এই মন তোকে দিলাম
দ্বিতীয় পর্ব - ঝড়ের রাত আর ফিরে আসা
অধ্যায় ১ : সেই রাতের বাস
আরিয়ান রাতে ঢাকা থেকে সিলেটের বাসে উঠলো।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বাসের জানালা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। আরিয়ানের মনে শুধু একটাই চিন্তা - আয়েশা, আর আয়েশার আব্বু।
আয়েশা হাসপাতালের বারান্দায় বসে আছে। তার চোখে ঘুম নেই। সে বারবার ফোন দেখছে। আরিয়ান ফোন ধরছে না, নেটওয়ার্ক নেই।
রাত ১১টা। আয়েশার ফোনে একটা মেসেজ এলো।
> "আয়েশা, আমি রওনা দিয়েছি। চিন্তা করো না। ভোরের আগেই পৌঁছে যাবো। - আরিয়ান"
আয়েশা একটু শান্তি পেলো।
কিন্তু রাত ১২টার দিকে হঠাৎ একটা খবর এলো। সিলেট রোডে একটা বাস এক্সিডেন্ট করেছে।
আয়েশার বুকটা ধক করে উঠলো। সে হাসপাতাল থেকে দৌড়ে বাইরে এলো।
"আল্লাহ, এটা যেন আরিয়ানের বাস না হয়।"
আয়েশা আরিয়ানকে ফোন করলো। ফোন বন্ধ।
আয়েশা কাঁদতে লাগলো। "আরিয়ান, তুমি কোথায়?"
অধ্যায় ২ : হাসপাতালে দুইজন
পরের দিন সকাল।
আয়েশা জানতে পারলো, আরিয়ানের বাসটাই এক্সিডেন্ট করেছে। তবে আরিয়ান বেঁচে আছে। তার মাথায় আঘাত লেগেছে। তাকে সিলেট মেডিকেলে আনা হয়েছে।
আয়েশা দৌড়ে গেল।
আরিয়ান বেডে শুয়ে আছে। মাথায় ব্যান্ডেজ। চোখ বন্ধ।
আয়েশা আরিয়ানের হাতটা ধরলো। "আরিয়ান, চোখ খোলো। আমি আয়েশা।"
আরিয়ান ধীরে ধীরে চোখ খুললো।
"আয়েশা... তুমি ঠিক আছো?"
আয়েশা কেঁদে ফেললো। "আমি ঠিক আছি। তুমি ঠিক আছো?"
আরিয়ান হাসার চেষ্টা করলো। "তুমি থাকলে আমি ঠিক থাকবো।"
ডাক্তার বললো, "উনার মাথায় আঘাত লেগেছে। তবে বিপদ কেটে গেছে। কয়েকদিন রেস্ট নিতে হবে।"
আয়েশার আব্বুও একই হাসপাতালে। একদিকে আব্বু, আরেকদিকে আরিয়ান। আয়েশা দুজনের মাঝখানে দৌড়াদৌড়ি করছে।
আব্বু বললো, "মা, তুই আরিয়ানের কাছে যা। আমি ঠিক আছি।"
আয়েশা বললো, "না আব্বু, তোমাদের দুজনকেই আমার লাগবে।"
অধ্যায় ৩ : রাকিবের সত্যি
এই এক্সিডেন্টের পেছনে যে রাকিব ছিল, সেটা কেউ জানতো না।
রাকিব বাসের ড্রাইভারকে টাকা দিয়েছিল, যাতে বাসটা একটু দেরি করে ছাড়ে। সে চেয়েছিল আরিয়ান যেন বিয়ের আগে সিলেট পৌঁছাতে না পারে। কিন্তু ড্রাইভার বৃষ্টিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
রাকিব যখন শুনলো আরিয়ান বেঁচে আছে, তখন তার মনে ভয় ঢুকলো। সে ভাবলো, "আমি কি খুনি হয়ে যাচ্ছি?"
সেদিন রাতে রাকিব হাসপাতালে এলো। আয়েশার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেললো।
"আয়েশা, আমাকে ক্ষমা করে দে। আমি আরিয়ানের বাসটা দেরি করিয়েছিলাম। আমি চাইনি ও মারা যাক।"
আয়েশা স্তব্ধ হয়ে গেল।
"রাকিব ভাই, তুমি এটা করতে পারলে? তুমি তো আমার ভাই।"
রাকিব বললো, "আমি তোকে ভালোবাসতাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, ভালোবাসা মানে কাউকে কষ্ট দেওয়া না।"
আরিয়ান বেড থেকে বললো, "রাকিব, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু তুমি আর কখনো আয়েশাকে কষ্ট দেবে না।"
রাকিব বললো, "দেবো না। আমি কথা দিচ্ছি।"
সেদিন থেকে রাকিব বদলে গেল। সে আরিয়ান আর আয়েশার বিয়েতে সবচেয়ে বেশি কাজ করলো।
অধ্যায় ৪ : বিয়ে
আব্বু আর আরিয়ান দুজনেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলো।
বিয়ের তারিখ আবার ঠিক হলো। এবার আর দেরি না।
বিয়ের দিন সকাল। আয়েশা মায়ের শাড়ি পরেছে। গোলাপি শাড়ি। চোখে কাজল। হাতে মেহেদি।
আরিয়ান ক্রিম পাঞ্জাবি পরেছে।
বাগানে বিয়ের অনুষ্ঠান। চারপাশে গোলাপ।
কাজি বিয়ে পড়ালো।
আয়েশা কবুল বললো। তার গলা কাঁপছিল।
আরিয়ান কবুল বললো। তার চোখে পানি।
সবাই আলহামদুলিল্লাহ বললো।
আব্বু আয়েশাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো। "মা, তুই সুখী হ।"
আয়েশা বললো, "আব্বু, তুমি দোয়া করো।"
সেদিন বিকেলে আয়েশা বাগানে গিয়ে গোলাপের চারাটার পাশে দাঁড়ালো।
"মা, দেখছো? আমার বিয়ে হয়ে গেছে। তোমার মেয়ে এখন আর একা না।"
আরিয়ান পেছন থেকে এসে বললো, "আয়েশা, চলো।"
আয়েশা বললো, "কোথায়?"
আরিয়ান বললো, "আমাদের নতুন জীবনে।"
অধ্যায় ৫ : ঢাকায় নতুন সংসার
বিয়ের পর ওরা ঢাকায় চলে এলো।
আরিয়ানের ফ্ল্যাটটা ছোট, কিন্তু আয়েশা সেটাকে সুন্দর করে সাজালো। বারান্দায় গোলাপের গাছ লাগালো।
"এটা আমাদের নতুন বাগান।" আয়েশা বললো।
প্রতিদিন সকালে আয়েশা নাস্তা বানায়। আরিয়ান অফিসে যায়। বিকেলে দুজন হাতিরঝিলে হাঁটতে যায়।
একদিন আয়েশা বললো, "আরিয়ান, তোমার মনে আছে, তুমি আমাকে প্রথম দিন কি বলেছিলে?"
আরিয়ান বললো, "এই বাগানে কি পরীরা থাকে?"
আয়েশা হাসলো। "হ্যাঁ। এখন মনে হয়, তুমিই আমার পরী।"
আরিয়ান বললো, "না, তুমি আমার পরী।"
দুজনের সংসার সুখে চলছিল।
কিন্তু একদিন আয়েশা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেল। ডাক্তারের কাছে গেল।
ডাক্তার হেসে বললো, "মিষ্টি খাওয়ান। আপনারা বাবা-মা হতে চলেছেন।"
আরিয়ান আর আয়েশা দুজনেই কেঁদে ফেললো। খুশির কান্না।
অধ্যায় ৬ : গোলাপের জন্ম
৯ মাস পর।
আয়েশার একটা মেয়ে হলো।
নাম রাখলো - গোলাপ।
গোলাপের মুখটা একদম আয়েশার মতো। চোখ দুটো আরিয়ানের মতো।
আয়েশা গোলাপকে কোলে নিয়ে বললো, "গোলাপ, তুমি জানো, তোমার বাবা আর আমার গল্পটা কত সুন্দর?"
আরিয়ান বললো, "একদিন গোলাপকে সব বলবো।"
গোলাপ বড় হতে লাগলো। সে এখন ৩ বছরের। বাগানে খেলে। গোলাপ ফুল দেখলে বলে, "মা, এটা আমার নাম!"
আয়েশা আর আরিয়ান তাকিয়ে হাসে।
একদিন সিলেটে গেল সবাই। পুরনো বাগানে।
গোলাপের চারাটা এখন বড় গাছ হয়ে গেছে। অনেক ফুল ফুটেছে।
আয়েশা গোলাপকে বললো, "দেখো, এই গাছটা তোমার বাবা লাগিয়েছিল।"
গোলাপ বললো, "বাবা, তুমি আমার জন্য লাগিয়েছো?"
আরিয়ান বললো, "হ্যাঁ মা, তোমার জন্য, আর তোমার মায়ের জন্য।"
সূর্য ডুবছিল। তিনজন পাশাপাশি বসে ছিল।
আয়েশা বললো, "আরিয়ান, মনে আছে, তুমি বলেছিলে, এই মন তোকে দিলাম?"
আরিয়ান বললো, "মনে আছে। আর সেই মনটা এখনো তোমার কাছেই আছে।"
আয়েশা বললো, "আর সারাজীবন থাকবে।"
গোলাপ বললো, "আমিও তোমাদের ভালোবাসি।"
তিনজন হেসে ফেললো।
বাগানে বাতাস বইছিল। গোলাপের পাপড়ি উড়ছিল।
আর দূরে আব্বু দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। তার চোখে পানি, কিন্তু মুখে হাসি। তিনি মনে মনে বললেন, "আয়েশার মা, দেখো, আমাদের মেয়ে সুখী।"