#রইলো_প্রেমের_নিমন্ত্রণ
#পর্ব_১৪
#ইয়ুশরা_রিমু
[ ক'পি করা নিষিদ্ধ]
রাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলো বেলা টের ও পায়নি। ফোনটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে অনেকক্ষণ সে চুপচাপ শুয়ে ছিলো। ইরা পাশে শুয়ে আরও কিছুক্ষণ ফিসফিস করে কথা বলেছে, তারপর কবে যেন সেও ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু বেলার চোখে ঘুম নামতে একটু দেরি হয়েছিলো। বারবার তার মাথায় ঘুরছিলো রাতের সেই সব মুহূর্ত ছাদের নাচ, সায়রের ফোনের স্ক্রিনে নিজের ছবি দেখে ফেলা, আর শেষে ফেক আইডি দিয়ে পাঠানো উল্টাপাল্টা মেসেজগুলো।বিশেষ করে শেষের কথাটাই। সন্তান পৃথিবীতে আসলে ব্যাগপত্র গুছিয়ে মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দিয়েন।
মনে পড়তেই বেলার ঠোঁটের কোণে আবারও হাসি ফুটে উঠলো। বিরক্ত মানুষটাও যে এভাবে জবাব দিতে পারে, সেটা ভাবলেই কেমন অদ্ভুত লাগে। তবু সেই হাসির আড়ালেই কোথাও একটা প্রশ্ন লেগেই রইলো। সায়র কি বুঝতে পেরেছে কিছু? অন্তত এটুকু কি আন্দাজ করেছে যে এই ফেক আইডির আড়ালে থাকা মানুষটা খুব দূরের কেউ নয়? ভাবতে কখন যে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো সে বুঝতেও পারেনি।
_________________________________________________________
সকালে ঘুম ভাঙলো বেশ দেরিতে।জানালার দিয়ে রোদের আলো বিছানার একপাশে এসে পড়েছে। ইরা তখনও বালিশ জড়িয়ে উল্টো দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে আছে। তার চুলের গোছা এলোমেলো হয়ে পুরো মুখ ঢেকে ফেলেছে। বেলা আধো ঘুমের চোখে উঠে বসে প্রথমেই ফোনটা হাতে নিলো।ওয়াই-ফাই কানেক্ট করতেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।ফেক আইডিতে একটা নতুন মেসেজ।রাতের শুভরাত্রির উত্তরে, অনেক পরে পাঠানো।বেলা তাড়াতাড়ি চ্যাটে ঢুকলো।সেখানে সায়রের এক লাইনের উত্তর ভেসে আছে,
--- শুভরাত্রি। আর হ্যাঁ, নিজের পরিচয় লুকিয়ে মানুষকে ডিস্টার্ব করা এক ধরনের অভদ্রতা। এইসব দুষ্টুমি ছেড়ে ভালো কাজে মন দিন।
এক মুহূর্তে বেলার চোখ কেমন বড় বড় হয়ে গেলো।তারপরই সে ধপ করে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লো।মানে কী?লোকটা কি সত্যিই কিছু বুঝে ফেলেছে? নাকি এমনি এমনি বলেছে? নাকি অন্য কিছু মিন করে বলেছে?
বেলা আবারও লাইনটা পড়লো। তারপর আরও একবার। যতবার পড়ছে, ততবারই বুকের ভেতরটা কেমন কাঁপছে। ঠিক ভয়ের মতো না, আবার পুরোপুরি স্বস্তিরও না। বরং এমন এক অনুভূতি, যেটা তাকে একইসঙ্গে লজ্জা দিচ্ছে, নার্ভাস করছে, আর অদ্ভুতভাবে কৌতূহলীও করে তুলছে।এমন সময় পাশ থেকে ইরার কাঁপা কাঁপা গলা এলো,
---কী দেখছিস রে এত মন দিয়ে?
বেলা চমকে উঠে ফোনটা প্রায় উল্টো করে ফেললো,
---কিছু না!
ইরা একচোখ মেলে তাকিয়ে বলে,
--- সকাল সকাল তোর কিছু না কথাটা খুব সন্দেহজনক শোনাচ্ছে।
---আরে কিছু না বললাম তো।
ইরা এবার উঠে বসল। চুলগুলো মুখ থেকে সরিয়ে সন্দেহভরা চোখে বললো,
--- ফোনটা দে দেখি।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে ফোন বুকে চেপে ধরলো,
---না।
---ওহ্, তাই নাকি? তাহলে নিশ্চিত কিছু একটা আছে।
--- ইরা, অত নাটক করিস না।
ইরা এক লাফে তার দিকে এগিয়ে এসে বলে,
---নাটক আমি করছি, না তুই করছিস? কাল রাতেও তোকে বলেছিলাম, তোর মুখ দেখলেই বোঝা যায় তুই কিছু লুকাচ্ছিস।
বেলা মুখ ঘুরিয়ে বললো,
--- তুই বেশি বুঝিস।
--- অবশ্যই বুঝি। এখন তাড়াতাড়ি বল, তোর হিটলার ভাই কী রিপ্লাই দিয়েছে?
বেলা একটু ইতস্তত করলো। তারপর আর লুকিয়ে লাভ নেই বুঝে ফোনটা ইরার সামনে ধরলো।ইরা মেসেজটা পড়ে প্রথমে দু’সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর এমনভাবে বেলার দিকে তাকালো, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রহস্য সে এইমাত্র জেনে ফেলেছে।
--- বেলা…
--- কী?
--- আমার মনে হচ্ছে, স্যার কিছু একটা ধরতে পেরেছে।
বেলার বুকটা ধক করে উঠলো,
---না না, তা কেন হবে? এমনি এমনি বলেছে।
--- এমনি এমনি কেউ এমন কথা বলে?
--- বলে।
--- না, বলে না।
বেলা এবার বিরক্ত গলায় বললো,
--- তুই না সকাল সকাল একদম বাড়াবাড়ি শুরু করিস!
ইরা ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বললো,
--- ঠিক আছে, আমি কিছু বললাম না। কিন্তু একটা কথা বলে রাখি, যদি সায়র স্যার সত্যিই বুঝে থাকে যে ফেক আইডির আড়ালে তুই, তাহলে আমি সামনে দাঁড়িয়ে পুরো নাটক দেখবো। ধরা পড়লে আমার নাম ভুলেও বলবি না ।
বেলা বালিশ ছুড়ে মারলো ওর দিকে,
--চুপ কর!
ইরা হো হো করে হেসে উঠলো।
এইসব খুনসুটির মধ্যেই দু’জনের সকাল শুরু হলো। নিচে নামতে নামতে তখনও ইরা মাঝেমধ্যে কিছু না কিছু বলেই যাচ্ছে,
---নিজের পরিচয় লুকিয়ে মানুষকে ডিস্টার্ব করা খুব ভদ্রতা না।উফ্ কী ডায়লগ! লোকটা পুরো সিনেমার নায়ক হয়ে গেছে!
বেলা দাঁত চেপে বললো,
---তুই আর একটা কথা বলবি, আমি সিঁড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবো।
--- আগে ধরতে পার, তারপর ফেলিস।
নিচে নেমেই দেখা গেলো ডাইনিং টেবিলে সকালের নাস্তার আয়োজন চলছে। মমতাজ বেগম রান্নাঘর থেকে পরোটা আর ডিম ভাজি এনে রাখছেন। বিহান ইতোমধ্যে চেয়ারে পা তুলে আরামে বসে মোবাইলে কী যেন দেখছে। রুপসাও তৈরি হয়ে এসেছে, চুল খোলা, মুখে হালকা ক্লান্তি থাকলেও বেশ ফ্রেশ লাগছে।
বিহান বেলাদের দেখেই বললো,
---বাহ! দুই মহারানীর ঘুম ভাঙলো তাহলে?
বেলা চেয়ার টেনে বসতে বসতেই বললো,
--- বাহ! আমাদের বাদ দিয়েই ভোজ শুরু হয়ে গেছে নাকি?
বিহান মুখ তুলে নাটকীয় গলায় বললো,
--- যারা দুপুর পর্যন্ত ঘুমায়, তাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠন করা উচিত।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা দিলো,
--- আর যারা সকালে উঠে নাস্তার টেবিলে বসে পাঁচজনের খাবার একা খেয়ে ফেলে, তাদের সরাসরি জেলে পাঠানো উচিত।
বিহান নিজের প্লেট বুকে জড়িয়ে বললো,
--- এই খাবারের দিকে কেউ কুনজর দিবি না। আমি আগেই বলে দিলাম।
বেলা হাসতে হাসতে বসে পড়লো।
--- এত খাবার দেখে মনে হচ্ছে তুমি গতকাল রাত থেকে না খেয়ে আছো।
--- শিল্পী মানুষদের ক্ষুধা বেশি থাকে।
ইরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
--- আবার শুরু হলো শিল্পী তত্ত্ব!
রুপসা মৃদু হেসে বললো,
--- বিহানকে থামানো যাবে না। ওর নিজেকে নিয়ে ধারণা খুবই উঁচু।
বিহান গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লো।
--- অবশেষে কেউ আমার প্রতিভা বুঝলো।
মমতাজ বেগম এসে বললেন,
--- প্রতিভা পরে দেখাবি, আগে সবাই ঠিকমতো খা। আর বিহান, তুই একটু আস্তে খা। কেউ তোর প্লেট কেড়ে নিচ্ছে না।
বেলা নিজের জন্য পরোটা তুলছিলো, এমন সময় করিডোরের দিক থেকে ভেসে এলো ধীর পায়ের শব্দ। অকারণেই তার হাত থেমে গেলো। পরের মুহূর্তেই সায়র ভেতরে ঢুকলো।সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, কালো ট্রাউজার, ভেজা চুল আঙুল দিয়ে হালকা পেছনে সরানো।এতটুকু সাধারণ সকালেও লোকটাকে কীভাবে যেন আলাদা লাগে। মুখে যথারীতি সেই শান্ত, নির্লিপ্ত ভাব, কিন্তু চোখে ঘুম ভাঙা ক্লান্তির সামান্য ছাপ আছে। সে সবার দিকে একবার তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
--- গুড মর্নিং।
রুপসা তৎক্ষণাৎ হেসে বললো,
--- গুড মর্নিং।
ইরা মুখ টিপে হাসলো। বিহান বললো,
--- তোর সকাল গুড হতে পারে, আমার না। আমার সম্মান এখনো পুনরুদ্ধার হয়নি।
সায়র চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো,
--- চাইলে গতকালের ছবিটা আবার দেখিয়ে দিতে পারি। স্মৃতি সতেজ থাকবে।
এক সেকেন্ড স্তব্ধতা, তারপর পুরো টেবিলে হাসির রোল পড়ে গেলো। বিহান এমনভাবে তাকালো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতার শিকার সে।
--- তুইও? তুই-ও আমার বিপক্ষে?
সায়র নির্বিকার।
--- সত্য কথা বলাকে বিপক্ষে যাওয়া বলে না।
বেলা হেসে ফেললো। আর ঠিক তখনই সায়রের চোখ একবার খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তার দিকে এলো। মাত্র এক মুহূর্ত। কিন্তু সেই এক মুহূর্তেই বেলার বুকের ভেতরটা আবার কেমন যেন ধক করে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে প্লেটের দিকে তাকালো।
নাজনীন সুলতানা বললেন,
--- বেলা মা, তোর পাশে চায়ের পাত্র টা আছে, সবার কাপে ঢেলে দে তো।
--- জি আম্মু
বেলা কাপের দিকে হাত বাড়ালো। প্রথমে ইরার, তারপর নিজের, তারপর রুপসার কাপে চা ঢেলে যখন সায়রের কাপের দিকে হাত বাড়ালো, তখন সে নিজের হাতটাকে যতটা সম্ভব স্থির রাখার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ঠিক তখনই সায়র খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কাপটা সামান্য এগিয়ে ধরলো, আর তার আঙুলের গাঁট বেলার আঙুলের গায়ে ছুঁয়ে গেলো একটুখানি।খুবই সামান্য।কিন্তু সেই ছোঁয়াটুকু যেন বেলার সারা শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের মতো ছুটে গেলো।সে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাত সরিয়ে নিলো। কাপের ভেতরে চা সামান্য দুলে উঠলো। ইরা পাশ থেকে এক ঝলক তাকিয়ে কী যেন বুঝে ফেললো বোধহয়, কারণ তার ঠোঁটের কোণে সঙ্গে সঙ্গে সেই চাপা হাসিটা ফুটে উঠলো। বেলা চোখ রাঙাতে গেলো, কিন্তু তার আগেই ইরা নিজের মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো।
নাস্তার টেবিলে এরপর বেশ কিছুক্ষণ শুধু হাসি-ঠাট্টা আর গল্পেই ভরে রইলো। বিহান একবার নিজের শৈশবের ফুটবল খেলার গল্প শুরু করলো, আরেকবার আর্জেন্টিনা নিয়ে নতুন করে তর্ক জুড়ে দিলো। ইরা মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করেই ওকে খোঁচা দিচ্ছে, বেলা হাসছে, রুপসাও কথা বলছে। মমতাজ বেগম সবাইকে একের পর এক খাবার তুলে দিচ্ছেন। এমনকি সায়রও আজ অস্বাভাবিকভাবে বেশি চুপচাপ না থেকে বিহানের কথায় দু-একটা মন্তব্য করে বসছে, আর তাতেই টেবিলে আবার হাসির ঢেউ উঠছে।
একসময় বিহান গরম পরোটার টুকরো হাতে নিয়ে বললো,
--- একটা কথা বলি? আজকে কেউ কোথাও যাবে না। সবাই বাসায় থাকবি। এত সুন্দর সকাল, এত সুন্দর আবহাওয়া এটা নষ্ট করা অপরাধ।
ইরা বললো,
--- আপনি আবার আবহাওয়া বুঝেন কবে থেকে?
--- আমি সব বুঝি। বিশেষ করে যখন ঘুরাঘুরির ব্যাপার আসে।
রুপসা বললো,
--- তাহলে আজ কী প্ল্যান?
বিহান মুখ উজ্জ্বল করে বললো,
--- আমাদের বাগানে যাই সবাই। বাগানটা এত সুন্দর, অথচ কেউ ঠিকমতো সময়ই দেই না। আম গাছের পাশে বসা যাবে, ছবি তোলা যাবে, চা হবে, আড্ডা হবে।
ইরা হাততালি দিলো।
--- আমি রাজি।
বেলা হেসে বললো,
--- তুই তো যে কোনো আড্ডায় রাজি।
নাজনীন সুলতানা বললেন,
--- যেতেই পারিস। মনটা ভালো লাগবে।
বিহান বিজয়ীর ভঙ্গিতে সায়রের দিকে তাকালো।
--- শুনলি? মা ও পারমিশন দিয়ে দিলো।
সায়র গ্লাসে পানি খেতে খেতে শান্ত গলায় বললো,
--- আমাকে দেখে কেন বলছিস? আমি তো নিষেধ করিনি।
বিহান ভ্রু নাচিয়ে বলে,
--- তোর মুখের ভাব দেখলে অনেক সময় মনে হয় তুই পৃথিবীর সব আনন্দ-উৎসবের বিরুদ্ধে।
বেলা হেসে উঠলো।
--- সত্যি কথা।
সায়র এবার শুধু তাকালো। কিছু বললো না। কিন্তু বেলা স্পষ্ট বুঝলো, তার কথায় তার চোখে এক সেকেন্ডের জন্য কেমন যেন বিরক্তির ছাপ স্পস্ট ছিলো। বেলা বিরবির করে বলে,অদ্ভুত মানুষ তো। এমন করে তাকানোর কি আছে।
খাওয়া শেষ হতে হতে বেলা নিজেও বেশ হালকা হয়ে গেলো। রাতের অস্বস্তিটা পুরোপুরি না গেলেও সকালের এই উষ্ণ, প্রাণখোলা পরিবেশটা তার মনটাকে অনেকখানি সহজ করে দিয়েছে। সবাই মিলে বাগানে যাওয়ার কথা উঠতেই তারও কেমন যেন ভালো লাগলো। অনেকদিন পর বাড়ির ভেতর এমন নির্ভার, আনন্দময় একটা সকাল নেমে এসেছে।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই একেক করে উঠে পড়লো। কেউ হাত ধুচ্ছে, কেউ পানি খাচ্ছে, কেউ আবার কার আগে কে বাগানে নামবে তা নিয়ে তর্ক করছে। ইরা তো বেলার হাত ধরেই টানতে লাগলো,
--- চল চল, দেরি করিস না। আমি আজকে বাগানের সব ফুলের সঙ্গে ছবি তুলবো।
বিহান সঙ্গে সঙ্গে বললো,
--- তোরা আমার ফুল গাছগুলো নষ্ট করিস না কেমন?
ইরা জিভ বার করে দেখিয়ে বলে,
--- সব ভেঙ্গে ফেলবো আজকে ।
এইসব খুনসুটির মধ্যেই সবাই বাড়ির সামনে বড় বাগানটায় এসে নামলো।
_____________________________________________________________
সকালের রোদ তখন নরম হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে আছে। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসে এখনও হালকা ঝিলিক। বাগানের একপাশে পুরোনো আমগাছ, আরেকপাশে কদম আর শিউলি, মাঝখানে কাঠগোলাপ, জবা, রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা ছোট বড় নানা গাছের সারি। বাতাসে মাটির গন্ধের সঙ্গে ফুলের মিষ্টি গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত প্রশান্তি তৈরি করেছে। দূরে একটা দোলনা ঝুলছে, তার পাশেই পাথরের বেঞ্চ। পুরো জায়গাটা যেন বাড়ির ভেতর আরেকটা আলাদা ছোট্ট পৃথিবী।ইরা বাগানে পা রাখতেই চেঁচিয়ে উঠলো,
---ওয়াও। কী সুন্দর!
বিহান গর্বিত মুখে বললো,
--- অবশ্যই সুন্দর। আমাদের বাড়ির সবকিছুই সুন্দর।
বেলা হাঁটতে হাঁটতে চারপাশে তাকালো। সত্যিই জায়গাটা অসাধারণ লাগছে। সকালের আলোয় পাতাগুলো আরও সবুজ, ফুলগুলো আরও উজ্জ্বল, আর বাতাসটাও কেমন স্নিগ্ধ। সে টকটকে লাল রঙের গোলাপ গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ফুলের গায়ে এখনও শিশিরের ছোট ছোট ফোঁটা জমে আছে। হাত বাড়িয়ে খুব আস্তে একটা পাপড়ি ছুঁতেই তার ভালো লাগায় বুকটা ভরে গেলো।
ঠিক তখনই পেছন থেকে সায়রের গলা এলো,
--- সাবধানে। ওটার ডালে কাঁ'টা আছে।
বেলা চমকে পেছন ফিরলো। সায়র একদম তার পেছনেই দাঁড়িয়ে। খুব কাছে না, কিন্তু যথেষ্ট কাছে এমন দূরত্বে, যেখানে তার গলার স্বরটা অকারণেই আরও নিচু, আরও স্পষ্ট শোনায়। বেলা তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিলো।
--- আমি দেখেই ধরছিলাম।
সায়র চোখ নামিয়ে গোলাপের ডালের দিকে তাকালো।
--- দেখেও অনেক সময় কাঁ'টা ফসকে যায়।
কথাটা খুব সাধারণ। অথচ কেন জানি বেলার মনে হলো, লোকটা শুধু গোলাপের কথা বলছে না। সে নিজেরই এই ভাবনায় হালকা অস্বস্তি বোধ করলো। চোখ নামিয়ে বললো,
--- আমি সামলে নিতে পারি।
সায়রের ঠোঁটের কোণে যেন খুব ক্ষীণ কিছু একটা নড়লো।
--- সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।
বেলার বুকের ভেতরটা অকারণে টনটন করে উঠলো। উত্তর দেওয়ার আগেই ইরা দূর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো,
--- বেলা! এইদিকে আয়, আমার ছবি তুলে দে!
বেলা যেন বাঁচলো।
--- আসছি! বলে সেখান থেকে চলে যায়।
সে তাড়াতাড়ি সরে গেলো। কিন্তু হেঁটে যেতে যেতেও টের পেলো, সায়রের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ড তার ওপরেই রয়ে গেলো।
বাগানে এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেলো সবাই। ইরা আর বেলা কখনো দোলনার পাশে, কখনো ফুলের গাছের সামনে দাঁড়িয়ে একে অপরকে নিয়ে খুনসুটি করছে। রুপসা প্রথমে বেশ স্বাভাবিকভাবেই সবার সঙ্গে ছিলো, কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার আচরণে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন চোখে পড়তে লাগলো। সে যেন অকারণেই সায়রের আশেপাশে থাকার চেষ্টা করছে। কখনো কোনো ফুলের নাম জিজ্ঞেস করছে, যদিও সেটা না জানার কথা না।কখনো গাছের ডাল থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে দেখিয়ে বলছে,
--- এটা কি কচি পাতা? দেখ না, কী সুন্দর রং!
কখনো আবার দোলনার পাশে দাঁড়িয়ে খুব হালকা হাসি নিয়ে বলছে,
--- সায়র , আমাকে একটা ছবি তুলে দিবে?
সায়র খুব স্বাভাবিকভাবেই সবকিছুর উত্তর দিচ্ছে। না খুব আগ্রহ নিয়ে, না বিরক্ত হয়ে। কিন্তু বেলা অদ্ভুতভাবে সবকিছু খেয়াল করে ফেলছিলো। খেয়াল করতে চায়নি, তবু করছিলো। আর নিজের এই খেয়াল করাটাই তার ভালো লাগছিলো না।
ইরা যখন বেলার কাঁধে ভর দিয়ে একটা সেলফি তুলছিলো, তখনও বেলার চোখ একবার অকারণেই সেদিকে চলে গেলো। রুপসা তখন সায়রের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলছে, মাথা সামান্য কাত করে। সায়র শুনছে, মাঝে মাঝে খুব ছোট ছোট উত্তর দিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখেই বেলার বুকের কোথাও যেন হালকা একটা অস্বস্তি খোঁচা দিলো। খুব ক্ষীণ। খুবই সামান্য। কিন্তু এতেও বুকের ভেতরটা খা খা করে উঠে।ইরা সেলফি শেষ করে বেলার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
--- কী হলো?
--- কিছু না।
ইরা চোখ সরু করলো, তারপর খুব ধীরে ধীরে রুপসা আর সায়রের দিকটায় তাকিয়ে আবার বেলার দিকে ফিরলো। তার ঠোঁটের কোণে সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো।
--- ওহহো…
--- কী?
--- কিছু না।
বেলা এবার চোখ রাঙালো।
--- ইরা!
--- আচ্ছা আচ্ছা, বললাম না, কিছু না।
কিছুক্ষণ পর বিহান ঘোষণা করলো,
--- সবাই এখানে আসো! একটা গ্রুপ ছবি হবে।
সবাই একসঙ্গে আমগাছটার নিচে জড়ো হলো। কে কোথায় দাঁড়াবে তা নিয়েই নতুন করে তর্ক শুরু হলো। ইরা বললো সে সামনে বসবে, বিহান বললো সে মাঝখানে থাকবে, রুপসা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এসে সায়রের একপাশে দাঁড়িয়ে গেলো। বেলা একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু বিহান টেনে বললো,
--- আরে তুই ওইখানে কেন? এখানে আয়, সামনে দাঁড়া।
বেলা এগিয়ে এলো। ঠিক তখনই ইরা কেমন যেন রহস্যময় হাসি নিয়ে তাকে হালকা ঠেলে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিলো, যেখানে তার আর সায়রের মাঝখানে একদম অল্প জায়গা রইলো।বেলা চমকে ইরার দিকে তাকালো। ইরা নির্বিকার মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, যেন কিছুই করেনি। বেলার গাল গরম হয়ে উঠলো। আর ঠিক তখনই সায়রের হাত খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পেছন থেকে একটু সরলো। যেন দাঁড়ানোর জায়গা করে দিতে গিয়ে আর তার হাতের পিঠ ছুঁয়ে গেলো ।বেলার ওড়নার ধারে।এই ছোঁয়াটা আরও ক্ষণিকের, অনিচ্ছাকৃত।তবু বেলা নিঃশ্বাস আটকে এলো।
বিহান দূরে দাঁড়িয়ে ফোন সেট করতে করতে বলছে,
--- কেউ নড়বি না কিন্তু! আমি টাইমার দিয়ে আসছি!
ইরা হাসি চেপে ফিসফিস করলো,
--- নড়ার অবস্থায় কেউ আছে নাকি?
বেলা দাঁত চেপে বললো,
--- তোকে আমি ছাড়বো না।
ছবিটা তোলা হয়ে গেলে সবাই একটু ছড়িয়ে গেলো। বিহান নিজের তোলা ছবি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ইরা সেগুলো দেখতে গেলো। বেলা একটু সরে এসে বাগানের মাঝখানের সরু ইটের পথ ধরে হাঁটতে লাগলো। রোদের ছায়া-আলোয় পথটা খুব সুন্দর লাগছিলো। ঠিক তখনই পেছন থেকে পায়ের শব্দ শুনে সে ফিরে তাকালো। সে এসে খুব বেশি দূরে না দাঁড়িয়ে বললো,
--- তোর ওড়নাটা একপাশে ঝোপে আটকে গেছে।
বেলা চমকে নিচে তাকালো। সত্যিই ওড়নার কোণাটা একটা ছোট্ট কাঁ"টাঝোপে আটকে আছে। সে তাড়াহুড়ো করে ছাড়াতে গিয়ে উল্টো আরও জড়িয়ে ফেললো।
--- ইস!
সায়র এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো, তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো,
--- দাঁড়া।
বেলা স্থির হয়ে গেলো। সায়র সামান্য ঝুঁকে খুব ধীরে, খুব সাবধানে ওড়নার প্রান্তটা কাঁ'টা থেকে ছাড়াতে লাগলো। তার আঙুলের নড়াচড়া শান্ত, মাপা। যেন তাড়াহুড়ো করলে কাপড় ছিঁড়ে যেতে পারে তাই সে অত্যন্ত সতর্ক। বেলা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো। এতটুকু দূরত্বে দাঁড়িয়ে সে টের পাচ্ছে সায়রের শরীরের হালকা সুগন্ধ, ভেজা সকালের বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকা সেই পরিচিত পারফিউমের গন্ধ, আর তার কপালের পাশে পড়ে থাকা দু-একগাছি চুলের নরম দোল।ওড়না ছাড়িয়ে দিয়ে সায়র সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
--- সবকিছু নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করিস কেন? ঠিকভাবে হাঁটতে শিখিসনি এখনো। একটা ওড়না সামলাতে পারিস না? একবার ঘড়িতে তো আরেকবার ঝোপে আটকায়। ওড়না যদি ছিঁড়ে যেতো? তখন তো ওড়না ছাড়াই থাকতে হতো। আমি যেন কখনো তোকে কারো সামনে ওড়না ছাড়া না দেখি। কথাটা মাথায় গেঁথে নে।
বেলা অকারণেই বললো,
--- আমি তাড়াহুড়ো করিনি।
--- করেছিস
--- না।
সায়রের চোখে হালকা, খুবই হালকা একটা মজা খেলে গেলো।
--- ঠিক আছে। এরপর থেকে সাবধানে চলবি।
বেলা কী বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। তার ভেতরে আবার সেই অদ্ভুত ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেছে। আর ঠিক তখনই দূর থেকে রুপসার গলা ভেসে এলো,
--- সায়র ! এদিকে আসবে একটু?
দু’জনেই একসঙ্গে সেদিকে তাকালো।রুপসা দোলনার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসি, কিন্তু তার চোখে কেমন একটা টান টের পাওয়া যাচ্ছে। যেন সে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই সায়রকে খুঁজছিলো, আর এখন এসে দু’জনকে একসাথে দেখে তার ভালো লাগেনি। তাই সায়রকে বেলার কাছ থেকে সরিয়ে নিতে এলো।বেলা কিছু না বলে সরে এলো। একসময় বিহান আবার হৈচৈ করে সবাইকে ডাকলো,
--- চা আসছে! সবাই এইদিকে আয়!
বাগানের মাঝখানে গোল টেবিলের মতো একটা জায়গায় ইতোমধ্যে নাস্তার পরের চা-আড্ডার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মমতাজ বেগম ট্রে করে চা আর বিস্কুট এনে রেখে গেলো। যাওয়ার সময় বেলাকে পায়ের সামনে দেখে মুখে বিরক্তির রেখা ভেসে উঠলো।
সবাই গোল হয়ে বসলো। ইরা আর বিহান আগের মতোই খুনসুটি শুরু করে দিলো। রুপসা এবার চুপচাপ বসে থাকলেও তার চোখ বারবার সায়রের দিকে যাচ্ছে। আর বেলা নিজের কাপ হাতে বসে থেকেও বুঝতে পারছিলো, এই সকালের শান্ত সৌন্দর্যের আড়ালে কোথাও যেন খুব সূক্ষ্ম, নরম একটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।চা খেতে খেতে ইরা হঠাৎ বললো,
--- একটা খেলা খেলবেন?
বিহান সঙ্গে সঙ্গে বললো,
--- না! তোমাদের খেলা মানেই শেষে আমাকছ অপমান করা।
ইরা হেসে ফেললো।
--- না না, এইবার অপমান না। এইবার শুধু প্রশ্ন-উত্তর।
বেলা চুপচাপ কাপের ভেতর তাকিয়ে রইলো। হাতে ধরা গরম চায়ের ধোঁয়া উঠছে, অথচ তার মনটা কোথাও আটকে আছে সামনেই সায়রের পাশে বসে থাকা রুপসার দিকে। মেয়েটা মুখে হালকা হাসি নিয়ে কী একটা বলছে, আর সায়রও খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শুনছে। দৃশ্যটা দেখে অকারণেই বেলার ভেতরটা কেমন শক্ত হয়ে উঠলো।
সকাল থেকে বাগানে আসার পর থেকেই রুপসা যেন ইচ্ছে করেই সায়রের আশেপাশে ঘুরছে।কখনো কথা বলার ছুতোয়, কখনো ছবি তোলার অজুহাতে, কখনো একেবারেই অকারণে। বিষয়টা বেলার একদমই ভালো লাগছে না। সে নিজেও বুঝতে পারছে না কেন এত বিরক্ত লাগছে, শুধু এটুকুই বুঝছে। এই মেয়েটা সায়র ভাইয়ের সঙ্গে সবসময় এমন চিপকে থাকাটা তার মোটেও সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু সায়রের ভ'য়ে কিছু বলতেও পারছেনা।
চলবে....