ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিঝুমপুরের ছায়াশরীর

পর্ব ১ আর পর্ব ২একসাথে

লেখক: লেখিকা: মুস্তারী আক্তার মারিয়া

উপন্যাস: নিঝুমপুরের ছায়াশরীর
লেখিকা: মুস্তারি আক্তার মারিয়া
পর্ব :১
নিঝুমপুরের অন্ধকার মহলবাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। নিঝুমপুরের শতাব্দী প্রাচীন পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ির চারপাশটা ঘন জঙ্গলে ঘেরা। ঝড়ের দাপটে জানলার ভাঙা কাচগুলো অনবরত খটখট শব্দ করছে। কিন্তু ভেতরের পরিবেশটা একদম স্তব্ধ, যেন এক অলৌকিক চাদরে ঢাকা।বাড়ির সবচেয়ে ভেতরের অন্ধকার ঘরটিতে একটি কাঠের চেয়ারে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে এক ব্যক্তিকে। তার বয়স আনুমানিক ৪৮ বছর। ঘরের একমাত্র তেলের প্রদীপের আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লোকটার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, যেন কোনো ক্ষুধার্ত রক্তপিপাসু শিকারের খোঁজে আছে। সে হিংস্রভাবে একবার এদিক, তো আরেকবার ওদিক তাকাচ্ছে। তার সারা শরীরে আঁচড়ের গভীর দাগ। মনে হয় কেউ খুব যত্ন সহকারে, ধারালো কোনো বস্তু দিয়ে তাকে বারবার আঘাত করেছে। সেই ক্ষতগুলোতে কালচে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। কিন্তু ব্যথার কোনো অনুভূতি তার মুখে নেই, বরং তার হাবভাব কোনো ভয়ংকর বন্য পশুর মতো। সে অনবরত দাঁত কিড়মিড় করছে আর অলৌকিক শক্তিতে বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছে।তার ঠিক পাশেই প্রদীপের আবছা আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে আরও কয়েকজন ছায়ামানব। তবে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষদের পরিচয় এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ গোপন ও অন্ধকারেই রয়ে গেছে। ঘরের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে সেখানে থাকা বাকি নারীদের মাঝে। কারণ, তারা কোনো সাধারণ নারী নয়! তারা মানুষের রূপ ধরে ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে থাকা জিন! প্রদীপের কাঁপতে থাকা আলোয় তাদের অবয়ব স্থির, চোখের পলক পড়ছে না। তবে তারা এখানে কোনো ক্ষতি করতে আসেনি, তারা হলো এই ঘরের মূল চালিকাশক্তি আমামার অত্যন্ত বিশ্বস্ত তিন আধ্যাত্মিক সহচর—ডারডানেল, শামহুরেশ এবং যাওবাআ। আমামার আদেশে ও তার সুরক্ষায় তারা ছায়ার মতো তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে-মুখে মানুষের মতো কোনো আতঙ্ক নেই, বরং এক আদিম অলৌকিক গম্ভীরতা লুকিয়ে আছে।আর এই সবার সামনে দৃঢ় পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক রহস্যময় নারী। তিনি মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো বোরকায় আবৃত।রহস্যময় নারীটি শান্ত কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে অবিরত দোয়া-দরুদ পড়ছেন। পড়া শেষ করে তিনি যেই লোকটির মুখে সজোরে ফুঁ দিলেন, অমনি তার ভেতরে থাকা অশরীরী আত্মা বা জিনটি তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল। তার গলা দিয়ে মানুষের অতীত কোনো এক পশুর হিংস্র গঠন বা গর্জন বেরিয়ে এল। বোরকা পরিহিত নারীটি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে আরও জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি এবং সূরা ইয়াসিন পাঠ করতে লাগলেন।ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুরুষ ভয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল, "এসব কি সত্যিই জিন-ভূতের কারবার? নাকি কোনো মানসিক রোগ?"কথাটি বোরকা পরিহিত নারীর কানে গেল। তিনি সূরা পাঠ থামিয়ে তপ্ত কণ্ঠে বললেন, "অবশ্যই জিন আছে! যে জিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করবে, সে কাফের। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং পবিত্র কুরআনে এদের কথা বলেছেন।"তিনি লোকটির দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার বললেন, "পবিত্র কুরআনের সূরা আল-জ্বিনের ১৫ নম্বর আয়াতে পরিষ্কার বলা আছে: 'আর যারা সত্যবিচ্যুত, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন।' অর্থাৎ জিনদের মধ্যেও যারা অবাধ্য, তাদের শাস্তি নিশ্চিত।"কথাটি শেষ করেই তিনি আবার জোরে জোরে আয়াত পড়তে শুরু করলেন। ঘরটি এক অদ্ভুত অতিপ্রাকৃতিক শক্তিতে কাঁপতে লাগল। বাঁধন পরা লোকটি অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল, যেন ভেতরের জিনটি পুড়তে শুরু করেছে।

উপন্যাস: নিঝুমপুরের ছায়াশরীর
লেখিকা: মুস্তারি আক্তার মারিয়া
পর্ব ২: রক্তের উত্তরাধিকার ও ছায়ামানব ঘরের ভেতরের বাতাস তখন ভারী হয়ে উঠেছে। বাঁধা লোকটি অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে হঠাৎ এক বিকট, অতিপ্রাকৃতিক গলায় হেসে উঠল। তার লাল চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সে চিৎকার করে বলল, "আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না! এই নিঝুমপুরের জমিদার বাড়ি আমি ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেব! আমি হলাম 'আযাযীল'। আমি এই জমিদার বাড়ির মেয়েকে ভালোবাসতাম! কিন্তু এই নিষ্ঠুর পরিবার তাকে আমার বুক থেকে কেড়ে নিয়েছে, আলাদা করে দিয়েছে আমাদের!"আযাযীলের এই হুংকারে ঘরের বাকিরা ভয়ে পিছিয়ে গেল। কিন্তু বোরকা পরিহিত রহস্যময়ী নারীটির মুখে কোনো ভয়ের রেখা ফুটল না। তিনি অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে লোকটির ঠিক সামনে থাকা কাঠের চেয়ারটির ওপর নিজের পা তুলে বসলেন। তার এই অবহেলা মেশানো সাহস জিনটিকে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ করে দিল।নারীটি তার গম্ভীর ও তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলতে লাগলেন, "আযাযীল, তুমি ভুলে যাচ্ছ তুমি কে। তুমি হলে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি, আগুনের তৈরি এক অবাধ্য জীব। আর ইনসান বা মানুষ হলো মাটির তৈরি। আগুন আর মাটির মিলন কখনো সম্ভব নয়। সুতরাং, তুমি সেই অসম্ভব আশা বর্জন করো। আর তুমি যদি তাকে সত্যিকারেরই ভালোবেসে থাকো, তবে তার জীবন থেকে চিরতরে দূরে সরে যাও। তাকিয়ে দেখো, তুমি যার শরীর দখল করেছ, সে তোমার ভালোবাসার মানুষের স্বামী—তার নাম আহনাফ! আর তোমার নাম আযাযীল। নিজের সীমানা স্মরণ করো, আর এক্ষুনি এই শরীর ছেড়ে চলে যাও!"আমামার কণ্ঠের সেই অলৌকিক আধ্যাত্মিক তেজ সহ্য করতে পারল না আযাযীল। আহনাফের শরীরটি শেষবারের মতো একবার তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে নিস্তেজ হয়ে চেয়ারে ঢলে পড়ল। ঘরটি হঠাৎ করেই একদম শান্ত হয়ে গেল। জিনটি চলে গেছে।এই বোরকা পরিহিত নারী আর কেউ নন, তিনি হলেন জমিদারের ছোট ছেলে মিলন শাহের মেজো কন্যা—আমামা ইসলাম শামভী। তার নামের পেছনের ইতিহাসটা এক গভীর রহস্যে ঘেরা। আমামা যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখনই তার দাদি এই নাতনির চোখের ভেতরের এক অলৌকিক জ্যোতি দেখে চমকে উঠেছিলেন। দাদি নিজে আধ্যাত্মিক ও ইসলামিক জ্ঞানে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই নাতনি সাধারণ কেউ নয়। তিনিই তখন গোপনে এই নাতনির নাম রেখেছিলেন 'আমামা ইসলাম শামভী'—যার অর্থ এক মহাশক্তিশালী আধ্যাত্মিক আলো, যা জিন বা অশরীরী আত্মাকে পরাজিত ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। তখন পরিবারের সদস্যরা দাদিকে এই অদ্ভুত নামের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি কাউকে আসল রহস্যের কথা বলেননি। শুধু মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে, দাদি আমামাকে গোপনে ডেকে তার ভেতরের সুপ্ত শক্তি এবং এই নামের আসল তাৎপর্য সম্পর্কে অবগত করে যান। আর দাদির সেই আধ্যাত্মিক শক্তির উত্তরাধিকার হিসেবেই ডারডানেল, শামহুরেশ এবং যাওবাআ নামের এই তিন শক্তিশালী জিন আমামার অনুগত সহচর হিসেবে কাজ করে। তাই বাড়ির কারোরই আমামার এই আসল রূপের কথা জানা নেই।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব ১ আর পর্ব ২একসাথে শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন