ফন্ট সাইজ:
থিম:
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ

৪র্থ পর্ব

লেখক: ইয়ুশরা রিমু

#র‌ইলো_প্রেমের_নিমন্ত্রণ

#পর্ব_৪

#ইয়ুশরা_রিমু

পরদিন সকালবেলা আশ্চর্যজনকভাবে অ্যালার্ম বাজার আগেই ঘুম ভেঙে গেল বেলার।যে বেলাকে প্রতিদিন ঘুম থেকে তুলতে অন্তত তিনবার ডাকাডাকি, দুবার ধমক আর একবার হুমকি দিতে হয়, সেই বেলাই আজ নিজে নিজে সকাল সকাল উঠে পড়লো। অবশ্য এর পেছনে পড়াশোনার প্রতি হঠাৎ জন্ম নেওয়া ভালোবাসা কাজ করছে না। বরং তার মাথার ভেতর গত রাত থেকে ঘুরতে থাকা "অপারেশন রুপসা" নামের গোপন পরিকল্পনাটাই তাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সক্রিয় করে তুলেছে।মেয়েটার হাসিটা যতবার মনে পড়ছে, ততবারই বেলার ভেতরে অকারণে বিরক্তি জন্ম নিচ্ছে।বালিশটা বুকে চেপে ধরে কয়েক মুহূর্ত গম্ভীর হয়ে বসে থাকলো সে। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললো,

---এত হাসাহাসির কী আছে বুঝি না। পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ নেই কথা বলার?

কথাটা বলেই আবার নিজের ওপরই বিরক্ত হলো। কারণ সে জানে, সায়র কার সাথে কথা বলবে, কার সাথে বন্ধুত্ব করবে, সেটা নিয়ে তার মাথা ঘামানোর কোনো অধিকার নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, তার মন এই যুক্তিগুলো শুনতেই চায় না।গোসল করে কলেজ ড্রেস পরে নিচে নামতেই নাজনীন সুলতানা সন্দেহভরা চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,

---আজ এত তাড়াতাড়ি?

বেলা খুব ভদ্র মুখ করে বললো,

---মানুষ কি বদলাতে পারে না?

নাজনীন সুলতানা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,

----পারে। কিন্তু তুই না।

বাশার খান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হেসে ফেললেন।আর বেলা নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাস্তা খেতে বসে গেলো।নাস্তা খাওয়ার সময় কোনো ঝামেলা করলো না, বড় চাচির সঙ্গে তর্ক করলো না।‌ বেলা অবশ্য এমন ভাব করে বসেছিল যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে ভদ্র এবং শান্তশিষ্ট মেয়ে।কলেজে যাওয়ার সময়ও সে নিরীহ মুখে বই বুকে জড়িয়ে বের হয়ে গেলো।কিন্তু বেলাকে যারা চেনে, তারা জানে। বেলাকে যত শান্ত দেখায়, বিপদ তত কাছাকাছি থাকে।

_______________________________________________________

কলেজে পৌঁছানোর পর প্রথম ক্লাসটা মোটামুটি শান্তভাবেই কে'টে গেলো। তবে বেলার মতো মানুষের ক্ষেত্রে "শান্ত" শব্দটার স্থায়িত্ব সাধারণত খুব বেশি সময় থাকে না।দ্বিতীয় ক্লাসের আগে করিডোরে দাঁড়িয়ে ইরার সাথে গল্প করছিলো সে। এমন সময় পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তানিয়া নামক একজন ক্লাসমেট এমনভাবে তার দিকে তাকালো । তাকানোর ভঙ্গি দেখে বেলার রাগ উঠে গেলো।

মেয়েটাকে বেলা আগে থেকেই সহ্য করতে পারে না।

কারণ তানিয়ার একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। সুযোগ পেলেই খোঁচা মে'রে কথা বলে। আর বেলারও এমন স্বভাব যে কেউ খোঁচা দিলে সে ফুল ছুড়ে উত্তর দেয় না। একদম বি'ষিয়ে উওর দেয়।তার চেয়ে বড় বিষয় সায়রের ক্লাসে সবসময় পড়া শিখে এসে ভালো সাজতে চায়। তানিয়া পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,

--- কিছু মানুষ পরীক্ষায় ফেল করার পরও এতো নির্লজ্জ ভাবে হাসিমুখে থাকে কীভাবে বুঝি না।

বাক্যটা শুনে ইরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেললো।কারণ সে জানে, যু'দ্ধ শুরু হয়ে যাবে এক্ষুনি।বেলা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো।তারপর মিষ্টি হেসে বললো,

--- কিছু মানুষ অন্যের রেজাল্ট নিয়ে এত চিন্তা করে কেন বুঝি না।

তানিয়া থেমে গিয়ে বলে,

---আমি তো কারো নাম বলিনি।

---আমিও তো বলিনি।

তানিয়া বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলে,

--- কিন্তু তুই আমাকে বুঝিয়েছিস।

বেলা চ‌ওড়া হাসি দিয়ে বলে,

--- এজন্যই লোকে বলে। যার কথা তার গায়ে বাজে।

চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন ছাত্রছাত্রী ইতোমধ্যে হাসি চেপে দেখছে।তানিয়া এবার বিরক্ত হয়ে বললো,

--- সতেরো নাম্বার পেয়ে এত আত্মবিশ্বাস আসে কোথা থেকে তোর?

বেলার মুখের হাসিটা আরও চওড়া করে বলে,

--- আর তোর এত অহংকার আসে কোথা থেকে? নব্বই পেয়েছিস নাকি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছিস?

তানিয়ে তাচ্ছিল্য করে বলে,

---অন্তত তোর মতো ফেল করিনি।

বেলাও কথা ছাড়ার পাত্রী না সেও তাচ্ছিল্য করে বলে,

---বাহ। তো ক্লাসে ফাস্ট গার্ল হয়েছিস বলে তোকে এখন নোবেল পুরস্কার দেওয়া লাগবে? অর্ডার দিব না নাকি?

---তোর সমস্যা কী? সবসময় এতো চেটাং চেটাং কথা বলতে আসিস কোন সাহসে আমার সঙ্গে?

---আমার কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা তোর। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আমার রেজাল্ট নিয়ে গবেষণা শুরু করছিস।

তানিয়া এবার রেগে গিয়ে বললো,

--- সবাই জানে তুই ফেলটুস ছাত্রী। তুই ফেল করেছিস এখন আমি সেটা বললেই দোষ?

---আর সবাই জানে তুই কতটা নাক গলানো অহংকারী ছাত্রী।

তানিয়া ধমকের স্বরে বলে,

---বেলা!

বেলাও এক‌ই ভঙ্গিতে বলে উঠে,

----তানিয়া!

তানিয়া বিরক্ত স্বরে বলে,

--- তুই অসহ্য একটা মেয়ে!

বেলা মিষ্টি হেসে বলে,

--- ধন্যবাদ। নতুন কিছু বল। এটা সবাই জানে

করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় সবাই তখন হাসছে।তানিয়ার মুখ লাল হয়ে গেছে রাগে।আর বেলার মুখে সেই বিখ্যাত নির্দোষ ভাব।যে ভাব দেখলে মনে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত মানুষটা সে।অবশেষে এক ম্যাডাম করিডোর দিয়ে হেঁটে আসতে দেখে দুজনকেই চুপ করতে হলো। ক্লাসে যাওয়া আগে তানিয়া চোখ রাঙিয়ে বললো,

--- তোর সাথে এই বিষয়ে পরে কথা হবে। আমাকে অপমান করেছিস এর শোধ আমি তুলবো একদিন না একদিন।

বেলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো,

--- অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসিস। আমি আবার ব্যস্ত মানুষ তো।

তানিয়া রেগেমেগে ফুসছিলো। করিডোরে থাকা সকল ছাত্র- ছাত্রী তখনো ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছে।তর্ক একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে ইরা এসে জোর করে বেলাকে টেনে নিয়ে গেলো। না নিয়ে গেলে হয়তো পুরো করিডোরটাই ছোটখাটো যু'দ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতো।

_______________________________________________________

টিফিন ব্রেকে দুজন কলেজের সামনের ফুচকার দোকানে চলে গেল।বেলার মন খারাপ থাকলে সাধারণত দুইটা জিনিস তার মুড ভালো করে।এক নম্বর, ঝগড়া।দুই নম্বর, ফুচকা।আজ দুটোই পাওয়া গেছে।ক্যান্টিনে বসার পরও বেলা ফুঁসছিল।ইরা ফুচকার প্লেট সামনে রেখে বললো,

--- তুই একটা দিন ঝগড়া না করে থাকতে পারিস না?

বেলা একটা ফুচকা মুখে পুরে বললো,

---পারি।

---কবে?

--- যখন ঘুমাই।

ইরা মাথায় হাত দিয়ে বলে,

--- হায়রে আল্লাহ্। এই আমি কোন তার ছিঁড়ার লগে বন্ধুত্ব করলাম ‌

বেলা হেসে ফেললো।ফুচকার প্রথম প্লেট শেষ করেই সে দ্বিতীয় প্লেটের অর্ডার দিল।ইরা অবিশ্বাস চোখে তাকিয়ে বললো,

--- তুই মানুষ তো?

---কেন?

--- এত খিদে লাগে কীভাবে?

---মা'নসিক কষ্টে।

---মা'নসিক কষ্টে মানুষ কাঁদে।

--- আমি খাই।

ইরা হো হো করে হেসে উঠলো।এরপর প্রায় আধাঘণ্টা ধরে তারা গল্প করলো, হাসলো, এলাকার চাচিদের মতো ক্লাসের বিভিন্ন মানুষের সমালোচনা করলো, আবার নিজেরাই হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেলো।সেই সময়টুকুতে সত্যিই বেলার মনটা অনেকটা হালকা হয়ে গিয়েছিলো।

_________________________________________________________

দিনের শেষ ক্লাসটা ছিল ইংরেজির।আর ইংরেজি মানেই সায়র।সায়র ক্লাসে ঢুকতেই বেলা আজকের প্রথম দুষ্টুমি শুরু করলো।ক্লাসের মাঝখানে সে এমন ভাব করে প্রশ্ন করতে লাগলো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মনোযোগী ছাত্রী সে-ই।কিন্তু প্রশ্নগুলো এত অদ্ভুত ছিল যে পুরো ক্লাসই হাসি চেপে রাখতে পারছিল না। বেলা প্রশ্ন করলো,

--- স্যার, ইংরেজি আবিষ্কার করার সময় আবিষ্কারক কি জানতো এটা এত কঠিন হবে?

সায়র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে বললো,

---ইংরেজি কোনো মোবাইল অ্যাপ না যে কেউ আবিষ্কার করেছে।

-- ও আচ্ছা। আপনি নিশ্চিত?

--- হ্যাঁ।

---আমার সন্দেহ আছে।

---আমারও আছে।

-- কীসের?

--- আপনার মানসিক সুস্থতা নিয়ে।

সঙ্গে সঙ্গে পুরো ক্লাস আবার হেসে উঠলো।বেলা মুখ ফুলিয়ে বসে পড়লো।কিন্তু পাঁচ মিনিট পর আবার হাত তুললো।সায়র চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড ধৈর্য ধরার চেষ্টা করলো।তারপর বললো,

---বেলা, আর একটা প্রশ্ন করলে ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবো।

বেলা নির্দোষ মুখে বললো,

--আমি তো জ্ঞান অর্জন করছি।

--- আপনার জ্ঞান অর্জন করার প্রয়োজন নেই। চুপচাপ যা পড়া বুঝাচ্ছি সেটা মনোযোগ সহকারে শুনুন।

বেলাও কোনো প্রশ্ন করলো না। সে তো শুধু প্রশ্ন করে সায়রকে ডিস্টার্ব করতে।আর কলেজে সবসময় আপনি করে সম্বোধন করে সায়র সবাইকে এমনকি বেলাকেও। সায়রের মুখে আপনি সম্বোধন শুনতে ভালোই লাগে ওর।ইরা ছাড়া কেউই জানে না বেলা সায়রের চাচাতো ভাই।

★

কলেজ ছুটি হওয়ার পর করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় দূর থেকে সায়রকে দেখতে পেল বেলা।শিক্ষক কক্ষে যাওয়ার পথে ছিলেন তিনি।বেলাকে দেখেও বিশেষ গুরুত্ব দিলো না।এবং ঠিক এই কারণেই বেলার দুষ্টুমি করার ইচ্ছা জেগে উঠলো।সে দ্রুত সামনে গিয়ে পথ আটকে দাঁড়ালো।সায়র ভ্রু কুঁচকে বললো,

-- কী হয়েছে?

---কিছু না।

--- তাহলে সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

--- আপনাকে দেখছিলাম।

--- আমি কি চিড়িয়াখানার প্রাণী?

--- না। আপনি তার থেকেও বিরল।

সায়র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

--- ক্লাস শেষ। ছুটি দিয়েছে বাসায় যা।

বেলা দুষ্টু হেসে বলে,

--- আপনার সঙ্গে যাব। বাসায় একা একা থাকতে একদম ভালো লাগে না। ভাইয়াও নেই। সারাদিন আপনাকে যতই বিরক্ত করি না কেন, বাসায় গিয়ে আপনাকে না দেখলে ভালো লাগে না। মনে হয় কী যেন নেই। আপনাকে অনেক মিস করি। আপনি কি আমাকে একটুও মিস করেন?

---না।

---একটুও না?

--এক সেকেন্ডও না।

---- যদি কখনো হারিয়ে যাই?

সায়র এক মিনিট স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে র‌ইলো বেলার বাচ্চাসুলভ চেহারায়। পরপর‌ই বললো,

--- তাহলে তো বিন্দাস লাইফ কাটাতে পারবো। তোর জ্বা'লায় বাসায় থেকেও শান্তি পাইনা। কলেজে এসেও না।

বেলা নাটকীয়ভাবে সায়রের বুক চেপে ধরলো,

---এত নিষ্ঠুর মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।

--- দেখিসনি । দেখে নে। এখন রাস্তা ছাড়।

বেলা মুখ বাঁকিয়ে সরে গেলো।কিন্তু সায়র চলে যাওয়ার পরও তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি লেগে রইলো।

_____________________________________________________

কলেজ থেকে ফিরে নিজের রুমে ঢুকেই বিছানার ওপর ধপাস করে শুয়ে পড়লো বেলা। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ, ক্লাস, ঝগড়া আর ফুচকা খাওয়ার পর শরীর ক্লান্ত লাগলেও তার মাথাটা অস্বাভাবিক রকম সক্রিয়। বিশেষ করে শেষ ক্লাসে সায়রের মুখের সেই বিরক্ত ভাবটা বারবার মনে পড়ছে। আবার মনে পড়ছে রুপসার কথাও। মেয়েটা আজ আসবে কি না, সেটাও অকারণে ভাবাচ্ছে তাকে।

ফোনটা হাতে নিয়ে বারবার একটা নির্দিষ্ট প্রোফাইল ঘুরে ঘুরে দেখছিলো বারংবার।শেষমেশ আর ধৈর্য ধরতে না পেরে ফেক আইডিতে লগইন করলো।কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে লিখলো,

--- স্যার, আপনার সন্তানের মা আজকে ফুচকা খেয়েছে।

অবাক করার মতো বিষয় হলো, এবার দ্রুত রিপ্লাই এলো।

--- এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে আমাকে জানানো হচ্ছে?

বেলা চোখ বড় বড় করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।

তারপর দ্রুত টাইপ করলো,

--- কারণ সন্তানের বাবার জানার অধিকার আছে।

কিছুক্ষণ পর উত্তর এলো,

--- সন্তানের বাবা বর্তমানে মানসিক চাপে আছে।

বেলা হেসে ফেললো। তারপর লিখলো,

--- কেন?

--- কারন সন্তানের মা বিরক্তির করছে প্রতিনিয়ত।

লেখাটা দেখে বেলার গলা শুকিয়ে উঠলো। সায়র কি তাহলে বুঝে গেছে যে বেলাই তাকে ডিস্টার্ব করছে? বেলা কাঁপা কাঁপা হাতে টাইপ করলো,

--- মিথ্যা অপবাদ। আমি কিভাবে বিরক্ত করলাম.?

--- প্রতিদিন মেসেজে বিরক্ত করছে তাহলে কে?

বেলা এবার বুঝতে পারলো সায়র ওকে ধরতে পারিনি।সে পুনরায় লিখলো,

--- ইশ্ । আর শুনুন একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

---করুন।

---আপনি যদি জানতে পারেন সন্তানের মা আসলে কে, তখন কী করবেন?

ওপাশে বেশ কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এলো না। সায়র অফলাইনে চলে গেছে হয়তো।

______________________________________________________

হঠাৎ তার মায়ের ডাকে তাড়াতাড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো বেলা। সায়রের মেসেজের রিপ্লাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যে চোখ লেগে এসেছিলো টের‌ই পায়নি। জানলার বাহিরে তাকিয়ে দেখে অন্ধকারে ছেয়ে গেছে চারপাশ। তার মায়ের ডাকার কারণ এবার বুঝতে পারলো সে। নাজনীন সুলতানা ডাক আবার ভেসে আসলো,

---বেলা! এই বেলা।

---কিকিকি?

---বই নিয়ে সায়রের ঘরে যা। পড়ার সময় হয়েছে। দরজা বন্ধ করে রেখেছিস কেন? দরজা বন্ধ করে ফাঁকিজুকি দিয়ে পড়া কামাই করতে চাইলে আমার হাতে মা'র খাবি কিন্তু।

মুহূর্তেই বেলার মুখটা মলিন হয়ে গেলো।ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।সত্যি বলতে পড়ার কোনো ইচ্ছাই তার নেই। তবুও মাকে বললো,

--- যাচ্ছি কিছুক্ষণের মধ্যেই।

শেষমেশ বই-খাতা নিয়ে সায়রের রুমের উদ্দেশ্য বেরোলো বেলা। সায়রের রুমটা দুতলার একবারে কার্নিশে । সায়র তার রুম এতো গুছিয়ে রাখে বলার বাহিরে। বিছানার চাদর পর্যন্ত একটু এলোমেলো দেখতে পারে না। কিন্তু বেলা এর বিপরীত সবকিছু এলোমেলো করাই যেন তার স্বভাব।এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সায়রের রুমের দরজা সামনে এসে পড়েছে বুঝতে পারলো না। ভেতরে যাবে কি যাবেনা ভাবতে ভাবতেই পাঁচ মিনিট কে'টে যায় তার।সায়র রুম থেকে হাঁক ছেড়ে বলে,

--- পড়ার ইচ্ছা থাকলে ভেতরে আয়। তোর পায়চারি দেখে আমি বিরক্ত হচ্ছি।

বেলা অবাক বনে যায়। সায়র কিভাবে বুঝলো সে এসেছে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ভেতরে প্রবেশ করলো সে। রুমে ঢুকতেই গতকালের মতোই তাকে টেবিলের সামনে বসে থাকতে দেখা গেল। সামনে কয়েকটা বই খোলা।চোখে চশমা।মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।বেলা ঢুকলেও বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে। যেন বেলার‌ উপস্থিত অনুপস্থিতে তার কিছু যায় আসেনা।বেলা মুখ বাঁকিয়ে চেয়ারে বসে পড়লো।তারপর বই খুলে বসে থাকলেও পড়ার প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই।বরং বারবার মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই যে মানুষের সঙ্গে এতক্ষণ মজা করে কথা বলছিল, সেই মানুষটাই এখন সামনে বসে এমন ভাব করছে যেন তাকে চেনেই না।ভাবতেই অদ্ভুত লাগলো।

বইখাতা সামনে খোলা থাকলেও আজকে বেলার মনোযোগের অবস্থা একেবারেই করুণ। সায়র বেশ কিছুক্ষণ ধরে ইংরেজির একটা গুরুত্বপূর্ণ টপিক বুঝিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার মাথায় পড়াশোনার একটা শব্দও ঢুকছে না। কখনো কলম ঘুরাচ্ছে, কখনো খাতার কোণায় আঁকিবুকি করছে, আবার কখনো বিরক্ত মুখে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।সায়র কয়েকবার সতর্কও করলো,

---বেলা, মনোযোগ দে।

--- দিচ্ছি তো।

---কোথায় দিচ্ছিস?

বেলা মিনমিনেয়ে বলে,

----মনে মনে।

---তোর সেই মনটা কোথায় আছে সেটাই তো সমস্যা।

বেলা মুখ বাঁকিয়ে বইয়ের দিকে তাকালো ঠিকই, কিন্তু পরের মুহূর্তেই দরজায় টোকা পড়লো।

---আসবো?

রুপসার কণ্ঠ শুনেই বেলার হাতের কলম থেমে গেলো।সায়র মাথা তুলে বললো,

--- আয়।

হাতে কয়েকটা ফাইল নিয়ে ভেতরে ঢুকলো রুপসা। মুখে স্বাভাবিক হাসি। ঢুকেই সায়রের পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লো। মিষ্টি হেসে বললো,

---বিরক্ত করলাম নাকি?

---না। সমস্যা নেই।

--- আন্টি কোথায়?এসে নিচে দেখতে পেলাম না।আর শোনো হ্যাঁ। আর তোমাকে একটা মজার ঘটনাও বলবো।

--- কি জানি বাড়িতেই কোথাও আছে হয়তো।

বেলা তখন বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু কান পুরোপুরি তাদের কথোপকথনে।প্রথমে দুজন কাজের কথা বলছিল।তারপর কখন যে গল্প শুরু হলো, সেটা বেলা নিজেও বুঝতে পারলো না।রুপসা একটা ঘটনা বলতে বলতে আবার হেসে উঠলো। সায়রও মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। তারপর আরেকটা প্রসঙ্গ উঠলো। তারপর আরেকটা। যেন গল্পের শেষই নেই।

মনে হচ্ছে এই রুমে আর কোনো মানুষ নেই, শুধু তারা দুজনই আছে। বেলার মুখটা লুচির মতো ধীরে ধীরে ফুলতে শুরু করলো।একবার বইয়ের দিকে তাকাচ্ছে।একবার তাদের দিকে।তারপর আবার বইয়ের দিকে।তারপর আবার তাদের দিকে।যত সময় যাচ্ছে, ততই তার ভেতরের বিরক্তি বাড়ছে।মনে হচ্ছে বুকের ভেতর কেউ আ'গুন ধরিয়ে দিয়েছে।সে জোর করে পড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না।।কারণ রুপসা আবার কিছু একটা বলেছে।বেলার দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলো।মনে মনে বলতে লাগলো,

--- এত হাসির কী আছে?

--- পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ নেই কথা বলার? সবসময় কেন সায়রকে সব বলতে হবে?

অবশেষে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না সে।খাতাটা বন্ধ করে একটু জোরেই বললো,

--- আপনার নিজের বাড়ি নেই রুপসা আপু?

রুমের ভেতর মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এলো।রুপসা অবাক হয়ে তাকালো।

--- কী বললে?

বেলা এবার সরাসরি তাকিয়ে বললো,

--- সকাল নাই দিন নাই আপনার যখন মনে চায় এই বাসায় এসে হাজির হোন। তাও আবার ভুলভাল টাইমে সায়র ভাইয়ের রুমে ঢুকে পড়েন। সায়র ভাই ছেলে মানুষ ওনি তো কিছু বলবে না ।কারন মেয়ে মানুষ আসলে ওনার ভালোই লাগবে। কিন্তু আপনি তো মেয়ে একটা প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের রুমে হুটহাট ঢুকে পড়েন । পাড়া প্রতিবেশী এইসব একবার জানলে কি হবে ভেবেছেন কখনো?

রুপসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে প্রশ্নটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।সায়রের কপালও কুঁচকে গেছে।

কিন্তু বেলা তখন থামার অবস্থায় নেই।সারাদিন ধরে জমে থাকা অভিমান, রাগ আর হিং'সেটা যেন একসাথে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বেলা আবার বলতে লাগে,

---মানুষ তো সাধারণত দরকারে আসে। কিন্তু আপনি তো সুযোগ পেলেই চলে আসেন। এতো নির্ল'জ্জ কেন আপনি?

--- বেলা!

সায়রের গলাটা এবার কঠিন হয়ে উঠলো।কিন্তু সে যেন শুনতেই পেল না।মুখ গোমড়া করে বললো,

--- গায়ে পড়া মানুষদের আমি ছোটবেলা থেকেই সহ্য করতে পারি না। আপনি ঠিক সেরকমই মেয়ে।

রুপসার মুখের হাসিটা পুরোপুরি মিলিয়ে গেল।

--- যথেষ্ট! হয়েছে বেলা।

এবার সায়র টেবিলের ওপর কলমটা রেখে সোজা হয়ে বসলো।তার চোখে স্পষ্ট রাগ।কিন্তু বেলা তখনও থামলো না। বকবক করে যাচ্ছে।

রুপসা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।তার মুখে কষ্ট এবং রাগের ছাপ স্পষ্ট।সে সায়রের পানে চেয়ে বলে,

---আমি আজ আসি আসি।

কথাটা বলেই সে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো।আর সেই মুহূর্তেই সায়রের ধৈর্যের শেষ সীমাটুকুও ভেঙে গেলো।

সে সরাসরি বেলার দিকে তাকিয়ে বললো,

--- তোর কি কোনো ধারণা আছে তুই কী বলেছিস রুপসাকে?

বেলা জেদি গলায় বললো,

--- যা সত্যি তাই বলেছি।

--- এটা সত্যি না। এটা অভদ্রতা।

--- আপনি..

--- চুপ। একদম চুপ।

সায়রের কণ্ঠ এতটাই কঠিন ছিল যে বেলা অনিচ্ছাসত্ত্বেও থেমে গেল।

--- সবাইকে অসম্মান করার অভ্যাসটা দিন দিন বাড়ছে তোর।কাউকে অপমান করার অধিকার তোকে কে দিয়েছে?

সায়র আবার বললো,

--- নিজের আচরণ নিয়ে লজ্জা হওয়া উচিত তোর। রুপসা আমার বন্ধু, পাশাপাশি আত্মীয়ও। ও এই বাড়িতে আসলে তোর সমস্যা কোথায় আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না। এই বাড়ি শুধু তোর না, সবার। ও অনেক বছর থেকেই এ বাড়িতে আসে, সবার সঙ্গে মিশে, গল্প করে। আজ পর্যন্ত কাউকে অসম্মান করেছে বলে দেখিনি। অথচ তুই এমনভাবে কথা বলছিস যেন ও এই বাসায় এসে কোনো অপরাধ করে ফেলেছে।

বেলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।সায়র বিরক্ত গলায় আবার বললো,

--- মানুষকে পছন্দ না হতে পারে, কারও সঙ্গে মতের মিল নাও থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে তাকে অপমান করতে হবে? সামনে বসিয়ে এমনসব কথা বলতে হবে? তুই কি একবারও ভেবেছিস, তোর কথাগুলো শুনে ওর কেমন লাগছে?

কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বললো,

--- সত্যি বলতে কী, তোর মতো অভদ্র মেয়ে পুরো পাড়ায় আর একটা আছে কিনা আমার সন্দেহ হয়। মুখে যা আসে তাই বলে দিবি, কে কষ্ট পেল, কে অপমানিত হলো, সেসব নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই। সবসময় মনে হয় পৃথিবীর সবাই ভুল আর একমাত্র তুই ঠিক। সারাক্ষণ ঝগড়া, তর্ক, জেদ আর নাটক। কলেজে গিয়ে ঝগড়া করিস, বাড়িতে এসে ঝগড়া করিস, পড়তে বসেও ঝগড়া করিস। একটা দিনও কি শান্তভাবে কাটাতে পারিস না? মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে তোর এত সমস্যা কেন?আর সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় কী জানিস? তুই নিজের ভুল কখনো স্বীকার করিস না। যত বড় অন্যায়ই করিস না কেন, শেষে এমন ভাব ধরিস যেন সব দোষ অন্যদের। একটু আগে যে কথাগুলো বললি, সেগুলো শুনে আমি নিজেই ল'জ্জা পেয়েছি।

সায়র কপালে হাত বুলিয়ে গভীর শ্বাস ফেলে বললো,

---মানুষকে সম্মান করতে শিখ বেলা। সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো হয় না। আর সব সম্পর্ককে নিজের রাগ, জেদ আর বাচ্চামি দিয়ে বিচার করা যায় না। তুই এখন ছোট নেই। অন্তত এতটুকু বোঝার বয়স হয়েছে যে কাউকে অকারণে অপমান করা খুব খারাপ অভ্যাস।কখন বড় হবি তুই, সেটাই বুঝি না। সত্যি বলছি, আজকে তোর আচরণে আমি খুবই হতাশ হয়েছি।

শেষ কথাটা বলার সময় তার গলায় হতাশার সুর স্পষ্ট ছিল সায়রের।

সায়রের প্রতিটা কথাই যেন তীরের মতো এসে লাগছিল বেলার বুকে।বিশেষ করে রুপসার সামনে।তার মনে হচ্ছিল, মাটিটা যদি ফে'টে যেত, তাহলে সে সেখানেই লুকিয়ে পড়তো‌ চোখের কোণে অশ্রু জমে গেলো।সে মরিয়া হয়ে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করলো। মাথা নিচু করে দ্রুত বইখাতা গুছিয়ে নিলো সে।তারপর কারও দিকে না তাকিয়েই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।চোখের কোণে অশ্রু জমলেও মাথা তুলে তাকালো না।কারণ পৃথিবীর যেকোনো মানুষের সামনে কাঁদতে পারলেও, সায়রের সামনে কাঁদতে সে রাজি না।একদমই না ।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন