ফন্ট সাইজ:
থিম:
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ

২৬তম পর্ব

লেখক: ইয়ুশরা রিমু

#র‌ইলো_প্রেমের_নিমন্ত্রণ

#পর্ব_২৬

#ইয়ুশরা__রিমু

[ ক'পি করা নিষিদ্ধ]

সূর্যের অন্তিম সোনালি আলোটা ধীরে ধীরে নদীর বুকে গিয়ে মিশে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশটা কমলা, সোনালি আর হালকা বেগুনি রঙের অপূর্ব মিশেলে রাঙিয়ে উঠেছে। নদীর শান্ত পানির ওপর সেই আলো ভেঙে ভেঙে হাজারো ঝিকিমিকি আলোর রেখা তৈরি করছে। চারপাশের কোলাহল যেন সেই ধ্বনির সঙ্গে ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। হালকা ঠান্ডা বাতাস নদীর বুক ছুঁয়ে এসে বারবার এলোমেলো করে দিচ্ছে বেলার খোলা চুলগুলো।

বেলা এখনও রেলিংয়ের পাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। তার ডান হাতের মুঠোয় ধরা সেই ছোট্ট কালো হেয়ার ব্যান্ড। আঙুলের সাহায্যে সে অজান্তেই বারবার ব্যান্ডটার ওপর হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কত সামান্য একটা জিনিস! অথচ এই সামান্য জিনিসটার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এমন একদিনের স্মৃতি, যেদিন প্রথমবার নিজের অজান্তেই সে সায়রের সামনে নিজের মনের গোপন অনুভূতিটুকু প্রকাশ করে ফেলেছিলো। সেই দিনের কথা মনে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো। চোখের পাতা নেমে এলো একরাশ লজ্জা।

অন্যদিকে সায়র ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। খুব বেশি কাছে নয়, আবার এত দূরেও নয় যে তাকে একা মনে হয়। সে কোনো কথা বলছে না। শুধু মাঝেমধ্যে খুব নিঃশব্দে বেলার দিকে তাকাচ্ছে। সেই দৃষ্টিতে ছিলো না কোনো দাবি, না কোনো অধিকার ফলানোর চেষ্টা। ছিলো শুধু গভীর এক সংযম। নিজের অজান্তেই জন্ম নিতে থাকা দায়িত্বের কোমল অনুভূতি।

হঠাৎ নদীর দিক থেকে জোরে এক ঝাপটা বাতাস এসে বেলার সমস্ত চুল মুখের ওপর উড়িয়ে দিলো।বেলা একটু বিরক্ত হয়ে মুখ থেকে চুলগুলো সরিয়ে নিলো। তারপর ধীরে ধীরে হেয়ার ব্যান্ডটা হাতে নিয়ে চুল বাঁধতে গেলো। কিন্তু সে যতবার চুলগুলো একসঙ্গে করার চেষ্টা করছে, ততবারই বাতাস এসে সব এলোমেলো করে দিচ্ছে।

একবার,দুইবার,তিনবার,প্রতিবারই ঠিক একই অবস্থা।বেলা বিরক্ত হয়ে হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেললো। ঠোঁট দুটো অভিমানের ভঙ্গিতে সামান্য ফুলে উঠলো।দৃশ্যটা দেখে সায়রের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।খুব ক্ষীণ সেই হাসির শব্দটাও বেলার চোখ এড়ালো না।সে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললো,

---হাসছেন কেন?

সায়র তাড়াতাড়ি নিজের হাসিটা চেপে রেখে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলো,

---না কিছু না।

বেলা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বলে,

---না, আপনি হাসছেন আমি স্পস্ট দেখেছি।

---একটুও না।

---মিথ্যা বলছেন।

সায়র এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। খুব আস্তে হেসে বললো,

---আসলে...

---আসলে কী?

---গত পাঁচ মিনিট ধরে তুই একটা ছোট্ট হেয়ার ব্যান্ডের সঙ্গে যু'দ্ধ করে যাচ্ছিস। তাই!

বেলা মুখটা আরও গম্ভীর করে বললো,

---যু'দ্ধ করছি আমি?

---হুম।

---আপনার কাছে আমার নাজেহাল অবস্থা দেখে খুব মজা লাগছে?

---না তবে একটু লাগছে।

---বাতাস দেখছেন না?

---দেখছি।

---তাহলে এত হাসি পাচ্ছে কেন?

সায়র মাথা নেড়ে শান্ত স্বরে বললো,

---কারণ তুই যতবার চুলগুলো ঠিক করছিস, বাতাস ততবার জেদ করে আবার এলোমেলো করে দিচ্ছে।

কথাটাশুনে খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও বেলার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠলো।সেই হাসিটা এতটাই ক্ষণস্থায়ী ছিলো, যেন সন্ধ্যার আকাশে হঠাৎ জ্বলে ওঠা কোনো এক টু'করো তারা।

সায়রের চোখ সেই হাসির ওপরই আটকে রইলো।সে মনে মনে ভাবলো,

---এই হাসিটুকুই তো ফিরিয়ে আনতে চাই, বেলা। এর বেশি কিছু না।

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সে ধীরে ধীরে বললো,

---একটা কথা বলি?

বেলা মাথা তুললো।

---জি?

সায়র কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় রইলো। তারপর খুব আস্তে বললো,

----আমি যদি সাহায্য করি?

বেলা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।

---মানে?

---চুলগুলো বাঁধতে পারছিস না তাই বলছিলাম।

কথাটা শেষ করেই সায়র নিজেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।

---না থাক। হয়তো বলা ঠিক হয়নি।

সে ফিরে যেতে চাইছিলো।ঠিক তখনই বেলার খুব নরম কণ্ঠ ভেসে এলো,

---দাঁড়ান

সায়র থেমে গেলো।বেলা ধীরে ধীরে তার দিকে হেয়ার ব্যান্ডটা বাড়িয়ে দিলো।চোখ নিচু।মুখে লজ্জার লাল আভা।খুব আস্তে বললো,

---আপনি বেঁধে দিন।

এক মুহূর্তের জন্য সায়র যেন স্থির হয়ে গেলো।সে বুঝতেই পারছিল না, সত্যিই কি বেলা তাকে অনুমতি দিলো?পরের মুহূর্তেই খুব ধীরে হাত বাড়িয়ে হেয়ার ব্যান্ডটা নিলো।সে ধীরে ধীরে বেলার পেছনে এসে দাঁড়ালো।দু'হাতে খুব আলতো করে বেলার সমস্ত চুল একসঙ্গে জড়ো করলো।চুলে তার আঙুলের স্পর্শ এতটাই সংযত ছিলো, যেন ফুলের পাপড়িও এর চেয়ে বেশি নরম হতে পারে না।

বেলার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো।তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে।চোখ দুটো অজান্তেই বন্ধ হয়ে গেলো। হাওয়া এখনও জোরে বইছে।কিন্তু এখন আর সেই বাতাসের স্পর্শও যেন সে অনুভব করতে পারছে না।সে শুধু অনুভব করছে,খুব সংযত, এক জোড়া হাতের কোমল উপস্থিতি।সায়র খুব যত্ন করে চুলগুলো গুছিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে হেয়ার ব্যান্ডটা পরিয়ে দিলো।

একটুও টান লাগতে দিলো না।কাজ শেষ করে সে সঙ্গে সঙ্গেই এক পা পিছিয়ে গেলো।নরম গলায় বললো,

---হয়ে গেছে।

বেলা ধীরে ধীরে চুলে হাত দিয়ে বুঝলো।একদম সুন্দর করে বাঁধা।তার বিস্মিত চোখ দুটো এবার সায়রের দিকে উঠলো।

---আপনি এত সুন্দর করে চুল বাঁধতে পারেন?

সায়রের ঠোঁটে খুব শান্ত একটা হাসি ফুটে উঠলো।

---খুব ছোটবেলায় আম্মুর প্রায়ই মাইগ্রেন হতো। মাথা ব্যথা করলে উনি নিজে চুল বাঁধতে পারতেন না। তখন আমিই বেঁধে দিতাম। প্রথমে খুব খারাপ হতো। পরে শিখে গেছি। যদিও এখন সেই সমস্যাটা নেই আম্মুর।

কথাটা শুনে বেলার চোখের দৃষ্টি বদলে গেলো।এই মানুষটাকে সে এতদিন শুধু কঠোর, রাগী, নিয়মমাফিক চলা একজন শিক্ষক হিসেবেই চিনেছিলো।আজ প্রথমবার তার ভেতরের অন্য মানুষটার সঙ্গে পরিচয় হলো।যে মানুষটা নিঃশব্দে যত্ন নিতে জানে।আর নিজের অনুভূতির চেয়ে সামনের মানুষের স্বস্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।বেলার ঠোঁটের কোণে আবারও খুব ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠলো।সেই হাসিটা দেখে সায়রের বুকের ভেতরেও অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো।ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় বেলার ওড়নার এক প্রান্ত উড়ে এসে খুব আস্তে সায়রের কব্জিতে জড়িয়ে গেলো।দু'জনেই একই সঙ্গে নিচের দিকে তাকালো।কেউ কিছু বললো না।সায়র তাড়াহুড়ো করে হাত সরাতে গিয়েও থেমে গেলো।বেলা ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এসে খুব সাবধানে ওড়নার প্রান্তটা ছাড়িয়ে নিতে গেলো।ওড়না খুলতে গিয়ে তার আঙুল খুব ক্ষণিকের জন্য ছুঁয়ে গেল সায়রের আঙুল।

মুহূর্তটা ছিল মাত্র এক মিনিটের।তবুও সেই ক্ষণিকের স্পর্শে দু'জনের বুকেই যেন অদৃশ্য এক তরঙ্গ নীরবে ছড়িয়ে পড়লো।বেলা দ্রুত হাত সরিয়ে নিলো।লজ্জায় তার গাল দুটো হালকা লাল গোলাপি হয়ে উঠেছে।

সায়রও অন্যদিকে তাকিয়ে মৃদু কাশি দিয়ে নিজের অস্বস্তিটা আড়াল করার চেষ্টা করলো।দু'জনের মাঝখানে আবারও নীরবতা নেমে এলো।তবে এই নীরবতা আর আগের মতো অস্বস্তির ছিলো না।এই নীরবতার ভেতরে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল একটুখানি বিশ্বাস, একটুখানি স্বস্তি, আর এমন এক কোমল অনুভূতি, যার কোনো নাম এখনও তারা কেউই উচ্চারণ করেনি।

ঠিক সেই সময় নদীর বুক চিরে ভেসে আসা শীতল বাতাসের সঙ্গে দূর থেকে শোনা গেলো চেনা এক কণ্ঠের চিৎকার,

----এই যে! তোমরা দু'জন কি নদীর ধারে সংসার পেতে বসেছো নাকি? আমরা কতক্ষণ ধরে খুঁজছি জানো?

বিহানের গলাটা এত জোরে ভেসে এলো যে বেলা আর সায়র দু'জনেই একসঙ্গে চমকে উঠলো।বেলা তাড়াতাড়ি নিজের হাতটা সরিয়ে নিলো। যদিও একটু আগেও তাদের হাত একসঙ্গে ছিলো না, তবুও অকারণ এক সংকোচে তার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠলো। সে দ্রুত এক কদম সরে গিয়ে ওড়নার আঁচলটা ঠিক করে নিলো।

অন্যদিকে সায়রও হালকা অপ্রস্তুত হয়ে গলাটা পরিষ্কার করলো। মুখে স্বাভাবিক ভাব আনার চেষ্টা করলেও তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা ক্ষীণ হাসিটা পুরোপুরি মিলিয়ে গেলো না।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে তাদের কাছে এসে পৌঁছালো বিহান আর ইরা।বিহান এসে প্রথমেই দু'জনের মুখের দিকে একবার তাকালো। তারপর চারপাশে তাকিয়ে এমন একটা ভাব করলো যেন খুব বড় কোনো রহস্যের সন্ধান পেয়ে গেছে।সে দুই হাত কোমরে রেখে নাটকীয় গলায় বললো,

---হুম ব্যাপারটা সন্দেহজনক!

ইরা ভ্রু কুঁচকে বললো,

---আবার কী হলো?

বিহান গম্ভীর মুখ করে বললো,

--- তোরা দুইজন কি এতক্ষণ ধরে নিশ্চয়ই নদীর পানির গভীরতা মাপছিলি ! তাই না?

ইরা হাসতে হাসতে বললো,

---আপনার মাথায় সারাক্ষণ এসবই ঘোরে?

---অবশ্যই। আমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা কিন্তু অসাধারণ।

বিহান এবার দুষ্টু চোখে সায়রের দিকে তাকিয়ে বললো,

---কী রে? কথা বলছিস না কেন?

সায়র খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল,

--- এইখানের বাতাস ভালো লাগছিলো। তাই দাঁড়িয়ে ছিলাম।

---ওহ! শুধু বাতাস!

বিহান এমনভাবে মাথা নাড়লো যেন কথাটা একেবারেই বিশ্বাস করতে পারেনি।

---বাহ! বাতাসের সঙ্গে এত গভীর বন্ধুত্ব কবে থেকে হলো?

এদিকে বিহান আবার শুরু করলো,

---সায়র, তুই কিন্তু আগে এমন ছিলি না। আমি কেমন যেন রহস্যের গ'ন্ধ পাচ্ছি।

সায়র এবার হেসে ফেললো।

---মানুষ সবসময় একরকম থাকে না।

---বাহ! দার্শনিক কথাও বলা শুরু করেছিস দেখছি!

ইরা সঙ্গে সঙ্গে বললো,

----আচ্ছা, আপনারা দুই বন্ধু কি আজকে শুধু একজন আরেকজনকে খোঁচা দিয়েই সময় কা'টাবেন?

বিহান খুব ভদ্র মুখ করে বললো,

---না ম্যাডাম। এখন থেকে আমি সম্পূর্ণ ভদ্র।

কথাটা শেষ হতেই ইরা সঙ্গে সঙ্গে বললো,

----এই কথাটা শুনে মনে হচ্ছে, আজকে সূর্য কোন দিকে উঠেছে।

সবাই একসঙ্গে হেসে উঠলো।বেলাও হেসে উঠলো।সায়র চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেই হাসিটুকু দেখছিলো।তার মনে হচ্ছিলো, এই একটি মুহূর্তের জন্যই যেন আজ এখানে আসা সার্থক।

হঠাৎ বিহানের চোখ পড়লো নদীর পাড়ে সারি সারি ছোট ছোট দোকানের দিকে।রঙিন কাঁচের চুড়ি, ঝিনুক দিয়ে বানানো শোপিস, হাতে আঁকা মাটির পুতুল, বাঁশের তৈরি ছোট ছোট কারুকাজের জিনিসপত্র, আর শিশুদের খেলনা দিয়ে সাজানো।বিহান দুই হাত তালি দিয়ে বললো,

---চল! এবার ওদিকে যাওয়া যাক।

ইরা আগ্রহ নিয়ে বললো,

---হ্যাঁ চল। ওই ঝিনুকের দোকানটা আমার খুব ভালো লাগছে।

বিহান সঙ্গে সঙ্গে সায়রের কাঁধে হাত রেখে বললো,

---আর শোন, আজ কিন্তু সব খরচ নতুন বরের।

সায়র ভ্রু তুলে তাকালো।

---কেন?

----কেন আবার? বিয়ে হয়েছে তোর, ট্রিটও দিবি তুই।

ইরা সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলো,

---আমি কিন্তু আইসক্রিমও খাবো।

বিহান বললো,

---আমি ফুচকা, চটপটি, আইসক্রিম সব খাবো।

সায়র অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো।

---তোরা আমাকে ঘুরতে এনেছিস, নাকি দেউলিয়া করতে?

বিহান হেসে বললো,

---বন্ধুর বিয়ের পর এই অধিকারটা আমাদের আছে।

সায়র গম্ভীর করে বলে,

--- ভুলে যাছ না।‌বিয়েটা কিন্তু তোর বোনকেই করেছি। আমার টাকা বেশি খরচ করলে তোর বোনের‌ই সমস্যা হবে।

সায়রের কথায় ইরা বিহান ফিক করে হেসে উঠলো ‌। তাদের সেই হাসির ফাঁকেই সায়রের চোখ একবার নিঃশব্দে বেলার দিকে চলে গেলো।বেলাও ঠিক তখনই তার দিকে তাকিয়েছিল।দু'জনের চোখ আবার এক মুহূর্তের জন্য মিললো।এবার সেই দৃষ্টিতে অস্বস্তির চেয়ে সংকোচ ছিল বেশি, আর সংকোচের আড়ালে খুব অল্প করে জন্ম নিতে থাকা একটুখানি স্বস্তি।সায়রের বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে উঠলো।সে মনে মনে শুধু একটাই কথা বললো,

---হয়তো পথটা এখনও অনেক দীর্ঘ। কিন্তু অন্তত আজ আমাদের মাঝের দূরত্বটা একটুখানি হলেও কমেছে।

__________________________________________________________

নদীর ঘাটে পৌঁছাতেই হালকা বাতাসটা যেন আরও শীতল হয়ে উঠলো। নদীর বুক জুড়ে তখন অস্তগামী সূর্যের লালচে-সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে। পানির ছোট ছোট ঢেউগুলো সেই আলোয় চিকচিক করে ঝলমল করছে। দূরে কয়েকটি মাছ ধরার নৌকা ধীরে ধীরে তীরের দিকে ফিরছে। মাঝেমধ্যে মাঝিদের ভাটিয়ালি সুর ভেসে এসে পুরো পরিবেশটাকে আরও মোহময় করে তুলছে। ঘাটের পাশে সারি সারি কাঠের ছোট নৌকা বাঁধা, আর একটু দূরে পর্যটকদের জন্য তৈরি বড় একটি মোটরচালিত কাঠের বোট নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে দুলছে।

বোটটার দিকে চোখ পড়তেই বিহানের চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠলো। সে একেবারে বাচ্চাদের মতো উচ্ছ্বাস নিয়ে হাত তুলে বলে উঠলো,

---এই যে! আজকে যদি ওই বোটে না উঠি, তাহলে কিন্তু এই ঘুরতে আসাটাই বৃথা হয়ে যাবে। চল, সবাই উঠে একটু নদীর মাঝখান থেকে সূর্যাস্ত দেখি।

ইরা সঙ্গে সঙ্গেই সায় দিলো।

---একদম ঠিক বলেছেন। আমি তো এমনিতেই নৌকায় উঠতে খুব পছন্দ করি।

দু'জনের উচ্ছ্বাস দেখে মাঝিও হেসে এগিয়ে এলো।

---আসেন বাবা, নদীর মাঝখানে নিয়ে যাই। এই সময়ের দৃশ্যটা সবচেয়ে সুন্দর লাগে।

কিন্তু চারপাশের সেই আনন্দের মাঝেও একজন মানুষের মুখ মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেলো। বেলা।বোটটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেও তার পা যেন মাটিতে গেঁথে গেছে। বুকের ভেতরটা অকারণেই কেঁপে উঠছে। হাতের আঙুলগুলো অজান্তেই ওড়নার প্রান্ত শক্ত করে মুঠো করে ধরলো সে।সায়র একটু দূর থেকেই বিষয়টা লক্ষ্য করছিলো। অন্য সবাই যখন বোটে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সে ধীরে ধীরে বেলার পাশে এসে দাঁড়ালো।খুব শান্ত, নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

---কী হলো?

বেলা চোখ না তুলেই বললো,

---আমি উঠবো না।

---কেন?

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বেলা নদীর দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলো,

---আমার ভয় লাগে।

তার কণ্ঠটা এতটাই নিচু ছিল, যেন নিজের ভয়টুকুও কাউকে শুনাতে চাইছে না।

--ছোটবেলায় একবার নৌকায় ঝড়ের মধ্যে পড়েছিলাম মনে আছে?

কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখের ভেতরে সেই পুরোনো আতঙ্ক আবারও ফিরে এলো।সায়র কোনো হাসি-ঠাট্টা করলো না। বললো না,

---এতে আবার ভয়ের কী আছে?

বরং সে খুব মন দিয়ে বেলার কথাগুলো শুনলো।

তারপর মৃদু স্বরে বললো,

---ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক না।আর এখন ঝড় বৃষ্টি হ‌ওয়ার সম্ভবনা নেই।

একটু থেমে আবার বললো,

---কিন্তু সব ভয় সারাজীবন বয়ে বেড়াতে নেই।

বেলা ধীরে ধীরে মুখ তুলে তার দিকে তাকালো।সায়রের চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত।সে খুব ধীরে নিজের ডান হাতটা বেলার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

---চল। একবার শুধু আমাকে বিশ্বাস করে দেখ।

বেলা সেই বাড়িয়ে দেওয়া হাতটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো।এই মানুষটার সঙ্গে তার স্বামী স্ত্রী সম্পর্কের বয়স মাত্র একদিন।তবু কেন জানি না, মানুষটার চোখের দিকে তাকালে বুকের ভেতরের অস্থিরতাটা একটু কমে আসে।অনেক দ্বিধা, অনেক সংকোচের পর খুব আস্তে নিজের হাতটা সায়রের হাতে রাখলো সে।মুহূর্তেই সায়র তার হাতটা ধরলো।শক্ত করে ধরলো।এমনভাবে, যেন বেলা চাইলে যেকোনো মুহূর্তে হাত সরিয়ে নিতে না পারে।

বোটটা তখন নদীর ঢেউয়ে হালকা দুলছে।বেলা প্রথম পা রাখতেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো।চমকে উঠে সে অজান্তেই আরও শক্ত করে সায়রের হাত চেপে ধরলো।সায়র সঙ্গে সঙ্গে আরেক হাত বাড়িয়ে বোটের কাঠের রেলিংয়ের দিকে ইশারা করলো।

---ধীরে কোনো তাড়া নেই। আগে রেলিংটা ধর।

তার কণ্ঠে এমন এক অদ্ভুত স্থিরতা ছিলো যে বেলার বুকের ভেতরের কাঁপুনিটা একটু একটু করে কমে আসতে লাগলো।ধীরে ধীরে সে বোটে উঠে দাঁড়ালো।উঠেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।সায়র মুচকি হেসে বললো,

---দেখলি? হয়ে গেছে।

বেলা নিচু স্বরে বললো,

---আমি ভেবেছিলাম পারবো না উঠতে।

---আমি কিন্তু প্রথম থেকেই জানতাম, তুই পারবি।

খুব সাধারণ একটা বাক্য।কিন্তু কথাটা শুনে বেলার বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে গেলো। সায়র কি সুন্দর তার ওপর এত সহজভাবে বিশ্বাস রেখেছে।

এদিকে পুরো ঘটনাটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলো বিহান আর ইরা।বিহান দুষ্টু হেসে ইরার কানে কানে বললো,

---আমাদের স্যার সাহেবকে তো দেখি আজ একেবারে নায়ক হয়ে গেছে।

ইরা হাসি চাপতে চাপতে বললো,

---আপনি একদম চুপ থাকবেন। আপনি কিন্তু বেলার ভাই। বোন জামাইয়ের সাথে লাগতে আসবেন না সবসময়।

---চুপ থাকবো কেন? আমি তো সত্য কথাই বলছি।

ইরা মুচকি হেসে তার বাহুতে আলতো একটা কিল বসিয়ে দিলো,

---আর একবার বাজে কথা বললে কিন্তু নদীতে ফেলে দেব।

বিহান নাটকীয় ভঙ্গিতে দুই হাত তুলে বললো,

---আচ্ছা আচ্ছা, আমি নির্দোষ!

ওদের কথায় মাঝিও হেসে ফেললো।বোটটা ধীরে ধীরে ঘাট ছেড়ে নদীর মাঝখানের দিকে এগিয়ে চললো।চারদিকে শুধু অথ‌ই পানি।শীতল বাতাস এসে সবার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে।কিছুক্ষণ আগেও যে বেলা ভয়ে কুঁকড়ে ছিলো, সেই বেলাই এখন ধীরে ধীরে সাহস করে নদীর দিকে তাকাচ্ছে।তার চোখে এবার আর আগের সেই আতঙ্ক নেই।আছে মুগ্ধতা।বাতাসের ঝাপটায় তার ওড়নাটা বারবার উড়ে যাচ্ছিলো।কপালের পাশে বাঁধা চুলের কিছু গোছা আবার মুখের ওপর এসে পড়লো।সায়র একবার তাকিয়ে খুব আস্তে বললো,

--এখনও ভয় লাগছে?

বেলা নদীর দিকে তাকিয়েই মাথা নাড়লো।

---আগের মতো না।

---কেন?

বেলা খুব ধীরে উত্তর দিলো,

--- জানি না।

কথাটা বলেই সে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলো।সায়রও কিছু বললো না।নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলা বোটটার মতোই হয়তো তাদের সম্পর্কটাও ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করেছে।কোনো তাড়াহুড়ো নয়, কোনো বড় বড় প্রতিশ্রুতি নয়। শুধু অল্প অল্প বিশ্বাস, নীরব যত্ন আর একে অপরের পাশে থাকার নিঃশব্দ আশ্বাস নিয়ে।

____________________________________________________________

রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা ।বেলা ওরা এখনো বাড়ি ফেরেনি। খান বাড়ির চারপাশে এক গভীর নীরবতা নেমে এসেছে। দিনের কোলাহল, মানুষের আনাগোনা, কথাবার্তা সবকিছু যেন ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। কিন্তু খান বাড়ির দ্বিতীয় তলার এক কক্ষে সেই শান্তির কোনো অস্তিত্ব নেই।জানালার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মমতাজ বেগম। পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলেও তাঁর চোখ যেন কিছুই দেখছিলো না। চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো শুধু গতকালের প্রতিটি মুহূর্ত। যতবার তিনি ভুলে থাকতে চেয়েছেন, ততবারই স্মৃতিগুলো আরও নির্মম হয়ে ফিরে এসেছে।

মমতাজ বেগম ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।তিনি কখনোই বেলাকে পছন্দ করতেন না।মেয়েটাকে প্রথম থেকেই তাঁর মনে হতো অত্যন্ত বেশি সরল সাজার চেষ্টা করে। বরং তাঁর মনে হতো, অতিরিক্ত ভালো হওয়ার আড়ালেও অনেক কিছু লুকিয়ে থাকতে পারে।আর তার বাবা যেখানে সহজ সরল ভাব নিয়ে মানুষের সঙ্গে বেইমানি করতে পারে। তাহলে মেয়ে তো ডাবল পারবে সেগুলো।

অন্যদিকে রুপসা,মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে আসা-যাওয়া করতো। সায়রের বন্ধু , কিন্তু মমতাজ বেগম বহু আগেই বুঝে গিয়েছিলেন, সেই বন্ধুত্বের আড়ালে রুপসার মনে অন্যরকম অনুভূতি জন্ম নিয়েছে।আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই অনুভূতিকে তিনি কখনো নিরুৎসাহিতও করেননি।বরং মনে মনে ভেবেছিলেন । রুপসার মতো শিক্ষিত, মার্জিত, সম্ভ্রান্ত পরিবারের একটি মেয়েই একদিন তাঁর ঘরের বউ হবে।কতবার যে আত্মীয়-স্বজনের সামনেও তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন, তার হিসাব নেই।রুপসাও হয়তো সেই কথাগুলো বিশ্বাস করেছিলো।কিন্তু আজ ,সব শেষ।হঠাৎ করেই তাঁর মনে হলো, এই খবরটা সবচেয়ে আগে যার জানা উচিত, সে এখনও কিছুই জানে না।তিনি ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা হাতে তুলে নিলেন।কয়েক মুহূর্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে পরিচিত একটি নম্বরে কল দিলেন।রিং হতে লাগলো।তারপর ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো,

--- হ্যালো,আন্টি।

কণ্ঠটা আগের মতোই প্রাণবন্ত,স্বাভাবিক,নির্ভার।মমতাজ বেগমের বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠলো।তিনি ধীরে উত্তর দিলেন,

--- হ্যালো, মা।

রুপসা হেসে বললো,

---কেমন আছেন, আন্টি? আজ হঠাৎ মনে করলেন? আমি তো ভাবছিলাম আগামী শুক্রবার একবার আপনাদের বাসায় যাবো। অনেকদিন আপনার হাতের চা খাওয়া হয় না। আর সায়রও আজকাল একদমই ব্যস্ত হয়ে গেছে। ফোন দিলে দুই মিনিট কথা বলেই রেখে দেয়।

শেষ কথাটা বলেই সে হালকা হেসে উঠলো।সেই হাসিটা যেন মমতাজ বেগমের বুকের ভেতর ছু'রি হয়ে বিঁ'ধলো।তিনি কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিলেন না।রুপসা অবাক হয়ে আবার বললো,

---আন্টি???আপনি চুপ করে আছেন কেন?সব ঠিক আছে তো?

মমতাজ বেগম খুব ধীরে সোফায় বসে পড়লেন।কণ্ঠটা কেমন যেন শুকিয়ে এসেছে।

---রুপসা...

---জি?

---তোকে একটা কথা বলবো।

--কী কথা?

---নিজেকে একটু শক্ত রাখিস।

রুপসার মুখের হাসিটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেলো।তার বুকের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি জমে উঠলো।সে দ্রুত জিজ্ঞেস করলো,

---আন্টি সায়রের কিছু হয়েছে?

---না।

---তাহলে?

মমতাজ বেগম কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রইলেন।তারপর খুব ধীরে, যেন প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করতেও কষ্ট হচ্ছে,

---সায়র বিয়ে করে ফেলেছে।

নীরবতা।এক দীর্ঘ, ভারী নীরবতা।ওপাশ থেকে কোনো শব্দ এলো না।মমতাজ বেগম বুঝতে পারলেন, খবরটা রুপসার ওপর কত বড় আ'ঘাত হয়ে নেমে এসেছে।তিনি আস্তে করে ডাকলেন,

---রুপসা?

অনেকক্ষণ পরে ভাঙা, কাঁপা একটা শব্দ ভেসে এলো।

----আআন্টি!!আপনি ...আপনি কী বললেন?

মমতাজ বেগমের চোখ বেয়ে ধীরে ধীরে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো,

---আমি মিথ্যে বলছি না, মা।

গতকাল সায়রের বিয়ে হয়ে গেছে।রুপসার মনে হলো, তার চারপাশের সবকিছু ঘুরছে।সে ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়লো।তার হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো।মুখটা সাদা হয়ে গেছে।ঠোঁট কাঁপছে।কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।কয়েক মুহূর্ত পরে সে ফিসফিস করে বললো,

---না।এটা হতে পারে না। আপনি ভুল বলেছেন।সায়র এমন করবে না।আমাকে না জানিয়ে সে বিয়ে করবে?এটা অসম্ভব।

মমতাজ বেগম তিক্ত হেসে বললেন,

---আমিও তাই ভেবেছিলাম।

কিন্তু বাস্তবতা আমাদের ভাবনার চেয়েও কঠিন হয়, মা।রুপসা এবার আর কান্না আটকে রাখতে পারলো না।চোখের পানি একের পর এক গড়িয়ে পড়তে লাগলো।সে কাঁপা গলায় বললো,

---কার সঙ্গে...?

মমতাজ বেগমের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে উঠলো।তিনি দাঁত চেপে উচ্চারণ করলেন,

---বেলা।

একটি নাম।কিন্তু সেই নামটুকুই যেন রুপসার সমস্ত শরীরে আ''গুন জ্বা''লিয়ে দিলো।সে মুহূর্তেই সোজা হয়ে বসে পড়লো।চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে,

---বেলা?ওই মেয়েটা

উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে রুপসার মুখের সমস্ত রং উধাও হয়ে গেলো।

তারপর ধীরে ধীরে সেই বিস্ময়ের জায়গায় জমতে লাগলো তীব্র ক্ষোভ।সে নিচু স্বরে বললো,

---আমি শুরু থেকেই ওকে পছন্দ করতাম না।মেয়েটার ব্যবহার উশৃঙ্খল ছিলো, কেন জানি না, ওকে আমার কখনোই ভালো লাগেনি।

মমতাজ বেগম তৎক্ষণাৎ বললেন,

---শুধু তুই না।আমিও কোনোদিন ওকে মেনে নিতে পারিনি।

কিন্তু ভাবিনি, একদিন সেই মেয়েই আমার ঘরের বউ হয়ে বসবে।কথাটা শেষ করতে গিয়েও তাঁর কণ্ঠ রাগে কেঁপে উঠলো।

রুপসা দুই চোখ শক্ত করে বন্ধ করলো।তার বুকের ভেতর তখন ভালোবাসা, অপমান, হিংসা, কষ্টসব অনুভূতি একসঙ্গে তোলপাড় করছে।সে শুধু মনে মনে একটি কথাই বারবার বলতে লাগলো,

---সায়র তুমি এটা কী করলে?

মোবাইলের ওপাশ থেকে রুপসার কান্নার শব্দ ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছিলো। সে যেন ঠিকমতো কথাই বলতে পারছিলো না। প্রতিটি শব্দের সঙ্গে মিশে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার অসহায় য'ন্ত্রণা।রুপসা কাঁপা গলায় বললো,

---আন্টি আপনি কি সত্যি বলছেন? সায়র.. সায়র সত্যিই বিয়ে করেছে বেলাকে?

মমতাজ বেগম চোখ বন্ধ করে গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর নিজের গলাটাও ভারী হয়ে এসেছে।

--হ্যাঁ, মা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি। কাল কলেজে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো। যে শেষ পর্যন্ত ওকে বিয়ে করতে হয়েছে।

কথাটা শেষ করতেই ওপাশে আবার কান্নার শব্দ শোনা গেলো,

---না আন্টি এটা হতে পারে না। আপনি তো জানতেন আমি সায়রকে কতটা ভালোবাসি। আপনি নিজেও তো বলেছিলেন, সময় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাহলে আজ এমন হলো কীভাবে?

মমতাজ বেগম ধীরে ধীরে সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন,

---আমি নিজেও কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পাইনি, রুপসা। আমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করেনি। নিজের ছেলের বিয়ের খবর আমাকে পরে জানতে হয়েছে। তুই ভাবতে পারছিস, আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে?

রুপসা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো,

---আন্টি আমি পারছি না। আমার মনে হচ্ছে সব শেষ হয়ে গেছে। আমি তো শুধু সায়রকেই নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছিলাম। আমি অন্য কাউকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারবো না।

মমতাজ বেগম শান্ত স্বরে বললেন,

---কাঁদিস না, মা। আমি এখনও এই বিয়েটাকে মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। সবকিছু এত সহজে শেষ হয়ে যায় না। সময় অনেক কিছু বদলে দেয়।

রুপসা চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো,

---আপনি আমাকে ভুলে যাবেন না তো, আন্টি?

---কখনো না। তুই আমার কাছে এখনও আগের মতোই আছিস।আমি সব ঠিক করে দিব চিন্তা করিস না।

রুপসার কণ্ঠে ধীরে ধীরে কান্নার সঙ্গে জেদও মিশে গেল।

---আমি এত সহজে হেরে যাব না, আন্টি। আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবো। আমি বিশ্বাস করি, একটা জোর করে হওয়া সম্পর্ক আর মন থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্ক এক জিনিস নয়।

মমতাজ বেগম ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।তিনি কখনোই বেলাকে পছন্দ করতেন না।মেয়েটাকে প্রথম থেকেই তাঁর মনে হতো অত্যন্ত বেশি সরল সাজার চেষ্টা করে। বরং তাঁর মনে হতো, অতিরিক্ত ভালো হওয়ার আড়ালেও অনেক কিছু লুকিয়ে থাকতে পারে।আর তার বাবা যেখানে সহজ সরল ভাব নিয়ে মানুষের সঙ্গে বেইমানি করতে পারে। তাহলে মেয়ে তো ডাবল পারবে সেগুলো।

অন্যদিকে রুপসা,মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে আসা-যাওয়া করতো। সায়রের বন্ধু , কিন্তু মমতাজ বেগম বহু আগেই বুঝে গিয়েছিলেন, সেই বন্ধুত্বের আড়ালে রুপসার মনে অন্যরকম অনুভূতি জন্ম নিয়েছে।আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই অনুভূতিকে তিনি কখনো নিরুৎসাহিতও করেননি।বরং মনে মনে ভেবেছিলেন । রুপসার মতো শিক্ষিত, মার্জিত, সম্ভ্রান্ত পরিবারের একটি মেয়েই একদিন তাঁর ঘরের বউ হবে।কতবার যে আত্মীয়-স্বজনের সামনেও তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন, তার হিসাব নেই।রুপসাও হয়তো সেই কথাগুলো বিশ্বাস করেছিলো।কিন্তু আজ ,সব শেষ।হঠাৎ করেই তাঁর মনে হলো, এই খবরটা সবচেয়ে আগে যার জানা উচিত, সে এখনও কিছুই জানে না।তিনি ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা হাতে তুলে নিলেন।কয়েক মুহূর্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে পরিচিত একটি নম্বরে কল দিলেন।রিং হতে লাগলো।তারপর ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো,

--- হ্যালো,আন্টি।

কণ্ঠটা আগের মতোই প্রাণবন্ত,স্বাভাবিক,নির্ভার।মমতাজ বেগমের বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠলো।তিনি ধীরে উত্তর দিলেন,

--- হ্যালো, মা।

রুপসা হেসে বললো,

---কেমন আছেন, আন্টি? আজ হঠাৎ মনে করলেন? আমি তো ভাবছিলাম আগামী শুক্রবার একবার আপনাদের বাসায় যাবো। অনেকদিন আপনার হাতের চা খাওয়া হয় না। আর সায়রও আজকাল একদমই ব্যস্ত হয়ে গেছে। ফোন দিলে দুই মিনিট কথা বলেই রেখে দেয়।

শেষ কথাটা বলেই সে হালকা হেসে উঠলো।সেই হাসিটা যেন মমতাজ বেগমের বুকের ভেতর ছু'রি হয়ে বিঁ'ধলো।তিনি কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিলেন না।রুপসা অবাক হয়ে আবার বললো,

---আন্টি???আপনি চুপ করে আছেন কেন?সব ঠিক আছে তো?

মমতাজ বেগম খুব ধীরে সোফায় বসে পড়লেন।কণ্ঠটা কেমন যেন শুকিয়ে এসেছে।

---রুপসা...

---জি?

---তোকে একটা কথা বলবো।

--কী কথা?

---নিজেকে একটু শক্ত রাখিস।

রুপসার মুখের হাসিটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেলো।তার বুকের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি জমে উঠলো।সে দ্রুত জিজ্ঞেস করলো,

---আন্টি সায়রের কিছু হয়েছে?

---না।

---তাহলে?

মমতাজ বেগম কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রইলেন।তারপর খুব ধীরে, যেন প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করতেও কষ্ট হচ্ছে,

---সায়র বিয়ে করে ফেলেছে।

নীরবতা।এক দীর্ঘ, ভারী নীরবতা।ওপাশ থেকে কোনো শব্দ এলো না।মমতাজ বেগম বুঝতে পারলেন, খবরটা রুপসার ওপর কত বড় আ'ঘাত হয়ে নেমে এসেছে।তিনি আস্তে করে ডাকলেন,

---রুপসা?

অনেকক্ষণ পরে ভাঙা, কাঁপা একটা শব্দ ভেসে এলো।

----আআন্টি!!আপনি ...আপনি কী বললেন?

মমতাজ বেগমের চোখ বেয়ে ধীরে ধীরে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো,

---আমি মিথ্যে বলছি না, মা।

গতকাল সায়রের বিয়ে হয়ে গেছে।রুপসার মনে হলো, তার চারপাশের সবকিছু ঘুরছে।সে ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়লো।তার হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো।মুখটা সাদা হয়ে গেছে।ঠোঁট কাঁপছে।কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।কয়েক মুহূর্ত পরে সে ফিসফিস করে বললো,

---না।এটা হতে পারে না। আপনি ভুল বলেছেন।সায়র এমন করবে না।আমাকে না জানিয়ে সে বিয়ে করবে?এটা অসম্ভব।

মমতাজ বেগম তিক্ত হেসে বললেন,

---আমিও তাই ভেবেছিলাম।

কিন্তু বাস্তবতা আমাদের ভাবনার চেয়েও কঠিন হয়, মা।রুপসা এবার আর কান্না আটকে রাখতে পারলো না।চোখের পানি একের পর এক গড়িয়ে পড়তে লাগলো।সে কাঁপা গলায় বললো,

---কার সঙ্গে...?

মমতাজ বেগমের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে উঠলো।তিনি দাঁত চেপে উচ্চারণ করলেন,

---বেলা।

একটি নাম।কিন্তু সেই নামটুকুই যেন রুপসার সমস্ত শরীরে আ''গুন জ্বা''লিয়ে দিলো।সে মুহূর্তেই সোজা হয়ে বসে পড়লো।চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে,

---বেলা?ওই মেয়েটা

উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে রুপসার মুখের সমস্ত রং উধাও হয়ে গেলো।

তারপর ধীরে ধীরে সেই বিস্ময়ের জায়গায় জমতে লাগলো তীব্র ক্ষোভ।সে নিচু স্বরে বললো,

---আমি শুরু থেকেই ওকে পছন্দ করতাম না।মেয়েটার ব্যবহার উশৃঙ্খল ছিলো, কেন জানি না, ওকে আমার কখনোই ভালো লাগেনি।

মমতাজ বেগম তৎক্ষণাৎ বললেন,

---শুধু তুই না।আমিও কোনোদিন ওকে মেনে নিতে পারিনি।

কিন্তু ভাবিনি, একদিন সেই মেয়েই আমার ঘরের বউ হয়ে বসবে।কথাটা শেষ করতে গিয়েও তাঁর কণ্ঠ রাগে কেঁপে উঠলো।

রুপসা দুই চোখ শক্ত করে বন্ধ করলো।তার বুকের ভেতর তখন ভালোবাসা, অপমান, হিংসা, কষ্টসব অনুভূতি একসঙ্গে তোলপাড় করছে।সে শুধু মনে মনে একটি কথাই বারবার বলতে লাগলো,

---সায়র তুমি এটা কী করলে?

মোবাইলের ওপাশ থেকে রুপসার কান্নার শব্দ ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছিলো। সে যেন ঠিকমতো কথাই বলতে পারছিলো না। প্রতিটি শব্দের সঙ্গে মিশে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার অসহায় য'ন্ত্রণা।রুপসা কাঁপা গলায় বললো,

---আন্টি আপনি কি সত্যি বলছেন? সায়র.. সায়র সত্যিই বিয়ে করেছে বেলাকে?

মমতাজ বেগম চোখ বন্ধ করে গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর নিজের গলাটাও ভারী হয়ে এসেছে।

--হ্যাঁ, মা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি। কাল কলেজে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো। যে শেষ পর্যন্ত ওকে বিয়ে করতে হয়েছে।

কথাটা শেষ করতেই ওপাশে আবার কান্নার শব্দ শোনা গেলো,

---না আন্টি এটা হতে পারে না। আপনি তো জানতেন আমি সায়রকে কতটা ভালোবাসি। আপনি নিজেও তো বলেছিলেন, সময় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাহলে আজ এমন হলো কীভাবে?

মমতাজ বেগম ধীরে ধীরে সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন,

---আমি নিজেও কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পাইনি, রুপসা। আমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করেনি। নিজের ছেলের বিয়ের খবর আমাকে পরে জানতে হয়েছে। তুই ভাবতে পারছিস, আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে?

রুপসা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো,

---আন্টি আমি পারছি না। আমার মনে হচ্ছে সব শেষ হয়ে গেছে। আমি তো শুধু সায়রকেই নিজের ভবিষ্যৎ ভেবেছিলাম। আমি অন্য কাউকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারবো না।

মমতাজ বেগম শান্ত স্বরে বললেন,

---কাঁদিস না, মা। আমি এখনও এই বিয়েটাকে মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। সবকিছু এত সহজে শেষ হয়ে যায় না। সময় অনেক কিছু বদলে দেয়।

রুপসা চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো,

---আপনি আমাকে ভুলে যাবেন না তো, আন্টি?

---কখনো না। তুই আমার কাছে এখনও আগের মতোই আছিস।আমি সব ঠিক করে দিব চিন্তা করিস না।

রুপসার কণ্ঠে ধীরে ধীরে কান্নার সঙ্গে জেদও মিশে গেল।

---আমি এত সহজে হেরে যাব না, আন্টি। আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবো। আমি বিশ্বাস করি, একটা জোর করে হওয়া সম্পর্ক আর মন থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্ক এক জিনিস নয়।

মমতাজ বেগম কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে ধীরে বললেন,

---এখন কোনো তাড়াহুড়ো করিস না। আগে পরিস্থিতি শান্ত হোক। তারপর কী করা যায়, সেটা ভেবে দেখা যাবে।

ফোন কে'টে যাওয়ার পর মমতাজ বেগম অনেকক্ষণ মোবাইলটা হাতে নিয়ে নিশ্চুপ বসে রইলেন। অন্যদিকে রুপসা বিছানায় বসে অঝোরে কাঁদতে লাগলো। তার চোখের পানি থামছিলোই না। কিন্তু সেই কান্নার আড়ালেই তৈরি হতে লাগলো এক তীব্র জেদ।সে এত সহজে নিজের ভালোবাসাকে ছেড়ে দেবে না। কিছুতেই না। যে করেই হোক না কেন তার সায়রকে চাই।

চলবে........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন