আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
❝ সিকদার বাড়িতে আজ আয়োজনের তোড়জোড়। চারদিকে ম ম করা খাবারের ঘ্রাণ। বসার ঘর থেকে সিঁড়ির ওপরটাও ফুল দিয়ে সাজানো। বাড়ির চার কর্তার হাক-ডাকে পুরোদস্তুর সরব নিবাস। পিউ ঘেমে-নেয়ে মাত্রই ঢুকলো। গোটা ঘরের চোখ ধাধানো সাজগোজের চেয়েও খাবারের গন্ধে পেট মুচড়ে উঠল তার। সেই কোন সকালে স্কুলে গিয়েছিল। তারপর কোচিং,রাস্তার এক গাদা জ্যাম পার করে মাত্রই এসেছে। এত গরম যে পরনের ইউনিফর্মটা অবধি ভিজে লেগে গেছে পিঠে। তবে মনে হলো না বাড়ির কারোর ওর দিকে চোখ-টোক পড়বে। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। ওই তো অদূরে আব্বু হাত তুলে তুলে লোকজন দিয়ে ফুল টানানোর তর্জন-গর্জন দিচ্ছেন। মেজো চাচ্চু - ছোটো চাচ্চুর সাথে কী নিয়ে যেন আলোচনায় মশগুল! সেজো চাচ্চুও রাঙামাটির কাজবাজ ফেলে গতকাল বাড়ি চলে এসেছেন। পিউ চুপচাপ ঘরের পথ ধরল। এই বিশাল ভবনের দোতলায় তার কামরা। ছিমছাম, পরিপাটি! যদিও আজ অবধি কোনো গোছগাছ পিউ নিজের হাতে করেনি। ও যাওয়ার পর হয় মা,নাহয় মেজো মা করে দেন। পিউ সবে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামাল,
তক্ষুনি কোত্থেকে ছুটে এলো পুষ্প। হড়বড় করে বলল,
“ এসে গেছিস? তোর জন্যেই বসেছিলাম।”
পিউ কপাল কুঁচকে বলল,
“ কিন্তু তুই তো দাঁড়িয়ে আছিস।”
“ উফ,বাজে কথা ছাড়। আচ্ছা এই দুটোর মধ্যে আমাকে কোন জামাটায় মানাবে বলতো।”
দু রঙের দুটো চুরিদার পুষ্প দুহাত দিয়ে বাড়িয়ে ধরে। ঠোঁটে তার টইটম্বুর হাসি। পিউ নাক-চোখ কুঁচকে বলল,
“ আচ্ছা,তোরা সবাই এমন অতিরিক্ত আহ্লাদ করছিস কেন বলতো আপু। মা-মেজো মায়েদের ব্যাপারটা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু তুই কেন এরকম ঝাকানাকা জামাকাপড় পরবি? বাড়ির ছেলে বাড়ি ফিরছে,তোর জন্যে তো পাত্রপক্ষ আসছে না।”
পুষ্প চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ বেশি পকরপকর করিস না। বাড়িতে কত আত্নীয়-স্বজন আসবে জানিস? সবগুলো গেস্ট রুম অলরেডি বুকড। মামারাও প্রায় কাছাকাছি। আব্বু আজ গোটা গোষ্ঠী দাওয়াত দিয়েছেন। তার মধ্যে কি আমি ছেড়া জামা পরে যাব?”
পিউ ক্লান্ত শ্বাস ফেলল। তার এসব ভালো লাগছে না। বাড়ির ছেলে বাড়ি আসবে,তা নিয়ে সবার কী গদগদ ভাব! সবথেকে দুঃখ লাগছে মেজো মায়ের আদরটা এবার দুভাগ হয়ে যাবে। নিজের ছেলে এলে কি আর মেজো মা ওকে এত ভালোবাসবেন? তখন ছেলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবেন না? তখন পিউকে কে চুল বেঁধে দেবে? মা বকতে এলে কে বাঁচাবে? ও
অনীহ চিত্তে আঙুল দিয়ে দেখাল একটা জামা।
“ এটা পর।”
পুষ্প তড়িৎ জামাটা নিয়েই ঘরে ছুটে গেল। পিউ তাজ্জব হয়ে বলল,
“ এ আজকে একটু বেশিই খুশি!
ধুর,তাতে আমার কী? আমার এখন খুব খিদে পেয়েছে। খেতে পারলেই হবে।”
পিউ মুখ কালো করে ওয়াশরুমে ঢুকল। আজকে এ বাড়ির বড়ো ছেলে নিউইয়র্ক থেকে ফিরছে। তাও পাক্কা সাত বছর পর। শুনেছিল,একটা চরম বেয়াদবির কেসে আব্বু তাকে বেধরম পিটিয়ে দেশ ছাড়া করেছেন। তারপর থেকে ছেলে আর বাড়িমুখো হয়নি। জেদ করে নিজের একটা ছবিও পাঠায়নি। ভিডিও কলে আসা তো দূর। মাঝেমধ্যে মায়েদের সাথে কলে কথা শেষ করতেন,খবরাখবর দিতেন ব্যস ওইটুকু। তাই এখনো কেউ জানে না সে লোক দেখতে কেমন! সাত বছরে নিশ্চয়ই অনেক বদলে গেছে!
পিউয়ের বয়স তখন মাত্র ৮। তাই ওর কিছু মনে থাকা তো দূর,মাথাতেও নেই। আর সে মাথাতে আনতেও চাইছে না। যে লোক আব্বুর মার খেয়ে বাড়ি ছাড়ল,তিনি নিশ্চয়ই সাধুবাবা নন!
পিউ সকালে শাওয়ার নিয়েই স্কুলে গিয়েছিল। তাই কোনোরকম হাত মুখ ধুয়ে,জামা পালটে নিচে নেমেছে। সামনে তার এস এস সি পরীক্ষা। সেজন্য এখন পড়াশোনার প্রচুর চাপ। বাড়ির এই আড়ম্বরপূর্ণ ব্যাপারস্যাপারেও ক্লাস মিস দিতে পারেনি।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে দেখল,বাড়ির তিন গিন্নিরা সমানে ছোটাছুটি করছেন। ছোটো চাচা আনিস এখনো বিয়ে করেননি। সদ্য এসে বসা অতিথিদের আপ্যায়নে তটস্থ সবাই। এমনকি পুষ্পও বিশ্রাম নিতে পারছে না।
পিউ গলা তুলে আবার আশেপাশে তাকাল। সাদিফ,রাদিফ আর সেজো চাচ্চুকে দেখা যাচ্ছে না।
ও নেমে দাঁড়াল এক কোণে। তখন সামনে দিয়ে হন্তদন্ত পায়ে রান্নাঘরে যাচ্ছিলেন মিনা।
ওকে দেখেই বললেন,
“ ওমা,তুই কখন এলি?”
“ আমিতো….
ভদ্রমহিলা কথা টেনে নিলেন। পালটা প্রশ্ন করলেন,
“ কিছু খেয়েছিস?”
পিউ ফের কথা হাঁ করতে গেলে এবারেও কথা টেনে নিলেন তিনি,
“ আর এ কী, তুই এমন একটা ম্যাড়ম্যাড়ে জামা পরেছিস কেন? কত লোক বাড়িতে। যা যা গিয়ে পালটে আয়। আমি যাই,অনেক কাজ! ধূসর এয়ারপোর্টে নেমেছে। বলতে বলতে চলে আসবে। খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে না!”
নিজের মতো হড়বড়িয়ে বলে চলে গেলেন মিনা। পিউ ঠোঁট ফোলায়। ওর কথা যদি নাই শুনবে জিজ্ঞেস করল কেন? হুহ,আসতে না আসতেই সারাদিন শুধু ধূসর ধূসর আর ধূসর।
তক্ষুনি হইচই শুরু হলো। বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে একটা সাদা গাড়ি ঢুকছে। কেউ একজন চ্যাঁচাল,
“ চলে এসেছে,চলে এসেছে। ধূসর চলে এসেছে…”
পুষ্প সবার হাতে হাতে শরবতের গ্লাস দিচ্ছিল। ঘোষণা শুনেই সোজা হলো তড়িৎ। ট্রে নামিয়ে রেখেই উদ্বেগী পায়ে ছুটে এলো গেইটে। যেতে যেতে চ্যাঁচাল,
“ মা,মেজো মা, সবাই এসো। ভাইয়া এসে গেছে।”
বাড়ির বড়ো কর্তা আমজাদ সিকদার ফোনে কথা বলছিলেন। লাইনটা কেটেই জোরালো পায়ে এগোলেন তিনি। গলা তুলে বললেন,
" আফতাব,আফতাব নিচে এসো। ওরা এসে গেছে তো।"
গিন্নিরাও কেউ থেমে নেই,যে যার মতো চঞ্চল কদমে সদর দরজা পার হলেন। পিউ এগোলো আস্তেধীরে।
তার বাসিমুখে হাসি নেই। পেটের ভেতর ইঁদুর চ্যাওম্যাও করছে। অথচ ওর নিজের মা-ও একটু খবর নিলো না!
ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়েদের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। পনের বছর বয়সে আর উচ্চতাই বা কত! বড়ো বড়ো মানুষগুলোর পেছনে ক্ষুদ্র শরীরটা হারিয়ে গেল তাই।
বাড়ির একদম সামনে এসে দাঁড়াল গাড়িটা। মূহুর্তে রাদিফ, আজমল নামলেন।
চলবে..... ইনশাআল্লাহ ..