ছোট গল্প:বৃষ্টির শহরে শেষ বিকেল
লেখিকা: মেহরিন মাহি
শহরের ব্যস্ততায় এক টুকরো নীরবতা
ঢাকা শহর।
ব্যস্ততার এই শহরে প্রতিদিন কত মানুষের আগমন ঘটে, কত মানুষ হারিয়ে যায়, তার হিসাব কেউ রাখে না। কেউ আসে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে, কেউ আসে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, আবার কেউ আসে নিজের অতীতকে পেছনে ফেলে নতুন করে বাঁচতে।
এই শহরেরই একটি পুরোনো এলাকায় ছোট্ট একটি বাড়িতে বসবাস করত নওরীন।
বয়স বাইশ। মাঝারি গড়নের মেয়েটির চোখে সবসময় একধরনের স্বপ্ন লেগে থাকত। খুব বেশি কথা বলত না সে। তবে নিজের ডায়েরির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল বহুদিনের।
পরিবার বলতে মা সালমা বেগম আর ছোট ভাই নাবিল।
নওরীনের বাবা মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই তার ওপর এসে পড়ে। মা অসুস্থ থাকায় নিয়মিত কাজ করতে পারতেন না। ছোট ভাইটি তখন স্কুলে পড়ে।
নওরীন একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। বেতন খুব বেশি ছিল না, তবে সংসারের খরচ চালানোর জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করত।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নায় মাকে সাহায্য করা, নাবিলকে স্কুলের জন্য তৈরি করা, তারপর অফিসে যাওয়া—এভাবেই তার দিন কেটে যেত।
তবুও প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে তার একটা নিজস্ব সময় ছিল।
সেটা ছিল বিকেল।
অফিস থেকে ফেরার পথে একটি পুরোনো লাইব্রেরির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ানো।
লাইব্রেরিটির নাম ছিল ‘প্রত্যাশা পাঠাগার’।
পুরোনো দালান। দেয়ালের রং উঠে গেছে। কাঠের দরজায় বয়সের ছাপ। জানালার পাশে কয়েকটি টব, আর সামনের ছোট্ট জায়গায় একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ।
দেখতে খুব সাধারণ হলেও জায়গাটির প্রতি নওরীনের অদ্ভুত মায়া ছিল।
কারণ সেখানে গেলে তার মনে হতো, পৃথিবীর সব ব্যস্ততা যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেছে।
লাইব্রেরিটির মালিক ছিলেন আবদুল কাদের সাহেব।
বয়স প্রায় সত্তর। মাথার চুল সাদা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। সবসময় পরিষ্কার পাঞ্জাবি পরতেন।
মানুষটি খুব বেশি কথা বলতেন না। তবে বইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অসীম।
নওরীন প্রথম যেদিন লাইব্রেরিতে প্রবেশ করেছিল, সেদিন তার হাতে কোনো টাকা ছিল না।
সে শুধু বইগুলো দেখছিল।
বৃদ্ধ দূর থেকে তাকে লক্ষ করে বলেছিলেন,
— মা, বই খুঁজছ?
নওরীন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলেছিল,
— জি, মানে... একটু দেখতে এসেছি।
— দেখতে এসেছ, ভালো কথা। বই দেখতে টাকা লাগে না।
নওরীন মৃদু হেসেছিল।
— এখানে কি বসে বই পড়া যাবে?
— অবশ্যই। তবে একটা কথা আছে।
— কী কথা?
— বই পড়ে যদি ভালো কিছু শেখো, সেটা যেন জীবনে কাজে লাগাও।
নওরীন মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল।
সেদিন থেকেই লাইব্রেরিটির সঙ্গে তার পরিচয়।
প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে অন্তত আধা ঘণ্টা সেখানে বসে বই পড়ত।
কখনো উপন্যাস, কখনো কবিতা, কখনো জীবনী।
বৃদ্ধ মাঝেমধ্যে তাকে বই সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন।
— আচ্ছা মা, তোমার কাছে একজন সফল মানুষের পরিচয় কী?
নওরীন বলেছিল,
— যে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, সে-ই সফল।
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বলেছিলেন,
— শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করলেই হবে? অন্য কারও স্বপ্ন পূরণের কারণ হতে পারলে সেটাও সফলতা।
কথাটা নওরীনের মনে দাগ কেটেছিল।
নওরীনের একটা গোপন স্বপ্ন ছিল।
সে লেখক হতে চায়।
ছোটবেলা থেকেই গল্প লিখতে ভালোবাসত। স্কুলের খাতার পেছনে, পুরোনো ডায়েরিতে, কখনো কাগজের ছোট টুকরোতেও গল্প লিখত।
কিন্তু সংসারের অভাব তাকে নিজের স্বপ্ন নিয়ে ভাবার সুযোগ খুব একটা দেয়নি।
একদিন রাতে নাবিল পড়ার টেবিলে বসে ছিল।
নওরীন রান্নাঘর থেকে এসে বলল,
— কী করছিস?
— আপু, একটা অঙ্ক বুঝতে পারছি না।
নওরীন পাশে বসে অঙ্কটা বুঝিয়ে দিল।
নাবিল হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— আপু, তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?
নওরীন একটু হেসে বলল,
— আমি তো বড় হয়েই গেছি।
— না, মানে তোমার স্বপ্ন কী?
নওরীন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— আমি লেখক হতে চাই।
নাবিল অবাক হয়ে বলল,
— তাহলে লেখো না কেন?
— সব স্বপ্ন পূরণ করার মতো সময় আর সুযোগ সবার জীবনে থাকে না, ভাই।
নাবিল ছোট্ট মুখে উত্তর দিল,
— তুমি তো বলো চেষ্টা করলে সব সম্ভব। তাহলে নিজে চেষ্টা করো না কেন?
নওরীন কিছু বলতে পারল না।
ছোট ভাইয়ের কথাটা যেন তার নিজের কাছেই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল।
সেদিন রাতে সে অনেক দিন পর ডায়েরি খুলল।
প্রথম পাতায় লিখল—
‘আমি আবার শুরু করতে চাই।’
অফিসে নওরীনের একজন ভালো বন্ধু ছিল। নাম তাসনিম।
তাসনিম ছিল নওরীনের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং প্রচণ্ড কথা বলতে ভালোবাসত।
প্রতিদিন অফিসে এসে নওরীনকে বলত,
— এই মেয়ে, আজকে আবার কী নিয়ে চিন্তা করছিস?
নওরীন হাসত।
— কিছু না।
— তোর এই কিছু না কথাটাই আমার সবচেয়ে অপছন্দ।
একদিন দুপুরে খাবার খাওয়ার সময় তাসনিম নওরীনের ডায়েরি দেখতে পেল।
— এটা কী?
— আমার লেখা।
— গল্প লিখিস?
— মাঝে মাঝে।
— আমাকে দেখাসনি কেন?
— ভালো হয়নি।
তাসনিম ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বলল,
— ভালো হয়েছে কি হয়নি, সেটা পাঠক ঠিক করবে। তুই নিজে কেন আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছিস?
নওরীন কিছু বলল না।
তাসনিম তাকে একটি অনলাইন সাহিত্য পত্রিকার কথা জানাল। সেখানে নতুন লেখকদের লেখা প্রকাশ করা হয়।
নওরীন প্রথমে রাজি হলো না।
কিন্তু তাসনিমের অনুরোধে নিজের লেখা একটি গল্প পাঠিয়ে দিল।
তারপর অপেক্ষা।
প্রতিদিন ই-মেইল চেক করত।
কোনো উত্তর আসত না।
তবুও সে লেখা বন্ধ করল না।
সেদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় আকাশের অবস্থা ভালো ছিল না।
চারদিকে কালো মেঘ। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ।
নওরীন তাড়াতাড়ি বাসার দিকে হাঁটছিল।
কিন্তু কিছুদূর যেতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো।
সে দৌড়ে প্রত্যাশা পাঠাগারের সামনে এসে দাঁড়াল।
ভেতরে ঢুকে দেখল আবদুল কাদের সাহেব বইয়ের তাক গোছাচ্ছেন।
— চাচা, আজকে তো বৃষ্টি বেশ ভালোই হচ্ছে।
বৃদ্ধ হেসে বললেন,
— বৃষ্টি ভালোই হচ্ছে। কিন্তু তোমার হাতে ছাতা নেই কেন?
— সকালে তো রোদ ছিল।
— আকাশের ওপর এত বিশ্বাস রাখতে নেই মা। কখন যে বদলে যায়, কেউ জানে না।
নওরীন হেসে ফেলল।
তারপর জানালার পাশে বসে পড়ল।
বৃদ্ধ তার সামনে এক কাপ চা রেখে গেলেন।
— নাও, চা খাও।
— চাচা, আপনাকে এত কষ্ট করতে হবে না।
— কষ্ট কোথায়? তোমাদের মতো বইপাগল মানুষদের দেখলে আমার ভালো লাগে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন,
— তোমার লেখালেখি কেমন চলছে?
নওরীন অবাক হলো।
— আপনি জানলেন কীভাবে?
— তোমার চোখে এখন আগের চেয়ে বেশি স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছি।
নওরীন মৃদু হেসে বলল,
— একটা গল্প পাঠিয়েছি। জানি না প্রকাশ করবে কি না।
বৃদ্ধ বললেন,
— প্রকাশ করুক বা না করুক, লেখা বন্ধ করবে না।
বাইরে তখন বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়ে গেছে।
নওরীন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, এই শহরে হাজারো মানুষ থাকলেও এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে গেলে মানুষ নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নিতে পারে।
প্রত্যাশা পাঠাগার তার কাছে ঠিক তেমনই একটি জায়গা।
কয়েক দিন পর অফিসে যাওয়ার পথে নওরীনের ফোনে একটি ই-মেইল এল।
সে মেইলটি খুলে পড়তেই থমকে গেল।
তার গল্পটি সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।
প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
বারবার মেইলটি পড়ল।
তারপর তাসনিমকে ফোন করল।
— তাসনিম!
— কী হয়েছে? এত চিৎকার করছিস কেন?
— আমার গল্পটা... ওরা প্রকাশ করবে!
— সত্যি?
— হ্যাঁ!
তাসনিম আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
সেদিন নওরীনের মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব আনন্দ যেন একসঙ্গে তার জীবনে এসে হাজির হয়েছে।
অফিস শেষে সে সোজা লাইব্রেরিতে গেল।
— চাচা!
বৃদ্ধ বই থেকে মুখ তুলে তাকালেন।
— কী হয়েছে মা?
নওরীন আনন্দে বলল,
— আমার গল্প প্রকাশ হবে!
বৃদ্ধের মুখে সুন্দর একটা হাসি ফুটে উঠল।
— বলেছিলাম না, একদিন পারবে?
নওরীন আবেগে বলল,
— আপনার জন্যই সম্ভব হয়েছে।
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন,
— না মা। তোমার পরিশ্রমের জন্য হয়েছে। আমি শুধু তোমাকে একটু সাহস দিয়েছি।
সেদিন বৃদ্ধ তাকে একটি নতুন খাতা উপহার দিলেন।
খাতার প্রথম পাতায় লিখে দিলেন—
‘লেখা থামিও না। কারণ তোমার একটি গল্প হয়তো কারও বেঁচে থাকার সাহস হয়ে উঠবে।’
জীবনের সব দিন অবশ্য একরকম যায় না।
কিছুদিন পর নওরীনের মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
হাসপাতালে নেওয়া হলো।
ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করাতে বললেন। চিকিৎসার খরচও বেড়ে গেল।
নওরীনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
একদিকে সংসার, অন্যদিকে মায়ের চিকিৎসা। অফিসের কাজ সামলাতে গিয়ে সে নিজের জন্য সময়ই পাচ্ছিল না।
কয়েক দিন লাইব্রেরিতে যাওয়া হলো না।
লেখালেখিও বন্ধ হয়ে গেল।
তাসনিম একদিন অফিসে এসে বলল,
— তুই নিজেকে এত কষ্ট দিচ্ছিস কেন?
নওরীন ক্লান্ত গলায় বলল,
— কী করব বল? সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
— আমি আছি তো। যতটুকু পারি সাহায্য করব।
নওরীন বন্ধুর হাত ধরে বলল,
— সবাই সব সময় পাশে থাকতে পারে না, তাসনিম।
তাসনিম উত্তর দিল,
— সব সময় পাশে থাকার দরকার নেই। প্রয়োজনের সময় পাশে থাকাটাই বন্ধুত্ব।
নওরীনের চোখ ভিজে উঠল।
সে বুঝতে পারল, জীবনে কিছু সম্পর্ক রক্তের না হয়েও পরিবারের মতো হয়ে যায়।
মায়ের অবস্থা একটু ভালো হওয়ার পর এক বিকেলে নওরীন লাইব্রেরিতে গেল।
অনেক দিন পর দরজায় দাঁড়িয়ে তার মনটা কেমন হয়ে গেল।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, আবদুল কাদের সাহেব চেয়ারে বসে আছেন।
তবে আগের চেয়ে অনেক দুর্বল দেখাচ্ছে।
— চাচা, কেমন আছেন?
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।
— ভালো আছি মা। তুমি কেমন?
— ভালো। মা অসুস্থ ছিল, তাই আসতে পারিনি।
— এখন কেমন আছেন?
— আগের চেয়ে ভালো।
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
তারপর বললেন,
— তোমাকে একটা কথা বলব?
— বলুন।
— এই লাইব্রেরিটা হয়তো আর বেশিদিন চালাতে পারব না।
নওরীন অবাক হয়ে গেল।
— কেন?
— বয়স হয়েছে মা। শরীর আগের মতো সায় দেয় না। ছেলেমেয়েরা সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। লাইব্রেরির খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নওরীনের বুকটা কেমন করে উঠল।
— তাহলে বইগুলোর কী হবে?
বৃদ্ধ একটু হেসে বললেন,
— বইয়ের আবার কী হবে? কোনো না কোনো জায়গায় চলে যাবে।
নওরীন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— চাচা, এই লাইব্রেরি বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না।
বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন।
— কী করবে তুমি?
— জানি না। তবে একটা ব্যবস্থা করব।
বৃদ্ধ কিছু বললেন না।
শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
সেই রাতেই নওরীন তাসনিমকে ফোন করল।
সব কথা খুলে বলল।
তাসনিম প্রথমে অবাক হলেও পরে আগ্রহ নিয়ে শুনল।
— তুই কি সত্যি লাইব্রেরিটা বাঁচাতে চাস?
— হ্যাঁ। জায়গাটা শুধু বইয়ের দোকান নয়। অনেক মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
— তাহলে আমরা কিছু করতে পারি।
— কীভাবে?
তাসনিম বলল,
— প্রথমে লাইব্রেরির একটা পরিচিতি তৈরি করতে হবে। অনলাইনে ছবি দেব, বই পড়ার আয়োজন করব, ছোটদের জন্য গল্প পড়ার অনুষ্ঠান করব।
নওরীনের চোখে আশার আলো ফুটে উঠল।
— কিন্তু খরচ?
— সবকিছু একদিনে করতে হবে না। অল্প অল্প করে শুরু করব।
পরদিন দুজন লাইব্রেরিতে গেল।
আবদুল কাদের সাহেবকে তাদের পরিকল্পনার কথা জানাল।
বৃদ্ধ প্রথমে রাজি হতে চাইছিলেন না।
কিন্তু নওরীন বলল,
— চাচা, আপনি আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। এবার আমাকে একটা স্বপ্ন পূরণ করতে দিন।
বৃদ্ধ আর আপত্তি করলেন না।
কাজ শুরু হলো।
প্রথমে লাইব্রেরির পুরোনো বইগুলো পরিষ্কার করা হলো। ভাঙা তাকগুলো মেরামত করা হলো। জানালার পাশে নতুন পর্দা লাগানো হলো।
নওরীন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু বই কিনে দিল।
তাসনিম পরিচিতদের মাধ্যমে আরও বই সংগ্রহ করল।
একদিন কয়েকজন স্কুলের শিক্ষার্থী লাইব্রেরিতে এল।
তাদের মধ্যে একটি ছোট মেয়ে ছিল। নাম মিতু।
মিতু নওরীনকে জিজ্ঞেস করল,
— আপু, এখানে কি বিনা পয়সায় বই পড়া যায়?
নওরীন হেসে বলল,
— অবশ্যই যায়।
— আমি কি প্রতিদিন আসতে পারব?
— পারবে।
মেয়েটির মুখে আনন্দ দেখে নওরীনের মনে হলো, তার এত দিনের পরিশ্রম সার্থক হচ্ছে।
ধীরে ধীরে আরও মানুষ আসতে শুরু করল।
কেউ বই পড়তে, কেউ বই দান করতে, কেউ শুধু পুরোনো দিনের স্মৃতি দেখতে।
একদিন এলাকার একজন শিক্ষক এসে বললেন,
— আপনারা খুব ভালো কাজ করছেন। এই লাইব্রেরিটা আমাদের এলাকার সম্পদ।
নওরীন হাসিমুখে উত্তর দিল,
— আমরা শুধু চেষ্টা করছি, স্যার।
শিক্ষক বললেন,
— চেষ্টা থেকেই তো বড় কিছু শুরু হয়।
সবকিছু একটু একটু করে সুন্দর হয়ে উঠছিল।
কিন্তু হঠাৎ এক সকালে নওরীনের ফোনে খবর এল।
আবদুল কাদের সাহেব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
নওরীন দ্রুত হাসপাতালে গেল।
বৃদ্ধ বিছানায় শুয়ে ছিলেন। শরীর খুব দুর্বল।
নওরীন কাছে গিয়ে বলল,
— চাচা, কেমন আছেন?
বৃদ্ধ চোখ খুলে তাকালেন।
— তুমি এসেছ?
— জি। আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। লাইব্রেরিতে আপনার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে।
বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।
— লাইব্রেরি কেমন চলছে?
নওরীন বলল,
— খুব ভালো। এখন প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে।
— বাচ্চারা আসে?
— জি। অনেক বাচ্চা আসে।
বৃদ্ধের চোখে প্রশান্তি ফুটে উঠল।
কিছুক্ষণ পর তিনি নওরীনের হাত ধরে বললেন,
— একটা কথা মনে রাখবে মা।
— বলুন।
— কোনো প্রতিষ্ঠান বড় হয় তার দেয়াল দিয়ে নয়, মানুষের ভালোবাসা দিয়ে।
নওরীনের চোখ ভিজে উঠল।
— আপনি সুস্থ হয়ে নিজেই আবার লাইব্রেরিতে বসবেন।
বৃদ্ধ কিছু বললেন না।
শুধু মৃদু হাসলেন।
সেদিন নওরীন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল।
পরদিন সকালে খবর এল, আবদুল কাদের সাহেব আর নেই।
নওরীন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
যে মানুষটি তাকে প্রথমবার লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যিনি তার লেখা পড়ে উৎসাহ দিয়েছিলেন, সেই মানুষটি আর নেই।
তার মনে হচ্ছিল, শহরের একটি পরিচিত আলো নিভে গেছে।
বৃদ্ধের জানাজা শেষে নওরীন লাইব্রেরিতে গেল।
দরজাটা খোলা ছিল।
সবকিছু আগের মতোই আছে। শুধু চেয়ারটিতে কেউ বসে নেই।
নওরীন ধীরে ধীরে বৃদ্ধের টেবিলের কাছে গেল।
সেখানে একটি খাম রাখা ছিল।
খামের ওপরে তার নাম লেখা।
নওরীন কাঁপা হাতে খামটি খুলল।
ভেতরে একটি চিঠি।
"প্রিয় নওরীন,
তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, হয়তো আমি আর তোমার সামনে থাকব না।
জীবনে অনেক মানুষ দেখেছি। অনেক স্বপ্ন ভাঙতে দেখেছি, অনেক স্বপ্ন পূরণ হতেও দেখেছি।
কিন্তু তোমার মধ্যে আমি এমন একটা জিনিস দেখেছি, যা সবার মধ্যে থাকে না।
তুমি নিজের কষ্টের মধ্যেও অন্যের জন্য কিছু করতে চাও।
মনে রেখো, বই শুধু জ্ঞান দেয় না, বই মানুষকে মানুষ চিনতেও শেখায়।
এই লাইব্রেরিটা যদি কোনোদিন তোমার হাতে নতুনভাবে বেঁচে ওঠে, তাহলে আমার আর কোনো আফসোস থাকবে না।
এখানে যারা আসবে, তাদের কখনো ফিরিয়ে দিও না। কারও কাছে বই কেনার টাকা না থাকলেও তাকে বই পড়ার সুযোগ দেবে।
আর নিজের লেখালেখি বন্ধ করবে না।
তোমার লেখা একদিন অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
ভালো থেকো।
ইতি, তোমার কাদের চাচা।"
চিঠিটা পড়ে নওরীন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল কাগজের ওপর।
সে চিঠিটা বুকের কাছে ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল।
ছয় মাস কেটে গেছে।
প্রত্যাশা পাঠাগার এখন আর আগের মতো নেই।
নতুন করে সাজানো হয়েছে। দেয়ালে রং করা হয়েছে। বইয়ের তাকগুলো গোছানো। শিশুদের জন্য আলাদা একটি কর্নার তৈরি করা হয়েছে।
দরজার পাশে একটি নতুন সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে—
'আবদুল কাদের স্মৃতি পাঠাগার'।
নওরীন ও তাসনিম মিলে পাঠাগারটি পরিচালনা করছে।
প্রতিদিন বিকেলে শিক্ষার্থীরা আসে। কেউ পড়াশোনা করে, কেউ গল্পের বই পড়ে, কেউ নিজের লেখা নিয়ে আসে।
নওরীন তাদের লেখাগুলো মন দিয়ে পড়ে।
একদিন একটি ছোট ছেলে তার কাছে এসে বলল,
— আপু, আমি বড় হয়ে লেখক হতে চাই।
নওরীন হেসে বলল,
— তাহলে আজ থেকেই লেখা শুরু করো।
ছেলেটি বলল,
— কিন্তু আমার লেখা তো ভালো হয় না।
নওরীন তার মাথায় হাত রেখে বলল,
— প্রথম দিনেই কেউ ভালো লেখক হয় না। চেষ্টা করতে হয়।
কথাটা বলতে গিয়ে তার নিজেরই সেই পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল।
এরই মধ্যে নওরীনের লেখা বেশ কয়েকটি গল্প বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে তার বই প্রকাশের প্রস্তাব এল।
বইয়ের নাম নিয়ে অনেক ভেবেছিল সে।
শেষ পর্যন্ত নাম ঠিক করল—
'যাদের স্বপ্ন থেমে যায় না'।
বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরি হলো। প্রকাশের তারিখও ঠিক হলো।
বই প্রকাশের দিন নওরীনের মা সালমা বেগম, ছোট ভাই নাবিল এবং বন্ধু তাসনিম উপস্থিত ছিল।
নওরীন মঞ্চে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
তার চোখ বারবার দর্শকদের ভিড়ের মধ্যে একজন মানুষকে খুঁজছিল।
যদি আজ আবদুল কাদের সাহেব এখানে থাকতেন!
যদি তিনি একবার বইটা হাতে নিয়ে বলতেন, ‘ভালো হয়েছে মা!’
কিন্তু কিছু মানুষকে জীবনে ফিরে পাওয়া যায় না।
অনুষ্ঠান শেষে নওরীন নিজের বইয়ের প্রথম পাতায় লিখল—
"আমার জীবনের সেই মানুষটির নামে, যিনি আমাকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন।
আবদুল কাদের সাহেব।"
তারপর বইটি পাঠাগারের তাকের প্রথম সারিতে রেখে দিল।
বছরখানেক পরের কথা।
আবার বর্ষাকাল এসেছে।
ঢাকার রাস্তায় বৃষ্টি পড়ছে। গাছের পাতায় জমে থাকা পানির ফোঁটা বাতাসে ঝরে পড়ছে।
নওরীন সেদিন অফিস থেকে একটু আগেই বের হয়েছে।
তার হাতে একটি বই, কাঁধে সাধারণ একটি ব্যাগ।
সে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে পাঠাগারের সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজার পাশে কয়েকজন শিশু বসে গল্পের বই পড়ছে।
তাদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে।
নওরীন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ভেতরে প্রবেশ করল।
মিতু দৌড়ে এসে বলল,
— আপু! তুমি এসেছ!
নওরীন হেসে বলল,
— হ্যাঁ। কী পড়ছ?
— নতুন একটা গল্পের বই।
— ভালো লাগছে?
— অনেক!
মিতু হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— আপু, তুমি কি আরও নতুন গল্প লিখবে?
নওরীন বলল,
— অবশ্যই।
— তাহলে আমাদের জন্যও একটা গল্প লিখবে?
নওরীন হেসে উত্তর দিল,
— তোমাদের জন্যই তো লিখি।
মিতু খুশিতে দৌড়ে চলে গেল।
নওরীন জানালার পাশে দাঁড়াল।
বাইরে তখন বৃষ্টির শেষ বিকেল।
কিছুক্ষণ পর তাসনিম এসে পাশে দাঁড়াল।
— কী ভাবছিস?
নওরীন মৃদু হেসে বলল,
— ভাবছি, জীবনটা আসলে কত সুন্দর!
তাসনিম বলল,
— এতদিনে বুঝলি?
নওরীন হেসে উঠল।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— জানিস, একসময় মনে হতো আমার নিজের স্বপ্নগুলো হয়তো কখনো পূরণ হবে না। সংসারের দায়িত্ব, অভাব, চিন্তা—সবকিছুর ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।
— এখন?
— এখন বুঝি, স্বপ্ন পূরণ করতে সব সময় বড় কোনো সুযোগের দরকার হয় না। কখনো কখনো একটা ছোট্ট লাইব্রেরি, একজন ভালো মানুষ আর নিজের ওপর একটু বিশ্বাসই যথেষ্ট।
তাসনিম কিছু বলল না।
নওরীন টেবিলের ওপর রাখা নিজের বইটি হাতে নিল।
প্রথম পাতায় লেখা—
"যারা মনে করে তাদের জীবনে আর নতুন করে শুরু করার সুযোগ নেই, এই বই তাদের জন্য।"
সে বইটি আবার তাকের ওপর রেখে দিল।
বৃষ্টির শব্দ ধীরে ধীরে কমে আসছিল।
আকাশের একপাশে সূর্যের শেষ আলো দেখা যাচ্ছিল।
নওরীন মনে মনে আবদুল কাদের সাহেবকে ধন্যবাদ জানাল।
তিনি হয়তো আর পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তার শেখানো কথাগুলো এখনো বেঁচে আছে।
প্রতিটি বইয়ের পাতায়, প্রতিটি শিশুর হাসিতে, প্রতিটি নতুন লেখকের স্বপ্নে।
সেদিন নওরীন বুঝেছিল, মানুষ চলে গেলেও তার ভালো কাজ কখনো হারিয়ে যায় না।
কিছু মানুষ নিজের জীবনে বড় কিছু রেখে যেতে পারে না, কিন্তু অন্যের জীবনে এমন একটি আলো জ্বালিয়ে যায়, যা বহু বছর পরও নিভে না।
আর সেই আলোই একদিন অন্য কারও পথ দেখায়।
বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে।
নওরীন পাঠাগারের দরজায় দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকাল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— চাচা, আপনার পাঠাগার এখনো বেঁচে আছে। আর আমি এখনো লিখছি।
তারপর দরজাটা বন্ধ করে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করল।
ঢাকা শহর তখন সন্ধ্যার আলোয় ঝলমল করছে।
মানুষ ছুটছে নিজের গন্তব্যে।
আর নওরীনের মনে হচ্ছিল, আজকের এই বিকেলটা যেন তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিকেল।
কারণ সে আজ শুধু একজন লেখক নয়, সে এমন একটি স্বপ্নের অংশ, যে স্বপ্ন অন্য অনেক মানুষের জীবনেও আলো ছড়াবে।
সমাপ্ত
লেখিকা: মেহরিন মাহি
লেখিকার অনুমতি ছাড়া গল্পটি নকল, পুনঃপ্রকাশ বা নিজের নামে প্রকাশ করা নিষেধ।
সমাপ্ত