গ্রুপের সবাই মিলে তাদেরই এক বন্ধুর বিয়েতে যাচ্ছে।
প্রভা, অনু আর নিপা—তিনজন একসঙ্গে গাড়িতে বসে আছে। তিনজনের উত্তেজনা দেখে কে! কখন হিমিদের বাড়িতে পৌঁছাবে, কখন সবার সঙ্গে দেখা হবে—এসব ভেবেই তাদের আনন্দের সীমা নেই।
অন্যদিকে নিরব, রাহুল, ইমু, জান্নাত, ইসরাত সুমাইয়া আর হিমি তাদের পিক করার জন্য বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সবার অবস্থা প্রায় কাহিল!
এর মধ্যেই রাহুল বিরক্ত হয়ে বলে উঠল—
রাহুল: —বইন, আর পারছি না দাঁড়িয়ে থাকতে!
ইমু:—তাহলে এখানে একটা বিছানা করে দিই, শুয়ে থাক!
নিরব: —হ্যাঁ ভাই, খুব মজা হবে!
ইসরাত:—কী সুন্দর মিষ্টি রোদ! সঙ্গে যদি একটা কাঁথা থাকত, তাহলে ঘুমটাও ভালো হতো!
জান্নাত:—তোরা কি এখানে পিকনিক করতে এসেছিস নাকি?
সবাই যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে অনু, প্রভা আর নিপা নামতেই হিমি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। আনন্দে এক দৌড়ে তাদের দিকে ছুটে গেল।
কিন্তু বন্ধুদের জড়িয়ে ধরার আগেই যা হওয়ার হয়ে গেল!
হিমির ধাক্কায় তিনজন একসঙ্গে রাস্তার ওপর গড়াগড়ি খেতে লাগল।
প্রভা কোনোমতে উঠে কোমরে হাত দিয়ে বলে উঠল—
প্রভা:—ও মা গো! আমার কোমর!
নিপা: —শালি! লাফ দিতে গিয়ে আমার কোমরের জয় বাংলা করে দিলি!
অনু:—এখনই কোমর ভেঙে দিলি! তাহলে বিয়েতে নাচব কীভাবে, ভাই?
তাদের কাণ্ড দেখে সবাই হেসে উঠল। তারপর দৌড়ে গিয়ে তিনজনকে উঠতে সাহায্য করল।
জান্নাত মুচকি হেসে বলল—
জান্নাত:—কী রে ভাই! সবাই দেখি সত্যি সত্যিই শুয়ে পড়েছিস! তোদের কি কাঁথা লাগবে? লাগলে বল!
নিপা: —এই চুপ থাক! বেশি কথা বললে তোরও জয় বাংলা করে দেব!
এবার আর কেউ হাসি থামাতে পারল না।
কিছুক্ষণ পর, হিমিদের বাড়িতে...
সবাই ফ্রেশ হয়ে হিমিদের ঘরে চলে এল। এরপর বিছানার ওপর গোল হয়ে বসে পড়ল সবাই।
হিমি আর তার বোন খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল। সবাই অল্পস্বল্প খেয়ে আবার নিজেদের আড্ডা শুরু করল।
কেউ গল্প করছে, কেউ হাসছে, আবার কেউ একজন আরেকজনকে খোঁচা দিয়ে যাচ্ছে।
এর মধ্যেই হঠাৎ হিমির ফোনে কল আসল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—ডাক্তার বাবু।
কলটা ধরতে যাবে, ঠিক তখনই প্রভা টান দিয়ে ফোনটা হিমির হাত থেকে নিয়ে নিল। আর নিপা পেছন থেকে হিমির মুখ চেপে ধরল।
হিমি চোখ বড় বড় করে তাদের দিকে তাকাল। কিন্তু বন্ধুরা কি আর এত সহজে ছাড়ার পাত্রী!
প্রভা গলা বদলে ফোন রিসিভ করল।
প্রভা:—হ্যালো জান!
ডাক্তার: —হুম!
প্রভা:—তুমি কী করছো, জান?
ডাক্তার:—এই তো বসে আছি। বাট তোমার কণ্ঠ এমন গলা ফাটিয়ে শোনাচ্ছে কেন?
এবার পাশে বসে থাকা অনু তাড়াতাড়ি বলে উঠল—
অনু: —ওই আসলে, বিয়ের জন্য গলা ওয়াশ করছিলাম তো! তাই একটু অন্যরকম শোনাচ্ছে!
ডাক্তার: —গলা ওয়াশ করে কী হবে, জান?
প্রভা আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা ইমুর হাতে ধরিয়ে দিল।
ইমু: —আচ্ছা জান, এসব বাদ দাও। তুমি কী করো?
ডাক্তার:—এই তো বসে আছি। আপনি কী করেন?
এবার নিপা ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে বলল—
নিপা:—কী আর করব! তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি!
ডাক্তার: —তা কী স্বপ্ন দেখেন আমাকে নিয়ে?
প্রভা আরেকটু এগিয়ে এসে বলল—
প্রভা:—এই ধরুন, বাসরঘরে আমি আর আপনি একা। তারপর...
ডাক্তার: —তারপর কী?
অনু লজ্জা পাওয়ার অভিনয় করে মুখে হাত দিয়ে বলল—
অনু: —আমার বলতে লজ্জা করছে! তুমি বলো!
ওদিকে ফোনের অপর পাশে ডাক্তার বাবু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
এদিকে হিমি রাগে ফুঁসছে। কিন্তু বন্ধুরা তার মুখ চেপে ধরে রেখেছে। তার অবস্থা দেখে বাকিরা হাসতে হাসতে শেষ!
ডাক্তার বাবু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন—
ডাক্তার: —বাহ! আজ দেখি আমার হিমু বেশ রোমান্টিক হয়ে গেছে!
কথাটা শুনে সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। তারপর প্রভা মুখ বাঁকিয়ে বলল—
প্রভা: —হিমু আবার কে? আমি তো আপনার জান!
ডাক্তার: —ওহ! তাই নাকি? তাহলে আমার জানের নামটা একটু বলবেন?
প্রভা: —নাম দিয়ে কী করবেন? বিয়ের কার্ডে লিখবেন নাকি?
ডাক্তার: —না, নামটা মনে রাখব। কারণ আমার জানের কণ্ঠটা একটু বেশিই মোটা!
কথাটা শুনে ঘরের সবাই হেসে উঠল।
এদিকে হিমি আর সহ্য করতে না পেরে নিপার হাত থেকে নিজের মুখ ছাড়িয়ে চিৎকার করে উঠল—
হিমি: —এইইই! ফোনটা দে! তোরা আমার জীবনটা শেষ করে দিবি!
ফোনের ওপাশ থেকে ডাক্তার বাবু বলে উঠলেন—
ডাক্তার: —হিমু! তুমি ওখানে আছো?
হিমি: —হ্যাঁ! আমি আছি! আর এরা সব পাগল!
প্রভা: —এই যে ডাক্তার সাহেব, আপনার রোগীকে সামলান। আমাদের হাতে আর রাখা যাচ্ছে না!
ডাক্তার: —রোগীকে একটু বলবেন, নিজের যত্ন নিতে। আর বেশি চিৎকার করলে গলাটা বসে যাবে।
নিপা: —আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আপনার রোগীকে একটা কথা বলবেন?
ডাক্তার: —কী কথা?
নিপা: —আপনার রোগী কিন্তু আপনাকে অনেক ভালোবাসে। তবে আমাদের একটু বেশি ভালোবাসে!
ডাক্তার: —বুঝলাম। তাহলে আপনারাই ওকে সামলান।
এই বলে ফোন কেটে গেল।
হিমি: —তোরা সবাই আমার শত্রু! একটাও আমার বন্ধু না!
অনু: —আহা! এত রাগ কেন? আমরা তো তোর প্রেমের সংসারটা একটু পরীক্ষা করছিলাম!
হিমি: —আরেকটা কথা বলবি? দেখবি কী করি!
রাহুল: —এই যে, ঝগড়া পরে করিস। আগে আমাদের একটা কথা বল। বিয়ের বাড়িতে এসে তোর নিজের বিয়ের কথা মনে পড়ছে না?
হিমি: —তোর মাথায় বিয়ে ছাড়া আর কিছু নেই?
ইমু: —আছে তো! খাবার!
সবাই আবার হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর...
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। বাড়ির উঠোনটা সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। চারদিকে রঙিন বাতি, ফুল আর কাপড়ের সাজসজ্জা। উঠোনের এক পাশে মেহেদির আয়োজন চলছে। অন্য পাশে গায়ে হলুদের জন্য হলুদ, ফুল আর সাজানো ডালা রাখা হয়েছে।
হিমিকে মাঝখানে বসানো হয়েছে। পরনে হলুদ রঙের সুন্দর একটা পোশাক। হাতে-পায়ে মেহেদি লাগানোর প্রস্তুতি চলছে।
হিমি নিজের হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে বসে আছে।
নিপা: —এই যে কনে! হাতটা সোজা করে ধর। এমন করলে মেহেদি লাগাব কীভাবে?
হিমি: —আমার হাত ব্যথা করছে!
প্রভা: —বিয়ের আগে এত কষ্ট করলে বিয়ের পরে কী করবি?
হিমি: —তোদের বিয়ে হলে বুঝবি!
অনু: —আমাদের বিয়ে হলে তোকে দাওয়াতই দেব না।
হিমি: —আলহামদুলিল্লাহ! আমার টাকা বাঁচবে।
জান্নাত: —এই মেয়েকে দেখ! নিজের বিয়ের আগে থেকেই দাওয়াতের টাকা বাঁচানোর চিন্তা!
সুমাইয়া: —ওর বিয়েতে আমরা কিন্তু সবাই মিলে নাচব। এমন নাচব, বরপক্ষ পালানোর রাস্তা খুঁজবে!
ইসরাত: —বরপক্ষ কেন পালাবে? বরকেই তো আগে পালাতে হবে!
সবাই হেসে উঠল।
এদিকে মেহেদি লাগানো শেষ হতে না হতেই প্রভা একটা মোবাইল বের করে বলল—
প্রভা: —এইবার সবাই ছবি তোলার জন্য রেডি!
হিমি: —আমার হাতের মেহেদি শুকাক আগে!
নিপা: —ছবি তুলতে মেহেদি শুকানোর কী দরকার? তুই হাত দুটো এমন করে ধর, যেন তুই পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত মেয়ে!
ইমু: —শান্ত? এই মেয়েকে শান্ত দেখানোর দায়িত্ব কে নিয়েছে?
রাহুল: —আমি না! আমার নিজের জীবনেই শান্তি নেই!
হিমি: —রাহুল ভাইয়া!
রাহুল: —আরে বাবা! আমি তো কিছুই বলিনি!
রাত ৮টা...
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে।
উঠোনের মাঝখানে সুন্দর করে সাজানো একটা জায়গায় হিমিকে বসানো হয়েছে। চারপাশে আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুরা ভিড় করেছে। সবাই মিলে গান গাইছে, হাসাহাসি করছে।
প্রথমে হিমির গালে হলুদ লাগিয়ে দিল অনু।
অনু: —এই নে, তোর গায়ে হলুদ দিলাম। এবার তোর জীবনটা হলুদের মতো উজ্জ্বল হোক!
নিপা: —আমিন! আর জামাই যেন বউয়ের সব আবদার পূরণ করে!
প্রভা: —শুধু আবদার? বউয়ের রাগও সহ্য করতে হবে!
ইমু: —আর প্রতিদিন শপিংয়ের টাকা দিতে হবে!
হিমি: —তোরা আমার বিয়ের আগেই জামাইকে ফকির বানিয়ে ফেলবি নাকি?
নিরব: —জামাইয়ের জন্য দোয়া রইল। বিয়ের আগেই এতজন শাশুড়ি পেয়ে যাচ্ছে!
রাহুল: —আমার তো মনে হচ্ছে, জামাইয়ের চেয়ে আমাদের হিমিরই বেশি বিপদ!
হিমি: —সবাই মিলে আমার পেছনে লাগছিস কেন?
প্রভা: —কারণ তুই আমাদের কিউট ফ্যামিলির দুষ্টু প্রাণী!
কথাটা শুনে সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।
এরপর শুরু হলো নাচের আয়োজন।
ডিজে গান চালু করতেই প্রভা আর নিপা হাত ধরে টেনে হিমিকে উঠিয়ে দিল।
হিমি: —না না! আমি নাচব না!
নিপা: —আজকে তোর কোনো কথা শুনব না। আজ তোর গায়ে হলুদ, নাচতেই হবে!
অনু: —একদম ঠিক! এতদিন আমাদের নাচ দেখেছিস, আজ আমরা তোর নাচ দেখব!
হিমি: —আমার হাতের মেহেদি নষ্ট হয়ে যাবে!
প্রভা: —হাত নাড়বি না, পা নাড়বি!
ইমু: —বাহ! কী সুন্দর বুদ্ধি!
হিমিকে মাঝখানে দাঁড় করিয়ে সবাই চারপাশে গোল হয়ে নাচতে শুরু করল। প্রথমে হিমি লজ্জায় একটু একটু করে নাচছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর নিজেই গানের তালে তাল মিলিয়ে নাচতে শুরু করল।
রাহুল মোবাইল বের করে ভিডিও করতে লাগল।
রাহুল: —এই নাচটা কিন্তু আমি রেখে দেব। ভবিষ্যতে জামাইকে দেখাব!
হিমি: —রাহুল ভাইয়া! ভিডিও বন্ধ করো!
নিরব: —ভিডিও বন্ধ হবে না। এটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত!
সুমাইয়া: —হিমির নাচের ভিডিওর নাম হবে—'বিয়ের আগে শেষ স্বাধীনতা!'
এবার হিমি নিজেই হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর...
সবাই নাচতে নাচতে ক্লান্ত হয়ে উঠোনের এক পাশে বসে পড়ল। হিমি পানি খেতে যাবে, ঠিক তখনই নিপা তার সামনে এসে দাঁড়াল।
নিপা: —এই যে কনে, একটা প্রশ্ন আছে।
হিমি: —কী?
নিপা: —বিয়ের পরে আমাদের চিনবি তো?
হিমি: —না! তোদের কাউকেই চিনব না।
প্রভা: —তাহলে আমরা জামাইয়ের কাছে অভিযোগ করব!
অনু: —বলব, বিয়ের আগে আমাদের সঙ্গে অনেক ভালো ব্যবহার করত, এখন আর করে না!
ইমু: —আর বলব, আপনার বউ কিন্তু আমাদের ফোনও ধরে না!
হিমি: —তোরা কি আমার বিয়ে দিতে এসেছিস, নাকি আমার সংসার ভাঙতে?
রাহুল: —আমরা এসেছি বিনোদন নিতে। বাকি সব তোদের দায়িত্ব!
সবাই আবার হেসে উঠল।
এমন সময় হিমির ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে আবারও ভেসে উঠল—ডাক্তার বাবু।
ফোনটা হাতে নিতেই প্রভা চোখ টিপে বলল—
প্রভা: —ওই যে! তোর ডাক্তার বাবু আবার হাজির!
নিপা: —ধর ধর! দেখি এবার কী বলে!
হিমি সবাইকে চোখ রাঙিয়ে ফোন রিসিভ করল।
হিমি: —হ্যালো!
ডাক্তার: —কী অবস্থা তোমার? অনেকক্ষণ ধরে ফোন করছি।
হিমি: —এই তো, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান চলছে।
ডাক্তার: —হুম। খেয়েছ?
হিমি: —না, এখনো না।
ডাক্তার: —অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই হবে? ঠিকমতো খেয়ে নেবে।
হিমি: —আচ্ছা, খাব।
ডাক্তার: —আর শুনেছি, আজ নাকি অনেক নাচানাচি করছ?
হিমি অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল।
হিমি: —কে বলেছে?
ডাক্তার: —সেটা বড় কথা নয়। তোমার নাচের খবর আমার কাছে পৌঁছে গেছে।
পেছন থেকে প্রভা ফিসফিস করে বলল—
প্রভা: —ডাক্তার সাহেবকে বল, নাচের ভিডিও পাঠিয়ে দেব!
হিমি তাড়াতাড়ি পেছনে ফিরে বলল—
হিমি: —চুপ কর!
ডাক্তার: —কাকে চুপ করতে বলছ?
হিমি: —কাউকে না! এরা সবাই পাগল!
ডাক্তার হালকা হেসে বললেন—
ডাক্তার: —বুঝলাম। তুমি অনুষ্ঠান উপভোগ করো। আর নিজের খেয়াল রেখো।
হিমি: —আপনিও।
ফোন কেটে যেতেই নিপা হিমির পাশে এসে বসে বলল—
নিপা: —ও মা! কী সুন্দর করে কথা বললি! আমাদের সঙ্গে তো এমন মিষ্টি করে কথা বলিস না!
অনু: —আমাদের জ