মন আমার বারোভাতারি 🦋
পর্ব ০১: বারোভাতারির বারো নম্বর বিপদ
পৃথিবীতে দুই ধরনের ছেলে আছে।
একদল ছেলে একটা মেয়েকে ভালোবেসে সারাজীবন তার হাত ধরে থাকার স্বপ্ন দেখে।
আরেকদল ছেলে একটা মেয়েকে ভালোবাসার কথা বলে পরের দিনই নতুন কাউকে খুঁজতে বের হয়।
তুহিন ছিল দ্বিতীয় দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং একমাত্র সদস্য।
তার জীবনের মূলনীতি ছিল—
"জীবনে প্রেম থাকবে, কিন্তু প্রেমিকা একজন হলে চলবে কেন?"
তুহিনের বয়স ছাব্বিশ। দেখতে মোটামুটি ভালো, কথা বলতে বেশ পটু, আর মেয়েদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ব্যাপারে তার আত্মবিশ্বাস ছিল আকাশছোঁয়া।
কিন্তু সমস্যা একটাই।
তার কোনো প্রেমই বেশিদিন টিকত না।
কেউ তাকে ব্লক করত, কেউ ধমক দিয়ে চলে যেত, কেউ আবার তার মিষ্টি কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল চরিত্র বুঝে ফেলত।
তবুও তুহিনের শিক্ষা হতো না।
বন্ধু রাফি প্রায়ই বলত,
— দোস্ত, তোর জীবনে কি কোনোদিন একটা মেয়ের সঙ্গে শান্তিতে সংসার করার ইচ্ছা জাগবে না?
তুহিন গম্ভীর মুখে বলত,
— অবশ্যই জাগবে।
— কবে?
— যেদিন বারো নম্বর মেয়েটাকে খুঁজে পাব।
রাফি মাথায় হাত দিয়ে বলত,
— তোরে নিয়ে গবেষণা করা দরকার।
তুহিন হেসে উত্তর দিত,
— গবেষণা বাদ দে। দোয়া কর, আমার জন্য ভালো একটা মেয়ে আসুক।
রাফি বলত,
— আগে তুই ভালো হ। তারপর ভালো মেয়ে খুঁজিস!
কিন্তু কে শোনে কার কথা!
১. বারোটি অধ্যায়ের প্রেম
তুহিনের জীবনে ইতিমধ্যে এগারোটি মেয়ের আগমন ঘটেছে।
প্রত্যেকের গল্প আলাদা।
প্রথমজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ফেসবুকে। তিন দিন কথা বলেই তুহিন তাকে বলেছিল, সে নাকি মেয়েটিকে ছাড়া বাঁচবে না।
পাঁচ দিন পর মেয়েটি বুঝেছিল, তুহিনের বাঁচার জন্য আরও অনেক মানুষ আছে।
দ্বিতীয়জন ছিল ভীষণ অভিমানী। তুহিন তার অভিমান ভাঙাতে গিয়ে নিজেই এমন বিপদে পড়েছিল যে শেষ পর্যন্ত মেয়েটি তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দেয়।
তৃতীয়জন তুহিনের মিথ্যা কথা ধরে ফেলেছিল।
চতুর্থজন তার অতিরিক্ত মিষ্টি কথায় বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল।
পঞ্চমজন তাকে সরাসরি বলেছিল,
— আপনার মতো ছেলে থেকে দশ হাত দূরে থাকাই ভালো।
তুহিন সেদিনও শিক্ষা নেয়নি।
এভাবেই এগারোটি অধ্যায় শেষ হয়েছিল।
কিন্তু বারো নম্বর অধ্যায় তখনো বাকি।
আর তুহিন জানত না, এই অধ্যায় তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায় হতে যাচ্ছে।
২. সাজিয়া নামের এক অদ্ভুত মেয়ে
সাজিয়া।
নামটা যেমন সুন্দর, মেয়েটাও তেমন শান্ত স্বভাবের।
সাজিয়াকে প্রথম দেখলে মনে হতো, মেয়েটি বুঝি সবসময় আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকে।
বাইরে বের হলে বোরকা, মাথায় হিজাব, মুখে নিকাব।
এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবিতেও তার মুখ ঢাকা।
ঘুমাতে গেলেও বোরকা পরা—এমন গল্পও তার বান্ধবীরা মজা করে বলত।
খেতে বসলে বোরকা, ঘুরতে গেলে বোরকা, বাজারে গেলে বোরকা!
সাজিয়ার পোশাকের ব্যাপারে তার কোনো ছাড় ছিল না।
কিন্তু একটা মজার রহস্য ছিল সাজিয়ার অতীত নিয়ে।
এই মেয়েই একসময় ছিল মাইকেল জ্যাকসনের বিশাল ভক্ত!
মাইকেল জ্যাকসনের গান, নাচ, ভিডিও—সবকিছুতেই তার আগ্রহ ছিল।
তার ঘরের দেয়ালে একসময় মাইকেল জ্যাকসনের ছবি থাকত।
বন্ধুরা তাকে মজা করে ডাকত,
— মাইকেল জ্যাকসনের বাংলাদেশি ফ্যান ক্লাবের প্রেসিডেন্ট!
সাজিয়া তখন গর্ব করে বলত,
— তোমরা বুঝবে না। উনি একজন লিজেন্ড!
তার জীবনে তখন ধর্মীয় অনুশাসনের জায়গাটা খুব বেশি ছিল না।
কিন্তু মানুষের জীবন কখন কীভাবে বদলে যায়, তা কেউ জানে না।
একদিন ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।
৩. মাথায় পড়ল মুড়ির বস্তা!
সেদিন সাজিয়া বাজারের পাশ দিয়ে হাঁটছিল।
একটি দোকানের সামনে বেশ কয়েকটি বস্তা রাখা ছিল। তার মধ্যে ছিল এক বিশাল মুড়ির বস্তা।
সাজিয়া নিজের ফোনে মাইকেল জ্যাকসনের একটা ভিডিও দেখছিল।
হঠাৎ—
ধপাস!
একটা মুড়ির বস্তা এসে পড়ল তার মাথার ওপর!
সাজিয়া চিৎকার করে উঠল,
— আল্লাহ!
চারপাশের মানুষ দৌড়ে এল।
একজন বলল,
— আপা, ঠিক আছেন?
আরেকজন বলল,
— বস্তাটা কে রাখছিল এখানে?
সাজিয়া তখন মাথা ধরে বসে আছে।
তার ফোনটা একপাশে পড়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো।
আল্লাহর রহমতে বড় কোনো শারীরিক ক্ষতি হয়নি। তবে ঘটনাটা তার মনে গভীর ছাপ ফেলে গেল।
সেই দিন থেকেই সাজিয়া নিজের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করল।
সে বুঝতে পারল, এতদিন দুনিয়ার কত কিছু নিয়েই ব্যস্ত ছিল, অথচ নিজের সৃষ্টিকর্তাকে জানার জন্য সময়ই দেয়নি।
ধীরে ধীরে সে নামাজের প্রতি মনোযোগী হলো।
কুরআন পড়তে শুরু করল।
ইসলাম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করল।
পোশাক-পরিচ্ছদে শালীনতা আনল।
একসময় তার জীবনযাত্রা পুরোপুরি বদলে গেল।
মাইকেল জ্যাকসনের প্রতি আগের সেই অতিরিক্ত আসক্তিও কমে গেল।
এখন তার ঘরে মাইকেল জ্যাকসনের ছবির জায়গায় কুরআন রাখার সুন্দর তাক।
তবে সাজিয়া কখনো নিজের অতীত নিয়ে অহংকার করত না। সে জানত, হেদায়েত আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
৪. বারোভাতারির সঙ্গে পরিচয়
এক বিকেলে তুহিন তার বন্ধু রাফির সঙ্গে বসে চা খাচ্ছিল।
হঠাৎ রাফি ফোন বের করে বলল,
— দোস্ত, একটা মেয়ের প্রোফাইল দেখবি?
তুহিন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
— সুন্দরী?
— হ্যাঁ।
— অবিবাহিত?
— হ্যাঁ।
— কথা বলা যাবে?
— জানি না।
তুহিন সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা হাতে নিল।
— দেখ দেখি!
রাফি সাজিয়ার প্রোফাইল দেখাল।
প্রোফাইলের নাম সাজিয়া।
ছবিতে নিকাব পরা একটি মেয়ে।
তুহিন কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল,
— বাহ! মেয়েটা তো বেশ সুন্দর।
রাফি বলল,
— কিন্তু দোস্ত, সাবধানে। মেয়েটা অনেক ধার্মিক।
তুহিন হাসল।
— আমি কি বলেছি তাকে নিয়ে পালিয়ে যাব? আগে পরিচয় তো হোক!
রাফি বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোর এই কথার কারণেই তোর এগারোটা প্রেম শেষ হয়েছে।
তুহিন পাত্তা দিল না।
সেদিন রাতেই সাজিয়াকে একটি মেসেজ পাঠাল।
'আসসালামু আলাইকুম।'
সাজিয়া কিছুক্ষণ পর উত্তর দিল,
'ওয়ালাইকুমুস সালাম।'
তুহিন লিখল,
'কেমন আছেন?'
সাজিয়া বলল,
'আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি?'
'আলহামদুলিল্লাহ। আপনার নাম কী?'
সাজিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল,
'প্রোফাইলেই তো লেখা আছে।'
তুহিন ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসল।
মনে মনে বলল,
'ও মা! প্রথম কথাতেই ধরা খাইলাম!'
৫. সাজিয়ার সামনে তুহিনের হার
পরিচয়ের কয়েকদিন পর তুহিন বুঝতে পারল, সাজিয়া অন্য মেয়েদের মতো নয়।
সে রাত জেগে অকারণে গল্প করতে পছন্দ করে না।
অপরিচিত ছেলেদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাও পছন্দ করে না।
তুহিন যখনই কোনো মিষ্টি কথা বলত, সাজিয়া খুব স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিত।
একদিন তুহিন লিখল,
'আপনাকে একটা কথা বলব?'
সাজিয়া বলল,
'বলুন।'
'আপনার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে।'
'কেন?'
'জানি না।'
'মানুষকে ভালো লাগার কারণ থাকা উচিত।'
তুহিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
এরপর লিখল,
'আপনি সব কথার এমন উত্তর দেন কেন?'
সাজিয়া লিখল,
'কারণ সব কথার উত্তর মিষ্টি হতে হবে, এমন তো কোনো নিয়ম নেই।'
তুহিন ফোনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
এমন মেয়ে সে আগে দেখেনি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সাজিয়ার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তুহিন প্রথমবার নিজের পুরোনো অভ্যাসগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করল।
সাজিয়া তাকে কোনোদিন জোর করেনি।
কোনোদিন বলেনি, তার জন্য সবকিছু বদলে ফেলতে হবে।
বরং সে নিজের জীবন সম্পর্কে বলত।
বলত, মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পরও একই ভুল বারবার করা ঠিক নয়।
তুহিন একদিন জিজ্ঞেস করল,
'আপনি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছেন?'
সাজিয়া উত্তর দিল,
'ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে কাউকে ভালো পথে চলতে উৎসাহিত করাও।'
কথাটা তুহিনের মনে আটকে গেল।
৬. তুহিনের পরিবর্তন
একদিন রাফি তুহিনকে ফোন দিল।
— কিরে, কী অবস্থা?
— ভালো।
— নতুন কাউকে পেয়েছিস নাকি?
— হ্যাঁ।
— কত নম্বর?
তুহিন একটু থেমে বলল,
— বারো নম্বর।
রাফি হেসে উঠল।
— হাহাহা! এবার কতদিন?
তুহিন এবার হাসল না।
সে বলল,
— জানিস রাফি, মেয়েটা অন্যরকম।
— সবাইকেই তো অন্যরকম বলিস!
— না রে। এবার সত্যিই অন্যরকম।
— কী এমন করেছে?
তুহিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমাকে নিজের ভুলগুলো বুঝতে শিখিয়েছে।
রাফি অবাক হলো।
— তুই আবার ভুল বুঝতে শিখেছিস কবে?
— চুপ কর!
দুজনেই হেসে উঠল।
কিন্তু তুহিনের ভেতরে সত্যিই কিছু একটা বদলাচ্ছিল।
সে বুঝতে পারছিল, এতদিন সে ভালোবাসা খুঁজেছে ঠিকই, কিন্তু নিজে ভালোবাসার যোগ্য মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেনি।
সে বুঝতে শুরু করল, কাউকে ভালোবাসার আগে নিজের চরিত্র সুন্দর করা প্রয়োজন।
৭. বাবু, খাইছো?
দিন যেতে লাগল।
তুহিন আর সাজিয়ার কথাবার্তা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল।
তাদের মধ্যে একটা মিষ্টি অভ্যাস তৈরি হলো।
তুহিন কোথাও থেকে খেয়ে এলে প্রথমেই সাজিয়াকে মেসেজ করত।
'বাবু, খাইছো?'
সাজিয়া উত্তর দিত,
'না।'
তুহিন সঙ্গে সঙ্গে লিখত,
'কেন খাও নাই?'
'এমনিই।'
'এমনিই আবার কী? যাও, কিছু খেয়ে আসো।'
'আপনি খেয়েছেন?'
'হ্যাঁ।'
'তাহলে আমাকে এত জিজ্ঞেস করছেন কেন?'
তুহিন লিখত,
'কারণ তুমি না খেলে আমার মন খারাপ হয়।'
সাজিয়া হেসে ফেলত।
একদিন তুহিন নিজেই খেতে বসেছে।
খাওয়ার মাঝখানে সাজিয়াকে মেসেজ করল।
'বাবু, খাইছো?'
সাজিয়া বলল,
'না, এখন খাব।'
তুহিন লিখল,
'তাড়াতাড়ি খাও।'
সাজিয়া বলল,
'আপনি খেয়ে নিন।'
তুহিন উত্তর দিল,
'তুমি না খেলে আমিও আর খাব না।'
সাজিয়া সঙ্গে সঙ্গে লিখল,
'এই নাটক করবেন না।'
তুহিন বলল,
'নাটক না, সত্যি।'
'আচ্ছা, খাচ্ছি।'
'এই তো আমার ভালো মেয়ে!'
সাজিয়া লিখল,
'আমি আপনার ভালো মেয়ে কখন হলাম?'
তুহিনের উত্তর,
'যেদিন থেকে আমার মাথাটা ঠিক করার দায়িত্ব নিয়েছো!'
সাজিয়া হাসতে হাসতে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
৮. প্রেমের নতুন অধ্যায়
তুহিন এখন আর আগের মতো ছিল না।
অকারণে কারও সঙ্গে কথা বাড়ানোর আগ্রহ কমে গিয়েছিল।
সাজিয়ার সঙ্গে পরিচয়ের পর সে বুঝেছিল, সম্পর্কের সৌন্দর্য শুধু মিষ্টি কথায় নয়; বিশ্বাস, সম্মান আর দায়িত্ববোধেও।
একদিন সাজিয়া তাকে জিজ্ঞেস করল,
'আপনি আগে অনেক মেয়ের সঙ্গে কথা বলতেন?'
তুহিন প্রথমে একটু অস্বস্তিতে পড়ল।
তারপর সত্যি কথাটাই বলল,
'হ্যাঁ।'
'কেন?'
'জানি না। তখন মনে হতো, এটাই বুঝি জীবন।'
'এখন কী মনে হয়?'
তুহিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর লিখল,
'এখন মনে হয়, আমি এতদিন ভালোবাসা খুঁজিনি। শুধু নিজের মনকে ব্যস্ত রেখেছি।'
সাজিয়া আর কিছু বলল না।
তুহিন আবার লিখল,
'একটা কথা বলব?'
'বলুন।'
'আপনার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর প্রথমবার মনে হচ্ছে, আমি নিজেকে বদলাতে চাই।'
সাজিয়া উত্তর দিল,
'নিজেকে বদলাবেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কোনো মানুষের জন্য নয়।'
তুহিন কথাটা মন দিয়ে পড়ল।
তারপর লিখল,
'ঠিক বলেছেন।'
৯. বারোভাতারির স্বীকারোক্তি
এক রাতে তুহিন আর সাজিয়া অনেকক্ষণ কথা বলছিল।
তুহিন হঠাৎ বলল,
'সাজিয়া?'
'জি?'
'আমি কি আপনাকে একটা কথা বলতে পারি?'
'বলুন।'
'আমার জীবনে অনেক মানুষ এসেছে। কিন্তু কাউকে নিয়ে কখনো ভবিষ্যৎ ভাবিনি।'
সাজিয়া চুপ।
'কিন্তু আপনাকে নিয়ে ভাবি।'
সাজিয়া এবার লিখল,
'এত সহজে কাউকে নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবা উচিত নয়।'
তুহিন উত্তর দিল,
'জানি। তাই তাড়াহুড়ো করতে চাই না।'
'তাহলে?'
'আপনাকে সম্মান করতে চাই। নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আর যদি আল্লাহ চান, একদিন আপনাকে আমার জীবনের সঙ্গী হিসেবে পেতে চাই।'
সাজিয়ার চোখে পানি এসে গেল।
এতদিন সে ভেবেছিল, তুহিন হয়তো অন্য ছেলেদের মতোই।
কিন্তু তুহিনের কথায় আজ সে আন্তরিকতা খুঁজে পেল।
সে শুধু একটি উত্তর দিল—
'আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন।'
তুহিন লিখল,
'প্রতিদিন।'
১০. নতুন জীবনের শুরু
এরপর থেকে তাদের সম্পর্ক আরও সুন্দর হতে লাগল।
তুহিন সাজিয়াকে কখনো অকারণে বিরক্ত করত না।
সাজিয়া তুহিনকে নামাজের কথা মনে করিয়ে দিত।
তুহিনও সাজিয়াকে খেয়াল রাখত।
কখনো বলত,
'বাবু, পানি খেয়েছো?'
কখনো বলত,
'আজকে মন খারাপ কেন?'
আবার কখনো বলত,
'আজকে আমার জন্য একটু দোয়া করো।'
সাজিয়া বলত,
'কী হয়েছে?'
তুহিন উত্তর দিত,
'ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছি। যেন তোমার সামনে কখনো লজ্জা পেতে না হয়।'
সাজিয়া মুচকি হাসত।
তুহিনের বন্ধু রাফিও পরিবর্তনটা লক্ষ করল।
একদিন সে বলল,
— দোস্ত, তুই তো একেবারে পাল্টে গেছিস!
তুহিন বলল,
— মানুষ পাল্টাতে পারে রে।
— তোর ক্ষেত্রে তো বিশ্বাসই হয় না!
— বিশ্বাস কর। বারোভাতারিরও একদিন বোধোদয় হয়।
রাফি হেসে বলল,
— তাহলে বারো নম্বর মেয়েটাই শেষ?
তুহিন একটু ভেবে বলল,
— বারো নম্বর বলিস না। ও আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
তারপর ফোন বের করে সাজিয়াকে মেসেজ দিল।
'বাবু, কী করো?'
সাজিয়া উত্তর দিল,
'কিছু না।'
'খাইছো?'
'হ্যাঁ।'
'আলহামদুলিল্লাহ।'
'আপনি?'
'খেয়েছি।'
'তাহলে এখন কী করবেন?'
তুহিন লিখল,
'তোমার সঙ্গে একটু কথা বলব।'
সাজিয়া বলল,
'কেন?'
তুহিন উত্তর দিল,
'কারণ তোমার সঙ্গে কথা বললে আমার দিনটা ভালো যায়।'
সাজিয়া আর কোনো উত্তর দিল না।
শুধু একটা প্রজাপতির ইমোজি পাঠাল।
🦋
তুহিন সেই ইমোজিটা দেখে অনেকক্ষণ হাসল।
তার মনে হলো, জীবনে প্রথমবার সে এমন একজনকে পেয়েছে, যার কাছে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য মিথ্যা বলতে হয় না।
যার কাছে নিজের ভুল স্বীকার করতেও ভয় লাগে না।
যে তাকে শুধু ভালোবাসতে শেখায়নি, নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেও শিখিয়েছে।
আর সাজিয়া?
সাজিয়াও বুঝতে পারছিল, তুহিনের মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে।
তবে সে জানত, শুধু কথায় নয়, সময়ের সঙ্গে কাজের মাধ্যমেই মানুষের পরিবর্তন প্রমাণিত হয়।
তাই দুজনেই ধীরে ধীরে সামনে এগোতে লাগল।
তাদের ছোট্ট পৃথিবীতে তখন অভিমান ছিল, হাসি ছিল, দুষ্টুমি ছিল, আর ছিল একে অপরের জন্য অনেকগুলো সুন্দর দোয়া।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই গেল—
এগারোটি ব্যর্থ প্রেমের পর বারোভাতারি তুহিন কি সত্যিই এবার ভালোবাসার মানুষটিকে খুঁজে পেয়েছে?
নাকি জীবনের গল্পে আরও কোনো অপ্রত্যাশিত অধ্যায় অপেক্ষা করছে?
তা জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী পর্বের জন্য।
চলবে... 🦋