই না।"

ফজরের আজানের একটু আগে, সালমা ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে বলল, "মা, মা দেখো, কে এসেছে।"

ফাতেমা দৌড়ে এলেন। দেখলেন, সালমার জ্বর ঘাম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। সে বলল, "মা, আমি স্বপ্নে দেখলাম, একজন খুব সুন্দর মহিলা, মুখে নূর, আমাকে বলছেন, 'সালমা, তুমি চিন্তা করো না। তোমার মায়ের তাহাজ্জুদের দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না। তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। তুমি আবার কোরআন পড়বে।'"

ফাতেমা বুঝলেন, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তিনি সেজদায় পড়ে গেলেন। সেজদায় কাঁদতে লাগলেন।

সকালে রহিম সাহেব ঘরে ফিরে দেখলেন, তার মেয়ে সুস্থ, হাসছে। তিনি কোনো ডাক্তার ছাড়াই, কোনো ওষুধ ছাড়াই মেয়েকে সুস্থ দেখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন।

ঈদের সকাল*

ঈদের দিন। সবার নতুন জামা আছে। শুধু রহিমের পরিবারের কারো নতুন জামা নেই। পুরনো জামা ধুয়ে ইস্ত্রি করে পরেছে।

আসমা বলল, "মা, আমরা এভাবে ঈদগাহে যাব? সবাই হাসবে।"

ফাতেমা বললেন, "মা আসমা, মানুষ তোমার জামা দেখবে না, তোমার তাকওয়া দেখবে। তুমি পর্দা করেছ, এটাই তোমার সবচেয়ে দামি জামা।"

তারা যখন ঈদগাহে গেল, সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। কারণ তাদের চেহারায় এমন এক নূর ছিল, যা নতুন জামায় থাকে না।

ঈদের নামাজের পর ইমাম সাহেব সবাইকে নিয়ে দোয়া করলেন। দোয়ার পর ইমাম সাহেব বললেন, "আজ আমি একটা পরিবারকে দেখাতে চাই। রহিম ভাই, ফাতেমা ভাবি, তোমরা একটু সামনে আসো।"

তারা লজ্জায় সামনে গেল। ইমাম সাহেব বললেন, "এই পরিবার গরীব হতে পারে, কিন্তু এরা হলো আমাদের গ্রামের জান্নাতের ফুল। যে ঘরে সালমার মতো হাফেজা আছে, আসমার মতো পর্দাশীল মেয়ে আছে, করিমের মতো নামাজি ছেলে আছে, আর ফাতেহার মতো ছোট ফেরেশতা আছে, সেই ঘরই তো জান্নাত।"

পুরো ঈদগাহ নীরব হয়ে গেল। অনেকের চোখে পানি।

সেদিন করিম বুঝল, আল্লাহর কাছে দামী হওয়াই আসল দামী হওয়া। দুনিয়ার সাইকেল, জামা, টাকা সব ফেলে চলে যেতে হবে। কিন্তু তাকওয়া, সবর আর নামাজ সাথে যাবে।

রহিম সাহেব বাড়ি ফিরে তার পরিবারকে নিয়ে হাত তুললেন। বললেন, "হে আল্লাহ, তুমি আমাদের যেমন রেখেছ, আমরা খুশি। তুমি আমাদের এই ছোট ঘরটাকেই জান্নাতের বাগান বানিয়ে দাও।"

ছোট ফাতেহা আমিন বলতে গিয়ে বলে ফেলল, "আমিন, আর আমাকে জান্নাতে বড় সাইকেল দিও।"

সবাই হেসে উঠল। সেই হাসির মধ্যে ফেরেশতারা আমিন বলল।

*শেষ কথা: এই গল্প আমাদের শেখায়, সুখ টাকায় না, সুখ থাকে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার মধ্যে। যে পরিবারে নামাজ আছে, কোরআন আছে, পর্দা আছে, সেই পরিবারই দুনিয়ার বুকে জান্নাতের ফুল।

ঈদের খুশি শেষ হতে না হতেই রহিম সাহেবের ঘরে নতুন পরীক্ষা এলো।

কোরবানির ঈদ আসছে। গ্রামের সবাই গরু কিনছে। রহিম সাহেবের খুব ইচ্ছা ছিল এবার একটা ছোট খাসি হলেও কোরবানি দেবেন। কিন্তু হাতে এক টাকাও নেই। চেয়ার বানানোর অর্ডারটাও ক্যান্সেল হয়ে গেছে।

ছোট ফাতেহা কিছুই বুঝত না। সে গ্রামের অন্য বাচ্চাদের দেখে বাবাকে বলল, "বাবা, আমাদের গরু কই? আমরা কোরবানি দেব না?"

রহিম সাহেব কিছু বলতে পারলেন না। চোখের পানি লুকিয়ে বাইরে চলে গেলেন।

ফাতেমা মেয়েকে কোলে নিয়ে বললেন, "মা ফাতেহা, শোনো। ইব্রাহিম (আ.) তার ছেলে ইসমাইল (আ.) কে আল্লাহর জন্য কোরবানি দিতে চেয়েছিলেন। আল্লাহ তখন পরীক্ষা নিয়েছিলেন। আমাদের পরীক্ষাটাও তেমন। আমাদের গরু নেই, কিন্তু আমাদের নিয়ত আছে। আল্লাহ নিয়ত দেখেন।"

ফাতেহা বলল, "তাহলে আমিও কিছু কোরবানি দেব মা?"

ফাতেমা হাসলেন, "তুমি কী দেবে মা?"

ছোট ফাতেহার একটা মাত্র পুতুল ছিল, একটা লাল জামা পরা পুতুল, যেটা তার খালা ঢাকা থেকে দিয়েছিল। সেটাই তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। সে দৌড়ে গিয়ে পুতুলটা নিয়ে এলো।

বলল, "মা, এই পুতুলটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমি এটা আল্লাহর জন্য দিয়ে দিলাম। গরীব কোনো বাচ্চাকে দিয়ে দাও।"

ফাতেমার চোখে পানি চলে এলো। ৭ বছরের মেয়ে কোরবানির মানে বুঝে গেছে!

ঈদের আগের দিন, এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। রহিম সাহেবের পুরনো উস্তাদ, যার কাছে তিনি কাজ শিখেছিলেন, তিনি সিলেট থেকে এলেন। বললেন, "রহিম, তুই আমার দোকানটা রাখ। আমি আর কাজ করতে পারব না। তোর সততার জন্য এটা তোকেই দিলাম।"

সেই দোকানে তখন ৫০,০০০ টাকার কাঠ আর যন্ত্রপাতি ছিল!

রহিম সাহেব বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

সেই রাতে ফাতেমা সালমা, আসমা, করিম আর ফাতেহাকে নিয়ে বললেন, "দেখেছ? ফাতেহা তার প্রিয় পুতুলটা কোরবানি দিয়েছে বলেই আল্লাহ আমাদের এত বড় রিজিক দিলেন। যে আল্লাহর জন্য ছোট কিছু ছাড়ে, আল্লাহ তাকে অনেক বড় কিছু দেন।"

পরদিন তারা একটা খাসি কোরবানি দিলেন। আর ফাতেহার সেই পুতুলটা তারা পাশের বাড়ির এতিম মেয়ে আয়েশাকে দিয়ে দিল। আয়েশার মুখের হাসি দেখে ফাতেহা বলল, "মা, আমার তো কষ্ট লাগছে না, উল্টা অনেক খুশি লাগছে!"

করিম তার বোনকে দেখে শিখল, কোরবানি মানে শুধু গরু জবাই না, প্রিয় জিনিস আল্লাহর জন্য ছেড়ে দেওয়াই কোরবানি।

*শিক্ষা: এই পর্ব আমাদের শেখায়, আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগ কখনো বিফলে যায় না। ছোট ফাতেহার মতো নিষ্পাপ ত্যাগ আল্লাহ অনেক বেশি পছন্দ করেন।*

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 জান্নাতের ফুল শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন