ফন্ট সাইজ:
থিম:
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ

২য় পর্ব

লেখক: ইয়ুশরা রিমু

#র‌ইলো_প্রেমের_নিমন্ত্রণ

#পর্ব_২

#ইয়ুশরা_রিমু

কানে ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বেলা। মুখটা এমনভাবে ফুলিয়ে রেখেছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অত্যা'চারী মানুষটা এইমাত্র তার সামনে দাঁড়িয়ে ক্লাস নিচ্ছে।

আর সত্যি বলতে, এই মুহূর্তে শাইবান খান সায়রকে তার ঠিক সেটাই মনে হচ্ছে।এক হাতে মার্কার, অন্য হাতে বই নিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ক্লাস নিচ্ছে লোকটা। যেন কিছুই হয়নি। যেন কিছুক্ষণ আগে একটা মানুষকে পুরো ক্লাসের সামনে অপদস্ত করে রাখেনি।বেলার রাগে গা জ্ব'লছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করছে বেঞ্চ থেকে লাফিয়ে নেমে গিয়ে বোর্ডের ডাস্টারটা ছুঁড়ে মা'রতে। অবশ্য ইচ্ছেটা বাস্তবে পরিণত করার সাহস তার নেই।কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, তারপর কী হবে। শাইবান খান সায়র তাকে জীবন্ত গি'লে খাবে। বেলাকে এই অবস্থায় দেখে পুরো ক্লাসে চাপা হাসির রোল।ইরা বারবার চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলছে। কিন্তু বেলার মাথায় এখন একটাই চিন্তা,

---এই লোকটার সর্বনাশ কিভাবে করা যায়!

ঘণ্টা পড়ার কয়েক মিনিট আগে সায়র পুরো ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বললো,

---আজকের লেসন সবাই ভালোভাবে পড়ে আসবে। আগামীকাল যাকে জিজ্ঞেস করবো, যেন উত্তর দিতে পারেন সবাই।

কথাটা বলে বই বন্ধ করলো সে।তারপর একবারও বেলার দিকে না তাকিয়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল।এই বিষয়টাই সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগলো বেলার।এতক্ষণ শা'স্তি দিলো, বকলো, অথচ যাওয়ার সময় একবার তাকিয়েও দেখল না।যেন সে আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কেউ না।

সায়র বের হতেই বেলা কানের ওপর থেকে হাত সরিয়ে ধপাস করে বেঞ্চে বসে পড়লো।কানে হাত দিয়ে কয়েকবার মালিশ করে বিরবির করে বললো,

---শা'লা হিটলার!

ইরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

---কাকে বললি?

বেলা কপাল কুঁচকে বলে,

---যে আমাকে এতক্ষণ মুরগি বানিয়ে রাখলো তাকে।

---আস্তে বল! কেউ শুনে ফেললে আবার...

---শুনুক। ভ'য় পাই নাকি?

কথাটা বললেও বেলা জানে, ভয় সে একটু হলেও পায়।বিশেষ করে শাইবান খান সায়রের সেই শান্ত গম্ভীর মুখটাকে।রাগ করলে মানুষ চিৎকার করে।কিন্তু এই লোকটা চিৎকারও করে না।শুধু তাকায়।আর সেই তাকানোতেই বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।

প্রসঙ্গ পাল্টে ইরা মজা ছলে বললো,

---কেমন লাগলো কানে ধরে দাঁড়াতে?

---মজা লাগছে। কাল আবার দাঁড়াবো।

---মিথ্যা কথা বলিস না।

বেলা সিরিয়াস মুড নিয়ে বলে,

--- আজকে বাসায় গিয়ে এই লোকটার নামে একটা গরু সদকা দিবো।

ইরা অবাক হয়ে বলে,

----সদকা দেয় মানুষের মঙ্গলের জন্য।

--- তাই তো দিবো। আল্লাহ্ যেন লোকটার একটু বদমেজাজ কমিয়ে হিটলার থেকে ভালো মানুষ করে দেন‌।

বেলার কথা শুনে পর হাসতে হাসতে ইরা বললো,

---যাই হোক আর জীবনেও এমন মজা করিস না ভাই। স্যার তোর সাথে আমাকেও পৃথিবীর বাইরে ছুঁড়ে ফেলবে।

ওর কথায় বেলা কিছু বললো না এতো সহজে তো সায়র নামক বেটাকে সে ছাড়বেনা।

______________________________________________

ব্যাগ গুছানোর সময় ফোনটা বের করলো বেলা। মেসেঞ্জার খুলে দেখলো এখনো কোনো রিপ্লাই আসেনি।ভ্রু কুঁচকে গেল তার।

---এই লোকটা কি আবার ক্লাস নিতে ব্যস্ত?

দুই মিনিট ভেবে আবার একটা মেসেজ পাঠালো,

---স্যার, আপনি কি দায়িত্বজ্ঞানহীন বাবা?

মেসেজ পাঠিয়েই নিজেই হেসে ফেললো।তারপর আরেকটা পাঠায়,

---আপনার সন্তানের মা সারাদিন না খেয়ে আছে।

তারপর আরও একটা মেসেজ লিখলো,

---সন্তানের মায়ের জন্য অন্তত দুধ-ডিমের ব্যবস্থা করেন।

পরপর চারটি মেসেজ সেন্ড করে ফোনটা ব্যাগে ভরে রাখলো সে।

সবার শেষে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে এলো ওরা দুজন, ঠিক তখনই পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,

---মিস বেলা।

বেলার পা থেমে গেলো।ইরার মুখও শুকিয়ে গেলো।দুজনেই একসাথে পেছন ফিরলো।সায়র করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে।হাতে কয়েকটা খাতা।মুখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য।

---একটু আসেন।

বেলার বুক ধক করে উঠলো।ফেক আইডির ব্যাপারটা কি ধরে ফেলেছে?মাথার ভেতর মুহূর্তে হাজারটা চিন্তা ঘুরে গেল।তবু যতটা সম্ভব স্বাভাবিক মুখ করে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

---জি স্যার?

সায়র কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর বললো,

---তুই ইচ্ছে করে পড়াশোনা ন'ষ্ট করছিস কেন?

প্রশ্নটা শুনে বেলা অবাক হয়ে গেল।সে ভেবেছিল অন্য কিছু বলবে।বেলা কিছু না জানার ভান করে বলে,

---মানে? কি বলছেন এসব?

---প্রতিদিন ক্লাসে অন্যমনস্ক থাকিস কেন? সমস্যা কি তোর বল।

--থাকি না তো।

---থাকিস।

বেলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

---আমি পড়া বুঝিনি।

---বুঝিসনি নাকি মনোযোগ দেসনি? আর বাসায় কখনো বলেছিস যে পড়া বুঝিস না । বা আমাকে একটু বুঝিয়ে দেন?

বেলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

---তুই ছোটবেলা থেকে যেমন ছিলি, এখনও তেমনই আছিস স্টুপিট।

বেলা ভ্রু কুঁচকিয়ে বলে,

---আমি আবার কি করলাম?

সায়র আবার বললো,

---জীবনটা সবসময় তোর পছন্দমতো চলবে না। কিছু বিষয় দায়িত্ববোধ থেকে করতে হয় ।পড়াশোনার ইচ্ছে না থাকলে বলিস। তোর পড়ালেখা অফ করে দিব।

বেলার হঠাৎ বিরক্ত লাগলো।সে উপদেশ শুনতে পছন্দ করে না।বিশেষ করে সায়রের কাছ থেকে না।সে মুখ গোমড়া করে বললো,

---আমার বাবা আছেন। উনিই এসব বুঝাবেন। আমার পড়াশোনা চলবে কিনা। আপনার উপদেশ প্রয়োজন নেই।

ইরা দূরে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।সে নিশ্চিত, এখন ঝড় আসবে।

বেলার কথায় সায়র রাগ করলো না।শুধু গম্ভীর মুখ করে ওর চোখে তাকিয়ে রইলো। সেই দৃষ্টিটা অদ্ভুত।বকা দেয় না।চিৎকার করে না।তবু মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।কয়েক সেকেন্ড পর সায়র ধীরে বললো,

--- হ্যাঁ চাচ্চুই তোকে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছে। আদরে আদরে বাঁদর বনে যাচ্ছিস দিন দিন।

বেলা আশ্চর্য হয়ে বলে,

--- আমি বাঁদর?

--- তা নয়তো কি?আর আগামীকাল থেকে মোবাইল যেন কলেজে আনতে না দেখি। আমি যদি একবার বুঝি আছাড় মে'রে ভাঙ্গবো তোর ফোন। কথাটা মস্তিষ্কে গেঁথে নে ভালোভাবে।

বেলা ভ'য়ে ভ'য়ে বললো,

--জি আ..আচ্ছা ।

সায়র আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না গটগট পায়ে ত্যাগ করলো স্থান।

সায়র চলে যেতেই ইরা সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করে,

---কি বললো স্যার?

---উপদেশ দিল।

--- বুঝতে পারেনি তো ফেক আইডির বিষয়ে?

---না।

_________________________________________________

সায়রের এতটা কাছে অন্য এক নারীর উপস্থিতি মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে বেলার। পুরুষটির যত্নশীল আচরণ আর মেয়েটির মুখের হাসি তার বুকের ভেতর অদ্ভুত যন্ত্রণা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই দৃশ্যেই বেলার হৃদয়টা নিঃশব্দে ভে'ঙে গেল।সেই দৃশ্য আবার তার প্রিয় কাঠগোলাপ ফুলের গাছের কাছে।

কাঠগোলাপ গাছটা বেলার খুব প্রিয়। একসময় সেই চারাগুলো সায়রই এনে দিয়েছিল। ওর জন্মদিনের উপহার হিসেবে।আজ সেই গাছের পাশেই অন্য এক মেয়ের সঙ্গে সায়রকে দেখে রাগে-অভিমানে ফে'টে পড়ে বেলা। সায়রকে সে দু'চোখ দেখতে পারেনা ঠিকই কিন্তু অন্য নারীর সাথে সায়রকে সহ্য ও করতে পারে না সে। নিজের এলোমেলো অবস্থা সামলে ওদের সামনে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে,

--এখানে কী হচ্ছে? এটা পার্ক নয়।এটা বাগান

আর সায়র ভ্রু কুচকে তাকায়। এমন বি'ধ্বস্ত লাগছে কেন ওকে?ধমক দিতে গিয়েও দেয় না।জোরে জোরে শ্বাস টানছে বেলা। দৃষ্টি তার সায়রের দিকে।যেন এখুনি টুপ করে গিলে ফেলবে।সায়র গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

---বেয়াদবি করছিস কেন?

--আমি বেয়াদব, তাই ।

মুখে মুখে তর্ক করাটাই যেন এই মেয়ের স্বভাব। সচরাচর কেউ সায়রের মুখের ওপর এভাবে কথা বলার সাহস করে না।কিন্তু এই মেয়ের মধ্যে ভয়ের টিকিটিও কখনো খুঁজে পায়নি সায়র। মাঝে মাঝে মনে চায় কাঁধে তুলে আছাড় মা'রতে মেয়েটাকে।

দাঁতে দাঁত চেপে বলে সায়র বলে,

---চাপকে তোর গাল লাল করে দিবো বেয়াদব।

সমান তালে বেলা জবাব দেয়,

--- আর আমি বসে বসে কি বাদাম খাব?আমার গাল কি এতো সস্তা? যে কেউ এসে আমাকে থা'প্পড়ে চলে যাবে?

রুপসা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বলে,

--- আরে বেলা কেমন আছো?

বেলা রাগান্বিত স্বরে বলে,

--- তোমাকে বলতে হবে কেমন আছি?

রুপসা আশ্চর্য বনে বলে,

---এভাবে কথা বলছো কেন?

--- তো কিভাবে কথা বলবো?

সায়র ধমকে বলে,

--- বেয়াদব ঠিক করে কথা বল। রুপসা তোর থেকে বড়।

নাক ফুলিয়ে দাঁত কটমট করে বেলা বলে,

--- তো বড় হয়েছে বলে এখন ওর পা ধুয়ে পানি খাব? সারাক্ষণ আমাকে ধমকানোর সুযোগ খুঁজতে থাকেন, তাই না?

বলতে বলতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কলেজের রাগটাও এখন উঠলে উঠছে বেলার। মন চাচ্ছে সায়র আর রুপসা দুটোরই চুল টেনে ছিঁ'ড়তে ।

রুপসার দিকে কঠোর মুখে তাকিয়ে বেলা বলে,

---আমাদের বাড়িতে এসেছো কেন? তোমার বাড়ি নেই? দুইদিন পরপর আমাদের বাড়াতে আসো কেন? এসেই সায়র ভাইয়ের সাথে চিপকে থাকো। এইসব লুতোপুতো কাহিনী আমাদের বাসায় চলবে না। এই আমি বলে দিলাম।

ওর পুরো বাক্য শেষ করার আগেই সায়র বলে ওঠে,

--- এটা আমারো বাড়ি ও একশোবার আসবে তাতে তোর কি?

অভিমানে বুক ভারী হয়ে ওঠে বেলার। নাক ফুলিয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে সায়রের মুখপানে।রুপসার রাগ এবার আকাশ ছুঁই ছুঁই। বাড়িতে এসেছে বলে খোঁটা দেবে? ওর কি বাড়ি গাড়ির অভাব আছে নাকি? বেলাকে কিছু বলতে যাবে, সায়র হাত উঁচু করে থামিয়ে দেয়।

বেলা চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পেছন ঘুরে। তখনই নজর পড়ে কাঠগোলাপ গাছের গোড়ায় কাঁদামাটির দিকে। মুহূর্তেই এক মুঠো মাটি তুলে সায়রের দিকে ছুঁড়ে মা'রে। শার্টে গিয়ে পড়ে কাদামাটি। আর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে যায়,

--- হিটলার বেটা।

এই কথাটা বলেই বেলা এক দৌড়ে চলে যায়।

সায়র বেলার যাওয়ার দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে ওর পিছু দৌড়ে ছুটে চিৎকার করে বলে,

--- ইডিয়েট! আজকে তোর খবর আছে। দেখি তোকে কে আমার হাত থেকে বাঁচায়!

চলবে.........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন