ফন্ট সাইজ:
থিম:
Mafia's Dark Love

পর্ব 1

লেখক: Jannatul Naima

Mafia's Dark Love
লেখিকা: জান্নাতুল নাঈমা
পর্ব ১
চট্টগ্রামের বিকেলটা সেদিন একটু অন্যরকম ছিল। আকাশে হালকা মেঘ জমেছিল, রাস্তায় মানুষের ভিড়, বাতাসে একটা চাপা গরম। মালিহা নূর কলেজ থেকে বের হয়ে টিউশনির দিকে যাচ্ছিল। হাতে একটা পুরনো ব্যাগ, কাঁধে ওড়না, চোখে ক্লান্তি। সারাদিন ক্লাস করে এখন আবার টিউশনি। বাবার ছোট মুদি দোকান, মায়ের অসুখ। সংসারটা অনেকটা তার টিউশনির টাকাতেই চলে। মালিহা জানে, তাকে শক্ত থাকতে হবে।
মালিহা রাস্তা পার হচ্ছিল। হঠাৎ একটা কালো গাড়ি প্রচণ্ড স্পিডে এসে তার সামনে ব্রেক করলো।
ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হলো। মালিহা ভয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল। তার হাতের ব্যাগটা পড়ে গেল রাস্তায়। বইগুলো ছড়িয়ে গেল।
গাড়ির দরজা খুললো।
প্রথমে নামলো দুইজন কালো পোশাক পরা লোক। তারপর নামলো সে।
ইভান চৌধুরী।
কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, চোখে সানগ্লাস। চেহারায় এমন একটা ঠান্ডা ভাব, যেটা দেখলে মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। চট্টগ্রামের মানুষ তাকে চেনে এক নামে। মাফিয়া। ডেভিল। যে মানুষ মেরে হাসে।
রাস্তার মানুষ সবাই সরে গেল। দোকানদাররা দোকানের শাটার নামিয়ে দিলো অর্ধেক। কেউ সামনে আসতে চাইলো না।
কিন্তু মালিহা জানতো না সে কে। সে শুধু জানতো, লোকটা তার বই ফেলে দিয়েছে।
মালিহা রেগে গিয়ে বললো, "এই যে! চোখে দেখেন না? এত জোরে গাড়ি চালান কেন? আমার বইগুলো সব পড়ে গেল।"
পুরো রাস্তা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ইভানের লোক দুইজন একে অপরের দিকে তাকালো। তারা জীবনে কাউকে ইভানকে এভাবে কথা বলতে দেখেনি।
ইভান ধীরে ধীরে সানগ্লাসটা খুললো।
তার চোখ দুইটা কালো, গভীর, ভয়ংকর। কিন্তু সেই চোখে এখন রাগ নেই, আছে অবাক হওয়া।
সে মালিহার দিকে তাকিয়ে রইলো।
এই মেয়েটা তাকে ভয় পাচ্ছে না। সবাই তাকে দেখে কাঁপে, আর এই মেয়েটা তাকে বকা দিচ্ছে।
ইভানের ঠোঁটে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠলো। এমন হাসি তার লোকেরা আগে কখনো দেখেনি।
ইভান নিচু হয়ে মালিহার একটা বই তুলে দিলো।
মালিহা বইটা নিয়ে বললো, "আপনার মতো বড়লোকদের জন্যই রাস্তায় চলা যায় না। সরি বলতে তো পারেন।"
ইভান বললো, "সরি।"
মালিহা থমকে গেল। সে ভেবেছিল লোকটা রেগে যাবে। কিন্তু লোকটা সরি বললো।
ইভান আবার বললো, "তোমার নাম কী?"
মালিহা বললো, "সেটা দিয়ে আপনার কী কাজ? আমি যাচ্ছি। আমার টিউশনি আছে।"
এই বলে মালিহা চলে গেল।
ইভান সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। তার লোক জিজ্ঞেস করলো, "বস, মেয়েটাকে তুলে আনবো?"
ইভান বললো, "না। এখন না। ওর সব খবর চাই আমার। কোথায় থাকে, কোথায় পড়ে, সব।"
সেদিন রাতে ইভান তার বিশাল বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। চট্টগ্রাম শহরটা তার পায়ের নিচে। তার হাতে সিগারেট, কিন্তু সে খাচ্ছে না। তার মাথায় শুধু একটা মুখ ঘুরছে।
মালিহা নূর।
২০ বছর বয়স। বাবা ছোট মুদি দোকান চালায়। মা অসুস্থ। মেয়েটা কলেজে পড়ে, টিউশনি করে। একদম সাধারণ।
কিন্তু ইভানের কাছে সে সাধারণ না। সে তাকে রাস্তায় সবার সামনে অপমান করেছে। ইভান চৌধুরীকে কেউ সরি বলতে বাধ্য করেনি কখনো। আজ একটা মেয়ে তাকে সরি বলতে বাধ্য করেছে। ইভান এটা মেনে নিতে পারছে না। তার ভেতরে রাগ জমছে।
ইভান তার ডান হাত রকিকে ডাকলো।
"রকি, একটা কথা মনে রাখবি। আমাকে যে অপমান করে, তাকে আমি শাস্তি দিই। আর আমি ওই মেয়েটাকে শাস্তি দিবো।"
রকি বললো, "বস, আপনি বললেই তুলে নিয়ে আসি।"
ইভান হাসলো। সেই ভয়ংকর হাসি। "আজ রাতেই। ওকে তুলে নিয়ে আসবি। ওকে বুঝিয়ে দিবো, ইভান চৌধুরীর সাথে বেয়াদবি করলে কী হয়।"
রাত ১০ টা।
মালিহা টিউশনি থেকে ফিরছিল। রাস্তাটা একটু ফাঁকা। মালিহা মনে মনে ভাবছিল, বাড়ি গিয়ে মাকে ওষুধ খাওয়াতে হবে।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা গাড়ি এসে তার পাশে দাঁড়ালো।
মালিহা কিছু বোঝার আগেই দুইজন লোক তার মুখ চেপে ধরলো। মালিহা চিৎকার করতে চাইলো, পারলো না। তার চোখে অন্ধকার নেমে এলো। তার ব্যাগটা রাস্তায় পড়ে গেল।
যখন চোখ খুললো, তখন সে একটা অন্ধকার ঘরে।
ঘরটা অনেক বড়। কিন্তু কোনো জানালা নেই। একটা ছোট বাতি জ্বলছে। বিছানাটা নরম। মালিহার হাত-পা কাঁপছে। সে উঠে দরজার দিকে দৌড়ে গেল। দরজা বন্ধ। সে দরজা ধাক্কাতে লাগলো।
"কেউ আছেন? আমাকে ছেড়ে দিন! আমার বাবা-মা চিন্তা করবে! প্লিজ!"
তখন দরজাটা খুললো।
ইভান ঢুকলো। হাতে এক গ্লাস পানি।
মালিহা তাকে দেখে চিনে ফেললো। "আপনি? সেই গাড়ির লোকটা? আপনি আমাকে এখানে এনেছেন কেন? আমাকে ছেড়ে দিন! আপনি তো আমাকে সরি বলেছিলেন!"
ইভান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। পানির গ্লাসটা টেবিলে রাখলো।
"হ্যাঁ, সরি বলেছিলাম। কারণ রাস্তায় অনেক মানুষ ছিল। কিন্তু এখন এখানে কেউ নেই। এখন তুমি আমার বন্দি।"
মালিহা কাঁদতে কাঁদতে বললো, "আমি ভুল করেছি। আমাকে মাফ করে দিন। আমি আর কখনো আপনার সামনে আসবো না।"
ইভান তার সামনে এসে দাঁড়ালো। তার গলা ঠান্ডা।
"মাফ? ইভান চৌধুরী কাউকে মাফ করে না। তুমি আমাকে রাস্তায় সবার সামনে বকা দিয়েছো, আমাকে সরি বলতে বাধ্য করেছো। এখন তোমাকে শাস্তি পেতে হবে।"
মালিহা বললো, "কী শাস্তি? আমাকে মারবেন?"
ইভান বললো, "মারলে তো তুমি বেঁচে যাবা। আমি তোমাকে মারবো না। আমি তোমাকে এখানে আটকে রাখবো। তুমি এই ঘর থেকে বের হতে পারবা না। তুমি কাঁদবা, চিৎকার করবা, কেউ শুনবে না। এটাই তোমার শাস্তি।"
মালিহা বললো, "আমি থাকবো না! আমি বাড়ি যাবো!"
ইভান হাসলো। "তোমার বাড়ি এখন এটাই।"
মালিহা বললো, "আপনি খারাপ লোক! আপনি মাফিয়া! মানুষ মারেন!"
ইভান বললো, "হ্যাঁ, আমি মাফিয়া। আমি মানুষ মেরে হাসি। আর তোমাকে আমি মারবো না, তোমাকে আমি তিলে তিলে কষ্ট দিবো। যাতে তুমি বুঝতে পারো, আমার সাথে বেয়াদবি করার ফল কী।"
এই বলে ইভান ঘর থেকে বের হয়ে গেল। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল।
মালিহা বিছানায় বসে কাঁদতে লাগলো। তার বাবার কথা মনে পড়লো। মা এখন কী করছে?
বাইরে থেকে ইভান দাঁড়িয়ে ছিল। দরজার ওপাশ থেকে মালিহার কান্নার শব্দ শুনছিল।
রকি এসে বললো, "বস, মেয়েটা কাঁদছে।"
ইভান ঠান্ডা গলায় বললো, "কাঁদতে দে। ও আমাকে অপমান করেছে। এই কান্নাটাই ওর শাস্তি।"
রকি বললো, "বস, খাবার দিবো?"
ইভান বললো, "না। আজ রাতে ওকে কোনো খাবার দিবি না, কোনো পানিও না। ওকে বুঝতে দে, ইভান চৌধুরীর সাথে বেয়াদবি করলে কী হয়। দেখি ওর জেদ কতক্ষণ থাকে। সেটা আমি নিজে এসে ভাঙবো।"
এই বলে ইভান সেখান থেকে চলে গেল। একবারও পেছনে তাকালো না।
আর ঘরের ভেতরে মালিহা ভাবতে লাগলো, "এই লোকটা মানুষ না। এই লোকটা একটা পাথর।"
সেদিন রাতে মালিহা ঘুমাতে পারলো না। আর ইভানও ঘুমালো না। একজন বন্দি ঘরে কাঁদছে, আরেকজন নিজের রাগে জ্বলছে।
দুইজনের মধ্যে এখন শুধু ঘৃণা আর শাস্তি।
কিন্তু রাতটা তো এখানেই শেষ হয়নি।
মালিহা বিছানার এক কোণায় বসে ছিল। তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। এখন আর কান্না আসছে না। শুধু বুকের ভেতর একটা চাপা কষ্ট। সে জানালা খুঁজছিল, কিন্তু জানালা নেই। সে ভাবছিল, তার বাবা এখন কী করছে? বাবা হয়তো এখনো রাস্তায় রাস্তায় তাকে খুঁজছে। মা হয়তো নামাজ পড়ে তার জন্য দোয়া করছে।
মালিহা মনে মনে বললো, "আল্লাহ, আমাকে এখান থেকে বের করে দাও। এই লোকটা আমাকে মেরে ফেলবে।"
অন্যদিকে ইভান তার নিজের ঘরে গেল না। সে ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে সিগারেট, কিন্তু ধরায়নি। তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে - মেয়েটা তাকে দিয়ে সরি বলিয়েছে। ইভান চৌধুরীকে আজ পর্যন্ত কেউ সরি বলতে বাধ্য করেনি।
রকি আবার এলো। বললো, "বস, আপনি ঘুমাবেন না?"
ইভান বললো, "ঘুম আসছে না। ওই মেয়েটার চিৎকারটা আমার কানে বাজছে।"
রকি বললো, "বস, মেয়েটাকে ছেড়ে দিলে হয় না? ও তো সাধারণ মেয়ে।"
ইভান রকির দিকে এমনভাবে তাকালো, রকি ভয়ে চুপ হয়ে গেল। ইভান বললো, "তুই কি আমাকে শিখাচ্ছিস? ওকে ছেড়ে দিলে সবাই ভাববে ইভান চৌধুরী দুর্বল হয়ে গেছে। আমি কাউকে ছাড়ি না। ওকে আমি শাস্তি দিবো। ওর জেদ আমি ভাঙবো।"
এই বলে ইভান নিচে নেমে এলো। মালিহার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। ইভান একটু অবাক হলো। মেয়েটা কি ঘুমিয়ে গেছে? নাকি কিছু হয়ে গেছে?
ইভান দরজার ছোট ফুটো দিয়ে ভেতরে তাকালো। দেখলো, মালিহা বিছানায় বসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ লাল। সে কিছু বলছে না।
ইভানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো। সে এই অনুভূতিটা চিনতে পারছে না। এটা রাগ না। এটা অন্য কিছু। কিন্তু সে এটাকে পাত্তা দিলো না। সে মনে মনে বললো, "না, আমি দুর্বল হবো না। ওকে শাস্তি পেতেই হবে।"
ইভান দরজার সামনে থেকে সরে গেল। কিন্তু সে তার ঘরে গেল না। সে সিঁড়ির কাছে বসে রইলো। সারারাত।
ভোরের দিকে মালিহা ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। তার চোখ লেগে এলো। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখলো, সে বাড়িতে ফিরে গেছে। মা তাকে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে। বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
আর ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল।
ইভান দাঁড়িয়ে আছে। হাতে এক গ্লাস পানি আর এক প্লেট খাবার।
মালিহা ভয়ে পিছিয়ে গেল।
ইভান খাবারটা টেবিলে রেখে বললো, "খেয়ে নাও।"
মালিহা বললো, "আমি খাবো না। আপনি আমাকে ছেড়ে দিন।"
ইভান ঠান্ডা গলায় বললো, "আমি বলেছি খেতে। এটা তোমার জন্য দয়া না। তুমি মরে গেলে আমার শাস্তি দেওয়া শেষ হয়ে যাবে। তুমি বেঁচে থাকলেই তো আমি তোমাকে শাস্তি দিতে পারবো। তাই খাও।"
মালিহা কিছু বললো না। সে খাবারের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার অনেক খিদে পেয়েছে, কিন্তু তার জেদ আরও বেশি।
ইভান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বের হয়ে গেল।
দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। মালিহা আবার একা হয়ে গেল।
কিন্তু এবার মালিহা কাঁদলো না। সে শক্ত হয়ে বসে রইলো। মনে মনে বললো, "আমি হারবো না। এই লোকটা যতই ভয়ংকর হোক, আমি হারবো না।"

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন