১"
কীরে ও শ্যামা তরে যে তোর মা কখন থাইকা ডাকতাছে সে দিকে কী কোনো খেয়াল আছে, যা যা তাড়াতাড়ি বাড়ি যা নাহলে তোর পিঠের একটা বাড়িও নিচে পরবো না।
শ্যামা নামের মেয়েটি পুকুর পাড়ের কিনার থেকে হেলেঞ্চা শাক তোলা বাদ দিয়ে পিছন ঘুরে মহিলাটিকে চেঁচিয়ে বলে,
কী হয়েছে গো মাসি, মা তো আমাকে শাক তুলতে পাঠাইছে তাহলে ডাকছে কেন?
মহিলাটা মুখ কুচকে বলে,
হারামজাদি সেটা আমি কেমনে জানমু তরে কেন ডাকে, কথা না বারাইয়া যা জলদি তর মা সেই রকম রাইগা আছে।
শ্যামা সতি দেবীর আর কথা না শুনেই শাক ভর্তি পলিথিন নিয়ে দৌড় দেয় বাড়ির উদ্দেশ্য, শ্যামার এমন দৌড় দেখে পিছন থেকে সতি দেবী চেচিয়ে বলে,
আস্তে যা শ্যামা পিছলা রাস্তা উল্টে পড়তে বেশিক্ষণ লাগবে না।
কে শুনে কার কথা শ্যামা যেনো এবার আরো জোরে ছুট লাগায়, দশ মিনিটে রাস্তা সে পাঁচ মিনিটেই শেষ করে ফেলে। বাড়ির সদর দরজায় দাড়িয়েই শুনতে পাচ্ছে তার মা তাঁরা বেগমের চেচামেচি।শ্যামা মুখ গোমরা করে বাড়ির ভেতরে এগোতে এগোতে ভাবতে থাকে।
নিশ্চয় মা সব জেনে গেছে আজ আমায় আচ্ছা মতো ঝারবে।
হঠাৎ লাঠির বাড়ি খেয়ে শ্যামার চিন্তা ভাবনা গুলো পালিয়ে যায়, হাতে থাকা শাক ভর্তি পলিথিন মাটিতে ফেলে লাফিয়ে উঠে চেঁচিয়ে বলে,
মা হাতটা বুঝি ফেটে গেলো এভাবে মারলে কেন উফ কী ব্যাথা করছে।
তাঁরা বেগম রাগে গজগজ করতে করতে আরেকটা বাড়ি বসিয়ে দেয় শ্যামার পায়ে এবার বেচারি শ্যামা ব্যথায় হু হু করে কেঁদে ওঠে।
তাঁরা বেগম চেঁচিয়ে বলে,
শ্যামা একদম মুখ দিয়া শব্দ বের করবি না, একবারে মেরে এখানে পুতে রাখবো বেয়াদব মেয়ে সারাদিন খালি টইটই করে ঘুরে বেড়াস, আর কী শুনলাম তোর নামে ফেল করছোস এবারও তুই কী মানুষ হবি না আমার নাক কান না কাটলে কী তর শান্তি হয় না মাগি, তোর বাপেরে এতো কইরা কই বিয়া দিয়া দিতে শুনে না আমার কথা আহ্,তোরে বিয়া করবোই বা কেডা না আছে চেহারা না আছে কোনো গুন আর না আছে টাকা যে তরে যৌতুক দিয়া বিদায় দিবো তুই যে সংসারে যাবি সে সংসার জ্বালিয়ে খাবি।
তাঁরা বেগম শ্যামাকে নিয়ে আরো কটু কথা বলতে বলতে ঘরের দিকে চলে যায় আর শ্যামা মায়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে পরে থাকা শাকগুলো তুলে কলপাড়ের দিকে রওনা দেয়।
শ্যামা মুসলিম ঘরের মেয়ে হলেও তার নামটা সনাতন ধর্মের।এই নামটা রেখেছিলো তার দাদা। শ্যামার গায়ের রং শ্যাম হওয়ায় ভালোবেসে নামটি রেখেছিলেন তার দাদা এবং শ্যামাকে তিনি ভালোবেসে শ্যামকন্যে বলে ডাকতেন। যখন সবাই এই নাম নিয়ে প্রশ্ন তুলতো তখন শ্যামার দাদু বলতেন নাম তো নাম এতে ধর্মের বিভেদ করার কী আছে। সনাতন ধর্মে বা অন্য ধর্মেও যেমন মা কে মা বলেই ডাকা হয় তেমনি আমরাও মাকে মা বলেই ডাকি তাহলে কেন আমরা অন্য ধর্মের নাম ব্যবহার করতে পারবো না। ওরাও মানুষ আমরাও মানুষ এতে সমস্যা কোথায়।
নুরুল ইসলাম এবং শেতাঁরা বেগমের দ্বিতীয় কন্যা শ্যামা তার পুরো নাম ফাতেমা বিন্তে শ্যামা। এতোদিনে সে কলেজে উঠে যেতো কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত ফেল করায় অষ্টম শ্রেণিতে তাকে দুবার থাকতে হয়েছে। শ্যামা বরাবরেই ফেল্টুস মানে কাঁচা ছাত্রী, এবার সে দশম শ্রেণিতে পরে তবে প্রথম এবং দ্বিতীয় মডেল টেস্ট এ ফেল করেছে। শ্যামা তিন বোন এক ভাই।
বড় বোনের বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামে। শ্যামা এবং তার ছোট বোন নিশি এরা পিঠাপিঠি মানে একবছর পাঁচ মাসের ছোট বড় তবে নিশি রুপে গুনে যেনো লক্ষী সে বাসার কাজ সহ পড়ালেখাও বেশ ভালো, নিশি শ্যামা একই শ্রেণিতে পরে কারণ শ্যামা ফেল করায় একই শ্রেণিতে দু বার থেকেছে তবে নিশির সঙ্গে শ্যমার সম্পর্ক তেল জলের মতো এরা যেনো একে অপরের সাথে মিশতেই চায় না।
শ্যামা শাকগুলো ভালো করে ধুয়ে রান্না ঘরে নিয়ে আসে, শাকগুলো এক পাশে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখে রান্না ঘরের ময়লা আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করতে আরম্ভ করে।
যখন শ্যমার কাজ শেষ প্রায় তখনি রান্না ঘরে আগমন ঘটে তাঁরা বেগমের, শ্যামা তার মাকে দেখে মিষ্টি হেসে বলে,
মা দেখো রান্না ঘরটা একদম ঝকঝকে করে দিয়েছি আর শাক ও ধুয়ে রেখেছি তোমার অনেক কাজ এগিয়ে দিয়েছি মা এবার তুমি খুশি তো।
তাঁরা বেগম মেয়ের দিকে একবার চেয়ে রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বলেন,
খুশি করে উদ্ধার করেছিস মা আমার,যা বিদায় হ এখান থেকে রান্নাটাও আজ পর্যন্ত শিখতে পারলি না পরের বাড়ি গিয়া কী করবি উঠতে বসতে ঝাটার বাড়ি খাবিরে হারামজাদি।
শ্যামা তার মায়ের কথা শুনে আরালে মুখ ভেঙ্গচি দিয়ে শান্ত সুরে বলে,
মা তুমি কথায় কথায় এমনে গালি দিবা না তো শুনতে খারাব লাগে আর তুমি আমার কোনো কাজে কেন সন্তুষ্ট হও না আমি কালো বলে কী সবার মতো আমার কোনো কাজ তোমার ভালো লাগে না।
শ্যামা শেষের কথাটা হাসতে হাসতে বলে যা শুনে তাঁরা বেগমের গা জ্বলে যায় চুলার পাশ থেকে খড়ি তুলে ছুরে মারে শ্যামার দিকে অমনি শ্যামা দৌড়ে উঠানে চলে যায় আর এদিকে তাঁরা বেগম চিল্লিয়ে বলে,
বেশি কথা শিখে গেছিস বলি নি তোকে আমার মুখে মুখে কথা বলবি না।মায়েদের কাছে সন্তান কালো না ফর্সা এসবের কোনো ভেদাভেদ নাই রে আবার যদি এসব আজেবাজে কথা বলিস তো ঘার ধরে বাড়ি থেকে বেড় করে দিবো বিয়াদব।
শ্যামা মায়ের কথা কানে না নিয়ে বের হয়ে যায় বাড়ি থেকে তার উদ্দেশ্য এখন বাগানে যাওয়া, জায়গাটা শ্যামার পছন্দের জায়গা চারপাশে যেনো সবুজের সমাহার ছোট বড় বিভিন্ন ফল ও ফুল গাছে ভরপুর বাগানের সামনে আছে একটি বৃহৎ শানবাঁধানো পুকুর। গ্রামের অনেকে দুপুরে স্নান করতে বা কাপড় ধুতে আসে এই পুকুরে। তবে এই বাগানে কোনো ফল কিংবা ফুল নির্ধারিত চাষ করা হয় না এটা একটি পরিত্যাক্ত বাগান বর্তমান জঙ্গলের রুপ ধারণ করেছে বাগানটি।
পুকুরপাড়ের পুরনো শানবাঁধানো ঘাটে বসে শান্ত পানির দিকে তাকাতেই শ্যামার মনে পড়ে দাদুরমুখের সেই গল্পগুলো। এই পরিত্যক্ত বাগান, ক্ষয়ে যাওয়া মন্দিরের ইট—সব নাকি একসময় ঠাকুরদের ছিল।
এছাড়া শ্যামা ছোট থেকে শুনে এসেছে এই বাগানটি নাকি ঠাকুর বংশের বাগান বহু আগে এই বাগানটি নির্মাণ করা হয়েছিলো।লোক মুখে শোনা যায় প্রাচীন কালে নাকি এ গায়ে অন্য ধর্মের তুলনায় সনাতন ধর্মের মানুষরা বেশি ছিলো এখানকার জমিদার বংশ ছিলো ঠাকুর বংশ তাদের বেশ কিছু চিহ্ন রয়েছে এ গ্রামে প্রায় কয়েকটি ছোট বড় মন্দির রয়েছে তবে বেশিরভাগ গুলো ধংসস্তুপে পরিনত হয়েছে। বর্তমান গ্রামে তিনটি মন্দির অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।সময় পেরোতে পেরোতে এখানে মুসলিমদের সংখ্যা বেড়ে যায় পরে এক সময় এখানে জমিদার হয়ে ওঠে পাঠান বংশ, কিন্তু এও শোনা যায় পাঠান পরিবার এবং ঠাকুর পরিবারের মধ্যে ছিলো নাকি সুন্দর বন্ধুত্ব।
তবে কোনো জটিল সমস্যার কারণে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। লোকমুখে শোনা যায় পাঠান বাড়ির ছেলের সাথে নাকি ঠাকুর বাড়ির মেয়ের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো যা জানাজানির ফলে দুপরিবারের মধ্যে যেনো এক অদৃশ্য দেয়াল সৃষ্টি হয়। সনাতন ধর্মের মেয়ের সাথে মুসলিম ধর্মের ছেলের সম্পর্ক কোনো পরিবার মেনে নিতে চাইবে না। হাজার হক দুই পরিবারের সম্মানের ব্যাপার এছাড়া এ সম্পর্ক ছিলো দুধর্মেই হারাম। পরবর্তীতে ঠাকুর বাড়ির মেয়েকে একপ্রকার জোর করে তাদের ধর্মের ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া হয় এবং বিয়ের দিনে পাঠান বাড়ির ছেলেটি আত্নহত্যা করে তার দুইদিন পরে নাকি ঠাকুর বাড়ির মেয়েটি ও নিজের প্রান ত্যাগ করে।এভাবে একটি ভালোবাসা সমাপ্তি ঘটেছিল।
এ ঘটানার পর থেকে এই দুপরিবারের মধ্যে সম্পর্ক যেনো আগুনে ঘীর ঢালার মতো হয়ে যায়। সে ঘটনার কয়েক বছর পর মূলত মুক্তিযুদ্ধের পর পর ঠাকুর বংশের সকলে ইন্ডিয়ায় একেবারে জন্য চলে যায় নিজেদের বসতবাড়ি ছেড়ে। তবে গ্রামের বেশ কিছু জায়গা তারা বিক্রি করে যায় আর যেগুলো বিক্রি করা হয় নি ওগুলো এখন মানুষের দখলে।
শ্যামা পুকুরের পানি থেকে চোখ সরাতেই চাঁদ বেগমের লক্ষ্য করে।সেই থেকে সে সানের ওপর বসে চাঁদ বেগমের কাপড় ধোঁয়া দেখছিলো আর কী জানি ভাবছিলো হঠাৎ চাঁদ বেগমের ডাক শুনে শ্যামার ভাবনার মাঝে ব্যাঘাত ঘটে শ্যামা মুখ কুচকে বলে,
কী হয়েছে খালা ডাকছো কেন?
চাঁদ বেগম উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে বললেন,
কেবল কানে গেলো কথা কখন থাইকা ডাকতাছি শুনোস না এই কাপড়ের বালটিটা নিয়া আমারে একটু বাড়ি পর্যন্ত আগাই দিয়ায় তো।
কথাগুলো কানে যেতেই শ্যামা বিরক্তি নিয়ে বললো,
আমি এখন বাসায় যাবো না খালা তুমি নিয়া যাও।
"তুই নিয়া যাবি নাকি তোর বাপেরে বিচার দিবো কোনটা।
শ্যামা চাঁদ বেগমের দিকে আর চোখে তাকিয়ে মুখ ভেংচি দিয়ে মনে মনে বলে,
আমায় দেখলেই এই মহিলার যতো কাজের কথা মনে পরে আর একটু কিছু হলেই বাপের ভয় দেখায় হুহ্ বজ্জাত মহিলা।
"কিরে কি হলো কী ভাবস তাড়াতাড়ি যা।
শ্যামা বিরক্তি নিয়ে বলে,
যাচ্ছি তো খালা এত অধৈর্য হচ্ছো কেন আ,,
শ্যামার আর কথা না শুনেই চাঁদ বেগম রেগে শ্যামার পিঠে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেন সঙ্গে সঙ্গে শ্যামার চোখে যেনো পানির ভির জমে।
চাঁদ বেগম রেগে মুখ কুঁচকে বললেন,
তুই খুব বার বারছিস শ্যামা তোর বাবরে বিচার না দিলেই নয় দিন দিন বেয়াদব হচ্ছিস ভুলে গেছিস আমি তোর কে হই,,
শ্যামা মনে মনে খালাকে গালি দিতে দিতে কাপড় ভরা বালটি নিয়ে এগিয়ে যায় বাড়ির উদ্দেশ্যে।
শ্যামা বাড়িতে এসেই কাপড়ের বালটি উঠানে রেখেই মায়ের কাছে চলে যায়। চাঁদ বেগম এখনো বাসায় পৌঁছায় নি আসতে তার এখনো দেরি পথে যে সে এখন গল্পের আসর জমিয়েছে প্রতিবেশিদের সাথে।
শ্যামা তাঁরা বেগমের কাছে বসে কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে চাঁদ বেগমের নামে বিচায় দেয়,
মা খালা আমারে কতো জোরে পিঠে থাপ্পড় মারছে। তুমি জানো পরশুদিন ঝাড়ু দিয়া দুইটা বাড়ি দিছিলো আমি কিছুই করি নাই,তার কাচের চুরি ভাঙ্গছে সিয়াম আর দোষ দিছে আমার।
তাঁরা বেগম মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, তোকে বলছি না ওর থেকে দুরে থাকতে তার পরও কেন ওর কাছে যাস।
আমি তো যাই না মা খালাই সবসময় আমার সামনে আসে বিশ্বাস করো।
তাঁরা বেগম শ্যামার পিঠ থেকে হাত সরিয়ে খুন্তি দিয়ে তরকারির নারতে নারতে বলে,
তোকে আমি ভালো করেই চিনি আর কে কার সামনে যায় তাও যানি।
শ্যামা কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাগ নিয়ে বলে,
"শুনো মা তুমি আব্বারে খালার নামে বিচার দিবা বলে দিলাম। নিশি যখন কোনো অকাজ করলে তুমি ওকে বকলে যেমন খালা আব্বারে মিথ্যা বিচার দিয়া তোমারে কথা শুনায় তেমন তুমিও আব্বারে খালার নামে বিচার দিয়া তারে কথা শুনাইবা বুঝতে পারছো।
তাঁরা বেগম এবার বিরক্ত হয়ে বললেন,
এতো কথা বলিস কেন এমনি এমনি মার খাস। যা এখান থেকে।
শ্যামা তাঁরা বেগমের কথায় একটুও নড়লো না তা দেখে তাঁরা বেগম শান্ত স্বরে বলেন,
কুকুর যদি তোকে কামড় দেয় তাহলে কী
তুই ও কী কুকুরকে কামড় দিবি শ্যামা।
সঙ্গে সঙ্গে শ্যামা মাথা নেরে না বলে,
আমি কেন ঐ ময়লা কুকুরকে কামড় দিবো মা ইয়াক আমার ভাবতেই তো গা গুলিয়ে আসছে।
শ্যামার কথা শুনে তাঁরা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
তোকে কথাটা বললাম কিছু বোঝানোর জন্য আর তুই কোথায় চলে গেলি আসলেই তুই একটা গাঁধা।চুলায় ঠিক মতো জ্বাল দে আর একটু পর পর তরকারি নারা দিবি আমি মাছ গুলা ধুয়ে আনছি,
"আচ্ছা মা তুমি যাও।
তাঁরা বেগম চলে যেতেই শ্যামা রান্না ঘরের তাক থেকে বিস্কুটের বক্স বের করে তিনটা বিস্কুট নিয়ে যথা স্থানে বক্সটা রেখে বিস্কুট খেতে খেতে মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজ করতে থাকে।
#চলবে
#শ্যামকন্যা
#ছুরাইয়া_আক্তার