### 🖤 প্রেম নয়, এ এক দখলদারির গল্প
### Love Isn't Given. It's Claimed.
লেখিকা: আতিয়া রহমান
### শেখ ভিলা, ঢাকা
সকাল ১০টা।
শেখ পরিবারের বিশাল প্রাসাদের ড্রয়িংরুমে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
সোফায় বসে আছেন শেখ পরিবারের কর্তা—শাহরিয়ার শেখ। তাঁর পাশে স্ত্রী নওশীন শেখ। বড় ছেলে আদনান শেখ, ছোট ছেলে আরহাম শেখ, আর পরিবারের একমাত্র মেয়ে আদ্রিয়া শেখ।
আদ্রিয়া।
যার নাম শুনলেই ঢাকার নামকরা ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
কালো রঙের শর্ট জ্যাকেট, সাদা শার্ট, কালো ট্রাউজার। কাঁধে ঝুলছে দামি ব্যাগ। চোখে কালো সানগ্লাস। হাতে গাড়ির চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে সে ঘরে ঢুকল।
শাহরিয়ার শেখ গম্ভীর গলায় বললেন,
— আদ্রিয়া, আজকে আবার কোথায় যাচ্ছিস?
সানগ্লাস খুলে বাবার দিকে তাকাল মেয়েটা।
— যেখানে আমার যাওয়ার কথা, বাবা। তোমার কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়ে না গেলে আবার তোমার ওই বুড়ো ডিরেক্টরগুলো ভাববে, শেখ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ঘুমাচ্ছে।
আদনান হেসে ফেলল।
— তোর মুখটা একটু কম চললে পৃথিবীটা বেঁচে যেত।
আদ্রিয়া ভাইয়ের দিকে তাকাল।
— আর তোর ব্রেইনটা একটু বেশি চললে শেখ গ্রুপের শেয়ার আরও বাড়ত।
আরহাম হেসে বলল,
— আপু, তুই একদিন আমাদের সবাইকে জেলে পাঠাবি।
— তোরা অপরাধ করিস না। তাহলেই জেলে যাওয়ার ভয় থাকবে না।
নওশীন শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— মেয়েটার মুখে লাগাম নেই।
আদ্রিয়া মায়ের গালে চুমু দিয়ে বলল,
— লাগাম ঘোড়ার জন্য, আম্মু। শেখ পরিবারের মেয়েদের জন্য না।
### চৌধুরী গ্রুপের বোর্ডরুম
অন্যদিকে, চৌধুরী গ্রুপের বোর্ডরুমে বসে আছেন আরজুমান চৌধুরী।
কালো স্যুট, ঠান্ডা চোখ, মুখে একটুও হাসি নেই।
তার পাশে ছোট ভাই আরমান চৌধুরী। আরেক পাশে চাচাতো বোন মেহরিম চৌধুরী। কোম্পানির CEO সাদমান রহমান, CFO ফারহান কবির এবং ব্যক্তিগত সহকারী রাইসা নূর।
আরজুমান ফাইল বন্ধ করে বলল,
— শেখ গ্রুপের সঙ্গে আমাদের ডিলটা আজকেই ফাইনাল হবে।
সাদমান বলল,
— স্যার, একটা সমস্যা আছে।
— বলো।
— শেখ পরিবারের মেয়ে আদ্রিয়া শেখ নিজে মিটিংয়ে আসছে।
আরমান মুখ টিপে হাসল।
— ওহ! সেই আদ্রিয়া শেখ? যার মুখের সামনে নাকি কেউ কথা বলতে পারে না?
আরজুমান ঠান্ডা গলায় বলল,
— আমার সামনে সবাই কথা বলতে পারে।
মেহরিম হেসে বলল,
— ভাইয়া, মেয়েটা কিন্তু ভীষণ অ্যাটিটিউড দেখায়।
আরজুমান ঘড়ির দিকে তাকাল।
— অ্যাটিটিউড দিয়ে ব্যবসা হয় না। মিটিংয়ে সময়মতো আসতে বলো।
ঠিক তখনই রাইসার ফোনে একটা মেসেজ এল।
"Tell Mr. Chowdhury, the queen doesn't wait. She makes others wait."
রাইসা মেসেজটা পড়ে থমকে গেল।
আরমান হেসে উঠল।
— ভাই, মনে হচ্ছে তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই কেউ তোমাকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে!
আরজুমান ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি টেনে বলল,
— ভালো। অনেকদিন পর কাউকে একটু শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেলাম।
### শেখ গ্রুপের বোর্ড মিটিং
দরজা খুলতেই হাই হিলের শব্দে পুরো রুমের মনোযোগ ঘুরে গেল।
আদ্রিয়া শেখ ঢুকল।
তার পেছনে ব্যক্তিগত সহকারী তাসনিয়া, আইনজীবী রাফসান এবং শেখ পরিবারের নিরাপত্তা কর্মকর্তা রুদ্র।
আদ্রিয়া চেয়ারে বসে ফাইলটা টেবিলে রাখল।
— Sorry, gentlemen. রাস্তার জ্যামে আটকে ছিলাম।
চৌধুরী গ্রুপের CFO ফারহান কবির বিরক্ত হয়ে বলল,
— মিটিংয়ের সময়ের গুরুত্ব নিশ্চয়ই আপনি বোঝেন, মিস শেখ?
আদ্রিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
— অবশ্যই বুঝি। তাই তো আপনাদের মতো ছোটখাটো ডিল নিয়ে ব্যস্ত মানুষদের জন্য আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করছি।
রুমে চাপা হাসি।
ফারহান রেগে গেল।
— আপনি কি বলতে চাইছেন?
আদ্রিয়া চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল,
— আমি যা বলি, তা বুঝতে না পারলে আমার দোষ না। আপনার IQ-র সমস্যা হতে পারে।
ঠিক তখনই দরজা খুলে ঢুকল আরজুমান চৌধুরী।
কালো স্যুটে গম্ভীর মুখে সে আদ্রিয়ার দিকে তাকাল।
আদ্রিয়াও তাকাল।
দুজনের চোখে চোখ।
আরজুমান বলল,
— মিস শেখ, আপনার পরিচয়টা কি আবার দিতে হবে?
আদ্রিয়া মুচকি হাসল।
— না। আপনার মতো মানুষের কাছে আমার পরিচয় দেওয়ার দরকার হয় না। আমার নাম শুনলেই যথেষ্ট।
আরজুমান চেয়ার টেনে বসল।
— আত্মবিশ্বাস ভালো। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস পতনের কারণ।
আদ্রিয়া ফাইল খুলতে খুলতে বলল,
— আর অতিরিক্ত অহংকার? সেটা কি আপনার পারিবারিক ঐতিহ্য?
আরমান মুখ চেপে হাসল।
আরজুমান এবার সরাসরি আদ্রিয়ার চোখের দিকে তাকাল।
— আপনি সবসময় এভাবে কথা বলেন?
— না। যাদের যোগ্যতা কম, তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় একটু সহজ ভাষা ব্যবহার করি।
— আপনি আমাকে অপমান করছেন?
আদ্রিয়া ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
— না, মিস্টার চৌধুরী। অপমান করার মতো মানুষ হলে করতাম। আপনাকে তো শুধু বাস্তবতা বুঝিয়ে দিচ্ছি।
পুরো বোর্ডরুম নিস্তব্ধ।
আরজুমান টেবিলে আঙুল ঠুকল।
— Interesting.
আদ্রিয়া চোখ সরিয়ে বলল,
— Interesting না, মিস্টার চৌধুরী। Deal নিয়ে কথা বলুন। আমার দুপুরে আরও তিনটা মিটিং আছে।
### অপ্রত্যাশিত ঘোষণা
মিটিং শেষ হওয়ার আগেই শাহরিয়ার শেখ উঠে দাঁড়ালেন।
— একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আছে।
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
— শেখ গ্রুপ এবং চৌধুরী গ্রুপের মধ্যে নতুন একটি যৌথ প্রজেক্ট শুরু হচ্ছে। এই প্রজেক্টের নেতৃত্বে থাকবে আদ্রিয়া শেখ এবং আরজুমান চৌধুরী।
আদ্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— বাবা, একটা কথা বলি?
— বল।
— আমার সঙ্গে কাজ করার জন্য কি পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ ছিল না?
আরজুমান ঠান্ডা গলায় বলল,
— আমারও একই প্রশ্ন।
শাহরিয়ার শেখ হেসে বললেন,
— তোমাদের দুজনের যোগ্যতা আছে। তাই তোমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
আদ্রিয়া আরজুমানের দিকে তাকিয়ে বলল,
— একটা কথা মনে রাখবেন, মিস্টার চৌধুরী। আমার কাজে নাক গলালে নাকটা নিজের জায়গায় থাকবে না।
আরজুমানও হাসল।
— আর আপনি মনে রাখবেন, মিস শেখ। আমার সঙ্গে খেলতে এলে জিততে শিখতে হবে।
আদ্রিয়া উঠে দাঁড়াল।
— খেলা? আমি খেলি না। আমি জিতি।
### শেষ দৃশ্য
বোর্ডরুম থেকে বেরিয়ে আদ্রিয়া লিফটের দিকে হাঁটছিল।
পেছন থেকে আরজুমানের কণ্ঠ ভেসে এল।
— আদ্রিয়া শেখ!
প্রথমবার।
তার নাম ধরে ডাকল লোকটা।
আদ্রিয়া থামল। ধীরে ঘুরে তাকাল।
— জি?
আরজুমান তার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
— আপনার সম্পর্কে একটা কথা শুনেছি।
— শুনতে পারেন। আমার সম্পর্কে অনেক কথাই শোনা যায়।
— আপনি নাকি কাউকে ভয় পান না?
আদ্রিয়া এক মুহূর্ত তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— ভয়? ওটা আমার অভিধানে নেই। তবে সাবধান, মিস্টার চৌধুরী। আমার সঙ্গে শত্রুতা করলে শেষটা আপনার পছন্দ হবে না।
কথাটা বলেই সে চলে গেল।
আরজুমান স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক আগ্রহ।
সে নিচু গলায় বলল,
— Let's see, Miss Sheikh. কতদিন এই attitude থাকে।
কিন্তু সে জানত না—
এই মেয়েটা শুধু তার ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যও হয়ে উঠবে।
চলবে.