ফন্ট সাইজ:
থিম:
ম্যারিড লাইফ

২১তম পর্ব

লেখক: রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎#ম্যারিড_লাইফ্

‎#পর্ব_21

‎#রঙ্গনা_মৈত্র_ঊর্মি

‎ধীরে ধীরে পড়াশোনায় প্রভাব পড়তে শুরু করল।

‎যে ছেলেটা সবসময় প্রথম হতো, সে পিছিয়ে যেতে লাগল। একটু একটু করে রেজাল্ট খারাপ হতে লাগল। আর বাড়িতে শুরু হলো চাপ,বকাঝকা, তুলনা,হতাশা।

‎আমার আব্বা আমাকে ভালোবাসতেন। খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা সবসময় কোমল হয় না।অনেক সময় সেটা কঠোর হয়ে আসে। তখন আমার মনে হতো, কেউ আমাকে বুঝছে না। একদম না। নিজেই নিজেকে বোঝাতে পারতাম না। অন্যরা কীভাবে বুঝবে?

‎তবু সময় বড় অদ্ভুত জিনিস।

‎ভাঙা হাড় যেমন একসময় জোড়া লাগে, তেমনি ভাঙা মনও কোনো না কোনোভাবে বাঁচতে শিখে যায়। আমি ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নিলাম।

‎আবার পড়াশোনায় মন দিলাম। আবার সামনে হাঁটতে শুরু করল।

‎কিন্তু আগের মানুষটা আর ফিরল না। কোথাও যেন হারিয়ে গেল। সেই প্রাণবন্ত ছেলেটার জায়গায় জন্ম নিল এক চুপচাপ মানুষ। শান্ত,গম্ভীর।

‎নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকা।

‎এরপর সে আর কাউকে বন্ধু বানাতে পারল না।

‎চাইলও না। কারণ তার মনে হতো, কাছের মানুষ একদিন না একদিন হারিয়েই যায়। তাই দূরে থাকাই ভালো।"

‎

‎ইখতিয়ার আবারো থামল। ঠোঁটে তার তাচ্ছিল্য হাসি। চোখ অস্বাভাবিক লাল। গাল তো কখনই ভিজে গেছে। দৃষ্টি এখনো দূরাকাশে। ঠোঁট আবার নড়ল তার। বলতে শুরু করল,

‎"প্রাইমারি শেষ হলো।

‎হাইস্কুলে উঠলাম। চারপাশে প্রচুর মানুষ ছিল। কিন্তু নিজের মানুষ ছিল না। করিডোর ভরা ছাত্রছাত্রী।

‎তবু আমি একা। মাঠ ভরা কোলাহল। তবু স্থীরতার প্রতিক হয়ে রয়ে গেলাম। যেন মানুষের ভিড়ে হাঁটতে থাকা একটা নিঃসঙ্গ ছায়া।

‎আমার চুপচাপ স্বভাবের কারণে কেউ খুব একটা কাছে আসত না।

‎কেউ হয়তো ভাবত অহংকারী। কেউ হয়তো ভাবত উদাসীন। আসলে আমি শুধু ভয় পেতাম। আবার কাউকে হারানোর ভয়।

‎

‎এরপর কলেজ জীবন এলো। আর সেখানেই বহুদিন পর প্রথমবারের মতো একটা বন্ধুমহল পেলাম।তৃষা ছিল সেই দলেরই একজন। আরও কয়েকজন ছিল। তারা খুব অদ্ভুত মানুষ ছিল।

‎তারা আমাকে বদলানোর চেষ্টা করেনি। আমার নীরবতাকে অপমান করেনি। বরং সেই নীরবতাসহ আমাকে গ্রহণ করেছিল। আমি খুব কম কথা বলতাম। তারা তবু পাশে বসত।

‎আমি আড্ডা দিতাম না। শুধু তাদের আড্ডা শুনতাম। তারা তবু ডাকত।

‎প্রথমবারের মতো আমার মনে হয়েছিল—হয়তো পৃথিবীতে এখনও কিছু মানুষ আছে, যারা বিনা শর্তে পাশে থাকে। সেই দিনগুলো সুন্দর ছিল।

‎খুব সুন্দর।দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির মতো। কিন্তু সুন্দর জিনিসের আয়ু যে বড় কম।

‎

‎কলেজ শেষ হলো। সবাই ছড়িয়ে গেলাম।কেউ মেডিকেলে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেউ বা অন্য শহরে।সবাই নিজের জীবনের পেছনে ছুটতে শুরু করল। আর আমি?

‎আমি আবার একা হয়ে গেলাম। ঠিক আগের মতো।যেন একবার ফুটে ওঠা বাগান হঠাৎ ঝরে গেছে। ফুলগুলো নেই। শুধু খালি ডালপালা রয়ে গেছে।

‎এরপর শুরু হলো আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন।

‎প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অনেকের কাছে স্বপ্ন ছিল।

‎আমার কাছেও ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের ভেতরেও এক ধরনের নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে ছিল।

‎বিশাল ক্যাম্পাস।

‎হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। নতুন পরিবেশ। নতুন জীবন। তবু প্রথম দিন থেকেই আমার কেমন জানি মনে হয়েছিল, আমি এখানে অতিথি।

‎অন্য সবাই যেন কোথাও না কোথাও যুক্ত। শুধু আমিই বিচ্ছিন্ন।

‎দিনগুলো এমনভাবে কাটতে লাগল, যেন কেউ একই পৃষ্ঠার ফটোকপি বারবার ছাপাচ্ছে।

‎একই রুটিন। একই একাকীত্ব।

‎বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ছাদে দাঁড়িয়ে আমি প্রায়ই নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।দেখতাম বন্ধুরা একসঙ্গে হাঁটছে। কেউ চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে তো কেউ গল্পে মাতোয়ারা।আবার কেউ হাসিতে ঝড় তুলছে।

‎আর আমি?

‎আমি ছিলাম দর্শক। সবসময়ের একানিষ্ঠ দর্শক।

‎

‎দুই বছর কেটে গেল।একটা নয়। দুইটা দীর্ঘ বছর।

‎সময়ের নদী বয়ে চলল।

‎মানুষ এলো, গেল। কিন্তু আমার জীবন একই রকম রয়ে গেল। একলা। যেন কুয়াশায় ঢাকা কোনো স্টেশন। যেখানে ট্রেন আসে , যায়। শুধু একজন যাত্রী চুপচাপ বসে থাকে। অপেক্ষায়।

‎কিসের অপেক্ষা, সে নিজেও জানে না..."

‎

‎ইখতিয়ার থামল। গালবেয়ে পরা অশ্রুগুলো শুকিয়ে গেছে। এখনো এদিকটা নিরব। তেমন কেউ এদিকে নেই। তবে বিকাল হয়ে গেছে। দুজনের কারো খেয়াল নেই। মুগ্ধার চোখে পানি গড়াচ্ছে। প্রিয় মানুষের কষ্ট কে বা সহ্য করতে পারে? তা প্রিয় মানুষটির জীবনে এত নিঃসঙ্গতা?

‎মুগ্ধা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইখতিয়ারের পানে। তবে ইখতিয়ারের দৃষ্টি এখনো আকাশের থেমে আছে। পলক পড়ছে খুব ধীরে। ইখতিয়ার নিজের এক হাত দিয়ে আরেক হাত মুঠো করে ধরল ‌। খুব শক্ত করে। যেন নিজেকে নিজে ভরসা দিচ্ছে। ইখতিয়ার আবার নিজ কাহিনী আওড়াতে থাকল। উকড়ে দিলো নিজের সব কষ্ট,বেদনা। বলল,

‎"জানো মুগ্ধা , আর তারপরই আমার জীবনের সেই দীর্ঘ নীরবতার ভেতর একদিন হঠাৎ করে একজন এসে পড়ল। একজন এন্জেল।

‎যে নিজেই ছিল একটা ঝলমলে বিকেল।

‎চঞ্চল, প্রাণবন্ত হাসিখুশি। তার নামের মতোই সুন্দর।"

‎একটু থামল ইখতিয়ার। এবার থেমে থেমে আওড়ালো,

‎"মুনতাহা...সিদরাতুল মুনতাহা"

‎

‎

‎#চলবে__?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন