#কলাবতী
#পর্ব-৩
#সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)
“বাড়ির বউয়ের এতো খাওয়ার চাহিদা কেন থাকবে?বাপের ঘর থেকে খেয়ে পড়ে আসেনি?”
নিলু ভাসুরের কথা শুনে মাথা নিচু করে রইল। একটা ফুচকা খাওয়ার জন্য এতোগুলো মানুষের সামনে এতোটা অপমান হতে হবে কখনো চিন্তাও করেনি।তার বাবা সত্যিই তার ইচ্ছে কোনো দিন পূর্ণ করেনি।বয়স সতেরো হতে না হতেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। না কোনো একটা শখের জিনিস না খাবার কিছুই সে ওভাবে পায়নি।দাদী বলতো মেয়েরা পরের ঘরের ধন।তার পিছনে যতো কম খরচ করা যায় ততোই ভালো।আর শ্বশুর বাড়ি এসে জানতে পারলো বাবার বাড়িই ছিল শখ আহ্লাদের জায়গা।শ্বশুর বাড়িতে বাড়ির বউদের পানি খেতে হলেও চিন্তা করতে হয়। না হলে ওদিন রাতে যখন প্রচন্ড গরমে হাপিত্যেশ অবস্থা তখন ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি বের করে গ্লাসে ঢালছিল তখন কোথা থেকে তার শ্বশুর এসে রাত বিরেতে বেশ কথা শোনালো।পরদিন সকালবেলা থেকেই ফ্রিজে তালা দেওয়া শুরু হয়েছে। নিলু নিজের মুখকে একশ একটা অভিশাপ দিলো।কেন খেল সে?
“মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে না থেকে চোখের সামনে থেকে সরতে বলো তো মা ওকে।সারা দিন পর বাড়ি এসে এসব যন্ত্রণা ভালো লাগে না।তোমার বড় বউয়ের আট মাসের পেট, সে খেতে চাইলো বলে ফুচকা আনলাম আর তোমার এই ন্যাবা বউ সেটাও ছাড় দিলো না।”
"দাঁড়া সমশের। একটা কথা বল আমাকে।"
"আবার কি?"
"তোর বউয়ের জন্য কয়টাকার ফুচকা এনেছিস?"
"একশ টাকার।মেয়েটা মন ভরে খাবে তাই।"
"এনে তাহলে ছোটো বউয়ের হাতে কেন দিলি?"
"সব কিছু আলাদা আলাদা এনেছি।বানিয়ে দিবে না?"
"ওর কি ঠ্যাকা পড়েছে? তোর বউয়ের ফরমায়েশ খাটার?"
"জা হিসেবে এটুক করবে না?"
"কেন করবে? ভাসুর হিসেবে যদি তুই তোর ভাইয়ের বউয়ের একটা ফুচকা খাওয়া মেনে নিতে না পারিস, জা হিসেবে ও কেন করবে?তোর বউয়ের আর কোনো কাজে ওকে ডাকবি না।"
"হাসালে মা।খাচ্ছে কার কামাই?ছেলে বিয়ে করিয়েছো বউয়ের দিকে তো ফিরেও চায় না।থাকতেছেই তো আমার দয়ায়।"
"আমি এখনো বেঁচে আছি।তুই নিজেই কিন্তু আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছিস।ভেবে চিন্তা করে কথা বলিস।"
নিলু রান্না ঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সবটা শুনলো।কেবল শুনলো না, ওড়নায় চোখ মুছলো বার বার।তিন মাসের বিয়ের জীবনে সেটা এটা বুঝে গেছে এই বাড়িতে তাকে কেউ সম্মান করবে না।করবে কি করে যার স্বামী তাকে দেখতে পারে না,বাবা ভাই এসে শ্বশুর বাড়ির লোকের সামনে ধমকে গেছে, মরলে লা"শ হিসেবে বের হতে বলেছে তার আর কিসের জোর? তার সাথে সবাই খারাপ ব্যবহার করবে এটাই তো স্বাভাবিক। তবে আজ সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো আর জীবনে কোনো দিন ভালো মন্দ খাবারের দিকে হাত বাড়াবে না।চোখ তুলে চাইবেও না।
