ফন্ট সাইজ:
থিম:
অপূর্ণ ভালোবাসা

পর্ব 1

লেখক: ছামি

উপন্যাস অপূর্ণ ভালোবাসা
লেখক : ছামি

পর্ব - ১ : যে বিকেলে দেখা হয়েছিল

সিলেটের এক ছোট গ্রাম, নাম তার চাঁদপুর।

গ্রামটা খুব একটা বড় না। একটা প্রাইমারি স্কুল, একটা মসজিদ, একটা বাজার, আর মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট একটা নদী। নদীর পাড়ে বড় একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। সেই গাছের নিচেই গ্রামের সব গল্প শুরু হয়, আর শেষ হয়।

সেই গ্রামেই থাকে আরিফ। বয়স ২২। বাবা নেই, মা আর ছোট বোনকে নিয়ে তার সংসার। ঢাকায় একটা ছোট চাকরি করে, ছুটিতে গ্রামে এসেছে।

আর এই গ্রামেই থাকে মেহরাবা। সবাই তাকে মেহু বলে ডাকে। বয়স ২০। অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ে। বাবা স্কুলের মাস্টার। মা গৃহিণী। মেহুর চোখ দুটো বড় বড়, হাসলে গালে টোল পড়ে।

আরিফ আর মেহুর প্রথম দেখা হয়েছিল ঠিক এই কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে।

সেদিন ছিল শুক্রবার, বিকেল ৪টা।

আরিফ নদীর পাড়ে বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ একটা বাচ্চা মেয়ে দৌড়ে এসে তার বইটা ফেলে দিলো পানিতে। আরিফ চিৎকার করে উঠলো, "আরে!"

আর তখনই মেহু দৌড়ে এলো। বাচ্চাটাকে ধরে বললো, "এই পিচ্চি, দুষ্টুমি করিস কেন?"

মেহু আরিফের দিকে তাকিয়ে বললো, "সরি ভাইয়া, ও আমার ভাই। খুব দুষ্টু।"

আরিফ হাসলো। "সমস্যা নেই। বইটা তো ভিজে গেছে।"

মেহু বললো, "আপনি চাইলে আমি কালকে একটা নতুন বই এনে দিবো।"

আরিফ বললো, "থাক লাগবে না। এই বইটা আমার খুব প্রিয় ছিল। নাম - অপূর্ণ ভালোবাসা।"

মেহু থমকে গেল। "অপূর্ণ ভালোবাসা? এটা তো আমারও প্রিয় বই।"

সেদিন থেকে তাদের কথা শুরু।

প্রথমে শুধু বই নিয়ে কথা। তারপর আস্তে আস্তে জীবন নিয়ে। আরিফ জানলো, মেহুর মা অনেক অসুস্থ। বাবার টাকায় সংসার চলে না। মেহু টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালায়।

মেহু জানলো, আরিফের বাবা ৫ বছর আগে মারা গেছে। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে পড়িয়েছে। আরিফ এখন চায় মাকে একটা সুন্দর জীবন দিতে।

দুজনের কষ্টটা একরকম ছিল। তাই দুজন দুজনকে বুঝতো।

দিন যেতে লাগলো।

আরিফ প্রতিদিন বিকেলে নদীর পাড়ে আসতো। মেহুও আসতো। কখনো চা খেতো, কখনো বই পড়তো। কখনো কিছু না বলে শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে বসে থাকতো।

একদিন আরিফ বললো, "মেহু, তুমি জানো? তোমার সাথে কথা বললে আমার সব কষ্ট ভুলে যাই।"

মেহু লজ্জা পেয়ে বললো, "আমারও তাই হয়।"

আরিফ আর কিছু বললো না। সে বুঝে গিয়েছিল, এটা ভালোবাসা। কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছিল। যদি মেহু রাগ করে? যদি আর দেখা না হয়?

মেহুও বুঝে গিয়েছিল। কিন্তু মেয়েদের তো আগে বলতে নেই। সে অপেক্ষা করছিল।

এভাবেই চলছিল ২ মাস।

তারপর একদিন হঠাৎ খবর এলো, আরিফের ঢাকায় ফিরতে হবে। চাকরিতে ছুটি শেষ।

সেদিন বিকেলে আরিফ মেহুকে বললো, "মেহু, কালকে আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি।"

মেহুর মুখটা শুকিয়ে গেল। "তো?"

আরিফ বললো, "তুমি কি আমাকে মিস করবে?"

মেহু চোখে পানি নিয়ে বললো, "জানি না।"

আরিফ পকেট থেকে একটা ছোট চিরকুট বের করে দিলো। "এটা রাখো। ঢাকায় গিয়ে ফোন করবো।"

মেহু চিরকুটটা খুললো। সেখানে লেখা -
> "মেহু, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু এখন বলার সময় হয়নি। আমি একদিন ফিরে আসবো, সব কিছু নিয়ে। সেদিন তোমাকে নিয়ে যাবো। অপেক্ষা করবে তো?"

মেহুর চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। সে বললো, "আমি অপেক্ষা করবো, আরিফ। সারাজীবন করবো।"

আরিফ ঢাকা চলে গেল।

প্রথম ১ মাস সব ঠিক ছিল। প্রতিদিন ফোন, মেসেজ, ভিডিও কল।

তারপর আস্তে আস্তে আরিফ ব্যস্ত হয়ে গেল। অফিসের চাপ, মায়ের অসুখ, বোনের বিয়ে। ফোন কমে গেল।

মেহুও ব্যস্ত হয়ে গেল। পরীক্ষা, টিউশনি, মায়ের অসুখ।

একদিন মেহুর বাবা বললো, "মেহু, তোর জন্য একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে। ছেলে বিদেশে থাকে। তুই কি চাস?"

মেহুর বুকটা ধক করে উঠলো। সে বললো, "আব্বু, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।"

বাবা বললো, "কিন্তু মা, তোর মায়ের অবস্থা ভালো না। সে চায় তোর বিয়েটা দেখে যেতে।"

মেহু কিছু বলতে পারলো না।

এদিকে আরিফ ঢাকায় নতুন একটা মেয়ের সাথে পরিচিত হলো। নাম রিমি। অফিসের কলিগ। রিমি আরিফকে পছন্দ করে। প্রতিদিন আরিফের জন্য খাবার নিয়ে আসে।

আরিফ প্রথমে পাত্তা দেয়নি। কিন্তু একদিন মা বললো, "বাবা, তুই একটা বিয়ে কর। আমি আর পারছি না।"

আরিফ মেহুর কথা ভাবলো। মেহুকে ফোন করলো। ফোন বন্ধ।

আরিফ ভাবলো, মেহু হয়তো ভুলে গেছে।

আসলে মেহুর ফোনটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সে নতুন ফোন কিনতে পারেনি। টাকা ছিল না।

দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলো।

ভালোবাসাটা আস্তে আস্তে অপূর্ণতার দিকে যাচ্ছিল।দূরত্ব

আরিফ ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পর প্রথম ১ মাস সব ঠিক ছিল।

প্রতিদিন রাত ১০টায় ফোন।

আরিফ বলতো, "মেহু, খাইছো?"
মেহু বলতো, "হ্যাঁ। তুমি?"
আরিফ বলতো, "আমার তো তোমাকে ছাড়া খেতে ইচ্ছা করে না।"

এই ছোট ছোট কথায় তাদের দিন কাটতো।

কিন্তু সমস্যা শুরু হলো দ্বিতীয় মাস থেকে।

আরিফের অফিসে নতুন প্রজেক্ট এলো। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ। মাঝে মাঝে রাতে অফিসেই থাকতে হতো।

মেহুরও পরীক্ষা চলে এলো। সারাদিন পড়া, সন্ধ্যায় টিউশনি। রাতে মায়ের সেবা।

দুজনের কেউ কাউকে সময় দিতে পারছিল না।

একদিন মেহু রাত ১১টায় ফোন করলো। আরিফ ফোন ধরলো না।

মেহু ভাবলো, "আরিফ হয়তো ব্যস্ত।"

আরিফ রাত ১টায় ফোন ব্যাক করলো। মেহু তখন ঘুমিয়ে গেছে। মা ডাকলো, "মেহু, ফোন বাজছে।"

মেহু ঘুমের ঘোরে বললো, "কালকে কথা বলবো।"

এভাবে ৩ দিন, ৭ দিন, ১৫ দিন কেটে গেল। কথা হয় না।

মেহুর মনে ভয় ঢুকলো। "আরিফ কি আমাকে ভুলে গেল?"

আরিফের মনেও একই ভয়। "মেহু কি অন্য কাউকে পেয়ে গেল?"

এর মধ্যে মেহুর জীবনে একটা বড় ঝড় এলো।

মেহুর মায়ের অসুখটা বেড়ে গেল। হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। ডাক্তার বললো, "অপারেশন লাগবে। ১ লাখ টাকা লাগবে।"

মেহুর বাবা স্কুল মাস্টার। মাসে বেতন ১৮ হাজার টাকা। ১ লাখ টাকা কোথায় পাবে?

মেহু টিউশনির টাকা জমিয়ে রেখেছিল ১৫ হাজার টাকা। সেটা দিলো। তবুও ৮৫ হাজার টাকা বাকি।

বাবা গ্রামের সবার কাছে ধার চাইলো। কেউ দিলো না।

সেদিন রাতে মেহু খুব কাঁদলো। সে আরিফকে ফোন করতে চাইলো। কিন্তু ফোনটা তখন নষ্ট। পানিতে পড়ে গিয়েছিল। ঠিক করার টাকা নেই।

মেহু একটা চিঠি লিখলো আরিফকে।

> "আরিফ, আমার মা খুব অসুস্থ। আমার টাকা দরকার। তুমি কি আমাকে সাহায্য করতে পারবে? আমি জানি তোমার কাছে টাকা নেই। তবুও বললাম। কারণ তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।"

কিন্তু চিঠিটা পোস্ট করার টাকাও ছিল না মেহুর কাছে। চিঠিটা বইয়ের ভেতরেই পড়ে রইলো।

এদিকে ঢাকায় আরিফের জীবনেও ঝড়।

আরিফের মায়ের হাঁপানি বেড়ে গেল। ডাক্তার বললো, "ঢাকার বাইরে খোলা জায়গায় থাকতে হবে।"

আরিফের ছোট বোনের বিয়ের সম্বন্ধ এলো। ছেলের পরিবার যৌতুক চায় ২ লাখ টাকা।

আরিফ পাগলের মতো হয়ে গেল। সে অফিস থেকে লোন নিলো।

তার মধ্যে অফিসের রিমি নামের মেয়েটা প্রতিদিন আরিফের কাছে আসে।

রিমি একদিন বললো, "আরিফ ভাই, আপনি এত চিন্তা করেন কেন? আমি আছি তো।"

আরিফ বললো, "আপনি বুঝবেন না।"

রিমি বললো, "আমি বুঝি। আপনার মায়ের জন্য, বোনের জন্য আপনি সব করতে পারেন। আমি আপনাকে ভালোবাসি, আরিফ।"

আরিফ চমকে গেল। "রিমি, আপনি কি বলছেন? আমার একজন আছে।"

রিমি বললো, "আমি জানি। কিন্তু সে তো গ্রামে থাকে। সে কি আপনার এই কষ্ট বুঝবে? আমি বুঝি।"

আরিফ কিছু বললো না। সে চুপ করে চলে গেল।

কিন্তু রিমির কথাটা তার মাথায় ঘুরতে লাগলো।

সত্যিই তো, মেহু কি তার কষ্ট বুঝবে? মেহু তো নিজেই কষ্টে আছে।

আরিফ মেহুকে ফোন করলো। ফোন বন্ধ। ১০ বার করলো। বন্ধ।

আরিফ ভাবলো, "মেহু হয়তো আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। হয়তো সে আর চায় না।"

আরিফ ভেঙে পড়লো।

এক মাস পর।

মেহুর মা কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলো। অপারেশন হয়নি, ওষুধে একটু কমেছে।

মেহুর বাবা একদিন বললো, "মেহু, একটা ছেলের খবর এসেছে। ছেলে ইতালি থাকে। অনেক টাকা। তোর মায়ের চিকিৎসার সব টাকা দিবে। তুই রাজি হ।"

মেহুর বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। সে বললো, "আব্বু, আমি একজনকে ভালোবাসি।"

বাবা বললো, "কে?"

মেহু বললো, "আরিফ।"

বাবা বললো, "সেই ছেলেটা? যার বাবা নেই? যে ঢাকায় চাকরি করে? ও তোকে কি দিবে? ও নিজেই তো গরিব।"

মেহু কেঁদে বললো, "আব্বু, ভালোবাসা টাকা দিয়ে হয় না।"

বাবা বললো, "ভালোবাসা দিয়ে ওষুধ কেনা যায় না, মা। তোর মা মরে যাবে। তুই কি চাস?"

মেহু চুপ হয়ে গেল।

সেদিন রাতে মেহু নদীর পাড়ে গেল। সেই কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসলো। যেখানে আরিফের সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল।

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, "আরিফ, তুমি কোথায়? তুমি কি আমাকে ভুলে গেলে? আমি তোমার অপেক্ষায় আছি। কিন্তু আমার আর শক্তি নেই।"

নদীর পানি বয়ে যাচ্ছিল। কেউ উত্তর দিলো না।

এদিকে ঢাকায় আরিফ সেদিন রাতে মেহুর ছবি দেখে কাঁদছিল।

সে তার ডায়েরিতে লিখলো -

> "মেহু, তুমি কেন ফোন ধরো না? আমি জানি তুমি রাগ করেছো। কিন্তু আমি কি করবো? আমার মা অসুস্থ, বোনের বিয়ে। আমি একা সব সামলাতে পারছি না। তুমি যদি পাশে থাকতে, আমি সব পারতাম।"

সেদিন দুজন দুই শহরে একই আকাশের নিচে কাঁদছিল। অথচ কেউ কারো কান্না দেখতে পাচ্ছিল না।

এটাই তো অপূর্ণ ভালোবাসা। ভালোবাসা আছে, কিন্তু একসাথে থাকার উপায় নেই।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন