ফন্ট সাইজ:
থিম:
Beloved Predator

পর্ব 1

লেখক: Jannatul Naima

Beloved Predator

লেখিকা : জান্নাতুল নাঈমা

পর্ব ১

____

কালিগঞ্জে সেদিন সন্ধ্যা নামল অস্বাভাবিক তাড়াতাড়ি। বিকেল চারটা থেকেই কুয়াশা, সাতটায় এত ঘন যে রাস্তার বাতিগুলো শুধু হলদে ফোঁটার মতো দেখাচ্ছিল।

নদীর ধারের ছোট্ট রেস্তোরাঁর কোণার টেবিলে বসে ইন্সপেক্টর শাহনাজ খানম হাতের কফিতে চুমুক দিলেন। বদলি হয়ে এই শহরে এসেছেন দুই মাস। এই দুই মাসে একটা জিনিসই তাঁর ভালো লেগেছে, সামনের চেয়ারে বসা মানুষটা।

"আজও দেরি করলাম, তাই না?" আব্রাহাম খান হাসল। নীল শার্টের হাতা গুটানো, চুল সামান্য এলোমেলো। বত্রিশ বছরের মুখে এমন একটা নরম ভাব, যা দেখলে মনে হয় এই মানুষ জীবনে কাউকে কষ্ট দেয়নি। " আসলে ক্লোজিংয়ের হিসাব মেলাতে মেলাতে..."

"তুমি রোজই দেরি করো।"

"আর তুমি রোজই অপেক্ষা করো। তাই তো দেরি করতে সাহস পাই।"

শাহনাজ মুখ ফিরিয়ে হাসি লুকালেন। থানার সবাই জানে ইন্সপেক্টর খানম কড়া মানুষ। অপরাধী তাঁর সামনে কাঁপে, অধস্তনরা চোখ নামায়। শুধু এই মানুষটার সামনে তাঁর কড়া মুখোশ খুলে পড়ে।

আব্রাহাম ব্যাগ থেকে একটা ছোট কাগজের মোড়ক বের করল। "আজ বাজারে গিয়েছিলাম। দেখলাম, দোকানি শিউলি বেচছে। এই মৌসুমে নাকি শেষ।"

শাহনাজ মোড়ক খুলে অবাক হলেন। ভেতরে একমুঠো শিউলি, কুয়াশায় ভেজা, তখনও সতেজ।

"তোমার গল্পে বলেছিলে," আব্রাহাম নরম গলায় বলল, "ছোটবেলায় তোমার মা ভোরে শিউলি কুড়াতেন।"

শাহনাজ কিছু বলতে পারলেন না। কফির কাপের ওপর তাঁর আঙুলের পাশে আব্রাহামের বাঁ হাত এসে থামল। হাতের উল্টো পিঠে একটা পুরনো পোড়া দাগ, চামড়া কুঁচকে যাওয়া।

প্রথম দিন তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আব্রাহাম হেসে বলেছিল, ছোটবেলায় রান্নাঘরে দুষ্টুমির ফল।

সে বললো - "শাহনাজ," "একটা কথা বলব?"

শাহনাজ বললেন - "বলো।"

"তুমি যে আমার জীবনে এসেছ, এটা আমার কাছে একটা অলৌকিক ব্যাপার। আমি অনাথ ছিলাম, জানো তো। কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করত না। আর এখন..." সে একটু থামল, তারপর হাসল। "এখন একজন ইন্সপেক্টর শাহনাজ খানম আমার জন্য ঠান্ডা কফি নিয়ে বসে থাকে।"

শাহনাজ মুচকি হেসে আলতো করে তার হাতটা চেপে ধরলেন আর বললেন "সব সময় থাকবো"। বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছিল,কিন্তু এই ছোট টেবিলে উষ্ণ আলো জ্বলছিল।

নটার সময় আব্রাহাম তাঁকে থানার গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিল।

"কাল ডিনার করা যাবে?" সে জিজ্ঞেস করল।

"কাল দেখি। একটা পুরনো ফাইল নিয়ে বসতে হবে।"

"তাহলে আজই বলে রাখি," আব্রাহাম একটু ঝুঁকে এল, তার নিঃশ্বাসে শিউলির মৃদু গন্ধ, "সাবধানে থেকো। আজ রাতের আবহাওয়া আমার ভালো লাগছে না।"

সে হেঁটে কুয়াশায় মিলিয়ে গেল। শাহনাজ অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে হাসি, বুকে অদ্ভুত শান্তি।

___

ডাকঘরের পোস্টমাস্টার ইব্রাহিম উদ্দিন সেদিন দেরি করে কাজ শেষ করছিলেন।

বয়স ষাটের কাছাকাছি, চোখে মোটা কাচের চশমা, গায়ে পুরনো ধূসর চাদর। তিরিশ বছর ধরে এই চেয়ারে বসে আছেন। শহরের কার ঘরে কোন চিঠি যায়, সব তাঁর মুখস্থ।

নটায় ফোন বাজল। ঢাকা থেকে মেয়ে রুমানা রুমি।

"আব্বু, খেয়েছ?"

"এখনই খাব। তুই?"

"পরীক্ষা সামনে। শোনো, তুমি ঠিক আছ? গলাটা অন্যরকম লাগছে।"

ইব্রাহিম একটু চুপ করে থাকলেন। "রুমি, আমি একটা কাজ করব। কাল। অনেক আগে করা উচিত ছিল।"

"কী কাজ?"

"কাল ফোন করে বলব। এখন পড়তে বস।"

ফোন রেখে তিনি ড্রয়ার খুললেন। ভেতরে একটা পুরনো খাম, হলদেটে, কোণা ছেঁড়া। বিশ বছর ধরে এটা তিনি এ ড্রয়ার থেকে ও ড্রয়ারে সরিয়েছেন, ফেলেননি, খোলেনওনি। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ ঠিক করেছেন, আর না। কাল থানায় যাবেন।

খামটা হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করতেই কুড়ি বছর আগের সেই রাত ফিরে এল।

ধানকলের দিকে আকাশ লাল। বাতাসে পোড়া ধানের গন্ধ। তিনি সাইকেল থামিয়ে দেখেছিলেন, গুদামের পেছনের গেটের সামনে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে। আর দেখেছিলেন অন্য একটা জিনিস, যেটা কাউকে বলেননি, নিজেকেও না। জ্বলন্ত জানালা দিয়ে ছোট একটা ছায়া লাফিয়ে বেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিল।

ছায়াটা একটা শিশুর মতো ছোট।

পরদিন সরকারি তালিকায় লেখা হলো, ছয়জন নিহত। সাত নয়, ছয়।

বাতিটা কাঁপল। ঘড়িতে দশটা সাত। জানালার বাইরে বটগাছের নিচে মনে হলো কেউ দাঁড়িয়ে আছে। স্থির, নিঃশব্দ। চশমা ঠিক করে তাকাতেই কেউ নেই। কুয়াশার খেলা।

ঠিক তখন পেছনে মেঝেতে খুব হালকা একটা শব্দ হলো।

ইব্রাহিম ঘুরলেন না। বিশ বছর ডাক বিলি করা মানুষ জানে, কোন শব্দ বাতাসের আর কোনটা মানুষের। এটা মানুষের। ধীর, সাবধান পায়ের শব্দ।

"কে?" তাঁর গলা কাঁপল না। এটাই তাঁকে অবাক করল।

বাতিটা একবার দপ করে নিভে আবার জ্বলে উঠল। আর সেই এক মুহূর্তের অন্ধকারের পর কাউন্টারের কাচে তিনি প্রতিফলনটা দেখলেন।

লম্বা একজন মানুষ। মাথায় কালো হুডি টানা, মুখে কালো মাস্ক। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। অস্বাভাবিক স্থির, পলকহীন। মনে হলো সে অনেকক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে ছিল, ইব্রাহিমের নিঃশ্বাস গুনছিল।

ইব্রাহিম ধীরে ঘুরলেন। "আপনি কী চান?"

লোকটা মাথা সামান্য কাত করল, কৌতূহলী শিশুর মতো, যে একটা পোকাকে পরীক্ষা করছে। ডান হাত হুডির পকেটে ঢুকল। ইব্রাহিমের বুক ধক করে উঠল। ছুরি? পিস্তল?

না। বেরিয়ে এল একটা সাদা কাগজ।

কালো গ্লাভস পরা হাতে সে কাগজটা কাউন্টারে রেখে আঙুলের ডগায় ঠেলে এগিয়ে দিল। সবকিছু এত শান্ত, যেন সে ডাকঘরে চিঠি জমা দিতে এসেছে।

ইব্রাহিম কাগজটা তুললেন। হাত কাঁপছিল।

কালো কালিতে সুন্দর, গোটা হাতের লেখায় ছয়টা নাম। প্রথম পাঁচটার ওপর লাল কালির কাটা দাগ। ছয় নম্বর নামটা কাটা হয়নি।

*ইব্রাহিম উদ্দিন।*

তাঁর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। এই পাঁচটা নাম তিনি চেনেন। কুড়ি বছর আগের রাতে যারা ধানকলের আশেপাশে ছিল, সবকিছু জেনেও চুপ ছিল। গত দুই বছরে একে একে পাঁচজনই মারা গেছে। কেউ "দুর্ঘটনায়", কেউ "আত্মহত্যায়", কেউ "রোগে"। শহর শুধু বলেছে, আহা, বয়স হয়েছিল। কেউ জোড়া লাগায়নি।

ইব্রাহিমও না। আজ রাত পর্যন্ত।

"আপনি..." তিনি ফিসফিস করে বললেন। "আপনিই সবাইকে..."

লোকটা এবার শব্দ করল। হাসি নয়, তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু। মাস্কের ভেতর থেকে একটা নিচু, ভাঙা, ছন্দময় শ্বাসের শব্দ, যেন গভীর কূপের তলা থেকে কেউ আনন্দ করছে।

সে একটা আঙুল মাস্কের ঠোঁটের জায়গায় তুলল। *চুপ।*

তারপর পকেট থেকে একটা পোড়া দেশলাইকাঠি বের করে কাউন্টারে রাখল।

ইব্রাহিমের পা ঠান্ডা হয়ে এল। ঘরে যেন পোড়া গন্ধে ভরে গেল। "তুমি... তুমি ওই রাতের..." বাক্য ভেঙে গেল। জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়া সেই ছোট ছায়াটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। "তুমি বেঁচে ছিলে?"

লোকটার চোখে প্রথমবার কিছু একটা ঝলকে উঠল। বিশ বছরের জমা কিছু, যার নাম ঘৃণা বললে কম বলা হয়।

বাতিটা আবার নিভল। এবার আর জ্বলল না।

অন্ধকারে ইব্রাহিম খামটা ধরতে হাত বাড়ালেন। আঙুলে ঠেকল ঠান্ডা কাগজ। ঠিক তখনই কাঁধের ওপর একটা ভারী, শান্ত হাত এসে নামল। গ্লাভস পরা হাত। কানের খুব কাছে, প্রায় স্নেহের গলায়, কেউ ফিসফিস করে বলল:

*"বিশ বছর অনেক চুপ ছিলেন, পোস্টমাস্টার সাহেব। আজ রাতে একটু বেশি চুপ থাকবেন।"*

_____

রাত এগারোটা চল্লিশে শাহনাজের ফোন বাজল।

তিনি বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফাইল পড়ছিলেন। স্ক্রিনে নাম: *আব্রাহাম।*

"ঘুমাওনি?" ওপাশ থেকে আব্রাহামের গলা, একটু হাঁপানো, যেন দৌড়ে এসেছে।

"না। তুমি এত রাতে?"

"শুধু জানতে চাইছিলাম, বাড়ি ফিরেছ ঠিকমতো। কুয়াশা বাড়ছে।" একটু থেমে সে বলল, "আমি ফ্ল্যাটে ফিরতে ফিরতে দেরি হলো। রাস্তাটা বন্ধ ছিল।"

"কোথায় ছিলে এতক্ষণ?"

"অফিসের কাজে। কেন, সন্দেহ করছ ইন্সপেক্টর?" তার হাসির শব্দ নরম, উষ্ণ।

শাহনাজ হাসলেন। "হ্যাঁ। তুমি বড্ড বেশি ভালো মানুষ। এটা সন্দেহজনক।"

"তাহলে গ্রেফতার করো আমাকে।"

"কাল সকালে।"

"শুভরাত্রি, শাহনাজ। আর শোনো... স্বপ্নে আমাকে দেখো।"

ফোন রেখে শাহনাজ বালিশে মাথা রাখলেন। মুখে হাসি ধরে রেখেই ঘুমিয়ে পড়লেন।

____

ভোর ছয়টায় থানার ফোন তাঁকে জাগিয়ে দিল।

ডাকঘরের সামনে ভিড়। ঝাড়ুদার সালেহা মাটিতে বসে কাঁদছে। কাউন্টারের পেছনে ইব্রাহিম উদ্দিন চিত হয়ে পড়ে আছেন, চোখ খোলা, ঠোঁটে আঙুলের একটা অদ্ভুত চিহ্নের মতো নীলচে দাগ। কোনো রক্ত নেই, কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই।

শুধু কাউন্টারের ওপর সাজানো দুটো জিনিস।

ছয় নামের কাগজ, যার ওপর ছয় নম্বর নামটা এখন লাল কালিতে কাটা।

আর একটা পোড়া দেশলাইকাঠি।

শাহনাজ হাঁটু গেড়ে বসে কাগজটা তুললেন। প্রথম পাঁচটা নাম পড়তে পড়তে তাঁর চোখ আটকে গেল চতুর্থ নামে। তারপর পঞ্চম নামে।

*আনোয়ার খান।*

তাঁর বাবার নাম।

শাহনাজের হাত থেকে কাগজ খসে পড়ল। আর ঠিক তখন ভিড়ের পেছন থেকে একটা পরিচিত গলা ভেসে এল।

"শাহনাজ?"

আব্রাহাম দাঁড়িয়ে ছিল, মুখে উদ্বেগ, চোখে গভীর মমতা। "আমি খবর শুনে ছুটে এলাম। তুমি ঠিক আছ?"

শাহনাজ তার দিকে তাকালেন। চোখে জল, গলায় শব্দ নেই।

আব্রাহাম এগিয়ে এসে তাঁর কাঁধে হাত রাখল, বাঁ হাত, যার পিঠে পুরনো পোড়া দাগ। আর শাহনাজ প্রথমবার কোনো কারণ ছাড়াই ভাবলেন, এই হাতের স্পর্শ আগে কোথায় যেন অনুভব করেছি।

কিন্তু ভাবনাটা তিনি সরিয়ে দিলেন। এখন সময় নেই।

চলবে....

---

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন