### 🌹 রক্তজবার প্রেম
A NOBEL BY SAMIRA
### অধ্যায় ১ — রক্তজবার রাত
রাত তখন প্রায় এগারোটা।
আকাশের বুকজুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা। চারদিকে অন্ধকারের রাজত্ব। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানিতে বিশাল রহমান বাড়িটি আলোকিত হয়ে উঠছে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির পানিতে ভিজে উঠেছে বাড়ির সামনের বাগান।
বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।
পরনে সাদা রঙের সালোয়ার-কামিজ। কোমর ছুঁয়ে থাকা কালো চুলগুলো খোলা। মুখে কোনো সাজসজ্জা নেই। চোখ দুটোতে একধরনের সরলতা।
মেয়েটির নাম রক্তিমা রহমান।
বয়স একুশ। ছোটবেলা থেকেই মেয়েটি একটু অন্যরকম। কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে পারে না। কেউ সামান্য ভালো ব্যবহার করলেই তাকে আপন ভেবে বসে। আবার কেউ একটু কঠিন কথা বললে সারারাত চুপচাপ কাঁদে।
তার হাতে একটি লাল রক্তজবা।
ফুলটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল সে।
— তোমাকে দেখতে এত সুন্দর লাগে কেন বলো তো?
নিজেই নিজের কথায় হেসে ফেলল রক্তিমা।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
— রক্তি!
মেয়েটি ঘুরে তাকাল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তার মা নাজমা রহমান।
— মা, তুমি ঘুমাওনি?
— তুই ঘুমাসনি কেন? এই বৃষ্টির মধ্যে বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস!
— বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগছে।
— বৃষ্টি দেখতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তখন কে দেখবে?
রক্তিমা মায়ের কাছে গিয়ে হাত ধরল।
— তুমি দেখবে না?
নাজমা মেয়ের গালে হাত রেখে মৃদু হাসলেন।
— এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারি না!
রক্তিমা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল,
— মা, একটা কথা বলব?
— বল।
— মানুষ কি কাউকে না চিনেও তার জন্য অপেক্ষা করতে পারে?
নাজমা একটু অবাক হলেন।
— হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?
— জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার জীবনে এমন কেউ আসবে, যাকে আমি আগে কখনো দেখিনি। অথচ মনে হবে তাকে অনেক আগে থেকেই চিনি।
মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— এসব চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমাতে যা।
রক্তিমা মৃদু হেসে ঘরের দিকে চলে গেল।
কিন্তু নাজমা রহমানের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
মেয়ের কথাটা শুনে কেন যেন তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
### রহমান পরিবারের রাতের অতিথি
রাত প্রায় বারোটা।
বাড়ির সামনের গেটে একটি কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ির দরজা খুলে নেমে এল একজন যুবক।
কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, হাতে দামি ঘড়ি। মুখে কোনো হাসি নেই। চোখ দুটোতে অদ্ভুত এক শীতলতা।
তার নাম আরহাম খান।
বয়স আটাশ।
শহরের পরিচিত ব্যবসায়ী। কিন্তু তার সম্পর্কে মানুষের জানাশোনা খুব কম। কেউ বলে সে ভীষণ অহংকারী, কেউ বলে তার রাগ ভয়ংকর। আবার কেউ বলে, মানুষটির হাসি নাকি বহু বছর ধরে হারিয়ে গেছে।
আরহাম বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই কাজের লোক এগিয়ে এল।
— স্যার, আপনি এসেছেন?
— কামাল সাহেব কোথায়?
— স্যার, ড্রয়িংরুমে আছেন।
আরহাম কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা ড্রয়িংরুমে চলে গেল।
সোফায় বসে ছিলেন কামাল রহমান।
তাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন।
— আরহাম! এত রাতে আসতে হলো?
— একটা জরুরি কাজ ছিল।
— এত বছর পর দেশে ফিরেছিস। একটু সময় নিয়ে আসতে পারতিস।
আরহাম সোফায় বসে বলল,
— সময় আমার হাতে খুব বেশি নেই, আঙ্কেল।
কামাল সাহেব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— তোর বাবার মতোই হয়েছিস।
আরহামের চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
— বাবার কথা তুলবেন না, আঙ্কেল।
— কেন? বাবাকে মনে পড়ে না?
— কিছু স্মৃতি মনে না করাই ভালো।
কামাল সাহেব আর কোনো কথা বললেন না।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল রক্তিমা।
হাতে একটি ট্রে। ট্রেতে কয়েক কাপ চা।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে টেবিলে চায়ের কাপ রাখল।
— আসসালামু আলাইকুম।
আরহাম একবার তার দিকে তাকাল।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম।
কামাল সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— রক্তিমা, ইনি আরহাম খান। আমার খুব কাছের বন্ধুর ছেলে।
রক্তিমা মিষ্টি করে হাসল।
— আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।
আরহাম কোনো উত্তর দিল না।
রক্তিমা একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
সে চলে যেতে উদ্যত হলে আরহাম হঠাৎ বলল,
— তোমার নাম রক্তিমা?
— জি।
— অদ্ভুত নাম।
রক্তিমা মৃদু হেসে বলল,
— আমার নামটা আমার মায়ের পছন্দ।
— নামের অর্থ জানো?
— জি। লাল রঙের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আরহাম কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
— তোমার নামের সঙ্গে এই বাড়ির একটা পুরোনো গল্প জড়িয়ে আছে।
রক্তিমার চোখ বড় হয়ে গেল।
— কী গল্প?
কামাল সাহেব দ্রুত বলে উঠলেন,
— আরহাম, এসব কথা এখন থাক।
আরহাম চায়ের কাপে চুমুক দিল।
— ঠিক আছে।
রক্তিমা অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকাল।
কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না।
### একটি নিষিদ্ধ বাগান
রাত বাড়ছে।
নিজের ঘরে যাওয়ার আগে রক্তিমা জানালা দিয়ে বাগানের দিকে তাকাল।
বাগানের মাঝখানে বিশাল একটি পুরোনো গাছ। তার পাশে অসংখ্য রক্তজবা ফুটে আছে।
কিন্তু বাগানের উত্তর পাশটা অদ্ভুতভাবে অন্ধকার।
সেখানে একটি পুরোনো লোহার দরজা।
রক্তিমা আগে কখনো ওই দরজার দিকে বিশেষ নজর দেয়নি।
আজ কেন যেন দরজাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।
হঠাৎ তার মনে হলো, দরজার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
সে চোখ কুঁচকে তাকাল।
কেউ নেই।
নিজেকে বোঝাল, হয়তো ভুল দেখেছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।
— ওইদিকে কী দেখছ?
রক্তিমা চমকে ঘুরে দাঁড়াল।
আরহাম!
তার মুখে আগের মতোই কঠিন অভিব্যক্তি।
— কিছু না।
— তাহলে ওদিকে তাকিয়ে আছ কেন?
— বাগানটা দেখছিলাম।
— বাগান দেখতে হলে এই বাড়িতে আরও অনেক জায়গা আছে।
রক্তিমা একটু সাহস করে বলল,
— আপনি কি সবসময় এমন রাগী থাকেন?
আরহাম ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কী রকম?
— এই যে, সবসময় এমন গম্ভীর হয়ে থাকেন।
আরহাম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বেশি কথা বলার অভ্যাস আমার নেই।
রক্তিমা মাথা নিচু করল।
— সরি।
মেয়েটির সরল উত্তর শুনে আরহাম কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
— রাত হয়েছে। ঘুমাতে যাও।
— জি।
রক্তিমা চলে যেতে লাগল।
হঠাৎ আরহাম আবার ডাকল।
— রক্তিমা!
মেয়েটি ফিরে তাকাল।
— জি?
— ওই বাগানের উত্তর পাশের দরজার কাছে কখনো যাবে না।
— কেন?
— কারণ আমি নিষেধ করেছি।
রক্তিমা কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
— কিন্তু কেন নিষেধ করছেন, সেটা তো বললেন না!
আরহামের চোখের দৃষ্টি আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
— সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া ভালো নয়।
কথাটা বলে সে চলে গেল।
রক্তিমা দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, এই মানুষটির চোখের ভেতরে অনেক না বলা গল্প জমে আছে।
### রাত ১টা — অচেনা নম্বর
নিজের ঘরে ফিরে বিছানায় বসে আছে রক্তিমা।
তার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে।
উত্তর পাশের দরজার ওপাশে কী আছে?
এত বড় বাড়িতে একটা দরজা নিয়ে এত নিষেধ কেন?
সে ফোন হাতে নিয়ে বান্ধবী মেহরিনকে কল করল।
দুইবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ঘুমজড়ানো কণ্ঠ ভেসে এল।
— হ্যালো! এই রাতদুপুরে ফোন দিয়েছিস কেন?
রক্তিমা হেসে বলল,
— তোর ঘুম ভাঙালাম?
— না, আমি তো রাত জেগে তোর জন্য বসে আছি!
— আচ্ছা, রাগ করিস না।
— বল, কী হয়েছে?
— আমাদের বাড়িতে একজন এসেছে।
— ছেলে নাকি মেয়ে?
— ছেলে।
— ওহ! তাহলে তো ঘটনা আছে!
রক্তিমা বিরক্ত হয়ে বলল,
— ধুর! তেমন কিছু না। মানুষটা খুব গম্ভীর।
— দেখতে কেমন?
— ভালোই।
— ভালোই মানে?
— মেহরিন! তুই না একদম অসহ্য!
দুজনেই হেসে উঠল।
কথা বলতে বলতে রক্তিমা জানালার দিকে তাকাল।
হঠাৎ তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
অপরিচিত নম্বর।
তুমি কি রক্তিমা রহমান?
রক্তিমা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল।
জি। আপনি কে?
কয়েক সেকেন্ড পর আবার মেসেজ এল।
যে ফুলটা তোমার হাতে থাকে, সেটি আর কখনো ছিঁড়বে না।
রক্তিমার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।
আপনি কে?
এবার উত্তর এল আরও ভয়ংকর একটি বাক্যে।
তোমার জন্মের আগের গল্পটা কি তুমি জানো?
রক্তিমা আর কোনো উত্তর দিতে পারল না।
সে সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটিতে কল দিল।
কিন্তু ফোন বন্ধ।
মেয়েটি ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
— এ কেমন অদ্ভুত মানুষ!
### আরহামের ঘর
অন্যদিকে নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আরহাম।
হাতে একটি কালো কফির মগ।
তার সামনে শহরের রাতজাগা আলো। কিন্তু তার চোখ আটকে আছে বহু পুরোনো একটি ছবিতে।
ছবিতে একজন তরুণী।
পরনে লাল শাড়ি। খোলা চুল। হাতে একটি রক্তজবা।
ছবিটির পেছনে লেখা—
রক্তজবার গল্প কোনোদিন শেষ হবে না।
আরহাম ছবিটির দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
— কেন ফিরে এলে তুমি? এত বছর পর আবার কেন?
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
— স্যার?
— আসো।
ভেতরে প্রবেশ করল আরহামের বিশ্বস্ত সহকারী রায়হান।
— স্যার, আপনি যে কাগজগুলো চেয়েছিলেন, সেগুলো পেয়েছি।
আরহাম হাত বাড়িয়ে কাগজগুলো নিল।
কয়েকটি পুরোনো দলিল। কিছু ছবি। আর একটি চিঠি।
চিঠিটি খুলতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
লেখা ছিল—
আরহাম, যদি কখনো রক্তিমা রহমানের সঙ্গে তোমার দেখা হয়, তাহলে তাকে কখনো অবহেলা করো না। মেয়েটি এই ঘটনার জন্য দায়ী নয়।
আরহাম চিঠিটি ভাঁজ করে টেবিলে রাখল।
রায়হান জিজ্ঞেস করল,
— স্যার, মেয়েটিকে কি সবকিছু জানানো হবে?
— না।
— কিন্তু স্যার, একদিন তো সত্যিটা জানবেই।
আরহাম জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— সেদিন আসার আগেই আমাকে অনেক কিছু করতে হবে।
— আর যদি দেরি হয়ে যায়?
আরহাম এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।
— আমি দ্বিতীয়বার কাউকে হারাতে চাই না, রায়হান।
### পরদিন সকাল
সকাল আটটা।
রান্নাঘরে ব্যস্ততা চলছে। নাজমা রহমান সকালের নাশতা তৈরি করছেন।
রক্তিমা ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে এল।
— মা, কী রান্না করছ?
— তোর পছন্দের খিচুড়ি।
রক্তিমা মায়ের পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
— আমার পৃথিবীর সেরা মা!
— হয়েছে, হয়েছে। এখন প্লেটগুলো নিয়ে টেবিলে যা।
রক্তিমা প্লেট নিয়ে ডাইনিং রুমে গেল।
সেখানে কামাল রহমান, আরহাম এবং বাড়ির ছোট ছেলে রাফি বসে আছে।
রাফি রক্তিমার ছোট ভাই। বয়স সতেরো। দুষ্টুমি করতে তার জুড়ি নেই।
রক্তিমাকে দেখে সে বলল,
— আপু, আজকে এত সকাল সকাল সূর্য কোন দিকে উঠেছে?
রক্তিমা চোখ বড় করে বলল,
— তোর মাথায় উঠেছে!
রাফি হেসে উঠল।
আরহাম চুপচাপ বসে নাশতা করছিল।
রক্তিমা তার সামনে একটি প্লেট রাখল।
— নিন।
আরহাম একবার তাকাল।
— ধন্যবাদ।
রক্তিমা একটু অবাক হলো।
গত রাতের মানুষটির মুখে আজ ধন্যবাদ শুনে তার বেশ ভালো লাগল।
রাফি হঠাৎ বলে উঠল,
— আরহাম ভাইয়া, আপু কিন্তু খুব ভালো রান্না করতে পারে।
রক্তিমা দ্রুত বলল,
— রাফি! চুপ কর।
আরহাম রক্তিমার দিকে তাকাল।
— সত্যি?
রক্তিমা লজ্জা পেয়ে বলল,
— একটু-আধটু পারি।
রাফি আবার বলে উঠল,
— একটু-আধটু না! গতকাল ডিম ভাজি পুড়িয়ে পুরো রান্নাঘর কালো করে ফেলেছে!
রক্তিমা রাগ করে বলল,
— তুই না একদম অসভ্য!
কামাল সাহেব হেসে ফেললেন।
আরহামের ঠোঁটের কোণেও সামান্য হাসির আভাস দেখা গেল।
রক্তিমা সেটা খেয়াল করল।
মনে মনে ভাবল,
মানুষটা হাসতেও পারে তাহলে!
### একটি পুরোনো চিঠি
নাশতা শেষে রক্তিমা নিজের ঘরে ফিরছিল।
সিঁড়ির পাশে একটি ছোট টেবিলের ওপর তার চোখ পড়ল।
সেখানে একটি খাম রাখা।
খামের ওপর তার নাম লেখা।
রক্তিমা রহমান।
সে খামটি হাতে নিল।
ভেতরে একটি পুরোনো চিঠি।
কাগজটি হলদে হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে অনেক বছর ধরে কোথাও লুকিয়ে রাখা ছিল।
চিঠি খুলে পড়তেই তার হাত কেঁপে উঠল।
প্রিয় রক্তিমা,
তোমাকে যদি কোনোদিন এই চিঠি দেওয়া হয়, তাহলে বুঝবে অতীত আবার ফিরে এসেছে। তোমার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস।
তোমার হাতে যে রক্তজবা ফুলটি থাকে, সেই ফুলের গল্প সাধারণ কোনো গল্প নয়।
মনে রেখো, সবাই তোমার আপন নয়।
আর সবচেয়ে বড় কথা, আরহাম খানকে বিশ্বাস করার আগে তার অতীত সম্পর্কে জেনে নিও।
চিঠির নিচে কোনো নাম নেই।
শুধু একটি তারিখ—
১৫ বছর আগের।
রক্তিমার চোখে পানি চলে এল।
সে নিজেকে প্রশ্ন করল,
— আমার জীবনে কী এমন ঘটেছিল, যা আমি জানি না?
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
— চিঠিটা কোথায় পেলে?
রক্তিমা চমকে পেছনে তাকাল।
আরহাম!
তার চোখ সরাসরি চিঠির ওপর।
— এটা... এখানে পেয়েছি।
আরহাম এগিয়ে এসে বলল,
— আমাকে দাও।
রক্তিমা চিঠিটি বুকের কাছে ধরে বলল,
— আগে বলুন, এখানে আমার নাম কেন লেখা?
— চিঠিটা আমাকে দাও, রক্তিমা।
— না। আগে বলুন, আমার অতীত নিয়ে আপনারা সবাই এত লুকোচুরি করছেন কেন?
আরহাম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,
— কারণ তোমার জানার মতো সব সত্য এখনো তোমার সামনে আসেনি।
রক্তিমার চোখ ভিজে উঠল।
— আমি কি এতটাই ছোট যে আমাকে কিছু বলা যাবে না?
আরহাম মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কিছুটা নরম কণ্ঠে বলল,
— তুমি ছোট নও। কিন্তু সব সত্য একসঙ্গে জানার জন্য প্রস্তুতও নও।
রক্তিমা চোখ মুছে বলল,
— আমি আর কোনো প্রশ্ন করব না। শুধু একটা কথা বলুন, আমি কি কোনো ভুল করেছি?
আরহাম কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে উত্তর দিল,
— না। তোমার কোনো ভুল নেই।
এই প্রথম রক্তিমার মনে হলো, মানুষটি যতটা কঠিন দেখায়, তার ভেতরে হয়তো অন্য কোনো গল্প লুকিয়ে আছে।
### রাতের শেষ রহস্য
সেদিন রাতে রহমান বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
কিন্তু রক্তিমার চোখে ঘুম নেই।
চিঠিটি বারবার পড়ছে সে।
হঠাৎ জানালার বাইরে একটি ছায়া দেখতে পেল।
সে পর্দা সরিয়ে তাকাল।
বাগানের মাঝখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
লোকটির হাতে একটি লাল রক্তজবা।
রক্তিমা ভয় পেয়ে জানালা থেকে সরে এল।
কিছুক্ষণ পর আবার তাকিয়ে দেখল, সেখানে কেউ নেই।
শুধু জানালার নিচে পড়ে আছে একটি ছোট্ট কাগজ।
কাগজে লেখা—
“প্রেমের গল্প শুরু হওয়ার আগেই রক্তের ইতিহাস শেষ করতে হবে।”
রক্তিমা কাগজটি হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার অজান্তেই রহমান বাড়ির পুরোনো ঘরের দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
আর সেই দরজার ওপাশে রাখা ছিল একটি ছবি।
ছবিতে রক্তিমার মতো দেখতে এক তরুণী।
ছবির নিচে লেখা—
রক্তিমা — ১৫ বছর আগে।
প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত।
চলবে... 🌹