ফন্ট সাইজ:
থিম:
ডিজায়ার আনলিশড

৩৩তম পর্ব

লেখক: সাবিলা সাবি

#ডিজায়ার_আনলিশড

✍️ সাবিলা সাবি

পর্ব: ৩৩

WARNING: This chapter contains explicit content, intense romantic scenes, and adult themes (18+). Reader discretion is strongly advised.

সমুদ্রের সেই লোনা জল আর মৃ,ত্যুর হিমশীতল আলিঙ্গন থেকে ফিরে আসার পর জাভিয়ানের ভেতরের অসুস্থ সত্তাটা যেন আরও কয়েক গুণ তেতে উঠেছে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ যেমন তীরের বালুকাভেলায় আছড়ে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হতে চায়, জাভিয়ানের দীর্ঘদিনের অবদমিত কামনার ঢেউগুলোও আজ তেমনি বাঁধ ভাঙার অপেক্ষায়। তার রক্তে আজ এক আদিম অস্থিরতা, যা কেবল এক শান্ত সমর্পণের খোঁজ করছে।

পরেরদিন রাত হতেই জাভিয়ান তান্বীকে নিয়ে জিপে করে পাহাড়ের আরও গহীনে যাত্রা শুরু করল। খাড়া পাহাড়ি পথ বেয়ে জিপ যখন উপরে উঠছিল, তান্বী অবাক হয়ে লক্ষ্য করল রাস্তার প্রতিটা মোড়ে কালো পোশাকে অস্ত্রধারী কমান্ডোরা পাহারায় নিযুক্ত। তাদের পাথরের মতো নিস্পৃহ মুখ আর হাতের উদ্যত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র জানান দিচ্ছে—আজ এই পাহাড়ের চূড়ায় জাভিয়ানের অনুমতি ছাড়া এক বিন্দু বাতাসও প্রবেশের অধিকার রাখে না।

তান্বী ভয়ার্ত চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "জাভিয়ান, আমরা কোথায় যাচ্ছি? এত গার্ড কেন? আমার খুব ভয় করছে।"

জাভিয়ান স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে অন্য হাতে তান্বীর বরফশীতল হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ওর ঠোঁটে সেই চিরচেনা আত্মবিশ্বাসী আর রহস্যময় হাসি। সে চিবুক ঈষৎ উঁচিয়ে নিচু স্বরে বলল, "ভয় পেও না জিন্নীয়া। এই পুরো পাহাড়টা আজ শুধু তোমার আর আমার। এই গার্ডরা পাহারা দিচ্ছে যাতে আমাদের একান্ত মুহূর্তগুলোতে বাইরের কোনো পৃথিবী হানা দিতে না পারে। আজ শুধু আমরা থাকব, আর থাকবে আমাদের নিঃশ্বাসের শব্দ।"

পাহাড়ের একদম খাড়া ঢালের শেষ প্রান্তে এসে জিপটি থামল। যেখানে নীল আকাশ যেন পাহাড়ের বুকে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে আছে।

চারিদিকে জাকারান্দা ফুলের হালকা মাদকতাময় সুবাস আর চাঁদের আলোর মায়াবী আভা। একটি বিশাল প্রাচীন বৃক্ষের শক্তিশালী মগডাল থেকে ঝোলানো হয়েছে এক শুভ্র মখমলের বিশাল লাক্সারি 'সুইং বেড' বা ঝুলন্ত বিছানা যাকে হ্যামক বল হয়।চারপাশটা শত শত ছোট ছোট মোমবাতির আলোয় সাজানো। নিচে ঘন কুয়াশার চাদর আর ওপরে তারায় ভরা আকাশ সব মিলিয়ে জায়গাটাকে কোনো এক ডার্ক রূপকথার অংশ মনে হচ্ছে। নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি ঝর্ণার অবিরাম কলতান। জাভিয়ান তান্বীকে তার বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে আগলে নিয়ে এলো সেই দোদুল্যমান বিছানায়। নিচে ঘন অরণ্যের গাঢ় অন্ধকার, আর ওপরে অগণিত তারার মেলা। বিছানাটি রাতের হিমেল বাতাসে মৃদু দুলছে; মনে হচ্ছে তারা কোনো মর্ত্যের মাটিতে নয়, বরং এক নিষিদ্ধ মেঘের ওপর ভাসছে।

জাভিয়ান তান্বীকে কোলে তুলে নিয়ে অত্যন্ত সাবধানে সেই দোদুল্যমান হ্যামকের ওপর বসিয়ে দিল। নিচে তাকাতেই তান্বীর মাথাটা ঘুরে উঠল। অতল অন্ধকার খাদ আর এই ঝুলন্ত হ্যামক ভয়ে ও জাভিয়ানের শার্টের কলার শক্ত করে খামচে ধরল।

তান্বী ফ্যাকাসে মুখে অস্ফুট স্বরে বলল, "জাভিয়ান... আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? এমন একটা ভয়ংকর জায়গায় কেউ কীভাবে রোমান্টিক মুহূর্ত কাটানোর কথা ভাবতে পারে? আমি তো নিচে তাকাতেই পারছি না!"

জাভিয়ান হাসল। সেই বাঁকা, নেশাতুর হাসি। সে হ্যামকের একপাশে বসে তান্বীকে নিজের বলিষ্ঠ বুকের সাথে পিষে ধরল। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর কপালে আছড়ে পড়ছে। সে নিচু কিন্তু ভারী স্বরে বলল—

"এটাই আমার ভালোবাসা তোমার প্রতি জিন্নীয়া—ভয়ংকর। সাধারণ রোমান্স তো সাধারণ পুরুষরা করে। জাভিয়ানের ভালোবাসা মানেই হলো খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে মৃ/ত্যুর চোখে চোখ রেখে জীবনের চরম স্বাদ নেওয়া। আজ তোমার ভয় আর আমার তৃষ্ণা—দুটোকেই এই গিরিখাতে বিসর্জন দেব।"

জাভিয়ানের হাতটা এবার তান্বীর উন্মুক্ত পিঠের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল। ওর কর্কশ আঙুলের স্পর্শে তান্বী এক তীব্র শিহরণে চোখ বুজল।

তান্বী আমতা আমতা করে প্রশ্ন করল, "জাভিয়ান... বলছিলাম আজকে কি... মানে আজকে কি করতেই হবে?"

জাভিয়ান ওর চিবুকটা এক আঙুলে উঁচিয়ে ধরল। ওর দুচোখে এখন সেই মাদকতা নেশা। জাভিয়ান খুব সাবলীল কিন্তু ধারালো গলায় উত্তর দিল

"ইয়েস! অনেক মাস ধরে সিগন্যাল হাই হয়ে আমার ব্লুটুথ অন হয়েছিল, কিন্তু তোমার ওই 'প্রাইভেসি সেটিংসের' জন্য কানেক্ট করতে পারিনি। আজ তোমার পেয়ারিং কোড পেয়েই গেছি, তখন কি আর ডেটা ট্রান্সফার না করে থাকা যায়? আজ শুধু ব্লুটুথ কানেক্ট না, একবারে 'ফুল এক্সেস' নিয়েই ছাড়বো।"

জাভিয়ান তান্বীর কানের কাছে মুখ নামিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, "এই মাটির পৃথিবীটা বড় নোংরা জিন্নীয়া। ওখানে সবাই তোমার দিকে নজর দেয়। তাই তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম... এই আকাশের কাছাকাছি। যেখানে শুধু বাতাস আর এই গভীর রাত আমাদের সাক্ষী থাকবে।"

পাহাড়ের খাড়া ঢালে ঝুলন্ত হ্যামকটা বাতাসের তোড়ে একবার খাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে,পরক্ষণেই ফিরে আসছে বটগাছের কাণ্ডের দিকে। নিচে কয়েকশ ফুট গভীর অন্ধকার গহ্বর—একটু অসাবধানতা মানেই সলিল সমাধি। তান্বী ভয়ে আর আতঙ্কে জাভিয়ানের প্রশস্ত বুকটা বারবার দুই হাতে খামচে ধরে আছে। ওর হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি যেন বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছে।

হ্যামকের প্রতিটি দুলুনিতে তান্বীর মনে হচ্ছিল সে এখনই ছিটকে পড়ে যাবে। ও ফুঁপিয়ে উঠে বলল, "জাভিয়ান, প্লিজ... আমার মাথা ঘুরছে। আমি পড়ে যাব! আমাকে নামিয়ে দিন!"

জাভিয়ান কোনো কথা বলল না। সে কেবল তান্বীর কোমর জড়িয়ে থাকা হাতের বাঁধনটা আরও কয়েক গুণ শক্ত করে দিল। ওর বলিষ্ঠ হাতের সেই কর্কশ স্পর্শে তান্বী এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

জাভিয়ান ওর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে সরাসরি ওর চোখের গভীরে তাকাল। ওর ওই উন্মাদ চোখের মনিতে তখন মোমবাতির শিখা প্রতিফলিত হচ্ছে।

জাভিয়ান ফিসফিস করে বলল, "আমার চোখের দিকে তাকাও জিন্নীয়া। নিচের অন্ধকারের দিকে নয়, আমার এই চোখের ভেতরের আগুনের দিকে তাকাও। আমি থাকতে এই পাহাড়ের সাধ্য নেই তোমাকে আমার বুক থেকে কেড়ে নেয়।"

জাভিয়ান ওর ঠোঁট নামিয়ে আনল তান্বীর কানের কাছে। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস তান্বীর ভয়ার্ত শরীরে এক বৈদ্যুতিক প্রবাহ ছড়িয়ে দিল। জাভিয়ানের হাতটা এবার তান্বীর পিঠের অনাবৃত অংশ দিয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। ওর কর্কশ আঙুলগুলো যখন তান্বীর মেরুদণ্ডের প্রতিটি হাড় ছুঁয়ে যাচ্ছিল, তান্বী ভয়ের কথা ভুলে গিয়ে এক অদ্ভুত আবেশে চোখ বুজল।

জাভিয়ান তান্বীর ঘাড়ের সেই স্পর্শকাতর ভাঁজে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে এক প্রকার নিষ্ঠুর আস্বাদনে মত্ত হলো। ওর দন্তের সামান্য চাপে তান্বী যন্ত্রণায় আর এক অদম্য সুখে ডুকরে উঠল। ধীরে ধীরে হ্যামকের সেই বিপজ্জনক দুলুনি তান্বীর কাছে আর আতঙ্ক মনে হলো না, বরং মনে হতে লাগল এই দুলুনিটাই বুঝি ওদের মিলনের একমাত্র ছন্দ।

জাভিয়ান এক ঝটকায় তান্বীর কাঁধের ওপর থেকে জামার কাপড়টা সামান্য সরিয়ে দিতেই ওর শ্বেতশুভ্র কাঁধ উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। জাভিয়ান সেখানে নিজের ঠোঁটের গভীর সিলমোহর এঁকে দিয়ে ভারী গলায় বলল, "ভয় লাগছে এখনো? নাকি আমার এই ছোঁয়ায় তোমার ভেতরের ভয়গুলো আমার তৃষ্ণায় পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে?"

তান্বী এখন পুরোপুরি আচ্ছন্ন। ওর হাত দুটো জাভিয়ানের চুলের ভেতরে বিলি কাটছে। সে অবচেতনভাবেই নিজেকে জাভিয়ানের শরীরের সাথে আরও নিবিড়ভাবে মিশিয়ে দিতে চাইল।

জাভিয়ান তান্বীকে বিছানার মাঝখানে শুইয়ে দিল। জাভিয়ান তার পেশিবহুল শরীরের সবটুকু ওজন নিয়ে তান্বীর ওপর ঝুঁকে পড়ল। নিচে ঝর্ণার গর্জন আর ওপরে পাতার মর্মর ধ্বনি তাদের দ্রুততর হৃদস্পন্দনের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় হ্যামকটি দুলছে, যা তাদের এই সান্নিধ্যের প্রতিটি মুহূর্তকে আরও বেশি অনিশ্চিত আর রোমাঞ্চকর করে তুলছে। কোনো দেয়াল নেই, কোনো ছাদ নেই আছে শুধু চারিদিকে উন্মুক্ত প্রকৃতি।

জাভিয়ানের স্পর্শে আজ কোনো সামাজিক বা নৈতিক বাধা নেই, সে এই বন্য প্রকৃতির মাঝেই তার পুরুষালি অধিকার পূর্ণ করতে চায়। তান্বীর লম্বা রেশমি চুলগুলো বিছানা ছাড়িয়ে বাতাসের ডালপালায় ডানা মেলছে।

জাভিয়ানের ভারি নিঃশ্বাস তান্বীর ঘাড়ের স্পর্শকাতর ভাঁজে তপ্ত আগুনের মতো অনুভূত হচ্ছে। হঠাৎ জাভিয়ান তান্বীর দুই হাত মাথার ওপরে তুলে শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের মণি এখন কেবল নেশায় নয়, বরং এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর জেদে জ্বলছে। সে তান্বীর গলার কাছে মুখ ডুবিয়ে খুব নিচু স্বরে, প্রায় হিসহিস করে বলল—"জানো জিন্নীয়া? এই হ্যামকের দড়িগুলো যদি আজ ছিঁড়ে যায়, আর আমরা যদি এই কয়েকশ ফুট ওপর থেকে নিচে পাথুরে ঝর্ণায় আছড়ে পড়ি—আমি বিন্দুমাত্র ভয় পাব না।"

তান্বী বিস্ময় আর আতঙ্ক মাখা চোখে তাকাতেই জাভিয়ান তার ঠোঁটে এক বন্য হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে তার এক হাত দিয়ে তান্বীর গলা আলতো করে পেঁচিয়ে ধরল; সেই স্পর্শে ভালোবাসা নাকি নিগ্রহ লুকানো ছিল, তা বোঝা দায়। জাভিয়ান কর্কশ স্বরে বলল—

"আমি চাই আমরা ওভাবেই মরি। একদম একসাথে। যাতে নিচে পড়ার পর আমাদের হাড়গোড়গুলো একে অপরের সাথে এমনভাবে মিশে যায় যে, কোনো ফরেনসিক ডাক্তারও যেন আমাদের আলাদা করতে না পারে। কেউ যেন কোনোদিন বলতে না পারে—কোনটা জাভিয়ান আর কোনটা তার জিন্নীয়া।"

জাভিয়ানের এই ভয়াবহ আর সর্বগ্রাসী রোমান্টিসিজম তান্বীর মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বইয়ে দিল। জাভিয়ান আর এক মুহূর্তের বিরতি দিল না। সে তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল তান্বীর গলার নরম ভাঁজে।

পাহাড়ের সেই খাড়া ঢালে ঝুলন্ত হ্যামকটি এখন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। জাভিয়ানের পৈশাচিক ঠোঁটদুটো তান্বীর গলার প্রতিটি খাঁজে আর ঘাড়ের স্পর্শকাতর ভাঁজে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো বিচরণ করছে। জাভিয়ানের সদ্য সেভ করা গালের ঘর্ষণ আর ওর ঠোঁটের তপ্ত ছোঁয়ায় তান্বীর সারা শরীরে এক তীব্র সুড়সুড়ি আর শিহরণের ঢেউ খেলে যাচ্ছে।

তান্বী নিজেকে সামলাতে না পেরে জাভিয়ানের আলিঙ্গনের মধ্যেই হাসফাস করতে লাগল। সুড়সুড়ির চোটে ও অবচেতনভাবেই শরীরটা মোচড় দিয়ে এদিক-ওদিক নড়াচড়া করতে শুরু করল। কিন্তু এই নড়াচড়াতে হ্যামকটা ভারসাম্য হারিয়ে খাদের দিকে বিপজ্জনকভাবে হেলে পড়ছে।

জাভিয়ানের মাথাটা এখন পুরোপুরি বিগড়ে গেছে। ওর রক্তে এখন কেবল তৃষ্ণা আর আধিপত্যের নেশা। তান্বীর এই ছটফটানি ওর সেই বুনো ছন্দকে নষ্ট করে দিচ্ছে। জাভিয়ান হঠাত করেই থেমে গেল। ওর চোখের মনিতে তখন এক হিংস্র শীতলতা।

সে এক হাত দিয়ে তান্বীর দুই হাত শক্ত করে মাথার ওপরে চেপে ধরল, আর অন্য হাতে কোমর থেকে নিজের সেই চকচকে ধারালো ছুরিটা বের করল। তান্বী আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল। জাভিয়ান কোনো কথা না বলে এক ঝটকায় হ্যামকের চারটে দড়ির মধ্যে একটা দড়ি অর্ধেকটা কেটে দিল!

হ্যামকটা একপাশে কাত হয়ে ঝুলে পড়ল। তান্বী চিৎকার দিয়ে উঠতে গেলে জাভিয়ান ওর মুখটা নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরল। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বরফশীতল গলায় জাভিয়ান গর্জে উঠল—

"অনেক হয়েছে জিন্নীয়া! এবার স্থির হও। আমার এই তৃষ্ণার মাঝে তোমার ওই সুড়সুড়ির অজুহাতে নড়াচড়া করাটা আমি আর সহ্য করছি না। একবার দড়িটা কেটেছি, এটা জাস্ট একটা ওয়ার্নিং। আরেকবার যদি নড়াচড়া করেছ বা আমাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছ, অন্যাপাশের দড়িটাও আমি কেটে দেব। তখন আমরা দুজন সরাসরি এই গিরিখাতের তলায় গিয়ে আমাদের বাসর শেষ করব। তুমি কি সেটা চাও?"

তান্বীর চোখ দুটো ভয়ে কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। জাভিয়ানের এই উন্মাদনা ওর কল্পনার বাইরে। সে বুঝতে পারল, জাভিয়ান এখন কোনো সাধারণ মানুষ নয়; ও একটা পৈশাচিক সত্তা, যে নিজের শিকারকে পূর্ণরূপে পাওয়ার জন্য মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করতে দ্বিধা করছে না।

জাভিয়ান ছুরিটা হ্যামকের ওপর গেঁথে রেখে আবার তান্বীর ওপর ঝুঁকে পড়ল। এবার আর কোনো বাধা নেই। তান্বী মূর্তির মতো স্থির হয়ে পড়ে রইল, কেবল ওর তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো জাভিয়ানের বুকে আছড়ে পড়ছে। জাভিয়ান ওর ঠোঁট দুটোকে আবার নিজের শাসনের নিচে পিষ্ট করতে শুরু করল। হ্যামকটা এখন তিনটে মাত্র দড়ির ওপর কোনোমতে ঝুলে আছে, আর তার নিচে অতল মৃ/ত্যু। কিন্তু জাভিয়ানের কাছে এখন ওই মৃ/ত্যুর চেয়েও তান্বীর শরীরের ঘ্রাণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জাভিয়ান তান্বীর কানের লতিতে কামড় বসিয়ে ফিসফিস করে বলল, "বি গুড। শুধু আমাকে অনুভব করো।"

হ্যামকটি তখন বাতাসের ঝাপটায় আর জাভিয়ানের আদিম ছন্দে উন্মত্তের মতো দুলছে। জাভিয়ানের প্রতিটি মুভমেন্ট ছিল এতোটাই শক্তিশালী আর বন্য যে তান্বীর মনে হচ্ছিল সে কোনো বিশাল ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়েছে। শরীরের সেই তীব্র দহন আর হ্যামকের নিচে অতল খাদের ভয়—দুটো মিলে তান্বীর সহ্যক্ষমতা ছাড়িয়ে গেল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; জাভিয়ানের কাঁধে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল।

সেই কান্নার শব্দ জাভিয়ানের কানে পৌঁছাতেই ওর ভেতরের পৈশাচিক সত্তাটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। কিন্তু পরক্ষণেই ওর চোখের মণি দুটো রাগে আর উত্তেজনায় টকটকে লাল হয়ে উঠল। জাভিয়ান কান্না সহ্য করতে পারে না, বিশেষ করে তার মিলনের এই চরম মুহূর্তে জিন্নীয়ার চোখের জল তার মস্তিস্কের শিরা-উপশিরায় বিষাক্ত মাদকতা ছড়িয়ে দেয়।

সে এক ঝটকায় তান্বীর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। ওর আঙুলের চাপে তান্বীর চোয়ালটা প্রায় জমে যাওয়ার উপক্রম। জাভিয়ান হিসহিস করে কর্কশ গলায় গর্জে উঠল—"কান্না বন্ধ করো তান্বী! এই মুহূর্তে তোমার চোখের জল আমার সহ্য হচ্ছে না। আমি কি তোমাকে সুখ দিচ্ছি না? নাকি কষ্ট দিচ্ছি?"

তান্বী কান্নার তোড়ে অস্ফুট স্বরে বলল, "জাভিয়ান... প্লিজ... আমি আর পারছি না... আমার খুব ভয় করছে..."

জাভিয়ানের মাথাটা এবার পুরোপুরি বিগড়ে গেল। সে ঝট করে হ্যামকের ওপর রাখা সেই ধারালো ছুরিটা হাতে তুলে নিল এবং চোখের পলকে হ্যামকের দ্বিতীয় প্রধান রশিটার ওপর ধরল। তান্বী আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল।

"চুপ!" জাভিয়ান হিমশীতল গলায় বলল। "তুমি যদি আর একটা শব্দ করো, তবে এই মুহূর্তেই এই দড়িটাও আমি কেটে দেব। তুমি কি চাও আমরা ওভাবেই মরি? নাকি শান্ত হয়ে আমার এই আদর উপভোগ করবে?"

জাভিয়ান ছুরিটা রশির ওপর একটু বেশিই চাপ দিল। দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার সেই বীভৎস ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে তান্বীর হৃৎপিণ্ড যেন থেমে গেল। সে তার কান্না গলার ভেতরেই গিলে ফেলল। তার বড় বড় চোখ দুটো এখন ভয়ে আর বিস্ময়ে জাভিয়ানের দিকে স্থির হয়ে আছে। জাভিয়ানের চোখে কোনো কৌতুক নেই, আছে এক ভয়াবহ উন্মাদনা।

তান্বীকে নিথর হয়ে যেতে দেখে জাভিয়ানের ঠোঁটে আবার সেই হাসিটা ফিরে এলো। সে ছুরিটা একপাশে সরিয়ে দিয়ে তান্বীর কবজি দুটো আবার রশির সাথে শক্ত করে চেপে ধরল।

"গুড গার্ল।আজ রাতে এই অরণ্যের প্রতিটি পাতা জানবে যে তুমি কার... তুমি কেবলই জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর!"

জাভিয়ান আর কোনো কথার অবকাশ রাখল না। সে আবার নিজের সেই উন্মত্ত নেশায় ডুব দিল। হ্যামকটি তখন পাহাড়ের ঢালে বিপজ্জনকভাবে দুলছে, যেন বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় তারা মৃ/ত্যুর খুব কাছে চলে যাচ্ছে। কিন্তু জাভিয়ানের কাছে ওই খাদের গভীরতা এখন তুচ্ছ; তার পুরো পৃথিবী এখন তান্বীর তপ্ত নিঃশ্বাস আর ওর শরীরের ঘ্রাণে সীমাবদ্ধ।

জাভিয়ানের হাতের বাঁধন আলগা হলো না, বরং প্রতিটি মুহূর্তে তা আরও নিবিড় হতে লাগল। তান্বী অনুভব করছিল, জাভিয়ান যেন কোনো মানুষ নয়—বরং এক ঝড়, যা তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে নিজের ভেতর বিলীন করে নিতে চায়। ওর প্রতিটি স্পর্শে ছিল এক অদম্য জেদ, এক নিরঙ্কুশ মালিকানা। খাদের নিচে অতল অন্ধকার ওত পেতে থাকলেও, জাভিয়ানের বাহুবন্ধনে তান্বী এক বিচিত্র অবশতা অনুভব করছিল।

মৃ/ত্যু হয়তো কয়েক ইঞ্চি দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু জাভিয়ানের এই সর্বগ্রাসী উপস্থিতির সামনে সেই ভয়ও যেন আজ ম্লান হয়ে গেছে। ওই মগডালের ওপর ঝুলন্ত শয্যায় সে কেবলই এক পুরুষ, যে তার ভালোবাসার নারীকে একটু একটু করে নিজের সত্তায় মিশিয়ে নিচ্ছে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ আর তান্বীর হৃদস্পন্দন মিলেমিশে একাকার হয়ে ওই নির্জন পাহাড়ের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল।

.

.

.

ভোরের সেই প্রথম আলো যখন জাকারান্দার ডালপালা ভেদ করে হ্যামকের ওপর এসে পড়ল, তখন চারপাশটা এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় ঢাকা। পাহাড়ের চূড়ায় কুয়াশার পাতলা চাদর, আর তার নিচে ঝর্ণার সেই অবিরাম বয়ে চলার শব্দ এখন অনেক বেশি স্পষ্ট। গতরাতের সেই উন্মাদনা আর ঝড়ের চিহ্নগুলো হ্যামকের শ্বেতশুভ্র মখমলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

জাভিয়ান আগেই জেগেছে। সে হ্যামকের এক কোণায় আধশোয়া হয়ে একহাতে মাথা এলিয়ে দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তান্বীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। জাভিয়ানের প্রশস্ত পিঠে তান্বীর নখের সেই লাল আঁচড়গুলো ভোরের আলোয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওর চোখের সেই গতরাতের বন্যতা এখন আর নেই, তার বদলে সেখানে এক স্থির, গভীর প্রশান্তি।

সে পরম মমতায় তান্বীর কপালে লেপ্টে থাকা কয়েকটা চুল সরিয়ে দিল। তার আঙুলের আলতো স্পর্শ তান্বীর ললাটে ছুঁতেই ও ঘুমের ঘোরেই একটু কেঁপে উঠল। তান্বী যখন চোখ মেলল, তার চোখের মণিতে তখনো ভোরের সেই আলস্য আর গতরাতের ক্লান্তির রেশ।

জাভিয়ানকে এত কাছে দেখে ও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সারারাতের সেই অমানুষিক ধকল আর জাভিয়ানের তীব্র সান্নিধ্যের পর তান্বীর শরীরটা যেন পুরোপুরি অবশ হয়ে আছে। সে একটু নড়াচড়া করার চেষ্টা করতেই ব্যথায় তার ভ্রু দুটো কুঁচকে এল।

জাভিয়ান খুব নিচু আর ভরাট গলায় বলল, "ব্যথা করছে খুব?"

তান্বী কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু বড় বড় চোখ মেলে জাভিয়ানের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই সেই মানুষ, যে গতরাতে মৃ/ত্যুর ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে তাকে নিজের করে নিয়েছে, আবার এই সেই মানুষ যার চোখে এখন পাহাড়ের শান্ত সরোবরের মতো মায়া।

তান্বী অস্ফুট স্বরে বলল, "আপনি সত্যিই খুব অদ্ভুত। গতরাতে তো মনে হচ্ছিল আপনি আমাকে শেষ করে ফেলবেন।"

জাভিয়ান মৃদু হাসল। সে হ্যামকের রশি ধরে আলতো টান দিয়ে তান্বীকে নিজের বুকের আরও কাছে নিয়ে এল। তান্বীর কপাল নিজের চিবুকে ঠেকিয়ে সে খুব গভীর স্বরে বলল "তৃপ্তি শব্দটা আমার জন্য নয় জিন্নীয়া। তোমাকে যতবার কাছে পাই, আমার ভয় আরও বাড়ে। মনে হয়, এই বুঝি তুমি আমার থেকে দূরে সরে গেলে। এই অরণ্য, এই বাতাস সবাই যেন তোমাকে আমার থেকে চুরি করতে চায়। তাই ভাবছি, তোমাকে এখান থেকে আর নামাবই না। এই আকাশের কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় তোমাকে সারাজীবনের জন্য বন্দি করে রাখব।"

তান্বী জাভিয়ানের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছিল। জাভিয়ানের এই ভয়াবহ পজেসিভ কথাবার্তা এখন আর তাকে আগের মতো আতঙ্কিত করছে না, বরং এক বিচিত্র আশ্রয়ের অনুভূতি দিচ্ছে। সে বুঝতে পারল, এই পুরুষের ভালোবাসার ধরণটাই এমন—উন্মত্ত, একগুঁয়ে এবং সর্বগ্রাসী।

জাভিয়ান তান্বীর কপালে এক দীর্ঘ চুমু খেয়ে তাকে নিজের বলিষ্ঠ বাহুডোরে জাপ্টে ধরল। পাহাড়ের চূড়ায় তখন সূর্য উঠছে, আর সেই আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে এক অসমাপ্ত গল্পের নতুন এক অধ্যায়।

তান্বী হঠাত মাথা তুলে জাভিয়ানের সুন্দর আর আর শান্ত মুখটার দিকে অদ্ভুত এক কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল। তার মনে অনেকক্ষণ ধরে একটা খটকা ঘুরপাক খাচ্ছিল।

তান্বী একটু আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল, "জাভিয়ান, একটা কথা বলব? রাগ করবেন না তো?"

জাভিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে তান্বীর কোমরে নিজের হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে টেনে নিয়ে বলল, "বলো জিন্নীয়া। আজ তোমার সব আবদার মঞ্জুর।"

তান্বী সরাসরি জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব সহজ গলায় প্রশ্ন করল, "না মানে... আপনার মা আপনাকে ছোটবেলায় আসলে কী খাইয়ে বড় করেছে?"

জাভিয়ান হঠাত এমন প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তান্বী থামল না, সে বলতে লাগল, "মানুষের তো একটা পাওয়ারের সীমা থাকে, একটা ক্লান্তি থাকে। কিন্তু আপনার তো মনে হয় ক্লান্তি বলতে কিছু নেই! পুরোটা সময় যেভাবে... মানে একজন স্বাভাবিক মানুষ কি এতক্ষণ ধরে অবিরাম এভাবে পারে?"

তান্বীর এমন অকপট আর বাস্তবিক কৌতূহল বুঝতে পেরে জাভিয়ান হঠাত হো হো করে হেসে উঠল। সেই অকৃত্রিম হাসির শব্দে গাছের ডালে বসে থাকা দু-একটা পাখিও ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। জাভিয়ান হাসতে হাসতেই তান্বীর কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব গম্ভীর অথচ মাদকতায় ভরা গলায় বলল—"এটা কোনো ডায়েট বা স্পেশাল খাবারের ফল নয় জিন্নীয়া। এটাকে বলে ‘গড গিফটেড’ স্ট্যামিনা। আর এই বিশেষ ক্ষমতাটা সৃষ্টিকর্তা কেবল আমার জন্যই দিয়েছে, আর আমি সেটা শুধুমাত্র তোমার জন্য বরাদ্দ করে রেখেছিলাম।"

জাভিয়ান আবার শুয়ে পড়ল তান্বীর পাশে, তাকে নিজের বুকের সাথে এমনভাবে জাপ্টে ধরল যেন সে কোনো অমূল্য সম্পদ আগলে রাখছে। তান্বী জাভিয়ানের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছিল।

জাভিয়ান তখন বুঝতে পারল এবার ফেরার সময় হয়েছে। সে হ্যামক থেকে নামার জন্য উঠে দাঁড়াল এবং পরম যত্নে তান্বীকে হাত ধরে তোলার চেষ্টা করল।

কিন্তু তান্বী একবার নড়াচড়া করতেই অস্ফুট স্বরে ব্যথায় ককিয়ে উঠল। ওর সারা শরীর যেন সীসার মতো ভারী হয়ে আছে। গতরাতের সেই অমানুষিক ধকল আর জাভিয়ানের তীব্র উন্মাদনার পর ওর শরীরের প্রতিটি পেশি এখন বিদ্রোহ করছে। ও উঠে দাঁড়ানো তো দূর, বিছানা ছেড়ে এক ইঞ্চি নড়তেও পারছে না। ওর পা দুটো যেন আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, পুরো শরীরটা এক অদ্ভুত অবশতায় ভেঙে পড়ছে।

তান্বী অসহায় চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, "জাভিয়ান... আমি বোধহয় উঠতে পারব না। আমার পা দুটো একদম অবশ হয়ে আছে। একটুও শক্তি পাচ্ছি না।"

জাভিয়ানের ঠোঁটে এক মায়াবী কিন্তু গর্বিত হাসি ফুটে উঠল। সে জানত এমনটাই হবে। সে কোনো কথা না বলে সরাসরি নিচু হয়ে তান্বীকে আলতো করে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। হ্যামকটি ওদের ভারে সামান্য দুলে উঠল। তান্বী আবেশে আর ক্লান্তিতে জাভিয়ানের চওড়া কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল। জাভিয়ানের বলিষ্ঠ বাহুডোরে নিজেকে সঁপে দিয়ে ওর মনে হলো, এই মানুষটা যতটা ভয়ংকর, তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী আশ্রয়।

জাভিয়ান তান্বীকে কোলে নিয়ে খুব সাবধানে সেই প্রাচীন বটগাছের ডাল থেকে নিচে নেমে এলো। পাহাড়ি ঢালের সেই অমসৃণ পথে জাভিয়ান অত্যন্ত স্থির কদমে হাঁটছে, যেন ওর কোলে কোনো কাঁচের পুতুল আছে—যা সামান্য আঘাতেই ভেঙে যেতে পারে।

পাহাড়ি পথের ধারে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা সশস্ত্র গার্ডরা যখন দেখল তাদের দুর্ধর্ষ বসের কোলে নিথর এবং বিধ্বস্ত অবস্থায় তান্বী, তারা বিস্ময় চেপে সম্মানে মাথা নিচু করল। জাভিয়ান কারোর দিকে এক পলকও তাকাল না। তার পুরো মনোযোগ এখন তার বাহুবন্দি ওই রমণীর ওপর, যে গতরাতের ঝড়ে পরিশ্রান্ত হয়ে কাঁচের পুতুলের মতো এলিয়ে আছে।

জাভিয়ান জিপের কাছে পৌঁছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তান্বীকে ড্রাইভিং সিটের পাশের সামনের সিটে বসিয়ে দিল।পাহাড়ের হিমেল বাতাস তান্বীর শরীরে লাগতেই সে সামান্য কুঁকড়ে গেল। জাভিয়ান তড়িৎ গতিতে নিজের গা থেকে দামী ব্লেজারটি খুলে পরম মমতায় তান্বীর কাঁধের ওপর জড়িয়ে দিল। ব্লেজারের ওম আর জাভিয়ানের শরীরের পরিচিত ঘ্রাণে তান্বী এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তি খুঁজে পেল।

জাভিয়ান ড্রাইভিং সিটে বসে জিপটা স্টার্ট দিল। তান্বী আধো বোজা চোখে দেখল গার্ডরা তখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সে অতি ক্ষীণ স্বরে বলল, "সবাই দেখছিল জাভিয়ান... আপনার কি একটুও লজ্জা লাগে না এভাবে আমাকে কোলে নিতে?"

জাভিয়ান জিপের গিয়ার বদলে পাশের আয়নায় তান্বীর ক্লান্ত অথচ স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ী হাসি। সে গম্ভীর কিন্তু ভরাট গলায় বলল—"লজ্জা দুর্বলদের ভূষণ তান্বী। আর এই পাহাড়ের প্রতিটি ধূলিকণা জানে যে তুমি এখন একমাত্র আমার। তোমাকে আগলে রাখা বা বহন করাটা আমার অধিকার, আর সেই অধিকারে লজ্জার কোনো ঠাঁই নেই। এখন ওই ব্লেজারটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে চুপচাপ ঘুমাও, অনেকটা পথ বাকি।"

জিপটা যখন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে নিচে নামতে শুরু করল, তান্বী অনুভব করল জাভিয়ানের এই প্রচণ্ড শাসন আর তীব্র ভালোবাসার মাঝে কোনো এক অদ্ভুত জাদুবল আছে। ব্লেজারের উষ্ণতায় তার সব ভয় আর জড়তা এক গভীর প্রশান্তিতে রূপ নিলো।

.

.

.

এদিকে ফারহান যখন ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল, তখন বাইরের আকাশটা ঘোলাটে হয়ে আছে। লুসিয়া জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, এক স্থির চিত্রপটের মতোই। ফারহানের পায়ের শব্দ পেতেই সে বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখের কোনটা রক্তবর্ণ হয়ে আছে বোঝাই যাচ্ছে সারারাত এক ফোঁটা ঘুম ওর চোখে নামেনি। ফারহানকে দরজায় পাসপোর্ট আর ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লুসিয়ার ভেতরের সবটুকু বাঁধ ভেঙে গেল।

সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফারহানের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। ওর দুই হাত ফারহানের গলার পেছনে লোহার শিকলের মতো শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। লুসিয়ার শরীরের প্রতিটি কম্পন ফারহান অনুভব করছিল। লুসিয়া ওর শার্টের কলারটা খামচে ধরে রুদ্ধকণ্ঠে বলতে শুরু করল—"ফারহান, তুমি সত্যিই চলে যাবে? একবারও কি মনে হচ্ছে না যে এই মেক্সিকোয় আমি তোমাকে ছাড়া কীভাবে থাকব? আমাকে সাথে নিয়ে চলো, নয়তো এখানেই থেকে যাও ফারহান। আমি তোমার সব শর্ত মেনে নেব... শুধু আমাকে এভাবে ফেলে যেও না!"

ফারহান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর হাত দুটো কয়েকবার কেঁপে উঠল লুসিয়াকে জাপ্টে ধরার জন্য, কিন্তু সে নিজেকে পাথর করে রাখল। খুব নিচু আর ভরাট গলায় ফারহান শুধু বলল, "লুসিয়া, নিজেকে সামলাও।আমার সময় হয়ে গেছে ফ্ল্যাইটের।"

লুসিয়া মাথা তুলে ফারহানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে তখন এক চরম আকুতি আর হারানোর তীব্র যন্ত্রণা। লুসিয়া এক হাতে ফারহানের গালটা আলতো করে ছুঁল। ওর তপ্ত নিশ্বাস ফারহানের ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে। সে ফারহানের ওই পাষাণ হৃদয়ের শেষ বিন্দুটা জয় করতে চাইল। নিজের চোখ দুটো বুজে সে ফারহানের ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নিয়ে এল চেয়েছিল শেষবারের মতো ফারহানকে একটা চুম্বনে বেঁধে ফেলতে।

লুসিয়া যখন ফারহানকে চুম্বন করতে উদ্যত হলো, ঠিক তখনই ফারহান এক হাত দিয়ে লুসিয়ার ঠোঁটের ওপর রেখে থামিয়ে দিলো। তারপর খুব দৃঢ়ভাবে ওকে নিজের থেকে সরিয়ে দিল। সে এক কদম পিছিয়ে গিয়ে লুসিয়ার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিল।

লুসিয়া অপমানে আর এক বুক হাহাকার নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। সে ভাঙা গলায় প্রশ্ন করল, "কেন ফারহান? আমাকে কি তোমার একটুও ছুঁতে ইচ্ছে করে না?"

ফারহান জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। ও চায় না লুসিয়া ওর চোখের কোণের দুর্বলতাটা দেখুক। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফারহান ধরা গলায় বলল "লুসিয়া, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করছি। আজ যদি আমি একবার তোমার এই আদরে ধরা দিই, তবে আমি আর এই মেক্সিকো ছেড়ে যেতে পারব না। আর আমার ফেরাটা এখন খুব দরকার। কিছু জেদ, কিছু হিসেব এখনো বাকি লুসিয়া। ভালোবাসা মাঝে মাঝে মানুষকে বড্ড দুর্বল করে দেয়, আর এই মুহূর্তে আমি দুর্বল হতে চাইছি না।"

ফারহান পকেট থেকে তার প্রিয় বাইকের চাবিটা বের করে সামনের টেবিলে রাখল। লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, "আমার বাইকটা তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। এটা আগলে রেখো।"

লুসিয়া অবাক হয়ে বলল, "বাইক? কিন্তু তুমি এয়ারপোর্টে যাবে কীভাবে? চলো একসাথে বাইকে করে দুজনে এয়ারপোর্টে যাই।"

ফারহান মাথা নাড়ল। ওর চোখে এক রহস্যময় ছায়া। "না লুসিয়া। তুমি এয়ারপোর্টে যাবে না। বাইরে গাড়ি আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আমি ওটাতেই যাব।"

লুসিয়া কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ফারহান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ব্যাগটা তুলে নিয়ে সে দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কালো রঙের গাড়িটিতে উঠে বসার সময় ফারহান একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।

পেছন থেকে লুসিয়া চিৎকার করে উঠল, "ফারহান! তুমি ফিরে আসবেতো। আমি জানি তুমি ফিরে আসবে!"

গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে ধুলো উড়িয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। লুসিয়া একা দাঁড়িয়ে রইল সেই নিঝুম ফ্ল্যাটে যেখানে টেবিলের ওপর পড়ে আছে ফারহানের প্রিয় বাইকের চাবিটা। ফারহান কেন তাকে এয়ারপোর্টে নিল না?সেই রহস্য মেক্সিকোর বাতাসে জমাট বেঁধে রইল

.

.

.

ফারহানের গাড়িটি এয়ারপোর্টের ভিআইপি গেটে না গিয়ে সোজা চলে গেল একদম শেষ প্রান্তে, যেখানে সাধারণের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সেখানে একটি বিশাল কার্গো বিমানের সামনে কালো স্যুট পরা কয়েকজন লোক পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ফারহান গাড়ি থেকে নামতেই তাদের মধ্যে একজন যাকে মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডে ওপর মহলের বিশ্বস্ত লোক বলে সবাই চেনে—ধীর পায়ে ফারহানের দিকে এগিয়ে এল।

ফারহান ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ক্লান্ত অথচ সজাগ দৃষ্টিতে লোকটির সামনে দাঁড়াল। লোকটি নিচু স্বরে বলল, "সব গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে, ফারহান। বস সানচেজ তোমার কাজে খুশি। শিপমেন্টগুলো অলরেডি রওনা হয়ে গেছে। ড্রাগস আর অস্ত্রের এই বিশাল লট যদি ঠিকঠাক পৌঁছায়, তবে বাংলাদেশের বাজার আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।"

ফারহান একটা শীতল হাসি হাসল। সে নিজে ডন নয়, কিন্তু মেক্সিকোর এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র সে-ই। ফারহান খুব ঠান্ডা গলায় বলল, "বসকে বোলো, ফারহান কখনো ভুল করে না। মাঝ সমুদ্রে কোস্টগার্ডের সাথে সব রফা হয়ে গেছে। কন্টেইনারগুলো একদম নিরাপদে বন্দরে গিয়ে ভিড়বে।"

লোকটি ফারহানের দিকে একটি ছোট এনক্রিপ্টেড ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল, "বসের শেষ মেসেজ। বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করবে। আর মনে রেখো, এই চালানের খবর যেন বাতাসের আগে কেউ না পায়।"

ফারহান ফোনটা পকেটে রেখে রানওয়ের দিকে তাকাল। সে লুসিয়াকে সাথে আনেনি তার এই বীভৎস অন্ধকার পরিচয়টা এখন আড়াল করতে। লুসিয়া যদি জানত ফারহান এখন ও এসব কাজ করে এবং কী ভয়ংকর নীল নকশা সে বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে, তবে হয়তো আজ সে ফারহানকে এভাবে আঁকড়ে ধরত না। ফারহান চায় লুসিয়া তাকে শুধু একজন সাধারণ প্রেমিক হিসেবেই মনে রাখুক—অপরাধ জগতের কোনো ঘুঁটি হিসেবে নয়।

বিমানের সিঁড়িতে ওঠার সময় ফারহান একবার পেছনে তাকাল। দূর থেকে মেক্সিকোর ধোঁয়াটে আকাশটা দেখা যাচ্ছে। মনে মনে ভাবল, সে বাংলাদেশে যাচ্ছে শুধু নিজের মাটিতে ফিরতে নয়, বরং মেক্সিকোর এই বিষাক্ত সাম্রাজ্যের শিকড় নিজের দেশে গেঁথে দিতে।

ফারহান বিমানে উঠে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজল। কেবিনের নিস্তব্ধতায় হঠাত তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিন জ্বলে উঠতেই ভেসে উঠল লুসিয়ার সেই ছবিটা, যা সে নিজ হাতে ফোনের ওয়ালপেপার হিসেবে সেট করেছিলো।

হঠাৎ করেই ওর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে জানে, এই যে সে বিদায় নিয়ে এল—এটা শুধু একটা সাময়িক বিদায় নয়। সে আর কোনোদিন এই মেক্সিকোতে ফিরবে না।

পকেট থেকে ফোনটা বের করে সে শেষবারের মতো লুসিয়ার ছবিটা দেখল।এয়ারপোর্টে তাকে না আনার পেছনে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় রহস্য; সে চায়নি তার শেষ বিদায়টা কোনো অপরাধ জগতের লেনদেনের সাক্ষী হয়ে থাকুক।

ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজল। সিটে হেলান দিয়ে ভাবল "ক্ষমা করে দিও লুসিয়া। তোমার কাছে আমি আর ফিরব না। মেক্সিকোর এই আকাশ আর তোমার ওই মায়াবী মুখ সবই আজ থেকে আমার জন্য নিষিদ্ধ।"

সে জানে বাংলাদেশে গিয়ে তাকে নতুন করে এক মরণখেলায় নামতে হবে। সেখানে সে কেবল একজন প্রতিনিধি, একজন সোলজার—যাকে মেক্সিকোর ওপর মহলের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। বিমানটি যখন মেঘের ওপর দিয়ে ডানা মেলল, ফারহান বুঝল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সে নিজেই লিখে এসেছে। সে ফিরছে নিজের মাটিতে, কিন্তু পেছনে ফেলে যাচ্ছে এক প্রাণবন্ত হৃদয়, যাকে সে তিলে তিলে মরতে দিয়ে এল।

.

.

.

.

অন্যদিকে রায়হান তার অন্ধকার সেফ-হাউসের কন্ট্রোল রুমে বসে আছে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, আর কলিজার ভেতরটা যেন কেউ নিংড়ে ধরছে। গত এক ঘণ্টা ধরে সে পাগলের মতো জাভিয়ানকে ফোন করে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। পাহাড়ি এলাকায় সিগন্যাল এমনিতেই দুর্বল, তার ওপর জাভিয়ান সম্ভবত ইচ্ছা করেই তার সব কন্টাক্ট ডিভাইস অফ করে রেখেছে।

রায়হান বিড়বিড় করে বলল, "স্যার, আপনি কোথায়? একবার শুধু ফোনটা ধরুন! পৃথিবী উল্টে যাচ্ছে আর আপনি পাহাড়ের চূড়ায় রোমান্স করছেন!"

রায়হানের সামনে রাখা ট্যাবে জেলের রেড অ্যালার্টের সিগন্যালটা লাল হয়ে জ্বলছে। একটু আগেই তার কাছে খবর এসেছে,জেলের সেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা মুহূর্তের মধ্যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। জেলের সব কটা ডিজিটাল লকিং সিস্টেম কেউ হ্যাক করেছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, মাত্র দশ মিনিটের এক দক্ষ অপারেশনে জেল ভেঙে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মেইলস্ট্রোমকে।

সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো গার্ডরা কেউ মারা যায়নি, তারা সবাই জীবন্ত সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে আছে। এর মানে যারা এই কাজ করেছে তারা চরম পেশাদার। রায়হান জানে, এই জেলের ভেতরে এমন কিছু তথ্য আর এমন কিছু মানুষ ছিল যা জাভিয়ানের অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে আছে। এখন সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।

রায়হান আবার জাভিয়ানের স্যাটেলাইট ফোনে কল করল। আবারও ব্যর্থ হলো। সে বুঝতে পারছে না জাভিয়ানকে এই মহাবিপদের খবরটা সে কীভাবে দেবে। জেলের ভেতর থেকে রায়হানের এক সোর্স তাকে শেষ মেসেজ পাঠিয়েছে: "The vault is empty. He is out. Repeat, HE IS OUT."

রায়হান জানে, এই 'He' বলতে কাকে বোঝানো হচ্ছে। এই মেইলস্ট্রোম বাইরে আসা মানে জাভিয়ানের জন্য সাক্ষাৎ আজরাইল নেমে আসা। রায়হান নিজের হাতে থাকা অটোমেটিক পিস্তলটা চেক করে নিলো।

চলবে.........

#ডিজায়ার_আনলিশড (ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল পর্ব)

✍️ সাবিলা সাবি

তানভিয়ান স্পেশাল পর্ব💐✨

.

.

.

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১২টা ছুঁইছুঁই। ক্যালেন্ডারের পাতায় সবেমাত্র পা রেখেছে ১৪ই ফেব্রুয়ারি—আজ ভালোবাসা দিবস। পাহাড়ের সেই বিভীষিকাময় রাত আর দীর্ঘ সফরের ধকল তান্বীর শরীরে বিষের মতো জেঁকে বসেছে। সকালে ফেরার পর থেকে সে বিছানা ছেড়ে এক কদমও নড়তে পারেনি। জাভিয়ানই তাকে বাচ্চার মতো কোলে করে বাথরুমে নিয়ে গেছে, আবার নিজ হাতে বিছানায় খাবার খাইয়ে দিয়েছে। তান্বীর পুরো শরীর ব্যথায় নীল হয়ে আছে, নড়ার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট তার নেই।

নিস্তব্ধ কক্ষে হঠাৎ জাভিয়ানের ভারী পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। সে তান্বীর শিয়রে এসে দাঁড়াল। পরনে তার সিল্কের নেভি ব্লু শার্ট আর তার ওপরে মেরুন রঙের ব্লেজার। হাতে দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি আর সাথে সাদ ডায়মন্ডের ব্রেসলেটটা, ঘাড়ের মধ্যে এখনও তান্বী লেখা ট্যাটুটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

জাভিয়ান নিচু গলায় বলল, "জিন্নীয়া, ওঠো। চলো একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।"

তান্বী আধবোজা চোখে আতঙ্কিত হয়ে তাকাল। সে চাদরটা গায়ের ওপর আরও টেনে নিয়ে করুণ স্বরে বলল, "প্লিজ জাভিয়ান, আমার শরীরের প্রতিটি হাড় ভাঙা মনে হচ্ছে। আমি নড়তেও পারছি না। আজ থাক না!"

জাভিয়ান এক চিলতে হাসল, যে হাসিতে কিছুটা রহস্য লুকিয়ে আছে।সে নিচু হয়ে তান্বীর কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, "আজ বিশেষ দিন জিন্নীয়া। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।"

'সারপ্রাইজ' শব্দটা শুনতেই তান্বীর রক্ত হিম হয়ে গেল। জাভিয়ানের সারপ্রাইজ মানেই তো ভয়ংকর কিছু!একবার সাবমেরিন তো আরেকবার পাহাড়ে ঝুলন্ত হ্যামক। সে পাগলের মতো মাথা নাড়তে শুরু করল, "না না না! আপনার সারপ্রাইজ মানেই ভয়াবহ কিছু। আমি যাব না জাভিয়ান, খোদার দোহাই লাগে আমাকে আর কোনো চমক দেবেন না। আমি এই বিছানায় মরতে রাজি, তাও আপনার সারপ্রাইজ দেখতে যাব না!"

জাভিয়ান কোনো কথা কানে তুলল না। সে এক ঝটকায় তান্বীর গায়ের চাদরটা সরিয়ে দিয়ে তাকে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। তান্বী যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলেও জাভিয়ানের বাহুডোর লোহার মতো শক্ত হয়ে রইল। সে তান্বীকে কোলে করেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল পার্কিং জোনের দিকে। গাড়ির দরজাটা খুলে তাকে পরম মমতায় ড্রাইভিং সিটের পাশের সামনের সিটে বসিয়ে দিল। এরপর নিজের শরীর থেকে দামী ব্লেজারটি খুলে তান্বীর গায়ে জড়িয়ে দিল যাতে ওর ঠান্ডা না লাগে।

গাড়ি যখন চলতে শুরু করল, তান্বী ভয়ে চোখ বন্ধ করে শুধু প্রার্থনাই করছিল। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়ি থামতেই জাভিয়ান বলল, "চোখ খোলো জিন্নীয়া।"

তান্বী চোখ মেলতেই একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার চোখের সামনে যা দৃশ্যমান হলো তা কোনো আতঙ্কের নয়, বরং এক স্বর্গীয় সুন্দরের বহিঃপ্রকাশ। রাস্তার ঠিক মাঝখানে বিশাল এক লরি দাঁড়িয়ে আছে, যার ওপর কয়েক হাজার টকটকে লাল গোলাপের এক দানবীয় তোড়া যা দেখে মনে হচ্ছে আস্ত এক বাগান তুলে আনা হয়েছে। এর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা রঙের এক স্পোর্টস কার, যার ভেতর থেকে লাল গোলাপের পাপড়ি উপচে পড়ে রাস্তায় এক রক্তিম গালিচা তৈরি করেছে। সেখানে পাপড়ি দিয়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা— "I LOVE YOU"

সবকিছু ছাপিয়ে তান্বীর নজর কাড়ল তাদের জিপের পেছনের অংশটি।জাভিয়ান ডিকির লকটা খুলতেই আকাশ রাঙিয়ে বেরিয়ে এল বিশাল এক গুচ্ছ লাল হৃদপিণ্ড আকৃতির বেলুন। সেগুলো সুতোর টানে গাড়ির ঠিক ওপরেই স্থির হয়ে এক অপার্থিব লাল মেঘের মতো দুলতে লাগল। বাতাসে গোলাপের তীব্র সুবাস আর মাথার ওপরে দোদুল্যমান ওই লাল হৃদপিণ্ডগুলোর নিচে এক জাদুকরী স্তব্ধতা নেমে এল।

তান্বী উত্তর দিতে ভুলে গেল। সে আজীবন সিনেমাতে এমন দৃশ্য দেখেছে, যদিও সিনেমাতেও কখনো এমন অকল্পনীয় আয়োজন দেখায়নি যেমনটা জাভিয়ান বাস্তবে করেছে। সে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাংলাদেশের এক মধ্যবিত্ত ঘরে বেড়ে ওঠা সাধারণ এক মেয়ের জীবনে কি সত্যি এত কিছু প্রাপ্য ছিল?

হঠাৎ করেই জাভিয়ান তান্বীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে তার পকেট থেকে একটি মখমলের ছোট বাক্স বের করল। ঢাকনা খুলতেই ধবধবে সাদা হিরের একটি আংটি চাঁদের আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠল। জাভিয়ান অত্যন্ত গম্ভীর কিন্তু রুদ্ধকণ্ঠে বলতে শুরু করল "জিন্নীয়া, আমি তোমাকে কোনো সস্তা প্রেমিকের মতো রূপকথার গল্প শোনাব না। আমি শুধু জানতে চাইতুমি কি সারাজীবন এই কঠিন মানুষটার ছায়া হয়ে থাকবে? বৃদ্ধ বয়সে আমি যখন হসপিটালের বেডে নিথর হয়ে পড়ে থাকব তখনও কি তুমি আমার হাতটা এভাবে ধরে রাখবে? শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত কি তুমি আমার পাশে থাকবে?"

তান্বীর চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। সে আবেগে জাভিয়ানকে জড়িয়ে ধরার জন্য এক পা এগোতে চাইল, কিন্তু শরীরের তীব্র ব্যথায় সে কুঁকড়ে গেল, এক কদমও নড়ার শক্তি পেল না। জাভিয়ান তা বুঝতে পেরে মৃদু হাসল এবং তান্বীর কাঁপা কাঁপা হাতটি ধরে অনামিকায় সেই হিরের আংটিটি পরিয়ে দিল। এরপর সে নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে তান্বীকে পরম আবেশে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তান্বী জাভিয়ানের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল।

জাভিয়ান ওর কপালে একটি দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল, "কাঁদলে আজকের ডিনারটা মাটি হয়ে যাবে। চলো,রাতটা এখনো বাকি।"

জাভিয়ান আবারও তাকে কোলে তুলে নিয়ে একটু দূরে সাজানো একটি বিশেষ জোনে নিয়ে গেল। সেখানে মায়াবী হলুদ আলোর লাইটিং আর লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে পুরো জায়গাটা সাজানো। এক কোণে নিওন সাইনে জ্বলজ্বল করছে— "HAPPY VALENTINE'S DAY, JINNIYA"।

আরেক পাশে একটি কাঁচের টেবিল, তার ওপর সুগন্ধি ক্যান্ডেল জ্বলছে। দুটি রাজকীয় চেয়ার আর টেবিলভর্তি তান্বীর প্রিয় সব খাবার। রাতের নিস্তব্ধতায় এই মায়াবী আলো আর ফুলের সুবাসে মনে হচ্ছে যেন কোনো স্বপ্নপুরী।

জাভিয়ান তান্বীকে খুব সাবধানে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজে তার উল্টো দিকে বসল। সে তান্বীর চোখের জল মুছে দিয়ে গ্লাসে রেড ওয়াইন ঢালতে ঢালতে বলল, "আজকের এই দিনটাও শুধু তোমার আর আমার।"

কিন্তু তান্বী যখন টেবিলের ওপর রাখা খাবারের দিকে তাকাল, ওর চোখজোড়া বিস্ময়ে কপালে উঠল।সাধারণ কোনো ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে মানুষ যা আশা করে পাস্তা, পিৎজা বা স্টেক—এখানে তার ছিটেফোঁটাও নেই। বরং পুরো টেবিলজুড়ে সাজানো রয়েছে মেক্সিকোর সবচেয়ে দামী এবং পুষ্টিকর সব খাবার। জাভিয়ান নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করছে। সে চায় না তান্বী দুর্বল হয়ে পড়ুক, কারণ রাতে তার আবার 'জিন্নীয়া'কে প্রয়োজন।

টেবিলে সাজানো রয়েছে কাঁচা বাদাম, অ্যাভোকাডো, সামুদ্রিক ঝিনুক (Oysters), গ্রিলড স্যালমন মাছ এবং প্রচুর পরিমাণে লাল মাংস। পাশে রাখা আছে এক গ্লাস ঘন ডার্ক চকলেট শেক, যাতে মেশানো হয়েছে বিশেষ কিছু ভেষজ নির্যাস।

তান্বী অবাক হয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, "জাভিয়ান, এতো সব কী? আমরা কি ডিনারে কোনো জিম ডায়েট করছি?"

জাভিয়ান অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের প্লেটটা সরিয়ে রেখে একদৃষ্টিতে তান্বীর দিকে তাকাল। ওর চোখে সেই পরিচিত শিকারী চাউনি, কিন্তু তাতে আজ এক অদ্ভুত বন্যতা মিশে আছে। সে গম্ভীর গলায় বলল "কাল রাতে পাহাড়ের সেই ঝড়ে তোমার এনার্জি একদম শেষ হয়ে গেছে জিন্নীয়া। খাবার সবটুকু শেষ করো। আমি চাই না কালকের মতো আজ রাতেও তুমি মাঝপথে দুর্বল হয়ে পড়ো। তোমার শরীরের প্রতিটি কোষে শক্তি চাই, কারণ আজ রাতের ঝড় কালকের চেয়েও ভয়াবহ হবে।"

তান্বী জাভিয়ানের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় মাথা নিচু করে ফেলল। জাভিয়ানের প্রতিটি কথায় রয়েছে অমোঘ হুকুম। তান্বী এক চামচ স্যুপ মুখে নিতেই জাভিয়ান তার হাতটা ধরল। সে নিজেই চামচটা কেড়ে নিয়ে তান্বীকে খাওয়াতে শুরু করল।

জাভিয়ান তাকে প্রতিটি খাবার গেলাতে গেলাতে বলতে লাগল, "এই সি-ফুড আর রেড মিট তোমার এনার্জি বাড়াবে। আমি তোমাকে শুধু আদর করতে চাই না, আমি তোমাকে আমার যোগ্য করে গড়ে তুলতে চাই। তুমি যত বেশি পুষ্টিকর খাবার খাবে, আমার বন্যতা সহ্য করার ক্ষমতা তোমার তত বাড়বে। আমি চাই আমার জিন্নীয়া হবে এই শহরের সবচেয়ে লাবণ্যময়ী নারী।"

সে প্রায় জোর করেই তান্বীকে দামী ক্যাভিয়ার (মাছের ডিম) আর প্রচুর ফলমূল খাওয়াতে লাগল। তান্বীর পেট ভরে গেলেও জাভিয়ান থামছে না। মনে হচ্ছে সে তাকে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে 'প্রস্তুত' করছে। জাভিয়ান ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে নিচু স্বরে বলল

"খেয়ে নাও জান। কারণ এই ক্যালরিগুলো পোড়ানোর দায়িত্ব আমার। আমি নিশ্চিত করব যাতে এক ফোঁটা ক্যালোরিও তোমার শরীরে অবশিষ্ট না থাকে।"

মায়াবী আলোর নিচে, গোলাপের সুবাসে ঘেরা এই নির্জনতায় তান্বী অনুভব করল জাভিয়ান চৌধুরী তাকে তিল তিল করে নিজের বন্যতার জন্য গড়ে পিটে নিতে চায়। বাইরে তখনো সেই লাল বেলুনগুলো দুলছে, আর বাতাসের কানে কানে জাভিয়ানের সেই ঘোষণা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— আজকের রাতটা কেবল শুরু।

জাভিয়ান যখন জোরাজুরি করে তান্বীকে দামী ক্যাভিয়ার আর প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারগুলো খাওয়াচ্ছিল, তখন তান্বীর বুকের ভেতরটা ভয়ে আর লজ্জায় দুরুদুরু কাঁপছিল। সে চামচটা নামিয়ে রেখে কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। ওর চাউনি এতটাই ধারালো যে মনে হচ্ছে তান্বীর হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে নেবে।

তান্বী অতি ক্ষীণ স্বরে বলল, "তার মানে কি... আজ রাতেও আপনি আবার...?"

জাভিয়ান থামল না। সে গ্লাসে রেড ওয়াইন ঢালতে ঢালতে শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় পালটা প্রশ্ন করল, "হ্যাঁ, কেন? কোনো সমস্যা?"

তান্বী মাথা নিচু করে নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলল, "কিন্তু কাল রাতটা তো কেবল শেষ হলো। আমি এখনো ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে পারছি না জাভিয়ান।"

জাভিয়ান ওয়াইনের গ্লাসটা ঠোঁটে ছোঁয়ালো না, বরং সেটা টেবিলের ওপর রেখে তান্বীর দিকে আরও ঝুঁকে এল। ওর গলার স্বর এখন অনেক বেশি গভীর আর নেশাতুর। "দেখো তান্বী, আমি আগে কখনোই এই স্বাদের খোঁজ পাইনি। যেদিন থেকে আমি তোমার প্রেমে পড়েছি, সেদিন থেকেই আমি তোমাকে নিজের করে চেয়েছি। কিন্তু প্রতিবার তোমার কথা ভেবে আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি, আগলে রেখেছি তোমাকে। কিন্তু এখন আমি এটার আসল টেস্ট পেয়ে গেছি। এখন আমি চাইলেও আর নিজেকে আটকাতে পারছি না। এটা আমার কাছে এখন মরণ নেশার মতো হয়ে গেছে।"

সে ওয়াইনের গ্লাসটা হাতে নিয়ে সেটার লাল রঙের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। "এই যে ওয়াইন পান করছি, এটাতে এখন আর আমার নেশা ধরছে না জিন্নীয়া। কাল রাতে তোমার মাঝে যে নেশাটা ছিল, আমি ওটা আজকেও চাই। আমি আজ আবারও তোমার গভীরে হারাতে চাই।"

তান্বী আর্তনাদ করে ওঠার মতো গলায় বলল, "কিন্তু জাভিয়ান, আমি তো অসুস্থ! আমার সারা শরীর ব্যথায় নীল হয়ে আছে।"

জাভিয়ান এবার উঠে দাঁড়াল। সে ধীর পায়ে তান্বীর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল এবং ওর কাঁধে নিজের পাথরের মতো শক্ত হাত দুটো রাখল। তান্বীর কানের কাছে মুখ নামিয়ে সে ফিসফিস করে বলল—"আমি জানি তুমি অসুস্থ। সেজন্যই তোমার জন্য বিশেষ মেডিসিনও আনিয়ে রেখেছি। আর আমি তো আছিই। তোমার শরীরের প্রতিটি ব্যথার যত্ন যেমন আমি নেব, তেমনি তোমার স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখাও এখন আমার দায়িত্ব। কিন্তু আজ রাতে কোনো অজুহাত চলবে না। আমি তোমাকে এমনভাবে নিরাময় করব যে তুমি নিজেই এই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে।"

জাভিয়ানের তপ্ত নিশ্বাস তান্বীর ঘাড়ে আছড়ে পড়তেই সে শিউরে উঠল। চারদিকের হাজারো গোলাপ আর জ্বলন্ত ক্যান্ডেলগুলো এই আসন্ন ঝড়ের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাভিয়ান যখন পরম নিশ্চিন্তে তার পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তান্বীর মস্তিষ্কে এক তীব্র অস্থিরতা কাজ করছে।

তান্বী মুখ নিচু করে খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল—"কিছু একটা তো করতে হবে! এই লোকটার হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই? ও তো আমাকে মেরেই ফেলবে! এই জীবনে আমিই বোধহয় প্রথম নারী, যে তার স্বামীর ভালোবাসার চেয়ে তার আদরকে বেশি ভয় পাচ্ছে।"

তান্বীর মনে পড়ে গেল কাল রাতের সেই বিধ্বংসী স্মৃতি।জাভিয়ানের সেই বন্যতা, সেই অনিয়ন্ত্রিত নেশা যা ওকে চুরমার করে দিয়েছিল। সে ভাবতেও পারেনি এই পাথুরে মানুষটার ভেতরে এমন এক আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে।

তান্বী নিজের অজান্তেই শিউরে উঠে ভাবল— "আগে যদি জানতাম এই লোকটা এতোটা হাঙ্গরি, তবে শত বিপদে পড়লেও কোনোদিন ওর কাছে ধরা দিতাম না। ও আমাকে আগলে রাখছে ঠিকই, কিন্তু সেই আগলে রাখার মাঝেও যে আমাকে তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছে!"

সে আড়চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। জাভিয়ান তখন খুব শান্তভাবে তার গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে, সে জানে তার শিকার আজ কোথাও পালাতে পারবে না। তান্বী বুঝতে পারল, এই সাজানো বাগান, এই দামী ক্যাভিয়ার আর এই মায়াবী আলো—সবই আসলে ওকে পরবর্তী 'ঝড়' এর জন্য চাঙ্গা করার এক নিষ্ঠুর আয়োজন।

জাভিয়ান হঠাৎ তান্বীর থুতনিটা ধরে মুখটা সামান্য ওপরে তুলল। ওর চোখে এক পৈশাচিক সৌন্দর্য। সে ধীর স্বরে বলল, "কী ভাবছো জিন্নীয়া? পালানোর পথ খুঁজছো? এই প্রান্তরে আজ আমি আর তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। তোমার প্রতিটি নিশ্বাস এখন আমার নিয়ন্ত্রণে।"

তান্বী অসহায়ভাবে চোখ বুজল। সে জানে, আজ রাতে এই গোলাপের গালিচায় তার হার মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

জাভিয়ান তান্বীকে কোলে করে নিয়ে গেলো গাড়ির সামনে, কোল থেকে নামিয়ে সেই সাদা রঙের বিলাসবহুল স্পোর্টস কারটির কাছে নিয়ে গেল। গাড়িটির ওপরের অংশ (Convertible) খোলা, যার ভেতরে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে এক নরম বিছানা তৈরি করা হয়েছে। খোলা আকাশের নিচে, হাজারো লাল বেলুনের ছায়ায় আজ রাতে এটাই তাদের বাসর।

জাভিয়ান তান্বীকে খুব সন্তর্পণে গাড়ির ভেতর শুইয়ে দিল। ওর দামী ব্লেজারটা একপাশে সরিয়ে রেখে সে তান্বীর ওপর ঝুঁকে এল। বাতাসের আদ্রতা আর দূরে পাহাড়ের নিস্তব্ধতা সাক্ষী রেখে জাভিয়ান তান্বীর কপালে, গালে এবং সবশেষে ওর কাঁপা ঠোঁটে নিজের অধিকার স্থাপন করল।

তান্বী অনুভব করল জাভিয়ানের স্পর্শে সেই পরিচিত আদিম নেশা। ওর প্রতিটি চুম্বনে এক একটি আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ছে। তান্বী মনে মনে ভাবল, "এভাবে চললে তো আজকেও ও আমাকে শেষ করে দেবে! কালকের ব্যথা এখনো শরীর থেকে যায়নি।"

একপর্যায়ে জাভিয়ানের আলিঙ্গন যখন আরও গাঢ় হলো, তান্বী শরীরটাকে এক নিমেষে শিথিল করে দিল। সে তার চোখের পাতা শক্ত করে বন্ধ করে মাথাটা একপাশে এলিয়ে দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার নাটক করল। আগে জাভিয়ানের ছোঁয়ার তীব্রতায় সে সত্যি সত্যি জ্ঞান হারাত, কিন্তু আজকের এই নিথর হয়ে যাওয়াটা ছিল কেবল তার আত্মরক্ষার এক ব্যর্থ কৌশল।

জাভিয়ান হঠাৎ থেমে গেল। তান্বীর নিস্পন্দ দেহটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর তীক্ষ্ণ চোখকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়। সে তান্বীর নিশ্বাসের গতি আর চোখের পাতার সামান্য কাঁপুনি দেখেই ধরে ফেলল যে জিন্নীয়া তার সাথে ছলনা করছে।

জাভিয়ান জানত, তান্বী ওকে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু আজ এই বিশেষ রাতে তান্বীর এই মেকি অভিনয় জাভিয়ানের পুরুষালী অহংকারে কোথাও গিয়ে আঘাত করল। সে চাইলেই ওকে এই নাটক করার জন্য শাস্তি দিতে পারত, কিন্তু সে কিছুই বলল না।

জাভিয়ান ধীর পায়ে তান্বীর ওপর থেকে সরে এল। সে গাড়ির বডির ওপর এক হাত রেখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ওর চোখে এক অদ্ভুত অভিমান খেলা করছে। যে মানুষটা পুরো শহরকে নিজের পায়ের নিচে রাখে, সে আজ তার প্রিয়তমার সামান্য একটা নাটকের কাছে হেরে গেল।

সে শান্ত গলায় কিন্তু ধরা গলায় বলল, "জেগে ওঠো জিন্নীয়া। আমি জানি তুমি অজ্ঞান হওনি। আমার ভালোবাসা যদি তোমার কাছে এতোটাই আতঙ্কের হয়, তবে আজ রাতে আমি আর তোমাকে ছোঁব না।"

তান্বী চোখ না তুলেও অনুভব করতে পারল জাভিয়ানের কণ্ঠের সেই চাপা কষ্ট। এই ভয়ংকর মানুষটার অভিমান যে কতটা ভারী হতে পারে, তা ভেবে তান্বীর বুকটা ডুকরে উঠল।

.

.

.

ভোরের আলো যখন পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সমতলে এসে পড়ল, তখন চারপাশের লাল বেলুনগুলো শিশিরে ভিজে কিছুটা নুইয়ে পড়েছে। কাল রাতে জাভিয়ান নিজের হাতে তান্বীকে ব্যথানাশক মেডিসিন খাইয়ে দিয়েছিল। সেই ওষুধের কড়া ঘুমে তান্বী গাড়ির ভেতরেই হারিয়ে গিয়েছিল গভীর নিস্তব্ধতায়।

সূর্য যখন পুব আকাশে উঁকি দিল, তান্বীর চোখ মেলতেই শরীরটা একটু হালকা মনে হলো। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। সাদা স্পোর্টস কারের সিটে সে একা শুয়ে আছে, গায়ে জাভিয়ানের সেই দামী ব্লেজারটা জড়ানো। কিন্তু জাভিয়ান পাশে নেই। ড্রাইভিং সিটটা শূন্য। চারপাশটা একদম নিঝুম, কেবল বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।

তান্বীর বুকে হঠাৎ এক অজানা ভয় মোচড় দিয়ে উঠল। কালকের সেই নাটক, জাভিয়ানের সেই চাপা অভিমানী কণ্ঠস্বর সবই ঝাপসা হয়ে মনে পড়ছে। সে কোনোমতে টলমলে পায়ে গাড়ি থেকে নেমে রিসোর্টের ভেতরের দিকে দৌড়ে গেল।

"জাভিয়ান! আপনি কোথায়?"

সে হন্যে হয়ে প্রতিটি রুম খুঁজল। ড্রয়িংরুম, কিচেন এমনকি কাল রাতের সেই ডিনার টেবিলটার কাছেও গেল কিন্তু কোথাও সেই দীর্ঘদেহী মানুষটার দেখা নেই।

তান্বীর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে কি তবে খুব বেশি রাগ করেছে?

অবশেষে হতাশ হয়ে তান্বী বেডরুমের লাগোয়া বিশাল বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নিচে তাকাতেই ওর চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।

নিচে রিসোর্টের নীল জলের সুইমিংপুলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জাভিয়ান। কনকনে ঠান্ডা জল ওর কোমর পর্যন্ত ছুঁয়ে আছে। জাভিয়ানের ঊর্ধ্বাঙ্গ পুরোপুরি খালি গায়ে, পেশিবহুল পিঠে ভোরের আলো পড়ে চিকচিক করছে। তার এক হাতে জ্বলন্ত দামী সিগার, যা থেকে ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

জাভিয়ান নড়ছে না, পাথরের মূর্তির মতো সে সামনের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, আর চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত শূন্যতা। ঠান্ডায় শরীর নীল হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। সে নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে এই বরফশীতল জলে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

বারান্দা থেকে জাভিয়ানকে ওই অবস্থায় দেখে তান্বীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এল। সুইমিংপুলের পাড়ে যখন সে পৌঁছাল, জাভিয়ান একবারের জন্যও ওর দিকে তাকাল না। সে আগের মতোই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সিগার টানছে, যেন তান্বীর অস্তিত্ব ওর কাছে আজ গৌণ।

তান্বী পুলের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে ডাকল, "জাভিয়ান..."

কোনো উত্তর নেই। জাভিয়ান ধোঁয়ার এক দীর্ঘ কুণ্ডলী ছেড়ে পুলের অন্য প্রান্তের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর এই নীরবতা চাবুকের চেয়েও বেশি আঘাত করছে তান্বীকে। সে বুঝতে পারল, কাল রাতের সেই নাটক জাভিয়ানের পুরুষালি অহংকারে কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

তান্বী সাহস সঞ্চয় করে পুলের সিঁড়ি দিয়ে সামান্য নিচে নামল। ঠান্ডা জল ওর পায়ের পাতা ছুঁতেই সে শিউরে উঠল। সে জাভিয়ানের কাছাকাছি গিয়ে ওর পেশিবহুল পিঠে হাত রাখতে গিয়েও থমকে গেল।

"জাভিয়ান, আপনিকি সারা রাত এখানে ছিলেন? শরীর খারাপ করবে তো। প্লিজ, উঠে আসুন।"

জাভিয়ান এবারও কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে—হয়তো অনিদ্রায়, নয়তো অভিমানে। সে তান্বীর চোখের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে পুলের ওপরে উঠে গেল। পানির ফোঁটা ওর শরীর বেয়ে টপ টপ করে পড়ছে। সে চেয়ারের ওপর রাখা সাদা তোয়ালেটা তুলে নিয়ে শরীর মুছতে হাঁটা শুরু করলো এমনভাবে যেনো তান্বী সেখানে নেই-ই।

তান্বী ওর পিছু পিছু এল। ও জাভিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে হাত দুটো ধরে ফেলল। "আম সরি জাভিয়ান। কাল ওটা আমি..."

জাভিয়ান এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তারপর রুমে চলে গেলো।

.

.

.

সারাটা দিন জাভিয়ান যেন এক জ্যান্ত পাথর হয়ে রইল। তান্বী শত চেষ্টা করেও ওর ঠোঁট থেকে একটা শব্দ বের করতে পারেনি। ডিনার টেবিল থেকে শুরু করে বসার ঘর—জাভিয়ান ওকে এমনভাবে এড়িয়ে গেছে যেন তান্বী এই বিশাল রিসোর্টের কোনো অদৃশ্য দেওয়াল। ওর এই নিঃশব্দ অবজ্ঞা তান্বীর ভেতরের ভয়কে জেদে রূপান্তরিত করল।

তান্বী বুঝতে পারল, জাভিয়ান চৌধুরীকে বশ করা সহজ, কিন্তু তার অভিমান ভাঙানো হিমালয় জয়ের চেয়েও কঠিন।

.

.

.

রাত গভীর হয়েছে। আকাশে একফালি চাঁদ উঠেছে, যার আলোয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা জাভিয়ানের অবয়বটা কোনো এক বিষণ্ণ গ্রীক দেবতার মতো লাগছে। ওর হাতে যথারীতি জ্বলন্ত সিগার। তান্বী আর সইতে পারল না। সে ঝড়ের বেগে বারান্দায় এসে জাভিয়ানের মুখোমুখি দাঁড়াল।

"আপনার সমস্যা কী জাভিয়ান? কেন আমাকে এভাবে ইগনোর করছেন?" তান্বীর গলার স্বর রাগে কাঁপছে।

জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে নির্বিকারভাবে সিগারের ধোঁয়া ছাড়ল আকাশের দিকে। ওর এই নির্লিপ্ততা তান্বীর ধৈর্যের শেষ বাঁধটা ভেঙে দিল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল—

"বুঝতে পেরেছি! আসলে সব পুরুষই এক, আপনিও তার ব্যতিক্রম নন। আপনার কাছে আমার কোনো মূল্য নেই, আপনিও কেবল আমার দেহকেই ভালোবাসেন! কাল রাতে দেহ দেইনি বলে, নাটক করে আপনাকে থামিয়েছি বলে এখন আর আমাকে ভালো লাগছে না আপনার? এই কি আপনার ভালোবাসার দৌড়?"

কথাটা শেষ হতেই চারপাশের বাতাস যেন জমে বরফ হয়ে গেল। জাভিয়ান ধীরপায়ে ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখের মণি দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, যেন সেখান থেকে এখনই আগ্নেয়গিরির লাভা বেরিয়ে আসবে। তান্বী বুঝতে পারল সে ভুল করে বাঘের লেজে পা দিয়ে ফেলেছে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

জাভিয়ান এক হ্যাঁচকায় তান্বীর ঘাড় ধরে ওকে বারান্দার পিলারের সাথে চেপে ধরল। ওর হাতের জ্বলন্ত সিগারটা তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে। জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে চরম আক্রোশে বলল, "আমি দেহের পাগল? আমার ভালোবাসাকে তুমি এই সস্তা তকমা দিলে?"

বলতে বলতেই জাভিয়ান চরম উন্মাদনায় হাতের জ্বলন্ত সিগারের আগুনটা তান্বীর ঠোঁটের কোণায় চেপে ধরল। আগুনের তাপে তান্বী যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ানের হাতের চাপে ওর মুখ দিয়ে গোঙানি ছাড়া কিছু বেরোল না। জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর এখন নরকের আগুনের মতো তপ্ত "আমি যদি দেহের পাগল হতাম, তবে তোমাকে ভিলা এস্পেরেন্জার ঘরণী বানিয়ে আনতাম না। টাকা দিয়ে তোমাকে রক্ষিতা হিসেবে কিনে আনতাম! এই শহরের দামী ক্লাবগুলোতে হাজার হাজার মেয়ে আমার এক ইশারায় বিছানায় নগ্ন হওয়ার জন্য লাইন দিয়ে থাকে। আমি যদি দেহের নেশায় থাকতাম, তবে যেদিন তোমাকে তুলে এনে বিয়ে করেছি সেদিন রাতেই তোমাকে রেইপ করতাম! তুমি জ্ঞান হারাতে কি না মরতে,তা দেখার দরকার মনে করতাম না নিজের পুরুষত্ব চালিয়ে যেতাম!"

জাভিয়ান সিগারটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তান্বীর মুখটা আরও জোরে চিপে ধরল। ওর চোখের দৃষ্টিতে তখন এক ভয়ংকর বন্যতা। "আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম জিন্নীয়া,কিন্তু তুমি আজ প্রমাণ করলি, তুমি কেবল আমার ক্রোধেরই যোগ্য। আজ থেকে তবে তাই হবে।"

তান্বী থরথর করে কাঁপছে। জাভিয়ানের চোখে যে আগুন সে আজ দেখল, তা কাল রাতের চেয়েও হাজার গুণ বেশি বিধ্বংসী। সে বুঝতে পারল, নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে গিয়ে সে আজ জাভিয়ানের ভেতরের আসল দানবটাকে জাগিয়ে তুলেছে।

বারান্দার সেই দমবন্ধ করা পরিবেশে জাভিয়ানের রুদ্রমূর্তি দেখে তান্বী পাথর হয়ে গিয়েছিল। ওর ঠোঁটের এক কোণ জাভিয়ানের সিগারেটের আগুনের তাপে পুড়ে লাল হয়ে গেছে। তীব্র যন্ত্রণায় চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, কথা বলা তো দূর—নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে ওর। তবুও সেই ব্যথার মাঝেই তান্বী অস্ফুট স্বরে, ভাঙা গলায় কোনোমতে বলে উঠল

"তাহলে... তাহলে কেন আমাকে ইগনোর করছেন? কেন কথা বলছেন না?"

তান্বীর এই অসহায় প্রশ্নে জাভিয়ানের চোয়াল সামান্য শিথিল হলো, কিন্তু চোখের সেই বিধ্বংসী আগুন নিভল না। সে তান্বীর চিবুকটা আরও জোরে চেপে ধরে ওকে নিজের চোখের একদম কাছে টেনে আনল।

জাভিয়ানের গলার স্বর এখন ভাঙা, কিন্তু তাতে এক আকাশ সমান আক্ষেপ মিশে আছে। "তুমি আমাকে ভয় পাও জিন্নীয়া? আমি এটা মেনে নিতে পারছি না! পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ জাভিয়ান চৌধুরীকে যমের মতো ভয় পাবে, সেটা আমার কাছে গর্বের। কিন্তু আমার ভালোবাসা, আমার ছোঁয়া তোমার কাছে কেবলই আতঙ্কের নাম এটা আমি নিতে পারছি না!"

জাভিয়ান ওর কপাল তান্বীর কপালে ঠেকিয়ে রুদ্ধকণ্ঠে বলতে লাগল "পুরো দুনিয়া আমাকে ভয় পেলেও আমি তোমার ওই হিরন্ময়ী চোখে আমার জন্য এক বিন্দু আতঙ্ক দেখতে চাই না। আমি চাই ওই চোখে শুধু আমার জন্য ভালোবাসা থাকবে, আমাকে চরমভাবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকবে। কিন্তু তুমি? তুমি আমার আদর থেকে বাঁচতে অজ্ঞান হওয়ার নাটক করলে? তুমি কি জানো এটা আমার পৌরুষে কতটা বড় আঘাত?"

জাভিয়ানের তপ্ত নিশ্বাস তান্বীর দগ্ধ ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে। সে আরো যন্ত্রণায় আর অভিমানে নীল হয়ে যাচ্ছে।

জাভিয়ান আবার বলল "আমি চাই তুমি আমাকে দেখে শিউরে উঠবে ঠিকই, কিন্তু ভয়ে নয় তীব্র আকুলতায়। আমার জন্য ওই চোখে শুধু তৃষ্ণা দেখতে চাই আমি। অথচ তুমি আমাকে একটা দানব বানিয়ে দিলে জিন্নীয়া। কাল রাতের পর আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার মনের ভাষা পড়বে, কিন্তু তুমি তো আমাকে কেবল দেহের পাগল ভাবলে!"

জাভিয়ানের সেই হাহাকার মেশানো কথাগুলো তান্বীর হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। সে বুঝতে পারল, এই ভয়ংকর মানুষটার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভীষণ একাকী ছেলে। তান্বী যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা অবস্থাতেই ওর হাত দুটো জাভিয়ানের প্রশস্ত বুকে রাখল। ভেজা চোখে, ধরা গলায় বলল—"সরি... আর কখনো এমন হবে না জাভিয়ান। আমি বুঝতে পারিনি..."

'সরি' শব্দটা কানে যেতেই জাভিয়ানের ভেতরের সেই রুদ্রমূর্তি মুহূর্তেই বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ল। ওর শক্ত হাত দুটো আলগা হয়ে এল। যখন ওর নজর গেল তান্বীর সেই লাল হয়ে যাওয়া দগ্ধ ঠোঁটটার দিকে, জাভিয়ানের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। নিজের ওপর এক তীব্র ঘৃণা জেঁকে বসল ওর। রাগের মাথায় ও কী করে ফেলল এটা? নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এই জানোয়ারটাকে ও নিজেও ঘৃণা করে।

জাভিয়ান আসলে ভালোবাসার কাঙাল। ছোটবেলা থেকে অনেক আভিজাত্য দেখেছে, কিন্তু বাবা-মায়ের স্নেহ পায়নি। মেধাবী ছাত্র হিসেবে সবসময় সবার উপরে থাকলেও ওর কোনো 'বেস্ট ফ্রেন্ড' ছিল না। যে বয়সে ছেলেরা প্রেমে পড়ে, জাভিয়ান তখন নিজের সাম্রাজ্য গড়তে ব্যস্ত ছিল। কোনো নারীর সান্নিধ্যে সে কোনোদিন আসেনি, শরীর আর মনের এই আদিম টান তার কাছে একদম নতুন। তাই তো তান্বীর প্রতি ওর এই টানটা অনেকটা নেশার মতো, যা ও সামলাতে পারছে না।

জাভিয়ান কাঁপাকাঁপা আঙুলে তান্বীর পুড়ে যাওয়া ঠোঁটটা স্পর্শ করল।সে ফিসফিস করে বলল—

"কেন তুমি আমাকে এতোটা রাগিয়ে দাও জিন্নীয়া? আমি তো তোমাকে ব্যথা দিতে চাইনি। এই হাত দুটো দিয়ে আমি সারা জীবন শুধু তোমাকে আগলে রাখতে চাই, অথচ আজ এই হাত দিয়েই তোমাকে পুড়িয়ে দিলাম!"

জাভিয়ান পরম মমতায় তান্বীকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। ওর চিবুক তান্বীর মাথার ওপর রেখে সে অপরাধবোধে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। যে মানুষটা কোনোদিন কারো কাছে মাথা নত করেনি, সে আজ নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে হেরে যাচ্ছে।

সে তান্বীর কানের কাছে মুখ নিয়ে করুণ সুরে বলল, "ছোটবেলা থেকে কেউ আমাকে ভালোবাসেনি জিন্নীয়া। আমি জানি না কীভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়। আমার কাছে অধিকার মানেই শাসন, আর শাসন মানেই বন্যতা। আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে পাগল হয়ে যাই, তাই হয়তো মাঝেমধ্যে দানব হয়ে উঠি। আমাকে ক্ষমা করে দাও।"

তান্বী অনুভব করল জাভিয়ানের শরীরের কম্পন। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা যতটা না ভয়ংকর, তার চেয়ে অনেক বেশি অসহায়। সে জাভিয়ানের পিঠ জড়িয়ে ধরে ওকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। আজকের এই দগ্ধ ঠোঁটের যন্ত্রণা জাভিয়ানের এই নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল।

যে মানুষটা এক ইশারায় শহর তছনছ করে দিতে পারে, সে আজ তান্বীর ওই এক চিমটি পোড়া দাগ দেখে দিশেহারা। সে দ্রুত তান্বীকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ঘরের ভেতরে বিছানায় বসাল। ওর হাত দুটো তখনো কাঁপছে।

সে আলমারি থেকে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে আনল। বিছানায় তান্বীর খুব কাছে বসে সে একটা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম আর কটন বাড বের করল। ওর চোখের সেই বন্যতা এখন এক অদ্ভুত শান্ত আর করুণ দৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

জাভিয়ান অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, যেন ফুলের পাপড়িতে ছোঁয়া দিচ্ছে এমনভাবে তান্বীর দগ্ধ ঠোঁটে মলমটা লাগাতে শুরু করল। মলমের ছোঁয়ায় তান্বী খানিকটা শিউরে উঠতেই জাভিয়ান মুখ নামিয়ে সেখানে আলতো করে ফুঁ দিতে লাগল। ওর তপ্ত নিশ্বাস তান্বীর ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে, তবে এবার সেখানে কোনো দাহ নেই, আছে প্রশান্তি।

সে তান্বীর হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে চুমু খেল। জাভিয়ানের চোখে তখন অদ্ভুত এক অসহায়ত্ব। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল "মাঝে মাঝে মনে হয় তোমাকে ছেড়ে দিই, তুমি মুক্তি পাও এই নরক থেকে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় তোমাকে ছাড়া এই জাভিয়ান চৌধুরী তো এক মুহূর্তও বাঁচবে না। তুমিই তো আমার অন্ধকার জীবনের একমাত্র আলো।"

তান্বী অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে দেখতে পেল, এই ভয়ংকর কোনো জাভিয়ান নয় তার সামনে আজ কেবল এক তৃষ্ণার্ত, নিঃস্ব প্রেমিক বসে আছে। তান্বী নিজের হাত বাড়িয়ে জাভিয়ানের গালটা স্পর্শ করল। পুড়ে যাওয়া ঠোঁটে মলমের চেয়েও জাভিয়ানের এই আর্তি তাকে বেশি সুস্থ করে তুলছে।

সে খুব আস্তে করে বলল, "আমাকে মুক্তি দেবেন না জাভিয়ান। আপনার এই অবাধ্য ভালোবাসার মধ্যেই আমি বন্দি থাকতে চাই। শুধু মাঝে মাঝে একটু নরম হবেন, এইটুকুই চাওয়া।"

জাভিয়ান যখন পরম মমতায় তখনও তান্বীর ঠোঁটে মলম লাগিয়ে দিচ্ছিল, তখন আশেপাশে সাজানো লাল গোলাপের তীব্র ঘ্রাণে তান্বীর নাকে অস্বস্তি হচ্ছিল। সে নাক কুঁচকে মৃদু স্বরে বলেছিল "জাভিয়ান, ওই লাল গোলাপগুলো সরিয়ে দিন। ওগুলোতে আমার ভীষণ অ্যালার্জি, আর সত্যি বলতে লাল রঙের চেয়ে আমার কাছে 'কালো গোলাপ' অনেক বেশি প্রিয়। ওটা রহস্যময়, ঠিক আপনার মতোই।"

জাভিয়ান তখন কোনো উত্তর দেয়নি, শুধু তান্বীর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। সে মনে মনে অবাক হয়েছিল যে তার মতো অন্ধকার জগতের মানুষের সাথে তান্বী কালো গোলাপের মিল খুঁজে পায়।

জাভিয়ান কিছু বললো না তার পুরো মনোযোগ এখন কেবল তান্বীর ওই ছোট্ট ক্ষতটার দিকে। জাভিয়ান যখন এতটা কাছে থাকে, তখন ওর চারপাশ থেকে দামী পারফিউম আর সিগারের একটা মিশ্র উগ্র কিন্তু নেশাতুর ঘ্রাণ পাওয়া যায়। তান্বী যন্ত্রণার কথা ভুলে গিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জাভিয়ানের মুখের দিকে।

এই মুখটা সে কতবার দেখেছে! কখনো ভয়ে, কখনো বিস্ময়ে। কিন্তু আজ এই নরম আলোয় জাভিয়ানের মুখটা তান্বীর কাছে এক রহস্যময় উপন্যাসের মতো মনে হলো। জাভিয়ানের চেহারায় কয়েকটা তিল আছে, যা তান্বীর ভীষণ পছন্দের। সে মনে মনে জাভিয়ানের তিলগুলোর মানচিত্র আঁকতে লাগল

প্রথমটি ওর ডান চোখের পাতার ঠিক ওপরে, যা চোখ বন্ধ করলে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করে। দ্বিতীয়টি ওর নাকের ঠিক ডান পাশে, যা ওর তীক্ষ্ণ নাকটাকে আরও ব্যক্তিত্বময় করে তোলে। আর সবশেষে, ওর ঠোঁটের ঠিক ডান পাশের কোণায় থাকা সেই ছোট্ট তিলটি, যা জাভিয়ান হাসলে বা বাঁকা কথা বললে এক অদ্ভুত আবেদনের সৃষ্টি করে।

তান্বী নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে জাভিয়ানের নাকের পাশের তিলটি ছুঁতে গেল। জাভিয়ান থমকে গেল। সে মলম লাগানো থামিয়ে তান্বীর চোখের দিকে তাকাল। ওর সেই বাদামী চোখের মণি এখন অনেক শান্ত।

সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "কী দেখছো জিন্নীয়া?"

তান্বী লজ্জিত হয়ে হাত সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ান ওর কবজিটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তান্বী নিচু স্বরে বলল, "আপনার এই তিলগুলো... আমার খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে ঠোঁটের পাশের এই তিলটা।"

জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল, যার কথা তান্বী কেবল ভাবছিল। সে তান্বীর হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে গিয়ে সেই তিলটার ওপর তান্বীর আঙুলটা চেপে ধরল।

জাভিয়ান গভীর গলায় বলল, "আমার শরীরের প্রতিটি অংশ এখন তোমার মালিকানাধীন জিন্নীয়া। এই তিল থেকে শুরু করে আমার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন—সবই তোমার নামে লিখে দিয়েছি। এখন তুমিই বলো, তোমার এই মালিককে তুমি কীভাবে শাসন করবে?"

তান্বীর সারা শরীরে এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। জাভিয়ানের এই শান্ত রূপটা ওর বন্য রূপের চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক, কারণ এটা সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করে। জাভিয়ানের সেই নেশাতুর কথাগুলো তান্বীর হৃদয়ে এক অদ্ভুত সাহসের জন্ম দিল। সে আজ আর ভয় পেতে চায় না, পালাতে চায় না। জাভিয়ানের এই অসহায় আত্মসমর্পণ তাকে আজ এক অন্যরকম অধিকারবোধে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তান্বী খুব ধীরে ধীরে নিজের মুখটা জাভিয়ানের মুখের আরও কাছে নিয়ে গেল।

জাভিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি এই মেয়েটি, যে কয়েক মুহূর্ত আগে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, সে আজ নিজে থেকে তার এত কাছে আসবে।

তান্বী প্রথমে তার কম্পিত ঠোঁটজোড়া জাভিয়ানের ডান চোখের পাতার সেই ছোট্ট তিলটির ওপর রাখল। এক অতি সূক্ষ্ম আর পবিত্র ছোঁয়া। জাভিয়ান নিজের অজান্তেই চোখ দুটো বুজে ফেলল। তার সারা শরীরে এক আশ্চর্য শীতল স্রোত বয়ে গেল। যে জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীকে পুরো শহর যমের মতো ভয় পায়, সে আজ তান্বীর এক সামান্য চুম্বনের কাছে একদম নিথর হয়ে গেছে।

এরপর তান্বী তার ঠোঁট সরিয়ে আনল জাভিয়ানের নাকের ডান পাশে থাকা সেই তিলটিতে। সেখানে খুব আলতো করে নিজের ভালোবাসা এঁকে দিল সে। জাভিয়ানের নিশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে। তার বুকের ধুকপুকানি তখন তান্বীর হাতের তালুতে স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে।

সবশেষে তান্বী থামল জাভিয়ানের ঠোঁটের ঠিক ডান পাশের কোণায় থাকা সেই তিলটির ওপর। যেখানে জাভিয়ানের সেই উদ্ধত অহংকার আর বন্যতা লুকিয়ে থাকে। তান্বী সেখানে দীর্ঘক্ষণ নিজের ঠোঁট চেপে ধরে রাখল। এই চুম্বনে কোনো ভয় ছিল না, ছিল না কোনো নাটক ছিল কেবল এক নিঃস্বার্থ সমর্পণ।

জাভিয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক ঝটকায় তান্বীর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। তার চোখ দুটো এখন আর লাল নয়, বরং এক গভীর মায়ায় টলমল করছে। সে ধরা গলায় বলল, "তুমি কি জানো জিন্নীয়া? এই সামান্য চুমুগুলো আমার কাছে পৃথিবীর সমস্ত সাম্রাজ্যের চেয়েও দামি।"

তান্বী জাভিয়ানের বুকে মাথা রেখে চোখ বুজল। পুড়ে যাওয়া ঠোঁটের যন্ত্রণা এই মুহূর্তে এক স্বর্গীয় সুখে পরিণত হয়েছে। কাল রাতের সেই অপূর্ণতা আজ এই রাতে, এক টুকরো মলম আর কয়েকটা তিলের ওপর আঁকা চুম্বনের মাধ্যমে পূর্ণতা পেতে চাইলো।

জাভিয়ানের শরীরের উষ্ণতা আর তার গায়ের উগ্র পারফিউমের ঘ্রাণে তান্বীর জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা। জাভিয়ান এবার খুব ধীরে ধীরে তান্বীর গলার কাছে মুখ নামিয়ে নিল। তার তপ্ত নিশ্বাস তান্বীর সংবেদনশীল ত্বকে আছড়ে পড়তেই তান্বী মৃদু আর্তনাদ করে জাভিয়ানের শার্টের কলারটা খামচে ধরল।

জাভিয়ান তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল তান্বীর ঘাড়ের বাঁ পাশে। সেখানে এক গভীর ও তৃষ্ণার্ত চুমু এঁকে দিতে দিতে সে আরও নিচে নেমে এল। তার প্রতিটি ছোঁয়ায় ছিল এক উন্মাদনা, যা এতোক্ষণ সে নিজের অবদমিত রাগের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল। তান্বীর সারা শরীরে এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। তার নিশ্বাসের গতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে, জাভিয়ানের এই হুট করে জেগে ওঠা বন্যতায় সে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে।

জাভিয়ান এবার তান্বীর কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আজ থেকে তোমার সব ভয় আমার, আর তোমার প্রতিটা অনুভূতি শুধুই আমার জিন্নীয়া।"

তান্বীর সারা শরীর কাঁপছে। জাভিয়ানের হাত দুটো এখন ওর পিঠের ওপর দিয়ে বিচরণ করছে। এই প্রথম তান্বী অনুভব করল, জাভিয়ানের ভালোবাসা শুধু শাসনের নয়, তা এক তীব্র দহনের মতো যা এক নিমিষেই তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে।

জাভিয়ান যত বেশি তান্বীর গলার কাছে নিজের অধিকার দাবি করছিল, তান্বী তত বেশি তার বাহুডোরে মিশে যাচ্ছিল। দীর্ঘক্ষণের জমানো তৃষ্ণা যেন বাঁধ ভেঙেছে।

জাভিয়ানের প্রতিটি স্পর্শে ছিল এক তীব্র দহন, যা তান্বীর শরীরের শিরায় শিরায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু ঠিক যখন উত্তেজনার পারদ চরমে, যখন জাভিয়ানের ঠোঁট তান্বীর ঠোঁটের খুব কাছাকাছি—ঠিক তখনই সে হঠাৎ স্থবির হয়ে গেল।

জাভিয়ানের নজর গেল তান্বীর সেই ছোট্ট ক্ষতটার দিকে। তার হাতের সিগারেটে পুড়ে যাওয়া সেই রাঙা ঠোঁটটার এক কোণ এখন ফুলে লাল হয়ে আছে। মলম লাগানো থাকলেও কালচে ছোপটা স্পষ্ট। জাভিয়ানের মস্তিস্কে এক মুহূর্তের জন্য সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল যখন সে রাগের মাথায় এই পবিত্র মুখে আগুন চেপে ধরেছিল।

এক তীব্র ঘৃণা আর অপরাধবোধে জাভিয়ান নিজেকে এক ঝটকায় সরিয়ে নিল। তার ভারী নিশ্বাসগুলো এখনো তান্বীর মুখে আছড়ে পড়ছে, কিন্তু তার চোখ দুটো এখন আর তৃষ্ণার্ত নয় সেখানে এখন কেবল অনুশোচনা।

তান্বী তখনো ঘোরের মধ্যে। সে আধা-বোজা চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। তার সারা শরীর তখনো কাঁপছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, "জাভিয়ান..."

জাভিয়ান তার কপাল তান্বীর কপালে ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার দুহাত তান্বীর গাল আগলে রাখল খুব সাবধানে, যেন এই মুখে আর একটুও ব্যথা না লাগে। সে ফিসফিস করে বলল—"আমি তোমাকে পুড়িয়েছি জিন্নীয়া। এই ঠোঁটজোড়া আজ আমার কাছে নিষিদ্ধ।"

জাভিয়ান বিছানা থেকে নেমে গিয়ে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। তান্বী বিছানায় শুয়ে অবাক হয়ে দেখল এই মানুষটাকে। যে মানুষটা এক মুহূর্ত আগে বন্য হয়ে উঠেছিল, সে কেবল তান্বীর সামান্য ব্যথার কথা ভেবে নিজের চরম হর্নি অবস্থা থেকেও নিজেকে টেনে সরিয়ে নিল।

.

.

.

সকালবেলা। রিসোর্টের জানালা দিয়ে আসা রোদের মিষ্টি আভা তান্বীর চোখে পড়তেই তার ঘুম ভেঙে গেল। পরশু রাতের সেই ভয়ংকর ঝড় আর তারপর কাল রাতের জাভিয়ানের সেই আবেগপ্রবণ আত্মসমর্পণের কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।

তবে তান্বীর সবচেয়ে বড় অবাক হওয়া বাকি ছিল। সে দেখল জাভিয়ান ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখছে। ওর পরনে একটা ধবধবে সাদা শার্ট, কিন্তু সেই শার্টের নকশা দেখে তান্বীর চোখের পলক পড়ছিল না। শার্টের বুকের দুপাশে চমৎকারভাবে কালো সুতো দিয়ে কালো গোলাপের কাজ করা।

তান্বী বিছানা ছেড়ে উঠে ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। জাভিয়ান আয়নায় তান্বীর প্রতিফলন দেখে মৃদু হাসল।

"কেমন লাগছে জিন্নীয়া?" জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর আজ অনেক বেশি শান্ত।

তান্বী অবাক হয়ে বলল, "আমি তো কাল রাতে আপনাকে শুধু একবার বলেছিলাম যে আমার লাল গোলাপে এলার্জি আর আমার কালো গোলাপ ভিষণ প্রিয়!"

জাভিয়ান ঘুরে দাঁড়িয়ে তান্বীর দুকাঁধে হাত রাখল। "আমি তোমাকে ভালোবাসি জিন্নীয়া। আর জাভিয়ান চৌধুরী যাকে ভালোবাসে, তার প্রতিটা কথা সে হৃদপিণ্ডে গেঁথে রাখে। কাল রাতে তোমার ওই যন্ত্রণার মাঝেও তুমি যখন তোমার পছন্দের কথা বলেছিলে, আমি তখনই আমার ডিজাইনারকে বলে এই কাস্টোমাইজড শার্টটা রেডি করিয়েছি। রাতারাতি এটা শহর দিক থেকে আনিয়েছি।"

তান্বী শার্টের সেই কালো গোলাপের বুননগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। তার মনে পড়ল, কাল রাতে ডিনার টেবিলের পাশে সাজানো লাল গোলাপের তোড়া দেখে সে একবার হাঁচি দিয়েছিল আর রাতে একবার বলেছিলো তার করো গোলাপ পছন্দের। জাভিয়ান যে এত দ্রুত সেই বিরক্তিকে ভালোবাসায় বদলে দেবে, তা সে ভাবতেও পারেনি।

"আপনি সত্যিই পাগল জাভিয়ান," তান্বী নিচু স্বরে বলল।

"হ্যাঁ, তোমার জন্য পাগল।" জাভিয়ান তান্বীর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। "আজ থেকে তোমার যা কিছু অপছন্দ, তা জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর জীবন থেকেও ডিলিট হয়ে যাবে। আর তোমার যা পছন্দ, তা আমি আকাশ থেকে হলেও ছিঁড়ে আনব।"

চলবে........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন