অপূর্ণতার আড়ালে
অধ্যায় ১ — নতুন একটা নাম
সকালটা অন্য দিনের মতোই ছিল।
জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে হালকা রোদ এসে ঘরের মেঝেতে পড়েছিল। বাইরে পাখির ডাক, পাশের বাড়ির কারও কথা বলার শব্দ, আর রান্নাঘর থেকে মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ—সব মিলিয়ে প্রতিদিনের মতোই একটা সাধারণ সকাল।
কিন্তু নীলাঞ্জনার মনটা আজ কেমন যেন অস্থির ছিল।
কোনো কারণ ছাড়াই।
সে বিছানায় বসে কিছুক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখল।
সাড়ে সাতটা।
“আবার দেরি হয়ে গেল…”
নিজের মনেই কথাটা বলে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে পড়ল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে মায়ের গলা শোনা গেল,
“নীলাঞ্জনা! স্কুলে যাবি না?”
“যাব তো মা। উঠেছি।”
“প্রতিদিন একই কথা। শেষ মুহূর্তে উঠে দৌড়াদৌড়ি করবি।”
“আজকে করব না।”
কথাটা বলেই নীলাঞ্জনা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে শুরু করল।
নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তার মনে হলো—আজকে সত্যিই যেন অন্যরকম একটা দিন।
কেন এমন মনে হচ্ছে, সে জানত না।
হয়তো কিছুই হবে না।
হয়তো দিনটা অন্য সব দিনের মতোই কেটে যাবে।
সে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
---
স্কুলের গেটের কাছে পৌঁছাতেই সুরাইয়া তাকে দেখে হাত নাড়ল।
“এই নীলু!”
নীলাঞ্জনা কাছে যেতেই সুরাইয়া তার হাত ধরে বলল,
“তুই এত দেরি করলি কেন?”
“দেরি কোথায়? সময় তো আছে।”
“তুই সবসময়ই বলিস সময় আছে। তারপর ক্লাসে গিয়ে দেখি সবার আগে তোর বই খুঁজে পাওয়া যায় না।”
“আজকে কিন্তু সব ঠিকঠাক আছে।”
সুরাইয়া সন্দেহের চোখে তাকাল।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে একটা খবর শুন।”
“কী?”
সুরাইয়া একটু কাছে এসে গলা নামিয়ে বলল,
“আমাদের ক্লাসে নতুন একটা ছেলে আসছে।”
নীলাঞ্জনা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তো?”
“তো কী?”
“নতুন কেউ আসলে কী হয়েছে?”
“তুই একদম boring।”
পাশ থেকে মেহরিন এসে বলল,
“ওকে এসব বলে লাভ নেই। নীলাঞ্জনা নতুন মানুষ দেখলেই এমন ভাব করে যেন পৃথিবীতে কিছুই ঘটেনি।”
নীলাঞ্জনা হেসে বলল,
“কারণ সত্যিই তো কিছু ঘটেনি।”
সুরাইয়া বলল,
“ছেলেটার নাম আয়ান।”
“আচ্ছা।”
“শুধু আচ্ছা?”
“আর কী বলব?”
মেহরিন হেসে ফেলল।
“দেখিস, আজকে এই ‘আচ্ছা’ কথাটাই সবচেয়ে বেশি মনে থাকবে।”
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।
“তোরা দুজন পাগল।”
তিনজন একসঙ্গে ক্লাসের দিকে চলে গেল।
---
ক্লাসে ঢুকতেই তাদের বাকি বন্ধুরাও একে একে চলে এলো।
তাসনিম সবসময়কার মতো শান্তভাবে নিজের খাতা বের করে বসে ছিল।
ইরা ঢুকেই বলল,
“আজকে কিন্তু আমি কারও সঙ্গে ঝগড়া করব না।”
অর্পিতা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তুই এই কথা বললেই বুঝি আজকে সবচেয়ে বেশি ঝগড়া হবে।”
ইরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আমি এত খারাপ?”
“হ্যাঁ।”
সবাই হেসে উঠল।
এক কোণে বসে থাকা মায়া শুধু হেসে আবার নিজের বইয়ের দিকে তাকাল।
নীলাঞ্জনা সবাইকে দেখে মনে মনে হাসল।
এই ছয়জনই ছিল তার সবচেয়ে কাছের মানুষ।
মেহরিন—তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। এমন অনেক কথা ছিল যেগুলো নীলাঞ্জনা অন্য কাউকে বলতে না পারলেও মেহরিনকে বলতে পারত।
সুরাইয়া—যার মুখ কখনো বন্ধ থাকে না। সবসময় কিছু না কিছু নিয়ে মজা করবে, বিরক্ত করবে, আবার প্রয়োজন হলে সবার আগে পাশে দাঁড়াবে।
তাসনিম—শান্ত আর বুঝদার। সবাই যখন একসঙ্গে কথা বলত, তখনও সে চুপ করে সব শুনত।
ইরা—সবসময় হাসিখুশি। একটা ছোট ঘটনাকেও এমনভাবে বলত যে সবাই হেসে ফেলত।
অর্পিতা—রাগ একটু বেশি, কিন্তু মনটা নরম।
আর মায়া—সবচেয়ে চুপচাপ। সে বেশি কথা বলত না, কিন্তু কার কী হয়েছে সেটা অদ্ভুতভাবে বুঝে ফেলত।
এই মানুষগুলো নিয়েই নীলাঞ্জনার ছোট্ট পৃথিবী।
তখনও সে জানত না, খুব শিগগিরই সেই পৃথিবীতে আরও একজন ঢুকে পড়বে।
---
কিছুক্ষণ পর শিক্ষক ক্লাসে ঢুকলেন।
সবার কথা ধীরে ধীরে থেমে গেল।
শিক্ষক বই খুলে রাখতেই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
“স্যার?”
সবাই দরজার দিকে তাকাল।
একজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
কালো শার্ট, কাঁধে ব্যাগ, মুখে খুব বেশি কোনো ভাব নেই। চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরে যেন একটা দূরত্ব আছে।
শিক্ষক বললেন,
“ভেতরে আসো।”
ছেলেটা ভেতরে ঢুকল।
“তোমার নাম কী?”
ছেলেটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
“আয়ান।”
শুধু একটা নাম।
কিন্তু নীলাঞ্জনা জানত না, এই নামটাই একদিন তার জীবনের সঙ্গে এতটা জড়িয়ে যাবে।
শিক্ষক বললেন,
“নতুন এসেছো। সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নাও।”
আয়ান পুরো ক্লাসের দিকে তাকাল।
তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য নীলাঞ্জনার চোখে এসে থামল।
নীলাঞ্জনা অকারণে চোখ সরিয়ে নিল।
সুরাইয়া তার কানে ফিসফিস করে বলল,
“এই তো আয়ান।”
“চুপ কর।”
“আমি তো কিছু বললামই না।”
“তুই চুপ থাকলেই ভালো।”
সুরাইয়া মুখ চেপে হাসল।
শিক্ষক আয়ানকে একটা খালি জায়গায় বসতে বললেন।
আয়ান গিয়ে বসে পড়ল।
তারপর ক্লাস শুরু হলো।
---
কিছুক্ষণ পর নীলাঞ্জনা খাতায় লিখতে লিখতে বুঝল তার কলমটা আর চলছে না।
সে কয়েকবার চেষ্টা করল।
কাজ হলো না।
“ধুর…”
ব্যাগ খুলে অন্য কলম খুঁজতে গিয়ে খেয়াল করল একটা কলমও নেই।
ঠিক তখনই সামনে থেকে একটা হাত বাড়িয়ে এল।
“এটা নাও।”
নীলাঞ্জনা তাকিয়ে দেখল আয়ান কলম এগিয়ে দিচ্ছে।
“তোমার কলম চলছে না।”
“তুমি দেখলে কীভাবে?”
আয়ান শান্তভাবে বলল,
“দেখছিলাম।”
নীলাঞ্জনা একটু অবাক হলো।
“ওহ…”
কলমটা নিয়ে বলল,
“ধন্যবাদ।”
আয়ান মাথা নেড়ে আবার সামনে ফিরে গেল।
মেহরিন পাশ থেকে সব দেখছিল।
সে আস্তে করে বলল,
“কী রে?”
“কী?”
“কিছু না।”
“তাহলে বলছিস কেন?”
“এমনিই।”
নীলাঞ্জনা মেহরিনের দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করল।
“বেশি ভাবিস না।”
মেহরিন হাসল।
“আমি কিছুই ভাবছি না।”
---
টিফিনের সময় সবাই মাঠের পাশে বসেছিল।
সুরাইয়া আবার শুরু করল,
“আচ্ছা, আয়ানকে কেমন লাগল?”
নীলাঞ্জনা বলল,
“কাকে?”
“আয়ানকে।”
“আমি তো ওকে ঠিকমতো চিনিই না।”
“তাই তো বলছি, চিনে নে।”
ইরা বলল,
“ছেলেটা কিন্তু অনেক চুপচাপ।”
অর্পিতা বলল,
“চুপচাপ হলেই খারাপ নাকি?”
“আমি কি খারাপ বলেছি?”
তাসনিম হেসে বলল,
“তোরা একটা মানুষকে নিয়ে পাঁচ মিনিটে বিচার করে ফেলিস।”
মায়া বলল,
“ওকে দেখে মনে হলো নিজের মধ্যে থাকতে পছন্দ করে।”
সুরাইয়া বলল,
“তাহলে নীলাঞ্জনার সঙ্গে ভালোই মিলবে।”
“কেন?”
“কারণ নীলাঞ্জনাও তো এমন।”
“আমি?”
“হ্যাঁ, তুই।”
সবাই হেসে উঠল।
নীলাঞ্জনাও হাসল।
ঠিক তখনই সুরাইয়া দূরে তাকিয়ে বলল,
“ওই যে আয়ান।”
আয়ান একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
একাই।
সুরাইয়া হাত তুলে ডাকল,
“আয়ান! এখানে আসো।”
আয়ান তাদের দিকে তাকাল।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
“ডেকেছিলে?”
“হ্যাঁ। বসো।”
আয়ান চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“তোমরা বসো।”
ইরা বলল,
“আমরা কি তোমাকে খেয়ে ফেলব?”
আয়ানের মুখে প্রথমবারের মতো হালকা হাসি দেখা গেল।
“তা বলিনি।”
সুরাইয়া বলল,
“তাহলে বসো।”
শেষ পর্যন্ত আয়ান একটু দূরে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ সবাই গল্প করল।
আয়ান খুব বেশি কথা বলছিল না।
তবে মাঝে মাঝে কেউ কিছু বললে ছোট করে উত্তর দিচ্ছিল।
নীলাঞ্জনা চুপচাপ বসে ছিল।
হঠাৎ আয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি সবসময় এত চুপ থাকো?”
নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে বলল,
“তুমি সবসময় এত প্রশ্ন করো?”
সুরাইয়া সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল।
আয়ানও একটু হাসল।
“না।”
“তাহলে?”
“যার উত্তর শুনতে ইচ্ছে করে, তাকে প্রশ্ন করি।”
নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কথাটা সাধারণ ছিল।
তবুও কেন যেন তার মনে থেকে গেল।
---
স্কুল ছুটির পর সবাই যার যার মতো চলে গেল।
নীলাঞ্জনা গেটের বাইরে এসে বুঝতে পারল, আয়ানের দেওয়া কলমটা তার ব্যাগে রয়ে গেছে।
সে কলমটা হাতে নিয়ে দেখল।
“কাল দিয়ে দেব।”
নিজের মনেই বলল সে।
কিছুদূর যাওয়ার পর পেছন থেকে কেউ ডাকল,
“নীলাঞ্জনা।”
সে ফিরে তাকাল।
আয়ান দাঁড়িয়ে আছে।
“তুমি?”
“আমার কলমটা…”
নীলাঞ্জনা ব্যাগ থেকে কলমটা বের করে বলল,
“ওহ, সরি। ভুলে নিয়ে চলে এসেছি।”
আয়ান কলমটা নিয়ে বলল,
“সমস্যা নেই।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর নীলাঞ্জনা বলল,
“তুমি নতুন এখানে। কেমন লাগছে?”
আয়ান একটু ভেবে বলল,
“এখনো বুঝিনি।”
“কেন?”
“সবকিছু বুঝতে সময় লাগে।”
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।
“হুম।”
আয়ান চলে যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকাল।
“কাল দেখা হবে।”
“হ্যাঁ।”
আয়ান চলে গেল।
নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
“অদ্ভুত ছেলে।”
---
রাতে নিজের ঘরে বসে নীলাঞ্জনা ফোন দেখছিল।
মেহরিনের message এসেছে।
মেহরিন:
“আজকের নতুন ছেলেটা কিন্তু বেশ চুপচাপ।”
নীলাঞ্জনা লিখল,
“হুম।”
কিছুক্ষণ পর মেহরিন আবার লিখল,
“তোর কী মনে হয়?”
নীলাঞ্জনা উত্তর দেওয়ার আগেই আরেকটা notification এলো।
একটা unknown account থেকে message।
“আজ তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগল।”
নীলাঞ্জনা কয়েক সেকেন্ড screen-এর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর account-এর নামটা দেখল।
Ayan.
সে লিখল,
“আমার সাথেই তো আজ প্রথম কথা হলো তোমার।”
কিছুক্ষণ পর reply এলো—
“হ্যাঁ। কিন্তু তোমাকে মনে হলো আগে থেকেই চিনি।”
নীলাঞ্জনা আর কোনো উত্তর দিল না।
ফোনটা পাশে রেখে দিল।
কিন্তু ঘুমাতে যাওয়ার পরও কথাটা মাথা থেকে গেল না।
“তোমাকে মনে হলো আগে থেকেই চিনি।”
আয়ান কেন এমন বলল?
সত্যিই কি শুধু কথার কথা?
নাকি তাদের এই পরিচয়ের পেছনে এমন কোনো গল্প আছে, যেটা নীলাঞ্জনা এখনো জানে না?
সে তখনও জানত না—
আজকের এই ছোট্ট পরিচয়টাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়ের শুরু হয়ে দাঁড়াবে।