🥀🖤 অপূর্ণ জীবনের পূর্ণতা 🖤🥀
✍️ লেখিকা: রহস্যকন্যা
পর্ব ১ — অভাবের সংসারে এক মুঠো স্বপ্ন! 🥺🥀
🌧️ টাঙ্গাইলের ছোট্ট একটি গ্রাম — সকাল ৭টা।
ভোরের আলো ফুটেছে। গ্রামের চারপাশে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। ছোট্ট একটি টিনের ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে হাঁড়িতে ভাত রান্নার শব্দ।
ঘরটির এক কোণে বসে পুরোনো জামায় সেলাই করছে আঠারো বছরের মেয়েটি।
মেয়েটির নাম মেহরিন আক্তার।
সাধারণ চেহারা, মায়াবী চোখ আর মুখভরা সরলতা। তার জীবনে বিলাসিতা বলতে কিছু নেই। ছোটবেলা থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছে সে।
মেহরিনের পরিবার:
আব্দুল করিম: মেহরিনের বাবা। পেশায় একজন দিনমজুর। সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালান। মেয়েকে অনেক পড়াশোনা করানোর স্বপ্ন দেখেন।
সালমা বেগম: মেহরিনের মা। সংসারের প্রতিটি কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করেন। সন্তানদের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে পারেন।
মেহরিন আক্তার: পরিবারের বড় মেয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি মাকে সংসারের কাজে সাহায্য করে। নিজের স্বপ্নগুলোকে পরিবারের অভাবের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছে।
রায়ান: মেহরিনের বারো বছরের ছোট ভাই। প্রচণ্ড দুষ্টু, হাসিখুশি। বোনকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
সকালের রান্নাঘর।
সালমা বেগম চুলার পাশে বসে আছেন।
মেহরিন: মা, আজ কী রান্না করেছ?
সালমা: আলু ভর্তা আর ডাল। তুই আগে হাত-মুখ ধুয়ে আয়।
মেহরিন: মা, তুমি খেয়েছ?
সালমা: হ্যাঁ মা, আমি খেয়েছি।
মেহরিন মায়ের মুখের দিকে তাকাল। সে জানে, মা আবারও মিথ্যা বলছেন।
মেহরিন: মা, তুমি প্রতিদিন এমন মিথ্যা বলো কেন? আমরা একসঙ্গে খাব।
সালমা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
সালমা: তুই যে আমার মায়ের মতো হয়ে গেছিস রে!
ঠিক তখনই ঘুম থেকে উঠে রায়ান দৌড়ে এলো।
রায়ান: আপু! আমার নাশতা কোথায়?
মেহরিন: তোর নাশতা তোকে বালিশের নিচে রেখে এসেছি!
রায়ান: সত্যি! তাহলে তো আমি আজ থেকে বালিশ খেয়ে বাঁচব!
মেহরিন হেসে ফেলল।
মেহরিন: পাগল একটা!
রায়ান: আমি পাগল না। আমি তোমার আদরের ছোট ভাই!
তিনজনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। অথচ সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো না বলা কষ্ট।
অন্যদিকে — চৌধুরী ভিলা।
ঢাকার অভিজাত এলাকায় বিশাল এক প্রাসাদসম বাড়ি। দামি গাড়ি, ঝাড়বাতি, বিদেশি আসবাবপত্র—কোনো কিছুর অভাব নেই সেখানে।
এই বাড়ির মালিক মাহমুদ চৌধুরী। দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের একজন।
আরহাম চৌধুরী: ছাব্বিশ বছর বয়সী যুবক। চৌধুরী গ্রুপের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। প্রচণ্ড গম্ভীর, আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল।
নুসরাত চৌধুরী: আরহামের মা। আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদাকে অনেক গুরুত্ব দেন।
মাহমুদ চৌধুরী: আরহামের বাবা। ব্যবসার পাশাপাশি পরিবারের সম্মান রক্ষা করাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আনায়া চৌধুরী: আরহামের ছোট বোন। উনিশ বছরের মিষ্টি মেয়ে। ভাইয়ের সঙ্গে সারাক্ষণ খুনসুটি করে।
সকালের নাশতার টেবিল।
আনায়া: ভাইয়া, তুমি কি মানুষ নাকি রোবট? সকালে উঠেই অফিস!
আরহাম: তোমার মতো অলস হলে এই সাম্রাজ্য চালাবে কে?
আনায়া: বাবা আছেন না!
আরহাম: তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল।
আনায়া মুখ বাঁকিয়ে বসে পড়ল।
মাহমুদ চৌধুরী: আরহাম, আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। গ্রামের একটা জমি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
আরহাম: ঠিক আছে বাবা। কাগজপত্র তৈরি রাখবেন।
নুসরাত: আরহাম, আজ রাতে বাসায় তাড়াতাড়ি ফিরবে। কয়েকজন অতিথি আসবেন।
আরহাম: চেষ্টা করব, মা।
কথা শেষ করে সে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
আবারও গ্রামের সেই ছোট্ট বাড়ি।
দুপুরের দিকে আব্দুল করিম কাজ থেকে বাড়ি ফিরলেন। তাঁর মুখটা আজ বেশ চিন্তিত।
মেহরিন: বাবা, কী হয়েছে? তোমাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
আব্দুল করিম: কিছু না মা। কাজের জায়গায় একটু সমস্যা হয়েছে।
সালমা: সংসারে চালও প্রায় শেষ। কাল বাজার করতে হবে।
আব্দুল করিম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
আব্দুল করিম: জানি রে। চেষ্টা করছি।
মেহরিন চুপচাপ বাবার পাশে বসে পড়ল।
মেহরিন: বাবা, আমার পড়াশোনার জন্য চিন্তা করো না। আমি টিউশনি করে কিছু টাকা আয় করার চেষ্টা করব।
আব্দুল করিম: না মা! তোর স্বপ্নগুলো আমার অভাবের কারণে থেমে যেতে দেব না।
মেহরিন বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল—
মেহরিন: আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন জানো বাবা? একদিন তোমাদের মুখে হাসি ফোটাব।
আব্দুল করিমের চোখ দুটো ভিজে উঠল।
তিনি জানেন না, তাঁর মেয়ের জীবনে সামনে কী অপেক্ষা করছে।
সন্ধ্যায় হঠাৎ মেহরিনের বাড়ির সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে এলেন একজন অপরিচিত লোক।
লোকটি বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
লোকটি: এখানে কি আব্দুল করিম সাহেব থাকেন?
ভেতর থেকে আব্দুল করিম বেরিয়ে এলেন।
আব্দুল করিম: জি, আমি। আপনি কে?
লোকটি একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন—
লোকটি: চৌধুরী গ্রুপের পক্ষ থেকে এসেছি। আপনার সঙ্গে আমাদের কিছু জরুরি কথা আছে।
নামটা শুনেই আব্দুল করিমের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
কারণ চৌধুরী গ্রুপের সঙ্গে তাঁর পরিবারের একটি পুরোনো সম্পর্ক রয়েছে, যার কথা মেহরিন নিজেও জানে না!
🥀 কিছু মানুষের জীবন শুরু হয় অভাব দিয়ে, কিন্তু শেষটা যে পূর্ণতায় হবে—তা কেউ জানে না। 🥀🌙 সেই রাতের কিছু না বলা কষ্ট...
রাত তখন প্রায় দশটা।
মেহরিন ছোট্ট ঘরের জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে তার পুরোনো একটি ডায়েরি।
ডায়েরির পাতায় লেখা—
“একদিন আমাদেরও সুন্দর একটা বাড়ি হবে। বাবাকে আর কষ্ট করে কাজ করতে হবে না। মাকে আর খাবার লুকিয়ে রাখতে হবে না। আর আমার ছোট্ট ভাই রায়ানকে তার পছন্দের সবকিছু কিনে দেব।”
লিখতে লিখতে মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
ঠিক তখন রায়ান এসে তার পাশে বসল।
রায়ান: আপু, তুমি কাঁদছ কেন?
মেহরিন দ্রুত চোখ মুছে হাসল।
মেহরিন: কই! আমি আবার কাঁদব কেন?
রায়ান: তুমি মিথ্যা বললে আমি বুঝতে পারি। একদিন আমি অনেক বড় হব। তোমাকে আর মাকে কোনো কষ্ট করতে দেব না।
মেহরিন ভাইকে বুকে টেনে নিল।
মেহরিন: তুই শুধু ভালো মানুষ হবি। আমার আর কিছু চাই না।
দরজার আড়াল থেকে সালমা বেগম দুজনের কথা শুনছিলেন। তাঁর চোখেও পানি জমে উঠল।
কেউ জানত না, পরদিন সকালেই তাদের জীবনে এক নতুন ঝড় আসতে চলেছে!
চলবে