ফন্ট সাইজ:
থিম:
অসমাপ্ত স্মৃতি

পর্ব 1

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস জুলি

আজ রবিবার সপ্তাহের প্রথম দিনে স্কুলে যাচ্ছে রাধিতা। দিনটি অন্য দিনের মতো সুন্দর নয় আকাশে কেমন গম্ভীর মেঘ জমেছে। তাও যেন তার স্কুলে যেতেই হবে।

রাধিতার বাড়ির সদস্য সংখ্যা চারজন। রাধিতা, রাধিতার ভাই এবং তাদের বাবা-মা। ছোট্ট এই পরিবারে সবসময় যেন খুশির রোল পড়ে যায়।

রাধিতার বাবার নাম আসলাম সিকদার।এবং তার মায়ের নাম রাফিয়া সিকদার। রাফি আরেকটি বড় ভাইও আছে যার নাম রিপ্ত।
রিপ্ত তাদের বাবা মায়ের সাথে থাকে না। সে একজন কানাডা প্রবাসী। সে প্রবাসে গেছে চার বছর হয়েছে। আর ছয় মাস বাদে বাড়ি আসবে হয়তো। রিপ্তর বয়স ২২ বছর। আর্থিক সমস্যা থাকার কারণে তাকে এ বয়সে প্রবাসে যেতে হয়েছে। রিপ্ত একজন খুব মেধাবী ছেলে এজন্য প্রবাসে গিয়ে ও তার বেশি খাটনির কাজ করতে হয়নি। ওখানে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ভালো অংকের স্যালারির জব করে।

আসলাম সিকদার একজন প্রাইভেট হাই স্কুলের শিক্ষকতা করতেন। সেজন্য পেনশনের সুবিধা ছিল না তাই নিজের ছেলেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রবাসী পাঠিয়েছেন। অবশ্য রিপ্ত ই বলেছিলো সে প্রবাসে যেতে চাই। কিন্তু বাবা হিসেবে সে তো জানতেন তার ছেলে কত টা আত্মত্যাগী। পরিবারের সুখের জন্য সবকিছুই করতে রাজি। কার্তিক বিবেচনা করে তিনিও আর অমত করেননি। রাফিয়া সিকদার একজন খাঁটি বাঙালি গৃহবধূ। সংসার ছাড়া যেন কিছুই বুঝেন না। এটুকুই যেন তার কাছে সব।

ওনারা ছাড়া আরও একজন সদস্য আছে বাড়িতে তার নাম মিমি। মিমি রাধিতার পোষা বিড়াল ছানা।এটি যেন রাধিতার প্রাণ।মিমিকে ছাড়া একদিনো চলে না তার।

প্রতিদিনের অভ্যাসে আজকেও গোসল করে রেডি হয়েছে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার সময় মিমিকে আদর করতেও ভুলেনি।
যাওয়ার পথেই তার বান্ধবীর বাসা। তার বন্ধু-বান্ধব বলতে ওই একজনই আছে। যে তাকে খুব ভালো করে বুঝে। তার নাম সুধা। বাসার সামনে এসে রাধিতা হাঁক ধরে ডাকলো,

__এই সুধাআআআ! আর কতক্ষণ লাগবে দ্রুত রেডি হহ। এতক্ষণ সময় লাগে রেডি হতে। তাহলে কিন্তু আমি তোকে রেখেই চলে যাব। বের হহ খরগোশ ছানা কোথাকার।

__রাধিতার বাচ্চা আআআ! আমি তোকে ছাড়বো না। তোকে কতদিন বলেছি আমাকে এ নামে ডাকবি না বদমাইশনী।

দুই বান্ধবীর এমন ঝগড়া দেখে সুধার মা চেচিয়ে বললেন,

__তোরা কি বড় হবি না। একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারবে না আবার দুই বাড়ি ঝগড়া করে মাথায় তুলবে । এদের নিয়ে আমি আর পারলাম না।

রাধিতাকে সোফায় বসতে বলে রান্নাঘরে চলে গেলেন। এখন তার নাস্তা বানাতে হবে। এটা যেন তার রোজকার নিয়ম। তিনি রাধিতা আর সুধাকে কখনো আলাদা চোখে দেখেননি। তার যেন সন্তান বলতে এ দুটোই আছে। এখন তিনি দুজনের জন্যই নাস্তা বানাবে। অন্যদিকে রাধিতা সোফায় গিয়ে একপ্রকার শুয়েই পড়েছে। রাধিতা আবারো চেঁচিয়ে ডাকলো,

__এই তুই কি আসবি নাকি আমি চলে যাব। তোর জন্য যদি দেরি হয়েছে তাহলে তোর খবর আছে বলে দিচ্ছি কিন্তু। তাড়াতাড়ি আয় কচ্ছপ কোথাকার।

সুধা এবার রাগে গজগজ করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এলো রেডি হয়ে। তার রাগ এবার আকাশ ছুঁয়েছে চেঁচিয়ে বলল,
__তোর আজকে খবর আছে। দাঁড়া বলছি রাতের বাচ্চা।

রাধিতা এবার উঠে দৌড়ানো শুরু করলো। সুধার মা জানেন এবার কি হবে। দুজনে এবার একে অপরকে দৌড়ানি দিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে যাবে। আর তার নাস্তা ঠান্ডা হয়ে যাবে। শেষে তাকেই সব খাওয়া লাগবে। তিনি এবার পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলবেন,

__কিরে নাস্তা করে যাবি না । এত কষ্ট করে আমি নাস্তা বানিয়েছি। সবগুলো তো ঠান্ডা হয়ে যাবে অন্তত টিফিনে করে নিয়ে যা। আজ যদি নাস্তা না করিস তাহলে তোদের খবর আছে। বেয়াদব গুলো।

কে শুনে কার কথা তারা তো এতক্ষণে সীমানা পার হয়ে গেছে। এ যেন তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। নাস্তা না করার জন্য দুজনে এমন ঝগড়া লাগাই প্রতিদিন। সুধার মা হতাশ কন্ঠে বললেন,

__বাঁদর গুলোর জন্য হয়েছে আমার যত জ্বালা। একটা দিন যদি নাস্তা করে গিয়েছে। বাইরে গিয়ে ওসব হাবিজাবি খেয়ে পেট ব্যাথা নিয়ে আসবে আমার কাছে । আসুক তখন একবার দেখাবো দুটোকে মজা।

স্কুলের দুইটা পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরপরই স্কুল থেকে পেট ব্যথার অজুহাতে ছুটি নিয়ে চলে এসেছে । অবশ্য স্যারের সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু রাধিতার দক্ষ নাটকে স্যার ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছেন। সাথে একা যেতে পারবে না বলে সুধা কেউ জুটিয়েছে। কি যে চঞ্চল এই দুইটা মেয়ে। এরা ক্লাস থেকে চলে গেলে ক্লাসের প্রাণ যেন চলে যায়। ক্লাস টাইমে দুজনের আজগুবি গল্পের জন্য কতবার যে পানিশমেন্ট পেয়েছে স্যার ম্যামদের কাছে। একটু যদি লজ্জা হয়ে থাকে। দুষ্টুমিতে সবার উপরে এরা দুজন। আবার ছাত্রী হিসেবেও তেমনি মেধাবী। সহজে কেউ কিছু বলতেও পারে এদের। এজন্যই বুঝি এমন বিচ্ছু হয়েছে দুটো। রোজগার মতোই বাড়ি চলে গেল দুজন।

রাধিতাকে রাত বলেই ডাকে সবাই। আর তার মা একটু রেগেই বললেন,

___কিরে রাত আজকেও স্কুল ফাঁকি দিয়ে এসেছিস। আজ তোর বাবা আসুক বাজার থেকে আমি বলে দেবো তুই আবার ওই স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাসায় এসেছিস।

রাত নির্লিপ্ত হেসে জবাব দিল,

__যাও যাও বলে দাও । সমস্যা নাই বাবা আমাকে কিছুই বলবে না কারণ বাবা আমাকে অনেক ভালোবাসে।

বলে মায়ের দিকে মুখ ভেংচি দিল। এবং দৌড়ে গিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ল। তার মা এবার রেগে বললেন,

__ বাবার লাই পেয়ে পেয়ে কেমন বাঁদর হয়েছিস। ঠিক আছে আজ আমি তোর ভাইয়াকে ফোন করে বলে দেবো তুই দিন দিন বাঁদর হয়ে যাচ্ছিস।

রাত এবার তো ধরফরিয়ে উঠে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

__জানো মা সেকেন্ড পিরিয়ডে খুব পেট ব্যথা করছিল। মনে হয় গ্যাস্টিক হয়েছে বুঝলে। এজন্যই আমি আর সুধা ছুটি নিয়ে এসেছি। প্লিজ তুমি ভাইয়াকে কিছু বলো না। সত্যি বলছি।

রাশিয়া সিকদার বলল,

__যতই অজুহাত দিস না কেন আজ তো আমি বলবোই। তুই অনেক বেশি বাঁদর হয়ে গেছিস।

__প্লিজ মা প্লিজ! আর কখনো এমন করবো না। দয়া করে তুমি ভাইয়াকে কিছু না। ভাইয়া জানতে পারলে আমাকে খুব বকবে প্লিজ।

মা মেয়ের কথার মাঝখানে রিপ্তর কল আসে। রাফিয়া সিকদার চলে গেছেন ফোন ধরতে।এবং রাতকে বলে গেছেন গোসল করে জামা পাল্টে নিতে। ভাইয়ার সাথে কথা বলতে হবে। এই সুযোগে রাত দৌড়ে রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিল। কে কার সাথে কথা বলে। সে এখন গোসল করে মিমিকে নিয়ে খেলতে বসবে। যে কথা সেই কাজ। প্রায় ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে আসলো। পরনে নেভি ব্লু কালারের একটা ফ্রক সাথে একই রংয়ের পাজামা। রাতের সবথেকে গারো নীল রং বেশি পছন্দ। তার সবগুলো জামা নীল রঙেরই। এবং যেখানে অন্যান্য মেয়েদের গোলাপ ফুল পছন্দ।
সেখানে এই একমাত্র মেয়ে যার গোলাপ ফুল একদম দেখতে পারে না। তার পছন্দের ফুল চন্দ্রমল্লিকা। লাল রং, একেবারেই সহ্য করতে পারে না। কেন তা সে নিজেও জানেনা। একদিন সে সুধাকে লাল রংয়ের জামা পরতে দেখে দুদিন কথা বলেনি। লাল নাকি রক্তের প্রতিক আর রক্ত সে মোটেও সহ্য করতে পারে না। রক্ত দেখলে তার প্যানিক অ্যাটাক হয়। তার জন্য তার বাবা কোনদিন বাজার থেকে জীবিত মুরগি বাড়ি এনে জবাই করেনি। একবারে কেটে তারপরে আনতেন তাও কোনদিন তা খেতে দেখা যায়নি রাত কে। রাফিয়া সিকদার কোনদিন মেয়েকে এক পিস মুরগির মাংস খাওয়াতে পারেনি। আজও বাড়িতে মুরগী রান্না হয়েছে। সেজন্য খাওয়ার প্রতি তার কোন আগ্রহ নেই।
তাইতো ঘরে বসে খেলা করছে মিমির সাথে যাতে ক্ষুধা না লাগে। জোহরের আযান পরছে। তাই রাত নামাজ পড়ে কেবল শুয়েছে মাত্র ঘুমানোর উদ্দেশ্যে। হঠাৎ গম্ভীর স্বরে আসলাম সিকদার ডাকলেন,

__ রাত খেতে এসো খাবার ঠান্ডা হচ্ছে। আর একবার যেন আমার ডাকা না লাগে।

রাত দরজার ওপার থেকে মৃদুস্বরে বলল,
__ বাবা আমি খাব না বাড়িতে মুরগী রান্না হয়েছে। তোমরা খেয়ে নাও।

__তো কি হয়েছে মুরগি কি মানুষ খায় না নাকি একদিন খেলে কি এমন ক্ষতি হবে। আমি কিছু শুনতে চাই না দ্রুত খেতে এসো।

বলে তিনি চলে গেলেন। এদিকে রাত হবে না বলে অজুহাত সাজাচ্ছে তবে বাবার সাথে পেরে উঠতে বলে মনে হয় না। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যে আদর করবে, আবার শাসনও করবে। রাত বাবাকে ভয় না পেলেও বাবার কথার অবাধ্য হয় না। তাই বাধ্য হয়ে খেতে চলে গেল। টেবিলে এসে দেখল মা তার জন্য করলা ভেজে রেখেছে। তিনি জানতেন এই মেয়ে কখনো মুরগি খাবেনা। তাই তো তার জন্য আলাদা করে রান্না করেছেন। রাতের এই এক অদ্ভুত অভ্যাস আছে ও করলা যেতে খুব পছন্দ করে। যেখানে অন্য সবাই নাক সিঁটকায়। সেখানে এ মেয়ে কি তৃপ্তি করে যে করলাম দিয়ে ভাত চাই তা না দেখলে বোঝা যাবে না।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন