ফন্ট সাইজ:
থিম:
ম্যারিড লাইফ

১৯তম পর্ব

লেখক: রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎#ম্যারিড_লাইফ্

‎#পর্ব_১৯

‎#রঙ্গনা_মৈত্র_ঊর্মি

‎পুকুরপাড়ের সেই নির্জন বিকেলটা যেন ধীরে ধীরে অন্য এক রঙে রাঙা হচ্ছিল। রোদের তীব্রতা কমে এসেছে প্রায়। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ঢলে পড়েছে, তার আলো পুকুরের জলের উপর গলে যাওয়া সোনার মতো ছড়িয়ে আছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে কচি ঘাস আর ভেজা মাটির গন্ধ। দূরে কৃষ্ণচূড়ার ডাল নড়ে উঠছে হালকা হাওয়ায়। লাল ফুলগুলো দেখতে লাগছে আগুনের ছোট ছোট শিখার মতো।মুগ্ধা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।

‎তার চোখ নিচু।

‎অথচ ভেতরে ভেতরে যেন ঝড় বইছে।

‎কিছুক্ষণ আগেও সে দৃঢ় ছিল। যেন নিজের চারপাশে অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে রেখেছিল। কিন্তু সেই দেয়ালে আজ আবরো ফাটল ধরেছে।

‎আর সেই ফাটলের নাম একই—ইখতিয়ার।

‎তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে আজ কেমন যেন নতুন লাগছে। অচেনা। আবার ভীষণ চেনাও।

‎দুজনের মাঝখানে কোনো কথা নেই।

‎তবু নীরবতাটা ভারী। যেন হাজারো অপ্রকাশিত বাক্য বাতাসে ঝুলে আছে। ইখতিয়ার কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

‎তার দৃষ্টি স্থির।

‎সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা মুগ্ধাকে অস্বস্তিতেও ফেলছিল।

‎নিস্তব্ধতার বুক চিরে মোবাইল ফোনের রিংটোন বেজে উঠল।শব্দটা এতটাই আকস্মিক ছিল যে পুকুরের ধারে বসে থাকা কয়েকটা পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে গেল।

‎ইখতিয়ার ভ্রু কুঁচকে ফোন বের করল।

‎স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

‎

‎ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কল রিসিভ করল।

‎কথা বলার সময় মুখে কোনো শব্দের ওঠানামা নেই। কোনো বাড়তি প্রতিক্রিয়াও নেই। তবু তার চোখের গভীরে উদ্বেগ স্পষ্ট।

‎

‎ইখতিয়ার ধীরে ধীরে ফোন নামাল। তার দৃষ্টি একবার মুগ্ধার দিকে গেল। খুব অল্প সময়ের জন্য।

‎কিন্তু সেই দৃষ্টিতে আগের উত্তাপ ছিল না। ছিল অদ্ভুত এক অস্থিরতা। একটা চাপা তাড়াহুড়ো।

‎যেন তার মাথার ভেতরে একসাথে হাজারটা চিন্তা ছুটে বেড়াচ্ছে। মুগ্ধা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইখতিয়ার মুখ ফিরিয়ে নিল। তার কাঁধের পেশিগুলো টানটান হলো।

‎পদক্ষেপগুলোও আগের মতো নয়।

‎

‎মুগ্ধা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।

‎কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, যার চোখে ছিল দাউদাউ আগুনের মতো অভিমান, রাগ, উৎকণ্ঠা—সেই মানুষটা হঠাৎ করেই কেমন দূরে সরে গেল।

‎খুব দূরে।

‎ইখতিয়ার একবারও পেছনে তাকাল না।

‎একবারও কিছু বলল না। িছুই না।

‎শুধু দ্রুত পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল।

‎

‎আর মুগ্ধা? সে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। যেন জমে যাওয়া কোন মোমবাতির কঠিন ফোঁটা।

‎___________________

‎

‎

‎

‎

‎

‎

‎শুক্রবার। জুম্মার দিন।

‎সকালের রোদটা বেশ শান্ত। আকাশের নীল রঙের ভেতর একধরনের নির্মলতা মিশে আছে, যেন পুরো পৃথিবী সাদা কাপড়ে মোড়ানো কোনো পবিত্র প্রার্থনার অপেক্ষায় বসে আছে। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা কুরআন তিলাওয়াতের সুর বাতাসকে আরও কোমল করে তুলেছে।

‎ইখতিয়ার নিজের ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো পাঞ্জাবির কলারটা ঠিক করল।

‎সাদা রঙের সূক্ষ্ম কাজ করা পাঞ্জাবিটা তার গায়ে অসম্ভব মানিয়েছে। পরিষ্কার, পরিপাটি, মার্জিত। কবজিতে ঘড়ি, চুলগুলো আঁচড়ানো। আতরের ছোট্ট শিশি থেকে আঙুলে নিয়ে গলায় ছুঁইয়ে দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল মৃদু, প্রশান্ত এক সুগন্ধ।

‎

‎আজ জুম্মা।

‎শৈশব থেকেই এই দিনটার প্রতি তার আলাদা টান।

‎পাঞ্জাবির হাতা সামান্য গোটাতে গোটাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল ধীর পায়ে। তার চোখে তখন কোনো বিশেষ ভাবনা ছিল না। না ছিল কোন উল্লাস।

‎কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে থমকে গেল। একেবারে থমকে গেল যেন।

‎যেন চলন্ত সময় হঠাৎ থেমে গেছে। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে মুগ্ধা। মুগ্ধা? যাকে এতদিন তোষামোদ করেও একচুল বাগে আনতে পারে নি ইখতিয়ার। সেই মুগ্ধা?

‎ইখতিয়ারের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।

‎বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা আচমকা বেড়ে গেল।

‎ষোলো দিন। পুরো ষোলো দিন এই বাড়িতে মুগ্ধার দেখা নেই।

‎রহিমা অসুস্থ হয়েছে বলেই আজ এসেছে সে। নয়তো এই বাড়ির দিকে ফিরেও তাকাত কি না, সেটাও সন্দেহ ছিল ইখতিিয়ারের কাছে। শুধুই রহিমার জন্য এসেছে?

‎মুগ্ধা সোফায় বসেছিল শান্ত ভঙ্গিতে।

‎আজ তার পরনে ছিল হালকা গোলাপি রঙের একটি সালোয়ার-কামিজ। কাপড়ের ওপর সাদা সুতোয় সূক্ষ্ম নকশা করা। ওড়নাটা কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে কোমল ঢেউয়ের মতো। দীর্ঘ চুলগুলো খোলা নয়, আলগাভাবে পেছনে বাঁধা। কয়েকটি অবাধ্য গোছা কপালের পাশে নেমে এসে মুখটাকে আরও কোমল করে তুলেছে।

‎মুখে কোনো ভারী সাজ নেই। তবু তাকে দেখাচ্ছিল ভোরের প্রথম ফুটে ওঠা গোলাপের মতো।

‎যে সৌন্দর্যের জন্য বাড়তি অলংকারের প্রয়োজন হয় না। জানালার পাশ দিয়ে আসা সূর্যের আলো তার গালে পড়ে এমন এক আভা তৈরি করেছিল, যেন কেউ নিপুণ হাতে আলো দিয়ে ছবি এঁকেছে।

‎ইখতিয়ার তাকিয়ে রইল।

‎চোখ সরাতে পারল না। তার মনে হলো, এই ষোলো দিনে মুগ্ধা যেন আরও বদলে গেছে।

‎আরও শান্ত, সুন্দর দূরের কেউ। আর সেই দূরত্বটাই বোধহয় তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। কিংবা দিচ্ছে।

‎হয়তো মুগ্ধা প্রথমে টের পায়নি কিংবা খেয়াল করেনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর অনুভব করল কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে মুখ তুলে তাকাল।

‎চোখে চোখ পড়ল এক চির পরিচিত মানুষের।

‎একটা মুহূর্ত। মাত্র একটাই মুহূর্ত।

‎কিন্তু সেই মুহূর্তটা যেন সময়ের খাতায় কয়েক শতাব্দী হয়ে রইল। মুগ্ধার চোখের পাতা কেঁপে উঠল।

‎হৃদয়ের অদ্ভুত এক কম্পন ছড়িয়ে পড়ল তার ভেতরেও।

‎আজ ইখতিয়ারকে অন্যরকম লাগছে।

‎সাদা পাঞ্জাবিতে তাকে এমন লাগছে, যেন মেঘের ভেতর থেকে হেঁটে আসা কোনো নীরব চরিত্র।

‎সাধারণত তার মুখে যে কঠোরতা থাকে, আজ সেটা নেই। আছে একধরনের স্থিরতা।

‎আর সেই স্থিরতার মাঝেও লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। কিসের অস্থিরতা? জানে না কেউ ই হয়তো। আবার জানতে পারে।

‎মুগ্ধা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিতে চাইল। পারল না।

‎ইখতিয়ারও নড়ল না। কিঞ্চিত পরিমাণ ও না।

‎দুজনেই যেন নিজের অজান্তে বন্দি হয়ে গেল এক অদ্ভুত নীরবতায়। চারপাশে এত মানুষ,এত শব্দ।

‎তবু তাদের মাঝখানে যেন এক গভীর নিস্তব্ধতা দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে কোনো কথা নেই।

‎শুধু না বলা হাজারো অনুভূতি সমাহার। ইখতিয়ার কিছু বলতে চাইল। গলা শুকিয়ে গেল। চোখ দিয়েই বোঝাতে চাইল নিজের সব আকুলতা।

‎

‎

‎ঠিক তখনই উপরতলা থেকে ইশতিয়াকের মৃদু গলা শোনা গেল।

‎"আরে ভাই! এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"

‎

‎সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে ইশতিয়াক নিচে এল।

‎তারপর দৃশ্যটা দেখে ভ্রু নাচাল। একবার ইখতিয়ারের দিকে তাকাল। একবার মুগ্ধার দিকে।

‎তার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

‎ব্যাপারটা বুঝতে তার এক সেকেন্ডও লাগল না।

‎সে ইখতিয়ারের পাশে এসে দাঁড়াল।

‎ফিসফিস করে বলল,

‎"কী ব্যাপার? জুম্মার নামাজে যাবি, নাকি এখানে শিকড় গজিয়ে ফেলেছিস?"

‎ইখতিয়ার কোনো উত্তর দিল না। যেন শোনেই নি ইখতিয়ার।

‎আর সেই নীরবতাই ইশতিয়াকের হাসি আরও বাড়িয়ে দিল। সে মৃদু একটা ঠেলা দিল ইখতিয়ারকে। অপ্রস্তুত অবস্থায় ইখতিয়ার সামান্য ভরকে গেল। পা হড়কে যাওয়ার উপক্রম হলো।

‎তবে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। ইশতিয়াক এবার হো হো করে হেসে উঠল।

‎"ভাই, মানুষকে এভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলে একসময় চোখ নিউমোনিয়া হয়ে যায়"

‎ইখতিয়ারের কপাল কুঁচকে গেল। চোখে নিউমোনিয়া?এর না এইচএসসিতে সায়েন্স ছিল? ইখতিয়ারের ইচ্ছে করল ইশতিয়াক এর মাথা দেয়ালে ঠুকে দিতে। কিন্তু আজও সে কিছু বলল না।

‎শুধু একবার গভীর শ্বাস নিল।তারপর মুগ্ধার দিকে আরেকবার তাকাল। মুগ্ধা তখন নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।

‎

‎

‎ইশতিয়াক কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে দৃশ্যটা উপভোগ করল।

‎ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা এমনিতেই অদ্ভুত নীরবতায় মোড়া। সেই নীরবতার মাঝখানে মুগ্ধা বসে আছে মাথা নিচু করে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা রোদের আলো তার গালের একপাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে, যেন সোনালি কোনো প্রজাপতি এসে নিঃশব্দে বসেছে।

‎সাধারণত মুগ্ধাকে দেখলেই ইশতিয়াকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কারণ মুগ্ধা আর সে একসঙ্গে থাকলে ঝগড়া, খুনসুটি আর কথার লড়াইয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে।

‎কিন্তু আজ...

‎আজ মুগ্ধা যেন অন্য মানুষ। বর্ষার আগের থমথমে আকাশের মতো। ইশতিয়াক ধীরে ধীরে সোফার পাশে গিয়ে বসল।

‎তারপর মুগ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

‎" কী রে? আমি আবার কী করলাম?"

‎মুগ্ধা কোনো উত্তর দিল না। ইশতিয়াক বুকের ওপর হাত রেখে কষ্ট পাওয়ার ভান করল।

‎" আল্লাহ! এমন অবহেলা! আমি কি তোর কোনো পাকা ধানে মই দিছি?"

‎মুগ্ধা এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলল। চোখে বিরক্তির ছাপ। গলায় ক্লান্তি।

‎"ধান রোয়ার মাটিতেই দিছোস। যা, দূর হ।"

‎কথাটা বলে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল সে।

‎ইশতিয়াক কয়েক সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

‎তারপর মুখ বেঁকিয়ে এমন ভাব করল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপমানটা সে সহ্য করেছে।সে নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‎"আচ্ছা, এবার জমিই নিয়ে যাচ্ছি। থাক তুই তোর ধান নিয়ে।"

‎বলেই উঠে দাঁড়াল।পাশে তখনও গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে ইখতিয়ার। দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাথরের মূর্তির কম মনে হয় না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কী ঝড় বইছে, সেটা শুধু আল্লাহই জানেন।

‎ইশতিয়াক দুষ্টু হেসে তার হাত ধরে ফেলল।

‎"চলেন জনাব। আর দাঁড়িয়ে থাকলে মসজিদে খুতবা শেষ হয়ে যাবে।"

‎ইখতিয়ার ভ্রু কুঁচকাল।

‎"হাত ছাড়।"

‎" ছাড়ব না।"

‎বলেই টানতে শুরু করল সে। ইখতিয়ার বিরক্ত মুখে হাঁটতে লাগল।তবে বেরিয়ে যাওয়ার আগে অজান্তেই একবার পিছনে তাকিয়ে ফেলল।

‎মুগ্ধা তখনও বসে আছে।

‎

‎পরক্ষণেই দুজন বেরিয়ে গেল। বাড়ির অন্য পুরুষেরাও আগেই মসজিদের পথে রওনা হয়েছে।

‎পুরো বাড়ি তখন যেন নারীদের কোলাহলে ভরে উঠল। ইন্তিয়া এসে মুগ্ধার পাশে বসলেন।

‎মায়াভরা চোখে বললেন,

‎" শরীর কেমন আছে মা?"

‎মুগ্ধা মৃদু হাসল।

‎" ভালো আছি, আম্মু।"

‎ঠিক তখনই রাফেয়া রান্নাঘর থেকে একটি কাঁচের বয়াম হাতে নিয়ে এলেন। মুখে বিজয়ীর হাসি।

‎"এই যে, নতুন আচার বানাইছি। আগে এটা চেখে দেখো"

‎বয়ামের ঢাকনা খুলতেই টক-মিষ্টি আমের আচারের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। যেন গ্রীষ্মের দুপুর কাঁচের বয়ামের ভেতর বন্দি হয়ে আছে।

‎ইন্তিয়া সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট প্লেটে করে তুলে দিলেন।

‎" খেয়ে বলো তো কেমন হয়েছে।"

‎মুগ্ধা একটু আচার মুখে দিল।

‎টক, ঝাল আর মিষ্টির মিশ্র স্বাদ জিভে ছড়িয়ে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।

‎সেই হাসি দেখে ইন্তিয়া আর রাফেয়া দুজনেই খুশি হয়ে গেলেন। মনে হলো, অনেকদিন পর বাড়ির উঠোনে হারিয়ে যাওয়া কোনো পাখি আবার ফিরে এসেছে। আর সেই পাখিটাকে ঘিরে সবাই যত্নের নরম ডানা মেলে দাঁড়িয়ে আছে।

‎

‎

‎রহিমার ঘরটায় রৌদ্দুরের আলো নরম হয়ে এসে পড়েছে। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া রোদ বিছানার একপাশে সোনালি চাদর বিছিয়ে রেখেছে। মুগ্ধা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল।

‎রহিমা বালিশে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। অসুস্থতার কারণে মুখটা কিছুটা শুকিয়ে গেলেও চোখদুটো আগের মতোই স্নেহে ভরা।

‎মুগ্ধাকে দেখেই মুখে হাসি ফুটল তার।

‎রহিমার রুগ্ন স্বর ভেসে এলো,

‎" এসেছিস ? আমি কিন্তু রিনি এখনো"

‎মুগ্ধা জীভ কাটল। রহিমার বিছানার পাশে বসে পড়ল সে।

‎" কেমন আছেন?"

‎

‎রহিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

‎" আলহামদুলিল্লাহ, আগের চেয়ে অনেক ভালো। বয়স হয়েছে তো, শরীর আর আগের মতো কথা শোনে না।"

‎

‎মুগ্ধার চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।

‎" নিজের খেয়াল রাখবেন তো।"

‎

‎রহিমা মুগ্ধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মেয়েটার দিকে তাকালো। আজকাল মেয়েটার জন্য বড্ড মায়া হয়।

‎" আল্লাহ তোকে সুখে রাখুক মা। তোর জীবনটা শান্তিতে ভরে উঠুক।"

‎

‎মুগ্ধা মাথা নিচু করল। দোয়ার শব্দগুলো কেমন যেন বুকের ভেতর গিয়ে ধাক্কা দিল।

‎কিছুক্ষণ গল্প করে সে আবার ড্রয়িংরুমে ফিরে এল।

‎

‎

‎এদিকে জুম্মার নামাজ শেষ।

‎এক এক করে বাড়ির পুরুষেরা ফিরতে শুরু করেছে। বাতাসে তখন মসজিদ ফেরত মানুষের আতরের গন্ধ আর গরম জিলাপির মিষ্টি সুবাস মিশে গেছে।

‎প্রথমে ঢুকলেন ইসরায়েল শেখ। মুগ্ধাকে দেখেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।

‎" আরে, মুগ্ধা আম্মু এসেছে যে"

‎

‎বলেই হাতে থাকা প্যাকেট থেকে একটা গোল গোল জিলাপি বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

‎ "নাও মা। তোমার জন্য আনা"

‎

‎মুগ্ধা হেসে হাতে নিল।

‎" ধন্যবাদ। ইউ আর দ্যা গ্ৰেট আব্বু"

‎

‎তারপর ছোট্ট একটা কামড় দিতেই মিষ্টি রস মুখে ছড়িয়ে পড়ল। মুহূর্তেই সে খিলখিল করে হেসে উঠল। কয়েক মুহূর্ত পর ইসরাফিল শেখও এসে হাজির। তার হাতেও জিলাপি।

‎" এই নাও, তোমার জন্য আলাদা করে এনেছি।"

‎

‎মুগ্ধা এবার হাসতে হাসতে বলল,

‎" আজ তো দেখি আমার ভাগ্যই খুলে গেছে।"

‎

‎ঘরে উপস্থিত সবাই মুচকি হাসল। কিন্তু আসল নাটক তখনও বাকি। সেটা তো করবেন এ বাড়ির ছোট পুত্র।

‎এবার এল ইশতিয়াক। তার মুখে এমন একটা ভাব, যেন বিশাল কোনো যুদ্ধ জয় করে এসেছে।

‎হাতে কিছু একটা শক্ত করে ধরা।

‎সে গম্ভীর মুখে মুগ্ধার সামনে এসে দাঁড়াল।তারপর হাত বাড়িয়ে দিল। মুগ্ধা তাকিয়ে দেখল...

‎এক টুকরো জিলাপি।

‎এত ছোট যে ভালো করে চোখ না মেললে দেখা যায় না। মোটামুটি এক সেন্টিমিটার মতো হবে।

‎মনে হচ্ছে খেতে খেতে কষ্ট করে শেষ অংশটা বাঁচিয়ে এনেছে।

‎ইশতিয়াক গর্বের সঙ্গে বলল,

‎" নে। তোর জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষণ করেছি।"

‎

‎ড্রয়িংরুমে মুহূর্তেই হাসির রোল পড়ে গেল।

‎মুগ্ধা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল।

‎তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এখনই কারও গলা টিপে ধরবে।

‎" এইটা?"

‎" হ্যাঁ।"

‎"এইটা আমাকে দিবি?"

‎"ভালোবাসার মূল্য বুঝতে শিখ পিও।"

‎

‎মুগ্ধা দাঁত কিড়মিড় করল।

‎"এ ভালোবাসা আমি রাখি কই? মাটি চাপা দিয়ে দে তোর ভালোবাসা হতচ্ছাড়া, তোরে আজকে..."

‎

‎ইশতিয়াক বুঝে ফেলল বিপদ আসছে। সে সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে গেল।

‎" বাঁচাও!"

‎

‎সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল। ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল।

‎"মুগ্ধা?"

‎

‎হাসির শব্দ থেমে গেল। মুগ্ধাও থেমে গেল। সবার চোখ একসঙ্গে সিঁড়ির দিকে উঠল। উপরে দাঁড়িয়ে আছে ইখতিয়ার। সাদা পাঞ্জাবি এখনও গায়ে।

‎মুখে আগের মতোই স্থির ভাব।

‎সে আবার বলল,

‎" মুগ্ধা, উপরে আসো একটু।"

‎

‎মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশ বদলে গেল যেন।ইশতিয়াকের মুখ হাঁ হয়ে গেল। ইন্তিয়া অবাক হয়ে তাকালেন। রাফেয়াও চোখ বড় বড় করে ফেললেন। কারণ ইখতিয়ার কখনও এভাবে সবার সামনে মুগ্ধাকে ডাকে না। সেটাও আবার নাম ধরে।

‎মুগ্ধা নিজেও কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

‎না বলতে চাইল মুগ্ধা। পারল না। এত মানুষের সামনে কীভাবে না বলে?

‎অবশেষে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। পেছনে রয়ে গেল কৌতূহলী দৃষ্টির সারি।

‎

‎

‎

‎উপরে পৌঁছে মুগ্ধা দেখল, করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে ইখতিয়ার। দুই হাত পাঞ্জাবির পকেটে গুঁজে।

‎মুখে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য। মুগ্ধা ভ্রু কুঁচকাল।

‎" কী হয়েছে?"

‎

‎ইখতিয়ার কিছু বলল না। শুধু পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা সাদা রুমাল বের করল। রুমালটা ভাঁজ করা।সাবধানে মোড়ানো। তারপর সেটা মুগ্ধার হাতে ধরিয়ে দিল।

‎মুগ্ধা অবাক হয়ে রুমাল খুলল। আর খুলতেই থমকে গেল। ভেতরে কয়েকটা বড় বড় জিলাপি।

‎একেবারে অক্ষত। যত্ন করে রাখা।

‎মুহূর্তেই তার চোখ গোল হয়ে গেল। এমন গোল যে মনে হচ্ছে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য আবিষ্কার করেছে।

‎সে অবিশ্বাস নিয়ে কখনও জিলাপির দিকে, কখনও ইখতিয়ারের দিকে তাকাচ্ছে। ইখতিয়ার সেই দৃষ্টি দেখে বিরক্ত হয়ে গেল।

‎ইখতিয়ার মুখ ফিরিয়ে নিল। রুমালের দিকে ইশারা করে বলল,

‎"আমি ওয়াশরুমে যাচ্ছি,দ্রুত শেষ কর।"

‎

‎বলেই সোজা হাঁটা দিল ইখতিয়ার। আর মুগ্ধা? সে দাঁড়িয়ে রইল করিডোরে। হাতে রুমালে মোড়ানো জিলাপি। চোখে আকাশসম বিষ্ময়। সে ইন্তিয়ার কাছে শুনেছে ইখতিয়ার কখনো মসজিদে গিয়ে জিলাপি নেয় না। আব্বুর থেকে এক টুকরো ভেঙে নিয়ে খায়। আর আজ তার জন্য জিলাপি আনল? তাও এতগুলো? এত যত্ন করে?

‎

‎

‎#চলবে___?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন