হৃদয়হীনা ||০১
~অলিভিয়া/জুমোশি
---“তুই এত হৃদয়হীনা কি করে হতে পারিস? তোর কি একটুও কষ্ট লাগছে না। তোর হবু স্বামী এই নষ্টা মেয়ের সাথে ৬ মাস ধরে রিলেশনে আছে।আর এক সপ্তাহ পরে তোর বিয়ে। তুই? তুই চুপচাপ বসে আছিস?"
নূরজাহানের সবগুলো কথা উড়িয়ে দিয়ে মিনা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
---“আরে মা! কি এমন হয়েছে বলো তো! ওদের একে অপেরকে পছন্দ সেজন্য রিলেশন করেছে। আর তুমি চিন্তা করো না। যারা জানে বিয়ের কথা সব্বাইকে গিয়ে বলবে তোমাদের ভুল হয়েছে। ঈশানের সাথে আমার নয় বরং সিমরানের বিয়ে হচ্ছে।বিয়ের কার্ডেও নাম বদলে ফেলবে।"
নূরজাহান হাক দিয়ে বললেন,
---“কি বলছিস? মাথা ঠিক আছে? সবাই জানে। কি করবো আমি? কি করে মুখ দেখাবো? দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষে ছিলাম।"
ঘরের এক কোণে গুটি মেরে অপরাধীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে সিমরান। ফর্সা মুখে অনেক কালসিটে দাগ। যে দাগ গুলো নূরজাহান মেরে মেরে করেছে। সিমরানের পায়ের গোড়ালি অব্দি চুলগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পরে আছে।তার অর্ধেক চুলও কেটে ফেলা হয়েছে। তবে এখনো কেউ জানে না। চুলগুলো কাটলো কে? নূরজাহান যত যাই করুক এত বড় সর্বনাশ করবে না।
মিনা কলেজ বেগ কাঁধে নিয়ে সিমরানের দিকে এগিয়ে গেল। সিমরান মুখ নিচু করে রেখেছে। মিনা স্বান্তনা দিয়ে বলল,
---“তুই চিন্তা করিস না। আমি সবটা সামলে নিবো। কলেজ থেকে এসে মা-বাবাকে বুঝিয়ে বলবো। ঠিক আছে?"
সিমরান মিনাকে জোরে ধাক্কা দিল আচমকা। মিনা টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে ধপাস করে পরলো। নূরজাহান দ্রুত মেয়ের কাছে আসলেন।
---“এই নষ্টা মেয়ে তোর এত বড় স্পর্ধা তুই আমার মেয়েকে ধাক্কা মারলি? আমার বাড়ি থেকে এক্ষুনি বের হো! নষ্ট!"
সিমরানও একই সুরে চেচিয়ে বলল,
---“হ্যাঁ, তোর বাড়ি থেকে আমি চলে যাবো। ঈশানের সাথে বিয়ে করবো আজকেই। আর ওর বাড়িতে চলে যাবো। তোদের ফালতু স্বান্তনা আমার দরকার নেই বুঝলি মিনা। তোকে আমি প্রথম থেকেই সহ্য করতে পারি না তুই জানিস না। তাও তোর স্বান্তনা, স্নেহ শেষই হতো না। তুই আমাকে সবসময় দয়ার চোখেই দেখতি। যেটা আমার একদমই পছন্দ না। এখন থাক তুই এই কলঙ্ক নিয়ে যে তোর বিয়ের আগেই বিয়ে ভেঙে গেছে কারণ ঈশান তোকে না আমাকে পছন্দ করে।"
এই বলে তাদের দিকে থুতু ছুঁড়ে হনহন করে চলে গেল। বাকরুদ্ধ হয়ে মিনা সিমরানের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। শান্ত চোখ ভিজে আসার চেষ্টা করেও পারলো না। মিনা কখনোই কাঁদে না। না কাঁদে তার চোখ, না কাঁদে মন। কান্না করার স্বভাব তার নেই।
নূরজাহান থুতু মুছে বিদ্রুপের সুরে বলল,
---“দেখ তোর পাতানো আদরের ছোট বোন। তোর মুখেই থুতু মেরে চলে গেল। আমাদের মানসম্মান এক নিমিষেই শেষ রে মিনা! শেষ! "
মিনা উঠে দাঁড়ালো। নূরজাহানকে কাঁদতে দেখেই সে কিছু না বলে কলেজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
———
কলেজে যেতে মিনার দশ মিনিট দেড়ি হলো।সাইফুল দারওয়ানকে কোনোমতে বুঝিয়ে কলেজের ভিতর ঢুকেছে সে। ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসটা দোতলায়। যেহেতু সে এই পথটা দৌঁড়ে এসেছে। আগে থেকেই হাঁপিয়ে গিয়েছে। সে ভাবলো প্রথম ক্লাস না করেই রেস্ট রুমে রেস্ট নিবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। রেস্ট রুমে গিয়ে বসলো মিনা। বড় বড় করে শ্বাস নিল। তৃষ্ণা পেয়েছে অনেকটা। কিন্তু আজকে পানি আনতে ভুলে গেছে। কড়া রোদের মধ্যে দৌঁড়ে এসেছে পানি না খেলে এখনি জান চলে যাবে।
যদি সে পানি নিতে যায় তাহলে স্যার বা ম্যাডাম তাকে দেখে ফেলবে। তখন আরো এক দফা ঝামেলা। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলো কতক্ষণ জানা নেয়। হয়তো চোখ লেগে গিয়ে ছিল।
মিনা অনুভব করলো তার মুখে গরম নিশ্বাস সাথে পারফিউমের ঘ্রাণ আসছে। সাথে সাথে চোখ খুলে তার মুখের উপর বিহান স্যারকে দেখে দ্রুত সরে আসলো। বিহান স্যার চেয়ারে হাত রেখে ছিল, মিনা সরে যাওয়ার হাত ফসকে বিহান স্যার পরেই যাবে তার আগে মিনা স্যারের হাত ধরে ফেলল।
পরক্ষণেই আবার সরে এলো। মিনা শক্ত গলায় বলল,
---“আপনাকে আমি ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম না,আমার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করবেন না। আপনি আমার লাস্ট ওয়ার্নিং মানেননি। তাই এখন যা হবে তার জন্য তৈরি হোন।"
বিহান চোখের চশমা ঠিক করে শয়তানি হাঁসি দিয়ে বলল,
---“তোমার কাছে কি এমন চেয়েছি? আমার সাথে মাত্র এক রাত, আই প্রমিস সব পরিক্ষায় ১০০ নাম্বার ফিক্সড। তোমার বন্ধু জাবেরিয়াও তো আমার কথা মেনে নিয়েছিল, দেখো সে এখন টপার। তুমি ওর থেকেও আকর্ষণীয়। তোমার জন্য অফার তুমি একবার শুধু....
কথা শেষ করবার আগেই মিনা জোরে জোরে চেঁচাতে লাগলো,
---“আমাকে বাঁচাও! স্যার ছাড়ুন... আমি তো আপনার বোনের মতো! প্লিজ ছাড়ুন!"
মিনা নিজেই নিজের হিজাব টেনে খুলে ফেলল। চুলগুলো এলোমেলো করে চেঁচাতে থাকলো। বিহান স্যার থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
---“আরে, কি করছো? আচ্ছা, আর কখনো তোমাকে এসব বলবো না। এবারের মতো মাফ করো! আমার টিচার কেরিয়ার শেষ হয়ে যাবে। চুপ করো!"
ততক্ষণে আশেপাশে থেকে ম্যাডাম, স্যার, অফিস রুম থেকে অধ্যক্ষ মহফিজুল চলে এসেছেন। বাইরে ভির জমেছে ছাত্রীদের।
মিনা মহফিজুলের পায়ের কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
---“আপনার কলেজের শিক্ষক এখনই আমার সর্বনাশ করতে চেয়েছিল। আপনি এর বিচার করুন।"
বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলো মিনা। আশেপাশের ছাত্রীরা বলতে থাকলো,
‘স্যার আপনাকে এর বিচার করতে হবে।'
‘নিজের ছেলে বলে ছেড়ে দিলে আমরাও কিন্তু পদক্ষেপ নিবো!"
বিহান স্যার বোঝাতে আসলে মহফিজুল পর পর কয়েকবার গালে থাপ্পড় বসালো। ছায়া ম্যাডাম এসে মিনাকে উঠিয়ে তার হিজাব দিয়ে মিনাকে ঢেকে দিলেন।
বাকি ম্যাডাম,স্যার সবাই ঘৃণার চোখে তাকালেন বিহান স্যারের দিকে। নেহা ম্যাডাম বলেই ফেললেন,
---“মহফিজুল স্যার,আপনার ছেলে বলে আমরা চুপ করে থাকবো না। আর বলি বিহান স্যার সারাদিন কত ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকেন আপনি?এখন ছিঃ! ছিঃ!
মহফিজুল স্যার অপমানে, রাগে, কষ্টে বললেন,
---“সাইফুল, পুলিশ কে ইনফর্ম করো।"
---“জ্বি, স্যার!"
——
আজ ক্লাস হয়নি। এত বড় ইস্যু ক্রিয়েট হওয়ার পর কোনো স্যার,ম্যাডাম তাদের মুখ দেখানোর সাহস পায়নি।বিহান স্যারকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মিনা পুলিশদের সামনে এমন ভাবে কেঁদেছে, পুলিশ অফিসার নিজেই কান্না আটকাতে পারেনি। মিনা নিজেও একজন পুলিশ অফিসারের মেয়ে। তার বাবা বর্তমানে ঢাকায় ট্রান্সফার হয়েছে। মিলিটারি চাকরির জন্য তারা পুরো পরিবার একসঙ্গে থাকতে পারে না।
মিনা ক্লাসরুমে চুপচাপ বসে নাক টানছে। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। তার ক্লাসমেটরা কত কি জিজ্ঞেস করলো! তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো কিন্তু কাজ হলো না। কেউই কথা বলাতে পারলো না। সবশেষে জাবেরিয়া সবার জোরাজোরি তে মিনার কাছে আবারো এসে জিজ্ঞেস করলো,
---“মিনা, তুই ঠিক আছিস? তোর সাথে স্যার কি করার চেষ্টা করেছিল?"
এই শুনে বাকিরা জাবেরিয়াকে চিমটি কেটে বলল,
---“হেই, কি জিজ্ঞেস করছিস? কি করতে চেয়েছিল জানিসই তো!"
মিনা এতক্ষণে মুখ তুললো। জাবেরিয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেঁসে বলল,
---“তুই যা করতে বলেছিস! তাই করেছে।"
মিলি জিজ্ঞেস করলো, “মানে?"
মিনা চওড়া হেসে বলল,
---“তোরা কেউ জানিস না? জাবেরিয়ার বয়ফ্রেন্ড কে?"
সবাই একসঙ্গে বলল, “ না তো!"
---“বিহান স্যার!আমার সাথে যা হয়েছে সব জাবেরিয়াই বলেছে।"
জাবেরিয়া উঠে দাঁড়িয়ে রেগে বলল,
---“ তোর...তোর কাছে প্রমাণ আছে?"
সবাই এবার মিনার দিকে তাকালো। মিনা সকলকে ইশারায় জাবেরিয়ার মোবাইল দেখালো। জাবেরিয়া একা সবার সাথে পেরে উঠলো না। জাবেরিয়া ধাক্কা ধাক্কিতে মিনার পায়ের কাছে এসে পড়লো।যখন সবাই জাবেরিয়ার মোবাইল ঘাটাঘাটি করছিল তখন মিনা ঝুঁকে জাবেরিয়ার কানে কানে বলল,
---“জানিস শয়তানকে হারাতে হলে তার থেকে বড় শয়তান হতে হয়। তোকে আমি বন্ধু ভেবেছিলাম কিন্তু তুই আমাকে জঘন্য ভাবে ঠকিয়েছিস। এবার এর প্রায়শ্চিত্ত কর!"
ক্লাসের একদল মেয়ে ছিল যারা কারো কোনো দোষ পেলেই তাকে মর্মান্তিক ভাবে বুলি করতো। এদের দলের নাম ছিল ‘N society।' দলের প্রধান নুসরাত। জাবেরিয়ার মোবাইল ঘাটাঘাটি করছিল সে নিজেই। নুসরাত বিহান স্যার আর জাবেরিয়ার সব পার্সোনাল চ্যাট তার পেজে পাবলিক করে দিয়ে মোবাইলটা নিজের কাছে রেখে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
---“N society এক্টিভেট এখন থেকে। আর বাকিরা চুপচাপ নিজের বাড়ি চলে যাও। এখন থেকে জাবেরিয়া আমাদের আয়ত্বে...!"
সবার হাসি জাবেরিয়ার কানে বিষের মতো বিঁধছিল। নুসরাত মিনাকে জিজ্ঞেস করলো,
---“তোর আপত্তি আছে?"
---“ নাহ!"
নুসরাত খুশি হলো। মিনার বই খাতা বেগে ঢুকিয়ে দিতে দিতে বলল,
---“ যা সকলে বাড়িতে চলে যা! আমরা একটু একান্তে বুলি করবো।"
বাকিরা বুলিদের বেশ ভয় পেতো। সেজন্য কেউ কথা বাড়ালো না। আস্তে আস্তে ক্লাস ফাঁকা হতে থাকলো। মিনা দড়জা দিয়ে বের হওয়ার আগে জাবেরিয়ার দিকে তাকালো, জাবেরিয়াও অসহায় দৃষ্টিতে মিনার দিকে তাকিয়ে ছিল।
মিনা তার দিকে বাঁকা হেসে চলে গেল....
চলবে,,