উপন্যাস: স্মৃতির আড়ালে তুমি
*লেখক: ছামি
ইনায়ার জ্ঞান ফিরেছে তিনদিন পর। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে চোখ খুলতেই সে দেখলো তার হাত ধরে একটা ছেলে বসে আছে। ছেলেটার চোখ লাল, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চুল এলোমেলো। ইনায়া ছেলেটাকে চেনে না।
ছেলেটা ইনায়ার চোখ খোলা দেখে চিৎকার করে উঠলো, "ডাক্তার! ডাক্তার প্লিজ আসুন!"
ডাক্তার, নার্স আর ইনায়ার মা-বাবা দৌড়ে এলো।
ইনায়া ভয় পেয়ে বললো, "আম্মু, এই ছেলেটা কে? আমার হাত ধরছে কেন?"
পুরো কেবিন স্তব্ধ হয়ে গেল।
যে ছেলেটা হাত ধরে ছিল, তার নাম অয়ন। ইনায়ার ভালোবাসার মানুষ। গত দুই বছরের প্রেম, তাদের এনগেজমেন্ট হয়েছে ছয় মাস আগে। আর ইনায়া তাকে বলছে "কে?"
ডাক্তার চেকআপ করে বাইরে ডেকে বললেন, "ওর মাথায় আঘাতটা গুরুতর ছিল। Retrograde Amnesia হয়েছে। ওর জীবনের শেষ দুই বছরের কোনো স্মৃতি নেই। ও এখন মনে করছে ও ক্লাস টেনে পড়ে।"
অয়নের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। গত দুই বছর মানে? তাদের প্রথম দেখা, প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা, প্রথম ভালোবাসি বলা, ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস, অয়নের দেওয়া প্রথম বেলী ফুলের মালা - সব ভুলে গেছে ইনায়া?
বাসায় আনার পর ইনায়ার সবকিছু অচেনা লাগতে শুরু করলো। তার রুম ভর্তি অয়নের ছবি। তার ফোনের ওয়ালপেপারে অয়ন। তার ডায়েরির প্রতি পাতায় অয়ন।
ইনায়া বিরক্ত হয়ে মাকে বললো, "আম্মু এই ছেলেটার ছবি আমার রুমে কেন? সরিয়ে ফেলো। আমার অস্বস্তি লাগছে।"
মা কাঁদতে কাঁদতে বললো, "ও অয়ন, মা। তোর অয়ন।"
"আমার অয়ন মানে?"
"তুই ওকে ছাড়া কিছু বুঝতি না।"
অয়ন প্রতিদিন আসতো। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতো। ইনায়া দেখলে ভয় পেত বলে ভিতরে ঢুকতো না। একদিন ইনায়া বারান্দা থেকে দেখলো, অয়ন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট। বৃষ্টি পড়ছে, অয়ন ভিজছে।
ইনায়ার কেন যেন খুব কষ্ট হলো। সে নিচে নেমে গেল।
"এই যে, আপনি এখানে ভিজছেন কেন?"
অয়ন তাড়াতাড়ি প্যাকেটটা লুকিয়ে ফেললো, "না, এমনি। তুমি নিচে এলে কেন? যাও, ঠান্ডা লাগবে।"
"আপনি প্রতিদিন এখানে আসেন কেন?"
অয়ন হেসে বললো, "আগে একজনের জন্য আসতাম, সে এখন আমাকে চেনে না। তাই দূর থেকে দেখে চলে যাই।"
ইনায়া প্যাকেটটা দেখে ফেললো, "ওটাতে কি?"
অয়ন প্যাকেটটা এগিয়ে দিলো। ভিতরে দুটো বেলী ফুলের মালা।
ইনায়ার বুকটা ধক করে উঠলো। এই গন্ধটা তার খুব চেনা লাগছে। খুব আপন।
"এই ফুল... আমি কোথায় যেন পেয়েছি..."
"মনে করার চেষ্টা করো না, মাথায় চাপ লাগবে।" অয়ন চলে যেতে লাগলো।
সেদিন রাতে ইনায়া তার ডায়েরিটা খুললো। শেষ পাতায় লেখা ছিল,
"যদি কখনো আমাকে ভুলে যাস, তাহলে আমাদের নদীর পাড়ে যাস। যেখানে তোকে প্রথম ভালোবাসি বলেছিলাম। আমি সেখানেই থাকবো।"
নদীর পাড়? কোন নদী?
ইনায়া তার বান্ধবী মারিয়াকে ফোন দিলো। মারিয়া সব শুনে কাঁদতে কাঁদতে বললো, "দোস্ত, তুই অয়ন ভাইয়াকে ভুলে গেছিস? তোরা তো সামনের মাসে বিয়ে করার কথা ছিল। তোরা তো..."
মারিয়া তাকে লোকেশন পাঠালো - শীতলক্ষ্যার পাড়, বটতলা।
পরদিন বিকেলে ইনায়া কাউকে না বলে সেখানে গেল। গিয়ে দেখে, অয়ন সেখানেই বসে আছে। সেই বটগাছের নিচে। খালি গায়ে না, কিন্তু চোখে সেই একই অপেক্ষা।
অয়ন ইনায়াকে দেখে উঠে দাঁড়ালো, "তুমি এখানে?"
ইনায়া বললো, "আমি আপনাকে চিনি না। সত্যি চিনি না। কিন্তু এই জায়গাটা, এই ফুলের গন্ধ, আপনার চোখ - সবকিছু আমার খুব চেনা লাগছে। কেন? আমি কেন আপনাকে ভুলতে পারছি না? স্মৃতিতে নেই, কিন্তু মনে হচ্ছে আপনি আমার ভিতরেই আছেন।"
অয়ন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। সে ইনায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
"কারণ তুই আমাকে স্মৃতিতে রাখিসনি, আত্মায় রেখেছিস। স্মৃতি হারিয়ে যায়, আত্মা হারায় না। তুই শুধু আমারই। স্মৃতির আড়ালে থাকলেও তুই আমারই।"
ইনায়ার মাথায় প্রচন্ড ব্যথা শুরু হলো। আবছা আবছা কিছু ছবি ভাসছে - বৃষ্টি, একটা নীল ছাতা, দুজন ভিজছে, অয়ন বলছে, "ভালোবাসি পাগলি", ইনায়া লজ্জা পাচ্ছে...
"অয়ন..." ইনায়া ফিসফিস করে বললো।
অয়ন চমকে উঠলো, "তুই আমার নাম... মনে পড়েছে?"
ইনায়া অজ্ঞান হয়ে অয়নের বুকে পড়ে গেল।
যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন সে হাসপাতালে। চোখ খুলে দেখলো অয়ন তার হাত ধরে আছে।
এবার ইনায়া হাত সরালো না। দুর্বল হাতে অয়নের গাল ছুঁয়ে বললো,
"আমি আবার তোমাকে ভুলে যাইনি তো অয়ন?"
অয়ন কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেললো। এই কান্না সুখের।
"না পাগলি, তুই মনে করেছিস। তুই ফিরে এসেছিস।"
ইনায়া বললো, "স্মৃতির আড়ালে গিয়েছিলাম, হারিয়ে যাইনি। তুমি ঠিকই বলেছিলে, তোমাকে ভোলা যায় না।হাসপাতালের দ্বিতীয়বার জ্ঞান ফেরার পর ইনায়া আর অয়নকে ছাড়ছিল না।
ডাক্তার বললেন, "এটা ভালো লক্ষণ। ব্রেইন নিজে নিজে স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এখন ওকে পুরোনো জায়গা, পুরোনো জিনিস দেখালে তাড়াতাড়ি মনে পড়বে। কিন্তু জোর করা যাবে না।"
অয়ন সেই দিন থেকে নতুন মিশনে নামলো। ইনায়ার স্মৃতি ফিরিয়ে আনার মিশন।
পরদিন সকালে অয়ন একটা পুরোনো বক্স নিয়ে এলো। বক্স ভর্তি তাদের দুজনের জিনিস।
"এটা কি?" ইনায়া জিজ্ঞেস করলো।
"আমাদের টাইম মেশিন।"
বক্সের ভিতর থেকে প্রথমে বের হলো একটা নীল ছাতা। ছাতাটা অর্ধেক ভাঙা।
ইনায়া ছাতাটা হাতে নিতেই তার মাথায় কারেন্টের মতো কিছু একটা হলো।
মনে পড়লো...
বৃষ্টি পড়ছে। ইউনিভার্সিটির সামনে। ইনায়ার ক্লাস শেষ, ছাতা নেই। একটা ছেলে এসে বলছে, "এই পাগলি, ভিজছিস কেন? আয় আমার ছাতায়।"
ইনায়া বলেছিল, "আপনি কে? আমি আপনার ছাতায় যাব কেন?"
ছেলেটা বলেছিল, "আমি অয়ন। তোকে আজ থেকে আমার ছাতায় ভিজতে হবে, সারাজীবন।"
ইনায়া ছাতাটা বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো, "অয়ন, এই ছাতাটা... এই ছাতাটা আমাদের না?"
অয়ন হেসে ফেললো, "মনে পড়েছে?"
"আবছা আবছা..."
অয়ন এরপর বের করলো একটা শুকিয়ে যাওয়া বেলী ফুলের মালা।
"এটা তোকে প্রথমবার দিয়েছিলাম। তুই বলেছিলি, বেলী ফুল নাকি বিধবাদের ফুল। আমি বলেছিলাম, তোকে বিধবা হলেও আমার বউ লাগবে।"
ইনায়া লজ্জা পেয়ে বললো, "আমি এমন বলেছিলাম? ছি!"
"হ্যাঁ, তুই এমনই ছিলি। ঝগড়াটে।"
এভাবে প্রতিদিন একটা একটা করে জিনিস। একটা চিরকুট যেখানে ইনায়া লিখেছিল "অয়ন একটা গাধা", একটা টিকিট তাদের প্রথম সিনেমা দেখার, একটা ছোট্ট আংটি যেটা অয়ন তাকে রাস্তার পাশ থেকে কিনে দিয়েছিল, কিন্তু ইনায়া সেটাকেই হীরার আংটির চেয়েও যত্নে রেখেছিল।
ইনায়ার মা একদিন অয়নকে আড়ালে ডেকে বললো, "বাবা, তুই ওকে এত কষ্ট করে মনে করাচ্ছিস কেন? ও যদি আর কোনোদিন মনে না করে? যদি ও তোকে আর ভালো না বাসে?"
অয়ন বললো, "আন্টি, ও আমাকে ভালো না বাসলেও আমি ওকে ভালোবাসবো। ওর স্মৃতিতে আমি না থাকলেও, আমার স্মৃতিতে ও সারাজীবন থাকবে। এটাই তো ভালোবাসা।"
এই কথাটা পেছন থেকে ইনায়া শুনে ফেললো।
রাতে ইনায়া অয়নকে মেসেজ দিলো। জীবনে প্রথমবার, স্মৃতি হারানোর পর নিজে থেকে।
"ঘুমিয়েছো?"
অয়ন সাথে সাথে রিপ্লাই, "না, তোর মেসেজের জন্যই জেগে ছিলাম দুই বছর ধরে।"
"একটা কথা বলি? আমার না সব মনে না পড়লেও একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি। তোমাকে আমার লাগবে। স্মৃতি ছাড়াই লাগবে।"
পরদিন অয়ন ইনায়াকে নিয়ে গেল সেই বটতলায় না, এবার নিয়ে গেল কাজী অফিসে না, একটা খোলা মাঠে। যেখানে তারা প্রথম ঘুড়ি উড়িয়েছিল।
ইনায়া বললো, "আমরা এখানে এসেছিলাম?"
অয়ন বললো, "হ্যাঁ। তুই ঘুড়ি উড়াতে পারতি না, আমি তোকে পেছন থেকে ধরে শিখিয়েছিলাম। তুই বলেছিলি, আমাকে এভাবে ধরে রেখো, যাতে আমি উড়ে না যাই।"
ইনায়া চোখ বন্ধ করলো। বাতাসে তার চুল উড়ছে। তার মনে হচ্ছে কেউ তাকে পেছন থেকে ধরে আছে। খুব আপন কেউ।
সে পেছনে ঘুরে অয়নকে জড়িয়ে ধরলো।
"অয়ন, আমার সব মনে পড়ছে না। কিন্তু তোমার বুকে মাথা রাখলে মনে হয় আমি বাড়ি ফিরে এসেছি। এটাই কি ভালোবাসা?"
অয়ন বললো, "হ্যাঁ পাগলি, এটাই ভালোবাসা। স্মৃতির আড়ালে থেকেও তুই আমাকে চিনে ফেললি।"
সেদিন সন্ধ্যায় ইনায়ার সব মনে পড়ে গেল। হঠাৎ করেই। মাথায় প্রচন্ড ব্যথা, তারপর সব পরিষ্কার।
সে চিৎকার করে বললো, "অয়ন! আমাদের বিয়ের কার্ড! আমাদের বিয়ের কার্ড ছাপাতে দিয়েছিলাম! ওটা কোথায়?"
অয়ন দৌড়ে এসে বললো, "ইনায়া?"
ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে বললো, "আমি ভুলে গিয়েছিলাম তোমাকে... আমি এত খারাপ... তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তোমাকে কত কষ্ট দিয়েছি।"
অয়ন তাকে কোলে তুলে নিলো, "তুই ফিরে এসেছিস, এটাই সবচেয়ে বড়। আর কিছু লাগবে না।"
ইনায়া ফিসফিস করে বললো,
"স্মৃতির আড়ালে তুমি ছিলে, আছো, থাকবে। কারণ তুই শুধু আমার