মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার পর থেকেই রিদয় আর অন্তরা যোগাযোগটা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। একসময় যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলতো, মাসখানেক ধরে তাদের মাঝে শুধু ইমোজি আর সংক্ষিপ্ত মেসেজ বিনিময় হতো। রিদয় জানত, অন্তরার পরিবার একটু কড়া; তারা কখনোই এই সম্পর্ক সহজে মেনে নেবে না। তবুও রিদয় আশা ছেড়ে দেয়নি, সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে নেমেছিল।
একদিন বিকেলে অন্তরার একটা মেসেজ এল—"রিদয়, কাল আমার গায়েহলুদ। বাবা-মা জোর করে ঠিক করেছে। পারলে ক্ষমা করে দিস।"
মেসেজটা দেখার পর রিদয়ের মাথার ছাদ যেন ভেঙে পড়েছিল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে মেয়েটাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিল, সে আজ অন্য কারও হয়ে যাচ্ছে। সে বহুবার ফোন করল, কিন্তু অন্তরা ফোন ধরল না। শেষমেশ মেসেজ এল—"ফোন করিস না, আমাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ভালো থাকিস।"
বিয়ে ভাঙানোর বা বাধা দেওয়ার মতো সাহস বা সামাজিক অবস্থান—কোনোটাই সেই মুহূর্তে রিদয়ের ছিল না। সে শুধু নীরব দর্শক হয়ে দিনগুলো পার করতে লাগল।
বিয়ে হয়ে গেল অন্তরার। এর ঠিক এক বছর পর, রিদয়ের ঠিকানায় একটা হলুদ খামের চিঠি এল। খামটার লেখাগুলো অন্তরার হাতের। হাত কাঁপছিল রিদয়ের, চিঠিটা খুলতেই চোখ ভিজে উঠল:
"প্রিয় রিদয়,
জানি তোর খুব ঘৃণা হচ্ছে আমার ওপর? বিশ্বাস কর, সেদিন প্রতিবাদ করার অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু বাবার চোখের জল আর মায়ের অসুস্থতার কাছে হেরে গিয়েছিলাম। যেদিন কবুল পরেছিলাম, সেদিন মনে হচ্ছিল আমার বুকের ভেতরটা কেউ চিরতরে শূন্য করে দিয়েছে। আজও প্রতিদিন রাতে তোর কথা মনে পড়ে। তুই হয়তো ভালো থাকিস নি, কিন্তু বিশ্বাস কর, তোর থেকে এক ফোঁটাও কম কষ্ট আমার হচ্ছে না। ভালো থাকিস অন্য কোনো আকাশে।
—ইতি
তর বেইমন অন্তরা।"
চিঠিটা বুকে জড়িয়ে রিদয় বহুক্ষণ কেঁদেছিল। কিছু ভালোবাসা হারিয়ে যায় না, শুধু দূরত্বের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। সমাজে অন্তরা হয়তো কারও স্ত্রী, কিন্তু তার মনটা আজও সেই অসমাপ্ত গল্পের রিদয়ের জন্যই কাঁদে।
চিঠি পাওয়ার পর রিদয়ের জীবনটা যেন আরও থমকে গেল। দীর্ঘ কয়েক বছর কেটে গেল এভাবেই। রিদয় নিজেকে পড়াশোনা আর ক্যারিয়ারে পুরোপুরি ডুবিয়ে দিল। আজ সে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ভালো অবস্থানে আছে, কিন্তু মনের ভেতর জমে থাকা শূন্যতা একটুও কমেনি।
একদিন কাজের সূত্রে রিদয়ের অন্য একটি শহরে যেতে হয়েছিল। সন্ধ্যার পর শহরের একাকী ব্যস্ত রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ অন্তরার সাথে তার দেখা হয়ে গেল।
অন্তরার পরনে সেই চেনা সাদাসিধে সালোয়ার-কামিজ নেই, পরনে লাল পাড়ের একটি শাড়ি। তবে তার চোখেমুখে আগের সেই দীপ্তি আর নেই; বরং সেখানে জমে আছে গভীর ক্লান্তি আর অদৃশ্য এক কষ্ট। অন্তরার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল বছর চারেকের একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান।
দুজনেই থমকে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের জন্য রাস্তার চারপাশের কোলাহল যেন মিলিয়ে গেল। দু’জনের চোখেই অজান্তে জল চলে এল।
অন্তরার আলতোস্বরে ডেকে উঠল—"রিদয়?"
রিদয় শুধু মৃদু হেসে বলল, "কেমন আছিস, অন্তরা?"
বৃষ্টি চোখ নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল, "ভালো? ভালো থাকা কি আর আমার কপালে আছে, রিদয়? সমাজ, সংসার আর দায়িত্বের খাঁচায় বন্দি এই জীবনে বেঁচে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। প্রতিদিন নিজের ছায়ার সাথে লড়াই করতে হয়।"
ছোট মেয়েটি মায়ের আঁচল ধরে কৌতূহলী চোখে রিদয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। অন্তরা তখন চোখ মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় বলল, "এই দেখ, আমার মেয়ে। এর নাম রেখেছি 'রিয়া মনি'। তোর নামের প্রথম অংশটা এর নামের মাঝে বেঁচে আছে। এ ছাড়া তোকে মনে রাখার আর কোনো অধিকার আমার নেই।"
রিদয়ের বুকটা ফেটে কান্না আসতে চাইল। সে দেখল, পরিস্থিতির কাছে হেরে যাওয়া এই মানুষটার জীবনটাও কতটা নিষ্ঠুরভাবে থমকে আছে।
বিদায় নেওয়ার সময় অন্তরা মলিন হেসে বলল, "ভালো থাকিস, রিদয়। পারলে ক্ষমা করে দিস এই স্বার্থপর মেয়েটাকে।"
অন্তরা তার মেয়েকে নিয়ে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। রিদয় অনেকক্ষণ সেই শূন্য রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু গল্প হয়তো বাস্তবে কখনো শেষ হয় না, তারা শুধু হৃদয়ের কোনো এক গোপন কোণে চিরকালের মতো সৃতি হয়ে বেঁচে থাকে।
অন্তরার সাথে সেই হঠাৎ দেখা হওয়ার পর থেকে রিদয়ের মনের ক্ষতগুলো যেন নতুন করে জেগে উঠল। সে বুঝতে পারল, সময়ের ব্যবধানে দূরত্ব বাড়লেও তাদের দুজনের মনের টান একবিন্দুও কমেনি। কিন্তু বাস্তবতা যে কতটা কঠিন, তা তারা দুজনেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল।
এর ঠিক দুই বছর পর। রিদয় তখনো অবিবাহিত, কাজের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছে। ঠিক সেই সময় এক সকালে তার ফোনে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে কল এল। ফোনটা রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে এক অপরিচিত কান্নার আওয়াজ ভেসে এল—"আপনি কি রিদয় ভাই বলছেন?"
রিদয় বুক কাঁপিয়ে জিজ্ঞেস করল, "হ্যাঁ, আমি রিদয় বলছি। কে বলছেন?"
ওপাশ থেকে কান্নার রোলে ভেসে এল, "আমি অন্তরার ছোট বোন বলছি। আপা... আপা আর নেই।"
কথাটা শোনার পর রিদয়ের হাতের ফোনটা খসে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। চারপাশটা যেন তার চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে এল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপাপা হাতে জিজ্ঞেস করল, "কী... কী বলছেন আপনি? এ কী বলছেন?"
বোনটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আপার শরীরটা অনেক দিন ধরেই ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছিল। প্রবল মানসিক চাপ আর যন্ত্রণার কারণে গত রাতে আপার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সব শেষ হয়ে গেছে। তবে মারা যাওয়ার আগে আপা ডায়েরির পাতার মাঝে একটা শেষ কথা লিখে গেছে, যেখানে শুধু আপনার নামটাই লেখা ছিল।"
খবরটা শোনার পর রিদয়ের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। সে সেদিনই ছুটে গেল সেই শহরে, যে শহরে অন্তরা বন্দি ছিল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অন্তরা চিরকালের মতো সব কষ্টের ঊর্ধ্বে চলে গেছে।
অন্তরা বাড়িতে পৌঁছানোর পর তার পরিবার রিদয়কে বাধা দিল না। অন্তরার শোবার ঘরে ঢুকেই রিদয় দেখল টেবিলের ওপর একটা ছোট লাল ডায়েরি রাখা। ডায়েরিটা খুলে প্রথম পাতাতেই অন্তরার সেই পরিচিত কাঁপাকাঁপা হাতের লেখা দেখতে পেল:
"প্রিয় রিদয়,
জানিস তো, এই দমবন্ধ করা জীবনে আমার বাঁচার একমাত্র সান্ত্বনা ছিল তোর ওই দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়া। সমাজের কাছে আমি হয়তো কারও স্ত্রী আর কারও মা ছিলাম, কিন্তু আমার আত্মাটা সবসময় তোরই ছিল। এই পৃথিবীতে তোর সাথে আমার পূর্ণতা পাওয়া হলো না। হয়তো ওপারে গিয়ে কোনো এক মুক্ত আকাশে আমাদের আর কোনো বাধা থাকবে না। ভালো থাকিস আমার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা।
—ইতি, তোর অন্তরা।"
চিঠিটা পড়ার পর রিদয় আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ডায়েরিটি বুকে জড়িয়ে ধরে ছোট বাচ্চার মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
আজ অন্তরা নেই, কিন্তু তার স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে। রিদয় আর কখনো কাউকে ভালোবাসেনি। সে আজও বিশ্বাস করে, দূরত্ব আর সমাজের দেয়াল হয়তো তাদের শরীরকে আলাদা করে দিয়েছিল, কিন্তু তাদের এই পবিত্র কষ্টমাখা ভালোবাসা অমর হয়ে রবে যুগ থেকে যুগান্তরে।