ফন্ট সাইজ:
থিম:
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ

৭ম পর্ব

লেখক: ইয়ুশরা রিমু

#র‌ইলো_প্রেমের_নিমন্ত্রণ

#পর্ব_৭

#ইয়ুশরা_রিমু

[ ক'পি করা নিষিদ্ধ]

নিজের রুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করেই বেলা পিঠ ঠেকিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। বুকের ভেতরটা এখনও অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছে। মনে হচ্ছে, একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যেন বাস্তব নয়, বরং কোনো স্বপ্নের অংশ ছিলো। চোখ বন্ধ করতেই আবার ভেসে উঠলো সেই মুহূর্ত হঠাৎ ধাক্কা, ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নেওয়া, আর ঠিক তখনই সায়রের শক্ত দুটো হাত তাকে আগলে ধরা। এরপর ওড়নাটা হাতঘড়িতে আটকে যাওয়া, আর কতটা ধৈর্য নিয়ে মানুষটা সেটি ছাড়িয়ে দিলো! গতকাল যে মানুষটার কথায় সারারাত বালিশ ভিজিয়ে কেঁদেছিল, আজ সেই মানুষটার আচরণই আবার তার সমস্ত হিসাব-নিকাশ এলোমেলো করে দিলো।

বেলা ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো। তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।পরক্ষণেই নিজেই নিজের মাথায় হালকা একটা চাপড় মেরে বিড়বিড় করে বললো,

---ধুর বেলা! তোর হয়েছে কী? একজন মানুষ ওড়না ছাড়িয়ে দিয়েছে, এতেই তুই এমন হাবুডুবু খাচ্ছিস? একদম পা"গল হয়ে গেছিস নাকি?

কথাটা বললেও নিজের হাসিটা আর লুকিয়ে রাখতে পারলো না। বালিশটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে এপাশ-ওপাশ গড়াগড়ি দিতে লাগলো। তারপর হঠাৎ মুখটা আবার গম্ভীর করে ফেলে বললো,

--- না... আর না। আজকের পর থেকে সায়রের সামনে আর কখনো এমন ছেলেমানুষি করবো না। সবসময় উল্টাপাল্টা কথা বলা, জ্বালানো, দুষ্টুমি করা এসব শেষ। উনি আমাকে সবসময় বাচ্চা ভাবেন। এবার থেকে উনার সামনে একদম ভদ্র, শান্ত আর সিরিয়াস হয়ে থাকবো। দরকার ছাড়া একটা কথাও বলবো না।

দৃঢ়ভাবে নিজের মনেই কথাগুলো বললো সে।কিন্তু সেই দৃঢ়তা টিকলো ঠিক এক মিনিট।হঠাৎ তার চোখ পড়লো বিছানার পাশে রাখা মোবাইলটার দিকে।মুখে ধীরে ধীরে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলে,

--- সামনাসামনি জ্বা'লাবো না।কিন্তু ফেক আইডি দিয়ে একটু জ্বালালে তো সমস্যা নেই!

এক লাফে বিছানা থেকে নেমে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিজের সেই বিখ্যাত ফেক আইডিতে লগইন করলো। তারপর অনেকক্ষণ ভেবে একটা মেসেজ টাইপ করলো,

---- শুনুন, আপনার সন্তানের একটা বড় অভিযোগ আছে। ও বলছে, তার বাবা নাকি সারাদিন শুধু রাগারাগি করে। একটু হাসতে শিখুন, না হলে জন্মের পর কিন্তু ও আপনাকে চিনবেই না!

মেসেজটা পাঠিয়ে সে বালিশে মুখ গুঁজে হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগলো।কয়েক মিনিট পর আবারও ফোন তুলে লিখলো,

---আপনার সন্তানের জন্য নাম ভেবে রেখেছেন? আমি কিন্তু তিনটা নামের লিস্ট বানিয়ে ফেলেছি। আপনি শুধু বলে দিন ছেলে হলে কোনটা রাখবেন, মেয়ে হলে কোনটা!

সেন্ড বাটনে চাপ দিতেই বেলা নিজের মুখ চেপে ধরে হাসতে লাগলো। অস্ফুট স্বরে বললো,

---এবার দেখি হিটলার সাহেবের মাথায় আবার আ'গুন লাগে কি না!

এরপর সে দ্রুত ফোনটা লক করে রেখে নিজের মনে বিড়বিড় করতে লাগে।ওর বিড়বিড়ানোর মাঝেই নাজনীন সুলতানার ডাক ভেসে এলো,

---বেলা! কোথায় তুই? সবাই বসে আছে, তাড়াতাড়ি আয়।

---আসছি আম্মু!

ফোনটা রেখে দ্রুত নিচে নেমে এলো।ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই বেলা দেখলো পুরো বাড়িটা যেন ছোট্ট একটা আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। টেলিভিশনে নিচু ভলিউমে খবর চলছে, সেন্টার টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, আর গরম গরম পেঁয়াজু সাজিয়ে রেখেছেন নাজনীন সুলতানা। বাশার খান আর সারোয়ার খান দেশের নানা বিষয় নিয়ে গল্প করছেন, আর বিহান মাঝেমধ্যেই এমন সব মজার মন্তব্য করছে যে পুরো ঘর হাসিতে মুখর হয়ে উঠছে। বিহান বেলাকে দেখে বলে উঠলো,

---এই যে আমাদের মহারানী! অবশেষে আগমন হলো!

বেলা সোফায় বসে বললো,

---এত নাটক করার কী আছে?

---নাটক না, অভিযোগ। পাঁচ মিনিট ধরে ডাকছি, ম্যাডামের আসার সময় নেই।

বাশার খান হেসে বললেন,

--- নিশ্চয়ই ফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিলো।

বেলা তাড়াতাড়ি বললো,

--- আরে না আব্বু, এমনি বসেছিলাম।

সারোয়ার খান চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন,

--- আচ্ছা, যেহেতু কাল শুক্রবার, সবারই তো ছুটি। তাহলে সন্ধ্যায় ছাদে কিংবা সবাই মিলে বসে একটু আড্ডা দিলে কেমন হয়?

কথাটা শুনেই বিহানের চোখ চকচক করে উঠলো,

---আড্ডা শুধু আড্ডা হলে হবে না। একটা জমজমাট আয়োজন করতে হবে।

বেলা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

--- কী আয়োজন?

বিহান দুই হাত তালি দিয়ে বললো,

--- কাল রাতে ছাদে বারবিকিউ পার্টি!

বেলা যেন অপেক্ষাতেই ছিল।সে উল্লাসিত স্বরে বলে উঠে,

---ইয়েস! দারুণ হবে! অনেকদিন পর বারবিকিউ খাবো।

নাজনীন সুলতানা মুচকি হেসে বললেন,

--- তোমরা শুধু খাওয়ার কথা ভাবো। এগুলো বানাবে কে?আমরা কিন্তু পারবো না এইসব ঝামেলা।

বিহান সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বললো,

--- আমি আছি না? পুরো শেফ আমি।

বেলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,

---তুমি আর শেফ? গতবার যে বারবিকিউ বানিয়েছিলে, চিকেনের চেয়ে কয়লার স্বাদ বেশি ছিলো।

ড্রয়িংরুমজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেলো।

বিহান রাগের ভান করে বললো,

--- ঠিক আছে। এবার তোর জন্য আলাদা করে শুধু পোড়া চিকেন বানাবো।

----আমিও তোমার জন্য শুধু সালাদ রেখে দেবো।

--- আমি তাহলে তোর ভাগের খাবার খেয়ে ফেলবো।

---তার আগেই আমি লুকিয়ে রাখবো।

দুজনের কথার লড়াই দেখে বড়রাও হাসতে লাগলেন।

ঠিক তখনই বাশার খান বললেন,

----আর একটা খবর আছে।

সবাই একসঙ্গে তাকালো।

--- কাল রাতেই কিন্তু আর্জেন্টিনার ম্যাচ।

কথাটা শুনে বেলার মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো,

--- সত্যি! তাহলে তো আরও মজা হবে। বারবিকিউ করতে করতে খেলা দেখবো।

বিহান হেসে বললো,

--- আমাদের বাড়ির সবচেয়ে বড় মেসি ভক্ত তো তুই। খেলা শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টা আগে থেকেই মনে হয় জার্সি পরে বসে যাবি।

বেলা গর্বের সঙ্গে বললো,

--- অবশ্যই। কাল কিন্তু কেউ আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে একটা কথাও বলবে না।

সারোয়ার খান মুচকি হেসে বললেন,

--- যদি প্রতিপক্ষ গোল দিয়ে বসে?

বেলা সঙ্গে সঙ্গে দুই কান চেপে ধরলো।

---না না চাচ্চু , এমন কথা বলা নিষেধ।

বিহান হেসে বললো,

--- আচ্ছা ঠিক আছে। যদি মেসি গোল করে, তাহলে কী হবে?

বেলা এক মুহূর্তও দেরি না করে বললো,

---তাহলে সবাইকে আইসক্রিম খাওয়াতে হবে।

বিহান ভ্রু তুলে বললো,

--- সবাই মানে?কে খাওয়াবে ?

বেলা তর্জনীর আঙ্গুল তাক করে বলে,

--- তুমি।

--- কেন আমি?

---কারণ তুমি চাকরি করো। টাকা আছে।

---বাহ! আমার পকেট মা'রার কী সুন্দর বুদ্ধি!

বাশার খান হেসে বললেন,

---- ঠিকই তো বলেছে। বড় ভাইয়ের কিছু দায়িত্ব থাকে।

বিহান নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

--- এই বাড়িতে আমার কোনো মূল্যই নেই। সবাই শুধু আমার টাকার দিকেই তাকিয়ে থাকে।

বেলা মুচকি হেসে বললো,

--- এত নাটক না করে কাল বাজার থেকে চিকেন, সসেজ, কাবাব, কোল্ড ড্রিং'কস আর আইসক্রিম নিয়ে আসো।

---আর কিছু লাগবে ম্যাডাম?

--- লাগবে। মেসি জিতলে একটা বড় কেকও কাটবো।

---আর হারলে?

বেলা চোখ রাঙিয়ে বললো,

---হারার কথা আবার বললে কাল বারবিকিউতে তোমার জন্য শুধু শসা আর পেঁয়াজ থাকবে।

এবার আর কেউ হাসি থামিয়ে রাখতে পারলো না।

পুরো ড্রয়িংরুম হাসি, ঠাট্টা আর খুনসুটিতে মুখর হয়ে উঠলো। অনেকদিন পর বাড়ির পরিবেশটা আবার এমন প্রাণবন্ত লাগছিলো। বেলার কাছে কলেজের ঝামেলা, দিনের সব ক্লান্তি আর মন খারাপ যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল এই আপন মানুষগুলোর হাসির শব্দে।

হাসতে হাসতেই বেলার হঠাৎ ইরার কথা মনে পড়লো।

সে তাড়াতাড়ি তার মায়ের ফোন এনে ইরাকে কল দিলো।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ইরা বললো,

--- কী রে? এত রাতে মনে পড়লো?

বেলা হাসতে হাসতেই বললো,

--- কাল দুপুরের পর একদম আমাদের বাসায় চলে আসবি।

--- হঠাৎ?

--- হঠাৎ না। শুক্রবার, তারপর শনিবারও ছুটি। রাতে ছাদে বারবিকিউ পার্টি হবে, তারপর সবাই মিলে আর্জেন্টিনার খেলা দেখবো।

ইরা সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো,

--- ওয়াও! আমি কিন্তু খালি পেটে আসবো। তোদের বাসায় গিয়ে আন্টির হাতের মজার মজার খাবার খাব।

---চলে আয়। বিহান ভাইয়া সব ব্যবস্থা করবে।

--- যদি মেসি গোল না করে?

বেলা নাটকীয় গলায় বললো,

--- তাহলে তোকে ছাদ থেকেই নিচে ফেলে দেবো

ইরা হো হো করে হেসে উঠলো।

--- আচ্ছা আচ্ছা, মেসি হ্যাটট্রিক করবে। এখন খুশি?

---এই তো আমার ভালো বান্ধবী।

দুজন আরও কিছুক্ষণ হাসি-ঠাট্টা করে গল্প করলো। ফোন রেখে বেলা আবার পরিবারের আড্ডায় গিয়ে বসলো। তার মুখে তখন সারাদিন পর সেই চেনা প্রাণখোলা হাসিটা ফিরে এসেছে। কলেজের সমস্ত অশান্তি যেন আপাতত ভুলে গেছে সে। এখন তার মাথায় একটাই চিন্তা। আগামীকালের বারবিকিউ, পরিবারের সঙ্গে আড্ডা আর প্রিয় আর্জেন্টিনার খেলা।

________________________________________________________

নাজনীন সুলতানা আর মমতাজ বেগম পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রান্নাঘরের আগামীকালের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করছে। দুজনের মাঝেই বেশ ভাব, কখনো বাজারের তালিকা নিয়ে কথা হচ্ছে, কখনো আবার কোন মসলা দিলে বারবিকিউর স্বাদ ভালো হবে, সেই নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করছেন।

মমতাজ বেগমের মুখে সবসময়ই একটা মৃদু হাসি লেগে থাকলেও, তার চোখ দুটো মাঝে মাঝেই অদৃশ্যভাবে বেলার দিকেই চলে যাচ্ছে। বেলা বিষয়টা টের না পেলেও, মমতাজ বেগম যেন অদ্ভুত এক নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন। মুখে কখনো কোনো বিরূপ কথা বলেন না, বাড়ির অন্য সবার সামনেও সবসময় স্বাভাবিক ব্যবহার করেন, কিন্তু তার মনের গভীরে বেলাকে নিয়ে যে অস্বস্তি কিংবা অপছন্দের একটা সূক্ষ্ম রেখা রয়েছে, সেটা তিনি এত নিখুঁতভাবে আড়াল করে রাখেন যে পরিবারের কেউই আজ পর্যন্ত সেই বিষয়টা বুঝতে পারেনি।

অন্যদিকে বেলা এসবের কিছুই না জেনে আগের মতোই বিহানের সঙ্গে তর্কে ব্যস্ত।ঠিক সেই সময় করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছিলো সায়র। নিজের রুম থেকে বের হয়েই ড্রয়িংরুমের ভেতরকার হাসির শব্দ শুনে অজান্তেই তার পা থেমে গেলো। দুতলার করডোরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ ভেতরের দৃশ্যটা দেখলো।

বিহান প্রাণ খুলে হাসছে, বেলা হাত নেড়ে নেড়ে কী যেন বোঝানোর চেষ্টা করছে, বাশার খান আর সারোয়ার খান তাদের কথা শুনে হেসে উঠছেন।দৃশ্যটা দেখে সায়রের নিজের মনটাও অকারণে হালকা হয়ে গেলো।এমন সময় বিহানের চোখ দুতলার করডোরে দিকে পড়তেই সে জোরে বলে উঠলো,

--- এই! ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস? চোরের মতো সব শুনছিস নাকি? নিচে আয়।

সায়র সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে হালকা হেসে বললো,

--- তোদের আড্ডা জমে গেছে দেখে আর বিরক্ত করতে ইচ্ছা করছিলো না।

বাশার খান সঙ্গে সঙ্গে বললেন,

---আরে বাবা, তুই তো এই বাড়িরই বড় ছেলে।

আয়, বস।তোকে ছাড়া আড্ডা পুরোপুরি জমে না।

মমতাজ বেগমও ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,

--- সারাদিন কলেজে দৌড়ঝাঁপ করে এসেছিস। আগে বস, আমি চা দিচ্ছি।

সায়র ধীরে ধীরে এসে সোফার একপাশে বসতেই বিহান তার কাঁধে আলতো চাপড় মে'রে বললো,

--- বল তো দেখি, কলেজ কি অবশেষে তোকে ছুটি দিয়েছে, নাকি তুই কলেজের কাজ রেখে পালিয়ে এসেছিস?

সায়র হালকা হাসে বললো,

---সবাই তো আর তোর মতো না। তুই কাজের ফাঁকেও আড্ডা দিতে পারিস।

--- এই জন্যই তো আমি সুস্থ আছি। আর তোর মাথায় দিন দিন টাক পড়ার ব্যবস্থা হচ্ছে।

সায়র ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে,

--- এক বছরের ছোট হয়ে বড়দের সঙ্গে এভাবেই কথা বলিস?

বিহান সঙ্গে সঙ্গে হেসে বললো,

---ওই এক বছরের বড় হওয়ার গল্পটা আর কত শুনাবি? ছোটবেলা থেকেই তো শুনে আসছি। আরে ভাই, মাত্র বারো মাসের সিনিয়র হয়েছিস, বারো বছরের না।

ঘরে উপস্থিত সবাই হেসে উঠলেন।সারোয়ার খান মুচকি হেসে বললেন,

--- তোদের দুজনকে দেখলে মনে হয় এখনও স্কুলে পড়িস।

বিহান গম্ভীর মুখ করে বললো,

---ওকে না খোঁ'চালে আমার পেটের ভাত হজম হয় না।

কথা ঘুরতে ঘুরতে বিহান নিজের চাকরির প্রসঙ্গ তুললো।

---- জানিস, এবার ট্রান্সফারটা পার্মানেন্ট হয়ে গেছে। আর বাইরে বাইরে ঘুরতে হবে না। এখন থেকে ঢাকা শহরেই থাকবো।

সায়র আন্তরিক স্বরে বললো,

--- খুব ভালো হয়েছে। তুই তো অনেকদিন ধরেই এই পোস্টিংটার জন্য চেষ্টা করছিলি।

বিহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

---হ্যাঁ। সত্যি বলতে কী, বাইরে থাকতে থাকতে একটা সময় মনে হতো চাকরি করছি ঠিকই, কিন্তু নিজের মানুষগুলোর সঙ্গে থাকার আনন্দটাই যেন হারিয়ে ফেলেছি। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে আপনজনদের মুখ দেখতে না পারলে চাকরির সাফল্যও অনেক সময় ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

সায়র ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলে,

---ঠিক বলেছিস। কাজের গুরুত্ব অবশ্যই আছে, কিন্তু কাজ কখনো পরিবারের জায়গা নিতে পারে না। মানুষ যত বড়ই হোক, দিনের শেষে ফিরে আসার জন্য একটা ঘর আর কিছু আপন মানুষ দরকার হয়।

বাশার খান সন্তুষ্ট চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন,

--- এই কথাগুলোই শুনতে ভালো লাগে। চাকরি, পদ-পদবি সবই একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু পরিবার যদি পাশে থাকে, মানুষ তখনও ধনী থাকে।

কথার মাঝেই বিহান হঠাৎ হাত চাপড়ে বললো,

--- আচ্ছা, কালকের প্ল্যানটা কিন্তু ফাইনাল। বিকেল থেকেই ছাদে বারবিকিউ শুরু হবে। তারপর সবাই মিলে বসে আর্জেন্টিনার খেলা দেখবো। কেউ কিন্তু ফাঁকি দিতে পারবি না।

সায়র ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বললো,

---আমাকে দিয়ে আবার বারবিকিউ বানানোর আশা করিস না।আমি ওসব পারি না।

---আরে না। রান্না আমি করবো, তুই শুধু আ'গুনটা জ্বা'লাবি। আমার পাশে পাশে থাকবি বুঝলি বেটা।

বেলা চুপচাপ সোফার এক কোণে বসে ছিলো। মুখে কোনো কথা নেই, দৃষ্টি নিচের দিকে নিবদ্ধ।অনেকক্ষণ ধরেই তার নাকে ভেসে আসছে সায়রের ব্যবহার করা সেই পরিচিত পারফিউমের মৃদু সুবাস। ঘ্রানটা খুব তীব্র নয়, আবার এতটাও হালকা নয় যে সহজে হারিয়ে যাবে। এক অদ্ভুত পরিমিতি আছে সেই সুগন্ধে যেন অকারণেই মানুষের মনে থেকে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর বেলার কাছে তো এই ঘ্রাণের আলাদা এক অনুভূতি জড়িয়ে আছে। কেন ভালো লাগে, তার কোনো ব্যাখ্যা সে নিজেও জানে না।শুধু এটুকু জানে, এই সুবাস তার ভীষণ প্রিয়।

এমনকি এখন যদি চোখ বন্ধ করেও কোথাও দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তবু সে নিশ্চিতভাবেই এই ঘ্রাণ চিনে ফেলতে পারবে। কলেজে প্রায়ই এমন হয়েছে করিডোর দিয়ে সায়র হেঁটে যাওয়ার আগেই বাতাসে ভেসে আসা এই পরিচিত সুগন্ধ যেন নীরবে তার উপস্থিতির সংবাদ জানিয়ে দিয়েছে। তখন না চাইলেও বেলার চোখ আপনাআপনিই সেই দিকেই চলে যেত। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। পরিচিত সেই সুবাস মুহূর্তের মধ্যেই বেলার ভেতরে অদ্ভুত এক নীরব অনুভূতির জন্ম দিলো, যদিও বাইরে থেকে সে আগের মতোই নির্বিকার হয়ে বসে রইলো।

অজান্তেই বেলার বুকের ভেতরটা আবার কেমন যেন কেঁপে উঠলো। একটু আগেই নিজের রুমে দাঁড়িয়ে কত দৃঢ়ভাবে প্রতিজ্ঞা করেছে ।সেই প্রতিজ্ঞাটাই মনে পড়তেই সে তাড়াতাড়ি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। সামনে রাখা চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন সেটাই এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।

অন্যদিকে সায়র কথাবার্তায় অংশ নিলেও মাঝেমধ্যে অজান্তেই তার দৃষ্টি বেলার দিকে চলে যাচ্ছিলো। আজ কলেজের ঘটনাটা এখনও পুরোপুরি মন থেকে সরাতে পারেনি সে। অফিসরুমে ভেঙে পড়া মেয়েটা আর এই মুহূর্তে পরিবারের সঙ্গে বসে প্রাণ খুলে হাসতে থাকা বেলাকে যেন একই মানুষ বলে বিশ্বাস করাই কঠিন।

সে লক্ষ্য করলো, আজ বেলা অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ। সাধারণত সে কিছু না কিছু বলবেই, সুযোগ পেলেই বিহানের সঙ্গে তর্কে জড়াবে, মাঝে মাঝে তাকে নিয়েও কোনো না কোনো মন্তব্য করবে। কিন্তু আজ সে যেন ইচ্ছে করেই দূরত্ব বজায় রাখছে। চোখাচোখি হওয়ার সুযোগ এলেই দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচ্ছে, কথাও বলছে শুধু প্রয়োজনের মধ্যেই।

বিহান বিষয়টা খেয়াল না করেই হেসে বললো,

--- এই বেলা, তুই আজ এত শান্ত কেন? জ্বরটর আসেনি তো?

বেলা কাপের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলো,

--- না তো।

বিহান হালকা অবাক হ‌ওয়ার অভিনয় করে বলে,

--- নিশ্চিত? তুই পাঁচ মিনিট ধরে কাউকে খোঁচা দিসনি। ব্যাপারটা কিন্তু খুব সন্দেহজনক।

সারোয়ার খান হেসে বললেন,

---- ওকে আর জ্বা'লাস না। সেই ভোরে উঠে কলেজে গেছে। হয়তো ক্লান্ত লাগছে।

বেলা হালকা একটা হাসি দিলেও কিছু বললো না।

সায়রও চুপচাপ বসে রইলো। তার মনে হলো, গতকালের আর আজকের ঘটনার পর বেলা সত্যিই কিছুটা বদলেছে। নাকি এটা কেবল সাময়িক?

ঠিক তখনই নাজনীন সুলতানা ট্রেতে করে আরেক দফা গরম চা নিয়ে এসে বললেন,

--- এই নাও সায়র, তোমার চা। কলেজ থেকে ফিরেই তো আবার ল্যাপটপ নিয়ে বসে গিয়েছিলে। একটু বিশ্রামও দরকার।

সায়র কাপটা হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বললো,

--ধন্যবাদ চাচি।

মমতাজ বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,

---সারাদিন কাজের পেছনে ছুটিস। নিজের শরীরের দিকেও একটু খেয়াল রাখ।

বিহান সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ নিয়ে বললো,

---চাচি, তুমি ওকে যতই বলো, কোনো লাভ নেই। এই লোকটা মনে করে পৃথিবীর সব কাজ একাই শেষ করবে।

সবাই কথায় মেতে উঠলেও বেলা শুধু একবার খুব আড়চোখে সায়রের দিকে তাকালো। ঠিক সেই মুহূর্তেই সায়রের দৃষ্টিও তার দিকেই ছিলো। দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলতেই বেলার বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলো, আর মনে মনে নিজেকেই বললো,

---না বেলা, নিজেকে কথা দিয়েছিস। সামনে আর কখনো এসব ছেলেমানুষি করবি না। উনাকে দেখলেই ভদ্র মেয়ের মতো থাকবি। যত জ্বা'লানো, সব শুধু এই ফেক আইডিতেই।

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন