১.
আজ খান বাড়িতে অনেক আয়োজন হচ্ছে। সারা বাড়িতে রান্নার ধুম পড়ে গেছে।
কারণ আজ দীর্ঘ ১৪ বছর পর দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাড়ি ফিরেছে খান বাড়ির তিন প্রিন্সেসরা।
মাহদিবা_খান_মেঘ, নুসরত_খান_নূরী_খান এবং
মাইরা_খান বলতে গেলে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে।
এই ১০ বছরে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা, যার মধ্যে কোনো
ভাবেই যুক্ত নেই তারা।
মেঘের বাবা-চাচা তিনজন ও ফুফু দুইজন।
একজন এর স্বামী মরায় আরেকজন এর ডিভোর্স হয়েছে,
এর জন্য এরাও এখানেই থাকে।
সবচেয়ে বড়— আশরাফ খান।
মেঝো— মোজাম্মেল খান।
এবং ছোট— মিজান খান।
আশরাফ খান এর একজন ছেলে—
"সাজ্জাদুল_খান_আবির
মোজাম্মেল খান এর এক ছেলে ও এক মেয়ে—
"রিদ_খান :- মাহদিবা_খান_মেঘ
মিজান খান এর দুই মেয়ে—
"নুসরত এবং :- মাইরা_খান
মেঘদের ফুফু্রা হলেন— সুফিয়া খান ও ফারজানা খান।
সুফিয়া খান এর একটাই ছেলে—
"ইরফান_খান
ফারজানা খান এর এক ছেলে ও এক মেয়ে—
"আরশ_খান :-মেহরিন_খান_মিম
তারা এলাকার যৌথ পরিবারের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বাড়ির
সকলের প্রাণ যেনো এক সুতোয় বাঁধা।
বাড়ির পরিবেশ ছিলো ভালোবাসায় মাতানো। কোথাও
কোনো কিছুরই কমতি ছিলো না, কিন্তু আচমকাই যেনো পরিবেশ টা পাল্টে গিয়েছিলো।
মেঘ, নুসরত আর মাইরা কোরিয়া যাওয়ার জন্য পাগল
ছিলো, তখন তাদের বাবা মা পড়া লেখা করার জন্য
পাঠিয়ে দেন। তখন মেঘের বয়স ৯ বছর, নুসরত ৮ বছর
আর মাইরার ৭ বছর।
বাড়ির সকলের সাথে যেমন দূরত্ব বেড়েছিলো, শারীরিক
ভাবে তেমনি দূরত্ব বেড়েছিলো মানসিকভাবেও।
প্রথমে কেউ-ই রাজি ছিলো না এই ছোট ছোট বাচ্চাদের
একা একা এতো দূর পাঠানোর জন্য, কিন্তু তারপর যখন
জানতে পারে আশরাফ খান এর খালাতো বোন ওখানে
আছে, উনার কাছেই থাকবে, তখন আর কেউ আপত্তি
করেনি। ১৪ বছর আগের আর এখনকার মেঘ, নুসরত
আর মাইরার মধ্যে আকাশ-পাতাল এর ব্যবধান। দেখেও
চেনার কোনো উপায় নেই।
মেঘ লম্বায় ৫ ফুট ২ ইঞ্চি, গায়ের রং ফর্সা।
নুসরত লম্বায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, গায়ের রং ফর্সা তবে তার
সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় চুল।
মাইরা লম্বায় ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, গায়ের রং ফর্সা।
তারা বাকিটা পড়াশোনা এখন দেশেই করতে করতে চায়। করতে চায় বললে ভুল হবে, করাতে চায়। কারণ তাদের
বড় চাচা আশরাফ ধারণা হয়েছে মেয়েরা বিদেশে থাকলে
এখন খারাপ হয়ে যাবে, উচ্ছন্ন যাবে।
অবশ্য এই ধারণা তার আগে আসেনি কিন্তু যখন শুনেছে
তিন মেয়েরই বাইকের প্রতি একটা টান হয়েছে, তখন
থেকে তখন থেকেই তিনি শুরু করেছে মেয়েদের দেশে
আনবে আর পড়াশোনা করতে হবে না বাইরে।
জোড়া জোড়ার এক পর্যায়ে তাদের বাধ্য হয়েই দেশে
আসতে হচ্ছে। তবে এর মাঝে আরেকটা কারণ আছে
যার জন্য তারা আসতে রাজি হয়েছে।
তিনজনই পড়ে আছে ঘুটঘুটে কালো রঙের টপস আর
জিন্স, মুখে মাস্ক লাগানো, মাথায় ক্যাপ দেওয়ায় প্রথম
দেখায় যে কেউ বলে দিবে এরা হয়তো মাফিয়া বা
গ্যাংস্টার।
প্লেনে সিটের সাথে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে
মেঘ হয়তো ১৪ বছর আগের কথা ভাবছে।
পাশেই ফোন চাপছে মাইরা হয়তো কিছু একটা করছে।
তার থেকে একটু দূরত্বে আছে নুসরত কানে হেডফোন
লাগিয়ে গান শুনছে।
প্লেন ল্যান্ড করার পর পরিবারের কাউকে দেখতে না পেয়ে
তাই তারা সিদ্ধান্ত নেয় বাইক বুক করবে
যে ভাবা সেই কাজ বাইক বুক করল
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইক এসে পড়লো
বাইক পেয়ে তিন বোন বাইক রেস করার সিদ্ধান্ত নিলো ।
কিন্তু বাইক রেডি নিয়ে আসা সেই ব্যক্তি প্রথমে দিতে না
চাইলে নুসরত—
"খান বাড়ির সামনে আসুন সেখানে বাইক পেয়ে যাবেন.
আর এইযে আমাদের পাসপোর্ট! চাইলে ছবি তুলে
নিতে পারেন."
লোকটি কিছুটা সন্দেহ নিয়ে বলে—
"সত্যি তো নাকি মিথ্যা বলছেন?"
এবার মেঘ এগিয়ে এসে বলে—
"আমাদের দেখে আপনার বাইক চোর মনে হচ্ছে? বিদেশ
থেকে এসেছি আপনার এই বাইক চুরি করতে?"
লোকটা কিছুক্ষণ ভাবে. তারপর বিশ্বাস করে নেয়.
ওদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে আগেই রওনা—
যেই ভাবা সেই কাজ বাইক নিয়ে ছুটলো একজন আরেক
জনের পিছু.
বাংলাদেশেও যে এভাবে কোনো তিন নারী বাইক নিয়ে
ছুটতে পারে তা অবিশ্বাস্য.
সো সো করে শব্দে ছুটছে তিনটা বাইক.
এর মাঝেই এমন বাইক রেসিং দেখে চোখ আটকায় তিন জোড়া পুরুষের!!
চোখ তিনটা ছিল আবির, আরশ আর ইরফান
তারা এয়ারপোর্টে নুসরত, মেঘ আর মাইরা কে পিক করতে গিয়েছিলো। তবে তাদেরকে চিনতে না পারায় বেচারাদের
৩ ঘণ্টা এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিলো.
কিন্তু যখন দেখলো তিন মেয়ে বাইক নিয়ে ছুটেছে তারাও
ওদের পিছু নেওয়ার জন্য পারিবারিক গাড়িটা রেখে
নিজেদের বাইক নিয়ে ছুটে ওদের পিছনে.
রোদের তেজ তখন মাথার উপরে। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায়
সো সো শব্দ তুলে ছুটছে তিনটা কালো বাইক।
হেলমেট মাথায়, মুখে কালো মাস্ক। পিছনের তিনটা
বাইকও যেন ঝড় তুলেছে।
আবির দাঁতে দাঁত চেপে স্পিড বাড়ালো।
পাশে আরশ চিৎকার করে উঠলো, "
ওই মেয়েগুলা কারা রে? বাংলাদেশের রাস্তায় এই
স্টাইলে বাইক চালায়!"
ইর্ফান হেলমেটের ভাইজর তুলে বললো, "ভাই,
সামনেরটার চালানো দেখ। প্রো রেসার ফেইল।
ধরতে না পারলে মান-ইজ্জত থাকবে না।"
বাতাসের সাথে যুদ্ধ করতে করতে মেঘ রিয়ারভিউ মিররে তাকালো। পিছনে তিনটা বাইক তাড়া করছে।
ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলে গেল। হেডসেটে
ফিসফিস করে বললো, "নুসরাত, মাইরা পিছে তিনটা
কুকুর লেগেছে। রেডি?"
নুসরাতের উত্তর ভেসে এলো, "১৪ বছর পর দেশে ফিরে
একটু ওয়েলকাম তো পাওয়া উচিত আপু। Let's play."
মাইরা শুধু বললো, "Checkmate in 3... 2... 1..."
সিগন্যালের লাল বাতি। নুসরাত ব্রেক না কষে বাঁ দিকে কাটালো। মাইরা ডানে। মেঘ সোজা ফ্লাইওভারের দিকে।
তিনজন তিন দিকে। আবির-আরশ-ইর্ফান হতভম্ব।
"Split!" আরশ চেঁচালো "আমি ডানেরটা, তুই বামেরটা
ইর্ফান। আবির ভাই আপনি সোজা যান।"
বাড়ির গেটে তখন শোরগোল। পোলাওয়ের গন্ধ,
আর বাড়ির মহিলাারা, আফসানা খান, জেসমিন খান,
ফারহানা খান তারা রান্না ঘরে সবাই ব্যস্ত।
আশরাফ খান বারবার ঘড়ি দেখছেন।
মোজাম্মেল খান ফোন কানে, "আবির, কই তোরা?
মেয়েরা ল্যান্ড করেছে ৩ ঘণ্টা আগে!"
ওপাশ থেকে আবিরের হাঁপানো গলা, "আব্বু, একটা
ঝামেলা হয়েছে। আমরা আসছি।"
মাইরা বাইক থামালো। হেলমেট খুলে চুল ঝাড়া দিল।
৫ ফুট ১ ইঞ্চির মেয়েটার চোখে এখন শিকারীর ঠান্ডা দৃষ্টি ইর্ফান বাইক এসে থামলো ঠিক সামনে।
ইর্ফান হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, "এই মেয়ে, রাস্তা কি
তোমার বাপের? এভাবে বাইক চালাও কেন?"
মাইরা মাস্কটা আস্তে করে নামালো। ফর্সা মুখে এক চিলতে হাসি, "রাস্তা আমার বাপের না চাচা, কিন্তু বাইকটা আমার। আর আপনি কে? আমার পিছু নিয়েছেন কেন?"
চাচা' ডাক শুনে ইর্ফানের মেজাজ চড়ে গেল।
"বেয়াদব মেয়ে, চাচা বলো কাকে?
নাম কী তোমার?"
মাইরা ক্যাপ খুলে বাইকে হেলান দিল, "মাইরা খান।
মিজান খানের মেয়ে। খান বাড়ি যাচ্ছি লিফট লাগবে আপনার?"
ইর্ফানের হাত থেকে বাইকের চাবি পড়ে গেল।
৬ বছরের সেই ছোট মাইরা? যে ইর্ফানের আঙুল
ধরে হাঁটতো?
আরশ নুসরাতকে কর্নার করেছে পুরান ঢাকার গলিতে।
নুসরাত বাইক থেকে নেমে মাস্ক খুলে চুল ঠিক করছে।
লম্বা সিল্কি চুল কোমর ছুঁয়েছে।
আরশ ধমকে উঠলো, "এই মেয়ে, সমস্যা কী?
পালাচ্ছিলে কেন?"
নুসরাত ভ্রু নাচালো, "আপনি তাড়া করছিলেন কেন
আরশ ভাই?
১৪ বছর পরেও আপনার স্বভাব বদলায়নি।
মেয়ে দেখলেই পিছু নেন?"
আরশ স্তব্ধ। এই গলা, এই চাহনি... "নু...নুসরাত?"
হুম আপনার যে বান্দর মাথা চেহারা এটা দেখেই
চিনতে পারলাম !!
আরশ রেগে গিয়ে বললো ছোট বেলা ও ছেলেদের মত
থাকতি আর এখনো, আর আমাকে বলিস বাদর
মেঘ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুড়িগঙ্গার পাড়ে।
আবির এসে বাইক স্ট্যন্ড করতেই মেঘ বললো,
"ভালোই চালান দেখি। খান বাড়ির ছেলে না?"
আবির অবাক, "তুমি চেনো আমাকে?"
মেঘ এবার ক্যাপ-মাস্ক সব খুলে ফেললো।
৫ ফুট ২ ইঞ্চি, ফর্সা মুখে কোরিয়ান কাট চুল, চোখে
রাজ্যের অভিমান। "১৪ বছর আগে যে আমাকে
কখনো একা ছাড়তো না, আর এখন ভুলে গেলেন
আবির ভাই?"
আবির অবাক হয়ে মেঘ কে দেখলো, ১৪ বছরে মেঘ
অনেক বদলে গেছে !!
আবিরের গলা শুকিয়ে গেল। এয়ারপোর্টে ৩ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে
ছিল যাদের জন্য, তারা এই মেয়েগুলো?
#খান_বাড়ির_গেট
তিনটা বাইক একসাথে ঢুকলো। পিছে পিছে আরও তিনটা। বাড়ির সবাই গেটে জড়ো হয়েছে।
সুফিয়া খান চিৎকার করে উঠলেন, "ইর্ফান!
এই মেয়েগুলো কারা?"
আবির বাইক থেকে নেমে মেঘ এর দিকে তাকিয়ে
শুধু বললো, "বড় আব্বু, আপনার প্রিন্সেসরা ফিরেছে।
সাথে আমাদের ইজ্জতও নিয়ে ফিরেছে।"
মেঘ হেলমেট খুলে সবার সামনে এসে দাঁড়ালো।
১৪ বছর আগের সেই ৯ বছরের বাচ্চা মেয়েটা এখন
২৩ বছরের আগুন। গলার স্বর ঠান্ডা, "বড় চাচা, শুনলাম মেয়েরা বাইক চালালে উচ্ছুন্নে যায়?"
তাই না দেখে নেন ।।
আশরাফ খান কথা হারিয়ে ফেলেছেন। মোজাম্মেল খান মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েও থমকে গেলেন।
এই মেঘকে তিনি চেনেন না।
মিজান খান শুধু ফিসফিস করলেন, "নুসরাত... মাইরা...
মা তোরা?"
নুসরাত বাবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
"হ্যাঁ বাবা, আমরা। কিন্তু 'আরেকটা কারণ',
যার জন্য আমরা আসতে রাজি হয়েছি।"
রিদ ভাইয়ের বিয়ের কথা শুনে আসলাম, কিন্তু ভাইয়া
কোথায়?
মাইরা ততক্ষণে ফোন বের করে কারো নাম্বার
ডায়াল করেছে, "হ্যালো, আন্টি? আমরা পৌঁছে গেছি।"
~চলমান~
#সূচনা_পর্ব
#আমৃত্যু_প্রণয়নের_প্রণয়িনী
#লেখিকা_সাদিয়া_আক্তার