ফন্ট সাইজ:
থিম:
ম্যারিড লাইফ

৩৪তম পর্ব

লেখক: রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎#ম্যারিড_লাইফ্

‎#পর্ব_৩৪

‎#রঙ্গনা_মৈত্র_ঊর্মি

‎এবারের বৃহস্পতিবারের সকালটা যেন অন্য সব সকালের চেয়ে একটু বেশি ব্যস্ত, একটু বেশি অস্থির। ভোরের আকাশে তখনও মেঘের পাতলা আস্তরণ। পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে ঠিকই, কিন্তু তার আলো এখনো ম্লান—যেন স্নিগ্ধার প্রথম পরীক্ষার উত্তেজনায় আকাশটাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

‎তালুকদার বাড়ির উঠোনে শিশিরের বিন্দুগুলো রোদের অপেক্ষায় ঘাসের ডগায় ঝুলে আছে মুক্তোর মতো।

‎স্নিগ্ধার ঘরের দরজা খোলা। টেবিলের উপর বই-খাতা, কলম, অ্যাডমিট কার্ড, পানির বোতল—সবকিছু সাজানো থাকলেও মেয়েটার ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। কখনো একটা বই খুলছে, আবার হঠাৎ মনে পড়ছে আরেকটা অধ্যায়ের কথা। দ্রুত কয়েক পৃষ্ঠা উল্টে দেখছে। তারপর কলমটা খুঁজছে, অথচ কলমটা তার হাতেই।

‎চোখে রাতজাগার ক্লান্তি, তবুও মুখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। আজ তার প্রথম পরীক্ষা। এতদিনের পড়াশোনা, অপেক্ষা, ভয় আর স্বপ্ন—সবকিছু যেন আজ কয়েক ঘণ্টার একটা পরীক্ষার খাতায় গিয়ে মিলবে।

‎আয়েশা বেগম দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েকে দেখছিলেন। হাতে গরম দুধের গ্লাস। চোখে মায়ের চিরচেনা উদ্বেগ। মেয়ের পরীক্ষার দিন মায়েদের মন বোধহয় এমনই হয়—নিজের সন্তান পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে, অথচ পরীক্ষার টেনশনটা যেন মায়ের বুকেই এসে জমা হয়।

‎“স্নিগ্ধা মা, আর কত পড়বি? একটু দুধটা খেয়ে নে।”

‎স্নিগ্ধা বই থেকে চোখ না তুলেই বলল,

‎“এই তো মা, আর পাঁচ মিনিট।”

‎আয়েশা বেগম মৃদু হেসে বললেন,

‎“তোর এই পাঁচ মিনিট শেষ হতে হতে পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে।”

‎স্নিগ্ধা এবার মুখ তুলে তাকাল। চোখে হালকা হাসি।

‎“ভয় লাগছে মা।”

‎কথাটা শুনে আয়েশা বেগমের বুকটা কেমন করে উঠল। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

‎“ভয় পাবি না। তুই যতটা পড়েছিস, আল্লাহ চাইলে তার চেয়েও ভালো লিখবি। শুধু মাথা ঠান্ডা রাখবি।”

‎স্নিগ্ধা মাথা নেড়ে আবার বইয়ের দিকে তাকাল।

‎বাইরে তখন সকালের আলো একটু একটু করে উজ্জ্বল হচ্ছে। উঠোনে রোদ ছড়িয়ে পড়ছে সোনালি চাদরের মতো। অথচ আয়েশা বেগমের মনে এখনও মেঘ জমে আছে। মেয়েটা ছোট থেকে কত যত্নে বড় হয়েছে। পড়াশোনায় কখনোই জোড়াজুড়ি করতে হয়নি স্নিগ্ধাকে। নিজ ইচ্ছায় পড়েছে। ফলস্বরূপ তার এই ছোট জীবনে অনেক অর্জনই জুটেছে। আজ এত বড় একটা পরীক্ষার হলে একা বসবে—এই ভাবনাটাই মায়ের বুকের ভেতর অদৃশ্য কাঁটার মতো বিঁধছে।

‎তিনি চুপচাপ মেয়ের ব্যাগটা আরেকবার দেখে নিলেন। অ্যাডমিট কার্ড আছে কি না, কলম আছে কি না, পানির বোতল ঠিক আছে কি না—সবকিছু যেন দশবার যাচাই করেও তার মন শান্ত হচ্ছে না।

‎স্নিগ্ধা বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল।

‎“মা, দোয়া করো।”

‎আয়েশা বেগম মেয়েকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। কপালে চুমু দিয়ে বললেন,

‎“আমার দোয়া সবসময় তোর সাথে আছে মা। মন দিয়ে পরীক্ষা দে। ভালোকিছু হবে। তোর জন্য আজ আমার বুকের ভেতরটা যেন পাখির ডানার মতো কাঁপছে।”

‎স্নিগ্ধা মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে মৃদু হাসল।

‎আর সেই হাসিটুকু দেখেই আয়েশা বেগম বুঝলেন—মেয়েটা ভয় পেলেও ভেঙে পড়েনি। আজ সে শুধু পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে না, নিজের স্বপ্নের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে। নিজের সবটা দিয়ে সপ্ন বহন করতে চাচ্ছে।

‎

‎

‎

‎

‎সকালটা যত এগোচ্ছে, স্নিগ্ধার বুকের ভেতর ততই যেন উথালপাথাল করছে। আজ তার প্রথম পরীক্ষা। এতদিনের পড়াশোনা, রাতজাগা, বইয়ের পাতায় চোখ রেখে স্বপ্ন দেখা—সবকিছুর প্রথম পরীক্ষা আজ। কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের ভিড়টা তাই তার কাছে আজ অন্যরকম লাগছিল।

‎রেজোওয়ান তালুকদার গাড়ি থামিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। বাবার চোখেও আজ অদৃশ্য চিন্তার রেখা।

‎“সবকিছু নিয়েছিস তো মা?”

‎স্নিগ্ধা মাথা নেড়ে বলল,

‎“হ্যাঁ বাবা।”

‎“অ্যাডমিট কার্ড?”

‎“আছে।”

‎“কলম?”

‎“আছে।”

‎“পানি?”

‎স্নিগ্ধা এবার মৃদু হেসে বলল,

‎“বাবা, সব আছে।”

‎রেজোওয়ান সাহেবও হাসলেন। তারপর মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

‎“ভয় পাবি না। প্রশ্ন যেমনই আসুক, মাথা ঠান্ডা রাখবি। তুই পারবি।”

‎

‎স্নিগ্ধা বাবার হাতটা এক মুহূর্ত ধরে রাখল। তারপর গাড়ি থেকে নামল। রেজোওয়ান তালুকদার গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। গাড়িটা গেট পেরিয়ে দূরে মিলিয়ে যেতেই স্নিগ্ধা একবার গভীর শ্বাস নিল। চারপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। কেউ শেষ মুহূর্তের পড়া দেখছে, কেউ বন্ধুর কাছে প্রশ্ন করছে, কেউ আবার ভয় পেয়ে বইয়ের পাতা উল্টে চলেছে। স্নিগ্ধা ফাইলটা ঠিক করে গেটের দিকে এগোচ্ছিল।

‎ঠিক তখনই—

‎ভ্রূউউউমমম!

‎একটা মেরুন রঙের বাইক এসে গেটের পাশেই থামল। স্নিগ্ধার পা থেমে গেল।

‎মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল।

‎হেলমেট খুলতেই এলোমেলো চুলগুলো কপালের ওপর ঝরে পড়ল। পরিচিত সেই মুখ। ঠোঁটের কোণে চিরচেনা দুষ্টু হাসি।

‎ইশতিয়াক।

‎স্নিগ্ধা চোখ সরিয়ে নিতে চাইল। পারল না।

‎ইশতিয়াক বাইকটা স্ট্যান্ডে রেখে এমন একটা ভাব নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল, যেন হঠাৎ করে এই কলেজগেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিই সে।

‎“কী অবস্থা, ম্যাডাম?”

‎স্নিগ্ধা ছোট করে বলল,

‎“ভালো।”

‎“পরীক্ষার ভয় লাগছে?”

‎“হু।”

‎“এতটুকু?”

‎“হু।”

‎ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকাল।

‎“এই যে! আমি এত সুন্দর করে কথা শুরু করলাম, আর তুমি শুধু হু-হা করছো কেন?”

‎স্নিগ্ধা ফাইলের দিকে তাকিয়ে বলল,

‎“পরীক্ষা আছে।”

‎“তা জানি তো। পরীক্ষা আছে বলেই তো এসেছি।”

‎স্নিগ্ধা এবার একবার তাকাল।

‎“কেন?”

‎ইশতিয়াক গলা খাঁকারি দিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল।

‎“তোমার ভয় দূর করতে।”

‎স্নিগ্ধার ঠোঁটের কোণে অতি সামান্য হাসি ফুটে উঠল। তবে সে সঙ্গে সঙ্গে মুখটা গম্ভীর করে ফেলল।

‎“আমার ভয় নেই।”

‎“ওহ! তাই?”

‎ইশতিয়াক নাটকীয় ভঙ্গিতে চারপাশে তাকাল।

‎“তাহলে ওই যে তোমার হাত কাঁপছে, সেটা কি ভূমিকম্প?”

‎স্নিগ্ধা নিজের হাতের দিকে তাকাল। সত্যিই আঙুলগুলো একটু কাঁপছে।

‎“এমনিই।”

‎“হুম। এমনিই।”

‎ইশতিয়াক এবার স্বরটা নরম করল।

‎“শোন, স্নিগ্ধা।”

‎মেয়েটা চুপ করে রইল।

‎“ভয় পাবা না। তুমি যতটা পড়েছ, তার অর্ধেকও যদি মনে থাকে, তবুও ভালো পরীক্ষা দিবা। আর প্রশ্ন কঠিন হলে ভাববি—সবাইয়ের জন্যই কঠিন। সহজ হলে—সবাইয়ের জন্যই সহজ।”

‎স্নিগ্ধা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। ইশতিয়াকের চোখে এবার কোনো দুষ্টুমি নেই। শুধু আন্তরিকতা। স্নিগ্ধাকে স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা।

‎“আর একটা কথা।”

‎“হুম?”

‎“প্রথম প্রশ্নটা দেখেই যদি মাথা ঘুরে যায়, আমার কথা মনে করবে।”

‎স্নিগ্ধা ভ্রু কুঁচকাল।

‎“তোমার কথা কেন?”

‎ইশতিয়াক হেসে বলল,

‎“কারণ আমি জীবনে এত বোকামি করেছি যে, তুই অন্তত ভাববি—‘ইশতিয়াকের চেয়ে আমি হাজার গুণ ভালো।’ ব্যস, আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে।”

‎স্নিগ্ধার মুখ দিয়ে এবার সত্যিকারের হাসি বেরিয়ে এল।

‎“তুমি একটা পাগল।”

‎“জানি তো।”

‎কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ। কলেজের ভেতর থেকে পরীক্ষার ঘণ্টা বাজার আগের ঘোষণা ভেসে এলো।

‎স্নিগ্ধা ব্যাগটা শক্ত করে ধরল।

‎ইশতিয়াক এবার একটু সরে দাঁড়িয়ে বলল,

‎“যাও। মন দিয়ে পরীক্ষা দেও।”

‎স্নিগ্ধা কয়েক পা এগিয়ে আবার ফিরে তাকাল।

‎ইশতিয়াক বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে। ঠোঁটে সেই পরিচিত হাসি। সে হাত তুলে ইশারা করল।

‎“ভয় পাবা না, স্নিগ্ধা। তুমি পারবা”

‎স্নিগ্ধা কিছু বলল না। শুধু মাথা নাড়ল। ইশতিয়াক বাতাসের যত্ন ছুড়ে দিলো। স্নিগ্ধা হালকা লজ্জা পেল। তারপর কলেজের গেট পেরিয়ে ভেতরে চলে গেল। ইশতিয়াক অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

‎মেরুন বাইকটা তখনও রোদের নিচে দাঁড়িয়ে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার চোখে যেন একটাই প্রার্থনা—

‎তার প্রিয়তমা যেন সর্বোচ্চ সফলতা পায়। ব্যার্থতা যেন তাকে ছুঁতে না পারে।

‎একটা শান্তিপূর্ণ সকালের সূচনা।

‎শেখবাড়ির ঘরের ভেতর অবশ্য শান্তির লেশমাত্র নেই। মুগ্ধা নিজের ঘর গোছাতে ব্যস্ত। সামনে কয়েকটা বই, পাশে খাতা, টেবিলের ওপর পরীক্ষার রুটিন। অনার্সের পরীক্ষা চলছে বলে তার দিনগুলো এখন বই, নোট আর পরীক্ষার প্রস্তুতিতে আটকে আছে। একটা বই সরিয়ে আরেকটা বই রাখছে, কখনো খাতাগুলো গুছিয়ে স্তূপ করছে, আবার পরক্ষণেই কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ নোট মনে পড়ে সেটা খুঁজতে শুরু করছে।

‎চুলগুলো আলগা করে বাঁধা। কপালের পাশে দু-একটা চুল বারবার এসে পড়ছে। মুগ্ধা বিরক্ত হয়ে সেগুলো কানের পেছনে গুঁজে আবার কাজে মন দিল।

‎“এই বইটা এখানে রাখলে আবার কাল খুঁজে পাব না।”

‎নিজেকেই বিড়বিড় করে বলল সে। ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।

‎মুগ্ধা ফিরে তাকাল না।

‎ইখতিয়ার বেরিয়ে এসেছে। ভেজা চুল থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে কপাল বেয়ে নামছে। গায়ে হালকা রঙের টি-শার্ট, হাতে তোয়ালে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে মুছতে সে কিছুক্ষণ মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে রইল।

‎মুগ্ধা তখনও ব্যস্ত।

‎তার এই ব্যস্ততাটা ইখতিয়ারের কাছে বেশ মজার লাগল। নিঃশব্দে তোয়ালেটা পাশে রেখে সে পা টিপে টিপে মুগ্ধার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

‎মুগ্ধা কিছু বুঝে ওঠার আগেই—

‎দুই হাত এসে আলতো করে তার কোমর জড়িয়ে ধরল। মুগ্ধা চমকে উঠল।

‎“আহ!”

‎হাতের বইটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। পেছন থেকে ইখতিয়ারের হাসির শব্দ। মুগ্ধার ঘাড়ে থুতনি রাখল। হাতের বাঁধন দৃঢ় হল ।

‎“এত ভয় পাওয়ার কী আছে?”

‎মুগ্ধা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোর চেষ্টা করল।

‎“আপনি! এভাবে কেউ পেছন থেকে ধরে?”

‎“তোমার স্বামী ধরেছে।”

‎“তাই বলে?”

‎“তাই বলে আরও শক্ত করে ধরার কথা।”

‎বলেই ইখতিয়ার একটু কাছে টেনে নিল। মুগ্ধা লজ্জায় গাল ফুলিয়ে বলল,

‎“ছাড়ুন তো। ঘর গোছাচ্ছি।”

‎“দেখছি।”

‎“তাহলে ছাড়ুন।”

‎“না।”

‎“কেন?”

‎“তুমি আমাকে সময় দিচ্ছ না।”

‎মুগ্ধা এবার চোখ কুঁচকে বলল,

‎“আমার পরীক্ষা চলছে। পড়াশোনা করব না?”

‎“করবে।”

‎“তাহলে?”

‎“আমাকেও একটু পড়াও।”

‎মুগ্ধা অবাক।

‎“আপনাকে?”

‎“হুম।”

‎“কী পড়াব?”

‎ইখতিয়ার গম্ভীর মুখ করে বলল,

‎“স্বামীকে কীভাবে সময় দিতে হয়—এই অধ্যায়টা।”

‎মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে কনুই দিয়ে পেছনে হালকা ধাক্কা দিল।

‎“আপনার মাথায় কিছু নেই।”

‎“আছে তো। খুব ভালোভাবেই আছে।”

‎“কী আছে?”

‎“তুমি।”

‎মুগ্ধা থেমে গেল।

‎ইখতিয়ার পাল্টাতে শুরু করেছে। স্বাভাবিক হয়েছে তার সাথে। কিন্তু এত পরিবর্তন মুগ্ধাকে। মুগ্ধার গাল ধীরে ধীরে গোলাপের পাপড়ির মতো লাল হয়ে উঠল।সে মুখ ঘুরিয়ে বলল,

‎“আপনি দিন দিন খুব বেশি কথা শিখে যাচ্ছেন।”

‎ইখতিয়ার মৃদু হেসে তার কানের পাশে ঝুলে থাকা চুলটা সরিয়ে দিল।

‎“বউয়ের সাথে কথা বলতে শিখতে হয়।”

‎“আমার তো মনে হচ্ছে, আপনি শুধু আমাকে বিরক্ত করতেই শিখেছেন।”

‎“সেটাও শিখেছি।”

‎

‎মুগ্ধা এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।

‎“ছাড়ুন, প্লিজ। আমার আজ অনেক পড়া।”

‎ইখতিয়ার একটু নরম হলো। আলিঙ্গনটা ঢিলে করে বলল,

‎“ঠিক আছে। পড়ো।”

‎মুগ্ধা দ্রুত সামনে সরে গিয়ে বইটা তুলে নিল। কিন্তু দুই পা যেতেই ইখতিয়ার আবার ডাকল,

‎“মুগ্ধা।”

‎“কী?”

‎“আমাকে কেমন লাগছে বলতো?”

‎মুগ্ধা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

‎“ভালো না”

‎ইখতিয়ার ভ্রু তুলল। বলল,

‎"আসলেই?"

‎"উঃ, কেন বিশ্বাস হচ্ছে না?"

‎“কারণ তোমার মুখ বলছে অন্য কথা।”

‎মুগ্ধা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।

‎“আপনি না… ভীষণ বিরক্তিকর।”

‎ইখতিয়ার হেসে বলল,

‎“তবুও তো তোমার।”

‎মুগ্ধা আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু বইটা খুলে বসে গেল। কিন্তু ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা হাসিটা আর লুকাতে পারল না।

‎ইখতিয়ার দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

‎এই ছোট্ট ঘর, এলোমেলো বই, পরীক্ষার চাপ আর দুজন মানুষের খুনসুটি—সংসারের সুখ বোধহয় এমনই। বড় কোনো আয়োজন নয়; বরং ব্যস্ত দিনের মাঝখানে চুরি করে পাওয়া কয়েক মুহূর্তের হাসি।

‎

‎

‎সময় ঘন্টা দুয়েক অতিবাহিত হলো।

‎মপরনে লাল রঙের থ্রিপিস। গলার কাছে সূক্ষ্ম কাজ করা নকশা, ওড়নাটা পরিপাটি করে কাঁধে রাখা। খোলা চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, কপালের পাশে দু-একটা চুল বাতাসে দুলছে। চোখে সামান্য কাজল। সাজ খুব সাধারণ, অথচ সেই সরলতাতেই মুগ্ধাকে আজ মায়াবী লাগছে।

‎ইখতিয়ার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।

‎পরনে হালকা রঙের শার্ট, গাঢ় প্যান্ট। হাতে বাইকের চাবি। মুগ্ধাকে দেখতেই তার চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

‎মুগ্ধা সেটা বুঝতে পেরে চোখ নামিয়ে ফেলল।

‎“চলবেন?”

‎ইখতিয়ার হালকা হাসল।

‎“চলো।”

‎

‎দুজন পাশাপাশি সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।

‎সিঁড়ির রেলিংয়ে সকালের রোদ এসে পড়েছে। তাদের পাশাপাশি নামার দৃশ্যটা যেন কোনো পুরোনো ছবির ফ্রেম—একজনের পদক্ষেপের সঙ্গে আরেকজনের পদক্ষেপ মিলছে, অথচ দুজনের চোখেই লুকিয়ে আছে আলাদা আলাদা গল্প।

‎নিচে পৌঁছাতেই ইন্তিয়া বেগমের চোখ দুজনের দিকে গেল। তিনি মুহূর্তেই থেমে গেলেন।

‎মুগ্ধার পাশে ইখতিয়ারকে দেখে মায়ের মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

‎“মাশাআল্লাহ!”

‎তার কণ্ঠে এমন মায়া ছিল, যেন নিজের চোখের সামনে কোনো স্বপ্নকে সত্যি হতে দেখেছেন।

‎“আমার ছেলেমেয়েদুটোকে আজ কী সুন্দর লাগছে!”

‎মুগ্ধা লজ্জায় মাথা নিচু করল।

‎ইখতিয়ার মৃদু হেসে বলল,

‎“আম্মু, ওর পরীক্ষা আছে। দেরি হয়ে যাবে।”

‎“হ্যাঁ হ্যাঁ, আগে খেয়ে নে।”

‎ডাইনিং টেবিলে সবাই প্রায় বসে গেছে। গরম পরোটা, ডিম ভাজি, সবজি আর ধোঁয়া ওঠা চা দিয়ে টেবিলটা যেন ছোটখাটো সকালের উৎসব।

‎মুগ্ধা চুপচাপ খেতে বসেছে। ইখতিয়ার পাশের চেয়ারে। ইন্তিয়া বারবার মুগ্ধার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন।

‎“আরেকটা পরোটা নে মা।”

‎“না আম্মু, হয়ে গেছে।”

‎“হবে না। পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিস। খালি পেটে পরীক্ষা দিলে মাথা কাজ করবে?”

‎ইখতিয়ারও মুগ্ধার দিকে তাকিয়ে বলল,

‎“আম্মুর কথা শোনো। আরেকটু খেয়ে নাও।”

‎মুগ্ধা চোখ তুলে তাকাল।

‎“আপনিও শুরু করলেন?”

‎“আমি তো তোমার পক্ষেই বলছি।”

‎মুগ্ধা মুখ লুকিয়ে হাসল।

‎নাস্তা শেষ হতে না হতেই সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠল। মুগ্ধা নিজের ব্যাগটা কাঁধে নিল। অ্যাডমিট কার্ডটা আরেকবার দেখে নিল ইখতিয়ার।

‎“সব আছে?”

‎“হ্যাঁ।”

‎“চলো তাহলে।”

‎দরজার সামনে এসে মুগ্ধা প্রথমে রহিমা বেগমকে সালাম করল। তারপর ইন্তিয়া বেগমের পা ছুঁয়ে সালাম করতেই তিনি মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।

‎“আল্লাহ তোর পরীক্ষা ভালো করুক মা।”

‎মুগ্ধা নরম গলায় বলল,

‎“আমিন।”

‎ইখতিয়ারও সবার কাছ থেকে সালাম নিল এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সালাম করল। বাড়ির অন্যরাও একে একে দোয়া করে দিল।

‎বাইরে তখন সকালের রোদ আরও উজ্জ্বল।

‎কালো বাইকটা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। ইখতিয়ার দরজা খুলে দিল। মুগ্ধা উঠে বসল। ব্যাগটা কোলে রাখল।

‎ইখতিয়ার বাইক চালু করল।

‎বাইকের শব্দে বাড়ির উঠোনের চঞ্চলতায় শব্দ যোগ করল।

‎রান্নাঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ইন্তিয়া বেগম দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখে তখন মায়ের দোয়া। গেট খুলে গেল।

‎বাইকটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল শেখবাড়ি থেকে।

‎মুগ্ধা পিছে বসে সামনে তাকিয়ে রইল। সামনে পরীক্ষা, বুকের ভেতর অল্প ভয়, অল্প উত্তেজনা—আর সামনে বসে থাকা মানুষটার উপস্থিতিতে সেই ভয়টা যেন একটু একটু করে সাহসে বদলে যাচ্ছিল।

‎

‎

‎#চলবে___?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন