### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ১
### প্রথম দেখা
সকালবেলা খান বাড়িতে বেশ ব্যস্ততা। বাড়ির সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। বিশাল বাড়ির চারপাশে সবুজ গাছপালা, সামনের বাগানে রঙিন ফুল আর মাঝখানে সুন্দর একটি ফোয়ারা।
খান বাড়ির বড় ছেলে শাহজাদ খান। পরিবারের সবার কাছে সে বেশ গম্ভীর স্বভাবের মানুষ। সহজে কারও সঙ্গে বেশি কথা বলে না। নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে। তবে পরিবারের মানুষদের প্রতি তার ভালোবাসার কোনো কমতি নেই।
সকালে নাশতার টেবিলে বসে আছে শাহজাদ। হাতে ফোন, চোখ স্ক্রিনে।
তার মা রেহানা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— শাহজাদ, সারাক্ষণ ফোনের মধ্যে কী দেখো বাবা? একটু খাবারের দিকেও মন দাও।
শাহজাদ ফোনটা টেবিলে রেখে বলল,
— কিছু কাজ ছিল, মা।
— তোমার কাজের তো শেষ নেই। এবার নিজের জন্যও একটু সময় বের করো।
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল,
— সময় তো আছেই মা।
রেহানা বেগম ছেলের কথায় মুচকি হাসলেন।
অন্যদিকে...
মায়াদের বাড়িতে সকাল থেকেই হাসাহাসি চলছে। মায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। আজ তার বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করার কথা।
মায়ার মা রান্নাঘর থেকে ডাক দিলেন,
— মায়া! আর কতক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবি?
মায়া দ্রুত ঘুরে বলল,
— এই তো মা, হয়ে গেছে!
— তোর এই হয়ে গেছে কথাটা শুনতে শুনতে আমার অর্ধেক দিন চলে যায়।
মায়া হেসে মায়ের কাছে এসে জড়িয়ে ধরল।
— আচ্ছা মা, আর দেরি করব না।
মা মুচকি হেসে বললেন,
— সাবধানে যাবি। আর রাস্তা পার হওয়ার সময় ফোন দেখবি না।
— ঠিক আছে মা।
মায়া বেরিয়ে পড়ল।
রাস্তার পাশে একটি ছোট্ট ফুলের দোকান। মায়া দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ফুল দেখছিল। হঠাৎ তার হাত থেকে পার্সটি নিচে পড়ে গেল।
ঠিক তখনই পাশ দিয়ে যাচ্ছিল একটি কালো গাড়ি।
গাড়িটি কিছুটা সামনে গিয়ে থেমে গেল। গাড়ি থেকে নেমে এল লম্বা, সুদর্শন এক যুবক।
সে নিচে পড়ে থাকা পার্সটি তুলে মায়ার দিকে এগিয়ে দিল।
— এটা কি আপনার?
মায়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
— জি, আমার। ধন্যবাদ।
যুবকটি শুধু মাথা নেড়ে আবার গাড়ির দিকে চলে গেল।
মায়া কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
নিজের মনেই বলল,
— মানুষটা এমন গম্ভীর কেন!
তারপর আর দেরি না করে বান্ধবীর কাছে চলে গেল।
অন্যদিকে গাড়িতে বসে শাহজাদ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
তার সহকারী রায়হান বলল,
— স্যার, অফিসে যাব?
— হ্যাঁ, চলো।
কিন্তু আজকের ছোট্ট ঘটনাটি যেন তার মনে একটু হলেও জায়গা করে নিল।
বিকেলবেলা খান বাড়িতে ফিরে শাহজাদ দেখল, তার ছোট বোন সোফায় বসে টেলিভিশন দেখছে।
শাহজাদ বলল,
— কী দেখছিস?
বোন মুখ না ঘুরিয়েই বলল,
— নাটক।
— পড়াশোনা শেষ?
— ভাইয়া, আপনি বাসায় আসার পর থেকেই শুধু প্রশ্ন করেন!
শাহজাদ হেসে বলল,
— পড়াশোনা না করলে ফোনটা কিন্তু নিয়ে নেব।
— আচ্ছা বাবা! এখনই পড়তে বসছি।
শাহজাদ নিজের ঘরে চলে গেল।
রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল সে। সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝেও সকালের সেই মেয়েটির কথা একবার মনে পড়ল।
এদিকে মায়াও নিজের ঘরে বসে ছিল। হঠাৎ সকালের ঘটনাটি মনে পড়তেই নিজের অজান্তে হেসে ফেলল।
মা ঘরে এসে মেয়েকে হাসতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
— কী হয়েছে? একা একা হাসছিস কেন?
মায়া তাড়াতাড়ি বলল,
— কিছু না মা!
— নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে।
— আরে না মা, আপনি শুধু শুধু সন্দেহ করেন!
মা হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মায়া জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে।
সে জানত না, জীবনের পথে আজ দেখা হওয়া সেই অচেনা মানুষটির সঙ্গে আবারও দেখা হবে।
আর সেই মানুষটি যে একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন হয়ে উঠবে, তা কি সে কখনো ভেবেছিল?
পরদিন সকালে মায়া ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এল। হাতে এক কাপ চা। হঠাৎ ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসল।
মায়া ফোন রিসিভ করে বলল,
— হ্যালো, কে বলছেন?
ওপাশ থেকে পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
— আমি শাহজাদ খান বলছি।
মায়া অবাক হয়ে বলল,
— আপনি আমার নম্বর পেলেন কোথায়?
শাহজাদ হেসে বলল,
— সেটা না হয় পরে বলব। আসলে আপনার বাবার সঙ্গে একটা বিষয়ে কথা ছিল।
— ওহ, আচ্ছা। বাবা এখন বাসায় নেই।
— ঠিক আছে। তাহলে পরে কথা হবে।
ফোন রাখার আগে শাহজাদ আবার বলল,
— ভালো থাকবেন, মায়া।
মায়া মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— আপনিও ভালো থাকবেন।
ফোন রেখে মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই মা ঘরে এসে মেয়েকে হাসতে দেখে বললেন,
— কী ব্যাপার? আজকাল তোকে বেশ হাসিখুশি দেখছি!
মায়া লজ্জা পেয়ে বলল,
— কিছু না মা!
মা মুচকি হেসে বললেন,
— আচ্ছা, কিছু না হলে তো ভালোই।
মায়া আবার জানালার বাইরে তাকাল। তার অজান্তেই জীবনের গল্পে নতুন একটি অধ্যায় যোগ হতে শুরু করেছে।
মায়া বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিল। শাহজাদের নম্বরটি স্ক্রিনে দেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর মুচকি হেসে ফোনটা পাশে রেখে দিল।
অন্যদিকে শাহজাদ অফিসের কাজ শেষ করে গাড়িতে উঠল। রায়হান জিজ্ঞেস করল,
— স্যার, বাসায় যাবেন?
শাহজাদ হেসে বলল,
— হ্যাঁ, আজ একটু তাড়াতাড়ি যেতে চাই।
তার মনে তখন শুধু একটি নাম—মায়া।
সেদিন রাতে শাহজাদ বাড়িতে ফিরে মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করল। মা ছেলের হাসিমুখ দেখে খুশি হলেন। কিন্তু শাহজাদের মনে বারবার মায়ার কথাই ভেসে উঠছিল। সে নিজেও বুঝতে পারছিল না, মেয়েটির প্রতি তার এত আগ্রহ কেন জন্মাচ্ছে। হয়তো এটাই ভালো লাগার প্রথম ধাপ।
চলবে... ❤️