সেই রাতেই তার স্বামী ইলিশ মাছ নিয়ে ফিরলো।বাড়ির বড় বউ খেতে চেয়েছে বলে।সন্ধ্যের সেই তর্কের পর শ্বাশুড়ি আর বাইরে আসেনি।মাছ সমেত ব্যাগটা প্রায় ছুড়েই দিয়েছে রিয়াজ নিলুর দিকে।মাছটা বাইরে বসে কাটতে হবে। রাত তখন আটটার বেশি বাজে।কয়েল জ্বালিয়ে বারান্দার একপাশে মাছ কাটতে বসলো সে। দাদীর মুখে শুনেছে এতো রাতে মাছ কাটলে মেছো জ্বীনে ধরে। মনে মনে ভয় হলো তার। কিন্তু ঘর থেকে তাকে ডাকা হচ্ছে কাজ কতদূর?পোয়াতি মেয়েটার ক্ষুধা লেগেছে। মাছটা কেটে বেশ কড়া করে ভাজলো নিলু।মাথাটা দিয়ে আগামীকাল কচু শাক রান্না করে দিতে বলেছে। মানুষ হিসেবেও মাছের পিস দুটো বেশি।ভাবী যদি তিনটে পিস ও খায় অন্তত তার জন্য লেজের শেষ দিকের একটা টুকরো থাকবে। খাওয়ার প্রতি লোভ করবে না করবে না করেও একটু মনে আশা জাগলো।বাবার বাড়িতেও ওই টুকরোটাই পেতো সে। কেবল সেটা দিয়ে আস্তেধীরে তৃপ্তি নিয়ে ভাত খেতো।আজকেও এক মুঠ ভাতের চাল বেশি দিয়েছে সে। মাছের ওই পিসটার আশায়।
রাতের খাবার বেড়ে দেওয়ার সময় তার স্বামী জিজ্ঞেস করলো
"মাছের পিস কয়টা হয়েছে?"
সে হিসেব দিলো। কতটুক ফ্রিজে তুলেছে কচু শাকের জন্য সেটাও বললো।তরকারির বাটিতে একটা পিস কম পড়ায় স্বাভাবিক সুরেই বলল,
"একপিস মাছ কম কেন এখানে?যাও সম্পুর্ন তরকারি নিয়ে আসো।আর আম্মার খাবার ঘরে দিয়ে আসো।"
সবার খাবার খাওয়ার পর নিলু টেবিল পরিষ্কার করলো।এটো প্লেট গুলো পরিষ্কার করে রান্না ঘর গুছিয়ে ফেলল।পাতিলে এখনো তার ভাগের ভাতটুক রয়ে গেছে।একমুঠ চাল বেশি দেওয়া ভাতটুক ওভাবেই পড়ে রইল। সেদিকে তাকাতে ইচ্ছে করলো না তার। রান্না ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলো মস্ত বড় এক চাঁদ উঠেছে। আর সেই চাঁদের আলোয় তার স্বামী ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বড় জায়ের বোনের জন্য বরাদ্দ ঘরটায়। রাত ভর এখন আড্ডা চলবে। হয়তো একটু পর আবার নতুন কোনো ফরমায়েশ আসবে ভার্সিটিতে পড়ুয়া সেই পরীর মতোন সুন্দর মেয়েটার কাছ থেকে।
পর্ব ২
নিলুর সামনে তেরোটা হাড়ি রাখা।ভাদ্র মাসের তেরাবেরা উপলক্ষে বড় ভাবীর বাড়ি থেকে এসব এসেছে।তেরো টা মাটির পাতিলে বারো রকমের পিঠে।পিঠের হাড়ি দেখে মুখ শুকিয়ে গেছে তার। গত এক সপ্তাহ যাবত শ্বশুর আর ভাসুর কয়েক বার কথা তুলেছে কিন্তু সে কিছুই জবাব দিতে পারেনি।বড় ভাইকে কল দিয়ে আমতা আমতা করে বলেছিল সে মানা করেছে।এতো কিছু করার মতো মানুষ কই? মাকে বলেছিল, মা বলেছে বাবাকে বলতে কিন্তু তার সাহস হয়নি। আজ তার ভাগ্যে কতগুলো কথা আছে কেবল সেটাই ভাবছে। পিঠের পাতিল এক এক করে ঘরের ভিতরে নিয়ে রাখলো।শ্বাশুড়ি সবাইকে সকালবেলা একসাথে বসিয়ে পিঠে ভাগ করে দিচ্ছে। নিলু হাত লাগাচ্ছে। একে ওকে এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে তার শ্বাশুড়ি তাকে একটা তেলের পিঠা হাতে দিতেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো শ্বশুর মশাই।
"আমেনা, তোমার কি কোনো দিন আর বুদ্ধিশুদ্ধি হবে না?ওকে কেন দিতেছো?ওর বাপ ভাই তো খবর ও নিলো না।"
"তো?বাপ ভাই খবর নেয় না বলে আমিও ফেলে দিবো?সবাই খাচ্ছে ও খাবে না?"
"না, বড় বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে আসছে হক সবার আগে বড় বউয়ের।"
"সব তোমার বড় বউ একা শেষ করতে পারবো?"
"আশেপাশের বাড়িতে দিবা।"
"আশেপাশের মানুষ খেতে পারব আর ও বাড়ির বউ হয়ে পারবো না?"
নিলু হাত থেকে পিঠাটা নামিয়ে রাখলো।পানি আনার ছুতোয় কলপাড়ে গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো।এতোটা অপমান সে কোনো দিনো হয়নি। গতকালের থেকে আজকে আরো বেশি ছিল কথার ঝাল।মানুষের কথারও ঝাল হয়, তাই তো সেই ঝালে নিলুর অন্তত আত্মা জ্বলে গেছে, সে ঢকঢক করে পানি খেল।ততক্ষণ পর্যন্ত পানি খেল যতক্ষণ পানি খেতে খেতে বমি না চলে এলো।নিজেকে ধাতস্থ করে রান্না ঘরে গেল সে। গ্যাসের চুলোয় রান্না করা বারণ, অন্তত তার জন্য বারণ।রান্নাঘরটায় মাটির চুলোদুটো লেপ দেওয়ার জন্য পুকুর পাড় থেকে মাটি আনতে গেল।ঘরের ভিতরে ভাসুরের গলা শোনা যাচ্ছে।তাকে ছোটো লোক বলে গালি দিচ্ছে।নিলু কিছুই ভাবলো না,দাঁড়ালো না।সে বিশ্বাস করতে লাগলো যতক্ষণ সে এসব শুনবে না ততক্ষণ তাকে কেউ কিছু বলবে না।
ভাবীর বোন আফসানা তখন পুকুর পাড়েই বসে আছে। বয়সে নিলুর থেকে বড়। নিলু তার সাথে তেমন একটা কথা বলে না।এড়িয়েই চলে বলা যায়।তার না আছে আফসানার মতপ রূপ না আছে গুণ। বাবার টাকা থাকলেও তার কি আছে?মাথা নিচু করে যাচ্ছিলো সে আফসানা তাকে ডেকে বলল,
"এই মেয়ে শোনো?"
অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে যেতে হচ্ছে।সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
"বলুন।"
"তুমি আমাকে এড়িয়ে চলো কেন?তোমার স্বামী না করেছে আমার সাথে কথা বলতে?"
"না কেউ না করেনি।"
"তাহলে তুমি আমাকে দেখতে পারো না কেন?"
"আমি কখনো সেটা বলিনি।"
"বুঝা যায়। আমার সাথে হেসে কখনো কথা বলো না।ভাই আমি এই বাড়ির অতিথি।তোমার সতীন নই।"
সতীন শব্দটা শুনে সারা গায়ে কাঁপন ধরে গেল নিলুর। একটা বার তাকালো সে আফসানার দিকে।দৃষ্টি নামিয়ে আবার তাকালো ওর হাতের দিকে।হাতগুলো পরিষ্কার,নখগুলো অনেক সুন্দর।এবার নিজের হাতের দিকে তাকালো। নখের ভিতর দিয়ে কালি জমেছে। কালির হাড়ি পাতিল ধুয়ে এসব হয়েছে। হাত দিয়ে মাথার কাপড় ঠিক করে সে জবাব দিলো,
"আমি কখনোই এসব বলিনি। আর যদি নসীবে থাকে তাহলে কি আমার আর কিছু করার থাকবে?"
"তুমি বলছো মেনে নিবে আমায় সতীন হিসেবে?"
"তা বলিনি।বলেছি নসীবে যা থাকবে তাই হবে।"
"যদি এরপর এই বাড়িতে থাকতে না দেই।বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে বলি তখন?"
"রিজিকের মালিক আল্লাহ।যে ঘরের হাড়িতে আমার জন্য দানা বরাদ্দ থাকবে আমি সেখানেই থাকবো।"
আফসানা হাসলো।সে হাসিতে যেন কৌতুক অনুভব হলো নিলুর। নিজেকে আরো ছোটো মনে হচ্ছে তার। সে পুনরায় পা বাড়ালো পুকুর ঘাটের দিকে। পিছন থেকে আফসানা বলে উঠলো,
"শুনো মেয়ে আমি কখনো চাইনি তোমার সংসার ভেঙে যাক।আমি কখনো চাইনি এই বাড়ির বউ হতে। যদি চাইতাম তাহলে তুমি কখনোই এই বাড়িতে বউ হয়ে আসতে পারতে না।"
নিলু আর দাঁড়ালো না।তার গা প্রচন্ড ভাবে কাঁপছে।কেন কাঁপছে সে জানে না।ক্ষুধা, ক্লান্তি নাকি অসহায়ত্ব! কোনো জবাব নেই তার কাছে।
পর্ব-৩
নিলুর দিনকাল ওভাবেই যাচ্ছে। বাড়িতে বড় করে আয়োজন চলছে আকিকার।ছেলে হোক কিংবা মেয়ে।সাত দিনের মধ্যেই আকিকা করবে। হাতের কড় গুনে দিন হিসেব করে মেয়েটা।আর দুই দিন পর তার আঠারো বছর হবে সাথে বিয়ের ছয়মাস। দেখতে দেখতে কতগুলো দিন চলে গেল।বিয়ের আগে হলে মা চুপ করে সেদিন আস্তো একটা ডিম ভেজে পাতে দিতো।এক গ্লাস দুধ আর একটুকরো নলেন গুড়ের সন্দেশ থাকতো ভাগে। সন্দেশটা অবশ্য তার দাদীর ওখান থেকে খুব গোপনে সরাতো মা।আর দুধ?সেদিন এক গ্লাস দুধ সরিয়ে পানি মিশিয়ে দিতো বেশি করে। দাদী সেদিন খেতে পারতেন না।গোয়ালাকে গালমন্দ করতেন।আর মা মনে মনে আল্লাহর কাছে মাফ চাইতেন।এবার আর মায়ের মাফ চাইতে হবে না।সে চলে এসেছে, এখানে জন্মদিন বলতে কিছুই নেই।সকাল সকাল উঠোন ঝাড়ু দিয়ে রান্নাঘরে যেতেই ভাবীর চিৎকার শুনতে পেল।তড়িঘড়ি গিয়ে দেখলো সে মেঝেতে বসে পড়েছে। হাত বাড়িয়ে তাকে ডেকে বলল,
"ছোটো আমার ভীষণ ব্যথা করছে, তোর ভাইকে ডাক।"
গত রাতে দুই ভাই মাছ মারতে গিয়েছিল এখনো ফিরেনি।শ্বশুর মসজিদে। শ্বাশুড়িকে ডেকে আনলো দ্রুত। পাশের বাড়ির লোকের সহায়তায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলো। মাঝ পথে শ্বশুরের সাথে দেখা হলে তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে তারা ছুটলো শহরের দিকে।বাড়ি পাহারার একটা ব্যাপার আছে তো।কিন্তু তাদের এই ব্যাপারে বিপদে পড়ে গেল নিলু। সে বাড়ির রাস্তা চিনে না।বিয়ের পর যে তিন চার বার বেরিয়েছে কেবল বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য সেটাও সাথে কেউ না কেউ ছিল।বিয়ের রাত,ওয়ালিমা আর পা ফিরানিতে লোকজন সাথে ছিল তাছাড়া আরেকবার ভাই নিয়ে গেল। এবার কি হবে? বোকার মতো এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে পায়ের নিচে ইটের টুকরো পড়ে জুতোটাও গেল ছিড়ে। আসার সময় যেটুক পথ চিনে এসেছে সেদিক দিয়েই হাঁটা শুরু করলো পায়ের জুতো হাতে নিয়ে। কিন্তু বিপত্তি হলো তিন রাস্তার মোড়ে এসে।কোন দিকে যাবে সে? অপু দশ বিশ করে যে রাস্তায় গেল মিনিট দশেক হাটার পর বুঝলো রাস্তাটা ভুল তাই আবার অন্য রাস্তায় হেটে বাড়ি ফিরলো।বাড়ি ফিরে মনে হলো চাবি শ্বাশুড়ির ব্যাগে।বড় ঘরে যেতে পারবে না।কিছু সময় পর স্বামী আর ভাসুর ফিরে এলো।মাছ রেখে তারা ছুটলো শহরে।একা বাড়িতে নিলু মাছ কাটে, বাসি কাপড় কাঁচে আবার রান্নাও করে। পাশের বাড়িতে ফ্রিজে মাছ রাখে।চাবি নিয়ে গেছে শুনে ও বাড়ির বউয়ের বেশ মায়া হয় তার জন্য।আঁচলের তলায় করে দুটো মুড়ির মুয়া দেয় তার হাতে। এতো দিনে এলাকার অনেকেই জানে বাড়ির বউয়ের বাপের বাড়ির লোক মেয়েকে আদর করে বলে তাকে কিছু বলার সাহস করে না মোল্লা বাড়ির পুরুষেরা কিন্তু ছোটো বউকে তারা পাতেও তুলে না, সম্মান তো দূরের কথা।মুয়া দুটো খেয়ে পেট ভরে পানি খায় নিলু।তরকারি রেধে গরম পানি বসিয়ে রাখে, কখন কে আসবে ভাত চড়িয়ে দিবে সেই হিসেবে।ভাত নষ্ট এ বাড়ির পুরুষের মোটেও পছন্দ নয়।সন্ধ্যে হলেও উঠোনে বসেই অপেক্ষা করতে লাগলো কিন্তু তবুও কেউ আসছে না।আজান দিতেই ভয় হলো।রান্না ঘরের বাতি জ্বালাতেও ঘরে যেতে হবে, তাই সিদ্ধান্ত নিলো পাশের বাড়িতে গিয়েই থাকবে কিন্তু সেই সময় গেটে শব্দ করে ঢুকলো তার স্বামী।সে যে প্রাণ ফিরে পেল, ভাবীর কথা জিজ্ঞেস করলে বলল ছেলে হয়েছে। চাবি দিয়ে তালা খুলে গোসলে চলে গেল সে।নিলু জলদি জলদি আলো জ্বলে ভাত বসালো।প্রায় বিশ মিনিট পর গরম ধোয়া উঠা ভাত সাথে মাছের তরকারি দিলো স্বামীর সামনে।খেতে বসে তার স্বামী বলল,
"ভাবীর জন্য চা, জাউভাত।আর বাকীদের জন্য খাবার রেডি করো।"
"কে আসবে?"
"আমি নিয়ে যাবো।"
"ফিরতে তো অনেক রাত হবে।"
"ফিরব কে বলেছে? ভাত নিতে না হলে আসতাম না কি?তারাতাড়ি করো।"
"আমি তাহলে পাশের বাড়ির চাচীর কাছে রাতে থাকবো?"
"কেন?"
"না মানে একা ভয় লাগবে।"
"তোমার মতো অন্যের ঘাড়ে চড়ে খাওয়া মেয়েদের কোনো ক্ষতি হয় না।তোমাদের গায়ে কলঙ্কও লাগে না।কারণ তোমরা এতোটাই নিকৃষ্ট।মিলিয়ে নিও কাল সকালে এসে দেখবো ঠিক বেঁচে আছো,ভালো আছো।কারণ উপরওয়ালার আমাকে এতো ভালোবাসে না যে তোমার থেকে এতো সহজে মুক্তি দিব।"
নিলু কোনো জবাব দিতে পারলো না।খাবার গুছিয়ে দিলো।স্বামী চলে যাওয়ার পর গেট আটকে দিয়ে বড় ঘরের দরজায় খিল দিলো।বারান্দায় তালা দিলো।ঘরের সব লাইট জ্বালিয়ে, দা পাশে নিয়ে বসে রইল।ওযু সে করে এসেছে, নামাজ পড়ে কোর-আন শরীফটা নিয়ে পড়তে লাগলো।তার কিশোরী মনে একটা ভরসা মানুষ এলে সে দা দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে আর জ্বিন ভূত থেকে বাঁচাবে তার সৃষ্টিকর্তা।
দেখতে দেখতে বাচ্চাটার আকিকার দিন চলে এলো।পুরো দিন কাজে কাজে কেটে গেছে নিলুর। দুপুরে খাওয়ার সময় একবার ডাক পড়েছিল বড় ভাবীর ঘরে। ভাবীর বোনের হাসি হাসি মুখটা দেখে আজও তার অন্তর পুড়ে গেল।সে আজ শাড়ি পরেছে। নীল রঙের শাড়ি, বাইরে তাকিয়ে দেখলো তার স্বামীও আজ পাঞ্জাবী পরেছে, রঙটাও নীল।অথচ নামে নিলুর কাছে আজ এই রঙ বিষিয়ে গেল।গলা দিয়ে খাবার নামলো না।অসুরের শক্তি বুঝি তার শরীরে আজ।একা একা প্রায় দেড়শ মানুষের খাবারের পর সব প্লেট, গ্লাস পরিষ্কার করলো।বড় বড় পাতিল গুলো আজকেই পুকুরপাড়ে নিয়ে পরিষ্কার করেছে।বাড়ির আনাচে কানাচের সব পরিষ্কার, ঘর দুয়ার মুছতে মুছতে রাত নেমে এসেছে।এখন বারান্দা পরিষ্কার করছে সে। তার ভাসুর মিষ্টির প্যাকেট তার সামনে প্রায় ছুড়ে দিয়ে বলল,
"এসব প্লেটে করে দিয়ে এসো আমার ঘরে।বাপের বাড়ি কিছুই শিখোনি?অতিথি আপ্যায়ন বুঝো না?"
নিলুর কোনো জবাব নেই।যা বললো তাই করে আস্তেধীরে এগিয়ে গেল পুকুর ঘাটে।রাত তখন দশটা। গলা পানিতে নেমে দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করে ঘরে যখন ফিরেছে তখন তার স্বামীও ফিরেছে।বিছানায় গা এলিয়ে কেমন করে শুয়ে আছে সে। নিলু কিছু না বলে নিচে বিছানা করছে। কারণ কোনো ভাবেই তার শোয়ার জায়গা নেই।রাতে গোঙানির শব্দে ঘুম ভাঙতেই দেখলো তার স্বামীর ভীষণ জ্বর।জলপট্টি দেওয়ার সময় দুই বার বমিও করলো।নিলু সবটা পরিষ্কার করলেও মুখে কিছু বলছে না কিন্তু এবার তার স্বামী কিছু বলছে।মনোযোগ দিতেই সে বুঝতে পারলো ভাবীর বোনের কথা বলছে।আদর করে সে তাকে পাখি ডাকে।কথার সারমর্ম এটুক ছিল, পাখি তাকে কোনো দিন ভালোবাসেনি।আজ পাখির সাথে যে ছেলেটি এসেছিল তার চার বছরের প্রেমিক।শিক্ষিত,দামী চাকরি করে।আজ যদি সে লেখাপড়াটা ঠিক মতো করতো তাহলে পাখি কি তার হতো? আফসোস করতে করতে সে ঘুমিয়ে গেছে।নিলু কিছুই বললো না।কেবল মনে পড়লো ওই রমনীর সেদিনের কথাগুলো।অযথাই কি তবে ভুল বুঝেছিল সে?
পরদিন সকাল থেকে নিলুর স্বামীর আচরণ তার প্রতি একদম বদলে গেছে।নিলুর সাথে বাজে আচরণ করে না।বরঙ বাড়ির সকলের সামনে বেশ আদরে রাখে,দামী শাড়ি পছন্দের চুড়ি আনা শুরু হলো।নিলু বুঝে এসব নিছক অভিনয় অথচ এই ছল ভাঙার সাধ্য তার কি আছে?
ভাবীর বোন মাঝেমধ্যেই আসে।তখন নীলু হয়ে উঠে পৃথিবীর সবচেয়ে আদরের স্ত্রী।তার স্বামী খুব নিকটে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
"ওর কি আফসোস হয়?তোমাকে এতো আদর করি এটা দেখে?তোমার কি মনে হয়?তোমার সুখকে ও হিংসে করে?"
নিলুর কাছে কোনো জবাব থাকে না।তার কেবল গা গুলিয়ে আসে।কেবল মনে হতে থাকে এতো মেকি আদরের থেকে অবহেলাই বুঝি শ্রেয়।কারণ অবহেলার মাঝে কোনো অভিনয় ছিল না এখন যেমনটা আছে ভালোবাসায়।
(সমাপ্ত)